সহেলী চট্টোপাধ্যায়
Showing posts with label সহেলী চট্টোপাধ্যায়. Show all posts

নেভারল্যান্ডের খোঁজে - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ - রুমেলা দাস

সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা আর বিস্কুট খেয়ে বাজার যাবার জন্য সবে তৈরি হচ্ছি এমন সময় আমার মোবাইল বেজে উঠল বিচিত্র সুরে। প্রথমটায় চমকে গেছিলাম এমন একটা বিদঘুটে গানের রিংটোন শুনে। তারপর মনে পড়ল কাল রাতে ঘুমোবার সময় আমার ছেলে মোবাইলটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিল বটে। আর তখনই রিংটোন বদলে দিয়েছে নির্ঘাত। ফোন রিসিভ করলাম। অপর প্রান্তে দিতি আমার বন্ধু ঋজু’র ওয়াইফ।

‘কী ব্যাপার? এত সকালে?’

‘সকাল আর কোথায় বেলা ন'টা বাজতে চলল যে। এর আগেও দু’বার ফোন করেছি বলিহারি মশাই আপনার ঘুম!’

দিতি প্রচুর কথা বলে। এই কিছুক্ষণ হল উঠেছি সে কথা আর প্রকাশ না করে বললাম, ‘তারপর সবাই কেমন আছ?’

‘ভাল আর কী করে থাকি বলুন যা গরম পড়েছে তাতে ভাল থাকাই দায়। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। আপনার বন্ধু তো আর এসি ইনভার্টার কিছুই কিনবে না। বলবে শরীরকে বেশি আরাম দিতে নেই...’

দিতির কথা শেষ হবার আগেই বললাম, ‘বুঝেছি। আমি ঋজুকে বেশ করে বুঝিয়ে বলব এখন যাতে এগুলোর ব্যাবস্থা করে। এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে অশান্তি করো না।’

‘দূর মশাই আমাদের মধ্যে অশান্তি হয়েছে আপনাকে কে বলল? আমাদের মধ্যে ছোটখাট ঝগড়া হলেও অশান্তি কখনও হয় না। আপনার বন্ধু তো ঠিক করে ঝগড়াই করতে পারে না। সারাক্ষণ লেখালেখি নয়তো বই মুখে নিয়ে বসে আছে। এমন লোক আর কী ঝগড়া অশান্তি করবে? কিন্তু তবু এ কী হল ভগবান!’ দিতি কেঁদে ফেলে হঠাৎ।

‘কী হয়েছে কাঁদছ কেন?’ আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই।

‘আপনার বন্ধুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে! অ্যাসাইলামে ভর্তি! হে ঈশ্বর!’

‘সেকি! আর ইউ সিরিয়াস? আর এতক্ষণ ধরে তুমি এসব কী বকছিলে এসি ইনভার্টার!’ চেয়ারে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ি।

‘১০০ পারসেণ্ট। আপনাকে আস্তে আস্তে বলছিলাম। প্রথমেই শুনলে আপনি শক পেতেন।’

‘আচ্ছা গোটা ব্যাপারটা খুলে বল দেখি কী করে হল?’

‘কাল সন্ধে থেকে। অফিস থেকে ফিরেই ল্যাপটপ খুলে বসে গেল! আমার সাথে শাশুড়ি মায়ের একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল। সেটা রোজই হয়। আমি বলতে গেলাম। রোজই বলি কখনও শোনে কখনও শোনে না। কখনো মন্তব্য করে কখনও কিছু বলে না। তা কাল আমি সবে কথা শুরু করেছি। তোমার মায়ের বাপু সবেতেই বাড়াবাড়ি। আমার শ্বশুর বাড়ির দোষ ধরে খুব অপদস্থ করব ভেবেছিলাম কিন্ত প্রথম লাইন বলতে না বলতেই দেখি ওর চোখ মুখের অস্বাভাবিক অবস্থা। আআআ করে অজ্ঞান হয়ে গেল! শ্ব্বশুর শাশুড়ি এলেন। ওর জ্ঞান ফেরে একটু পরেই। কিন্তু তারপর থেকেই কেমন একটা অদ্ভুত আচরণ করছে। চোখ পাকাচ্ছে বড় বড় করে। হাতের কাছে যা পাচ্ছে ছুঁড়ে ফেলছে।’

‘কী কী ছুঁড়েছে?’

‘আমার শাড়ি, জামা কাপড়, প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিল, চিরুনি, আমার মেক আপের জিনিস পত্র, কাপ, গ্লাস, ফুলদানি, রেডিও।’

আমার চোখ বড় বড় হয়ে যায় উত্তেজনায়। ‘আর ল্যাপি, বই খাতা পেন এইগুলো? এইগুলো ছোঁড়েনি?’

