অরিজিৎ ঘোষ
Showing posts with label অরিজিৎ ঘোষ. Show all posts

শারদ ১৪২৫



প্রচ্ছদশিল্পী - অরিজিৎ ঘোষ


(প্রতিটি লেখা Hyperlink করা আছে। লেখার ওপর ক্লিক করে পড়ুন।)



দুষ্প্রাপ্য রচনা


উপন্যাস


গল্প

গহ্বরতীর্থের কুশীলব মলয় রায়চৌধুরী
কথার দাম চুমকি চট্টোপাধ্যায়
বোমাতঙ্ক অনন্যা দাশ
মানুষের বন্দি শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়
খোলস রম্যাণী গোস্বামী
মামুলি একটা গল্প ধূপছায়া মজুমদার
তিনতলার ঘর দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী
নেভারল্যান্ডের খোঁজে সহেলী চট্টোপাধ্যায়
নীলগিরির বাঘ মিলন গাঙ্গুলী
মাস্টার সুস্মিতা কুণ্ডু
সমীকরণ সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
বহুরূপীয়া অনিমেষ গুপ্ত
গলদ ঋজু গাঙ্গুলী
ভদ্রলোক দীপ ঘোষ
পুজোর জামা রাজীবকুমার সাহা
প্রেমের নেশায় সায়নদীপা পলমল
বাবা এরশাদ বাদশা
শূন্য খনন বুম বোস
দ্য সিক্রেট নাম্বার মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
চেলোবাদক পিনাকী ঘোষ
ইচ্ছে লজ্জাহীন প্রদীপ কুমার বিশ্বাস
আলোকবৃত্তে অনিন্দ্য রাউৎ
উপস্থিতি মধুমিতা সেনগুপ্ত
জল’কে চল্ রুমেলা দাস
কমরেড নীলাদ্রি মুখার্জি
হিটলারের চিঠি অভিষেক মিত্র
ম্যাডামের সাথে সেদিন পারমিতা বণিক
উড়ান অনিমেষ ভট্টাচার্য্য
রূপকার পারিজাত ব্যানার্জী
ঝড় সলমা মিত্র
ওল্ড এজ হোম অরুণ চট্টোপাধ্যায়
আমার বন্ধু জেনি বনশ্রী মিত্র
রূপান্তর অভিষেক সেনগুপ্ত
শূন্য প্রহর নীলাভ বিশ্বাস
নগণ্যের মৃত্যু প্রমিত নন্দী

অনুবাদ কমিকস


কবিতা

লাইব্রেরি তৃষ্ণা বসাক
বলে দেওয়া কথা সুমনা দাসদত্ত
ফেলুচরিত ৫০ প্রতীক কুমার মুখার্জি
টান চিন্ময় বসু
অভিযাত্রী বিদ্যুৎ বিহারি
তারুণ্যের ফাল্গুনে সুরঞ্জিৎ গাইন
অনন্ত প্রশ্ন সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী
ব্ল্যাকবোর্ড, চক ও ডাস্টার অসীম মালিক
তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ শুভদীপ পাপলু
বিরতির পর মন্দিরা লস্কর
আরেকটা বাঁক সায়ক দত্ত
ধোঁয়া মেঘ বৃষ্টি নীলাঞ্জনদেব ভৌমিক
অরফিউসের বাঁশি দেবজিৎ ভট্টাচার্য্য

প্রবন্ধ





গলদ - ঋজু গাঙ্গুলী

অলংকরণ - অরিজিৎ ঘোষ

গ্রেলিং ডিন থেকে মাইলটাক দূরে, একটা লম্বা ঝিলের একদম গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটা। ওঁরা দু’জন সেদিকেই হনহনিয়ে হেঁটে আসছিলেন।

তখন আকাশের লাল সরিয়ে সন্ধ্যা নামছে।

কালচে সবুজ টিলাগুলোর মাঝে বানানো, আদতে লাল, এখন কালচে ইটের বাড়িটা সম্বন্ধে সুপারিনটেন্ডেন্ট হ্যাডলে বা ডক্টর গিডিওন ফেল্‌ কিছুই জানতেন না। বাড়ির সামনের লনটা ছিমছাম লাগলেও একেবারে নিষ্প্রদীপ ঘরগুলো দেখে তাঁরা থমকে গেলেন।

“এই যে!” এতক্ষণ ধরে চলতে থাকা তর্কটা চালু রাখার পক্ষে একটা মোক্ষম উদাহরণ হাতে পাওয়ার মতো করে বাড়িটা দেখিয়ে হ্যাডলে বললেন, “এই হচ্ছে আমার গ্রামগঞ্জে না থাকার সবচেয়ে বড়ো কারণ। এখানেও আমরা একা! সামনের বাড়িটায় আদৌ কেউ থাকে, নাকি এটা পরিত্যক্ত, তাই বোঝার উপায় নেই। এর চেয়ে শহরে...”

“আমরা এখানে কিন্তু ঠিক একা নই।” হ্যাডলেকে মাঝপথে থামিয়ে বলেন ফেল্‌।

ফেল্‌-এর হাতের বিশ্বস্ত লাঠির ইঙ্গিত দেখে লেকের দিকে তাকালেন হেডলি।

জলের একদম ধার বরাবর একজন দাঁড়িয়েছিলেন। তরল অন্ধকারেও জলে ঝিকমিকিয়ে ওঠা শেষ আভাটুকু দিয়ে তাঁর চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছিল।

ছোটোখাটো উচ্চতা। গাঢ়রঙা টিপটপ পোষাক। মাথায় লিনেনের একটা সাদা হ্যাট।

ভদ্রলোক জলের দিকে ঝুঁকে কী যেন দেখছিলেন। হ্যাডলে আর ফেল্‌-এর পায়ের ঘষটানি শুনে বোধহয় তাঁর সম্বিত ফিরল। ঘুরে হ্যাডলে আর ফেল্‌-কে দেখলেন ভদ্রলোক।

“আমি কোনো রাজহাঁস দেখছি না।” খুব চিন্তিত মুখে ওঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন মানুষটি, “আপনারা দেখতে পাচ্ছেন?”

“না।” গম্ভীরভাবে বললেন ফেল্‌, “দেখতে পাওয়ার কথা আছে বুঝি?”

“একটা।” অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক, “একটা রাজহাঁস দেখতে পাওয়ার কথা। মরা। গলায় রক্ত মাখা। ওই...ওখানে ভাসার কথা।”

“মেরে ফেলা হাঁস?”

“অবশ্যই।” আবার মাথা দোলালেন মানুষটি, “খুন হওয়া। মানুষের মতোই।”

“কিছু মনে করবেন না।” লম্বা আর রোগাটে হ্যাডলে-র গলাটা এবার ছুরির মতোই ধারালো শোনাল, “আমরা ভেবেছিলাম এই বাড়ির বাসিন্দারা কেউ নেই। তাই এখান দিয়ে শর্ট-কাট করছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমরা অনধিকার প্রবেশ করে ফেলেছি।

ফেল্‌!” বিপুলদেহী মানুষটি হ্যাডলের দিকে তাকালেন। “আমরা বরং টিলার ওই দিক দিয়েই...?”

“ক্ষমা করবেন।” মানুষটির গলায় একটা মার্জিত, ধীরস্থির ভাব ছিল যেটা একটু আগের কথাগুলোর সঙ্গে খাপ খায় না। হ্যাডলে থমকে গেলেন। “ওসব কথা আমার বলা উচিত হয়নি। আসলে... তিরিশ বছর ধরে আমি প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে চলেছি। তাই বলে ফেলেছিলাম।

অনধিকার প্রবেশ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, কারণ এই জমির মালিক আমি নই। একসময় এখানে থাকতাম অবশ্য। তখনকার কথাগুলোই মনে পড়েছিল!

এখানে একটা বেঞ্চ আছে। তাতে যদি আপনারা একটু বসেন... মানে খুব অসুবিধা যদি না হয়...!”

ঘনায়মান সন্ধ্যায়, সেই নিস্তব্ধ লেক আর লনে, সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো উড়িয়ে দিতে পারেননি হ্যাডলে আর ফেল্‌। ঝিলের ধারে একটা মর্চে ধরা বেঞ্চে বসে তাঁরা ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনেছিলেন।

“আমি জোসেফ লেসিং।” নিভু-নিভু গলায় বলছিলেন ভদ্রলোক, “বুঝতেই পারছি, আপনারা আমার নাম শোনেননি। তাহলে আমার সৎ বাবা, ই.এন.টি বিশেষজ্ঞ ডক্টর হার্ভে লেসিং-এর নামও আপনাদের শোনার কথা নয়।

সেই সময় আমরা এই বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসতাম। আমরা মানে... দাঁড়ান, একটু গুছিয়ে বলতে হচ্ছে ব্যাপারটা।

ডক্টর লেসিং-এর প্রথম স্ত্রী যখন মারা যান, তখন তাঁদের তিনটি সন্তান ছিল। দু’বছর পর যখন তিনি আমার মা-কে বিয়ে করেন, তখন মা-র প্রথম পক্ষের সন্তান হিসেবে আমি এই পরিবারের সদস্য হই।

দুঃখের বিষয়, আমার মা-ও ওই বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যে মারা যান। তবে ডক্টর লেসিং দয়ালু মনের মানুষ ছিলেন। এই পরিবারে আমার কোনো রকম অনাদর হয়নি তার পরেও।

আমরা চার ভাইবোন, মোটের ওপর, ভালোই ছিলাম।

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ছিল ব্রাউনরিগ। প্রচুর হাসত ও। একসময় ভালো অ্যাথলিটও ছিল। তবে ওর কথা ভাবতে গেলেই মনে হয়, লোককে ঠেস দিয়ে কথা বলা, রাশিরাশি আখরোট খাওয়া, এগুলোই ওর বৈশিষ্ট্য ছিল। ও ডেন্টিস্ট ছিল।

তারপর ছিল হার্ভে জুনিয়র। লম্বা-লম্বা পা ফেলে হাঁটত হার্ভে। “ভাইসব!” বলে, কেমন একটা বক্তৃতার স্টাইলে আমাদের সম্বোধন করত ও। একজায়গায় স্থির হয়ে থাকা ওর ধাতে ছিল না। সবসময় অস্থিরভাবে, হাত ছুঁড়ে কিছু-না-কিছু নিয়ে কথা বলতে-বলতে চলেফিরে বেড়াত ও। তবে জুনিয়রের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস ছিল জলবিহার। গণ্যমান্য লোকজন টেমসে নৌকো করে বেড়ানোর সময় যেমন লাল-সাদা পিনস্ট্রাইপ ব্লেজার আর খড়ের টুপি পরতেন, ও-ও সেরকম সাজগোজ করে নৌকোয় চেপে ঝিলে ঘুরত। ও তখন ডাক্তারি পড়ছে।

শুধু চা-এর পরের সময়টা বাদ যেত। তখন ডক্টর লেসিং-কে বিরক্ত করার প্রশ্নই ছিল না। উনি তখন দিবানিদ্রার জন্য ওই সামারহাউসটায় আসতেন।”

এতক্ষণে খেয়াল করলেন হ্যাডলে আর ফেল্‌। অন্ধকার লেকের মাঝামাঝি জায়গায়, লতার আড়ালে ঢাকা পড়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে আছে একটা একতলা ছোট্ট বাড়ি।

কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে রইল লন। তারপর জোসেফ আবার কথা শুরু করলেন।

“ডক্টর লেসিং-এর তৃতীয় সন্তান ছিল মার্থা। প্রায় আমারই বয়সী ছিল ও। ওকে আমি খুব... পছন্দ করতাম। আর্থার সমার্স, মানে যার সঙ্গে ওর বিয়ে হওয়া ঠিক হয়ে গেছিল, একটা লাইন রেজিমেন্টে কমিশনড অফিসার ছিল। চমৎকার ছেলে। মার্থা বাদে এই বাড়িতে আমিই ছিলাম ওর সবচেয়ে কাছের লোক। আমরা ওর আসার অপেক্ষাতেই ছিলাম যখন... ঘটনাগুলো ঘটে।

সেবার সাংঘাতিক গরম পড়েছিল।

আমি একজন মণিকারের দোকানে কাজ করতাম। ছুটি পড়ার পর এখানে এসে চারদিকে সবুজ, শান্ত পরিবেশ পেয়ে মনে হয়েছিল, বাঁচলাম।

আর মার্থা!

