প্রবন্ধ
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

ডি এন এ, জিনকাটা কাঁচি আর তিন বিদুষী ● সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

ডি এন এ, জিনকাটা কাঁচি আর তিন বিদুষী
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

 

কাট—ওয়ান

১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হল একটি সাড়া জাগানো বই— বেরোনো মাত্রই বেস্টসেলার। সাধারণত নোবেল লরিয়েটরা পপুলার সায়েন্সের বই লিখতে চাইতেন না, কারণ তাতে নাকি বিজ্ঞানের সঙ্গে সমঝোতা করতে হত। কিন্তু এই বইটা একটু অন্যরকম। বিশ্বের অন্যতম— হয়তবা বিংশ শতাব্দীর সর্বোতকৃষ্ট আবিষ্কারের একটা জীবন্ত দলিল।

ফ্রম মেক্সিকো উইথ লাভ ● জয়িতা সাহা

ফ্রম মেক্সিকো উইথ লাভ
জয়িতা সাহা

১৯৯৭ সাল। ড্রাগযুদ্ধ আর ভূমিকম্প কবলিত মেক্সিকো তখন মাতোয়ারা জাপাতিস্টা মুভমেন্টের আলোড়নে। স্কুল কলেজ সব অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। ফিলোসফি প্রথম বর্ষের এক ছাত্র ঠিক করলেন এই সুযোগে ইউরোপ একটু ঘুরে আসা যাক। বাবা মা দুজনেই থিয়েটারের মানুষ, তাই অভিনয়ের মঞ্চেই শৈশব কেটেছে, কিন্তু অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। লন্ডনে বার টেন্ডিং করে দিব্যি চলছিল।

মধ্যযুগীয় রান্নার পুঁথি—নিমত্‌নামা ● অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মধ্যযুগীয় রান্নার পুঁথি—নিমত্‌নামা
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

একটি বিশেষ গুণের জন্য বহুপরিচিত একজন মানুষ যদি সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে পারদর্শী হন, তবে অবাক হতেই হয়। আর যদি সেই মানুষটা দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা হন, তাহলে তো কথাই নেই। শাসকের কাজ শুধু শাসন ত্রাসন। তিনি যদি বিপরীত দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য কাজে মন দিয়ে ফেলেন, যে কাজটা আদৌ তাকে সাজে না, তবে যেটা হয়, তার প্রমাণ হলেন মহম্মদ ঘিয়াসুদ্দিন শাহ, যাকে ইতিহাস ঘিয়াত শাহ্‌ বলে চেনে।

হার-না-মানা মেইসেল - জয়িতা সাহা

প্রবন্ধ

ষাটের দশকের নিউইয়র্কে সন্ধেবেলার দিকে যদি গ‍্যাসলাইট পাবে যান, মিজের সাথে মোলাকাত হতে পারে। মিরিয়াম মিজ মেইসেল। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অঙ্কের অধ্যাপক এব্রাহাম আর ওকলোহমা প্রভিন্সের উত্তরাধিকারী, প‍্যারিসে শিল্পচর্চা শেখা রোজের একমাত্র কন‍্যা। মিজ তার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস প্ল্যান করে নিতে শিখেছে। সম্ভ্রান্ত জিউইশ পরিবারের আদবকায়দা পালনে তার জুড়ি মেলা ভার।

সাহিত্যে হাস্যরস - তপন তরফদার

প্রবন্ধ


পৃথিবীতে মানুষ নামক প্রাণীরাই হাসতে পারে। অন্যরা কেন হাসতে পারে না, তা খুঁজতে গেলে দেখা যায় মানুষকে হাসার জন্য সব থেকে বেশি স্নায়ু-পেশীর সাহায্য নিতে হয় --- এমনকি বিরহ, শোক-সন্তাপের ক্রন্দনের থেকেও বেশি স্নায়ুর ব্যবহার করতে হয় হাসির জন্য। হাসি সংক্রান্ত শরীরবিদ্যাকে বলে “গেলাটোলজি” (Gelatology)। হাস্য গবেষক রবার্ট প্লোভিনের অভিজ্ঞতায় বলে, মস্তিস্কের বিভিন্ন স্নায়ু, পেশী বিভিন্ন শারীরিক মানসিক ঘটনা ঘটায়।

কেন লাভক্র্যাফট পড়ব - বিশ্বদীপ দে

প্রবন্ধ

১৯৩৭ সালের ১৫ মার্চ। অন্ত্রের ক্যানসার ও কিডনির অসুখে ভুগে মারা যাচ্ছেন হাওয়ার্ড ফিলিপস লাভক্র্যাফট। সেদিন হাসপাতালের বিছানায় অসহায় ও নিঃসঙ্গ (যেমনটা সব মানুষকেই হতে হয় মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে) লাভক্র্যাফট কি ভাবতে পেরেছিলেন তাঁর মৃত্যুর আশি বছর পরেও তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে সারা বিশ্ব জুড়ে?

লাভক্র্যাফটের দুনিয়া - প্রতিম দাস

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ৪০ বছরের পাঠক জীবনে টুকটাক এই মানুষটার লেখা পড়লেও, গত ২ বছর ধরে যেভাবে মানুষটাকে নিয়ে চর্চা করছি তা এর আগে কোনোদিন করিনি। ছোট বড় মিলিয়ে ৩১ টা গল্প অনুবাদ করেছি। তার সাথে সাথেই এ বছরের শুরুতে আরম্ভ করেছি থুলু মিথোজ এর নানান বিষয়আদির একটা বাংলা বিশ্বকোষ বানানোর কাজ। যারা এইচ পি লাভক্র্যাফটের সম্বন্ধে জানে তাদের কাছে CTHULU বা থুলু অতি চেনা শব্দ ।

বিষানল - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মন্দার পর্বত ও সর্পরাজ বাসুকির সাহায্যে সমুদ্র মন্থন করে দেবতারা পেলেন অমৃত আর অসুরদের ভাগ্যে জুটল হলাহল। দেবতারা অমরত্ব লাভ করলেন। বিষ হাতে পেয়ে অসুরেরা নামল ধ্বংসযজ্ঞে।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থের এই কাহিনীর সাথে আমরা সকলেই বহু পরিচিত। কিন্তু বিষের উপর অধিকার কি শুধু নরকের বাসিন্দাদের? সে কি শুধুই শয়তানের হাতের অস্ত্র? হয়তো নয়। শাসকের হাতে সেই বিষ কেমন ভাবে মারণাত্মক হয়ে উঠতে পারে, পৃথিবীর প্রতিটি যুদ্ধ তার সাক্ষী। শাসক তো দেবতারই প্রতিনিধি। তাই অমৃত কিম্বা বিষ, সবেতেই তার একছত্র অধিকার।

মানব ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, রাজনীতিতে বিষ কীভাবে প্রবেশ করে একেবারে জাঁকিয়ে তার অধিকার দাবী করেছে। সম্পদের অধিকারভোগ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ঈর্ষা। ঈর্ষা জন্ম দিয়েছে সন্দেহ। সন্দেহের অজানা কানাগলিতে ওঁৎ পেতেছে মৃত্যু।

পরিমাণে কম হলে বিষ হয় জীবনদায়ী (অমৃত?)। আবার সেই অমৃতরূপী ওষুধ, পরিমাণের আধিক্যে হয়ে ওঠে বিষ। তাই বুঝি অমৃত ও বিষের তফাতটা অতি সামান্যই। দ্রব্য ব্যবহারের গুণে কখনো বিষ হয়ে ওঠে প্রাণদায়ী, আবার কখনো প্রাণহারী।

মানুষ ঠিক কবে থেকে বিষ প্রস্তুতির মশলা আয়ত্ত করল, ইতিহাস ঘেঁটে বার করা কষ্টসাধ্য। কারণ মানবসভ্যতার সব ইতিহাস তো লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়নি! এখনো পর্যন্ত মানুষের হাতে আসা সবচাইতে প্রাচীন পুঁথি প্যাপিরাসে বিষের ঔষধি গুণাবলী লেখা দেখতে পাওয়া গেছে, সেটি আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পুরনো। তবে অন্যান্য নিদর্শন, যেমন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে পাওয়া মানুষের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে পণ্ডিতেরা জানাচ্ছেন—বিষ তৈরির কৌশল আরও প্রাচীন। প্রায় ৪৫০০ খ্রিস্টপূর্বাদ আগেও মানুষ বিষের ব্যবহার জানত।

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে পন্টাসের রাজা মিথিরিডেটস–৬ প্রভূত বিষ আবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কারের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর বিষপ্রয়োগের থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। তিনি নিত্য নতুন বিষ আবিষ্কারই শুধু করতেন না, তার প্রতিষেধক খুঁজে তথ্যসমূহ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। বিষ প্রয়োগে তাকে কেউ হত্যা করবে এই ভয়ে, রোজ একটু একটু করে নিজের শরীরে বিষ ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে সেই বিষের মাত্রা বাড়াতেন। এক কথায় তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক বিষ-পুরুষ। অবশ্য এমন এক বিষ-পুরুষের কামড়ে মানুষ মারা যেত কিনা, সে বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। মিথিরিডেটাসের শত্রু ছিলেন রোমের রাজা পম্পেই। রোমের সৈন্য পন্টাস আক্রমণ করে রাজা মিথিরিডেটসকে বন্দী করে। পম্পেইয়ের বিচারে মিথিরডেটাসের শাস্তি হয় মৃত্যু। শাস্তি এড়াতে রাজা মিথিরিডেটস মৃত্যু বরণ করবার উদ্দেশ্যে নিজেই নিজের শরীরে বিষ প্রয়োগ করেন। কিন্তু বিষ-পুরুষের শরীরে সেই বিষ কোনও কাজ করল না, আর মিথিরিডেটস মারা গেলেন না। অগত্যা রাজা পম্পেইয়ের নির্দেশে মিথিরিডেটসকে কেটে ফেলে হত্যা করা হয়।

৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় সুমের সভ্যতার আরাধ্য বিষ দেবীর নাম - গুলা। বিষ প্রয়োগ করে রোগ নিরাময়ের জন্য মানুষ তার আরাধনা করতো। গুলা দেবীর আরাধনার যে সমস্ত নিদর্শন পাওয়া গেছে, তা থেকে বিষ ব্যবহারে প্রাচীন মানুষেদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয়। গুলা শব্দের অর্থ – মহান। অর্থাৎ মহান ছিল গুলাদেবীর বিষ প্রয়োগের ক্ষমতা। গুলার মা ছিলেন অনু। তিনিও আরোগ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। গুলার বাবা আবু ছিলেন কৃষিকার্যের দেবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে — গুলা তার বাবা ও মায়ের কাছে শেখা ব্যবহারিক জ্ঞান থেকে ভেষজ বিষ বানাবার পদ্ধতি আয়ত্ব করেছিলেন। মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া গুলা দেবীর মন্দিরে অনেক কুকুরের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। সাথে চিনে মাটির কুকুরের মূর্তিও পাওয়া গেছে। কুকুর যে নিজের গা চেটে রোগ নিরাময় করতে পারে, সেটি তখনকার দিনের মানুষের জানা ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে পুরুষ দেবতাদের রমরমা শুরু হতে থাকে। কিন্তু গুলা দেবীর মহিমা বহুকাল পর্যন্ত সমাজে অটুট ছিল।

হিন্দুধর্মে সর্পদেবী হিসেবে মনসার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ববেদে। পুরাণে তাঁকে ঋষি কাশ্যপ ও নাগ-জননী কদ্রুর কন্যা বলা হয়েছে। জনসমাজে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, শিব বিষ পান করার পর মনসা তাঁকে রক্ষা করেন এবং তারপর থেকে ‘বিষহরা’ নামে পরিচিত হন। যদিও দেবীর কুলীন আসন তার কপালে কোনোদিনই জোটেনি।

গুহাবাসী শিকারি-সংগ্রহকারী জীবন থেকে নেওয়া পাঠে মানুষ একদিন হয়তো শিকার করা পশুর পিছনে ছুটে বেড়ানোর পরিশ্রম ও সময় সংক্ষেপের তাগিদেই লতাপাতা থেকে বিষ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে ফেলে। এমনটাই ধারণা পণ্ডিতদের। তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে শিকার করতে শুরু করে একদিন লড়াইতে মানুষ মারার কাজেও সেই বিষ মাখানো তির ব্যবহার করা শুরু হয়। মানুষই হয়ে ওঠে মানুষের শত্রু। রাজনীতি-ধর্মনীতি জন্ম দিল নতুন নতুন বিষ ও মারণাস্ত্রের। প্রাণদায়ী সুধা কখন যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠল, মানব সমাজ জানতেই পারল না। প্রাকৃতিক সম্পদ একজায়গায় কিছু মানুষের হস্তগত হল, কিছু মানুষ হল বঞ্চিত। হিংসা বিদ্বেষ সম্পত্তির লোভ জন্মাল মানুষের মধ্যে। নিঃশব্দ ঘাতকের রূপ নিল মানুষের তৈরি বিষ।

নারী শাসিত যৌথ জীবন থেকে পুরুষ শাসিত সমাজে রূপান্তরের কারণে বিষ প্রয়োগের কৌশলে নারীবাদের তকমা লেগে গেল। বিষ প্রয়োগ করা হয় অজান্তে নিঃসাড়ে। তাই বিষ প্রয়োগ নিছকই নারীজনোচিত কাজ বলে গণ্য হতে থাকল। পুরুষ কেন বিষ প্রয়োগ করবে? সে তো তার পেশীর শক্তি ব্যবহার করে, রক্তপাত ঘটিয়ে, যখন খুশি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। বিষ প্রয়োগে হত্যা করা তাই পুরুষের উচিত কাজ বলে আর গণ্য হল না মানব সমাজে।

সেক্সপিয়ার তার লেখা বিখ্যাত নাটক ‘এন্টনি ও ক্লিয়পেট্রা’ তে দেখালেন—রোমান রানি ক্লিয়োপেট্রা, বিষ প্রয়োগে আত্মহত্যা করছেন। সুন্দরী রানির জীবনে একদিকে বৃদ্ধ সম্রাট জুলিয়াস সিজার, অন্যদিকে প্রেমিক রাজা এন্টনি। জীবনের প্রতি অনীহা আর নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে না পেয়ে, সেক্সপিয়ারের নাটকে অন্তিম দৃশ্যে তাই দেখা গেল—ক্লিয়োপেট্রা বিষধর সাপকে আহ্বান করে বলছে, “হে বিষধর, তোমার শ্বদন্তে আমার জীবনের শেষ গিঁট ছিঁড়ে দাও। এসো তোমার শরীরে ক্রোধ আনো, বিদায় জানাও।”

ক্লিয়োপেট্রা যে সত্যি সত্যি সাপের বিষে প্রাণ দিয়েছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু সেক্সপিয়ারের নাটকে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য চিত্রকর সাপের দংশনে ক্লিয়োপেট্রার মৃত্যুর চিত্র এঁকে গেছেন। বিজ্ঞেরা বলেছেন, সাপটা কিং-কোবরা না হয়ে যায় না। কারণ অন্য কোনও বিষে মারা যাবার পাত্রী ছিলেন না ক্লিয়োপেট্রা। তিনি বিষ নিয়ে গবেষণা করতেন। নিত্য নতুন বিষ বানিয়ে, পরিচারক পরিচারিকার উপর প্রয়োগ করে, ফল পরীক্ষাই শুধু করেননি—নিজেও রোজ অল্প অল্প করে বিষ পান করে ক্রমশ নিজেকে বিষকন্যা করে তুলেছিলেন।

ক্লিয়োপেট্রার আগে বিষ পান করে মারা গিয়েছিলেন বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস। তিনি দেবতার অস্তিত্ব বিনা প্রমাণে মেনে নিতে পারেননি। মানেননি ধর্মীয় প্রভুদের অনুশাসন। যুক্তির উপর দাঁড় করিয়ে জন্ম দিয়েছেন এক নতুন দর্শনের। ফল – মৃত্যুদণ্ড। শাসকের নির্দেশে ৫০০ বিচারকের বিচারের প্রহসনে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রায় দিয়েছিল ২৮০ জন বিচারক। তবে সে যুগে তাঁর মতো প্রখ্যাত জ্ঞানী দার্শনিককে বেছে নিতে বলা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি। তিনি হেমলক বিষ পান করে মৃত্যু বরণ করে নিতে চেয়েছিলেন। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো সক্রেটিসের মৃত্যু দৃশ্যের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। যদিও সক্রেটিসের এই শিষ্যটি তাঁর মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন না। সক্রেটিসকে হেমলকের সাথে খানিকটা আফিম মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তিনি আচ্ছন্ন অবস্থায়, কম যন্ত্রণায় মারা যান। প্লেটোর বর্ণিত দৃশ্য এমন ছিল – সক্রেটিস তাঁর বন্ধু ক্রিটোর হাত থেকে বিষ পাত্র তুলে পান করলেন। ক্রিটো তাঁর পায়ের উপর চিমটি কেটে অনুভব করছেন, সক্রেটিসের শরীরে বিষ অঙ্গ অবশ করতে সক্ষম হয়েছে কিনা। সক্রেটিস জানাচ্ছেন – আস্তে আস্তে বিষ তার শরীরে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এবার হৃদয়ে উঠে এলেই সব শেষ হয়। তারপর ক্রিটো দেখছেন – সক্রেটিস অসাড় হয়ে গেছেন, তাঁর চোখ নিথর হয়ে গেছে। মারা গেছেন সক্রেটিস। বিষ পান করে মৃত্যুপথযাত্রী সক্রেটিসের অনেক ছবি এঁকে গেছেন অনেক বিখ্যাত চিত্রকর, যার মধ্যে ফরাসী চিত্রকর জ্যাকুইস লুই ডেভিসের ছবিটি সবচাইতে বেশি খ্যাতি লাভ করে।

