অনিমেষ ভট্টাচার্য্য
Showing posts with label অনিমেষ ভট্টাচার্য্য. Show all posts

উড়ান - অনিমেষ ভট্টাচার্য্য

অলংকরণ - পিয়াল চক্রবর্তী

দুমদাম চ্যানেল পাল্টে ক্রিকেটে যাওয়ার সময়ই রিমোট হাতে থমকে দাঁড়াল ইন্দ্র। একটা নিউজে চোখ আটকে গেছে তার। সাউন্ড বাড়িয়ে শুনল, বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু হিউম্যান ট্রাফিকিং ব্যাপারটা ঠিক কী সে বিষয়ে খুব একটা আইডিয়া না থাকায় একটু দমে গেল।

তবে, জায়গাটা ওর খুব চেনা। আদিবাসী মাঠের ইটভাঁটা। সব চেয়ে বড় ব্যাপার যে সময়ের নিউজ রিল দেখাচ্ছে ঠিক তার একটু বাদেই ইন্দ্র ওখানে গেছিল। এই তো সোমবারের কথা। পিছনের দিকে ইঁটের পাঁজার মধ্যেই পেটকাটি ঘুড়িটা উড়াচ্ছে, যেটা এখন ওর চিলেকোঠায়। আশ্চর্য সেই সময় তো ওখানে কোনো নিউজ রিপোর্টার বা ক্যামেরাম্যানকে বেরোতে দেখেনি ও। প্রেসের কোনো গাড়িও চোখে পড়েনি। ইশ! আরেকটু আগে গেলে ওকেও টিভিতে দেখাত।

কিন্তু, এই হিউম্যান ট্রাফিকিং-এর কেসটা কী জানতে হবে! আচ্ছা আজ তো শনিবার। ভাস্করদা বাড়ি থাকবে। ইন্দ্র পুরো খবরটা শুনে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল।

***

ভাস্কর একটা আইটি ফার্মে কাজ করে। বাড়িতেই ছিল। ইন্দ্রকে জানলার বাইরে সাইকেল তালা মেরে ঘরে ঢুকতে দেখে একটু অবাকই হল।

“ভাস্করদা, ফ্রি আছো?”

“বাপরে! ভালোই হাঁপাচ্ছিস। জল খা আগে। ...ফ্রিই আছি। বল—”, বলে ইন্দ্রকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিল।

ঢকঢক করে কিছুটা জল খেয়ে ইন্দ্র বলল, “আদিবাসী ইটভাঁটা আছে না, ওটা আজ টিভিতে দেখাচ্ছিল। এই একটু আগেই!”

ভাস্কর একটা ইয়াবড়ো পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপ খুলে বসেছিল। সেটা গোটাতে গোটাতে বলল, “কেন? কারোর কোনো ইনজুরি?”

“না। না। কী যেন বলছিল, ও হ্যাঁ, হিউম্যান ট্রাফিকিং! ইংলিশ নিউজ গো... হাইফাই ব্যাপার মনে হল। তাই ছুট্টে এলাম।”

“একটা নিউজ জানতে দৌড়ে চলে এলি?” ভাস্কর চোখ পাকিয়ে বলল।

“না। মানে পেটকাটিটাকেও দেখালো। কিন্তু ঘুড়িটা দেখতে পেয়ে আমিও গেছিলাম ওখানে, তারপরেই। আমাকে টিভিতে দেখায় নি!” করুণ স্বরে বলল ইন্দ্র, এ বছর ফাইভে উঠল।

“হা হা হা! যা তাহলে কী হবে!” হেসেই ফেলল ভাস্কর।

“ধুর! বলো না কেসটা কী! আমি তো কোনো রিপোর্টার বা ক্যামেরাম্যানকে দেখিনি!”

এবার ভাস্কর একটু সিরিয়াস চোখে তাকাল। ভ্রু কুঞ্চিত হল। কপালে আরামসে ভাঁজ খেলে গেল। একটা ক্লোরোমিন্টের প্যাকেট ছিঁড়ে ইন্দ্রকে একটা দিল, নিজে একটা মুখে দিল। তারপর ইন্দ্রকে জিগ্যেস করল, “আচ্ছা, তুই যখন ওখানে গেলি, ঘুড়িটা আনতে, কী কী দেখতে পেয়েছিলি?”

“ওই যেমন হয়। গরম ইটভাঁটা। লোকজন মাথায় করে ইট নিয়ে যাচ্ছে। মাটির ইট নিয়ে আসছে। কেউ জায়গাটা পরিষ্কার করছে। এইসব।”

“আর কিছু? মানে এই ধর কোনো জমায়েত বা তোর মতো বাচ্চা কাউকে কাজ করতে দেখলি?”

“বাচ্চা? হ্যাঁ, সে ছিল বৈকি। আমার মতই বা আমার থেকে বড় হবে। ওদের সঙ্গে কাজ করছিল। ইট বানাচ্ছিল, সাজাচ্ছিল। আর জমায়েত, মানে ভিড় তো?”

“হ্যাঁ ওইরকমই। অল্প জায়গা জুড়ে—”

“আমি যখন ঘুড়িটার জন্য বাঁ দিককার ইটগুলোর দিকে যাচ্ছিলাম দুটো লোক জিগ্যেস করল, ‘কী চাই?’ ঐখানে কয়েকটা গরিব লোক দাঁড়িয়ে ছিল।”

“হুম... বুঝলাম। তোকে আর কিছু বলেনি ওরা?”

“নাঃ। ঘুড়ি নিয়ে চলে এলাম। আরেকটু আগে গেলেই হত! ক্যামেরাম্যানগুলো ততক্ষণে চলে গেছিল নিশ্চয়! …এই তুমি কী বুঝলে বলো না! বলো না!”

ভাস্কর ততক্ষণে ইন্টারনেটে কীসব সার্ফ করছিল। আর পায়চারি করছিল। ইন্দ্রর ঘ্যান ঘ্যান শুনে বলল, “বলব। বলব। ঠিক সময়ে বলব। আজ বিকেলে আসিস। হিউম্যান ট্রাফিকিংটা কী বুঝিয়ে দেব।”

“ওক্কে। সন্তুকে বলে দেব আজ নো ভোকাট্টা। হিহি... আচ্ছা ওটা জানলে কি আমাকেও, মানে ওই টিভিতে আর কি...!”

“না। অন্য কাজ আছে তোর। তুই আয় বিকেলে। ...ওহ, এই ম্যাপটা নিয়ে যা। এখানে যে জায়গাগুলো নীল গোল করা আছে, সেগুলো বাড়ি গিয়ে ভালো করে দেখবি। প্রশ্ন করব। এখন যা...”, বলে ইন্দ্রকে ওই পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপটা দিল ভাস্কর।

চান করেই মাকে খেতে দিতে বলল ইন্দ্র। শ্যামলীদেবী একটু অবাকই হলেন, “বাব্বা, সূর্য আজ উল্টোকাতে শুয়েছিল নাকি?”