সেবারের ছুটির কথা ভাবতে গেলেই দুধসাদা পোশাকে রাজকন্যার মতো গরবিনী মার্থার কথা মনে পড়ে। হাসি, খেলা, আর ছুটোছুটি। এই নিয়েই থাকত ও।

বেলা দু’টো-র পর আমরা লাঞ্চ আর চা-এর মাঝামাঝি একটা কিছু সারতাম। ১৫ই অগস্ট সেসব মেটার পর আমরা প্রত্যেকেই বেরিয়ে পড়ার প্ল্যান করেছিলাম। ওই...”

জোসেফের আঙুল অনুসরণ করে অন্ধকার বাড়িটার দিকে তাকান হ্যাডলে আর ফেল্‌। বাড়ির একদম মাঝামাঝি, দেওয়াল থেকে বাইরের দিকে বাক্সের মতো এগিয়ে আসা একটা জানলা দেখালেন জোসেফ।

“ওই জানলার পাশেই টেবিলটা সাজানো হয়েছিল।

ডক্টর লেসিং সবচেয়ে আগে টেবিল থেকে ওঠেন। একে গরম, তায় হাওয়ার অভাবে দুপুরটা এমন ঝিম-ধরা হয়ে উঠেছিল যে আমারও ঘুম পাচ্ছিল।

ঝিলের ধারেই জুনিয়র ইট, কাঠ, এসব দিয়ে একটা ছোটোখাটো জেটি বানিয়েছিল। তার ধারেই রাখা ছিল একটা দাঁড়টানা নৌকো, আর একটা ‘পান্ট’, মানে পোল দিয়ে টানতে হয় এমন চ্যাপ্টা নৌকো।

ডক্টর লেসিং-কে আমরা সবাই দেখতে পেয়েছিলাম। বগলে একটা বালিশ, আর হাতে একটা বই নিয়ে উনি লন পেরিয়ে দাঁড়টানা নৌকোর কাছে যান। তারপর নৌকোটার দাঁড় বেয়ে সামারহাউসে পৌঁছন।

তারপর ওঠে মার্থা। ওর যেমন স্বভাব, তেমনই করেছিল। হেসে, চেয়ারটাকে পেছনে ঠেলে, ও দৌড়ে বেরিয়ে গেছিল।

তার একটু পরেই আমিও উঠে বেরিয়ে গেছিলাম। আমার পর টেবিল ছেড়েছিল জুনিয়র। শুধু ব্রাউনরিগ আলসেমি করে সেদিন টেবিল ছেড়েই ওঠেনি। রোদ্দুর যাতে গায়ে না লাগে সেজন্য চেয়ারটাকে এক পাশে সরিয়ে, এক কাঁড়ি আখরোট নিয়ে ও সারা দুপুরটা কাটিয়ে দিয়েছিল।

এসব কথার সাক্ষী ছিল একজন।

রবিনসন বলে এক মালী জানলার নীচেই বাগানে কাজ করছিল। সে আমাদের কথা শুনেছিল, আমাদের বেরিয়ে যেতে দেখেছিল। সামারহাউসে ডক্টর লেসিং ঢুকে যাওয়ার পর যে তার সামনের আর পেছনের দুটো দরজাই ভেজানো ছিল, এবং তারপর সারা দুপুর, বিকেল, এমনকি সন্ধে অবধি আর কেউ ওখানে যায়নি, এটাও সে দেখেছিল।

ছ’টা নাগাদ আমরা ফিরে এসেছিলাম।

যখন লনে ছায়াগুলো লম্বা হতে শুরু করল, আশপাশটা একটু বেশিই ফাঁকা লাগতে শুরু করল, তখন আমাদের ব্যাপারটা খেয়াল হল।

ডক্টর লেসিং তখনও বেরোননি!

ব্যাপারটা আমাদের সবার কাছেই অস্বাভাবিক লেগেছিল। আমরা তীর থেকে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ পাইনি।

বয়সে বড়ো হওয়ার সুবাদে ব্রাউনরিগ খবরদারি করার সুযোগ পেলে ছাড়ত না। তখনও ও আমাকে, একদম ফাইফরমাশ খাটানোর মতো করে বলে দিল ডক্টর লেসিং-কে ডেকে তুলতে।

আমি ‘পান্ট’ একেবারেই সামলাতে পারতাম না। এদিকে দাঁড়টানা নৌকোটা তখনও সামারহাউসের সামনেই বাঁধা আছে দেখছিলাম। শেষ অবধি জুনিয়র আমার সঙ্গে হাত লাগাল। আমরা দু’জনে, প্রচুর কসরত করে শেষ অবধি সামারহাউসে পৌঁছে ঘরে ঢুকলাম।

এক নজরে মনে হয়েছিল, ডক্টর লেসিং ঘুমিয়েই আছেন।

এক পাশ ফিরে শুয়ে ছিলেন মানুষটা। বালিশে মুখটা প্রায় গুঁজে ছিল। একটা হাত নীচে ঝুলছিল। নীচে, মেঝেতে, ‘থ্রি মেন অন আ বোট’ বইটা পড়েছিল।

তারপরেই আমার মনে হল, কিছু একটা গোলমাল আছে। জুনিয়র তখনই দেখাল, মানুষটির কান থেকে কিছু একটা বেরিয়ে এসেছে। কাছে গিয়ে দেখলাম সেটা কালচে লাল, চকচকে... রক্ত!

ডাক্তার বলেছিলেন, ঘুমের মধ্যেই মারা গেছিলেন ডক্টর লেসিং। তাঁর ডান কানের মধ্য দিয়ে একটা গোল, কিন্তু মাথার দিকে সরু, শক্ত, আর ধারালো জিনিস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টুপি ঝোলানোর পেরেকের চেয়ে চওড়া, অথচ পেন্সিলের চেয়ে সরু সেই জিনিসটা, অর্থাৎ খুনির হাতিয়ারটা, পুলিশ কোথাও খুঁজে পায়নি।”

জোসেফ লেসিং চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। গাছের মাথাগুলোকে দুলিয়ে দিয়ে গেল একটা কনকনে হাওয়ার দাপট। তারাভরা আকাশের নীচে জোসেফের মাথার সাদা টুপির ওঠানামা থেকে হ্যাডলে আর ফেল্‌ বোঝেন, মানুষটি মাথা দুলিয়ে কিছু ভাবছেন, কিছু কথা সাজিয়ে নিচ্ছেন।

“হুঁ।” বিপুল শরীরের ভার বেঞ্চে ছেড়ে দিয়ে এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন ফেল্‌, কিন্তু এবার তিনি প্রশ্ন করলেন, “পুলিশ কাকে সন্দেহ করেছিল?”

“আমাকে।” নীচু স্বরে বললেন জোসেফ। “ওখানে সেদিন যতজন ছিল, তাদের মধ্যে শুধু আমিই সাঁতার কাটতে পারতাম।”

“কিন্তু...” উত্তেজিত হয়ে ওঠেন হ্যাডলি, “আপনি যে বললেন...?”

“আমি বুঝিয়ে বলছি।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন জোসেফ।

“এই খুনের মোটিভ হিসেবে পুলিশ অর্থলিপ্সাকেই চিহ্নিত করেছিল।

ডক্টর লেসিং যথেষ্ট ধনী ছিলেন, এবং তাঁর সম্পত্তি মোটামুটি সমান চার ভাগেই ভাগ করে আমাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল।

ব্রাউনরিগ যে ঘর ছেড়ে নড়েনি, সেটা রবিনসনের কথায় স্পষ্ট হয়।

মার্থা ওর এক বান্ধবীর সঙ্গে দুপুরটা কাটিয়েছিল।

জুনিয়রের কোনো অ্যালিবাই ছিল না, কারণ ও হাঁটাহাঁটি করতেই বেরিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ওকে সন্দেহ করার মতো কোনো কারণ পায়নি।

আমিই ছিলাম একমাত্র ‘বেমানান’ সদস্য। তার ওপর লোকের মুখের ওপর চ্যাটাং-চ্যাটাং কথা বলার বদভ্যাস, সন্দেহবাতিক, এসবের জন্য আমাকে দোষী ভেবে এগোনোটা বোধহয় সহজ ছিল।”

হ্যাডলে আর ফেল্‌ নীরব রইলেন। জোসেফ আবার মুখ খুললেন।

“ইন্সপেক্টর ডিয়ারিং-এর মতে, আমার প্ল্যানটা ছিল এরকম।

আমি আগে এটা নিশ্চিত করব যে বাড়ির আশেপাশে কেউ থাকবে না। তাহলে সবাই ভাবতে বাধ্য, যে খুনি বাইরে থেকে এসে, ‘পান্ট’ চালিয়ে সামারহাউসে গিয়ে খুনটা করে আবার ফিরে এসেছে। যেহেতু ‘পান্ট’ আমি একেবারেই ম্যানেজ করতে পারি না, তাই আমাকে লোকে সন্দেহ করবে না।

তারপর, ইন্সপেক্টরের মতে, আমি ঝিলের ওই পারে ওই... যেখানে বেশ কয়েকটা গাছ ঝুপসি হয়ে রয়েছে, ওখানে আসি। খাওয়ার ঘরের জানলা আর সামারহাউসের সঙ্গে একই রেখায় রয়েছে ওই জায়গাটা। আমি নাকি আগেই পোষাকের নীচে স্নানের পোষাক পরেছিলাম। তাই, জামাকাপড় খুলে আমি জলে নামি।

বিশ গজ সাঁতার কাটা সত্যিই আমার কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না। ইন্সপেক্টরের মতে আমি পেছন দিক থেকে যখন সামারহাউসে পৌঁছই, তখন ব্রাউনরিগ স্বাভাবিকভাবেই এই বাড়ির দোতলার জানলা দিয়ে আমাকে দেখতে পায়নি, কারণ আমি আড়াল হয়ে গেছিলাম। তারপর আমি সামারহাউসের জানলার নীচে আসি, আর খোলা জানলা দিয়ে সেখানে ঢুকি।

স্নানের পোশাকের মধ্যেই নাকি আমি খুনের অস্ত্রটি লুকিয়েছিলাম। খুন করে আমি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি। রোদের তেজ ছিল মারাত্মক, তাতেই আমার গা-হাত-পা শুকিয়ে যায়।

এভাবেই নাকি আমি, দুনিয়াতে আমার প্রতি সহানুভূতি দেখানো একমাত্র মানুষটিকে মেরে ফেলেছিলাম।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন জোসেফ। ঝিলের দিক থেকে বয়ে আসা হাওয়া গাছগুলোতে আওয়াজ তুলল। নড়েচড়ে উঠলেন দুই শ্রোতা।

আবার জোসেফ কথা শুরু করলেন।

“আমি বারবার বলেছিলাম, আমি এই কাজ করিনি। তাছাড়া কোনো সাক্ষী নেই, কোনো প্রমাণ নেই, শুধু গায়ের জোরে এইভাবে কিছু বলা...