ডেভিডের আঁকা সক্রেটিসের মৃত্যু দৃশ্য

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে এশিয়া মহাদেশ থেকে ঘরে ফেরার সময়ে ব্যাবিলনে দেহত্যাগ করেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আলেকজান্ডার। তখন তার বয়স মাত্র ৩২। কেউ বলে ম্যালেরিয়ায় হয়ে বা নিয়মোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান আলেকজান্ডার। আবার কেউ বলে বিষপ্রয়োগে মৃত্যু হয় তাঁর। বিশেষজ্ঞদের বর্তমান মত হল—ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাহক মশার অস্তিত্ব ব্যাবিলনের মরুভূমিতে পাওয়ার কথা নয়। নিউমোনিয়াও কেন শুধু তারই হল, মহামারীতে আর কেউ মারা যাওয়ার কথা কেন জানা যায় না। তাই তাঁদের মতে, পানীয়ে বিষ মিশিয়ে হয় তাকে হত্যা করা হয়েছিল, বা অসাবধানে কোনক্রমে পানীয়তে বিষ মিশে যাওয়ার ফলে অ্যালেক্সান্ডার মারা যান। পুঁথি বলছে প্রায় বারো দিন রোগে কষ্ট পেয়ে মারা যান রাজা। কী সেই বিষ, যার ফলে দীর্ঘায়ত হয়েছিল তাঁর মৃত্যু? সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, ভেরাটাম এ্যালবাম নামক একধরনের ভয়ঙ্কর বিষাক্ত গাছ আলেকজান্ডারের খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে থাকতে পারে। এই গাছের সাদা ফুল অতি সুন্দর। অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ ওষুধ হিসাবে এই গাছের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। জঙ্গলের পশুরা কিন্তু ভুলেও এই গাছের ধারে কাছে যায় না। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাতেও ভেরাটাম এ্যালবামের শিকড় থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হয় রক্তশূন্যতা, মৃগীরোগ, টাইফয়েড প্রভৃতি চিকিৎসায়।

বিষের প্রয়োগবিধি ও ধরণের উপর যে শাখায় গবেষণা করা হয় সেটি হল – টক্সিকোলজি, বা বিষবিদ্যা। জীবনবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, ঔষধবিদ্যার ব্যবহারিক দিক প্রয়োগ করে বিষ নিয়ে গবেষণা করাই এই শাখার কাজ। তবে বিষের উপর এমন পরীক্ষা নিরীক্ষার ইতিহাস অতি প্রাচীন। সভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে বিজ্ঞানের এই শাখার কাজ ততই জটিল পথ ধারণ করছে নিঃসন্দেহে। রোমান সম্রাট নিরোর সভাবৈদ্য ডায়োস্করডিস সর্বপ্রথম গাছের বিষ ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস করেন। হেমলক সর্বাধিক ব্যবহৃত বিষ, যা হেমলক গাছ থেকে তৈরি করা হয়। এছাড়াও রিসিন একটি অত্যন্ত মারাত্মক বিষ। রিসিন গাছের বীজ থেকে ক্যাস্টর অয়েল বানানো হয়। কিন্তু এই বীজের খোসা প্রাণী শরীরে প্রবেশ করলে প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে। বহু রাজনৈতিক হত্যার পিছনে রিসিনের মারাত্মক বিষ প্রয়োগের কাহিনী লুকিয়ে আছে।

রিসিন
হেমলক
ভেরাটাম

প্রাচীন গ্রীক সাম্রাজ্যে হেমলক ছাড়াও আর একটি বিষের ব্যবহার বিষবিদ্যার গবেষকেরা খুঁজে পেয়েছেন। সেটি হল—একোনাইট। বাংলায় একে বলা হয় কুচিলা। নীল রঙের অতি সুন্দর বাহারি ফুল হয় এই গাছে। গ্রীকেরা তীরে বিষ মাখানোর জন্য একোনাইটের শিকড় ব্যবহার করত। এরপর সমাজের উন্নতির সাথে সাথে বদলে গেল বিষের ব্যবহারের উপকরণ। আর্সেনিক, পারদ, সীসা, সব ধাতুই প্রথমে ওষুধ হিসাবে প্রয়োগ করা হতো। ধীরে ধীরে এদের মারণাত্মক দিকটাও মানুষ আবিষ্কার করে ফেলল।

বিষ প্রয়োগ ও তার ব্যবহারের সাথে সাথে মধ্যযুগীয় রাজনীতিতে জমে উঠল পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে তার আমত্য চাণক্য রাজাকে নির্বিঘ্ন শাসনের পথ খুলে দিতে বিষকেই বেছে নিয়েছিলেন গোপন হত্যায়। বিষকন্যা নিযুক্ত করে উচ্চাসনে আসীন রাজপুরুষদের হত্যা করা সে যুগে খুবই স্বাভাবিক ছিল। বৌদ্ধ ও জৈন পুঁথিতে উল্লেখ করা আছে, চন্দ্রগুপ্তকে চাণক্য প্রতিদিন একটু একটু করে বিষ পান করাতেন, যাতে তার শরীর বিষরোধী হয়ে ওঠে। শত্রুর বিষপ্রয়োগের হাত থেকে মহারাজের প্রাণ বাঁচানোই ছিল তার উদ্দেশ্য। বিন্দুসারের জন্ম নিয়ে একটি কাহিনী বিভিন্ন বৌদ্ধ পুঁথিতে পাওয়া যায়। একদিন চন্দ্রগুপ্ত তার পত্নী দূর্ধারার সাথে প্রাতরাশ করবার সময়ে আপেলে কামড় দিয়ে সেই আপেলই মহিষীকে ভালবেসে খেতে দেন। ঠিক সেই মুহূর্তে চাণক্য প্রাতরাশের জায়গায় এসে পড়েন। দূর্ধারা সেই সময়ে গর্ভবতী ছিলেন। বিষ-পুরুষ চন্দ্রগুপ্তের কামড়ানো আপেল খেয়ে দূর্ধারার আসন্ন সন্তান মারা যাওয়ার আশংকায় চাণক্য তখুনি রানির পেট তরোয়াল দিয়ে কেটে তার পুত্র সন্তানকে বার করে আনেন। এক ফোঁটা রক্ত সদ্যজাতের মাথায় পড়ায় তার নাম হয় – বিন্দুসার। হয়তো আসল ঘটনার সাথে অনেকটাই কল্পনা ও কাহিনী মিশে থাকার সম্ভাবনা আছে। তবে চন্দ্রগুপ্ত স্বয়ং যে একজন বিষ-পুরুষ ছিলেন, এর উল্লেখ বহু লিপিবদ্ধ পুঁথিতেই পাওয়া যায়।

মোগল সাম্রাজ্যর ইতিহাস জুড়ে আছে সন্দেহ, অবিশ্বাস, গুপ্তহত্যা ও নীরবে বিষপ্রয়োগ করে হত্যার অসংখ্য নজির। বাদশারা এক বিশেষ কৌশলে প্রায়শই হত্যার কাজটি সুসম্পন্ন করতেন। সেই আমলে রত্ন মণিমাণিক্য খচিত মূল্যবান পোশাক উপহার দিয়ে অতিথিকে সম্মান জানাবার রীতি ছিল। এমন পোশাককে বলা হত – খিলাত। বশ্যতা স্বীকার করবার প্রমাণ হিসাবে বাদশার সামনেই এই পোশাক পরার রীতি ছিল। পোশাকের মধ্যে কলেরা, স্মল পক্স ও ম্যালেরিয়ার জীবাণু মিশিয়ে দেওয়া হত। ফলে পোশাক গায়ে দিয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কোনও সন্দেহের অবকাশই থাকত না। তবে এইভাবে বিষ মাখানো পোশাক ব্যবহার করে মানুষ মেরে ফেলার চল অতি প্রাচীন। জানা যায় গ্রীক বীর হিরাক্‌লসকেও নাকি একই পদ্ধতিতে মারা হয়। মোগল বাদশাহ আওরঙ্গজেব তার প্রতিদ্বন্দ্বী পৃথ্বী সিংহকে একই উপায়ে স্মল পক্সের জীবাণু মেশানো পোশাক উপহার দিয়ে হত্যা করেন। আওরঙ্গজেবের পুত্র আকবর (দ্বিতীয়) তার পিতার বিরুদ্ধাচারণ করে বিরাগভাজন হন। আওরঙ্গজেব তার মসনদের কাঁটা সরাতে নাকি পুত্রকে বিষ মাখা পোশাক উপহার দেন। পিতার মতিগতিতে সন্দিহান হয়ে আকবর সেই পোশাক সে নিজে না পরে, এক ক্রীতদাসকে সেই পোশাক পরিয়ে দেয়। দুএকদিনের মধ্যেই দাসটি মারা যায়। দ্বিতীয় আকবরের সন্দেহ প্রমাণিত হয় এবং সে তার প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়।

১৭০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিষবিদ্যার বিপ্লব ঘটে গেল। কারণ এই সময়ের মধ্যে হয়েছিল শিল্প বিপ্লব। উন্নতি হল ধাতুশিল্প, খনন কার্জ এবং রসায়ন শিল্পে। এক দল মানুষের হাতে নতুন ক্ষমতা এল। জন্ম নিল ঈর্ষার নতুন দিক, রাজনীতির মোড় ও গতি বদলে গেল। বিষ প্রয়োগের নতুন নতুন কলাকৌশলে মেতে উঠল বিষবিদ্যা। শুধু একজনের প্রতি বিষপ্রয়োগের জায়গা নিল বহু মানুষকে একসাথে মেরে ফেলবার জন্য রাসায়নিক ও জীববিজ্ঞানী মারণাস্ত্র। দুটি বিশ্বযুদ্ধ তার সাক্ষী।

তথ্য ঋণ -

1) The elements of murder, A history of Poison, John Emsley, Oxford University Press, 2003.

2) Historical milestone and discoveries that shaped the toxicological sciences, Antoinetee N. Hayes and Steven G. Gillbert, Research Gate. net publication, 2009.

3) Killer Khilats, “Legends of Poisoned Robes of Honour” in India, Michelle Maskiell and Adrienne Mayor, Routledge Journals; Taylor & Francis Ltd, 2001, pp. 23 – 45.

 

ছবি ঋণ – আন্তর্জাল

কার্তিকবাবুর কড়চা - নীলাদ্রি মুখার্জি

দিন তিনেকও হয়নি সৌমিত্র বড়জোড়া জেলা পুলিশ স্টেশনে এসআই হিসেবে বদলি হয়ে এসেছে। এমনিতে বাঁকুড়া জেলার এই থানাটার আবহাওয়াটা মোটের উপর বেশ নিরুপদ্রবই বলা যায়, কিন্তু আসা ইস্তক থানার বড়বাবু এমন এক খুনের তদন্তে সৌমিত্রকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন যে তাতে তার নাকানিচোবানি খাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বড়বাবু কার্তিক লাহিড়ীর বাজারে যে খুব সুনাম আছে এমন নয়, তবে আর দশটা পুলিশ যে কারণে দুর্নামের ভাগীদার হয় কার্তিকবাবুর ক্ষেত্রে কিন্তু কারণটা সম্পূর্ণ আলাদা। ঘুষ খাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে জনগণকে বিপাকে ফেলা, অসাধু ব্যবসায়ীদের মদত দেওয়া ইত্যাদি কোন প্রকার অভিযোগের ভাগীদার কার্তিকবাবু হননি।

কিন্তু কার্তিকবাবুর সমস্যা এগুলি থেকেও অনেক বেশি গুরুতর। যেমন ধরুন কার্তিকবাবুর কাছে থানায় একজন আত্মহত্যার কেস রিপোর্ট করতে এল, এবার হয়তো সেই বিষয়টি খুব একটা গুরুতর নয়। ধরা যাক বিষ খেয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। সাধারণত অন্যান্য আধিকারিকরা একটা প্রাথমিক তদন্ত সেরে ময়না তদন্তের রিপোর্ট বার করে বিষয়টিতে ইতি ঘটাবেন কিন্তু কার্তিকবাবু সেই দলে পড়েন না!

যতক্ষণ না কোন বিষয়কে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করে তদন্তের নাড়িভুঁড়ি বার করবেন ততক্ষণ তার শান্তি নেই। যেমন ধরুন বিষক্রিয়ার মৃত ব্যক্তি কোন বিষ খেয়ে মারা গেছেন, তিনি সেই বিষ কোথায় পেলেন, সেই বিষ জাতীয় বস্তু কে বিক্রি করেন, কেনই বা মৃত ব্যক্তি সেই বিষ খেলেন, সেই বিষ এলাকাতে কীভাবে এলো, সেই বিষের উৎপত্তিস্থল কী বা কোথা থেকে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর তিনি যতক্ষণ না পাবেন ততক্ষণ তদন্ত চলতে থাকবে।

এবার কথা হল সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে যে এটাই তো একজন কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব, কিন্তু মুশকিল হয়েছে কখনো কখনো বিষয়গুলিকে নিয়ে কার্তিকবাবু এত বাড়াবাড়ি করেন যে তাতে তার সহকর্মীরা, বাদী বিবাদী পক্ষের লোকজন, এমনকি স্বয়ং জজ সাহেব পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কাছারিতে এমন ঘটনা বহুবার হয়েছে যে জজ সাহেব কার্তিকবাবুকে তদন্ত আর আগে না এগোবার পরামর্শ এবং অনুরোধ দুই করেছেন। তার কারণ সাধারণ দৃষ্টিতে যে তদন্ত জলের মতো সহজ বলে মনে হয় সেই তদন্তকেও তাত্ত্বিকভাবে পর্যালোচনা করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হন এই বয়স্ক পুলিশ অফিসারটি।

সৌমিত্র যেদিন থানায় জয়েন করে তার দিন দুয়েক পরে রাজনৈতিক রেষারেষির জেরে খুন হয় এলাকার এক মস্তান। সৌমিত্র তদন্তে নেমে খুনি সন্দেহে দু’জনকে গ্রেফতার করে এবং জবরদস্ত জেরার মুখে তাদের মধ্যে একজন খুনের দায়ভার স্বীকার করে। ঘটনাটা এখানেই শেষ হয়ে যেত কিন্তু যতক্ষণ না কার্তিকবাবু নিশ্চিত হচ্ছেন যে তার হেফাজতে থাকা বয়ান দেওয়া ছেলেটি যে খুনি ততদিন তিনি এই তদন্তকে চালিয়ে যাবেন। সচরাচর কার্তিকবাবু তদন্তভার হাতে নিলে বাকি অফিসারেরা সেই তদন্তকে এড়িয়ে চলে কিন্তু যেহেতু সৌমিত্র নতুন এসেছে কার্তিকবাবু তাকেই পাকড়াও করেছেন।

—আচ্ছা স্যার বিল্টু তো স্বীকার করেছে যে কাজটা ও-ই করেছে তাহলে এতদিন ধরে নিয়ে যাওয়ার কী প্রয়োজন?

চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে সৌমিত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন কার্তিকবাবু। তারপর আবার মুখের সামনে ডাই করে রাখা ফাইল এর গভীরে ডুবে গেলেন।

সৌমিত্র ছাড়বার পাত্র নয়, সে আবার বলল, জবাব দিলেন না যে স্যার? বন্দুকটাও তো উদ্ধার হয়েছে তার সাথে বিল্টুর ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে তাতে। এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে বলুন?

মুখের সামনে খোলা ফাইলটা এবার বন্ধ করে রাখলেন কার্তিকবাবু। সৌমিত্রর মুখের দিকে কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন

—ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করলেই কি আর সব সময় অপরাধীকে শনাক্ত করা যায়? অনেক সময় ফিঙ্গারপ্রিন্ট তো ভুলও হতে পারে।

ছয় বছর হয়ে গেল সৌমিত্র পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে কিন্তু এখন অব্দি এই ধরণের অদ্ভুত কথা কখনো শোনেনি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট আবার ভুল হয় নাকি! সে তো শুনেছে কুড়ি কোটি লোকের মধ্যে দুজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করে তাও সেটা আপেক্ষিক, সব সময় হয় না। তাহলে কার্তিকবাবু সেই জিনিসটিকে কেন মাথার মধ্যে রাখছেন? যদিও কার্তিকবাবু পদমর্যাদায় সৌমিত্রর থেকে অনেকটাই বয়োজ্যেষ্ঠ তবুও সিনিয়র অফিসারকে প্রশ্নটা করার লোভ সামলাতে পারলো না সৌমিত্র। বলল

—এটা আপনি কী বলছেন স্যার? আমার চাকরি জীবনের এ ধরনের কথা তো আমি কখনো শুনিনি। এমনও নয় যে আমি প্রথমবার খুনের তদন্তে অংশগ্রহণ করেছি।

কথাটা কার্তিকবাবু ঠিক হজম করতে পারলেন না। নিজের মনেই খানিকটা বিড়বিড় করলেন আর তারপর বললেন

—ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে তোমার ধারণা ঠিক কতোটা?

সৌমিত্র কিন্তু এই প্রশ্নের জন্য একেবারে প্রস্তুত ছিল না। আমতা আমতা করে বলল

—আমাদের ফরেন্সিক স্টাডিতে যেটুকু শিখিয়েছে সেটুকুই জানি স্যার। তাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যে কখনো ভুল হয় সেটা শুনিনি।

সৌমিত্র কথা শুনে হাসি পেল কার্তিকবাবুর। তিনি বিলক্ষণ জানেন যে তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আর সহকর্মীরা খুব একটা সহজভাবে নেয় না তাও এক্ষেত্রে সৌমিত্রকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ইতিহাস না জানালেই নয়। পুলিশের চাকরি যে শুধু কম্পিটিটিভ পরীক্ষাতে পাশ করলেই হয় না তার সাথে অপরাধ বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রয়োজন সেটা বোঝানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সৌমিত্র আজকালকার ছেলে তো, তাই যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা না দিলে সে কোনোকালেই পুরো বিষয়টা মন থেকে বিশ্বাস করতে পারবে না।

পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছে কার্তিকবাবু হাঁক পাড়লেন

—ওরে আমার আর মেজোবাবুর জন্য দু’কাপ চা নিয়ে আয় দেখি। তারপর সৌমিত্রর দিকে ফিরে বললেন

—আমি জানি আজকালকার দিনে অত ভেবেচিন্তে পড়াশোনা করে কেউ খুনের তদন্ত করে না। তবে আমার বদ অভ্যাস এই বুড়ো বয়সে আমি ছাড়তে পারিনি তাই চা খেতে খেতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ইতিহাস সম্পর্কে তোমাকে জানানো আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলে আমার মনে হয়।

ডিউটির শেষলগ্নে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পর্কে জ্ঞান শুনতে সৌমিত্রর মোটেই ইচ্ছা করছিল না কিন্তু সিনিয়র অফিসার বলে কথা! অগত্যা চুপ করে বসে কার্তিকবাবুর কথা শোনা ছাড়া আর কোন উপায় সৌমিত্র দেখতে পেল না।

গলা খাঁকরে শুরু করলেন কার্তিকবাবু, বললেন, আচ্ছা সৌমিত্র ফিঙ্গারপ্রিন্ট অর্থাৎ আঙ্গুলের ছাপ, এই বিষয়টা মানুষ কবে থেকে ব্যবহার করত বল তো? চিন্তা নেই তুমি তোমার ধারণাটাই বল, সঠিক না হলেও চলবে।

খানিকক্ষণ ভেবে সৌমিত্র বলল, এই আঙ্গুলের ছাপ এর ব্যাপারটা মডার্ন এরা থেকেই চলছে বলে আমার ধারণা তবে ২০০-৩০০ বছর আগে হয়তো সম্পত্তি লেনদেন বা অর্থনৈতিক লেনদেন এই ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপের ব্যবহার হত।

—তোমার কথাটা কিছুটা ঠিক তবে পুরোটা নয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ব্যবহার আধুনিক যুগের অনেক আগে থেকে চলে আসছে এবং সেটা পৃথিবীর কোন একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে নয় বরং গোটা বিশ্ব জুড়ে। প্রাচীনকালেও এর ব্যবহার হয়েছে এবং এটা শুধু আমার কথা নয়, এর যথেষ্ট প্রামাণ্য নথিও এখন মানুষের হাতে চলে এসেছে।

—প্রাচীন বলতে ঠিক কত পুরনো বলছেন আপনি?