“কেন, তুমি কি ভালো রান্না করেছ?”, বলে একগাল হেসে চুল আঁচড়াতে গেল ইন্দ্র। আজ তার অনেক কাজ। ম্যাপটা খুলে দেখতে হবে। এদিকে লাইব্রেরি থেকে যে মহাকাশবিজ্ঞানের বইটা এনেছিল আজকেই সেটা ফেরত দিয়ে আসতে হবে। এখনও দশ পনেরো পাতা পড়া বাকি। অলরেডি দেড়টা বাজছে! “মা, মা, বলছি খাইয়ে দেবে আজ? অনেকদিন খাইয়ে দাও না। খুব ইচ্ছে করছে আজ। প্লিজ মা, প্লিজ মা!”

“কী এমন রাজকার্য আছে শুনি, যে এত তাড়াহুড়ো?” শ্যামলী দেবী ঠিক জানেন খাইয়ে দিলে ছেলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। মাছও পুরোটা খেয়ে নেবে।

“ভাস্করদা ডেকেছে। গল্প বলবে বলেছে!”

“তুইও পাগল। আর ও তো পাগলের গাছ একটা! পারি না বাপু। ... দাঁড়া মাখিয়ে নিয়ে আসি—”, ভাত বাড়তে চলে গেলেন শ্যামলী দেবী।

অ্যাপোলো, স্পুটনিক এসব ইন্দ্রর আগেই জানা ছিল। কিন্তু এই যে নতুন নতুন মহাকাশযান ঘাঁটি গেড়েছে মহাকাশে সেগুলো সম্পর্কে আবছা ধারণা ছিল।

বেশ খানিকটা অবাক হল যখন জানতে পারল ওদের টিভির সিগন্যাল নাকি কোনো একটা স্যাটেলাইটের থেকে আসছে। মানে ওই দূর থেকে! ভাবা যায়!

তারপর, এই যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এ বছর বর্ষা কবে আসবে, কতটা বৃষ্টি হবে সব নাকি নানা ধরণের কৃত্রিম উপগ্রহের কাছ থেকে জানা যায়। একমনে এসব পড়ছিল ইন্দ্র। কখন যে চারটে বেজে গেছে খেয়ালই হয়নি। ঘড়িতে ঘন্টা পড়তেই তড়াক করে উঠে বসল। ম্যাপটা আর খোলার সময় নেই। বাড়ি এসেই একবার দেখেছিল। কলকাতা, হাওড়ার কিছু জায়গা লাল কালিতে গোল করা আর পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, ছত্তিশগড় বর্ডারের দিকে কিছু জায়গা নীল রঙের। ওদের গ্রামটাও নীল রঙে গোল করা। ওই যে পুরুলিয়ার সুখীনদী!

সাইকেল বাগিয়ে সোজা লাইব্রেরি গেল। বইটা জমা দিয়ে নেক্সট ভলুমটা ইস্যু করল। তারপর ধাঁ করে ভাস্করের বাড়ি।

“ভাস্করদা, ভাস্করদা! জানো ওই ইটভাঁটার মালিকটাকে পুলিশে—”

“গ্রেপ্তার করেছে। জানি। খবরটা নিউজে দেখানোর আগেই, কাল রাত্রেই গ্রেপ্তার হয়েছে।”

“তুমি সব জানতে আগে থেকে?”

“ব’স। একটা জিনিস দেখাচ্ছি। ওহ ম্যাপটা আমাকে দে।” বলে ভাস্কর ম্যাপটা দেওয়ালে টানটান করে ঝুলিয়ে দিল।

“হিউম্যান ট্রাফিকিং হল এক কথায় মানুষের বেচাকেনা। এই ধরে নে আমি তোকে কিনে নিলাম পয়সা দিয়ে, তারপর তুই আমার গোলাম হয়ে গেলি!”

“মুন্ডু! ইয়ার্কি নাকি? আমাকে বেচবে কে? আর কিনলেই বা গোলাম হব কেন? আমি তো কিসুই পাচ্ছিনা।”

“যার থেকে কিনব সে পাবে। তোর বাবা, বা কোনো এজেন্ট। আর এই পণ্য-মানুষরা হয় শিশু আর নাহলে খুব গরীব, অসহায় শ্রেণীর। কাজেই অল্প ক’টা পারিশ্রমিক বা অত্যাচারের থ্রু তে এই ব্যবসা রমরমিয়ে চলে। চলছেও!”

“যা বাব্বা। সেটা তো বেআইনি।” ইন্দ্র রীতিমত অবাক।

“আর সেই জন্যই মানসুখানি অ্যারেস্ট হল। আর তাকে মানুষ সাপ্লাই দেনেওয়ালা আরও চারজন!”

“কিন্তু, লোকে জানল কী করে? ও ও বুঝেছি, ওই নিউজ রিপোর্টিং। কিন্তু সেটাও তো বলছো গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেখিয়েছে। তাহলে? আর আর...”

“আমি আগে থেকে জানলাম কী ভাবে?”

“এক্সাক্টলি!”

ভাস্কর একটা স্টিক নিয়ে ম্যাপের দিকে তাক করল। ওই গোল গোল করা জায়গাগুলোতে।

“লাল গোলগুলো যেকোনো ম্যাপেই পাবি। অথোরাইজড ইটভাঁটা। এগুলোতে চাপ নেই। হিউম্যান ট্রাফিকিং-টা বেশি হয় এই প্রত্যন্ত এরিয়াগুলোতে। যেগুলোর খবর কেউ জানে না। এখানেই শিশু শ্রমিক, ফোর্সড লেবার সব থেকে বেশি। একে তো এগুলোর খোঁজ পাওয়া নেক্সট টু ইম্পসিবল, তারপর হাতে নাতে প্রমাণ! সেটাও—”

ইন্দ্র গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল সকালের ভিডিও ফুটেজটা। বাচ্চাদের মুখগুলো। অপুষ্টিতে ভোগা শরীরটাকে টেনে টেনে কাজ করছে। ওই টেম্পারেচারে।

“তার মানে? তাহলে নিউজের লোকগুলো জানল কীকরে? ওরা ভিডিও করলে তো ইটভাঁটার মালিক তাড়িয়ে দেবে।”

“গুপ্ত ক্যামেরা। পুরো ইটভাটার বিভিন্ন জায়গায় পাওয়ারফুল ক্যামেরা গুঁজে এসেছিলাম আমি আর প্রফেসর সমাদ্দার।”

“কী! তুমি! আর তোমার কলেজের ওই রাগী দাদু! কী বলছ?... আর এরকম ক্যামেরা গোঁজা ব্যাপারটাই বা কী? কেমন একটা স্টিং অপারেশনের গন্ধ পাচ্ছি, ভাস্করদা!” অবাক হয়ে চোখ পাকিয়ে ইন্দ্র বলল।

“হেহেঃ... শোন সবটা। ইউনিসেফের নাম শুনেছিস তো? তো সেই সংস্থা অনেক আগে থেকেই চাইল্ড লেবারের বিরুদ্ধে এইসব জায়গার শিশুদের জন্য নানা ধরনের প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। এখনও কাজ করে চলেছে। কিন্তু, তাতেও অনেক অঞ্চল ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তখন বিকল্প ব্যবস্থা বা সাপোর্টিভ কিছু খোঁজের মধ্যেই উঠে এল এই উপায়টা।”

“কী উপায়?”

“স্যাটেলাইট! কৃত্রিম উপগ্রহ...”

“কী বলছ! ওই মহাকাশ থেকে?”