‘না। এই জিনিসগুলো তো ছোঁড়েনি।’

‘তারপর কী হল?’ মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হই।

‘সেই রাতেই ডাক্তার বাবু এসে দেখে গেলেন। আমাদের পারিবারিক ডাক্তার রায়। বললেন এ আমার কেস নয়। উনি আমাদের বাইরে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে আপনার বন্ধুকে পরীক্ষা করলেন। তারপর রায় দিলেন এ আমার কেস নয়। একটা ভাল আস্যাইলামে ভর্তি করে দিন কাল সকালেই। আমার চেনা জানা ডাক্তার আছেন সব। কোন অসুবিধা হবে না। আজ সকালে পাঁচটার সময় ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গাড়িতে যখন ওঠানো হয় নিজে নিজেই গেল। আশ্চর্য রকম শান্ত। খালি মাঝে মাঝে ফিক ফিক করে হাসছে। ল্যাপি বগলে করে নিয়ে গেছে।’

‘তুমি যাওনি ওর সাথে?’

‘না বাবা! আমাকে দেখলেই দাঁত খিচুচ্ছে। ডাক্তার রায় আর আমার শ্বশুর মশাই গেছেন।’

‘তুমি তাড়াতাড়ি আমাকে মেসেজ করো অ্যাসাইলামের নাম ঠিকানা। আমি এক্ষুনি রওনা দেব।’

ফোন অফ করতেই দেখি মধুশ্রী দাঁড়িয়ে আছে গালে হাত দিয়ে। বুঝতে পারলাম সব কথাই ও শুনেছে। তবু সংক্ষেপে ওকে সবটা বললাম। ও বলল, ‘এত জানাই ছিল তোমার ওই বন্ধু জন্ম থেকেই পাগল। যাই হোক, বাজারটা করে দিও যেও।’

প্রতিবাদ করে সময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়লাম নিজের বাইকে। যেহেতু ঋজু গল্প লেখে সেহেতু সে পাগল। একই কথা মধু আমার সম্পর্কেও বলে। আমিও মাঝে মাঝে গল্প উপন্যাস লিখি সেই জন্য। শাশুড়ি মা এসে আছেন এখন। ল্যাপি খুলতে দেখলেই এঁরা চিল চিৎকার জোড়েন। আমি এক এক সময় চিলে কোঠার ঘরে বসে গল্প লিখি। মাথায় প্লট আসলে লিখতে ইচ্ছে করে। না হলে মাথায় উকুনের মত প্লট কামড়াতে থাকে। ভুলে গেলেও বিপদ। মধুশ্রী এক এক সময় ভাবে আমি বোধ হয় চিলেকোঠায় বসে ব্লু ফিল্ম দেখছি। মুখেও বলে তার সন্দেহের কথা।

তাড়াতাড়ি বাজার সেরে বাড়িতে দিয়ে এলাম। এই সব বাজার দেখে মধুশ্রীর মুখ হাঁড়ি। খুঁত একটা ধরা চাই-ই। কাজের লোকটি মাঝে মাঝেই কাজ ছেড়ে দিতে চায় মধুশ্রীর মধু ওগরানোর জ্বালায়। আবার তাকে খোসামোদ করে নিয়ে আসি। আজ অফিস ছুটি। মুসলিমদের একটি পরব আছে। ছেলেরও ছুটি। বায়না ধরেছিল সঙ্গে আসার জন্য। অনেক করে বোঝালাম যেখানে যাচ্ছি খুব ভয়ানক জায়গা। ডাক্তারবাবুরা ধরে ধরে ইঞ্জেকশান দেবে। আমাকেও দেবে। এইসব বলাতে কাজ হল। শুধু একটা ক্যাডবেরির বদলে আমাকে অব্যাহতি দিল।

দিতি আমাকে অ্যাসাইলামের ঠিকানা মেসেজ করে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

খুব সুন্দর নাম অ্যাসাইলামের। নেভারল্যাণ্ড। ছেলেবেলায় পিটার প্যানের বইতে পড়েছি। হায় রে পিটার প্যান! কোথায় গেলে তুমি! বাস্তববাদীদের জ্বালায় পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করছে আজ। থাকুক না ওরাই। পৃথিবীর ভাল ওরাই করতে পারবে।

নেভারল্যান্ড এর পরিবেশ খুব সুন্দর। শহর থেকে অনেক দূরে। বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। লোহার ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ফটকের সামনে একজন সিকিউরিটির লোক বসে। তাকে সব কৈফেত দিয়ে তবে ভেতরে ঢোকা। ভেতরে অনেকটা জায়গা। প্রচুর গাছ গাছালি। পাখি ডাকছে। ছোট একটা কৃত্রিম নদী আছে। তার ওপরে আবার ছোট্ট একটা সাঁকো। চারদিকে ছোট ছোট কটেজের মত ঘর। ওইখানেই মনে হয় পেশেন্টরা থাকে। প্রচুর ফুল ফুটেছে। একজন মালি গাছের পরিচর্যায় ব্যাস্ত। এগিয়ে গেলাম সেইদিকে। আমি দেখছিলাম। ভাল করে তাকিয়ে দেখি মালিকে খুব চেনা লাগছে। আরে এযে আমার কলেজের বোটানির প্রোফেসর।

‘স্যার আপনি এখানে?’ কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি।

স্যারের এখন বয়স হয়েছে আশির কাছাকাছি। তবে সৌম্য দর্শন স্যার এখনও একই রকম আছেন। চোখের চশমাটা ঠিক করে বললেন, ‘আরে অয়ন যে! কেমন আছ? তোমায় দেখে খুব ভাল লাগল।’ স্যার আমার সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে নিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি এখানে কেন?’