—প্রায় খ্রিস্টপূর্ব সোয়া দুই হাজার বছর আগেকার কথা বলছি।

—বলেন কী!

এবার আর আশ্চর্যের সীমা রইল না সৌমিত্রর। রসকষহীন আলোচনা আশা করেছিল সে কিন্তু যেভাবে কার্তিকবাবু তাকে টাইম মেশিনে চড়িয়ে বসালেন তাতে মুগ্ধ হয়ে শোনা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না বড়জোড়া থানার নতুন মেজবাবুর।

সদ্য আগত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কার্তিকবাবু বলে চললেন

—এই আঙ্গুলের ছাপের ব্যাপারটা সেই মেসোপটেমিয়া সভ্যতা সময় থেকে চলে আসছে। সবথেকে পুরনো আঙ্গুলের ছাপের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় ব্যাবিলন সাম্রাজ্যের পাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে। ব্যাবিলন বলতে আজকের ইরাক দেশ যেখানে সেখানে। খনন কার্য চালিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রমাণ পেয়েছেন যে তখনকার দিনে ব্যবসায়িক দেওয়া-নেওয়ার জন্য প্রমাণ হিসেবে আঙ্গুলের ছাপ ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ব্যাবিলনের পত্তন হয়েছিল আনুমানিক তেইশশো খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তাহলে বুঝতে পারছ তো যে বিষয়টা কতটা পুরনো!

সত্যি কথা বলতে সৌমিত্র‍র এবার বিষয়টাতে অল্প অল্প করে আগ্রহ জন্মাচ্ছিল। পুলিশের প্রযুক্তিগত কচকচানিতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকার কারণে হোমিসাইড শাখার শহরতলির পোস্টিং ছেড়ে সে এসেছে এই ধ‍্যাড়ধ‍্যাড়ে গোবিন্দপুরে। কিন্তু প্রযুক্তিগত কচকচানিতেও যে এত প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে তা সৌমিত্রর ধারণার বাইরে।

—আচ্ছা স্যার, প্রাচীনকালে শুধুমাত্র ব‍্যাবিলনেই আঙ্গুলের ছাপের প্রচলন ছিল?

—না, মোটেই না‌। মাটির পাতে আঙ্গুলের ছাপের ব‍্যবহার ২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে চিনেও যেমন ছিল তেমনি ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দে পারস‍্যেও তার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

—বলেন কী?

—একেবারেই তাই। মজার ব‍্যাপার কী জানো এই অপরাধের ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর প্রথম ব‍্যবহার ব্রিটিশেরা দাবী করলেও চিনের কিন সাম্রাজ্যের সম্রাটরা ডাকাতদের ধরার পর তাদের নথিভুক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে শনাক্তকরণের জন্য এই পদ্ধতি ব‍্যবহার করতেন। ভাবতে পারো সেই কতশো বছর আগের পদ্ধতি আমরা আজও ব‍্যবহার করে চলেছি!!

—আচ্ছা স্যার, এই যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং সেটার পিছনে যে বিজ্ঞান, সেটা মানুষ কবে ব‍্যাখ‍্যা করতে পারে?’

—দ‍্যাখো সৌমিত্র, আমার বিশ্বাস যে অনেক প্রাচীনকালেই মানুষ এই বিজ্ঞানটা পুরো আয়ত্ত করে ফেলেছিল, তবে নথি অনুযায়ী ১৬৮৪ খ্রীষ্টাব্দে "Philosophical Transactions of the Royal Society of London" নামক গবেষণাপত্রে ডঃ নেমায়াহ গ্রিউ ইউরোপীয়দের মধ‍্যে প্রথম হাতের পাতার ফ্রিকশন রিজের কথা উল্লেখ করেন।

—ডঃ গ্রিউই প্রথম ফ্রিকশন রিজের কথা বলেছেন এমন প্রামাণ‍্য নথি যদি থেকে থাকে, তাহলে প্রাচীন কালের মানুষ যে এই বিজ্ঞানটা আয়ত্ত করে ফেলেছিল, আপনার এহেন ভাবনার কী কারণ?

সৌমিত্রর গলায় কৌতূহলমিশ্রিত সন্দেহের সুর শুনে বেশ খুশিই হলেন কার্তিকবাবু। আজকালকার ছোকরা অফিসারদের মধ্যে এই অনুসন্ধিৎসু, কৌতূহলী ব‍্যাপারটা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে! একজন তদন্তকারী হতে গেলে সাহস, ক্ষুরধার বুদ্ধির পাশে মানুষের এই দুটি সহজাত প্রবৃত্তি যে কতটা উপযোগী তা কার্তিকবাবু হাড়ে হাড়ে জানেন।

—আসলে সৌমিত্র, পুরাতন কালের ব‍্যাপারগুলো তো আজকালকার তাত্ত্বিকেরা মানতে চান না, তবে তাই বলে সেগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না!

—সে তো বটেই।

—ফ্রিকশন রিজের সর্বপ্রথম গ্রন্থভুক্তিকরণের কথা যদি বলো, তাহলে সেটা হয়েছে চৌদ্দশো শতকে পারস‍্য ভাষায় লেখা "জামল তারিখ" এর মাধ‍্যমে। খাজা রশিদুদ্দিন ফজলোল্লা হামাদানির পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা এই গ্রন্থে সর্বপ্রথম আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে মানুষের শনাক্তকরণের কথা বলা হয়েছে। এবং এই ফ্রিকশন রিজের কথাও প্রথম উল্লেখ করা হয়েছে এই গ্রন্থে।

—আচ্ছা, এই যে ফ্রিকশন রিজ, তার মানে আমাদের এই আঙ্গুলের চামড়ার খাঁজ তো?

—একেবারেই তাই এবং এই খাঁজের বিন‍্যাস প্রায় প্রতিটা মানুষের আলাদা এবং তার জন‍্যই শনাক্তকরণের জন্য এই পদ্ধতি ব‍্যবহার করা হয়। তবে …

—তবে কী স্যার?

—না থাক, সেটা না হয় শেষে হবে‌। তার চেয়ে বরং তোমাকে "বিদলু" দিয়ে শুরু করি?

—অ্যাঁ, বিদলু! সেটা আবার কী?

সৌমিত্রর খাবি খাওয়া ভঙ্গি দেখে মনে মনে বেশ মজাই পেলেন কার্তিকবাবু। হেসে বললেন

—শারীরস্থানবিদ কথাটার অর্থ জানো?

—সেরেছে, এত কঠিন বাংলা আমার জানা নেই স্যার।

—শারীরস্থানবিদ কথার অর্থ হল অ্যানাটোমিস্ট অর্থাৎ শরীরের অঙ্গ প্রত‍্যঙ্গ নিয়ে যাদের কারবার আর কী!

—তা এই বিদলুর সাথে অ্যানাটোমির কী সম্পর্ক?

—সম্পর্ক আছে ইয়ং ম‍্যান। ডঃ গ্রিউয়ের গবেষণাপত্র প্রকাশ পাওয়ার অব‍্যবহিত পরেই অর্থাৎ ১৬৮৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রখ‍্যাত ডাচ অ্যানাটোমিস্ট গোভার্ড বিদলু তার লেখা শারীরস্থানবিদ‍্যা সংক্রান্ত যুগান্তকারী বই "অ্যানাটমি অফ দ‍্য হিউম‍্যান বডি" প্রকাশ করেন যা আজও প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পরেও চিকিৎসাশাস্ত্রে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই এই বইতেই প্রথম চিত্রাকারে ফ্রিকশন রিজের ব‍্যাখ‍্যা দেওয়া হয়। যদিও এতে বিদলু আঙ্গুলের ছাপের অনন‍্যতা অর্থাৎ Uniqueness সম্বন্ধে বিশদে কিছু বলে যাননি।

—তাহলে আজকের এই অনন‍্যতার তত্ত্বটা এল কোথা থেকে?

—আসলে বিদলুর পরেও আর একজন শারীরস্থানবিদ‍্যার ইতালিয় অধ‍্যাপক মারসেলো ম‍্যালপিঘি বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ‍্যাপনা করা-কালীন আঙ্গুলের চামড়ার শৈলশিরা, সর্পিল ও বৃত্তাকার আঁকিবুঁকির ওপর লিখে গেছেন, কিন্তু বিদলু বা ম‍্যালপিঘি কেউই আঙ্গুলের ছাপের অনন‍্যতার ব‍্যাপারে কোন প্রামাণ্য তথ‍্য রেখে যাননি।

এরপর ১৭৮৮ সালে জার্মান চিকিৎসক জে.সি.এ.মেয়ার একটি বই লেখেন যার নাম "Anatomical Copper-plates with Appropriate Explanations" । এই বইতে মেয়ারই প্রথম বলেন যে মানুষের আঙ্গুলের ছাপ হল অনন‍্য অর্থাৎ একজন মানুষের আঙ্গুলের ছাপ কিছুতেই অন‍্য মানুষের হাতের ছাপের সাথে মিলবে না। মেয়ার এখানে লিখেছেন

“Although the arrangement of skin ridges is never duplicated in two persons, nevertheless the similarities are closer among some individuals. In others the differences are marked, yet in spite of their peculiarities of arrangement all have a certain likeness”

এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পুরোটা শুনছিল সৌমিত্র। সত‍্যিই তো, এই অজ পাড়াগাঁতে এসে, আপাতনিরীহদর্শন এই বড়বাবুটি যে এমন জ্ঞানের আধার তা সে মোটেই প্রথমে আন্দাজ করতে পারেনি। তার সাথে এটাও বুঝতে ওর অসুবিধা হল না যে কার্তিকবাবু এতদিন শুধু উলুবনেই মুক্তো ছড়িয়ে গেছেন আর সেই কারণেই বাজারে তার এত দুর্নাম। সৌমিত্র জিজ্ঞাসা করল

—আচ্ছা বড়বাবু, এগুলো তো না হয় বুঝলাম কিন্তু আধুনিক যুগে অপরাধ ক্ষেত্রে বা আইনানুগভাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর ব‍্যবহার কবে থেকে চালু হল? নিশ্চয়ই ইউরোপেই চালু হয়েছিল তাই না?

সৌমিত্রর কথা শুনে স্মিত হাসলেন কার্তিকবাবু। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের অনেক ইতিহাসই আজ বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে! বললেন

—সৌমিত্র, তুমি জঙ্গিপুরের নাম শুনেছ?

—মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর?

—উঁহু, হুগলির জঙ্গিপুর। তা ১৮৫৮ সালে হুগলি জেলার চিফ ম‍্যাজিস্ট্রেট স্যার উইলিয়াম হার্শেল প্রথম সিভিল কনট‍্যাক্টসের শনাক্তকরণের জন‍্য আঙ্গুলের ছাপ নেওয়ার ব‍্যবস্থা আইনানুগভাবে চালু করেন।

—আরিব্বাস, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা ঘটেছিল এই বঙ্গদেশে! এতো এক অভূতপূর্ব ঘটনা!

—সে তো বটেই, তবে অপরাধী ধরতে অথবা তাদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যে পোক্ত তত্ত্বের দরকার হয় তা কিন্তু এই পর্যন্ত কেউই পরিবেশন করতে পারেননি। পুরোটাই ছিল আনুমানিক এবং ঝাপসা তথ‍্যের ওপর নির্ভরশীল।

—তারপর কী হল?

—১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত "The American Journal of Microscopy and Popular Science" নামক বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকার জুলাই সংখ‍্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ‍্যাত মাইক্রোস্কোপিস্ট থমাস টেইলর তার প্রতিবেদনে অপরাধী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে হাতের পাতার ছাপ এবং আঙ্গুলের ছাপের পক্ষে সওয়াল করেন।

নিউইয়র্কের একটা সংবাদপত্রে এরপর লেখা হয়

" In a recent lecture, Mr. Thomas Taylor, microscopist to the Department of Agriculture, Washington, D.C., exhibited on a screen & view of the markings on the palms of the hands and the tips of the fingers, and called attention to the possibility of identifying criminals, especially murderers, by comparing the marks of the hands left upon any object with impressions in wax taken from the hands of suspected persons. In the case of murderers, the marks of bloody hands would present a very favorable opportunity. This is a new system of palmistry"

—কিন্তু এটা তো শুধু একটা পথদিশা মাত্র বড়বাবু, টেলরের এই বক্তব্যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, নিশ্চয়তার কথা তো কিছু বলা হয়নি।

—ঠিকই বলেছ সৌমিত্র, তবে এই ঘটনা ঘটার কয়েক বছর পরেই এমন দুটি ঘটনা ঘটে যা অপরাধবিজ্ঞানকে এক যুগান্তকারী ইতিহাসের শরিক করে দেয়।

—কীরকম?

—ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ স্যার ফ্রান্সিস গাইতন, যিনি কিনা আবার স্বনামধন্য চার্লস ডারউইনের তুতো ভাই ছিলেন, ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে গবেষণা শুরু করেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে । শেষমেশ তিনি ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি প্রকাশ করেন একটি বই, যার নাম "Finger Prints" । স্যার গাইতনই ছিলেন প্রথম ব‍্যাক্তি যিনি বিজ্ঞানসম্মত ব‍্যাখ‍্যা দিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টের অনন‍্যতার তত্ত্ব জনসাধারণের সামনে নিয়ে আসেন। এই বইটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম প্রকাশিত বই যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্টকে প্রথমবারের জন্য শ্রেণীবিন‍্যস্ত করা হয়।

—বাহ্, দারুণ ব‍্যাপার তো! তার মানে ডারউইনের তুতো ভাইও তাঁর মতনই ক‍রিতকর্মা ছিলেন।

—অবশ্যই, আর শুধু তো প্রথম বইটাই নয়, "Decipherment of Blurred Finger Prints" এবং "Fingerprint Directori" নামক বইটিও ওয়াকিবহাল মহলে যথেষ্ট সমাদৃত হয়।

—বাবা! এতো একেবারে গুণের ডিপো!

—সে তো বটেই, আধুনিক ফ্রিকশন রিজ বিজ্ঞানের পথিকৃৎও বলা যায় তাকে।

—আচ্ছা স্যার, দ্বিতীয় ঘটনাটা কী?

—দ্বিতীয় ঘটনাটা বলার আগে বলো তো, তুমি বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করো তাই না?

কথাটা বলে একবার সৌমিত্রর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন কার্তিকবাবু। গতকাল রাতে বিশ্বকাপের খেলা দেখার জন্য যে সৌমিত্র শরীর খারাপের বাহানা করে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ে, সন্দেহটা সেখান থেকেই দানা বাঁধে। আজ সকালে সৌমিত্রর মোবাইলে লিওনেল মেসির ওয়ালপেপারটা সন্দেহকে সত‍্যিতে পরিণত করে। আমতা আমতা করে সৌমিত্র বলল

—ইয়ে মানে স্যার, ওই আর কী!

—চিন্তা নেই, গতকালের ব‍্যাপারে জবাবদিহি চাইবো না, নির্ভয়ে বলো।

—হ‍্যাঁ স্যার, আপনি ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু আমাদের আলোচনার সাথে আর্জেন্টিনার কী সম্পর্ক?

—আছে সৌমিত্র আছে, গভীর সম্পর্ক আছে। ১৮৯২ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আইরেসে ইনস্পেক্টর এদুয়ার্দো আলভারেজ বিশ্বে সর্বপ্রথম অপরাধীকে শনাক্ত করতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব‍্যবহার করেন।

—বলেন কী?

—আর বলছি কী! আর ঘটনাটাও ছিল খুব নৃশংস।

—কী রকম?

—ফ্রান্সিসকা রোহাস নামক জনৈকা মহিলা তার দুই পুত্রসন্তানকে খুন করে এবং নিজেকে আক্রান্ত প্রমাণ করার জন্য সেই মহিলা নিজের গলাতেও ছুরি চালিয়ে দেন। রোহাস দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন জনৈক এক ব‍্যাক্তির ওপর। কিন্তু রোহাসের দুর্ভাগ্য যে সেই চেষ্টা ব‍্যর্থ হয় ইনস্পেক্টর আলভারেজের তৎপরতায়, কেননা, অপরাধস্থলে একটি দরজার পাল্লায় পাওয়া যায় রোহাসের রক্তাক্ত হাতের ছাপ। আর সেই ছাপ পরীক্ষা করে রোহাসকে খুনি হিসেবে শনাক্ত করে আলভারেজ। এবং এটিই পৃথিবীর প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করার উদাহরণ।

—বাব্বা, এতো একেবারে ক্রাইম থ্রিলার গল্পের মতন!

—তা একবারেই ঠিক বলেছ, তবে ক্রাইম থ্রিলার গল্পে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণের ইতিহাস কিন্তু বাস্তবের থেকেও পুরোনো।

—তাই নাকি? কী রকম?

—মার্ক টোয়েনের নাম শুনেছ তো?

—অবশ্যই, তিনি তো বিশ্বখ‍্যাত সাহিত‍্যিক।

—ঠিক, আর এই টোয়েনই তার বই "লাইফ অন দ‍্য মিসিসিপি"-তে এক আততায়ীকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ‍্যমে পাকড়াও করার কথা বলেছেন। সেটাও বুয়েনস আইরেসের ঘটনার প্রায় দশ বছর আগে।

—অভূতপূর্ব ব‍্যাপার, সত‍্যিই এধরণের মানুষের সৃষ্টি এইজন্যই কালজয়ী হয়।

—ঠিকই বলেছ তুমি।

—আচ্ছা স্যার, আমার মনে একটা প্রশ্ন ছিল।

—বলো না।

—আচ্ছা এই যে আমরা এখন দাগী অপরাধীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে রাখি ভবিষ্যতে তদন্তের সুবিধার জন‍্য, সেই পদ্ধতিটি কারা চালু করেন?