“ঠিক তাই!”

ঠকঠক করতেই অভিরাজ এসে দরজা খুলল। অভিরাজ প্রফেসরের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। চিঠি টাইপ করা থেকে ডাইরির ধুলো ঝেড়ে দেওয়া সব এই বছর পঁয়ত্রিশের মাঝারি গড়নের ভদ্রলোকের কাজ। দরজা খুলে সুপরিচিত ভাস্করকে দেখে জিগ্যেস করল, “এই ছোটভাই, সক্কাল সক্কাল! এসো এসো, চা বসাই।”

“হ্যাঁ, বেশ আদা দিয়ে ভালো করে। স্যার আছেন তো?”

“সূর্য প্রণাম করছে। ছাদে আছে। এই বাবুভাইকে তো চিনলাম না।” ইন্দ্রকে দেখে প্রশ্নটা করল অভিরাজ।

“আমার নাম ইন্দ্র। ইন্দ্রজ্যোতি স্যানাল। চাঁপাডাঙা হাই স্কুলে ফাইভে পড়ি।” হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করে কথাগুলো বলল ইন্দ্র।

“বাঃ বাঃ। বসো তোমরা। বিস্কুট চা নিয়ে আসি।”

টেবিলের ওপর একটা ছোট রিমোট জাতীয় কিছু রাখা ছিল। ইন্দ্র সেটা নিয়ে দেখতে গিয়ে ভুল করে একটা বোতামে টেপা পড়ে গেল আর অমনি পাশের ঘর থেকে কী একটা উড়ে চলে এল দরজা দিয়ে। এসে ইন্দ্রর মাথার উপর ঘুরতে থাকল। আর একটা শোঁ করে আওয়াজ। এই পুরো ব্যাপারটা ঘটতে লাগল জাস্ট তিন সেকেন্ড। ভাস্কর কিছু করতে পারার আগেই। আর ঠিক পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ধুতি পরে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন প্রফেসর সমাদ্দার।

“এই কে রে, ড্রোন চালালি!”

নাতিস্থূল ভুঁড়ি, চোখে একটা পাতলা চশমা, ডান হাতে তাবিজ আর কপালে ভাঁজ। চোখের চাউনি দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন তাঁকে ঠকিয়ে পচা মাছ গছিয়ে দিয়েছে!

“অ। তুমিই ইন্দ্র ধনুস। বাবা ইন্দ্র এক কাজ করো তো ‘এম’ লেখা বোতামটা টেপো দেখি।”

ভাস্করের দিকে একবার তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ ‘এম’ লেখা বোতামটা টিপতেই ড্রোনটা বাধ্য ছেলের মতো প্রফেসরের মাথায় শান্ত হয়ে বসে পড়ল। আর সমাদ্দারবাবু সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে কব্জা করে তার ভিতরের চিপটা খুলে পকেটে রেখে দিলেন।

“স্যার, মানসুখানির কীর্তি ফাঁস হয়েছে। ব্যাটা গ্রেপ্তারও হয়েছে। সরকার থেকে লেবারদের জন্য পুনর্বাসনের প্রকল্পও ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ—”

ভাস্করকে মাঝপথে থামিয়ে প্রফেসর বললেন, “অর্থাৎ, মিশন ওয়ান সাকসেসফুল। এবার নেক্সট। অলরেডি আমার ইংল্যান্ডের বন্ধু প্লেসেট, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া আরো শ’দুয়েক ছবি ঘেঁটে এই পুরুলিয়াতেই তিনটে ইটভাঁটা খুঁজে পেয়েছে। সেগুলোর কোনো অথেন্টিসিটি নেই। জায়গা তিনটে হল....উমম.... হ্যাঁ, এফ পি এস.... ফড়িংহাটা, পায়রাবেড়া আর শাখনাডালা। এদের মধ্যে সব থেকে ছোট ক্যাপাসিটির হল পায়রাবেড়া। জায়গাটা সুখীনদী থেকে বাসে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। একটু ভিতরের দিকে গ্রাম।”

“বাব্বা! আপনি এত রিসার্চ কখন করলেন, স্যার?”

“কাল রাত্রে তুই ফোন করার পরই। প্লেসেট আমাকে কো-অর্ডিনেট আগেই দিয়ে রেখেছিল। ইন্দ্রকে কাজে লাগানোর আইডিয়াটা কিন্তু তোফা!”

ইন্দ্র এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। নিজের নাম শুনে আলোচনায় মন দিল। “আমাকে আবার কী করতে হবে? আমার তো ইস্কুল আছে!”

ওর কাঁধে হাত রেখে ভাস্কর বলল, “চিন্তা করিস না। ছুটির দিনেই হবে। আর তোকে ঐ ঘুড়ি ধরতেই যেতে হবে। তবে এবার আর আদিবাসি ইটভাঁটা নয়, পায়রাবেড়া!”

“তাহলে এবার আর পেটকাটি নয়, ময়ূরপঙ্খী চাই আমার!”

প্রফেসর একগাল হেসে বললেন, “ডান!”

সঙ্গে সঙ্গে অভিরাজ, চা আর চানাচুর নিয়ে ঢুকল, “বিস্কুট শেষ হয়ে গেছে স্যার!”

ইন্দ্র সেদিন রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, কত দূরে থাকা কিছু স্যাটেলাইট একনাগাড়ে ছবি তুলে যাচ্ছে। ভারতের, পুরুলিয়ার। আর তাবড় বিজ্ঞানীরা বসে বসে সেই ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, কোথায় কী ঘটছে না ঘটছে জানার জন্য! কেন করছে ওরা? কেউ তো জানতেও পারছে না। পুরো ব্যাপারটাই একটা সিক্রেট মিশন। মানুষকে ভালো রাখার মিশন। ওর মতো বাচ্চাদের হাতে সুন্দর ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার মিশন। সামনের রবিবার সেও এই মিশনের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে। ভাবলেই গাঁয়ে কাঁটা দিচ্ছে!

ইংল্যান্ডের মহাকাশ সংস্থা আর ভারত সরকারের যুগলবন্দীতে শুরু হওয়া এই মিশনে দরকার ছিল কিছু বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের যাদের ঐ সমস্ত ইটভাঁটার কাছাকাছি পাওয়া যাবে। ভলিন্টিয়ার হিসেবে এরাই প্রমাণ সংগ্রহ করবে; দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানের খবর কেবলমাত্র এদের কাছেই থাকবে। এরকমই একজন হলেন জয়নাল সমাদ্দার, সুরেন্দ্রনাথ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ইলেক্ট্রনিক্স-এর প্রফেসর। আর তিনি বেছে নিলেন তাঁরই ছাত্র ভাস্কর অধিকারীকে।

সারা সপ্তাহ ধরে স্কুল শেষে ঘণ্টা খানেকের জন্য ভাস্করের বাড়িতে জোর রিহার্সাল, ট্রেনিং চলল ইন্দ্রর। কীভাবে সন্দেহ এড়িয়ে জায়গায় ঢুকবে, কেউ পথ আটকালে কীভাবে হ্যান্ডল করবে, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কী জবাব দেবে... সবকিছু শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করা হল তাকে।