তবু আমার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। লাইব্রেরিতে, কোর্ট বসানোর মতো করে, ওরা আমাকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। ওরা মানে... মূলত ব্রাউনরিগ। মার্থা শুধু কাঁদছিল। জুনিয়র কয়েকবার ‘ফেয়ার-প্লে’, ন্যায়বিচার, এসবের কথা তুলেও দম-ফুরোনো পুতুলের মতো চুপ করে গেছিল। কিন্তু ব্রাউনরিগ মসৃণভাবে, হিসহিসে সুরে, কথাগুলো বলছিল।

‘হয় আমাদের এটা মেনে নিতে হবে, যে তুমিই খুনটা করেছ।’ ব্রাউনরিগ বলছিল, “নইলে মানতে হবে যে কোনো ভূতপ্রেত এই কাণ্ডটা করেছে! দ্বিতীয়টা মানা অসম্ভব। তাই তুমিই...! কাজকম্মো না করে টাকা কামানোর সহজ রাস্তা বেছে নিয়েছিলে, তাই না?’

তবে এসব কথা বললেও ওদের আমি ভয় পাইনি। আমার আশঙ্কা ছিল ইন্সপেক্টর ডিয়ারিং-কে নিয়ে।

পুলিশ আমায় গ্রেফতার করেনি, কারণ তাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছিল না। কিন্তু রোজই মনে হত, হয়তো আজকেই ওরা আমার বিরুদ্ধে কিছু খুঁজে পাবে। ডক্টর লেসিং-এর অন্ত্যেষ্টির পর, যখন গরম আরও বাড়ল, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল মার্থার কান্নাকাটি, তখন মনে হচ্ছিল এই সন্দেহ আর অভিযোগের নরক থেকে ফাঁসিকাঠও ভালো।

আর তারপরেই...

ওই জানলাটা দেখতে পাচ্ছেন?”

জোসেফের আঙুল অনুসরণ করে হ্যাডলে আর ফেল্‌ বাড়িটার একদম ওপরে, ছাদের ঠিক নীচেই একটা জানলার দিকে তাকালেন। অল্প আলোতেও জানলাটার একটা বিশেষত্ব ওঁদের নজর এড়ালো না।

“গরাদ লাগানো আছে দেখছি জানলাটায়।” বললেন হ্যাডলে।

“হ্যাঁ।” অন্ধকারেও টুপিটার নড়াচড়া দেখা গেল, “ঘরটার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিই আপনাদের।

ঘরটা ছোটো। চৌকো। একটা দরজা, আর একটা জানলা আছে ওতে। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন ওই ঘরে আসবাব বলতে কিচ্ছু ছিল না। একবার ওই ঘরে একটা ট্র্যাজেডি হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ঘরটা ওইরকম ফাঁকা আর তালাবন্ধ হয়ে থাকত। ঘরের চাবিটা থাকত ডক্টর লেসিং-এর কাছেই।”

একটা দেশলাই জ্বলে উঠল। অন্ধকারের মধ্যে লাফিয়ে ওঠা আলোয় হ্যাডলে আর ফেল্‌ একটা পাইপ, খাড়া নাক, টানা চোখ, আর শনের মতো সাদা লম্বা চুল, এটুকুই দেখতে পেলেন।

“২২শে অগস্ট বিকেলবেলা। এই পরিবারের যিনি সলিসিটর ছিলেন, তিনি আগেভাগে কিছু না জানিয়েই এখানে হাজির হলেন। আমি বাকিদের ডাকতে গিয়ে দেখি, ব্রাউনরিগ এক বোতল হুইস্কি নিয়ে নিজের ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি, জুনিয়র হাঁটতে বেরিয়েছে, আর মার্থা নিজের শোয়ার ঘরে।

ক’দিন ধরেই মার্থা বলছিল, ও অসুস্থ। মুশকিল হল, অসুস্থতাটা ঠিক কী ধরনের, তা না বলে ও শুধু কান্নাকাটি করছিল। বুঝতে পারছিলাম, ও আর্থার, মানে যার সঙ্গে ওর বিয়ে হওয়ার কথা হয়েছিল, তার জন্য অপেক্ষা করতে-করতে অস্থির হয়ে পড়েছে। অথচ বেচারি ছুটি না পাওয়ায় আসতে পারছিল না।

সেদিনও ওর ঘরে উঁকি মেরে দেখেছিলাম, ও একটা চেয়ারে গা এলিয়ে রয়েছে। হাতে একটা স্মেলিং সল্টের বোতল। কেঁদে-কেঁদে চোখগুলো ফোলা। একটা ধবধবে সাদা পোশাক পরে, মাথার চুলগুলো চূড়া করে, একটা ওই... ঘড়ি-লাগানো পেনড্যান্ট গলায় ঝুলিয়ে কাত হয়ে শুয়েছিল ও। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ও কেমন আছে? উত্তরে ও আমার দিকে একটা বই ছুড়ে আবার কাঁদতে শুরু করল!

নিরুপায় হয়ে আমি একাই গেলাম সলিসিটরের সঙ্গে কথা বলতে। নীচের ঘরে বসে যখন আমরা কথা বলছি, তখনই একটা শব্দ শুনলাম।

আমি একা নই, শব্দটা সলিসিটর ভদ্রলোকও শুনেছিলেন। আমরা দু’জনেই বুঝেছিলাম, আওয়াজটা ওপর থেকে এসেছে। দোতলায় উঠে দেখি, মার্থা তার ঘরে নেই। ও কোথায় যেতে পারে সেটা আন্দাজ করলাম ছাদের ঘরে যাওয়ার সিঁড়ির মুখের দরজাটা খোলা দেখে। আমরা ওপরে উঠলাম।

ওপরে গরম আরও বেশি ছিল। ওই বন্ধ ঘরের দরজাটা আধখোলা হয়ে ছিল। তার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি কাজের মেয়ে, কী যেন নাম... বোধহয় জেন ডসন... যাকগে, সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। কোনোক্রমে সে শুধু আঙুল তুলে ঘরের ভেতরটা দেখাতে পেরেছিল।

ঘরটা, আগেই বলেছি, ছোটো সাইজের। ফাঁকা। একটা ময়লাটে খয়েরি রঙ ছিল দেওয়ালে। সূর্য নীচে নেমে এলেও তার দাপট কমেনি। সেই চোখ-ধাঁধানো আলো জানলার গরাদের ছায়া ফেলেছিল মার্থার সাদা পোশাকে।

ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় পড়েছিল মার্থা।

আমি ওকে তুলে ধরে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। তখনই দেখেছিলাম, ওর চোখ থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তের ধারা!

ঘরে আর কেউ ছিল না।

কাজের মেয়েটি বলেছিল, ও মার্থাকে ডক্টর লেসিং-এর বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে। মার্থা তখন, ওই স্কার্ট পরেও, প্রায় দৌড়চ্ছিল। সেই অবস্থাতেও ও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। মার্থাকে ওইভাবে ওপরের ঘরে যাওয়ার সিঁড়ি খুলে ছুটতে দেখে মেয়েটি ভয়ই পেয়ে যায়, এবং ওর পিছু-পিছু ওপরে আসে।

ওপরে উঠে মেয়েটি দেখে, মার্থা এই বন্ধ ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢোকে। তারপর... তারপর মার্থা বন্ধ না করলেও দরজাটা নাকি ওর পেছনে-পেছনে বন্ধ হয়ে যায়। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর আশঙ্কার বশে মেয়েটি তখনই দরজাটা খুলতে চেষ্টা করেনি। কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ও যখন কী করবে ভাবছে, তখনই সেই অদ্ভুত শব্দটা হয়, যেটা আমরাও নীচে বসেই শুনেছিলাম।

শব্দটা কেমন ছিল তা মেয়েটি বর্ণনা করতে পারেনি। তবে সেটা যথেষ্ট জোরে হয়েছিল। দেওয়াল-জড়ানো লতানে গাছে বসা পাখিরা উড়ে গেছিল। এমনকি ঝিল যেখানে বাড়িটার একদম কাছে এসেছে, ওই যে... হ্যাঁ, ওখানে, রাজহাঁসগুলোও নাকি ওখানে জল থেকে উঠে এসেছিল।

মেয়েটি ভয়ে-ভয়ে দরজা কিছুটা ফাঁক করে ঘরের ভেতরে তাকিয়ে দেখেছিল। ওইভাবে পড়ে থাকা মার্থা ছাড়া ঘরে তখন আর কেউ ছিল না।

আমরা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।

মেয়েটির বয়ানে কোনো ফাঁক ছিল না। এমনকি পুলিশও সেখানে অবিশ্বাস করার মতো কিছু পায়নি। মেয়েটি বারবার বলেছিল, মার্থাকে, এবং শুধু মার্থাকেই সে ওই ঘরে ঢুকতে দেখেছিল। ঘর থেকে কেউ বেরোয়নি। ঘরের মধ্যে লুকোবার কোনো জায়গা ছিল না। জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে কারও পালানোর প্রশ্নই ওঠেনি। আর ঘরের মধ্যে যে কোনো যন্ত্র-টন্ত্র লুকোনো ছিল না, সেটাও ইন্সপেক্টর ডিয়ারিং তন্নতন্ন করে খুঁজে নিশ্চিত করেছিলেন।

তবে হ্যাঁ, এটা পুলিশ খেয়াল করেছিল যে ঘরটার সিলিং বা দেওয়ালে ধুলোবালি থাকলেও মেঝেটা ছিল একদম পরিষ্কার।

ব্যাপারটা শুনতে যতটা অবিশ্বাস্য লাগছে, বিশ্বাস করুন, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি ছিল। মার্থা! কীভাবে?? কেন?

পরে আমি আর জুনিয়র হাঁটতে-হাঁটতে এই ঝিলের ধারে এসেছিলাম। জুনিয়র কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, কেন মার্থা ওপরের ওই ঘরে গেছিল। সেই প্রশ্নটাই ও বারবার আমাকে, নিজেকে, বিশ্বসংসারকে করে চলেছিল। তখনই জলের ধারে ভেসে আসা থাকা ওই নলবনের মধ্যে একটা কিছু আমাদের চোখে পড়ল।

জিনিসটা দেখে এক নজরে মনে হয়েছিল, যেন জলের মধ্য দিয়ে তীরের দিকে ভেসে আসছে একটা লম্বা নখের মতো কিছু। কাছে এলে বুঝতে পারলাম, ওটা একটা রাজহাঁসের গলা, যার মাথাটা গলা থেকে, কিছু একটার ঘায়ে, প্রায় আলাদা হয়ে গেছে!

আমরা একটা নৌকো টানার হুক দিয়ে ওটাকে জল থেকে তুলে দেখেছিলাম।”

জোসেফ লেসিং চুপ করে গেলেন। অন্ধকার ঝিলের জলে, আর গাছের পাতায় দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো আওয়াজ তুলে ঘুরপাক খেল হাওয়া। হ্যাডলে অবশ্য তার মধ্যেও ফেল্‌-এর লম্বা-লম্বা শ্বাসের শব্দ পাচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, নিজের রাগটাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন ফেল্‌।

“হুঁহ্‌!” গলা নয়, বরং নাক দিয়ে শব্দটা বের করলেন ফেল্‌, “তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, এগুলো কীভাবে হয়েছিল, সে ব্যাপারে আপনি কিচ্ছু জানেন না?”