—এই পদ্ধতি চালু হওয়ার পিছনে আছেন পরাধীন ভারতবর্ষের হতভাগ্য দুই বঙ্গসন্তান।

—বলেন কী!

—ঠিকই বলছি। ১৮৯৭ সালে পরাধীন ভারতবর্ষের সিংহাসনে আসীন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে অপরাধীদের আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করে রাখা হবে। সে মতানুযায়ী সেই বছরের শেষেই আমাদের শহর কোলকাতায় অ্যানথ্রোপোলজিকাল ব‍্যুরোতে গড়ে ওঠে বিশ্বের সর্বপ্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব‍্যুরো।

আর অ্যানথ্রোপোলজিকাল ব‍্যুরোকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের আঁতুড়ঘর বানিয়ে তোলার পিছনে হাত ছিল যে বঙ্গসন্তানদ্বয় তাঁদের নাম আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র দাস। মূলতঃ এই দুই ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞের হাত ধরে আধুনিক প্রয়োগমূলক ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সূচনা হয়। আজও পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে ফিঙ্গারপ্রিন্টের যে ‘হেনরি সিস্টেম’ এর মাধ‍্যমে অপরাধী শনাক্ত করা হয় তার আবিষ্কর্তা এই দুই বঙ্গসন্তান। কিন্তু পরাধীন ভারতের বাসিন্দা তায় আবার বাঙালি তাই সেই আবিষ্কারের কৃতিত্ব যায় তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরির দখলে।

—ইসস, এরকম ঘটনা সত‍্যিই দুর্ভাগ্যজনক। তবে সে তো আরও কত বাঙালি কৃতীর সাথে এরকম ঘটেই চলেছে। তবে স্যার একটা প্রশ্ন আছে।

—বলো না!

—আচ্ছা এই আজিজুল আর হেমচন্দ্রবাবুর তৈরী করা পদ্ধতি তো অনেক বছর আগেকার, এবং আমরা আজও যদি সেই পদ্ধতির ব‍্যবহার করে থাকি তাহলে কোথাও গিয়ে কি সেই পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন নয়? মানে অনেক পুরোনো তত্ত্বকে নতুন করে ভাঙ্গা-গড়া করা হচ্ছে, নতুন আঙ্গিকে সংশোধন করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রেও কি তার প্রয়োজনীয়তা নেই?

—পুরোনো তত্ত্বের সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মার্কিন মুলুকের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডেরাল ব‍্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশান একবার যা কেলোর কীর্তি করেছিল তাতে চট করে অন্তত ফিঙ্গারপ্রিন্টের বুনিয়াদি তত্ত্বকে কেউ ঘাঁটাবে বলে মনে হয় না।

—বলছেন কী! এফ.বি.আই-ও ভুল করে!

—আলবাৎ করে। একশোবার করে। তোমাকে যে ঘটনার কথা বলব সেটাতেই করেছে। এবং সেই ভুল ক্ষমার অযোগ‍্য!

—কী সেই ভুল স্যার?

—২০০৪ সালে স্পেনের মাদ্রিদ শহরের ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণের কথা মনে আছে তোমার?

—অবশ্যই আছে স্যার। সে তো মর্মান্তিক এক ঘটনা! প্রায় দুশো মানুষের মৃত্যু হয় সেই ঘটনায়। জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়দা সম্ভবত স্প‍্যানিশদের ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রতিবাদে ঐ ন‍্যক্কারজনক ঘটনাটা ঘটায়।

—ঠিকই বলেছ তুমি। তা সেই ঘটনার তদন্ত করতে নেমে এফ.বি.আই এক ব‍্যাক্তিকে পাকড়াও করে যার নাম ব্র‍্যান্ডন মেফিল্ড। তা এই মেফিল্ড ছিল একজন ধর্মান্তরিত আমেরিকান মুসলিম। এফ.বি.আই সন্দেহভাজন জঙ্গিদের আঙ্গুলের ছাপের সাথে মেফিল্ড এর আঙ্গুলের ছাপ মেলাতে পারার ফলে তাকে নিজেদের হেফাজতে বন্দী করে।

তবে মেফিল্ডের সৌভাগ্য যে তার পাশে দাঁড়ায় স্প‍্যানিশ পুলিশ প্রশাসন। তাদের বিশেষজ্ঞরা জানান যে পরীক্ষার পদ্ধতিগত ভুলের ফলেই মেফিল্ড এর আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। মার্কিন সংস্থাটি প্রথমে ভুল স্বীকার না করতে চাইলেও পরে চাপের মুখে নিজেদের পরীক্ষার পদ্ধতিগত ভুল স্বীকার করতে বাধ‍্য হয় এবং মেফিল্ডকে দুসপ্তাহ পরে মুক্ত করে দেওয়া হয়। আমেরিকার কোর্টে এইজন্য সংস্থাটিকে তীব্র ভৎসনার সম্মুখীন হতে হয় এবং মেফিল্ডকে ক্ষতিপূরণ বাবদ সংস্থাটিকে কুড়ি লক্ষ মার্কিন ডলার জরিমানাও দিতে হয়‌।

—বাব্বা, এতো পুরো কেচ্ছা, নিশ্চিতরূপে আমেরিকার মুখ পুড়েছিল সে সময়।

—অবশ‍্যই।

—আচ্ছা স্যার, আপনি যে এতকিছু বললেন, তার সাথে বিল্টুর কেসটার কী সম্পর্ক?

—বিল্টু খুনটা একা করেনি সৌমিত্র।

—মানে? এটা কী বলছেন আপনি? পিস্তলে বিল্টুর হাতের ছাপ, ফরেনসিক রিপোর্টেও এসেছে সেই পিস্তলের গুলিই নিমাইয়ের শরীরে ঢুকেছে, তার ওপর নিমাইয়ের শার্টের দুকাঁধে বিল্টুর হাতের ছাপ আর সর্বোপরি বিল্টুর জবানবন্দি। এর পরেও একথা কী করে বলছেন?

—আচ্ছা বিল্টুর সাথে নিমাইয়ের সম্পর্ক কেমন ছিল বলে তোমার মনে হয়?

—একে অপরের রাইভাল গ‍্যাংয়ের ছেলে, তার ওপর বিল্টু আর নিমাইয়ের শত্রুতা তো সর্বজনবিদিত। তাই ভালো সম্পর্ক নয় সে তো বলাই যায়।

—তাহলেই ভাবো, যাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক তারা কি আর রাস্তায় কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে?

—তার মানে?

—মানে বলতে চাইছি যদি গুলি করতেই হয় তাহলে বিল্টু নিমাইয়ের কাঁধৈ হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে কেন? সে তো সামনে বা পিছনে দূরে দাঁড়িয়ে গুলিটা করবে, তাই না?

—ঠিক তো, এরকমভাবে তো ভেবে দেখিনি।

—আচ্ছা বিল্টুদের লিডার, ওই কাউন্সিলরের ছেলে রমেশ, সে ব‍্যাটা কী স্টেটমেন্ট দিয়েছে?

—সে তো বলছে সে ওইদিন কোলকাতা গেছিল, মামার বাড়ি রাতে ছিল আর গতকাল দুপুরে ফিরেছে। যাওয়ার আসার ট্রেনের টিকিট আর গত পরশুর কোলকাতাতে সিনেমা হলের টিকিট দেখিয়েছে।

—আচ্ছা সৌমিত্র, এমনও তো হতে পারে রমেশ টিকিট কেটে গত পরশু সকালে বাড়িতে লুকিয়ে রইল সারাদিন, তারপর রাতে নিমাইকে মেরে দিল। আর তারপর গতকাল সকালে সিনেমার টিকিটটা কাউকে একটা দিয়ে আনিয়ে নিল যেটা আগেই কেটে রেখেছিল।

—তাহলে বিল্টু মিথ‍্যা বলবে কেন?

—সে পয়সা দিলে আর ভয় দেখালে সবাই বলবে।

—আপনি হঠাৎ রমেশকেই সন্দেহ করছেন কেন? সে তো সত‍্যিও বলতে পারে।

—তা পারে, তবে দুটো খটকা আর একটা কানাঘুষো আমাকে রমেশই যে খুনি সেটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে।

—কী সেগুলো স্যার?

—প্রথমত, তোমার নিমাইয়ের বডি নিয়ে আসার পর গতকাল আমি একবার অকুস্থলে যাই, ফরেনসিকের একটা ছেলেকে নিয়ে। তা নিমাইয়ের দেহ যেখানে পড়েছিল তার থেকে প্রায় ১০০ মিটার দক্ষিণে লাইটপোস্টে আমি রক্তমাখা আঙ্গুলের ছাপ দেখতে পাই। সেদিনই নমুনা সংগ্রহ করে আমি কোলকাতার ল‍্যাবে পাঠাই আর রমেশের থেকে সংগ্রহ করা নমুনা তার সাথে হুবহু মিলে যায়।

দ্বিতীয়ত আততায়ী খুন করে খুনের অস্ত্রটা লোপাট ক‍রার বদলে সেটা অকুস্থল থেকে খানিক দূরে ফেলে যাবে কেন?

এটা কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়? ওরা কি এতই বোকা বলে তুমি মনে করো?

—সেটাও তো ঠিক!

—তাহলে এখন কী করবে বলে ঠিক করেছ?

—বিল্টুকে আর একবার ভাল ক‍রে রগড়ানি দিলে হয় না অথবা খানিকটা লোভ বা ভয় দেখালেও হয়তো কাজ হতে পারে!

—সেটা করে কী লাভ হবে?

—কেন স্যার, ওর ঠিক বয়ানটা নিয়ে নেব!

—কোর্টে খাটবে সেটা? বিল্টু তো বলবে যে পুলিশ মারধর করে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছে।

সত্যিই আর কোন জবাব থাকল না সৌমিত্রর কাছে। কার্তিকবাবু চেয়ারটা সরিয়ে নিয়ে দরজা দিয়ে বেরোনোর আগে বললেন

—এক কাজ করো সৌমিত্র, আজ বাড়ি ফেরার সময় একবার নতুনপাড়ার দিকটায় ঘুরে এসো। যে ফ্ল‍্যাটের সামনে ঘটনাটা ঘটেছিল তার পাঁচ তলায় এক বৃদ্ধ পুরো বিষয়টা দেখেছে। বছর পাঁচেক আগে ওই বৃদ্ধর জমি রমেশের বাবা কেড়ে নেয়। ফ্ল‍্যাটের নিচে গোলমাল হতে দেখে, ভদ্রলোক বুদ্ধি করে পুরো ঘটনাটা নিজের মোবাইলে ভিডিও করে রেখেছে। আসছে মঙ্গলবার কোর্টে তুলব ভদ্রলোককে, তুমি বরং একজন সশস্ত্র কনস্টেবল নিয়োগ করে দিয়ে এসো।

হতভম্ব হয়ে কার্তিকবাবুর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে রইল সৌমিত্র। লোকটা কি জিনিয়াস না ক্ষ‍্যাপা! কেস যদি সমাধান করে ফেলেছে তা হলে ফিঙ্গারপ্রিন্টের এত কথা ফাঁদার কী মানে? তাহলে কি লোকটা ফিঙ্গারপ্রিন্টের গল্পের শেষ পরিচ্ছেদটা বোঝানোর জন‍্যই এত কথা বলল! গ্লানিমিশ্রিত হতাশায় মাথা নাড়তে নাড়তে বড়বাবুর পথ অনুসরণ করল সৌমিত্র।

বিশ্বজয়ী এবং একটা পদ্ধতি - সোহম সেহানবীশ

২০০৬ :- বিশ্বকাপ ফাইনাল
২০০৮ :- ইউরোর গ্রুপ থেকে বিদায়
২০১০ বিশ্বকাপ যোগ্যতাঅর্জন পর্ব :- প্লে-অফ খেলে বিশ্বকাপে যাওয়া
২০১০ বিশ্বকাপ :- গ্রুপ থেকে বিদায়
২০১২ :- ইউরোতে দ্বিতীয় রাউন্ড
২০১৪ বিশ্বকাপ যোগ্যতাঅর্জন পর্ব :- প্লে-অফ খেলে বিশ্বকাপে যাওয়া
২০১৪ বিশ্বকাপ :- কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১৬ ইউরো :- রানার্স আপ
২০১৮ বিশ্বকাপ :- চ্যাম্পিয়ন

একটা লম্বা রাস্তা। একাধিক টুর্নামেন্টে ব্যর্থতা। ২০০৩-এর কনফেডারেশনস কাপ জয়ের পর থেকে সাফল্যহীন একটা দল। ২০০৬-এর সেই অভিশপ্ত রাতের পর থেকে মনেপ্রাণে দেখে চলা একটা স্বপ্ন। কিন্তু, এই স্বপ্ন কি নিছকই এক মাসের? এই স্বপ্ন কি নিছকই একটা প্রতিযোগিতায় এসে পরপর সাতটা ম্যাচ ভালো খেলা আর বিশ্বজয়ীর তকমা নিয়ে ফিরে যাওয়া? মনে হয় না, কারণ বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে এসে হিসেব নিকেশ সবসময় অতটা সোজা থাকে না! স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন সফল হওয়ার মধ্যে থাকে একটা পদ্ধতি, যেটা বিভাজন করে দেয় ওই একত্রিশটা দল, এবং বিশ্বজয়ীর মধ্যে!

২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনালটা খেলার পর থেকেই ফলাফলের গ্রাফ নিম্নমুখী হতে শুরু করে ফ্রান্সের। ২০০৮-এর ইউরোতে গ্রুপ থেকে ছিটকে যাওয়া এবং ২০১০ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে আয়ারল্যান্ড এর সাথে প্লেঅফে থিয়েরি অরি’র ‘হ্যান্ডবল’ গোলে জিতে মূলপর্বে যাওয়া, দলটার খেলা নিয়ে বিতর্ক লেগেই ছিলো! যজ্ঞে ঘৃতাহুতি পড়লো যখন তৎকালীন কোচ রেমন্ড ডমেনেখ-এর সাথে টিমের সদস্যদের ঝামেলা তুঙ্গে ওঠে। কোনও দুর্বোধ্য কারণে তরুণ স্ট্রাইকার করিম বেনজিমাকে বিশ্বকাপে না নিয়ে যাওয়া এবং নিকোলাস আনেলকাকে কেন্দ্র করে কোচ এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে অশান্তি, সবকিছু মাথায় রেখে হয়তো ২০১০-এর বিশ্বকাপে ফ্রান্সের গ্রুপ থেকে বিদায় নেওয়া কাকতালীয় কিছুই ছিলো না।

এরই মধ্যে ২০১২-এর ইউরোর ঠিক পর জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া হয় দিদিয়ের দেশঁকে। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপজয়ী দেশঁ’র দায়িত্ব ছিলো ২০১৪-তে বিশ্বকাপে অন্তত একটু সম্মানজনক ফলাফল আদায় করা। কিন্তু যোগ্যতা অর্জন পর্বের শেষ ধাপে একটি বড়সড় ধাক্কা, প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডে ইউক্রেনের কাছে ০-২ হেরে বসলো ফ্রান্স। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনই না করার! যদিও শেষ রক্ষা হয়েছিলো এবং চারদিন পর সেই ইউক্রেনকেই দ্বিতীয় রাউন্ডে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপে গেলো ফ্রান্স, এবং তর্কাতীত ভাবে জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসের পর হয়তো গোটা প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা ফুটবল উপহার দিলো তারা। গোটা মাঠ জুড়ে আক্রমণাত্মক খেলার উদাহরণ দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রবল পরাক্রান্ত জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে পরাজয় বরণ করলেও, গোটা ম্যাচে ফ্রান্সের মুহুর্মুহু আক্রমণ ও হার-না-মানা মনোভাবের মধ্য দিয়ে এইটুকু স্পষ্টই ছিলো, যে সেদিন না হোক, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতেই, ফরাসি ফুটবলের সুদিন ফিরছে! ভীষণভাবে ফিরছে!

আর ঠিক এখানেই আসল মাস্টারস্ট্রোকটা খেললো ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন। দেশঁকে বরখাস্ত না করে কোচ রেখে দিয়ে। ফ্রান্সের ফুটবলের একটা স্বর্ণযুগ এলো। ২০১৪-এর দলটার সাথে এসেই যুক্ত হলো এনগোলো কান্তে, দিমিত্রি পায়েটের মতো কিছু উঠতি তারকার নাম, এবং ধীরে ধীরে ফ্রান্স হয়ে উঠতে লাগলো অপ্রতিরোধ্য! ২০১৬-এ ঘরের মাঠে ইউরোর গ্রুপ ও নকআউট পর্বের দুর্বার গতি দেখে যখন সবাই একপ্রকার বলেই দিলো যে কাপটা ফ্রান্স কে দিয়ে দিলেই হয়, ঠিক যে মুহূর্তে সবার মনে হলো ১৯৯৮ বিশ্বকাপের মতোই, আবারও ‘শিল্ড গ্রামের বাইরে যাবে না’, তখনই আবার অঘটন। পর্তুগাল এসে ফাইনালে কাপটা নিয়ে চলে গেলো! আবারও একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে! তাহলে কি এই দলটার সেই বহুচর্চিত ‘চ্যাম্পিয়ন্স লাক’ নেই?

তবে এরপরেও দেশঁর উপরেই আস্থা রাখলো বোর্ড। উমতিতি, এমবাপের মতো আরো কিছু তরুণ তারকা দলে এলেন। ফ্রান্স ছুটতে লাগলো নিজেদের আসল লক্ষ্যের দিকে। যে লক্ষ্য ২০০৬ এর বার্লিনের ওই রাতে অসমাপ্ত অধ্যায় হয়েই থেকে গিয়েছিলো! অবশেষে! অবশেষে! স্বপ্ন সফল হলো। এতবারের প্রচেষ্টায়! নকআউটে পরপর আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া... কেউ যদি এরপরও বলে যে ধারে-ভারে যোগ্য চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স নয়, তাহলে আর কিছুই বলার নেই। পুতিনের দেশে অন্য মহাশক্তিদের ব্যর্থতার মধ্যেই উজ্জ্বল রয়ে গেলো লেস ব্লুজ, এবং অবসান ঘটলো প্রতীক্ষার!