ইন্দ্রও ব্যাপারটার গুরুত্ব উপলব্ধি করছিল ধীরে ধীরে। টিভিতে দেখানো নিয়ে আর কোন আগ্রহই নেই তার। ঘুড়ি ধরার ছুতোয় সঠিক লোকেশনে গুঁজে দিতে হবে সেই গুপ্ত ক্যামেরা। এ তো আর আদিবাসি মাঠ নয়, যে গভীর রাতে গিয়ে কাজটা করা যাবে। এ হল পায়রাবেড়া। জায়গাটা এমনিতেই দূরে প্লাস মানসুখানি ধরা পড়ার পর ওরা নিশ্চয় রাতে পাহারার ব্যাবস্থা করবে। তাই, সাত পাঁচ ভেবে এই ফন্দি।

***

নির্দিষ্ট দিনে বাস থেকে নামল তিনজন। আলাদা আলাদা ভাবে। প্রফেসরের কাঁধে একটা ব্যাগ। ভাস্করের সঙ্গে একটা ঝোলা। ইন্দ্রর পরনে সাধারণ পোশাক। ধুলো মাখা, পুরনো। হালকা চুল উড়ছে শুকনো হাওয়ায়। প্রফেসর তাঁর প্ল্যান অনুযায়ী দু’দিক দেখে নিয়ে চাষের ক্ষেতের দিকে নেমে গেলেন। একটা আখের জমিতে টুক করে ঢুকে গেলেন। ইন্দ্রকে আগেই স্যাটেলাইটের তোলা থ্রি-ডি ছবি দেখিয়ে ইটভাঁটাটা সম্পর্কে অবগত করা আছে।

ইন্দ্র আর দেরি না করে সেদিকেই হাঁটা লাগাল। এবার কাজ শুরু হল ভাস্করের। পকেট থেকে বেরোল একটা ভাঁজ করা প্লাস্টিক। ভাঁজ খুলতেই সেটা মাঝারি সাইজের ময়ূরপঙ্খী ঘুড়ি হয়ে গেল। সিন্থেটিক কাঠিগুলো বেশ শক্তপোক্ত। একটু আড়ালে গিয়ে তার মাঝখান বরাবর লাগিয়ে দিল প্রফেসরের বানানো খুদে ড্রোন! তারপর সেটাকে আখের ক্ষেতটা থেকে ঠিক লম্বালম্বি দূরত্বে একটা গাছের ডালে রেখে পালিয়ে এল। নিরাপদ স্থানে এসে প্রফেসরকে মিসড কল দিতেই ঘুড়িটা ফরফর করে উড়তে লাগল। সুতো নেই, জাস্ট উড়ছে। আর ঘুড়ির আওয়াজে ড্রোনের আওয়াজটা অত বোঝা যাচ্ছে না।

ওদিকে আখের জমি থেকে ছোট্ট একটা ল্যাপটপ বের করে সেটাকে কন্ট্রোল করছে প্রফেসর সমাদ্দার। ঘুড়িটা দেখে মনে হচ্ছে সেটা যেন কেটে গেছে। ময়ূরপঙ্খীটা আস্তে আস্তে পায়রাবেড়া ইটভাঁটার দিকে উড়ে যেতে লাগল। যেখানে ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে ইন্দ্র। প্যান্টের পকেটে পাঁচটা গুপ্ত ক্যামেরা। ঘুড়িটা যেখানে যেখানে গোঁত্তা খাবে ঠিক সেখানে সেখানে সেগুলো অন করে গুঁজে দিলেই কাজ শেষ। কো-অর্ডিনেট সেট করাই আছে।

বাচ্চারা মাটি সাজাচ্ছে, মাথায় করে ইট নিয়ে চলল কেউ, গনগনে তেজ চারদিকে। আকাশ পরিষ্কার। একটা লাল ময়ূরপঙ্খী মাথার উপর উড়ছে ... সেটার পেছন পেছন ঢুকে পড়ল ইন্দ্র!

ঐ তো! ঐ তো গোঁত্তা খেল ঘুড়িটা। ইন্দ্র দৌড়ে গেল। হাতের মুঠোয় গুপ্ত ক্যামেরা। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে। এক পা, এক পা, করে এগিয়ে গেল সেদিকে...

‘ভোকাট্টা’ বলে চিৎকার করে উঠল বাচ্চাগুলো। তাদের উড়ান সামনেই!

ঠাকুরঘরে কে?

ঠাকুরঘরে কে?
অনিমেষ ভট্টাচার্য্য


“তার মানে তুই বলছিস, লোকটা দরজায় আওয়াজ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল?”

“হ্যাঁ। তারপর কাউকে না দেখতে পেয়ে এদিক ওদিক খুঁজতে গেছিল আর তখনই ব্যাস!”

“ধ্যার! তা কী করে হয়? লোকটার বডিটা আমরা পেয়েছিলাম দরজা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। কী রে মানিক, তাই তো?”

মানিক দুটো চায়ের গেলাস টেবিলে রেখে বলল, “আজ্ঞে, পঞ্চান্ন মিটার। বল খেলার মাঠ বরাবর।”

“তাহলেই দেখ, কিশোর। কাউকে খুঁজতে, যাকে সে চেনেই না, অত দূর কেন যাবে? তাও মাঝরাতে!”

“উম্-ম... এটা ধাপ্পা হতে পারে। মানে ধরেন, লোকটা খুন হল দরজার কাছাকাছিই। এই পাঁচ-দশ মিটারের মধ্যে। তারপর যাতে সন্দেহ না হয়, তাই ডেডবডিটা টেনে নিয়ে ওখানে রাখল। আর সেক্ষেত্রে আততায়ী সম্পূর্ণ অচেনা ঠেকছে না! বা এমনও হতে পারে আততায়ী খুবই চেনা। বাইরে গলা শুনে দরজা খুলল। সে বলল, ‘একটা জিনিস দেখবি, চল।’ তারপর কিছু দূর গিয়ে কুপিয়ে দিল! কী বলেন?” নিজের বুদ্ধিতে নিজেই গদগদ হয়ে চায়ের বদলে বোতল থেকে আরেকবার জল খেল কনস্টেবল কিশোর বর্মণ।

“তোর ধান্দাটা কী বল তো? আগে থেকেই একটা আইডিয়া বানিয়ে রেখে দিবি আর তারপর যা হোক করে সেখানে টেনে নিয়ে যাবি? মাঝ রাত্তিরে কেন কেউ কিছু দেখাতে নিয়ে যাবে? আর খুনির মোটিভ কী? ভিক্টিমের ঘর থেকে তো কিছুই চুরি যায় নি। দরজাটা ভেজানো ছিল মাত্র। ফ্যান লাইট সবই চলছিল। ছুরিটাও পাওয়া গেল না। ঠিক করে খুঁজেছিলি তো তোরা?” চা শেষ করে গেলাস নামিয়ে রাখলেন লাভপুর থানার ইন্সপেক্টর সমর্পণ শিকদার। মৃদু আওয়াজ হল— ঠক্‌। তাঁর চোখ চলে গেল সামনে খোলা কাগজের পাতায় বড় বড় করে লেখা হেডলাইনের দিকে—

সংকেত দত্ত হত্যা রহস্য। লহরগঞ্জের ইতিহাসে এক অদ্ভুত অধ্যায়। একই সঙ্গে লজ্জার!