“মানে?” জোসেফ লেসিং যে বিলক্ষণ চমকেছেন, সেটা বোঝা গেল।

“মানে আপনি সত্যিই জানেন না, কীভাবে এই খুনগুলো করা হয়েছিল?”

“না।” স্পষ্ট গলায়, গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন ছোটোখাটো মানুষটি।

“আচ্ছা বেশ।” সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে ফেল্‌ বলেন, “তাহলে আর একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি হাওয়ায় তির ছুঁড়েছেন কখনও?”

“এক মিনিট! এক মিনিট!” সোজা হয়ে বসেন হ্যাডলে। “কী বলতে চাইছেন? কেউ হাওয়ায় তির ছুড়ে মার্থাকে মেরেছিল?”

“ধুর!” কথাটা উড়িয়ে দিলেন ফেল্‌। “আমি ছেলেমানুষি খেয়ালের কথা বলছি। যেরকম খেয়াল থেকে লোকে হাওয়ায় পাথর বা তির ছুঁড়ে দেখে, সে কতটা উঁচুতে পাঠাতে পারল জিনিসটাকে। আমার আশঙ্কা, জোসেফ লেসিং মহোদয় এসব ছেলেমানুষি জিনিসে আনন্দ পান না। আর পান না বলেই এই মামলার সবচেয়ে বড়ো গলদগুলো তাঁর চোখে পড়েনি।

যেমন ধরুন, পাখিরা কারও গলার আওয়াজ, এমনকি চিৎকার শুনেও দল বেঁধে আকাশে ওড়ে না। আপনি যেরকম বললেন তাতে বাড়ির আশেপাশে, এমনকি ঝিলের পাখিরাও জুনিয়রের হাঁটাচলা আর বকবক দেখে ওই ধরনের আওয়াজে অভ্যস্ত ছিল। তাছাড়া পাখিরা উড়লেও রাজহাঁসেরা জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসার মতো কাজ শুধু তখনই করে যখন তাদের গায়ে, বা তাদের মাঝখানে কিছু এসে পড়ে।

অর্থাৎ, ওই জানলা দিয়ে কেউ, বা কিছু একটা জিনিস জলে পড়েছিল।

তারপর আসুন আরেকটা সহজ কথায়। কোনো মহিলা কখনও ভয় পেয়ে ওপরের একটা তালাবন্ধ ঘরে ছুটবে না, বিশেষত সেই ঘরের সঙ্গে যখন, আপনার কথামাফিক, একটা ট্র্যাজেডি জড়িয়ে আছে। সে নীচে যাবে, যেখানে লোকজন রয়েছে।

মার্থা ওপরের ওই ঘরটায় গেছিল একটাই কারণে।

না, কোনো জিনিস খুঁজতে সে যায়নি, কারণ ওখানে কিচ্ছু ছিল না। তাহলে কেন গেছিল ও?

আমরা জানি, বেশ কিছুদিন ধরেই মার্থা নিজের বাগদত্তা ওই ছেলেটির আসার জন্য দিন গুনছিল। ওর ওই কান্নাকাটি, অসুস্থ বলে নিজেকে সরিয়ে রাখা, এসবই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, সপ্তাহের-পর-সপ্তাহ ধরে আর্থারকে দেখতে না পাওয়া, আর ডক্টর লেসিং-এর মৃত্যু, এই দুয়ের চাপ ও আর নিতে পারছিল না।

এটাও লক্ষণীয় যে, ওই ঘরটা সবচেয়ে উঁচুতে বলে ওর জানলা দিয়েই কিন্তু গ্রাম থেকে এদিকে আসার রাস্তাটা সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।

তাহলে, কেউ যদি মার্থাকে বলে যে তার মনে হয়েছিল, ... দূর থেকে দেখার ফলে সেটা ভুলও হতে পারে, কিন্তু তবু... আর্থারকে সে গ্রাম থেকে এদিকে আসার রাস্তায় দেখেছে, তাহলে মার্থা ওই অবস্থায় কী করত?

ফাঁদ পাতা হল।

ডক্টর লেসিং-এর ঘরে গিয়ে, বাক্স থেকে চাবিটা বের করে, স্বস্তিতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে মার্থা ওই ঘরে গেল। দরজা খুলে মার্থা দেখল, ওর চোখে সূর্যের আলো পড়ে একদম ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। তখন, আরও স্পষ্টভাবে রাস্তাটা দেখার জন্য ও জানলার দিকে এগোল, কারণ, কোনো সদয় ব্যক্তি ওকে সাহায্য করার জন্য জানলার ধারে একটা কিছু রেখে দিয়েছিলেন। কেউ যাতে ধুলোয় পড়া পায়ের ছাপ থেকে তাঁকে চিনতে না পারে, তাই মেঝেটা ঝাড় দিয়েও রেখেছিলেন তিনি।

কী রাখা হয়েছিল সেখানে?”

“একটা দূরবীন।” খসখসে গলায় কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন হ্যাডলে।

“তবু,” তর্ক করার মতো করে বললেন ফেল্‌, “যে জানলায় গরাদগুলো এতই কাছাকাছি যে সেখান দিয়ে হাতও গলানো যায় না সহজে, সেখানে একটা দূরবীন লাগিয়ে দেখা যে খুবই কঠিন, তা আমরা সবাই জানি। যেদিকেই ঘোরান, গরাদগুলো সামনে পড়বে, আর ওগুলোই ফোকাসে আসবে। তখন আপনি কী করবেন?

আপনি অধৈর্য হয়ে দূরবীনটা কাত করে জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে আগে বাইরে বের করবেন। তারপর দু’টো গরাদের মধ্য দিয়ে হাত বের করে, গরাদে নাক-মুখ ঠেকিয়ে আপনি দূরবীনটা চোখে ফিট করবেন। তাই তো?”

অদ্ভুত শান্ত, ভদ্র, কিন্তু হিংস্র রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন ফেল্‌। তবু নিজেকে শান্ত রেখে বলে চললেন তিনি।

“কিন্তু এই দূরবীনটা তো খুব সাদামাটা জিনিস ছিল না।

মার্থা সেটাতে চোখ লাগিয়েই বুঝেছিল, ছবি ঝাপসা আসছে। তাই সে মাঝের স্ক্রুটা ঘুরিয়ে ফোকাসটা ঠিক করার চেষ্টা করল। আর তখনই আঘাত হানল মৃত্যু! বিস্ফোরিত হওয়ার মতো করে একটা ধারালো স্টিলের হুক বেরিয়ে এল দূরবীনের পেছন দিকটা দিয়ে, আর মার্থার চোখ দিয়ে একেবারে মাথার ভেতর অবধি পৌঁছে গেল।

মার্থা পেছনদিকে ঠিকরে গেছিল সেই ধাক্কায়। সেজন্যই ও ঠিক জানলার কাছে ছিল না। কিন্তু ওর হাত থেকে নীচে পড়ে গেছিল দূরবীনটা, আর তার ভারী স্টিলের হুকটাই নীচের একটা রাজহাঁসের মাথাটা গলা থেকে প্রায় আলাদা করে দিয়েছিল। তারপর, দূরবীনটা তলিয়ে গেছিল জলে।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ফেল্‌। একটা চুরুট হাতে নিয়েও সেটা না ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন তিনি।

“ব্যস্ত সলিসিটররা ‘হঠাৎ করে’ কোথাও আসেন না। তাঁদের ডেকে আনা হয়। ব্রাউনরিগ মাতাল অবস্থায় ছিল। জুনিয়র বাড়িতে ছিল না। দূরবীনটার নীচে পড়া দেখার জন্য কেউ ছিল না। কিন্তু খুনির একটা জবরদস্ত অ্যালিবাই দরকার ছিল। তাই ওই সলিসিটারকে ডেকে আনা হয়েছিল। মার্থাই ছিল এই বাড়ির একমাত্র সদস্য, যাকে ফাঁদে ফেলে ওইভাবে মারা যেত, যাতে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে, তাদের নজর ডক্টর লেসিং-এর খুনির থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।

বাড়িতে একজনই ছিল যে, নিজের জবানবন্দি অনুযায়ীই, মার্থার মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কথা বলেছিল।

বাড়িতে একজনই ছিল যে মণিকারের সঙ্গে কাজ করত, এবং তার ফলে একটা দূরবীনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার মতো দক্ষতা এবং যন্ত্রপাতি, দুই-ই যার কাছে ছিল।

ফলে প্রশ্ন থাকে একটাই।”

সোজা জোসেফ লেসিং-এর দিকে ঘুরে প্রশ্নটা করলেন ফেল্‌। অন্ধকারেও তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।

“পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করেনি কেন?”

“করেছিল।” শান্তভাবে বললেন জোসেফ লেসিং, “আমি মাত্র মাসখানেক হল ব্রডমুর থেকে ছাড়া পেয়েছি।”

আবার একটা দেশলাই জ্বলে উঠল অন্ধকারে। নিভে যাওয়া পাইপটা ধরিয়ে নিলেন জোসেফ।

“তাহলে আপনি...” রাগ, বিস্ময়, বিরক্তি, সবকিছু নিজের গলায় মিশিয়ে বলে উঠলেন হ্যাডলে, “এতক্ষণ ধরে আমাদের এইসব শোনাচ্ছিলেন কেন? কী জানতে চাইছিলেন আপনি?”

“আহ্‌! আপনাদের তো গোড়াতেই গলদ হয়ে গেছে।” শান্তভাবে বলেন জোসেফ লেসিং, “ডক্টর লেসিং আর মার্থা-কে কে খুন করেছিল, সেটা আমি আদৌ জানতে চাইনি। আমার প্রশ্নটা অন্য।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ব্রাউনরিগ আর জুনিয়র বলেছিল, আমার মা পাগল ছিলেন। আমিই ওদের বাধ্য করেছিলাম কথাটা বলতে। বলেছিলাম, ওরা যদি ওইরকম বলে আমার ফাঁসি যাওয়া ঠেকিয়ে ব্রডমুরের পাগলাগারদে যাওয়ার ব্যবস্থা না করে, আমি সত্যি কথাটা বলে দেব।

সত্যি এটাই, যে আমার নয়, বরং ওদের, মানে ব্রাউনরিগ-জুনিয়র-মার্থা-র মা পাগল ছিলেন। ওই ওপরের ঘরটা থেকেই তিনি নীচে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন, তাই জানলায় গরাদ লাগানো হয়েছিল। ব্রাউনরিগ আর জুনিয়র দু’জনেই ভেবেছিল, তাদের মা পাগল ছিলেন, এই কথাটা জানাজানি হলে তাদের পেশাগতভাবে সর্বনাশ হবে।

তাই, আমার প্রশ্ন একটাই মহোদয়গণ।”

অন্ধকারে উঠে দাঁড়ান জোসেফ লেসিং। তাঁর সাদা টুপির নড়াচড়া, আর পাইপের মধ্যে ধিকিয়ে ওঠা ফুলকি দেখতে পান হ্যাডলে আর ফেল্‌।

“আমি পাগল নই, ছিলামও না। আর আমার মা-বাবাও সুস্থই ছিলেন।

তাহলে আমার আশ্রয়দাতা, সহৃদয় মানুষটিকে, এবং তারপর একটা বাচ্চা, হাসিখুশি মেয়েকে, আমি কেন মারলাম বলতে পারেন?”