পদ্ধতি

প্রতিটা বড় সাফল্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটা পদ্ধতি। এবং সেটা যদি আন্তর্জাতিক ফুটবল দলের ক্ষেত্রে বলতে হয়, তাহলে তো অবশ্যই! যদি এক মুহূর্তের জন্য ভেবেওনি, যে ২০১৬-এর ইউরো না জিততে পারার অপরাধে দিদিয়ের দেশঁর চাকরি নট হতো, তাহলে কি হতো? ইউরোপের একটি প্রথম সারির দল হিসেবে পরিচিত এই ফ্রান্সেরও খেলোয়াড় উৎপাদন বন্ধ হতো না, এবং নতুন কোচ পেতেও সমস্যা হতো না, তাহলে? কিন্তু, নতুন কোচের নতুন পরিকল্পনা-ছকে কি খেলোয়াড়রা মানিয়ে নিতে পারতেন? এমনিতেই দশ মাস ক্লাব ফুটবলে যে যার নিজের ক্লাবে, বছরে মেরেকেটে ওই চার-পাঁচটা ইন্টারন্যাশনাল ব্রেকে ওই দুটো করে ম্যাচ, এতে কি হয়? আর ঠিক এই কারণেই, ইউরোপের ফুটবল খুঁজতে চায় একটা ভারসাম্য। খুঁজতে চায় একটা স্থায়িত্ব। যে স্থায়িত্বের খোঁজে ২০০৬ থেকে আজও জার্মানির কোচ থেকে যান জোয়াকিম লো। যে স্থায়িত্বের কারণে একজন ভিসেনতে দেল বস্কে স্পেনকে নিয়ে যান সাফল্যের শিখরে। এবং ঠিক সেই স্থায়িত্বের পদ্ধতি অনুসরণ করেই ফ্রান্সও আজ বিশ্ব-ফুটবলের শিখরে! একবার যদি ফ্রান্সের তেইশ জনের দলটির দিকে তাকিয়ে দেখা যায় তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে ফ্রান্সের এই স্কোয়াড থেকে খুব সহজেই একটি দ্বিতীয় দলও তৈরি করা যায়, যা হয়তো প্রথম দলের থেকে খুব একটা দুর্বল হবে না! এবং এটাও মাথায় রাখতে হবে যে ফ্রান্স এবার পায়েট, কোম্যান, লাকাজেট, মার্শাল এবং কোসসিয়েলনির মতো কিছু পরিচিত নামকে নিয়েই যায়নি বিশ্বকাপে। স্থায়িত্বের পাশাপাশি এই রিজার্ভ বেঞ্চের শক্তিই বা আর কটা দলের কাছে রয়েছে?

ইউরোপীয় ফুটবলকে এই চিরাচরিত স্থায়িত্বের পদ্ধতিই পথপ্রদর্শক হয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছে সোনালী ভবিষ্যতের দিকে!

গিজার খুফু পিরামিড – এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের তৈরি প্রাচীন সৌধ মানুষকেই কীভাবে বিস্মিত করেছে তার সবচাইতে বড় উদাহরণ মিশরের পিরামিড। মিশরীয় সভ্যতা যে হাজার হাজার বছর আগে উন্নতির আকাশ ছোঁয়া সিঁড়িতে পা রেখেছিল, পিরামিডের সামনে দাঁড়ানো আজকের দিনের পর্যটক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে হয়ত সেই কথাই ভাবে। পিরামিড নিয়ে বিস্ময় জন্ম দিয়েছে তাকে ঘিরে উপকথার, কল্পনার জাল বুনেছে মানুষ, গড়ে উঠেছে মিথ। কারণ, সত্যিটা কোথাও লিপিবদ্ধ করে রেখে যায়নি পিরামিড গড়ার উদ্যোগীরা। আর যদি করে গিয়েও থাকে - কালের করাল থাবা, সেই সংবাদ গ্রাস করেছে চিরতরে। তাই বিজ্ঞানী, ভূতাত্ত্বিক, স্থপতি, নৃতাত্ত্বিক, সবাই ভিড় করেছে পিরামিডের চারপাশে, তার রহস্য অনুসন্ধানে এগিয়ে এসেছে।

বালুকাস্তীর্ন প্রান্তরে একদা মিশরের সমৃদ্ধির সাক্ষী, সুউচ্চ সৌধ, পৃথিবীর অন্যতম এক আশ্চর্য হিসাবে স্বীকৃত - গিজার পিরামিড, যাকে গ্রেট পিরামিডও বলা হয়। পাশাপাশি আছে আর দুটি অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার পিরামিড। স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, মিশরীয়রা কেন বানিয়েছিল এই পিরামিডগুলো? বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত রাজা ও রানীদের সমাধি বানাবার উদ্দেশ্যে পিরামিড বানানো হয়। রাজারা নাকি পাতালের শয়তানকে ভয় পেত। তাই তারা মারা যাবার পর মাটি থেকে উঁচুতে, স্বর্গের কাছাকাছি থাকা বেশি পছন্দ করত। আশ্চর্যের বিষয় হল, মিশরের এই পিরামিড থেকে কোনও শবাধার বা মমি, এমনকি কোনও লিপি কিন্তু আবিষ্কার করা যায়নি। কারো মতে শস্য সংরক্ষণের জন্য এই বিশাল পিরামিড বানানো হত। কিন্তু শস্যের নামগন্ধ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কোনও পিরামিডে। তবে পিরামিডের ভিতরের স্থাপত্য কর্ম দেখে শস্য সংরক্ষণশালা বলে আদৌ মনে হয় না।

মিশরের ঐতিহাসিকদের গবেষণা অনুযায়ী, মিশর সম্রাট খুফুর শাসনকালে গ্রেট পিরামিড বানানো হয়। তাই এই পিরামিডকে খুফু পিরামিডও বলা হয়ে থাকে। আনুমানিক ৪৫০০ বছর আগে নীল নদ উপত্যকায় গড়া ওঠে গিজার গ্রেট পিরামিড। প্রাচীনকালের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম আশ্চর্য স্মারক এই পিরামিড, আজও পৃথিবীর বুকে টিঁকে আছে - বাকি আশ্চর্যগুলি বিলীন হয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে।

গ্রেট পিরামিডের পাশে আরও দুটি ছোট পিরামিড আছে, যাদের নাম হল কফ্রে ও মেঙ্কাউরে। সম্ভবত খুফুর দুই সন্তান এই দুটি পিরামিড নির্মাণ করে, যারা পরবর্তীকালে মিশরের রাজা হয়। কিন্তু পিরামিড তিনটি যে এই সম্রাটদের দ্বারা নির্মিত, তার সপক্ষে খুব জোরালো যুক্তি খুঁজে পাওয়া দায়। অনেকটাই যেন অনুমান সাপেক্ষ।

প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের চাই দিয়ে তৈরি খুফু পিরামিড ১৩ একর জমির উপর বিস্তৃত। ১৮৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার তৈরির আগে পর্যন্ত এটাই ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ ইমারত। এর উচ্চতা ৪৮১ ফুট। যে পাথর দিয়ে পিরামিড তৈরি হয়, বিভিন্ন মাপের সেই পাথরের ওজন ৫০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত। এত ভারী ওজনের পাথর কীভাবে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তা স্থপতিবিদদের কাছে আর এক বিস্ময়। পাথরগুলো খুব সম্ভবত বয়ে নিয়ে আসা হয় নীল নদ থেকে কাটা খাল পথে। কিন্তু এত বড় মাপের পাথর আজকের দিনের অত্যাধুনিক ক্রেন ব্যবহার করেও অত উঁচুতে তোলা প্রায় দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। কীভাবে প্রাচীন পৃথিবীতে সেসব সম্ভব হল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ এমন মতও প্রকাশ করেন, সেই সময়ে এই কাজে নাকি লক্ষাধিক মানুষের শ্রম ব্যবহার করা হয়, যারা ছিল রাজা কুফুর ক্রীতদাস। সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অবশ্য অন্য তথ্য তুলে ধরেছে। পিরামিডের আসেপাশে খনন কার্জ চালিয়ে প্রত্নতাত্মিকেরা বেশ কিছু ঘরবাড়ি ও মানুষের কঙ্কাল আবিষ্কার করেছেন। তাদের মতে, এই জায়গায় পিরামিডের কারিগরেরা বাস করত এবং তাদের জীবনের মান বেশ উন্নত ছিল। উদ্ধার করা কঙ্কাল পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে, তারা যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার দাবার খেত। তাই মিশরের রাজা কুফু যে পিরামিড তৈরি করার কাজে ক্রীতদাসদের লাগিয়েছিলেন এমন ধারণা ভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এবার পিরামিডের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখা যাক, কী কী বিস্ময় সেখানে অপেক্ষা করে আছে। প্রবেশ দ্বার পেরলে প্রথমেই একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গ দেখা যাবে। সুড়ঙ্গ পার হয়ে দুটি পথ পাওয়া যায়, একটি নিচের দিকে ও আর একটি উপরের দিকে। উপরের দিকের সুড়ঙ্গ পথ দুভাগে ভাগ হয়ে, একটি চলে গেছে ভূমির সমান্তরাল অলিন্দে - যার শেষ রানীর কক্ষে, আর একটি পথ উপরে উঠেছে, - যাকে বলা হয় গ্র্যান্ড গ্যালারি, এই গ্যালারির শেষে আছে রাজার কক্ষ। সম্ভবত রাজা ও রানীর মরদেহ সংরক্ষণের জন্য এই দুটি প্রকোষ্ঠ বানানো হয়। প্রবেশ পথ পেরিয়ে নিচের দিকের সুরঙ্গটি আর একটি কক্ষে শেষ হয়েছে, যেটি একটি অন্তভৌম কক্ষ। বাস্তুকারেদের মতে, সুড়ঙ্গ পথের এত নিখুঁত শ্রেণী বিন্যাস (alignment) আজকের আধুনিক স্থাপত্যেও বিরল।

দুই ধরণের পাথর দিয়ে গোটা পিরামিডটি তৈরি - গ্রানাইট ও চুনাপাথর বা লাইমস্টোন। পিরামিডের ভিত্তি স্থাপন হয় গ্রানাইট পাথরে, বাকি সৌধ তৈরি হয় চুনাপাথর দিয়ে। পিরামিড নির্মাণ করার পর এক ধরণের বিশেষ চুনাপাথর, যার নাম তুরা লাইম স্টোন, সেই পাথর দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয় পিরামিড। মসৃণ এই পাথরের রং সাদা হওয়ায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে দূর থেকে নয়নাভিরাম পিরামিড যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তুরা লাইম স্টোনের এই আবরণ খসে যায় দুবার ভূমিকম্প হওয়ায়। এখনো পিরামিড চুড়ায় তুরা লাইম স্টোনের অংশবিশেষ অবশিষ্ট, অনেকটা যেন টুপির মত আজও বর্তমান।

গিজার পিরামিড যে ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়নি, তার কারণ ছোট ও বড় আকারের পাথরের এলোমেলো ব্যবহার। স্থপতিবিদেরা জানিয়েছেন, এই ভাবে পাথর সাজানোয় যে কোনও বড় সৌধে গঠনের স্থায়িত্ব আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্রেস ডিস্ট্রিবিউশন’। ফলে এক জায়গায় স্ট্রেস আহরিত হয়ে প্রবল বলের ক্রিয়ায় সৌধ ভেঙে পড়ে না। ছেনির সাহায্যে বিভিন্ন আকারের পাথর কেটে, মসৃণ করে, একের পর এক সাজিয়ে, গড়ে তোলা হয়েছিল পিরামিড। দুই পাথরের সংযোগ স্থলে কোনও সিমেন্ট জাতীয় পদার্থ ব্যবাহার করা হয়নি। শুধু পাথরের ভরের সামঞ্জস্য ব্যবহার করে এই বিশাল স্থাপত্য কর্ম ভূমিকম্পের প্রকোপ থেকে বেঁচে গেছে, যদিও আশেপাশের সমস্ত বাড়ি ঘর ও অন্যান্য স্থাপত্যকর্ম ধসে গিয়ে মাটিতে মিলিয়ে গেছে চিরতরে।

ফরাসী স্থপতিবিদ জিন পিয়েরে হাউডিন, তার সুদীর্ঘ আট বছরের গবেষণার ভিত্তিতে পিরামিড বানানোর কৌশল সম্বন্ধে নতুন আলোকপাত করেছেন ২০০৭ সালে। কম্পিউটর সিমুলেশনের সাহায্যে তিনি দেখিয়েছেন, গিজার পিরামিড বানানো হয়েছিল ভিতর থেকে বাইরে - অর্থাৎ আগে ভিতরের অংশে পাথর সাজিয়ে, তারপর কাঠের লিভারের সাহায্যে ভারী

পাথর সাজানো হতো চক্রাকার প্যাঁচালো সিঁড়ি বানিয়ে। তাঁর গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গ্র্যান্ড গ্যালারি বানানোর উদ্দেশ্য ছিল চেন-পুলি ব্যবস্থা ব্যবহার করে, ৭০ থেকে ২০০ টন ওজনের ভারী পাথর টেনে তোলা। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, গ্রীক বিজ্ঞানী হিরোডেোটস ভারী বস্তু টেনে তোলার জন্য চেন – পুলি আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু অনেক পরে, খৃস্ট পূর্ব প্রথম শতাব্দীতে। মিশরিয় ইতিহাসবিদদের মত অনুযায়ী, পিরামিডের গঠন শৈলী পর্যবেক্ষণ করতে হিরোডোটস নাকি মিশর ভ্রমণ করেছিলেন। পিরামিডের শীর্ষে পাথরের মসৃণ ইরেজি অক্ষর ‘ভি’ এর আকৃতি নির্দেশ করে ফরাসী স্থপতি হাউডিন জানিয়েছেন, চেন-পুলি ব্যবস্থায় শক্ত দড়ি ব্যবহার করা হয় এবং ‘ভি’ আকৃতির খাঁজ ব্যবহৃত হয় দড়ির সুগম যাতায়াতের জন্য। পাথর তোলার জন্য ব্যবহার করা হয় কাঠের ট্রলি। গ্র্যান্ড গ্যালারির দুই পাশে পাথরের বেঞ্চ লক্ষ করে হাউডিন অনুমান করেছেন, এই বেঞ্চের উপর দিয়ে কাঠের ট্রলিতে ভারী পাথর চেন-পুলি ব্যাবস্থায় টেনে তোলা হয়। পিরামিডের বাইরে জমি খুঁড়ে এমন ট্রলি সদৃশ কাঠের খিলান পাওয়া গেছে - কায়রোর সংগ্রহশালায় যা যত্ন সহকারে সংগৃহীত।

গ্রেট পিরামিডের স্থাপত্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট বিশেষ ভাবে বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। (১) ছয় হাজার হেক্টর ভিত্তি প্রস্তর কীভাবে সমান্তরাল করা হয়েছিল, (২) ৫০০ মাইল দূর থেকে গ্রানাইট পাথর কেমন করে বয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল, (৩) রাজার কক্ষ ভূমির সাথে সমান্তরাল করতে কী ধরণের পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহৃত হয়, (৪) লোহা আবিষ্কার না হওয়ায় শুধু মাত্র পাথর ও তামার তৈরি ছেনি দিয়ে এত কম সময়ে পাথর মসৃণ করা গিয়েছিল কী করে? এই সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও পাওয়া যায় না। বিভিন্ন মতের সম্মুখীন হয়ে ঘুরে ফিরে যেন একই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়, এমন অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা হয়েছিল কোন প্রযুক্তিতে?

খুফু পিরামিডের প্রধান কক্ষ - যাকে রাজার কক্ষ বলা হয়, সেটি লাল গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি। এর দৈর্ঘ ৩৪ ফুট, প্রস্থ ১৭ ফুট ও উচ্চতা ১৯ ফুট। ১৫৩ ফুট লম্বা সুউচ্চ গ্র্যান্ড গ্যালারি পার হওয়ার পর জমির সমান্তরাল এক সুড়ঙ্গ নিয়ে যাবে রানীর কক্ষে। এটি রাজার কক্ষ থেকে দৈর্ঘে কিছুটা কম হলেও, প্রস্থ ও উচ্চতায় প্রায় সমান মাপের। প্রবেশ পথের ঢালু সুড়ঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে ভূমির ২০ ফুট নিচে অন্তভৌম কক্ষে। এর দৈর্ঘ কিন্তু রাজার কক্ষের চাইতেও বেশি। এই কক্ষ কেন তৈরি করা হয়, এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র খুফুই দিতে পারতেন, যদি তিনি আজও বেঁচে থাকতেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, রাজা খুফুর মরদেহ সংরক্ষণের জন্যই এই কক্ষটি বানিয়ে, পরে মত পাল্টে, উপরের দিকে পৃথক কক্ষ বানানো হয়। কেউ এমন মতও প্রকাশ করেছেন যে, এই কক্ষ শেষ কথা নয়, আরও নিচে হয়তো অন্য গুপ্ত কক্ষ আছে - যার সন্ধান অনেক অভিযান করেও পাওয়া যায়নি।

রাজা ও রানী কক্ষ থেকে বাতাস চলাচল করবার জন্য দুটি করে অতি সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। এই চারটি সুড়ঙ্গ এমন ভাবে তৈরি করা হয়, যাতে চারটি সুড়ঙ্গ দিয়ে কাল্পনিক রেখা টানলে আকাশের বিশেষ চারটি তারাকে সেই রেখা নির্দেশ করে। মিশরের স্থপতিরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়ে কতটা উন্নতি লাভ করেছিলেন, গিজার পিরামিডের স্থাপত্যের এই উদাহরণ দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।