“অ্যাই! হট! হুট হুট!... আরে কী মুশকিল! আগের দিন এলাম তো। তাও চিনে উঠতে পারেনি এরা।”

“এ গাঁয়ে তো পুলিশ-টুলিশ আসে না বাবু। তাই হয়তো আপনাদের পোশাক-আশাক দেখে ওরা একটু আমোদ পেয়েছে।” বলে মুখ টিপে হাসল চায়না বাগদি। পুকুর থেকে জল নিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় কুকুরের পাল্লায় অতিষ্ঠ সমর্পণবাবুকে দেখে তার এই উক্তি।

“এই শোনো, শোনো... কী নাম তোমার?”

“চায়না। হলুদপাড়ায় শ্বশুরবাড়ি। বিটির জ্বর, তাই ক'দিন বাপের ঘর এলাম। তা এসে থেকে ভালোই ছিলাম জানেন।” কলসি নামিয়ে শিশু গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম মুছল চায়না। “কোন ঝঞ্ঝাট নাই। হুজ্জোতি নাই। কোত্থেকে যে কী হয়ে যায়! শুনেছি মানুষটা ভালো ছিলেন।”

“হুম। ... তা মানুষটাকে চিনতে-টিনতে নাকি?”

“আ মরণ! আমি কেনে চিনতে যাব? ব্যাঙ্কে কাজ করত শুনিচি।ওই ব্যাঙ্কে-ট্যাঙ্কে যারা যেত, তাদের শুধান। আমাদের অত টাকাও নাই। মুরোদও নাই!” কলসি কোমরে উঠিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল চায়না, “যাই দারোগা বাবু। বিটিকে খেতে দিতে হবে। আপনি হরেন সান্যালরে জিগেস করেন। ওদের পোচুর পয়সা!”

সমর্পণবাবু কনস্টেবল কিশোরকে নিয়ে সান্যাল বাড়িতে ঢুকলেন।

“আপনি তো সংকেত দত্তকে চিনতেন?” ইন্সপেক্টর জিগেস করলেন।

“ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের সাইথিয়া ব্রাঞ্চের করণিক। মানুষ খুব ভালোই ছিল। বছর তিনেক আগে ট্রান্সফার হওয়ায় এখানেই টিনের চালের বাড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করে।” হরেনবাবু বললেন।

“আর পরিবার?”

“সে তো কাল এসেছিল দেখলেন। বউ বাচ্চা আর বুড়ো বাবা। বাগুইহাটিতে থাকে। এখানে নিয়ে আসেনি। গ্রামে সুযোগ-সুবিধা কম বলেই হয়তো। তবে, উৎসবে অনুষ্ঠানে বাড়ি চলে যেত। আমাকে কিংবা তারাচরণকে বলত বাড়িটা নজর রাখতে।”

“তারাচরণবাবু মানে সামনের ওই পুরোনো বাড়িটা?”

“হ্যাঁ। তারাচরণরা এই গাঁয়ের খুব পুরোনো বাসিন্দা। ওদের সঙ্গেও সংকেতের সদ্ভাব ছিল।”

“কিশোর, সব নোট করলি তো রে? তারাচরণ-এ মূর্ধন্য ণ কিন্তু!” বলে উঠে দাঁড়ালেন ইন্সপেক্টর শিকদার। কিশোর দরজায় হেলান দিয়ে টুকছিল। তড়িঘড়ি বানানটা ঠিক করল।

***

ওরা বাইরে এল। বল খেলার মাঠে ছেলেরা জড়ো হচ্ছে এক এক করে ব্যাট বল নিয়ে। একটা হলদে জামা পরা ছেলে, যাকে বাকিরা ‘লাড্ডু’ বলে ডাকছিল, সে কিছু একটা খুঁজছিল। কিন্তু পাচ্ছিল না। হতাশ হয়ে বলল, “এই পল্টু, উইকেটগুলো পুতব কী করে?”

“কেন, ওই তো ব্যাটটা পড়ে আছে। নিয়ে আয়।”, পল্টু বলটা এ হাত ও হাত ঘোরাতে ঘোরাতে বলল।

“ধুর। মাটিটা খুঁড়তে হবে একটু। নইলে হচ্ছে না। শিকটা তো এখানেই থাকার কথা।”

“হ্যাঁ, ওই রাস্তার ওখানে দেখ। পাচ্ছিস না?”

“না। তুই আয়!”

সমর্পণবাবু ওদের দিকেই আসছিলেন। তারাচরণের বাড়িতে তালা দেখে, কোথায় গেছে খোঁজ নিতে। এই কথোপকথন শুনে কী একটা খটকা লাগল তাঁর।

“অ্যাই, তোরা কী খুঁজছিস?”

“দারোগা বাবু! আমাদের একটা লোহার শিক ছিল। উইকেট পোঁতার সময় মাটি গর্ত করতে লাগে। এইখানেই থাকে। বাড়িতে রাখলে মা ঠাকুমারা উনুনে কয়লার ছাই বার করার কাজে লাগিয়ে দেবে, তাই!” পল্টু বলল।

সমর্পণবাবুও খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে লাগোয়া ঠাকুরতলায় চলে গেছিলেন। ছেলেরা জোর গলায় ডাকল, “ও দারোগা বাবু, ওদিকে জুতো পরে যাবেন না। মসণ্ডী মায়ের ঘর। পাপ দেবে।”

ততক্ষণে কিশোর অন্য একটা ছেলের থেকে তারাচরণের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিল। একটু ওস্তাদি করেই নিজে জেরা করছিল...

“হ্যাঁ রে, তোর নাম কী?”

“পিলু প্রামাণিক। তোমার নাম?”

কিশোর থতমত খেয়ে সামলে নিয়ে বললে, “আমার নাম জেনে কাজ নেই তোর। এই তারাচরণবাবুরা কোথায় গেছেন রে?”

“তা জানি না। তবে, যাওয়ার আগে অংশু বলছিল দু’দিনের লেগে চলল। তার মানে ধরো এই আজকেই ফেরার কথা।”

“অংশু কে? ওঁর নাতি?”

“নাতি কেন হবে! তারা জ্যাঠার ছেলে অংশু। আমার সঙ্গেই পড়ে।”

এমন সময় ইন্সপেক্টর শিকদারের ডাক শোনা গেল, “এই কিশোর চল। থানায় ফিরে যাই। তারাচরণ বাড়িতে নেই। পরে আসব'খন। আজ আবার বাগুইহাটির খোঁজ নিতে হবে।”

“হ্যাঁ, তাই চলেন। বাগুইহাটি কেনে?” কিশোর প্রশ্ন করে।

“ওই যে শুনলি না, সংকেতের পরিবার বাগুইহাটিতে থাকে!”

লহরগঞ্জ থেকে লাভপুর থানায় যখন সমর্পণবাবু ফিরলেন, তখন বিকেল শেষ হয়ে এসেছে। গাঁয়ের ছেলেরাও খেলা ভেঙে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে। কোনও গোয়ালবাড়ির পিছনে আস্তে আস্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

মজুমদার পাড়ার রাস্তা দিয়ে একটা ট্রলি রিক্সায় প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন দিতে দিতে গাঁয়ে ঢুকল তারাচরণ, তার স্ত্রী রত্না আর ছেলে অংশু। গাঁয়ের পথ ঘাটে ঝুপ করে অন্ধকার নামে। বাড়ির দোরগোড়ায় এসে টর্চ বের করল বছর আটত্রিশের তারাচরণ। খুট করে তালা খুলে স্ত্রীকে বললেন, “এসো...”