‘হা হা! অ্যাসাইলামে লোকে কী জন্য আসে! আমি পাগল! হা হা।’

‘কিন্তু আমি তো আপনার ব্যাবহারে কোন রকম অস্বাভাবিকতা দেখতে পাচ্ছি না স্যার।’

‘তবু আমি পাগল। কারণ আমি মানুষের চেয়ে গাছপালাকেই বেশি ভালবাসি। মানুষের কাছে আমার আর কিছু পাওয়ার নেই। আমারও কিছু দেওয়ার নেই। এরচেয়ে অনেক আনন্দ আমি এই গাছপালাদের কাছ থেকে পাই। গাছপালারা আর যাই হোক গাল মন্দ তো কখনও করে না আমায়। আমার গিন্নি ছেলের কাছে বিদেশে। আমাকে তারা পাগলই মনে করে। দেখো এই সব গাছ আমার নিজের হাতে করা।’

স্যার আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। কৃত্রিম নদীর কাছে। সেখানে একজন অল্প বয়সী ভদ্রলোক ঘাসের ওপর মাদুর পেতে বসে ছবি আঁকছে। কাছে গিয়ে দেখি খুব সুন্দর সুন্দর পরিবেশের কিছু দৃশ্য এঁকেছেন উনি। ছয়টা ঋতু কে ধরার চেষ্টা করেছেন ছটা আলাদা পেজে। আমাদের দেখে একবার মুখ তুলে তাকালেন একটু হাসলেন তারপর আবার নিজের আঁকায় মন দিলেন। স্যার বললেন, ‘এই ছেলেটিও সদস্য এখানের। এও একজন পাগল।’

‘সেকি স্যার! এত ভাল ছবি আঁকে যে সেও পাগল!’

‘হ্যাঁ । এও মানুষদের সাথে থাকতে পছন্দ করে না। নিজের আঁকা নিয়ে প্রকৃতিকে নিয়ে মশগুল থাকে। ওর আঁকায় শুধু প্রকৃতিই থাকে।’

এখানে আরেকজন ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। ইনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। ডাক্তার স্যানাল। অনেকক্ষণ আগে থেকেই এনাকে দেখছিলাম। বেশ হাসি খুশি মানুষ। আমি এবার স্যারকে আমার বন্ধু ঋজুর কথা বলি। ঋজু আর আমাকে স্যার খুব ভাল করেই চিনতেন। ঋজুর কটেজটা দেখিয়ে দিলেন স্যার দূর থেকে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমায় কিছু লিখতে হবে না? পেশেন্টের সাথে দেখা করতে এসেছি।’

ডাক্তার স্যান্যাল বললেন, ‘চলুন আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। যাবার আগে খাতায় একটা সই করে দেবেন। আমরা কাউকে এলাও করিনা ভেতরে তবে পেশেন্ট বলেছেন অয়ন বলে কেউ দেখা করতে আসলে তাকে যেন এলাও করি তাই নিয়ে যাচ্ছি। আপনাকে অনেকক্ষণ লক্ষ করছি।’

কটেজের দিকে এগিয়ে গেলাম। একটা ছোট্ট মন্দির আছে। সেখানে আছে ভগবান বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তি। বড় ঠাণ্ডা মানুষ ছিলেন। এখানে মেডিটেশান করানো হয়। স্যান্যাল জানালেন।

ঋজুর কটেজে টোকা মারতেই দরজা খুলে দিল স্বয়ং ঋজু। মুখে হাসি। ঘর একদম পরিপাটি করা। বিছানায় কিছু গল্পের বই। আর খোলা ল্যাপটপ।

বললাম, ‘কী কাণ্ড! সবাই কত চিন্তা করছে আর তুমি এখানে দিব্যি আছো দেখছি।’