এত সুবিশাল পিরামিডে মাত্র তিনটি কক্ষ? হতেই পারে না। তাই মিশর সরকার ১৯৬৬ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ ডক্টর লুই আল্ভারেজকে (১৯৬৮ সালে নোবেল বিজয়ী হন) দায়িত্ব দেয় এক্স-রে ব্যবহার করে গিজার গ্র্যান্ড পিরামিডের ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রকোষ্ঠ আবিষ্কারের করবার জন্য। কিন্তু এত বড় স্থাপত্য কর্মের এক্স-রে হবে কীভাবে? তাই আল্ভারেজ স্থির করলেন, সূর্যের আলোর পথে বর্ষিত হওয়া কসমিক পার্টিক্‌ল ব্যবহার করতে হবে। ব্যস, তিনি তার দলবল নিয়ে পিরামিডের ভিতর বসিয়ে দিলেন স্পার্ক চেম্বার, কাউন্টার, ওঅসিলোস্কোপ, আরও সব যন্ত্রপাতি। কণা পদার্থবিদ আল্ভারেজ জানতেন, সূর্য থেকে ক্রমাগত বর্ষিত কসমিক পারটিক্‌ল পিরামিডের দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে পরে। পিরামিডের ভিতর ফাঁকা জায়গা যদি থাকে তবে সেই দিক থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি কণা আসবার কথা। আর যদি নিরেট দেওয়াল হয়, তবে চারিদিক থেকে প্রতি মিনিটে একই সংখ্যার কণা আসবে। আল্ভারেজের গবেষণার জন্য হিউলেট প্যাকার্ড কোম্পানি দিল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি, আনুষঙ্গিক খরচা খরচ যোগাল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি, আই বি এম দিল আধুনিক কম্পিউটর। কিন্তু ফলাফল শূন্য - কসমিক পারটিক্‌ল প্রায় ধরাই পড়ল না। কারণ জানতে অন্য বিজ্ঞানীরা লেগে পড়লেন। জানা গেল, চুনা পাথরে উপস্থিত জলের কারণে কসমিক পারটিক্‌ল আটকে যায়। কাজেই আল্ভারেজের ব্যবহৃত পদ্ধতি গুপ্ত কক্ষ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।

এর আগেও পিরামিডের পাথর যে জলে সম্পৃক্ত - একথা বিজ্ঞানীদের শুধু নয়, সাধারণ দর্শনার্থীদেরও জানা ছিল। মিশরের বালুকা বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিডের বাইরেটা একেবারে শুকনো খটখটে। তাহলে পাথরে এত জল এল কোথা থেকে? কেউ বললেন, এর নিচে দিয়ে বয়ে গেছে অনেক গুপ্ত জলের খাল, আবার কেউ দোহাই দিলেন – স্বর্গীয় বন্যার। বাইবেলে লেখা আছে সেই বন্যার কথা, যার প্রভাবে সারা পৃথিবী হয়েছিল জলমগ্ন, নোয়া তার নৌকোয় তুলে নিয়েছিল সর্ব প্রকারের দুটি করে প্রাণী। কারো মতে পিরামিডের গায়ে যে আঁচড়ের দাগ দেখা যায়, সেটা দীর্ঘকাল জলের তলায় থাকার ফল। এই বিষয়ে সঠিক কোনও যুক্তিগ্রাহ্য বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি এখনো। তবে স্বর্গীয় বন্যা না হোক, নীল নদের বন্যার ফলে জলে দীর্ঘকাল জলে ডুবে থেকে চুনা পাথরের জলে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক ভূবিজ্ঞানীরও।

সাধারণত পিরামিডের চারটি পার্শ্বীয় তল (lateral faces) দেখা যায়। কিন্তু গিজার পিরামিডের আটটি পার্শ্বীয় তলের পিছনে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী মাথার চুল ছিঁড়ে চলেছেন। তবে গিজার পিরামিডের আকৃতির সাথে জ্যামিতিক পিরামিডের তফাত এইখানে, গিজার পিরামিডের নিম্নতল বর্গাকৃতি। এর চারটি পার্শ্বীয় তল চার দিশায় সারিবদ্ধ – অর্থাৎ চারটি তল সঠিক ভাবে উত্তর দক্ষিন পুর্ব পশ্চিমকে নির্দেশ করে।

১৯৪০ সালে আকাশপথে যেতে যেতে এক পাইলট পিরামিডের আটটি পার্শ্বীয় তলের সন্ধান পান। খালি চোখে, মাটিতে দাঁড়িয়ে পিরামিডের এই অতিরিক্ত তলের হদিস পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র বিষুবন বা ইকুইনক্সের (দিন ও রাত যখন সমান সমান হয়) সময় নিচে দাঁড়িয়েও খালি চোখে পিরামিডের আটটি পার্শ্বীয় তলের হদিস পাওয়া যায়, কারণ তখন সূর্যালোক সরাসরি পিরামিডে পড়বার জন্য, ছায়া সৃষ্টি হয়ে বিভ্রম ঘটায় না। খুফু পিরামিডের সঠিক দিশা-নির্দেশ কোন কৌশলে করা হয়েছিল, সে বিষয় বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে - কারণ, কম্পাসের আবিষ্কার কিন্তু এর অনেক পরে হয়েছে। তাহলে অনুমান করা যেতেই পারে, পিরামিড স্থপতিরা গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান গণনা করেই পিরামিড গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এত সঠিক মাপজোকের পিছনে তাদের কী উদ্দেশ্য ছিল, তা সঠিক ভাবে আজও জানা যায় না।

এবার দেখা যাক খুফু পিরামিডের ভিতরে অবস্থিত সুরঙ্গগুলির নির্মাণ বৈশিষ্ট কী কী। ভিত্তি বরাবর যে ঢালু সুরঙ্গটি নিচের দিকে নেমে গেছে, তার কৌণিক মাপ ২৬ ডিগ্রি - এতটুকু হেরফের নেই। আবার উপরের দিকে যে সুরঙ্গটি গ্র্যান্ড গ্যালারি বরাবর উঠে গেছে, সেটিও ২৬ ডিগ্রি কৌণিক মাপে বিন্যস্ত। এই সুরঙ্গগুলির মাপ এমনই যে দর্শনার্থীকে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হবে লম্বা পথ। মিশরীয় বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, চোরেদের নাস্তানাবুদ করতেই সুরঙ্গের গঠন এমন ভাবে করা হয়।

সম্প্রতি পদার্থবিদেরা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কারের দাবী করেছেন। এই বিজ্ঞানীরা প্রমান করবার চেষ্টা করেছেন - গিজার গ্রেট পিরামিড তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ অনুরণিত হয়ে এক জায়গায় একত্রিত করতে পারে। আশ্চর্য জনক ভাবে দেখা গেছে, বিশেষ তরঙ্গ দৈর্ঘের তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ একীভূত হয় রাজা ও রানীর কক্ষে। অন্য তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়ে যায়। তাহলে কী সূর্য শক্তির ব্যবহার করার বিশেষ কৌশল হস্তগত ছিল পিরামিড নির্মাতাদের? এর সপক্ষেও এখনো পর্যন্ত কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী, ভবিষ্যতের অনুসন্ধান গিজার পিরামিডের অনেক রহস্যই উদ্ঘাটিত করতে সক্ষম হবে।

সাড়ে চার হাজার বছর আগে মিশরের মানুষ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিল, একথা মানতে চান না অনেক বিশেষজ্ঞই। তারা এমন কথা বলেন যে, আজকের বিজ্ঞান পিরামিডের যে বিশেষ তাৎপর্য আবিষ্কার করেছে, তা নিতান্তই কাকতালীয়। অনেকে প্রমান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, অনেক কম লোকবলে, নিম্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এমন সৌধ তৈরি করা সম্ভব। আবার বিজ্ঞানীদের একদল বলেছেন, মাত্র দুই দশকে এই বিপুল পিরামিড গড়ে তুলতে হলে এমন প্রযুক্তি প্রয়োজন ছিল, যাতে দিনে বারো ঘণ্টা কাজের হিসেব ধরলে, প্রতি আড়াই মিনিটে একটি করে পাথরের চাঁই কেটে বসানো হয় - লোকবল ও উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া যা অসম্ভব।

কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই শুধুমাত্র নিজেদের শৌর্য বীর্য অমর করে রেখে যাবার জন্যই পিরামিড বানাতেন মিশরের রাজা ফারাওরা, একথা যারা পিরামিডকে সশরীরে চাক্ষুষ করেছেন, তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া অবশ্যই কষ্টকর। কল্পবিজ্ঞান ফ্যান্টাসিও গুজব ছড়িয়েছে পিরামিড ঘিরে। ভিন গ্রহের প্রাণী, অর্থাৎ এলিয়েনদের নাকি হাত ছিল পিরামিড তৈরির পিছনে - এমন মতও অনেকে প্রকাশ করেছে।

পিরামিড তৈরির পিছনে নির্মাতাদের কী উদ্দেশ্য ছিল সঠিক ভাবে জানা না গেলেও, কোনও এক বা একাধিক উদ্দেশ্য যে ছিল - সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিজ্ঞানীদের নিরলস সাধনা, খুফু পিরামিডের নির্মাণ শৈলীর অনেক বিচিত্র জটিল বিষয় আবিষ্কার করায়, ‘কাকতালীয় ভাবে পিরামিড তৈরি হয়েছিল’- এমন ধারণার অস্তিত্ব আধুনিক জগতে বিলীন করে দিয়েছে। বরং হদিস দিয়েছে উন্নততর এক মানব জীবনের।

তথ্যসূত্র :

1. The message of the sphinx - Graham Hancock & Robert Bauval, Three Rivers Press New York, 1996.

2. The Egypt Code - Robert Bauval, The Disinformation Company Ltd., 2008.

3. Electromagnetic properties of the Great Pyramid: First Multipole Resonances and Energy Concentration - Mikhail Balezin, Kseniia V. Baryshnikova, Polina Kapitanova, and Andrey B. Evlyukhin, Journal of Applied Physics 124, 034903 (2018)

আদি অস্ট্রাল জাতি ‘হো’ - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

আদি অস্ট্রাল জাতি ‘হো’
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতবর্ষের ইতিহাসে আদিবাসীদের এক উল্লেখযোগ্য স্থান আছে। প্রতিটি প্রদেশেই এদের দেখতে পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে প্রায় চারটিতেই আদিবাসীদের বসবাস লক্ষ্য করা যায়। সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাঁও, লেপচা, লোধা, খাড়িয়া প্রভৃতি আদিবাসীদের মতো হো আদিবাসীদেরও দেখা মেলে এই পশ্চিমবঙ্গে। যদিও তারা সংখ্যায় অতি নগণ্য। ১৯৭১ সালের আদমসুমারী অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে হো-দের জনসংখ্যা মাত্র ১০৩৬ জন। শোনা যায়, হো-দের আদিনিবাস ছিল ছোট নাগপুর অঞ্চলে। সিংভূমের ভুঁইয়াদের যুদ্ধে পরাজিত করে সেখানে বহুদিন তারা স্বাধীনভাবে বসবাস করে। পরে দীর্ঘ সংগ্রামের পর ইংরেজদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে।

প্রত্যেক আদিবাসী সমাজেই কিছু-না-কিছু লোককথা থাকে। হো-দের উৎপত্তি নিয়েও এরকম একটা গল্প আছে। হো-দের বিশ্বাস প্রকৃতির সবকিছু সৃষ্টির মূলে আছে তাদের দুই দেবতা— (১) অতে বড়াম (ভূমি দেবতা) এবং (২) সিংবোঙ্গা (সূর্যদেব)। পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন আনার জন্য এরা দু’জনে মিলে জীবজন্তু, গাছপালা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সৃষ্টি করেন। গুহাবাসী এই ছেলেটি ও মেয়েটি সিংবোঙ্গার কাছে এক সময় ‘ইলি’ অর্থাৎ ধেনো মদ তৈরি করতে শেখে। সেই মদ খেয়ে তাদের কামের উদ্রেক হয়। এরফলে বারোটি ছেলে ও বারোটি মেয়ের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে এরা জোড় বেঁধে ঘর-সংসার শুরু করে। এরাই হল হো-দের পূর্বপুরুষ।

আদি অস্ট্রাল জাতির মধ্যে হো-রাই দেখতে সুন্দর। ঐতিহাসিকদের মতে হো-দের সঙ্গে আর্য রক্তের সংমিশ্রণ ঘটেছে সব চেয়ে বেশি।

দু-তিনটি পাড়া নিয়ে হো-দের এক একটি গ্রাম তৈরি হয়। এই পাড়াগুলিকে বলা হয় টোলা। সাধারণত পাহাড়ের গায়ে কিংবা জঙ্গলের ধারে এদের গ্রামগুলি দেখা যায়। গ্রামের মাঝখানে থাকে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। একে বলা হয় আখড়া। জায়গাটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। দিনের শেষে সবাই গ্রামে ফিরে এলে এখানে বসে নাচ-গানের আসর। এছাড়াও গ্রামের কোনো আলোচনা সভা, বিচার সভা ইত্যাদিও এখানেই হয়। গ্রামের একদিকে থাকে জাহেরা বা দেবস্থান আর গ্রামের বাইরে থাকে প্রত্যেক গোত্রের জন্য আলাদা আলাদা সমাধিক্ষেত্র। এই সমাধিক্ষেত্রগুলিকে হো-দের ভাষায় বলা হয় ‘সমান’। হো-রা অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এদের সৌন্দর্যবোধও দেখার মতো। খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরগুলির দেওয়ালে নানারকম রঙ দিয়ে মেয়েরা সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকে। ছবির বিষয়বস্তু সাধারণত জীবজন্তু ও গাছপালা হয়। ঘরগুলি বেশ বড় হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা দু’কক্ষের— বড়োটি শোওয়ার ঘর এবং ছোটটি রান্না ঘর। এদের কাছে রান্না ঘরের গুরুত্বই সব চেয়ে বেশি। অন্য কোনো সম্প্রদায়ের লোক এই ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ এখানে থাকে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে পূজ্যদ্রব্য উৎসর্গ করার জন্য একটি মাটির বেদী। একে বলা হয় আদিং। এমনকী পরিবারের কোনো মেয়ের বিয়ে হয়ে অন্য পরিবারে চলে যাওয়ার পর তাকেও আর এই ঘরে প্রবেশ করতে বা বেদী স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না। ভুলক্রমে কেউ কখনো প্রবেশ করে ফেললে ওই ঘরের রান্নার সমস্ত সরঞ্জাম অপবিত্র হয়েছে মনে করে বাইরে ফেলে দেওয়া হয় এবং পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে একটি মুর্গী উৎসর্গ করে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়।

অরণ্যের সন্তান হলেও হো-রমণীরা গয়না পরতে খুব ভালোবাসে। সোনার গয়নার প্রতি আকর্ষণ থাকলেও অর্থনৈতিক কারণে রুপার গয়নার ব্যবহারই বেশি দেখা যায়। তুলনায় কাঁচের চুড়ির ব্যবহার অনেক কম। সেদিক থেকে হো-দের পোষাক-পরিচ্ছদ অত্যন্ত সাদাসিধা। ছেলেদের মোটা ধুতি আর মেয়েদের মোটা শাড়ী লজ্জা নিবারণের জন্য যথেষ্ট। শীতের হাত থেকে রক্ষা পেতে ব্যবহার করে একটি চাদর মাত্র। তবে কোনো কোনো পরিবারে আধুনিকতার স্পর্শ লক্ষ্য করা যায়।

বনসংরক্ষণ আইন এবং শিকারের অপ্রতুলতার জন্য হো-দের আদি উপজীবিকা পরিত্যাগ করে বর্তমানে কৃষিকাজকেই উপজীবিকা হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজস্ব জমি না থাকায় ক্ষেতমজুরি করে এদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। সিংভূম অঞ্চলে এক সময় স্বাধীনভাবে বসবাসকারি হো-রা আজ নিঃস্ব থেকে নিঃসম্বল। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আজ তারা দিনমজুর।

অন্যান্য আদিবাসীদের মতো হো-দের মধ্যেও ‘কিলি’ অর্থাৎ গোত্র বিভাগ দেখা যায়। প্রতিটি গোত্রের ধর্মীয় প্রতীক বা টোটেম আছে। গ্রাম থাকলেই গ্রাম প্রধান থাকে। হো সমাজে গ্রাম প্রধানকে বলা হয় মুণ্ডা। তিনিই গ্রামে উদ্ভুত কোনো সমস্যার সমাধান করেন এবং সৎপরামর্শ দেন। এরজন্য তিনি কোনো আর্থিক অনুদান পাননা ঠিকই তবে সমাজে বিশেষ মর্যাদা পেয়ে থাকেন। প্রত্যেক মুণ্ডারই একজন সাহায্যকারী থাকে। তাকে বলা হয় ডাকুয়া। অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে তৈরি হয় অঞ্চল। একে বলে পিড়। পিড়-এর প্রধানকে বলা হয় মানকি। পশ্চিমবঙ্গে হো-দের বসতি খুব কম হওয়ায় পিড় অথবা মানকি এখানে বিশেষ দেখা যায় না। তবে বিহার ও ছোটনাগপুরের হো-অধ্যুষিত অঞ্চলে এটা দেখা যায়।

হো-দের মধ্যে বাল্যবিবাহ এবং একই গোত্রে বিবাহের প্রচলন নেই। তবে এদের সমাজে চার ধরনের বিবাহ স্বীকৃত।

● আন্দি বিবাহঃ এই বিবাহে পাত্র-পাত্রী পছন্দ করার দায়িত্ব থাকে অভিভাবকের। এই ধরনের বিবাহ খুব ব্যয়বহুল। কারণ কন্যাপণ লাগে প্রচুর।

● অপর তাপি বিবাহঃ কোনো ছেলে জোর করে কোনো মেয়ের কপালে সিঁদুর লাগিয়ে দিলে মেয়েটিকে তার বৈধ স্ত্রী বলে গণ্য করা হয়। তবে বর্তমানে এ ধরনের বিবাহ সমাজে ভালো চোখে দেখা হয় না। তাই আগে থেকে ছেলেমেয়ের মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে এই বিবাহ আজকাল খুব একটা হয় না।

● রাজিখুশি বিবাহঃ ছেলে ও মেয়ে পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করলে তাকে বলে রাজিখুশি বিবাহ।

● আনাদের বিবাহঃ কোনো মেয়ে কোনো ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইলে (ছেলের মতামতের উপর নির্ভর না করে) সে একদিন গোধুলিলগ্নে স্বেচ্ছায় ভাবী শশুড় বাড়ি এসে উপস্থিত হয় এবং ভাবী শাশুড়ির কাছে তার মনের কথা ব্যক্ত করে। মেয়েটির প্রস্তাব ছেলের মা প্রথমে মেনে নিতে পারে না। তাই সে মেয়েটির উপর শুরু করে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন। এই পীড়ন সহ্য করে মেয়েটি যদি ভাবী শশুড় বাড়িতে থেকে যেতে পারে তখন গ্রামের অন্যান্যদের মধ্যস্থতায় মেয়েটিকে পুত্রবধু হিসেবে সেই পরিবারে ঠাঁই দেওয়া হয়।