লনে ঘন হয়ে ওঠে নৈঃশব্দ্য।

হাওয়ায় মড়মড়িয়ে ওঠা গাছের নীচ দিয়ে, অন্ধকারের সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার মতো করে সাদা টুপি পরা মাথাটা দুলতে-দুলতে সরে যায়।

মূল কাহিনি: “দ্য রং প্রবলেম”
প্রথম প্রকাশ: ১৪ই অগস্ট, ১৯৩৬, লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায়

চেলোবাদক - পিনাকী ঘোষ

অলংকরণ - অরিজিৎ ঘোষ

লাঞ্চের পর থেকে সেই নিয়ে আমরা তখন তৃতীয়বার গডফাদার-এর থীম মিউজিক বাজাচ্ছিলাম। তাই আমি একটু এদিকওদিক তাকিয়ে বাজারচত্বরের উল্টোদিকে বসা ট্যুরিস্টদের দেখছিলাম, বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে তাদের মধ্যে কতজন আছে যারা আগেরবার এটা বাজানোর সময় ছিল। পছন্দের হ’লে লোকেদের একাধিকবার শুনতে আপত্তি থাকে না, কিন্তু তেমনটা বারবার ঘটে না, আবার লোকেরা এটাও ভাবতে পারে যে আপনার ভাঁড়ারে আর কিছু ভালো নেই। বছরের এই সময়ে, একই গান বারবার বাজানোটা মোটামুটি চলে যায়। হিমেল হাওয়ার প্রথম পরশ আর কফির দামে হাস্যকর ছাড় ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়িয়ে দেয়। যাই হোক, এই কারণেই আমি বাজারচত্বরে বসা লোকজনদের মুখ লক্ষ করছিলাম, আর এই করতে গিয়েই আমার নজরে পড়ল টাইবর।

ও হাত নাড়ছিল। প্রথমে আমি ভাবলাম ও আমাদের দিকে হাত নাড়ছে, পরে বুঝলাম ও ওয়েটারকে হাত নেড়ে ডাকার চেষ্টা করছে। ওকে একটু বয়স্ক দেখাচ্ছিল, আর একটু মোটাও হয়েছিল, কিন্তু চিনতে একেবারেই অসুবিধে হচ্ছিল না। আমার ঠিক পাশে বসেই অ্যাকর্ডিয়ান বাজাচ্ছিল ফ্যাবিয়ান। আমি তাকে খুব হালকা করে একটা কনুইয়ের গুঁতো দিলাম আর মাথা নেড়ে ওর দিকে দেখালাম। দুটো হাতের একটাও স্যাক্সোফোন থেকে সরাতে পারছিলাম না ব’লে ঠিকমতো ওকে দেখাতে পারছিলাম না। এরপর যখন একটু ফুরসত পেলাম, তখন আমাদের ব্যান্ডের বাকিদের দিকে তাকিয়ে মনে হ’ল, সেইবছর গ্রীষ্মে যখন টাইবরের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছিল, আমাদের ব্যান্ডের আমি আর ফ্যাবিয়ান ছাড়া তখন এরা আর কেউ ছিল না।

হ্যাঁ, তাও সাত সাতটা বছর হয়ে গেল, কিন্তু তবুও ভাবলে যেন কেমন হয়। তখনও এরকম একসাথে রোজ বাজাতে বাজাতে ব্যান্ডটাকে একটা পরিবারের মতো মনে হ’ত, আর ব্যান্ডের সদস্যরা হয়ে গেছিল ভাইয়ের মতো। প্রতিনিয়ত ব্যান্ডে আসা-যাওয়া লেগে থাকলেও মনে হ’ত সকলেই যোগাযোগ রাখবে। ভেনিস, লন্ডন বা দুনিয়ার যে প্রান্তেই যাক না কেন, সেখান থেকে হয়তো পোস্টকার্ড লিখবে, নতুন ব্যান্ডের সদস্যদের সাথে তোলা ছবি পাঠাবে—ঠিক যেন নিজের পুরোনো গ্রামে চিঠি পাঠানোর মতো। তাই এরকম একটা মুহূর্ত হঠাৎ করেই মনে করিয়ে দেয় কতো তাড়াতাড়ি সব পালটে যায়। আজকের হরিহর আত্মা কেমন কালকে গিয়ে অচেনা মানুষ হয়ে যায়, ইউরোপের অজানা অচেনা কোনো স্কোয়্যার বা ক্যাফেতে গিয়ে গডফাদার থীম বা অটাম লীভস বাজায়।

থীমটা বাজানো শেষ হবার পর ফ্যাবিয়ান বিচ্ছিরিভাবে আমার দিকে তাকাল। ওর ‘স্পেশ্যাল প্যাসেজ’ বাজানোর সময় আমি ওকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়েছি বলে চটে আছে। ‘স্পেশ্যাল প্যাসেজ’ ঠিক সোলো নয়, কিন্তু বাজনার ক্ষেত্রে এটা বেশ একটা বিরল মুহূর্ত যেখানে বেহালা আর ক্ল্যারিনেট থেমে যায়, আমি ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা কিছু স্বর লাগাই, আর ও ওর অ্যাকর্ডিয়ানে একসাথে সুরটা ধরে রাখে। আমি যখন টাইবরকে দেখিয়ে ফ্যাবিয়ানকে আমার কৃতকর্মের ব্যাখ্যা দিচ্ছিলাম, তখন টাইবর একটা ছাতার নীচে বসে চামচ দিয়ে কফি নাড়াচ্ছিল। প্রথমে ফ্যাবিয়ানের তাকে মনে করতে অসুবিধে হলেও, পরে বলল,

‘ও হ্যাঁ, সেই চেলো বাজানো ছেলেটা। এখনও সেই মার্কিন মহিলার সাথে যোগাযোগ আছে কিনা দেখো’।

‘মোটেও না,’ আমি বললাম। ‘তোমার মনে নেই? তখনই তো সব চুকেবুকে গেছিল’।

ফ্যাবিয়ান কাঁধ ঝাঁকাল। ওর মনোযোগ তখন ওর শীট মিউজিকের দিকে। এরপর আমাদের পরের বাজনা শুরু হবে।

ফ্যাবিয়ান আর কোনো উৎসাহ দেখাল না দেখে আমার হতাশ লাগল, কিন্তু আমার মনে হয়, ওই অল্পবয়স্ক চেলোবাদকের ব্যাপারে ওর কোনো কালেই কোনো আগ্রহ ছিল না। ফ্যাবিয়ান, দেখো, ও কখনও বার বা ক্যাফেতে বাজিয়েছে বলে মনে হয় না। আমাদের তখনকার বেহালাবাদক জিয়ানকার্লো-র মতো নয়, আবার বাস গীটারের এরনেস্টো-র মতোও নয়। তাদের সঙ্গীতশিক্ষা ছিল প্রথাগত, তাই তাদের কাছে টাইবরের মতো কেউ একজন সবসময়ই চটকদার। হয়তো টাইবরের উচ্চমানের সঙ্গীতশিক্ষা নিয়ে তাদের মধ্যে একটু ঈর্ষাও ছিল—তার ভবিষ্যত সামনে পড়ে আছে। আর সত্যি বলতে, আমার মনে হয় এইজন্যেই টাইবরদের এরা নিজেদের ছত্রছায়ায় নিতে চায়, তাদের একটু দেখাশোনা করবে, যেমনটা চাইছে তেমনটা করে দেবে, আর যখন তাদের মনের মতো সবকিছু হবে না, তখন সেটা তাদের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হবে না।

সাত বছর আগের সেই গ্রীষ্মে গরমটা অন্যান্যবারের থেকে একটু বেশীই ছিল। এমনকি আমাদের এই শহরেই মনে হচ্ছিল যেন আমরা অ্যাড্রিয়টিকের নীচের দিকে আছি। চারমাসেরও বেশী সময় আমরা বাইরে বাজাতাম—ক্যাফের সামনে একটা চাঁদোয়ার নীচে, সামনে বাজারচত্ত্বর, আর টেবিলগুলো পাতা—এতোই গরম যে দু’তিনিটে স্ট্যান্ড ফ্যান সবসময় বনবন করে চারপাশে ঘুরত। কিন্তু এটাই ছিল ভালো সময়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আরও অনেক দেশ, এমনকি এই দেশেরও প্রচুর ট্যুরিস্ট এইসময় এখানের সমুদ্রতটগুলোয় রোদ পোয়াতে আসে। আর সেই গ্রীষ্মেই আমরা প্রথম লক্ষ করলাম রাশিয়ান ট্যুরিস্ট। এখন আর রাশিয়ান ট্যুরিস্টদের দেখলে আলাদা করে চেনা যায় না, অন্যান্যদের মতোই লাগে। কিন্তু সেইসময় তাদের এতোটাই অন্যরকম লাগত যে দাঁড়িয়ে পড়ে তাকিয়ে দেখতে হ’ত। তাদের পোশাকআশাক অন্যধরণের, আর চলাফেরা দেখলে মনে হ’ত স্কুলের নতুন বাচ্চা। প্রথমবার যখন আমরা টাইবরকে দেখি, তখন আমরা আমাদের জন্যে পাশে সরিয়ে রাখা ক্যাফের বড় টেবিলটায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। ও কাছেই বসেছিল, আর অনবরত ওর চেলোর কেসটা উঠিয়ে উঠিয়ে ছায়ায় সরাচ্ছিল।

‘ওকে দ্যাখো,’ জিয়ানকার্লো বলল। ‘রাশিয়ান মিউজিক স্টুডেন্ট, পেট চালানোর জন্যে কিচ্ছু নেই। তাই সে কী করছে? না মেইন স্কোয়্যারে কফির পিছনে পয়সা ওড়াবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে’।

‘নিঃসন্দেহে একটা মূর্খ,’ এরনেস্টো বলল। ‘কিন্তু রোম্যান্টিক মূর্খ। সারা বিকেল ধ’রে যতক্ষণ আমাদের স্কোয়্যারে বসে থাকে, অনাহারে থাকতে ভালোবাসে’।

ওর চেহারা ছিল রোগাপাতলা। মাথায় সোনালী চুল। চোখে সাদামাটা চশমা। বড় চশমার ফ্রেমে ওর মুখটা একটা পাণ্ডার মতো লাগত। দিনের পর দিন ও এসে বসে থাকত। এখন আমার ঠিক মনে পড়ছে না কীভাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই আমরা বাজানোর মাঝে গিয়ে ওর সাথে বসতাম আর গল্প করতাম। আর কখনও সখনও ও যদি ক্যাফেতে সন্ধ্যের সেশনে আসত, তাহলে আমরা সব মিটে গেলে ওর সাথে গল্প করতাম, হয়তো ওয়াইন আর ক্রস্টিনি খাওয়াতাম।

কিছুদিনের মধ্যেই আমরা জানতে পারলাম টাইবর আসলে রাশিয়ান নয়, হাঙ্গেরিয়ান; আর ওকে দেখে বয়স যতটা মনে হয়, ও তার থেকে একটু বেশীই, কারণ ও ইতিমধ্যেই লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ মিউজিক থেকে পড়াশোনা করেছে, ভিয়েনায় ওলেগ পেট্রোভিচের কাছে দু’বছর শিখেছে। সেই বৃদ্ধ পণ্ডিতের কাছে তেড়েফুঁড়ে শুরু করার পর শিখেছে কীভাবে সব আবেগ অনুভূতিকে বশ করতে হয় এবং তারপর গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভিয়েনা ছেড়ে ইউরোপের কিছু কিছু মর্যাদাপূর্ণ শহরে বাজিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু তারপর চাহিদা কম থাকার জন্যে কনসার্টগুলো এক এক করে বাতিল হতে শুরু করে। ওকেও তখন বাধ্য হয়ে অপছন্দের বাজনা বাজাতে হয়। এদিকে মাথাগোঁজার খরচও দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছিল।