ঋজু লজ্জিত মুখে বলে, ‘কী করব রে! একটা ভৌতিক উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছিলাম যে। কিন্তু বাড়িতে দিতি আর মায়ের প্রতিদিনের ঝগড়া কাজে খুব অসুবিধা করত। কন্সেট্রেট করতে পারতাম না একদম। তাই এই আইডিয়া দিল আমাদের পারিবারিক ডাক্তারবাবু। ওনাকে সব বলেছিলাম। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের মত পাগলদের উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। যারা মানুষদের সাথে থাকতে বিশেষ পছন্দ করে না। ঝগড়া অশান্তি করতে পারে না। বাড়িতে ঝগড়া অশান্তি দেখলে চোখে জল চলে আসে। এরা মানুষ জাতির কলঙ্ক। তাই ডাক্তার স্যান্যাল এই প্রতিষ্ঠান করেছেন। কিছুদিন লেখক, শিল্পীরা এসে কাটিয়ে যাবে। বিনিময়ে কিছু টাকা দিতে হবে। তবে রেট খুব বেশি নয়। একদিন আধবেলার জন্য হলে খুবই কম। অনেক ছাড়ও আছে। এখানে স্যারও আছেন আমাদের।’

‘আচ্ছা ঋজু এইভাবে সংসার থেকে বেরিয়ে আসা পাগলের অভিনয় করে এটা কি একপ্রকার পলায়নী মনোবৃত্তি নয়?’

‘তাহলে তো লেখক শিব্রাম চক্রবর্তীও পাগল ছিলেন। রাস্তায় শুয়ে পড়েছিলেন একবার। কত কাণ্ডই তো করেছেন।’

‘কিন্তু শিব্রাম আর তুই তো এক নোস।’

‘তা ঠিক। কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর চরিত্রের মিল আছে এটা আমি বেশ বুঝতে পারি।’

‘তোর বাবা মা বউ চিন্তা করছে।’

‘এটা আপেক্ষিক। কেউ চিন্তা করছে না। সবার মনে হচ্ছে যে চিন্তা করছে। আসল কথা হল সবাই সবার স্বার্থের চিন্তা করছে। জানিস আমি অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছি। বাবা মা সবাই অফিস চলে যেত। আমি ঠাম্মির কাছে মানুষ। প্রতিদিন বাবা মায়ের অশান্তি হত। যেদিনগুলো ওঁরা বাড়ি থাকত আমার হাড়ে দুব্বো ঘাস গজিয়ে দিত। ঠাম্মার যে বয়স হয়েছে তাঁর যে একটু আরামের দরকার সেটা ওরা বুঝত না। ঠাম্মি নিজের ঘরে বসে চোখের জল ফেলত। আমার অন্য বন্ধুদের বাবা মায়েরা কত ঘুরতে যেত, পুজোয় মজা করত । আমি বুঝে গেছিলাম বাড়িতে ঝগড়া হওয়া খুব স্বাভাবিক কিন্তু রোজ ঝগড়া হওয়া মোটেও স্বাভাবিক নয়। নানা রকম বই পড়তাম আর ঠাকুরের কথামৃত। সেই বয়সেই বুঝেছিলাম যে আমাদের বাবা মা ও আমাদের তত ভালবাসেন না যতটা ঠাকুর মা তাঁদের সন্তানদের ভালবাসতেন। আর সংসার থেকে দূরে গিয়ে নির্জনে গিয়ে মাঝে মাঝে জপ ধ্যান করতে বলতেন। আমি এখানে জপ না করলেও ধ্যান করতে পারব। এটা খুব জরুরি ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য। আর গল্প লিখব। সাতদিন পর আবার ফিরে যাব বাড়ি।

আমি বিয়ে করতে চাইনি। কিন্তু মা বাবার চাপে পড়ে বাধ্য হই। সংসার ত্যাগ করতে পারিনি কারণ আমি তো আর ঠাকুরকে পাইনি। অত কষ্ট সহ্য করব কীভাবে?’

ঋজু ঠাকুরকে মাকে খুব মানে এটা আমি জানতাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এইসব পরিকল্পনা কার?’

ডাক্তার স্যানাল, আমি, আমাদের বোটানির স্যার, একজন পেইন্টার , কয়েকজন মনঃচিকিৎসক আমরা সবাই এই নেভারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত। তবে এখনই কাউকে কিছু বলিস না। এটা শুধু কিছু পাগলদের সংগঠন হয়েই থাক। সবাই বুঝবে না আমাদের।’

‘কিন্তু কেউ যদি ভর্তি হতে আসে?’

‘ডাক্তার বাবুরা রেফার করবেন না। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া।’

আমি চুপ করে গেলাম। ঋজু ইলেকট্রিক কেটলিতে চা বসিয়ে দিয়েছে। একটু পরে স্যার আর পেইন্টার আমাদের চায়ের আসরে যোগ দিলেন। আমি ভাবছিলাম নেভারল্যাণ্ডে আমিও একটা কটেজ বুক করব। সাত দিনের জন্য। এই পাগলদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিতে দিতে বেশ ফ্রেশ লাগছে।