এই চার ধরনের বিবাহের মধ্যে আন্দি বিবাহের সামাজিক মর্যাদা সব থেকে বেশি। তাই এই বিবাহে আনন্দ উৎসবও হয় খুব ধুমধাম করে। স্ত্রী-আচার থেকে আরম্ভ করে পাড়া-পড়শিদের নিয়ে নাচগান, খানাপিনা সবকিছুরই ব্যবস্থা থাকে পাত্রের বাড়িতে। বিবাহের দিনক্ষণ ঠিক হলে বরযাত্রী সহ বর কনে বাড়িতে যায়। সঙ্গে থাকে গ্রামের পুরোহিত অর্থাৎ দিউরি। বর-বধুর কল্যাণ কামনায় দিউরি সিংবোঙ্গার নামে মন্ত্রপাঠ করে। সেদিন কনে বাড়িতেও থাকে বরযাত্রী এবং আমন্ত্রিতদের জন্য সাধ্যমতো আপ্যায়নের ব্যবস্থা।

হো সমাজে পিতার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় একমাত্র ছেলেরা। অথচ হো-পরিবারে কেউ মারা গেলে মৃতদেহ সৎকারে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে পরিবারের মেয়েরা। মৃতদেহ দাহ করাই এই সমাজের প্রচলিত রীতি। শ্মশানে চিতায় প্রথম অগ্নি সংযোগের অধিকারিণী হল মৃতার স্ত্রী, অবিবাহিত কন্যা অথবা বোন। দাহ শেষে জল দিয়ে চিতা নিভিয়ে মৃত ব্যক্তিটির অস্থি সংগ্রহ করা হয়। এরপরে সেটি একটি মাটির পাত্রে রেখে পরিবারের সসানে পুঁতে দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় জাঙ তোপা। এই অনুষ্ঠানে একমাত্র পরিবারের লোকেরাই উপস্থিত থাকে। জাঙ তোপা অনুষ্ঠান শেষে এই মৃত ব্যক্তির আত্মাকে ঘরে নির্মিত মাটির বেদীতে অধিষ্ঠানের জন্য তারা বেদীর সামনে এসে পূর্বপুরুষদের কাছে অনুরোধ করে। এরপর থেকে এই নতুন অধিষ্ঠিত আত্মাকেও পূজ্যদ্রব্য উৎসর্গ করা হয়।

হো-দের বিশ্বাস প্রকৃতির মধ্যেই দেবদেবীর অস্তিত্ব আছে। তাই তাদের দেবদেবীর সংখ্যাও কম নয়। এদের মধ্যে অবশ্যই সিংবোঙ্গা প্রধান দেবতা। অন্যান্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—

● মারাং বোঙ্গা বা বুরু বোঙ্গা— পাহাড়-পর্বতের দেবতা। অনাবৃষ্টি হলে পূজা করা হয়।

● নাগে এরা— ছোট জলাশয় ও ঝরণার দেবী।

● পাউড়ি চুরদু বোঙ্গা—গভীর জলাশয়ের দেবতা।

● বাগিয়া বোঙ্গা— জঙ্গলের দেবতা। বন্য জীবজন্তুদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

● ইকির বোঙ্গা— নদীর দেবতা।

● সাঙ্গার বোঙ্গা— শিকারের দেবতা।

● সনা চুরদু বোঙ্গা— ধনদৌলতের দেবতা।

এছাড়াও আছেন জিদ বোঙ্গা, কুমবু বোঙ্গা, ডাটা বোঙ্গা, হাংকার বোঙ্গা ইত্যাদি।

ভুতের ভয় এদের ভীষণ। বিশেষ করে যুগিনী ভুতকে। গ্রামে কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হলে সে যুগিনী ভুত হয়, এমনই এদের বিশ্বাস। তাই তারা তুক্‌তাক্‌ এবং যাদুমন্ত্রে বিশ্বাসী।

বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো হো সমাজে সারা বছর ধরেই উৎসব-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ লেগেই থাকে। এই সব উৎসবের সিংহভাগটাই অবশ্য চাষবাসকে কেন্দ্র করে। তাই পৌষ সংক্রান্তিতে হয় এদের পৌষ পরব। মাঘ মাসে অর্থাৎ, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে হয় মাঘ পরব। দুষ্ট অশরীরী শক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এরা এই সময় সিংবোঙ্গার উদ্দেশ্যে পূজা দেয়। এটাই এদের সব থেকে বড়ো পরব এবং চলে পাঁচদিন ধরে। মার্চ-এপ্রিল মাস। ফাগুন লেগেছে বনে বনে। বসন্তের ছোঁয়ায় শাল-সেগুনে লেগেছে শিহরণ। সমস্ত শালবন ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। আকাশ বাতাস ভরে গেছে মহুয়ার গন্ধে। ভোরের শিশিরবিন্দুর সঙ্গে মিলেমিশে ছড়িয়ে আছে অজস্র মহুয়া ফুল মহুয়া গাছের গোড়ায়। ফুলের অলংকারে প্রকৃতির অপরূপ সাজ দেখে বনবাসী হো-রা আর নিজেদের সামলে রাখতে পারে না। তারাও মেতে ওঠে উৎসবে। এই উৎসবের নাম বাহা পরব। ‘বাহা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ফুল। আদিবাসী হো-দের কাছে এই ফুলই হল বসন্তোৎসবের প্রধান অঙ্গ। তাই মেয়েরা খোঁপায় গোঁজে শাল ফুল আর সংগ্রহ করে মহুয়া। ধান গাছে নতুন শীষ এলে তাতে যাতে পোঁকা না লাগে তার জন্য এরা পালন করে বাতাউলি উৎসব। ধান ঝাড়াই করে শস্য ঘরে উঠলে কোলোম-বোঙ্গা-উরা উৎসবে এরা মেতে ওঠে। নাচ গানই এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ। ‘জম-নামা’ উৎসব পালিত হয় আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে। এটা অনেকটা আমাদের নবান্ন উৎসবের মতো।

পশ্চিমবঙ্গে কোনো গ্রামেই এখনার সম্পূর্ণ হো বসতি দেখা যায় না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হো পরিবারগুলি ধীরে ধীরে কবে যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তার খবরও হয়তো কেউ পাবে না। এদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু সরকারি স্তরে নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন আছে।

তথ্য সূত্রঃ

১) পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ (প্রথম খণ্ড), ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে; পরিবেশকঃ সুবর্ণ রেখা, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা।

২) অসামান্য মানভূম, তপন কর; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা- ৯।

৩) ভারতের আদিবাসী, সুবোধ ঘোষ; ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোং লিঃ, ৮সি রমাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা।

৪) আদিবাসী ইতিবৃত্ত, উন্নয়ন; ৩৬/১ গরচা রোড, কলিকাতা – ৭০০০১৯।

৫) The Tribes and castes of Bengal, H.H.Risloy

৬) Tribal Life in India, Nirmal Kumar Bose; National Book Trust, India, NewDelhi.

ইউ ক্যান বাট ইউ মে নট - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

রবিঠাকুরের একটা ইন্টারেস্টিং ছড়া আছে—“পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী।” এ ছড়াটা কিন্তু আমাদের আজকের সাহিত্যের আঙিনাতে সমানভাবে খেটে যায়। সাহিত্যের ভুবনে তিন শরিকের মালিকানা। একপক্ষে রয়েছেন প্রজাপতি ব্রহ্মা উর্ফ সাহিত্যস্রষ্টা। দ্বিতীয়জন বিষ্ণু—সাহিত্যের ধাত্রীদেবতা, এনার নাম প্রকাশক। আর তৃতীয়জন স্বয়ং দেবাদিদেব, রাখলে রাখবেন, মারলে মারবেন—সাহিত্যের মহাদেব—ইনি হলেন সমালোচক।

তা লেখক, প্রকাশক আর সমালোচক এই তিনে মিলে দিব্যি তো চালাচ্ছেন সাহিত্যের সৃজনপালনের দুনিয়াটি। প্রত্যেকেই ভাবেন ও দাবী করেন তিনিই মালিক, তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সাহিত্যরচনার পুরাো দুনিয়া। ওদিকে, অন্তর্যামী পাঠক আড়ালে বসে হাসেন। আসল কথা হল, সাহিত্যের দুনিয়ায় তিনিই হলেন গিয়ে পরমাত্মা। তার কৃপাদৃষ্টিতে পড়বার জন্যে অন্য তিন জীবাত্মার যত দৌড়োদৌড়ি।

জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ অভিঘাতে মানুষের কল্পনায় যে কথকতার নিয়ত সৃজন হয়ে চলে তারই খানিকটা কখনও কখনও লিখিত চেহারায় অন্যের বোধগম্য দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়। তাকেই সাহিত্য বলি। এই সৃষ্টি জীবনের সঙ্গে সঙ্গে চলে, এরই দর্পনে বিম্বিত হয় জীবন। দর্পনটি যেমনই হোক, জীবনের ছায়া তাতে পড়বেই, তা সে ছায়া ভাঙাচোরাই হোক অথবা সোজা সরলই হোক। কাজেকাজেই কোন এক বিশেষ কালখণ্ডের মানদণ্ডের নিরিখে উত্তম বা অধম যা-ই বিবেচিত হোক না কেন, বোধগম্য দুনিয়ায় প্রকাশিত জীবন আশ্লিষ্ট যে কোনও কথকতাকে সাহিত্য এই নামটি দিতেই হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ‘সাহিত্য’ শব্দটা বিশেষণ নয়। বিশেষ্যমাত্র—যদিচ প্রতিটি দেশকালেই সমকালীন উন্নাসিক স্রষ্টা ও সমালোচকরা এই তকমাটাকে তাঁদের পছন্দসই সৃষ্টিগুলির গায়ে বিশেষণরূপে ব্যবহার করেছেন ও তাঁদের অপছন্দের (অর্থাৎ তাঁদের মতে নিম্নস্তরের) কোনও লেখাকে এই মর্যাদা কেউ দিতে গেলে শিং বাগিয়ে তেড়ে এসেছেন।

লেখক যখন লেখেন, তখন তাঁর সচেতন নীতিবোধ ও বেঁচেবর্তে থাকবার জন্য প্রয়োজনীয় দোকানদারী যুক্তিবোধ তার কলমটাকে পাকড়ে ধরে বসে থাকে না (যাঁদের থাকে, তারা লেখক হন না। এ হল লেখকের দুনিয়ায় প্রকৃতিদেবীর NATURAL SELECTION)। ফলত যে কোনও লেখাই কিছু কিছু বিষয়ে আশ্চর্যরকম নীরব ও কিছু কিছু ব্যাপারে বৈপরিত্যযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠে—এবং সেটা ঘটে লেখকের অজান্তেই। লেখক সচেতনভাবে যে কথাগুলো বলছেন, তা তাঁর নিজের একক বা সমষ্টিগত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তাঁর লেখার মধ্যে যে দিকগুলো অকথিত থেকে যাচ্ছে, হয়তা বা তাঁর অজান্তেই, তা কিন্তু, যে সময়খণ্ডে এবং যে আর্থসামাজিক শ্রেণীতে তিনি অবস্থান করেন, তার গোষ্ঠীগত রুচি, প্রয়োজনবোধ, অচেতনতা কিংবা অননুধাবনতার ফসল। অতএব, কথাসাহিত্যিকের কোনও সৃষ্টি যদি একটা কোনও বিশেষ রঙ-য়ে (যথা হলুদ মলাটের রঙ, কিংবা বিপ্লবের অরুণাভা) তার পরিবেশিত জীবনবোধকে রঞ্জিত করে, অথচ জীবনের বাকি বর্ণগন্ধগুলির সম্পর্কে স্বল্পবাক কিংবা নীরব থেকে যায়, তবে তা তাঁর সেই গোষ্ঠীগত অচেতনতার ফল, লেখকের ব্যক্তিগত নৈতিক দায়বদ্ধতা তাতে নেই।

লেখক তাঁর বাস্তবকে গড়ে তোলেন, যে দৃষ্টিবিন্দু থেকে তিনি বিষয়টিকে দেখছেন তার ওপর নির্ভর করে। তার অবস্থান বা দৃষ্টিবিন্দু তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কাল ও সমাজের বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে তাঁর স্থানাংকই নির্ধারণ করে দেয় তার দৃষ্টিবিন্দুকে। তার ফলে, চোখের একেবারে সামনে থাকা ক্লেদখণ্ডকে যদি অনেক দূরে দাড়ানো বিরাট বিষ্ণুমূর্তির চেয়ে তিনি বড় করে দেখেন ও দেখান (কিম্বা, ধরুন, দুটি মানুষের সম্পর্কের মধ্যে তিনি শারীরিক আমোদটাকেই বড় করে দেখলেন, কিন্তু চরিত্রগুলোর সামাজিক অবস্থান, তাদের সম্পর্কের ও ঘটনাপরম্পরার বাস্তবতা/ অবাস্তবতাগুলো গৌণ অথবা নিরুচ্চার রয়ে গেল), তাতে তাঁর সচেতন দায়বদ্ধতা নেই।

লেখকের লেখায় ‘অপ্রয়োজনীয়’ বৈপরিত্য, বাস্তব থেকে ‘নাহক’ প্রস্থান, ‘অনাবশ্যক’ চিৎকার অথবা নীরবতাগুলো খুঁজে বার করবার দায়িত্ব পালন করে থাকেন অভিজ্ঞ ও বিদগ্ধ সমালোচক। জীবন বা সমাজের নানাবিধ স্থানকালসাপেক্ষ সত্যগুলোকে ধ্রুব বলে ধরে নিয়ে তার থেকে কোনও লেখায় কতদূর বিচ্যুতি ঘটল সেইটি মেপে নিয়ে তাঁরা সাহিত্যের মূল্যায়ন করেন। এই সত্যগুলির ধ্রুবত্ব বা চিরন্তনত্বের নিরুপণও হয়ত তাঁরা করে থাকেন, কিন্তু, কিছু মহান ব্যতিক্রম ভিন্ন তা-ও সাধারণত ঘটে কোনও এক বিশেষ যুগে বিশেষ এক নরগোষ্ঠীর মূল্যবোধের নিরিখে। অতএব, দেশকালগত অবস্থান বদলালেই আকাশের ‘ধ্রুবতারা’টার মতই এই ধ্রুব সত্যগুলোও বদলে যায়। কালকের নিন্দিত সাহিত্য আজকের নন্দিত সাহিত্যের মর্যাদা পায়, অথবা তার উল্টোটা। যেমন ধরুন, ৭৪ বছর আগে, শনিবারের চিঠির ১৯৪৪ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যাতে ‘সংবাদ সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধে সমালোচনা বার হয়েছিল এইরকম—

“কবি জীবনানন্দ (জীবানন্দ নহে) দাশকে আর ঠেকাইয়া রাখা গেল না; রসের যে তুরীয় লোকে তিনি উত্তরোত্তর উত্তীর্ণ হইতেছেন বুদ্ধদেব বসু অথবা সমর সেনের প্রশংসা সেখানে আর পৌঁছিবে না। জলসিড়ি নদীর ধারে যেখানে ধানসিড়ি খেত তাহারই পাশে জাম-হিজলের বনে তাঁহার মন এতকাল পড়িয়া ছিল; নাটোরের বনলতা সেন সেখান হইতে তাঁহাকে উদ্ধার করিয়া কাঁচাগোল্লা খাওয়াইয়া অনেকটা দুরস্ত করিয়া আনিয়াছিলেন। কিন্তু

কতক্ষণ থাকে শিলা শূন্যেতে মারিলে।

কতক্ষণ জলের তিলক রহে ভালে।।

—জাল ছিঁড়িয়া তিনি আবার ভাগিয়াছেন—চিতাবাঘিনীর ঘ্রাণে ব্যাকুল ঘাইহরিণীর মত। আর তাঁহাকে ফিরিয়া পাওয়া যাইবে না।”

অথবা তার সেই অসাধারণ পংক্তিগুলি—

আকাশের আড়ালে আকাশে

মৃত্তিকার মত তুমি আজ

তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।

হৈমন্তিকী,

তোমার হৃদয়ে আজ ঘাস।

এ সম্বন্ধে ‘শনিবারের চিঠি’র সমালোচকের উক্তি—

“প্রেয়সীকে আমরা এতদিন হৃদয়ে লইতাম—ভালোবাসিতাম। এইবার প্রেয়সীর হৃদয়ে চরিবার দিন আসিল। একসঙ্গে দেহের আহার ও মনের ওষুধ—এ সম্ভাবনার কথা কে কল্পনা করিতে পারিয়াছিল?”

আবার এর মাত্রই বত্রিশ বছর পরে ১৩৭৬-এ ‘কবি জীবনানন্দ দাশ’ বইতে কোন এক প্রসঙ্গে দেখি সঞ্জয় ভট্টাচার্য বলছেন, “চল্লিশের দশকে বিপ্লব বিশ্বাসী কবিদের হট্টগোলে নির্জনতার সাধক জীবনানন্দ ভবিষ্যতের সুস্থ মানব-সমাজের পথেই চলেছেন কবিতার ভিন্ন আলো জ্বেলো।”

একই সমাজ, একই কবি, অথচ মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে তার ভিন্নধর্মী কাব্যসৃষ্টির প্রতি সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গীর কী আকাশ পাতাল ভেদ!