আমাদের শহরে একটা বেশ সাজানো গোছানো শিল্প-সাংস্কৃতিক উৎসব হয়। তাতে যোগদানের জন্যেই সেই গ্রীষ্মে ও এখানে এসেছিল। এই উৎসবটা ওর কাছে ছিল খুব দরকারী একটা সাহায্য। তাই ওর রয়্যাল অ্যাকাডেমির পুরোনো এক বন্ধু যখন ক্যানালের পাশে তার অ্যাপার্টমেন্টে নিখরচায় থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল, ও বিনা দ্বিধায় রাজী হয়ে গেছিল। ও বলেছিল আমাদের শহরটাকে ওর বেশ ভালো লেগে গেছে, কিন্তু টাকাপয়সার সমস্যাটা একটা বড় সমস্যা। যদিও এখন ওর মাঝেমধ্যে বাজানোর ডাক আসছে, কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা নিয়ে ভালোই ভাবতে হচ্ছে।

ওর এই সমস্ত দুঃখ দুর্দশার কথা বেশ কিছুক্ষণ শোনার পর জিয়ানকার্লো আর এরনেস্টো ঠিক করল ওর জন্যে আমাদের কিছু করার চেষ্টা করা উচিত। আর এইভাবেই টাইবরের সাথে কাউফমানের যোগাযোগ হয়। কাউফমান অ্যামস্টারডামে থাকেন, জিয়ানকার্লোর দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয়, হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

সেইদিন সন্ধ্যের ঘটনা আমার খুব ভালো মনে আছে। সময়টা তখনও গ্রীষ্মের শুরুর দিকে। কাউফমান, জিয়ানকার্লো, এরনেস্টো, এবং বাকি আমরা সবাই ক্যাফের ব্যাক রুমে বসে টাইবরের চেলো বাজানো শুনছি। ও নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছিল সেদিন ও কাউফমানের জন্যে একটা অডিশন দিচ্ছিল। আর তাই সেদিন রাতে বাজানোর জন্যে ও বেশ উদ্গ্রীব ছিল। আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার তখন ওর অন্ত ছিল না। কাউফমান যখন জানালেন উনি অ্যামস্টারডামে ফিরে গিয়ে ওর জন্যে কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন, ও তো খুশীতে গদগদ। এরপর লোকজন যখন বলে ওই গ্রীষ্মেই টাইবরের অধঃপতন শুরু হয়েছিল, ও নিজের ভালো নিজে বুঝছিল না, আর এই সবকিছুর জন্যে দায়ী ছিল সেই মার্কিন মহিলা, তাহলে বুঝতে হবে সেই কথাগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে।

***

দিনের প্রথম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতেই টাইবর সেই মহিলা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল। সেইসময় বাজারচত্বরটা ঠাণ্ডা থাকে। ক্যাফের দিকটা সকালের অনেকটা সময় ছায়া ঢাকা থাকে। শহরের মজদুররা এসে হোসপাইপ দিয়ে ফুটপাথগুলো ভিজিয়ে গেছে, তখনও ভিজেভিজে ভাব। তার নিজের ব্রেকফাস্ট করার সামর্থ্য নেই, কেবলমাত্র ঈর্ষান্বিত হয়ে দেখতে হচ্ছিল পাশের টেবিলের ওই মহিলা নানানরকমের বানানো ফলের রস অর্ডার করে যাচ্ছেন। তারপর আপন খেয়ালখুশীতেই, যদিও তখনও দশটা বাজেনি, একবাটি ঝিনুক সেদ্ধ অর্ডার করে বসলেন। টাইবরের কেমন যেন মনে হ’ল সেই মহিলাও তাকে মাঝেমধ্যে আড়ে আড়ে দেখছে, কিন্তু সেটা নিয়ে সে বেশী ভাবল না।

‘ভারী চমৎকার মহিলা, দেখতেও দারুণ,’ ও তখন আমাদের বলেছিল। ‘কিন্তু দেখতেই পাচ্ছো, উনি আমার থেকে প্রায় দশ পনেরো বছরের বড় হবেন। তাহলে কিছু চক্কর চলছে সেটাই বা ভাবব কী ভাবে?’

তারপর ও এই বিষয়টা ভুলে গেল। ঘরে ফিরে গিয়ে লাঞ্চের আগে ঘন্টা দু’য়েক রেওয়াজ করতে হবে। তাই ও ওঠার তোড়জোড় করছিল। এমন সময় হঠাৎ ও দেখল সেই মহিলা ওর সামনে সটান দাঁড়িয়ে।

বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। দেখে মনে হবে ওদের মধ্যে অনেকদিনের চেনাজানা। স্বভাবে লাজুক বলে ও সেই মহিলাকে কোনো অভিবাদন জানাতে পারল না। তারপর তিনি ওর কাঁধে একটা হাত এমনভাবে রাখলেন যেন মনে হবে ও কোনো পরীক্ষায় ফেল করেছে আর উনি সান্ত্বনা জানাচ্ছেন। তিনি বললেন,

‘সেদিন তোমার বাজানোর সময় আমি ছিলাম। সান লোরেঞ্জো-তে’।

‘ধন্যবাদ,’ ব’লে ও বুঝতে পারল উত্তরটা খুব বোকা বোকা শোনাল। তারপর যখন দেখল সেই মহিলা ওর দিকে তাকিয়েই আছেন, ও বলল, ‘ও হ্যাঁ, সান লোরেঞ্জো চার্চে। ঠিক। আমি ওখানে একদিন বাজিয়েছিলাম’।

মহিলাটি তখন হাসতে হাসতে হঠাৎ ওর সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। ‘এমনভাবে বলছ যেন ইদানিং তোমার পরপর ঠাসা অনুষ্ঠান রয়েছে,’ ঠাট্টার সুরে তিনি বললেন।

‘যদি তেমনকিছু মনে হয়, তাহলে আমি বলছি আমার বলার ধরণটা একটু ভুল হয়ে গেছে। যে অনুষ্ঠানটায় আপনি এসেছিলেন, সেটা ছিল বিগত দু’মাসে আমার প্রথম অনুষ্ঠান’।

‘কিন্তু তুমি তো এখন সবে আরম্ভ করছ,’ তিনি বললেন। ‘ভালোই বাজাও, যেকোনো অনুষ্ঠানে ডাক পাবার মতো। আর সেদিনও তো ওখানে ভালো ভীড় ছিল’।

‘ভালো ভীড়? ওখানে মাত্র চব্বিশজন ছিল’।

‘তখন সবে বিকেল। বিকেলের অনুষ্ঠানের পক্ষে সংখ্যাটা ভালোই’।

‘আমার অভিযোগ জানানো উচিত নয়। তবুও বলব, ভীড়টা ভালো ছিল না। যে সমস্ত ট্যুরিস্টরা ছিল, তাদের কিছু করার ছিল না বলে সেখানে ছিল’।

‘ওহ! এতোটা হাল ছেড়ে দিচ্ছ কেন? আরে, আমি তো ওখানে ছিলাম। আমি ওই ট্যুরিস্টদের মধ্যে একজন ছিলাম’। তখন ও লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, কারণ ক্ষোভ উগরাতে ও এসব বলেনি। মহিলাটি তখন ওর হাত ছুঁয়ে, মুচকি হেসে আবার বললেন, ‘তুমি সবে শুরু করছ। এখন তোমার শ্রোতাদের সংখ্যা নিয়ে ভাবতে হবে না। মনে রাখবে, সেই জন্যে তুমি বাজাচ্ছ না’।

‘ওহ, তাই নাকি? শ্রোতাদের জন্যে বাজাচ্ছি না তো কাদের জন্যে বাজাচ্ছি?’

‘আমি তা বলিনি। আমি তোমাকে যেটা বলতে চাইছি সেটা হ’ল তোমার কেরিয়ারের এই জায়গায় তোমার শ্রোতা কুড়ি হ’ল দু’শো হ’ল তাতে কিছু যায় আসে না। কেন যায় না বলব? কারণ তোমার সেটা আছে!’

‘আমার আছে?’

‘হ্যাঁ, তোমার আছে। নিশ্চয়ই আছে। তোমার সেই... সম্ভাবনা।

ওর ঠোঁটের কোণে একটা অভব্য হাসি বেরিয়ে আসতে চাইলেও তাকে সংবরণ করে নিল। ওনাকে না করে নিজেকেই নিজের ভর্ৎসনা করতে ইচ্ছে হ’ল। মনে হয়েছিল, উনি হয়তো ওকে বিশাল পণ্ডিত বা প্রতিভাবান কিছু বলবেন, কিন্তু পরমুহূর্তেই ওনার কথায় ওর সে ভুল ভেঙে গেল। তিনি আরও বলতে লাগলেন,

‘এখন তুমি কী করবে, না তুমি একজনের জন্যে অপেক্ষা করবে যে এসে তোমার বাজনা শুনবে। সেই মঙ্গলবারের কুড়িজন শ্রোতার মধ্যে একজনকে তুমি অনায়াসেই একটা ঘরে পেয়ে যাবে...’

‘আয়োজক ছাড়া চব্বিশ জন...’

‘ওই হ’ল, চব্বিশ জন। আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা হ’ল এখন ওই সংখ্যাটা কোনো ব্যাপার নয়। ব্যাপার হ’ল সেই একজন’।

‘আপনি রেকর্ডিং কোম্পানীর লোকের কথা বলছেন?’

‘রেকর্ডিং? আরে না না। ওটা এমনি এমনিই হয়ে যাবে। না, আমি সেই লোকের কথা বলছি যে তোমাকে ফুটিয়ে তুলবে, যে তোমার বাজনা শুনবে আর বুঝবে তুমি প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সাধারণ মাপের কেউ নও। তুমি এখনও গুটিপোকা হয়ে আছ, একটু সাহায্য পেলেই তুমি প্রজাপতি হয়ে উড়ে যাবে’।

‘ও, বুঝলাম। তা, কোনওভাবে আপনি কি সেই লোক হতে পারেন?’

‘আরে, বাদ দাও! তুমি তো বেশ অহংকারী হে। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হয় না তো, যে তোমার মেন্টর হবার জন্যে লোকেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। অন্তত, আমার মাপের তো কেউ নয়’।

একটা বড়সড় ভুল করে ফেলে ও তখন রীতিমতো বেকায়দায়। আবার ভালো করে সেই মহিলাকে দেখল। তিনি তখন চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে ফেলেছেন। ও দেখল নম্র, দয়ালু সেই মুখে ফুটে উঠেছে হতাশার ছাপ, হয়তো কিছুটা রাগও। ও তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েই রইল, আশা করছিল চিনতে পারবে, কিন্তু শেষমেশ বলতে বাধ্য হ’ল,

‘আমি খুব দুঃখিত। আপনি বোধহয় কোনো খ্যাতনামা সুরকার?’