এক রাতের গল্প


অলংকরণ - অরিজিৎ ঘোষ

সেবার বেড়াতে গিয়ে তিনদিন আটকে পড়ে ছিলাম হোটেলেই। কারণটা আর কিছু নয় বৃষ্টি আর বৃষ্টি। আর সঙ্গে এলোমেলো হাওয়া। পাহাড়ের সবই ভাল তবে বৃষ্টি শুরু হলেই মুস্কিল। দোষ আমারই, সেপ্টেম্বর মাসে পাহাড়ে যায় কেউ? এসেছিলাম ইস্ট সিকিমের অখ্যাত একটা গ্রামে। ওয়েদার যে এত খারাপ হবে বুঝতে পারিনি। আমি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টিটিভের কাজ করতাম। নানা জায়গায় ঘুরতে হত কাজের জন্য। কাজের জন্যই এসেছিলাম সিকিমের রংপো। ভাগ্যিস অফিসের কাজ আমি প্রথমদিনেই মিটিয়ে নিয়েছিলাম। কোম্পানি থেকে আমার জন্য একটা নিম্নমানের হোটেল ঠিক করেছিল। অর্ধেক সময় কারেন্ট থাকত না। জেনারেটরও ছিল না। আমার বয়স বছর তিরিশ হবে। বাড়িতে মা, বোন, দিদি, ভাই অনেকের দায়িত্ব। সেই সময় মোবাইল ছিল না। ৯০ এর দশক চলছে। চিঠির যুগ। এখন আমার অনেক বয়স। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবি। এই ঘটনাটা মনে পড়লে এখনও ভয় লাগে। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভাবলাম লিখে ফেলি। গল্পের পাঠকই বিচার করবেন অলৌকিক বলে সত্যি- ই কিছু আছে কি? না, সবটাই উদ্ভট মস্তিষ্কের কল্পনা? আমি নিজে অলৌকিক কিছু মানি না। স্নায়ুর রোগ থাকলে এরকম অনেক অলৌকিক জিনিস দেখা যায়।

সিকিমে আগেও এসেছি তবে এমন বৃষ্টির মধ্যে পড়িনি কখনও। আমি যে হোটেলে ছিলাম সেখানে সম্ভ্রান্ত লোক বিশেষ আসে না। সেই সময় টুরিস্ট খুব কম ছিল। যে ক'জন ছিল কর্মসূত্রেই এসেছিল আমার মতন। তবে একজন ছিল অন্যরকম। তাঁকে দেখলে সমীহ হত। একমুখ দাড়ি হলেও ভদ্রলোক বেশ সুদর্শন। বয়স চল্লিশের বেশি। বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের লোক, দেখেই মনে হত। ওঁর মধ্যে এমন কিছু ছিল, চট করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। কারোর সঙ্গেই কথা বলতেন না। সব সময় মোটা একখানা বই নিয়ে বসে থাকতেন রিসেপশানে। আদৌ পড়তেন কি-না জানি না, অনেক সময় দেখেছি বই এর দিকে দৃষ্টি নেই ওপরে কিছু দেখছেন, আর কীসব বিড়বিড় করে বলছেন।

একদিন রাত্তিরে মোমবাতির আলোয় ডিনার করছি। বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। ভৌতিক এক রহস্যময় পরিবেশ, আমার মন্দ লাগছিল না। খাবার ঘরে আমি ছাড়াও কয়েকজন ছিল। খেতে খেতে মুখ তুলে দেখি সেই দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক একটু দূরে একটা টেবিলে বসে আছেন এবং আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। কারেন্ট এসে গিয়েছিল তাই বুঝতে পারলাম। আমিও তাকিয়ে রইলাম। উনি কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলেন না। নিজের টেবিল থেকে উঠে তিনি চলে এলেন আমার টেবিলে। বললেন, ‘আপনার আপত্তি না থাকলে এখানে বসতে পারি কি?’

‘হ্যাঁ বসুন না!’ এ ছাড়া আর কিই বা বলতাম?

‘আসলে আজ রাত্তিরটা খুব ভয়াবহ।’ ভদ্রলোকের চোখে মুখে একটা আতঙ্ক দেখতে পেলাম।

আমি হেসে ফেললাম। বললাম,' বৃষ্টি দেখে বলছেন? এরকম রাতেই তেনারা আসেন শুনেছি।’

ভদ্রলোক কিন্তু হাসলেন না। তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে আমায় দেখতে লাগলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন?’