মানিক আবার চা দিয়ে গেছে। চুমুক দিয়ে আরাম করে চোখ বুজে ছিলেন ইন্সপেক্টর। ক্রিং ক্রিং করে ফোনটা বেজে উঠল। সমর্পণবাবু ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে হরেন সান্যালের গলা— “ঘটনা ঘটে গেছে, ইন্সপেক্টর! কে বা কারা তারাচরণের সিন্দুক লুট করে পালিয়েছে।”

ধড়মড় করে উঠে বসলেন চল্লিশোর্ধ্ব ইন্সপেক্টর। তারপর একটু ভেবে বললেন, “কীভাবে জানা গেল?”

সেদিন আর লহরগঞ্জে যান নি তিনি। তাঁর অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক তখনই বুঝে ফেলেছিল এই খুন আর ডাকাতি একসূত্রে বাঁধা। কাজেই চুরিটাও পরশু রাতেই হয়েছে। এখনই রাত-বিরেতে গাড়ি ছুটিয়ে লহরগঞ্জ গিয়ে লাভ নেই। ফোনেই খানিকটা জানার চেষ্টা করলেন। তারাচরণের সঙ্গেও ফোনে মিনিট পনেরো জেরা হল। কিছুটা জানাও গেল। সেই নিয়েই রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত চলল কিশোরের সঙ্গে জোর আলোচনা।

“তাহলে, পারিবারিক সম্পত্তি বলছেন?” কিশোর শুধাল।

“তারাচরণরা দুই ভাই। ওদের বাবারা তিন ভাই এক বোন। গ্রামে এক তারাচরণই থাকে। বাকিরা বাইরে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কাজেই পৈতৃক সম্পত্তি বল আর এজমালি, সিন্দুকের ভাগীদার কিন্তু অনেকেই।” গম্ভীর ভাবে পায়চারিরত অবস্থায় ইন্সপেক্টর বললেন।

“সে সিন্দুক এল কোত্থেকে?”

“রাজরাজড়ার আমলে তারাচরণের কোনও এক পূর্বপুরুষ নায়েব ছিলেন। সেই সূত্রে বেশ কিছু বাঁধানো গয়না, সোনাদানা জমা হয়েছিল সিন্দুকে। গাঁয়ের অনেকেই জানে সেটা। তবে সেই সঙ্গে ছিল গৃহদেবী মসণ্ডী মায়ের দায়িত্বও। যা জানতে পারলাম, জীবনে ভয়ানক অভাব না এলে, মানে ধরে নে এমন অভাব যে মায়ের পুজো হল না, একমাত্র তখনই ওই গয়নায় হাত পড়বে। পড়েওছে এর আগে দু’বার। একবার ওদের বাবা দ্বিজপদর আমলে আর একবার এই তারাচরণের ক্ষেত্রে।”

“বাব্বা! অনেক কেস তো! জিনিসটা থাকত কোথায়?”

“বলল তো মসণ্ডী মায়ের ঘরেই। ঠাকুর নাকি খুব জাগ্রত। তাই চুরির ভয় কেউ কোনওদিন করেনি। এমনিতেও ওদের পরিবারেও যদি গয়না বিক্রি করতে হয়, তো সবার থেকে আলোচনা করেই সেটা করতে হবে—”

“বুঝলাম। যা হোক। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে, তারাচরণ গাঁয়ে ছিল না আর চোর সেই সময় এসেছিল চুরি করতে। পালাবার সময় সামনে চলে আসে সংকেত দত্ত। আর খুন! খুবই সিম্পল!”

“তাই না? খুব সিম্পল। যদি ধরেও নি, যে চোর আর খুনি একই লোক, তাহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন চুরি করল কে? সংকেত অত রাত্রে ওখানে কী করছিল? চুরি হল, খুন হল... অথচ কেউ কিচ্ছু জানতে পর্যন্ত পারল না! অদ্ভুত না?”

“আচ্ছা, এই তারাচরণ নভেম্বর মাসে আবার কোথায় গেছিল?”

“আমার স্ত্রীর বাপের বাড়ি কাছেই। দক্ষিণমাঠ পেরিয়ে একটা গ্রামে। অংশুর মামার খুব জ্বর হল। তাই, একটু খোঁজ খবর করতে গেছিলাম মঙ্গলবার।” কাটা-কাটা ভাবে কথাগুলো বলল তারাচরণ। শনিবারের সকাল বেলা। ইন্সপেক্টর শিকদার জেরা করতে এসেছেন তারাচরণের বাড়িতে।

“অংশুর মামা এখন কেমন আছেন?” সমর্পণবাবু জিজ্ঞেস করলেন। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন তিনি। চৌকিতে উপবিষ্ট তারাচরণ, হরেন সান্যাল এবং তারাচরণের স্ত্রী রত্না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব নথিবদ্ধ করছে কিশোর।

“বেটার। ভাইরাল জ্বর। সময় খারাপ তো। বুঝতেই পারছেন।”

“পরিবারের বাকিদের খবর দিয়েছেন?”

“ছোটকে কাল বলেছি। আজ বিকেল দিকে ঢুকবে।”

“ঠাকুর ঘরে থাকে বলছেন জিনিসটা। তা সেখানে ঢোকার রাস্তা কোনটা?”

“দুটো রাস্তা আছে। এক সদর দিয়ে ঢুকে এই বারান্দার শেষে একটা দরজা আছে। ওটা খুলে যাওয়া যায়। অথবা ঠাকুরতলার বাইরের যে দরজাটা আছে, ওই প্রাঙ্গণের লাগোয়া ওইটা দিয়ে—”

“একবার দেখানো যাবে দুটো রাস্তাই?”

“আসুন...”

***

ঝুমঝুম শব্দে চাবিগাছা নিয়ে রত্না দেবী আগে আগে চললেন। সমর্পণবাবু দেখলেন খিড়কি দরজার সঙ্গে এই বারান্দার কোনও সম্পর্ক নেই। মাঝখানে উঠোন আর উঠোনের পর কোলাপসিবল্ গেট। মানে খিড়কি দিয়ে ঢুকতে হলে এই গেট খুলতে হবে! গেট নাকি বন্ধই পেয়েছিল তারাচরণ। তার মানে বাকি থাকে সদর আর প্রাঙ্গণের দরজা। রত্না দেবী ভেতরের দরজা খুলতেই ঠাকুরঘরটা সামনে এল—

সব দেখে শুনে বাইরে এলেন ইন্সপেক্টর আর তারাচরণ। মাঠের পাশেই একটা গোঁজ পোঁতা ছিল। পায়ে লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সমর্পণবাবু আর তখনই মাটিতে আধখানা ঢুকে থাকা জং ধরা বাঁকা শিকটা চোখে পড়ল তাঁর! তড়িঘড়ি সামলে নিয়ে বললেন, “আমার ঘড়িটা বোধহয় ঘরেই ফেলে এসছি। একটু কাইন্ডলি এনে দেবেন, তারাবাবু?”