‘আমি এলুইজে ম্যাককরম্যাক,’ হাসিমুখে তিনি বললেন আর তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, নামটা টাইবরের অজানা, তাই ও পড়ল আরও মুশকিলে। প্রথমেই ও অবাক হওয়ার ভান করল, আর বলল, ‘সত্যি, কী আশ্চর্য!’ কিন্তু তারপর যখন মনে হ’ল এমন মিথ্যে বলা শুধু অসাধুতাই নয়, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লজ্জাজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হতে পারে, ও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে বলল,

‘মিস ম্যাককরম্যাক, আপনার সঙ্গে আলাপ হওয়ায় আমি অভিভূত। কিন্তু বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, আমি বয়সে নবীন এবং আগেকার ইস্টার্ন ব্লকের লোহার ঘেরাটোপে বড় হবার কারণে হালের ফিল্ম স্টার বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও চিনি না, যদিও তাদের নাম পশ্চিমের ঘরে ঘরে জানে। তাই আপনি ঠিক কে সেটা আমি বুঝতে পারছিনা ব’লে আমাকে ক্ষমা করবেন’।

‘হুম...তোমার আন্তরিকতার প্রশংসা না করে পারছি না’। মুখে একথা বললেও তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি অপমানিত বোধ করছেন। তাঁর আগের উৎসাহও আর দেখা যাচ্ছিল না। কিছুটা অস্বস্তি কাটিয়ে উঠে ও আবার বলল,

‘আপনি কোনো খ্যাতনামা সুরকার, ঠিক?’

তিনি মাথা নাড়লেন। তাঁর দৃষ্টি তখন ভেসে বেড়াচ্ছে স্কোয়্যারটার উল্টোদিকে।

‘আমি আবার ক্ষমা চাইছি,’ ও বলল। ‘আমি সত্যিই ভীষণ সন্মানিত যে আমার মতো তুচ্ছ একজনের বাজনা শুনতে আপনি এসেছিলেন। আমি কি জানতে পারি আপনি কোন যন্ত্র বাজান?’

‘তোমার মতো,’ তিনি চটপট জবাব দিলেন। ‘চেলো। এইজন্যেই তো আমি শুনতে গিয়েছিলাম। তোমার মতো সাধারণ কেউ বাজালেও আমি না গিয়ে পারি না। শুনেও আমি অন্যদিকে চলে যেতে পারি না। আমার তো একটা লক্ষ্য আছে, সেইজন্যেই মনে হয়’।

‘একটা লক্ষ্য?’

‘আমি জানি না তাছাড়া এটাকে আর কী বলব। আমি চাই সমস্ত চেলোবাদক খুব ভালো বাজাক। ভীষণ চমৎকার বাজাক। প্রায়শই দেখি তারা এমন ভুল পথে পরিচালিত হয়ে বাজাচ্ছে’।

‘কিছু মনে করবেন না, কিন্তু শুধুমাত্র কি আমরা এই চেলোবাদকরাই ভুল পথে পরিচালিত হয়ে বাজাচ্ছি? নাকি আপনি সব সুরকারদের কথাই বলছেন’।

‘হতে পারে এটা অন্য বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। কিন্তু আমি একজন চেলোবাদক, তাই আমি অন্য চেলোবাদকদের বাজনাই শুনি, আর যখন শুনি কিছু ভুল হচ্ছে... জানো, সেদিন কী হয়েছিল, মিউজিও সিভিকো-র বারান্দায় কিছু অল্পবয়সী ছেলে বাজাচ্ছিল আর লোকজন সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ না করেই যে যার মতো নিজের কাজে ছুটছিল। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে পড়ে শুনলাম। আর তুমি তো জানো, আমি না বলে থাকতে পারি না’।

‘ওরা কি ভুল বাজাচ্ছিল?’

‘না, ঠিক ভুল সেটাকে বলা যায় না। কিন্তু... হ্যাঁ, ওটার অভাব ছিল। ওটার ধারেকাছেও ছিল না। তুমি হয়তো ভাবছ আমি খুব বেশী আশা করছি। আমি জানি, আমি যেমনটা চাইছি তেমনটা সবাই বাজাবে সেটা আশা করা বৃথা। মনে হয় ওরা মিউজিকের স্টুডেন্ট ছিল’।

এতক্ষণে তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। স্কোয়্যারের মাঝখানে বসানো ফোয়ারাটার কাছে বাচ্চারা হইহল্লা করে একে অন্যের দিকে জল ছেটাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে টাইবর বলে উঠল,

‘মঙ্গলবার আমার ক্ষেত্রেও আপনি বোধহয় সেই তাগিদটাই অনুভব করেছিলেন। আমার কাছে এসে আমাকে আপনার পরামর্শ দেবার তাগিদ’।

তিনি হাসলেন, আর পরমুহূর্তেই তাঁর মুখটা খুব গম্ভীর হয়ে গেল। ‘হ্যাঁ, করেছিলাম,’ তিনি বলে উঠলেন। ‘আমি সত্যিই করেছিলাম। কারণ আমি যখন তোমার বাজনা শুনলাম, মনে হ’ল আমি আমারই একসময়ের বাজনা শুনছি। কিছু মনে কোরো না, হয়তো একটু খারাপ শোনাবে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, তুমি এখনও সঠিক রাস্তা খুঁজে পাওনি। তাই যখন আমি তোমার বাজনা শুনলাম, তোমাকে সাহায্য করার জন্যে উঠেপড়ে লাগলাম, তা সে দেরিই হোক আর তাড়াতাড়িই হোক’।

‘আপনি হয়তো জানেন না, আমি ওলেগ পেট্রোভিচের কাছে শিখেছি’। খুব সাদামাটাভাবে কথাটা বলে টাইবর উত্তরের অপেক্ষায় রইল। কিন্তু এটা শুনে তিনি মুখ টিপে হাসছেন দেখে আরও অবাক লাগল।

‘পেট্রোভিচ, হ্যাঁ,’ তিনি বললেন। ‘পেট্রোভিচ তাঁর সময়ের একজন শ্রদ্ধেয় শিল্পী ছিলেন। আর আমি জানি তাঁর ছাত্ররা আজও তাঁকে সমীহ করে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের অনেকের কাছে তাঁর ধ্যানধারণা, তাঁর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী...’ কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই বাকিটা তিনি মাথা নেড়ে, হাতদু’টো প্রসারিত করে বোঝালেন। টাইবরের তখন প্রচণ্ড রাগে কথা প্রায় বন্ধ। ও তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি আবার তাঁর হাতটা ওর হাতের ওপর রেখে বললেন, ‘আমি অনেক বলে ফেলেছি। আমার বলার অধিকার নেই। আমি এখন যাচ্ছি। তুমি শান্তিতে থাকো’।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে টাইবরের রাগও কিছুটা পড়ল। টাইবরের স্বভাবটা ছিল খুব উদার। ও বেশীদিন কোনো মানুষের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে থাকতে পারত না। আর তাছাড়া, সেই মহিলা ওর পুরোনো শিক্ষক সম্বন্ধে যা ব’লে ওর মনে নাড়া দিলেন, সেটা ওর মনে হলেও কোনদিন প্রকাশ করতে সাহস হয়নি। তাই ও যখন তাঁর দিকে মুখ তুলে তাকাল, ওকে দেখে বিভ্রান্ত ছাড়া আর কিছু মনে হ’ল না।

‘দ্যাখো,’ তিনি বললেন, ‘মনে হচ্ছে তুমি আমার ওপর এখন এতোই রেগে আছো যে এসব নিয়ে তুমি এখন ভাবতে পারবে না। কিন্তু তবু আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। যদি তোমার মনে হয় তুমি এই বিষয় নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে চাও, তাহলে আমার কাছে চলে এসো। আমি কাছেই, এক্সেলসিয়র-এ আছি’।

এই হোটেলটা শহরের সবচেয়ে বড় হোটেল। ক্যাফের সামনে স্কোয়্যার, আর তার উল্টোদিকে একদম শেষ প্রান্তে রয়েছে হোটেলটা। তিনি আঙুল উঠিয়ে টাইবরকে দেখালেন। তারপর একটু মুচকি হেসে সেইদিকে হাঁটা লাগালেন। ও তাকিয়েই রইল যতক্ষণ না পর্যন্ত স্কোয়্যারের মাঝখানে বসানো ফোয়ারাটার কাছে গিয়ে তিনি বাঁক নেন। সেখানে পৌঁছে একটু তাড়া দিয়ে পায়রার ঝাঁকটাকে ওড়ালেন, আর তারপর টাইবরকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে নিজের রাস্তায় এগিয়ে গেলেন।

***

পরের দু’দিন ধরে ও এই সাক্ষাতটা নিয়ে অনেকবার ভাবল। পেট্রোভিচের নাম করায় তাঁর মুখে বিদ্রুপের হাসিটা মনে পড়ে গিয়ে আবার নতুন করে রাগ হতে লাগল। ও এটাও লক্ষ করল যে ওর রাগটা কিন্তু ওর পুরোনো শিক্ষকের তরফে হচ্ছে না। রাগটা বরং হচ্ছে পেট্রোভিচের নাম নিয়েও সম্ভ্রম আদায় করতে না পারার জন্যে। ও এতোদিনে মোটামুটি এইভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল যে পেট্রোভিচের নাম উল্লেখ করলেই তার একটা প্রভাব পড়বে। এটা যেন একধরণের সার্টিফিকেট যেটা দিয়ে ও গোটা দুনিয়ায় ভাঙিয়ে খাবে। কিন্তু তখনই ওর মাথা গরম হয়ে গেল যখন দেখল সেই সার্টিফিকেট যতটা ওজনদার ওর মনে হয়েছিল, ততটা আদৌ নয়।

যাবার সময়ের তাঁর আমন্ত্রণটাও টাইবরের বারবার মনে পড়ছিল। ও যতক্ষণ স্কোয়্যারে বসেছিল, ও খেয়াল করল, ওর নজর চলে যাচ্ছিল দূরে, সেই এক্সেলসিয়র হোটেলের প্রধান প্রবেশপথের দিকে যেখানে দারোয়ানের সামনে দিয়ে ঘনঘন ট্যাক্সি, লিমুজিন ঢুকছে আর বেরোচ্ছে।

অবশেষে, এলুইজে ম্যাককরম্যাকের সাথে কথা বলার তৃতীয় দিনের মাথায়, ও বাজারচত্বরটা পেরিয়ে হোটেলের মার্বেলমোড়া বারান্দাটায় গিয়ে উঠল। তারপর ফ্রন্ট ডেস্কে এসে তাঁর এক্সটেনশনে ফোন করতে বলল। রিসেপশানিস্ট ফোনে কথা বলে ওর নাম জানতে চাইল। তারপর আরও কয়েকটা কথা বলে রিসিভারটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো।

‘আমি ভীষণ দুঃখিত,’ ওপ্রান্ত থেকে তাঁর গলা ভেসে এলো। ‘সেদিন আমি তোমার নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম। তাই তুমি কে সেটা ভেবে বার করতে একটু সময় লাগল। আমি কিন্তু তোমাকে ভুলিনি। সত্যি বলতে কি, আমি তোমার করুণ ভাগ্যের কথা ভাবছিলাম। তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। আর সেটা এক্ষুণিই বলা দরকার। তোমার সঙ্গে চেলো এনেছো? না, আনোনি নিশ্চয়ই। তাহলে এক ঘন্টার মধ্যে নিয়ে চলে এস না। ঠিক এক ঘন্টা কিন্তু। আমি তোমার অন্যে অপেক্ষা করব’।

ও যখন এক্সেলসিয়রে ওর বাদ্যযন্ত্রটা নিয়ে আবার ফেরত এলো, রিসেপশানিস্ট তাড়াতাড়ি এলিভেটরের দিকে দেখিয়ে বলল মিস ম্যাককরম্যাক ওর জন্যে অপেক্ষা করছেন।