এবার আর না বলতে পারলাম না। মা এত পুজো আচ্ছা করেন! হাতে ধাগা বেঁধে দিয়েছেন মা দুর্গার। আমরা সবাই মানি ভগবানকে। ভদ্রলোক হেসে উঠলেন। ‘প্লাস থাকলে মাইনাস থাকবে। পজিটিভ এনার্জি থাকলে নেগেটিভ এনার্জি থাকবে। ভগবান থাকলে শয়তানও থাকবে।’

আমি চুপ করে ছিলাম। আমাদের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোকের চোখে মুখে ভয় ফুটে উঠল আবার। বললেন, ‘জানেন আজ ২১ সেপ্টেম্বর। আমার জন্মদিন।’

‘শুভ জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা আপনাকে।’

আমার শুভেচ্ছায় খুশি হতে পারলেন না। বললেন, ‘আজকের দিনেই সেই ভয়ানক ঘটনাটা ঘটে। আজকের দিনেই সে আমাকে নিয়ে যেতে চায়। আমাকে একটু সময় দিতে পারবেন? আমি আপনাকে সব বলতে চাই। সব কনফেস করব আবার যদি সে আমায় মুক্তি দেয়।’

বললাম, ‘বলুন না! আমরা ঘরে গিয়ে বসি।’ ভদ্রলোক মানসিক ভাবে অসুস্থ। এইসব মানুষের একটু কেয়ার দরকার।

আমরা দোতলায় এলাম। ভদ্রলোককে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। বিছানার ওপর আমি বসলাম আর ভদ্রলোক বসলেন চেয়ারে। নিজের কথা শুরু করলেন।

‘আমি সুমন ব্যানার্জি। এখানেই একটি কলেজে অধ্যাপনা করি। ছোট থেকেই পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলাম। বেড়ে উঠেছিলাম বিত্তশালী পরিবারে। বাবা মা দুজনেই ভাল চাকরি করতেন। আমি কনভেন্টে পড়াশোনা করতাম। কখনও সেকেন্ড হইনি জীবনে। খুব অহঙ্কার ছিল আমার। দেখতেও মন্দ ছিলাম না। আমি নিজে জানতাম আমি সুদর্শন। একদিন স্কুল থেকে কলেজে গেলাম। বোটানি অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম নামি একটি কলেজে। সেখানে প্রচুর মেয়ে বন্ধু হল। আমার মন জয় করার চেষ্টা করতো তারা। আমি সব বুঝতে পারতাম। আর মনে মনে ভীষণ খুশি হতাম। আমার বাড়ির খুব কাছেই থাকত পিসি - পিসেমশাই। পিসি হাউস ওয়াইফ আর পিসেমশাই ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। স্বচ্ছলতা ছিল পরিবারে। পিসেমশাই প্রচুর সম্পত্তি পেয়েছিলেন পৈত্রিক সূত্রে। তাঁদের কোনও সন্তান ছিল না। আমি যাতায়াত করতাম প্রায়-ই। ওঁরাও আমাকে খুব ভালবাসতেন। পিসেমশাই এর বাড়ির তরফে আর কোনও আত্মীয় বিশেষ কেউ ছিল না। আমি জানতাম আমি নিজেই একদিন এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হবো। কিন্তু আমার মনে কোনও লোভ ছিল না। কারণ আমি যথেষ্ট অর্থবান পরিবারের ছেলে। এবং পড়াশোনাতেও ভাল তাই উজ্জ্বল কেরিয়ার পেতে আমার অসুবিধা হবে না।

এর মধ্যে একদিন ঘটে গেল এক দুর্ঘটনা। পিসি আর পিসেমশাই একটি মেয়েকে দত্তক নিলেন। আমার আদরের ভাগীদার এসে গেল। আমি আর আগের মত স্বচ্ছন্দ ভাবে ওই বাড়িতে যেতে পারতাম না। মেয়েটিকে বোন বলে মানতে পারিনি। সম্পূর্ণ উড়ে এসে জুড়ে বসা এক মেয়ে। অজ পাড়া গাঁয়ের মেয়ে। জানি না পিসি আর পিসেমশাই এর মন কী করে জয় করেছিল! নাকে নোলক আর তেলে জবজবে চুল, ডুরে শাড়িকে দেখলেই গা জ্বলে উঠত আমার। কমলা প্রথমে এসেছিল বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সে গুণ করে ফেলল আমার পিসি আর পিসেমশাইকে। ওঁরা আইনসন্মত ভাবে ওকে দত্তক নিলেন। কমলা প্রাইভেটে পড়াশোনা করতে লাগল। ডুরে শাড়ি ছেড়ে রেশমি শাড়ি ধরল। চুলে তেলের বদলে দামি শ্যাম্পুর সুবাস পেতাম। দামি পারফিউম আর ম্যাচিং জুয়েলারিতে নিজেকে সব সময় সাজিয়ে রাখত। এক এক সময় ভুলে যেতাম আমিও, যে একে আমি পচ্ছন্দ করিনা। কমলা পড়াশোনায় ভাল ছিল। মাধ্যমিক ভাল ভাবেই উতরে গেল। কলেজে ভর্তি হল। আমাকে দাদা দাদা করে পাগল করে দিত। বাচ্চা মেয়ে ছিল কতই বা বোঝে সংসারের মারপ্যাঁচ। পিসি মাঝে মাঝে অনুযোগ করতেন আজকাল কম আসি বলে। আমি বলতাম পড়াশোনার চাপে আটকে গেছি। তখন আমি এম.এসসি পড়ছি। ভাই দ্বিতীয়ার সময় আমি বেড়াতে চলে যেতাম প্রতিবার বা মামার বাড়ি যেতাম মামাতো বোনেদের থেকে ফোঁটা নিতে। কমলার হাত থেকে ফোঁটা নিতে রুচি হত না।

একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে দেখলাম কমলা একটি ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে এক পার্কের সামনে। ছেলেটিকে দেখেই মাথায় আগুন জ্বলে উঠল কেন জানি না। খুব লোফারের মত দেখতে। কমলার রুচি আর কত ভাল হবে। ইস, এইভাবে আমার পিসির টাকা নষ্ট করছে। যে টাকায় একদিন আমার সম্পূর্ণ অধিকার হতো।

বাবার মুখে একদিন শুনলাম পিসেমশাই আর পিসি নাকি ওঁদের সমস্ত সম্পত্তি কমলাকে দিয়ে যাবেন। আমি এতদিন জানতাম অর্ধেক সম্পত্তি আমি অন্তত পাবো। পিসির বাড়ি যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিলাম।

একদিন সকালে শুয়ে ছিলাম নিজের ঘরে। দুমদুম দরজায় ধাক্কা শুনে উঠে বসলাম। আমি শুয়ে থাকলে কেউ আমাকে এভাবে ডাকে না। খুলে দেখি কমলা দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি। আমার ঘরে ঢুকে পড়ল হুড়মুড় করে। আমাকে প্রণাম করল। হাতে বেঁধে দিল রাখী। আমি হাত থেকে রাখী খুলে ফেলে দিলাম ঘরের মেঝেতে। বললাম, ‘আমার ঘরে এভাবে কেন এসেছিস? খুব ভাল করেই জানিস তোকে আমি বোন বলে মনে করিনা। বেরো এখান থেকে!’ এত রুঢ় ব্যবহার সে আমার কাছে আশা করেনি।

কমলা কেমন থতমত খেয়ে গেল। বলল, ‘দাদা তুমি আমার সঙ্গে কেন এরকম করছ? আজ রাখী আর আজ তোমার জন্মদিন ও। আমি তোমায় শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলাম।’

‘যা এখান থেকে। আমার থেকে দূরে থাকলেই তোর ভাল হবে। জোর করে সম্পর্ক পাতানো যায় না। যেটা তুই ভাল পারিস, কিন্তু আমার কাছে পারবি না। আমি পিসি পিসেমশাই এর মত দুর্বল চরিত্রের নই।’

‘তোমার মধ্যে দেখছি মনুষ্যত্ব বোধ নেই।’ এই কথায় প্রচণ্ড রেগে গেলাম, কমলাকে এক প্রচণ্ড চড় কষিয়ে দিলাম। ও মেঝেতে পড়ে গেল। কমলা আস্তে আস্তে নিজেই উঠে দাঁড়াল। আমার মুখের দিকে একবার তাকাল। সুন্দর দুই চোখে জলের ধারা। আমার মায়া হল না। মুখ ফিরিয়ে নিলাম। মেঝে থেকে রাখীটা কুড়িয়ে নিল হাতে। তারপর আর দাঁড়াল না বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।’

সুমনবাবু থামলেন। বোতল থেকে একটু জল খেলেন। আমি এতক্ষণ দম বন্ধ করে শুনছিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তারপর কী হল’?

‘তারপর আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেল। সেই দিন কমলা আর বাড়ি ফিরল না। একটা অ্যাকসিডেন্ট কেড়ে নিল ওর জীবন। বাবার মুখে শুনেছি হাতের মুঠিতে তখনও ধরা ছিল সেই রাখী। পিসির সব সম্পত্তি পেয়েছিলাম।’

‘তাহলে কমলা এইভাবে আপনাকে মুক্তি দিল?’

‘নাহ! সে আমাকে মুক্তি দেয়নি।’ চিৎকার করে উঠলেন সুমনবাবু।

‘সেই রাতেই কমলা আমার ঘরে আসে। চোখে জল। মাথার এক জায়গা থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। হাতে ধরা সেই রাখী। আমি চেঁচিয়ে উঠি, কিন্তু ও যায় না। কতবার বলেছি আমাকে ক্ষমা করিস তুই। কিন্তু ও শোনে না। প্রথম কিছু বছর সে রোজ আসতো। গত দু বছর ধরে সে এই ২১ সেপ্টেম্বর রাত বেছে নিয়েছে। ওই যে শুনতে পাচ্ছেন না ওর পায়ের শব্দ। নূপুরের শব্দ হচ্ছে ওই তো।’

‘ঝড়ের শব্দ ছাড়া আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। দরজায় যে আঘাতের শব্দ হচ্ছে সেটা ঝড়ের জন্য হচ্ছে।’ মাথা নেড়ে বললাম। সত্যিই মনে হচ্ছে কেউ যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। প্রকৃতিই মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়।