“কী হল স্যার! কিছু তো বলেন!”

“আঃ! কিশোর। থাম, থাম। ভাবতে দে। তুই ওই শিকটা ফরেন্সিকে পাঠিয়েছিস তো?”

“হ্যাঁ তো। কালকের মধ্যে রিপোর্ট এসে যাবে। আচ্ছা, স্যার, কালকে সংকেত দত্তর ব্যাপারে কিছু জানতে পারলেন?”

“ওঁর স্ত্রী রেশমি খুবই ভেঙে পড়েছেন। ভালো করে কথা হয়নি। তবে একটা অদ্ভুত জিনিস জানা গেছে।”

“কী? কী?”

“বলছি, তার আগে তোকে একটা কাজ করতে হবে। একবার দক্ষিণমাঠ যেতে হবে। অংশুর মামার কেসটা যাচাই করা দরকার! ওখানেই খটকা লাগছে। সামান্য ভাইরাল ফিভারের জন্য মামাবাড়ি! উঁহু... আমি ততক্ষণে দেখি তারাচরণের ছোটভাইয়ের সঙ্গে কোনও ভাবে কথা বলা যায় কি না!”

“আবার লহরগঞ্জ যাবেন?”

“হ্যাঁ। তুই গাড়ি নিয়েই যা। আমি বাইকে চলে যাচ্ছি। রত্না দেবীর ভাইয়ের নাম সমীরণ। খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। ছোটগ্রাম। খোঁজ নিয়ে রেখেছি আমি।”

দুপুর তিনটে বাজছে। দু’জনেই আবার থানা থেকে বেরিয়ে গেল। রহস্য ক্রমেই শেষের দিকে। মানিক বিকেলের চা এনে দেখে টেবিলে কেউ নেই। নিজেই দু’কাপ চা খেল বসে বসে!

তারাচরণ চক্রবর্তীর বৈঠকখানায় ঘর ভর্তি লোক। তারাচরণ ছাড়াও আছে রত্না দেবী, তারাচরণের ভাই শংকর, হরেন সান্যাল, লাড্ডু, অংশু, কিশোর ও মানিক। এছাড়া, বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়িতে আরও দু’জন কনস্টেবল বসে। “যাক, তাহলে সবাই এসে গেছেন! শুরু করা যাক।” বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ইন্সপেক্টর সমর্পণ শিকদার।

“ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানো অর্থাৎ স্লিপ ওয়াকিং একটা রোগ। এই অবস্থায় মানুষ ফ্রিজ খুলে খাবার পর্যন্ত খাওয়ার নজির আছে। আর ঘটনাটা আধঘন্টা-চল্লিশ মিনিট অবধি স্টে করতে পারে। সংকেত দত্তর স্লিপ ওয়াকিং-এর রোগ ছিল।” চকিতে একবার চারদিক চোখ বুলিয়ে নিলেন সমর্পণবাবু।

“লহরগঞ্জে কুকুর নেহাত কম নয়। খুন হল, ডাকাতিও হল। কিন্তু একটা কুকুরেরও ঘেউ ঘেউ কেউ শোনে নি। তার মানে একটাই! শুধু সংকেত দত্তই নয়, খুনিও এই পাড়ার!”, একটু থেমে আবার শুরু করলেন তিনি— “চক্রবর্তী বাড়ির সিন্দুক আর মসণ্ডী মায়ের মন্দির দুইই একই যোগসূত্রে বাঁধা। তাই, সিন্দুক থেকে গয়না হাতিয়ে নেওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। সিন্দুকে কী কী আছে, সবকিছুর তালিকা পরিবারের সবার কাছেই থাকে। শংকরবাবুই কাল বলছিলেন। কাজেই, কোনও একজনের অভাবে সিন্দুকে হাত পড়বে না, এটাই নিয়ম। চোর জানত সিন্দুক বোঝাই আছে মণি-মানিক্যে। ঠাকুরঘরে একবার ঢুকতে পারলে কেল্লা ফতে। কারণ, সিন্দুকের তালা ভাঙার আওয়াজ বাইরে কেউ শুনতে পাবে না। ব্যাপারটা এতটাই ভেতরে। সুতরাং, ঠাকুরঘরের তালা খোলাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। যা করার রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে করতে হবে।”

“গ্রামবাসী তালা ভাঙার আওয়াজ পায়নি। তালা ভাঙাই হয়নি। শুক্রবার বিকেলে লাড্ডুদের সঙ্গে শিক খোঁজার সময়েই দেখেছিলাম ওই তালায় ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন নেই। অথচ, সিন্দুকের তালা ভাঙা ছিল। ব্যাপারটা অসম্ভব নয়। ঠাকুরঘরের তালা সবাই দেখতে পায়। যে কেউ তার চাবি বানিয়ে রাখতে পারে। সেটা কে, পরে আসছি।”

“চোর রাতের অন্ধকারে এল, তার কাছে থাকা চাবি দিয়ে তালা খুলল, ভেতরে গিয়ে সিন্দুকের তালা ভেঙে মালপত্র হাতিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আর সামনে এল সংকেত দত্ত! ভূত দেখার মতো অবস্থা! বারোটার পর গ্রাম ঘুমিয়ে যায়। তাই, এই আশঙ্কাটা চোর আশা করেনি। সংকেত যে আদতে ঘুমের ঘোরে হাঁটছে, সেটা খুনির জানা ছিল না! তবে, তার সঙ্গে তো তালা ভাঙার হাতিয়ার থাকার কথা! অথচ সংকেত দত্ত খুন হয় একটা লোহার শিকে! যেটা লাড্ডুরা উইকেট পোঁতার কাজে লাগায় আর যে জিনিসটা কৌশল করে গোঁজের পাশে মাটিতে ভরে রাখা হয়েছিল! কেন?”

গোটা ঘর থমথম করছে। পিনপতনের নিঃশব্দতা। অংশু আর লাড্ডুর পলক পড়ছে না! ইন্সপেক্টর গ্লাস থেকে ঢকঢক করে জল খেলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “অর্থাৎ, চোর তালা ভাঙে নি। সিন্দুকের চাবিও তার কাছেই ছিল। কোনওরকম লোহা-লক্কর-শাবল-গাইতি তার কাছে ছিলই না! ভাঙা তালা, যেটা হরেন বাবু দেখেছিলেন, সেটা একটা সাজানো ব্যাপার ছাড়া কিছুই না! ব্যাপারটা একদম দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল শংকরবাবুর পায়ের জুতো দেখে। জুতোটা দে তো মানিক।”

মানিক জুতোটা এগিয়ে দিল।

“কী শংকরবাবু, এটাই কাল পরেছিলেন না? যখন চায়ের দোকানে আপনার সঙ্গে কথা বলছিলাম!”

“হ্যাঁ তো। কিন্তু এটা তো এই বাড়িতেই থাকে। আমি তো আপনাকে কালকেই বললাম। আমি শু পড়ে এসেছি। হাঁটতে যাওয়ার জুতো ছিল না। তাই, এইটা পরে বেরিয়েছিলাম। দাদার জুতো এটা! খাদিমের পুরনো মডেল। এখন আর পাওয়া যায় না।”

এক ধাক্কায় সব্বার চোখ ঘুরে গেল তারাচরণের দিকে। সে সদর্পে বলল, “তাতে হয়েছেটা কী!”