এহেন তরলচরিত্রতা সত্ত্বেও একজন যোগ্য সমালোচক কিন্তু তাঁর নিজস্ব স্থান-কালে একটি বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেন। কোন নির্দিষ্ট স্থান-কালে সৃষ্ট একটি সাহিত্য, তার সমালোচনা হচ্ছে যে সময়ে তার সমকালীন মূল্যবোধের নিরিখে কতটা প্রয়োজনীয় বা গ্রহণযোগ্য, অথবা সেই বিশেষ স্থান-কাল খণ্ডের জন্য কী প্রকার সাহিত্য উপযোগী হতে পারে সেই মূল্যায়নটি ঘটে বিদগ্ধ সমালোচকের কলমে। নিরপেক্ষতা, গভীর ও ব্যপ্ত পড়াশোনা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে মেগালোম্যানিয়ার অনুপস্থিতি, এই তিনটে গুণ তাঁর সমালোচকের চেয়ার অলঙ্কৃত করবার তিনটে প্রধান যোগ্যতা।

তবে এ-প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, সে মূল্যায়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশ-কাল নিরপেক্ষ নয়। ফলস্বরূপ যেকোন একটা সাহিত্য যথেষ্টপরিমাণ সৃষ্টিধর্মীতার স্বাক্ষর বহন করলে, সমালোচকের হাজার মৃত্যুদণ্ডদানেও তা আউটডেটেড হয়ে যায় না। তার পক্ষে অনুপযুক্ত সময়ে তা হয়ত বিস্মৃতির গহ্বরে বিশ্রাম নিতে যায়, তবে উপযুক্ত সময় এলেই ফের তা শীতঘুম ভেঙে জেগে উঠে বের হয়ে আসে সেই গহ্বরের থেকে। অন্যদিকে, সমালোচনা কালনির্ভর। এক সময়বন্ধনীর সমালোচনা অন্য সময়বন্ধনীতে এসে প্রায়শই আউটডেটেড ও ফলত নিষ্প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

পেশাদার সমালোচকের এক্তিয়ার তাই অনেকটা অন্যের বাজারের নীরিখে সম্পত্তির মূল্যায়ন করে সম্মান দক্ষিণ প্রাপক ভ্যালুয়ারের মত। সমসময়ের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে একটি সাহিত্যকীর্তির মূল্যায়ন করেই তার কাজ শেষ। এর বাইরে সেই সম্পত্তির হত্যা বা ভোগদখল করার অধিকার তাঁর নেই।

এ-তো গেল মসীজিবি বেচারা সমলোচকপ্রবরের কথা। খবরের কাগজের কিংবা সাহিত্যপত্রিকার এক কোণে তাঁদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর টিমটিম করে জলে টলি কিংবা বলিউডের পাত্রপাত্রীসম্বাদের বৃহদোজ্জ্বল ব্লো-আপের পাশে।

প্রকাশকের অবস্থান আবার আরেকরকম। তিনি ধাত্রীর কাজটা করেন। যে কোন সাহিত্যই অপরিচয়ের অন্ধকার থেকে পরিচিতির জগতে ভূমিষ্ট হয় তারই হাত ধরে। অনেক যত্নে অনেক সাবধানতায় এই কাজটি সারতে হয় তাকে। তারপর অর্থমূল্যটি গুণে নিয়ে মঞ্চ থেকে তার প্রস্থান। সাহিত্যকর্মটির খ্যাতি বা অখ্যাতি সেই দুয়েরই পরোক্ষ ভাগীদার তিনি থাকলেও জনমানসে তিনি বইয়ের নীচে এক লাইনে লেখা প্রকশনার নাম ও লোগোটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাহিত্যপ্রেমী পাঠক সেটিকে অবহেলায় উপেক্ষা করে ডুব দেয় সাহিত্যকীর্তিটির মধ্যেই। সেটাই স্বাভাবিক। নতুন প্রেমিকটি কি তার প্রেমিকাকে কখনো তার ধাত্রীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করবে?

উদাহরণস্বরূপ বলি, বিভূতিভূষণকে আমরা কে না জানি, কিন্তু তার সর্বজনপরিচিত প্রথম বড়মাপের উপন্যাস পথের পাঁচালী প্রথম প্রকাশ করেছিলেন কে এবং কোন পত্রিকায় সেই নামদুটো, গুটিকয় সাহিত্যের শিক্ষক, ছাত্র কিংবা অতি উৎসাহী সাহিত্যপ্রেমী ছাড়া ক’জন মনে রেখেছেন? না রাখাটা দোষার্হ নয়। সেটাই স্বাভাবিক। সুনীল গাভাসকার, উত্তমকুমারদের বুড়ি ধাইদের আর কে কবে কোথায় মনে করে রেখেছে?

সাহিত্যস্বর্গের এই ত্রিদেব—-লেখক, প্রকাশক ও সমালোচক, এই তিনজনকে ছেড়ে এবারে আসা যাক সাহিত্যের পরমাত্মা পাঠকের কথায়। ইনি সর্বভূতে বিরজমান। লেখক, প্রকাশক বা বিদগ্ধ সমালোচক হতে পারেন কেবল মুষ্টিমেয় মানুষ। তার জন্য হয় ঈশ্বরদত্ত, পিতৃদত্ত বা স্বোপার্জিত অর্থ এবং/অথবা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ মেধার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, পাঠক হতে পারেন আপামর শিক্ষিত জনসাধারণ। খুব বেশি অর্থ অথবা মেধার প্রয়োজন এখানে তত নেই। আর এই ওমনিপ্রেজেন্ট পাঠককে উদ্দেশ্য করেই লেখকের লেখা, তাঁর জন্যই প্রকাশকের প্রকাশনা, সমালোচকের সমালোচনা। তাঁর দরবারে হাত পেতে দাঁড়ান এঁরা সকলেই। কেউ হন যশোপ্রার্থী, কারো চাহিদা রুজিরটি, কারো বা আবার দুটোই চাই।

তবে কিনা প্রশ্ন হল কোন মানুষ পড়তে জানলেই তিনি যেকোনো সাহিত্যকীর্তির পাঠক পদবাচ্য হবেন কি? নতুন ইংরিজি শেখা এক ভদ্রলোক লর্ডসে খেলা দেখতে গিয়ে কম্পটন স্ট্যাণ্ডে বসেছেন। সেখান থেকে পাশেই ইনভেস্টেক মিডিয়া সেন্টারের দিকে চোখ পড়তে ইচ্ছে গেল ওইখানটাতে সুন্দর ফাঁকাফাঁকায় গিয়ে বসলে কেমন হয়? পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মীকে ডেকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ক্যান আই গো অ্যাণ্ড সিট দেয়ার? উত্তরে বৃটিশ নিরাপত্তাকর্মী মুচকে হেসে জবাব দিলে, ইয়েস স্যার ইউ ক্যান বাট ইউ মে নট।

পাঠকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তাই। সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই একটা লেখা কিনে ফেলে বা ইনটারনেট থেকে ডাউনলোড করে নেবার পর, ‘ইউ ক্যান’। কিন্তু আপনার জ্ঞান ও রুচির পরিসীমা অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘ইউ মে নট’। কাগজের বা পর্দার গায়ে অক্ষরগুলো হয়ত প্রত্যেকেই পড়তে পারেন, যেমন পারেন পয়সা থাকলে যেকোনো ক্রিকেটের মাঠে ঢুকতে, একটি টিকিট কেটে। কিন্তু সেটি পারলেও মাঠে ও পাঠে প্রত্যেকেরই কিছু আঙিনা নির্দিষ্ট থাকে। ক্রীড়ারসিকের ক্ষেত্রে টিকিটের চরিত্র বা পাঠকের ক্ষেত্রে তার জ্ঞানের ক্ষেত্র, গভীরতা ও বিস্তারের মাপ অনুযায়ী তাঁর সেখানে আসন মেলে। যেমন ধরুন এই অধম যদি পয়সা দিয়ে থিওরি অব রিলেটিভিটির মূল বইটা কিনেও ফেলেন তাহলেও তার সেটি পড়বার অধিকার জন্মায় কি? আর পড়লেও তারপর সমালোচকের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে, “কী ফালতু বই। একেবারে দুর্বোধ্য। এসব লোক কেন যে লিখতে আসে!” এমন মন্তব্য ঘোষণার অধিকার জন্মায় কি? এবং তা করলে নিজেকে কিঞ্চিৎ উপহাস্পদ করা ছাড়া আর কিছুই লাভ হবে না।

তবে হ্যাঁ, উপহাস্পদ হবার ঝুঁকি নিয়েও, নিজের পাঠসীমার বাইরের কোনো লেখা পড়ে মতামত জানানোটা পাঠকের অধিকারের মধ্যে পড়ে বইকি। ইন্ডাস্ট্রিটাই তো চলছে তাঁর পয়সায়। যেমন তাঁর অধিকার রয়েছে কিনে আনা একটা লেখা পড়ে তাতে ভুল তথ্য থাকলে তা ধরিয়ে দেবার, বা ভাল না লাগলে সেটা জানাবার। কিন্তু, পয়সা খরচ করে (বা না করে) একটা লেখা পড়বার পর যেটা তাঁর অধিকারের মধ্যে পড়ে না তা হল তাকে গলা টিপে মারবার জন্য সংঘবদ্ধ ‘পবিত্র যুদ্ধ’ শুরু করা। যেটা সদ্যই ঘটে গেল এস হরিশের মালয়ালাম উপন্যাস ‘মিশা’ নিয়ে।

একটা রসালো উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন গিয়ে আদিরসের সাহিত্য। কামসূত্র। লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার। রাতভোর বৃষ্টি। প্রজাপতি। কামসূত্র অন্যকালের কাজ। সে-সময় রানি ভিক্টোরিয়ার মূল্যবোধের ভাইরাস পাঠকের রক্তে ঢোকেনি। কিন্তু অন্যগুলো প্রকাশিত হতে পাঠককূলের একটি অংশ তো সোচ্চার হয়ে তারস্বরে গর্জন জুড়েছিলেন। তাঁদের নীতিবোধ এই সাহিত্যগুলো স্থান দিতে চেয়েছিল সাধারণের পাঠযোগ্যতার সীমার বাইরে। এই প্রতিবাদী দল ক্ষমতাশালী ছিলেন সমাজে। ফলস্বরূপ জনগণেশের নেতৃকূলের তর্জনে বইগুলোকে সরকারী নির্দেশে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল।

একদিক থেকে দেখলে, তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবাদীরা একেবারে ঠিক ছিলেন। তার কারণ এই নয় যে সাহিত্যকীর্তিগুলো একেবারেই সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী। তার কারণ, যাঁরা সোচ্চার হয়েছিলেন, সাহিত্যপাঠের অঙ্গনে তাঁদের টিকেট ওই সাহিত্যের গ্যালারির জন্য নয়।

কিন্তু সমস্যাটা এই প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়াটা না। সমস্যা হল তার কণ্ঠরোধ করবার চেষ্টা। যেমন অশ্লীলতার দায়ে লেডি চ্যাটার্লি কিংবা লোলিটাকে ব্যান করানো, কিংবা একেবারে ঘটমান বর্তমানে এস হরিশের মালয়ালাম উপন্যাস ‘মিশা’কে ব্যান করবার চেষ্টা (যে চেষ্টাকে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি একটা অসামান্য রায় ব্যর্থ করে দিয়েছেন)।

হ্যাঁ। কোনো পাঠকের কাছে কোনো সাহিত্য নিম্নমানের বা নিম্নরুচির অথবা তা অন্য যেকোনো সামাজিক/রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক/আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক মনে হলে তার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ জানাবার অধিকার আছে। অধিকার আছে তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে তা দেখিয়ে দেবার। কিন্তু যাকে কুরুচিকর বা ক্ষতিকর বা অপটু সাহিত্য বলে পাঠকের কোনো শ্রেণী মনে করছেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হোক যাকে আপনারা সৎ সাহিত্য বলে মনে করেন তার সৃজন করে, তারপর এই দুই ধরণের সাহিত্যকে খোলা ময়দানে লড়তে দিয়ে। ও বাড়ির রাখালটা পাজির পা’ঝাড়া বলে তার গলা টিপে মেরে ফেলে ভালো ছেলে গোপালকে দিয়ে তাকে ‘প্রতিস্থাপন’ করবার অধিকারটা গোপালের সমর্থকদের দিল কে? রাখালের সমালোচনা করুন, কিন্তু তাকেও বেঁচে থাকবার ও বেড়ে ওঠবার অধিকার দিন। দেখা যাবে, হয় তো পরবর্তী কোনও এক সময়ে সে একজন কেউকেটা হবে! আমরা বরং আমাদের গোপালকেই মনযোগ দিয়ে মানুষের মত মানুষ করবার চেষ্টা করে যাই। রাখালের সাথে লড়াইতে গোপাল যদি হেরে যায় তবে তাকে রাখালের বদমায়েশি হিসেবে না দেখে বরং গোপালের দুর্বলতা হিসেবে দেখা যাক ও তাকে সবল করে গড়ে তোলবার চেষ্টা করা যাক। তাতে সবার মঙ্গল।

সত্যি বলতে কী, একটা প্রশ্ন জাগে মনে সবসময়। সুস্থ সংস্কৃতি বা সৎ সাহিত্যের চিরায়ত পথটা কী? সংস্কৃতিতে চিরায়ত বলে কিছু হয় কি? দেশকালনিরপেক্ষ চিরায়ত সত্য জীবনে পাওয়া দুষ্কর, অতএব সাহিত্যেও তা মিলবে না। কারণ সাহিত্য জীবনেরই দর্পন এবং জীবন অংকের সূত্রকে থোড়াই কেয়ার করে চলে। চিরায়ত কোনও কিছু খুঁজতে হলে তাকে অংকের বইয়ের পাতায় খুঁজলেই হয়। সেখানে সর্বদাই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে থাকে, সে অশোকের যুগেই হোক, কিংবা হিটলারের যুগে।

মিশা একটা বিপজ্জনক উদাহরণ। ছাপা সাহিত্যের ক্ষেত্রে লেখকের কণ্ঠরোধ আটকাতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ অবধি হতে হয়েছে সেখানে। আর, একবার যখন হয়েছে তখন বারবারই সে পথে আক্রমণ আসবে।

কিন্তু সে ছাড়াও আরো একটা নতুন ক্ষেত্রে এই বিপজ্জনক প্রবৃত্তিটা অধুনা দেখা দিচ্ছে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। সেটা হল সোশ্যাল মিডিয়া। সাহিত্য নিয়ে সমালোচনার এ এক শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু সমস্যা হল, পাঠকের ব্যক্তিগত ভালোমন্দের বোধকে জনতার দরবারে মুহূর্তে হাজির করে তা পাঠক ও প্রকৃত সমালোচকের মধ্যেকার তফাৎটাকে দ্রুত ঘুচিয়ে দিচ্ছে।

বাংলা ও ইংরিজি এই দুটো ভাষাতেই দেখতে পাচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য যোগ্য ও ধী-যুক্ত সমালোচনার পাশাপাশি, মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, কোনো একটা লেখা কোন পাঠকের পছন্দ না হলে তিনি একবার থমকে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটা কখনো নিজেকে করছেন না যে ‘এ-লেখাটা আমার অঙ্গনের কি? একবার জানতে চাইব কি কেন এমনটা লেখা হল?’ সে পথে না হেঁটে, তিনি সরাসরি সমালোচকের চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়ে, ব্যক্তিগত অপছন্দটাকে সরাসরি লেখাটার বিরুদ্ধে অ্যাবসলিউট টার্মে উগরে দিচ্ছেন। তারপর লেখার পাশাপাশি লেখককেও আক্রমণ করে বসছেন, নিজের দৃষ্টিকোণকেই একমাত্র ধ্রুব ও নির্ভুল বলে ধরে নিয়ে।

প্রকৃত শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সমালোচকের সঙ্গে এঁদের তফাৎটা হল, কোনো লেখা এঁদের মনঃপূত না হলে সেটা যে তাঁর নিজের বোঝবার ত্রুটি বা জ্ঞানের খামতির জন্যও হতে পারে, সেইটে এঁরা স্বীকার করবেন না। এবং অবিলম্বে লগ ইন করে লেখা ও লেখকের তুলো ধোনা শুরু করে দেবেন।

আক্রমণগুলো এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাঠকের নৈতিক না হলেও অন্তত গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমার মধ্যে। তাতে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীকে খানিক প্রভাবিত করে লেখাটার পাঠক সংখ্যায় সাময়িক বাধা তৈরি করা ছাড়া কারো কোনও বড়ো ক্ষতি হয় না। কিন্তু এরই মধ্যে লুকিয়ে আছে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সাহিত্যের ওপর মরাল পোলিসিং এর বিপজ্জনক বীজ। সাবধান না হলে একদিন তার অঙ্কুরোদ্গম হয়ে, তারপর মহীরুহে বদলে গিয়ে এই নতুন মাধ্যমকেও সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীর শক্তিমান পাঠকবাহিনীর দখলে এনে ফেলতে পারে। কোন লেখাটা পড়া উচিত আর কোন লেখাটা তার লেখকের মতই জঘন্য সেই ফতোয়া ঘোষণা করেন যে পাঠক-টার্নড-সমালোচক(রা), তিনি(তাঁরা) তখন হয়ে উঠতে পারেন এই বৈদ্যুতিন খাপ পঞ্চায়েতের প্রধান। আর, এরপর আমাদের সাম্প্রদায়িক ও বাজারনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমে বা খুব সহজেই এই প্রধানরা হয়ে উঠতে পারেন ক্ষমাতাশালী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেক্সাসের হাতের পুতুল। (বেশি কিছু নয়, একটা বার্ষিক মোটা টাকার সরকারি/বেসরকারি পুরস্কার আর খবরের কাগজে ছবি, ওইটুকুই এখনকার একজন মানুষের আত্মার বিক্রয়মূল্য হবার জন্য প্রায়শ যথেষ্ট।) এবং তা যদি হয় তাহলে এই শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, কিছু সুনির্দিষ্ট পথের বাইরে সাহিত্যচর্চার সর্বশক্তিমান মারণাস্ত্র।

নাহক ভয় পাচ্ছি, তাই কি? তাই হলে তো বাঁচা যেত। প্রার্থনাও করি তাই যেন হয়। কিন্তু কথা হল, ভয় লাগে। এ-দেশের বুকে শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতির পালাবদলের অনেক সশব্দ ও নিঃশব্দে আন্দোলন তো হয়ে গেল। কিন্তু বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে, বহু আশার জন্ম দিয়ে অন্তিমে কেউ কথা রাখেনি। কে, কেন কথা রাখেনি সে হিসেব করবেন পণ্ডিতেরা। কিন্তু, আমরা যারা ঘরপোড়া গরু, যারা বহু- বহুবার বিশ্বাস করে ঠকেছি, স্বপ্ন দেখে ঠকেছি, দেখেছি কেমন ভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের রক্তিম প্রতিশ্রুতি বদলে যায় তোলাবাজের রক্তচক্ষুর ধমকানিতে, তাদের কাছে ওপরে বিবৃত এই সামান্য ইঙ্গিতগুলোও ভবিষ্যতের কোনো মারণব্যাধির সংকেত বহন করে আনে। বৈদ্যুতিন মিডিয়ায় কদাচিত কোনো অনভিজ্ঞ পাঠক-কাম সমালোচকের অপটু কিন্তু বিষাক্ত কাদা ছোঁড়া ও তাতে লাইক ও কমেন্টের বহর দেখে তাই ওতে সিঁদুরে মেঘের দুঃস্বপ্ন দেখি। আসুন সতর্ক থাকা যাক।