‘কারণ আপনার সাথে তার কোনও শত্রুতা নেই। জানেন আমার স্ত্রী আমাকে পাগল ভেবে ছেড়ে চলে গেছেন! কিন্তু আমি পাগল নইইইই! আমার মা বাবা গত হয়েছেন মনের কষ্ট নিয়ে, যে একমাত্র ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি যক্ষের মত এত সম্পত্তি নিয়ে পড়ে রয়েছি। কমলা সত্যিই আসে প্রতি জন্মদিনের রাতে। কী করে বোঝাই আপনাকে!’ সুমন বাবু দাঁড়িয়ে পড়েন। উত্তেজিতভাবে সারা ঘর পায়চারি করতে লাগলেন। দপ করে ঘরের আলো নিভে গেল। বাইরে জোর বাতাস বইছে। ঘরের দরজা খুলে গেল বিচ্ছিরি একটা শব্দ করে। বললাম, ‘হাওয়ায় খুলে গেছে দরজাটা। এইসব সস্তার হোটেলের ঘরের ছিটকিনিও তেমন মজবুত নয়।’ আমি মোমবাতি ধরালাম। দরজা বন্ধ করতে গেলাম। আমার সঙ্গে একটা ঠাণ্ডা কিছুর জোর ধাক্কা লাগল। ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপট ছাড়া আর কিছুই নয়। উফ একদলা বরফের সঙ্গে যেন আমার কলিশান লাগল। পড়ে গেলাম মেঝেয়। সুমন বাবু হাসলেন। আমি হেসে বললাম, ‘প্রকৃতির তাণ্ডবকে ভৌতিক কিছু ভাববেন না।’ মোমের আলোয় দেওয়ালে আমাদের নিজেদেরই কালো কালো ছায়া দেখে অসহ্য লাগছে। সুমনবাবুকে আমি হাল্কা ডোজের একটা ঘুমের ওষুধ দিলাম। উনি আমার বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। চেয়ারে বসে আমিও চোখ বুজলাম। মনের মধ্যে অপরাধবোধ থেকে সুমনবাবুর আজ এই দশা। বাথরুমে যাবার দরকার পড়ল। চোখ খুলতেই দেখলাম দেওয়ালে এক কালো বিশাল ছায়া। আস্তে আস্তে সেই ছায়া সুমন বাবুর শরীরের ওপর চেপে বসেছে। আর কিছুই আমি দেখিনি। আমার এতক্ষণের সাহস আমাকে ছেড়ে বিদায় নিল। ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। সেই ছায়া অদৃশ্য হল। তারপর দুর্গা নাম জপেছিলাম বাকি রাতটুকু।

সকাল থেকে ঝড় বৃষ্টি একদম কমে গেল। তবে রাস্তা বন্ধ হয়ে সে আরেক গল্প। এদিকে সুমনবাবু একদম সুস্থ হয়ে গেলেন। মনেই হচ্ছিল না এনাকে মানসিক রোগী মনে হচ্ছিল ক'দিন আগেই। আমার সঙ্গে ভালই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সিকিমের বাড়িতে উনি একাই থাকতেন একজন বিশ্বস্ত কাজের লোককে নিয়ে। ওনার এই অসুস্থতা বছরের এই নির্ধারিত সময়েই বা দিনেই দেখা দিত। অনেক চিকিৎসা করেও ভাল হননি। আমাদের মধ্যে পত্রালাপ চলত। আমি বলেছিলাম, ‘আপনি নিজেকে ক্ষমা করে দিন। অনেক কষ্ট নিজেকে দিয়েছেন আর নয়।’ উনি হেসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘নাহ। সে আমাকে ক্ষমা করেনি। ওই রাত আমি যেখানেই থাকি লন্ডন বা প্যারিস, কলকাতা বা সিকিম, বড়লোকি হোটেল বা সস্তার হোটেল সে ঠিক আসবে।’ আরও পাঁচ বছর পর এক ২১ সেপ্টেম্বরের রাতে সুমনবাবুর মৃত্যু হয়েছিল ঘুমের মধ্যে। আমাকে ফোনে জানিয়েছিল ওঁর সবসময়ের বিশ্বস্ত হেল্পিং হ্যান্ড মহেন্দ্র। আমিই ফোন করেছিলাম সুমন বাবুকে। মহেন্দ্র জানিয়েছিল গোটা ব্যাপারটা। আমি এখনও ভাবি সেই ঝড় জলের অন্ধকার রাতে দেওয়ালে আর সুমন বাবুর শরীরের ওপর যার কালো অশুভ ছায়া দেখেছিলাম, সে কি সত্যিই ওপার থেকে এসেছিল না আমার মনের কল্পনা! আর বরফের মত ঠাণ্ডা কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ব্যাপারটাও কেমন যেন অদ্ভুত মনে হয়। কিছুই বুঝতে পারি না, আসলে মনের অসুখ বড় ছোঁয়াচে জিনিস।