“সেখানেই তো কাণ্ড ঘটেছে তারাবাবু। ঠাকুরতলায় জুতো পরে যাওয়া নিষেধ। আর শুক্রবার বিকেলে আমি সেখানেই কামিনী গাছের গোড়ায় জুতোর ছাপ পেয়েছিলাম। খুব সম্ভবত চোর ঢোকার সময় তাড়াহুড়োতে জুতো খুলতে ভুলে গেলেও ঘরে ঢোকার আগে গাছতলায় জুতো খোলে, এবং ফেরার পথে সেটা পরার সময় হালকা ছাপ রেখে যায় যে ছাপ চায়ের দোকানের মাটির মেঝেতে গতকাল খুঁজে পাই। কী, তারাবাবু, এখনও বলবেন কী হয়েছে!”

“দারোগাবাবু, এসব গাঁজাখুরি গপ্প শুনিয়ে কী লাভ হচ্ছে? বেস্পতিবার আমি সস্ত্রীক দক্ষিণমাঠে। অংশুর মামার—”

“সমীরণবাবুর জ্বর হয় নি, তারাবাবু!” গর্জে উঠলেন ইন্সপেক্টর! “তিনি আর আপনি এসেছিলেন সেদিন লহরগঞ্জে। যাতে লোকে সন্দেহ না করে সেজন্য অ্যালিবাই সাজিয়েই কাজটা করেছেন!”

“কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”

“প্রমাণ? হা, হা, হা! হাসালেন তারাবাবু!”,তারপর লাড্ডুর দিকে ঘুরে বললেন, “কোথায় মাটি খুঁড়ছিল রে?”

“ওই তো উঠোনে। নারকেল গাছের ওখানে- সেদিন প্রসাদ খেতে এসে দেখেছিলাম।”

সমর্পণবাবু বললেন, “প্ল্যান আপনার ভালোই ছিল তারাবাবু। বাড়িতে না থাকাকালীন সিন্দুকের তালা ভেঙে চুরি। তারপর সেটা সটান নিয়ে যাবেন শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে সমীরণকে তার ভাগ দিয়ে বাড়ি ফিরে বাকিটা উঠোনের গর্তে ভরে রাখবেন। কারণ, আপনি আন্দাজ করেছিলেন বাড়ি খানাতল্লাশি হতে পারে। সন্দেহের তীর যে আপনার দিকে যাবে, সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিত ছিলেন। বাধ সাধল ব্যাঙ্কার সংকেত! আচ্ছা, কতদিন ধরে অভাব চলছে, হ্যাঁ?”

রত্নাদেবী ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “আমি বলেছিলাম, এসব করতে যেও না। দারোগাবাবু, গেল বছরের আগের বছর থেকে একটাও জমিতে ভালো করে ফসল হচ্ছে না। এজমালি সম্পত্তি- জমি বিক্রি, বন্ধক কিচ্ছু করার জো নেই। যাও বা পয়সা আসে তাও ভাগ করতে হয় সবার সঙ্গে। আমাদের কপালে খুব কিছু জোটে না। কত বলেছি ভাইদের, পিসিদের... কেউ মুখ তুলে চায় নি, দারোগাবাবু!”

“মানিক, লোক লাগিয়ে উঠোন খোঁড়ার ব্যাবস্থা কর। কিশোর, দক্ষিণমাঠের খবর কী?”

“থানায় ফোন করেছিলাম। সমীরণ ভীতু লোক। দু’চার ঘা পড়তেই সব বলে দিয়েছে। মাল পাওয়া গেছে। সে এখন থানায় হাওয়া খাচ্ছে!”

***

মাথা নীচু করে বসে আছে তারাচরণ। চুপ করে গেছে। অংশু আর লাড্ডু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শংকর কাকে একটা ফোন করার জন্য বারান্দায় দাঁড়াল। হরেন সান্যাল এতক্ষণ কিচ্ছু বলেননি। মাথা নেড়ে চুক চুক শব্দ করে বললেন, “আমাকে তো জানাতে পারতিস। না হয় কিছু ধার দিতাম। সংকেতকে এভাবে মরতে হত না। ভালো ছেলে ছিল। লহরগঞ্জ এ ঘটনা কোনওদিন ভুলবে না। কোনওদিন না!”

তারাচরণকে হাতকড়া বেঁধে গাড়িতে তুলল কিশোর। চক্রবর্তী বাড়ির চারপাশে তখন একগাদা ভিড়। চাপা গুঞ্জনের মধ্যে ধুলো উড়িয়ে মিলিয়ে গেল পুলিশের গাড়িটা।

ঠিক সন্ধে নামার আগে...

অনিমেষ ভট্টাচার্য্য


দর্মার বেড়া দিয়ে ঘেরা কফিকাপ;
ঠোঁট ছোয়ানোর আগে উষ্ণতার আভাস নিষিদ্ধ!
একটা কুয়াশার মতো রেলগাড়ি চলে গেল—
গভীরতাকে দু’গোল দিয়ে। তুমি ভাবছ, রাত।
আমি বলব, শীত।

আজকাল ভিড় বাড়লে বুঝি, কেউ হারাচ্ছে। শান্ত হতে চেয়েছিল
কপাল। তাতে জ্বর আসে, ভাঁজ হয়;
ঢেউ খেলে যায় গুনতে গুনতে।
আমার কপালে বসে তুমি ভিড় গুনছ, হারাবে বলে—
আমরা ভিড়ে অভ্যস্ত। হারানোতেও!

যেদিন শহরের একমাত্র নদীটা পাখি হয়ে যাবে,
যেদিন সরব উলুধ্বনিতে চাপা পড়ে যাবে প্রস্তুতি,
যেদিন কাগজের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা ছবি, বই হয়ে যাবে,
যেদিন...
থাক, সেইদিনটা আসার অনেক আগেই আমি বয়ে যাব।
তীরে বসে বই পড়বে তুমি। ছবির মতো...

অলংকরণ : প্রমিত নন্দী
মূল ছবি : প্যাট্রিসিয়া কুইঞ্চ

ঝলকানি

অনিমেষ ভট্টাচার্য্য



পারমিতা পড়ল মহা ফাঁপরে। গত কয়েক মাস থেকেই সুবিমল উইকেন্ডের এক-আধ দিন করে বাড়িতে থাকত না। কখনও কখনও উইকডেজেও দেরি করে ফিরত। চাকরির চাপ আছে, তারপর খামখেয়ালি মানুষ। এদিক ওদিক ঘুরতে ভালবাসে। তাই পারমিতা অত গা করে নি।

আজ বাইশ বছর ধরে সংসার করছে। বাড়িতে ছেলে মেয়ে আছে। মেয়েটার সেকেন্ড ইয়ার হবে। আর রঙিনের ক্লাস ফাইভ। এরকম বয়েসে এসে অন্য কোন মেয়েমানুষের সঙ্গে লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম-পিরিতি – ব্যাপারটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে নি সে। ঐ বাংলা সিরিয়ালটা দেখতে দেখতেই মনে হল...