সেই ভরদুপুরে তাঁর ঘরে ঢুকে টাইবরের এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতা বোধ হ’ল। ঢুকেই একটা বড় স্যুইট। বেডরুমটা সম্পূর্ণ আড়ালে। শাটার লাগানো বড় বড় জানালা। শাটার সরাতেই হাওয়ায় জানালার পর্দা উড়তে লাগল। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেই স্কোয়্যারটা নজরে পড়বে। অমসৃণ পাথরের দেওয়াল, গাঢ় পালিশ করা কাঠের মেঝে নিয়ে ঘরটা যেন একটা মঠের মতো লাগছিল। তার সঙ্গে ছিল ফুল, কুশন আর অ্যান্টিক কিছু আসবাবপত্র। ঘরটার সঙ্গে একদম বেমানানভাবেই তাঁর পরণে টি-শার্ট আর ট্র্যাকস্যুট, যেন এক্ষুণি দৌড়ে ফিরেছেন। চা বা কফি কোনকিছুই অফার না করে খুব সাদামাটাভাবে অভ্যর্থনা জানিয়ে তিনি বললেন,

‘আমাকে বাজিয়ে শোনাও। সেদিন অনুষ্ঠানে যেটা বাজিয়েছিলে, সেটাই আজ আমার জন্যে বাজাও’।

ঘরের মাঝখানে রাখা পালিশকরা খাড়া চেয়ারটা দেখিয়ে ওকে বসতে বললেন। ওটার ওপরে বসেই ও চেলোটা কেস থেকে বার করতে শুরু করল। কিছুটা কুণ্ঠিতভাবে তিনি গিয়ে বসলেন একটা বড় জানালার সামনে, ওর সঙ্গে ঠিক আড়াআড়িভাবে। তারপর যতক্ষণ ও যন্ত্রটাকে সুরে বাঁধছিল, তিনি সামনের ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন। ও বাজাতে শুরু করার পরেও তিনি ঠায় একইভাবে বসে রইলেন। প্রথম টুকরোটা বাজানোর পর তিনি কিছু না বলে চুপ করে থাকলেন। তাই ও তাড়াতাড়ি আরেকটা টুকরো ধরল, তারপর আরেকটা। আধঘন্টা পার হয়ে গেল, তারপর একঘন্টা। ঘরের ছায়াময় পরিমণ্ডল, উড়তে থাকা পর্দার ফাঁক দিয়ে ফিকে হয়ে যাওয়া বিকেলের রোদ, নীচে বাজারচত্বরের শোরগোল, সর্বোপরি, ঘরের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি ওর বাজনায় এক নতুন গভীরতা, নতুন ইঙ্গিতের সৃষ্টি করছিল। দ্বিতীয় ঘন্টার শেষদিকে ওর মনে হ’ল এবার নিশ্চয়ই তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। কিন্তু ও যখন বাজনা শেষ করল, দুজনেই চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর দিকে মুখ করে বসে তিনি বললেন,

‘হুম, আমি বুঝতে পারছি তুমি ঠিক কোন জায়গায় আছ। ব্যাপারটা খুব একটা সহজ হবেনা, কিন্তু তুমি পারবে। তুমি নিশ্চয়ই পারবে। চলো, ব্রিটেনেরটা দিয়ে আমরা শুরু করি। ওটা আবার বাজাও, শুধু ধরতাইটা, আর তারপর আমরা ওটা নিয়ে আলোচনা করব। এমনভাবে একটু একটু করে একসাথে আমরা এগিয়ে যেতে পারব’।

এই কথা শুনেই ওর মনে হ’ল যন্ত্রটা বেঁধেছেঁদে নিয়ে এক্ষুনি চলে যাবে। কিন্তু আবার কৌতুহলবশত বা হয়তো নিজের অহংকারকে জয় করতে ও ওই টুকরোটা বাজাতে শুরু করল। বেশ অনেকগুলো মাত্রা পেরোনোর পর ওকে থেমিয়ে দিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন। এবারও ওর উঠে চলে যেতে ইচ্ছে করল। তারপর মনে মনে স্থির করে নিল, ভদ্রতা দেখিয়ে খুব বেশী হলে আর মাত্র পাঁচ মিনিট এই গায়েপড়া প্রশিক্ষণ ও সহ্য করবে। কিন্তু দেখল ও তার থেকে একটু বেশী রয়ে গেল, তারপর আরও একটু বেশী। ও কিছুটা বাজাচ্ছিল, আর তারপর তিনি আবার বলছিলেন। প্রথম চোটে তাঁর কথাগুলো দাম্ভিকতাপূর্ণ এবং ভিত্তিহীন শোনাচ্ছিল, কিন্তু ও যখন সেগুলোকে ওর বাজানোর মধ্যে দিয়ে আত্মস্থ করছিল, তখন তার প্রভাব দেখে আশ্চর্য হচ্ছিল। ঠিকভাবে বুঝে ওঠার আগেই আরও একঘন্টা কেটে গেল।

‘আমি হঠাৎ যেন কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম,’ ও আমাদের ব্যাখ্যা করে বলেছিল। ‘যেন একটা বাগান, যেখানে আমি এখনও ঢুকিনি। ওটা আগে থেকেই ছিল, কিছুটা দূরে। রাস্তায় অনেককিছু ছিল। কিন্তু সেটাই প্রথমবার, দেখলাম রয়েছে। বাগানটা আমি আগে কখনও দেখিনি’।

হোটেল থেকে ও যখন বেরোলো, সূর্য ডুবে গেছে। বাজারচত্বরটা পেরিয়ে ক্যাফের টেবিলগুলোর কাছে এসে পৌঁছল। তারপর মনের সুখে হুইপড ক্রিম দিয়ে একটা আমন্ড কেক নিয়ে বসল। মনের মধ্যে অহংকারের বিন্দুমাত্র তখন আর অবশিষ্ট ছিল না।

***

তারপর বেশ কিছুদিন বিকেলবেলায় ও নিয়মিত সেই হোটেলে যেতে লাগল, আর সববারেই ফেরার সময়, প্রথমবারের মতো আবরণ উন্মোচনের অভিজ্ঞতা না হলেও, মনটা অন্তত নতুন আশা উদ্দীপনায় ভরে থাকত। এদিকে তাঁর বলার মাত্রাও বেড়ে গিয়েছিল। বাইরের কেউ যদি সেখানে থাকত তবে নির্ঘাৎ ভাবত এ কী বেয়াদবের মতো কথা! কিন্তু টাইবরের সেইধরণের কথায় আর তেমনকিছু মনে হ’ত না। ওর তখন একটাই ভয়, কবে তাঁর এই শহরে থাকার দিন ফুরিয়ে যাবে, আর এই চিন্তাই ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত, রাতে ঘুমোতে দিত না। কিন্তু যখনই ও এই বিষয় নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করত, স্পষ্ট কিছু উত্তর পেত না। কখনও হয়তো বলতেন, ‘ওহ, যতক্ষণ পর্যন্ত ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারব’। আবার কখনও বলতেন, ‘আমার মনে হয়, যতদিন পর্যন্ত এখানে একঘেয়ে না লাগছে, ততদিন আমি আছি’।

‘কিন্তু উনি কার মতো বাজান?’ আমরা ওকে জিজ্ঞেস করেই যেতাম। ‘মানে চেলোতে। উনি কার মতো?’

প্রথমবার যখন আমরা প্রশ্নটা তুলেছিলাম, টাইবর আমাদের ঠিকমতো জবাব দেয়নি। শুধু বলেছিল, ‘উনি আমাকে বলেছেন উনি একজন সঙ্গীতবিশারদ, একদম গোড়া থেকে’, বলে প্রসঙ্গ পালটে দিয়েছিল। কিন্তু পরে যখন বুঝল আমরা ওকে রেহাই দেব না, ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাদের ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল।

বিষয়টা হ’ল, একদম প্রথমবারেই, টাইবরের কৌতুহল জেগেছিল তাঁর বাজনা শোনার, কিন্তু ও সেদিন এতটাই ভয় পেয়ে ছিল যে তাঁকে বলতে পারেনি। ওর একটু সন্দেহ হয়েছিল যখন ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখেছিল সেখানে তাঁর নিজের চেলোর কোনো চিহ্ন নেই। তারপর আবার মনে হয়েছিল, ছুটি কাটাতে এসে সঙ্গে চেলো নিয়ে আসেনি এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আবার এটাও মনে হয়েছিল যে হয়তো চেলো আছে—ভাড়া করা চেলো—বন্ধ বেডরুমের ভেতর রাখা আছে।

কিন্তু ওই স্যুইটে পরবর্তী সেশনগুলো যখন ও যেতে শুরু করল, তখন সন্দেহ আরও বাড়ল। ও যথাসম্ভব চেষ্টা করছিল মন থেকে সেসব হঠিয়ে দিতে। তিনি যে ওর বাজনা শুনছেন, এটাই ওর কাছে একটা বড় পাওনা। তাই একটা বিকেল থেকে আরেকটা বিকেলের মাঝের সময়টায় ও মনে মনে ভাবত পরেরদিন কী বাজাবে, তাতে তিনি কী মন্তব্য করবেন, তাঁর মাথা নাড়ানো, তাঁর ভ্রূকুটি, বাহবা জানানো, আর সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক, ওর সুরের আবেশে চোখ বন্ধ করে হাতের ভঙ্গিমার অনুকরণ। কিন্তু তবুও সন্দেহ যায় না, আর তারমধ্যেই একদিন ও ঘরে ঢুকে দেখল বেডরুমের দরজাটা আধখোলা। ভেতরেও পাথরের দেওয়াল, মান্ধাতার আমলের ছত্রী লাগানো খাট, কিন্তু চেলোর কোনো চিহ্ন নেই। একজন সঙ্গীতবিশারদ, যতই ছুটিতে থাকুন, এতদিন বাদ্যযন্ত্র না ছুঁয়ে থাকবেন? কিন্তু এই প্রশ্নটাও ও মনে থেকে দূর করে দিল।

***

গ্রীষ্ম চলাকালীনই ওদের আলাপ আলোচনা হোটেলের সেশন শেষ হবার পর ক্যাফের টেবিল অবধি এসে পৌঁছল। তিনি ওর জন্যে কেক, কফি, মাঝেমাঝে স্যান্ডুইচ কিনে দিতেন। তখন আর ওদের কথাবার্তা শুধু বাজনার মধ্যেই আটকে থাকত না। যেমন, তিনি হয়তো ওকে ভিয়েনায় ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা সেই জার্মান মেয়েটার কথা জিজ্ঞেস করতেন।

‘কিন্তু বোঝার চেষ্টা করুন, ও কোনদিনই আমার গার্লফ্রেণ্ড ছিল না,’ টাইবর তাঁকে বলত। ‘আমাদের মধ্যে তেমন কিছু ছিল না’।

‘তুমি বলতে চাইছো, তোমাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিল না? কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে তুমি ওকে ভালোবাসতে না’।

‘না, মিস এলুইজে, এটা ঠিক নয়। আমার ওকে ভালো লাগত ঠিকই, কিন্তু আমাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না’।

‘কিন্তু কাল যখন তুমি আমার ওখানে র‍্যাকমানিনভ বাজাচ্ছিলে, তোমার মধ্যে একটা আবেগ ফুটে উঠছিল। প্রেম, রোম্যান্টিক প্রেমের আবেগ’।

‘না, হতেই পারে না। ও আমার ভালো বন্ধু ছিল, কিন্তু আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল না’।

‘কিন্তু তুমি ওই অংশটা এমন বাজাও, মনে হয় যেন কোনো প্রেমের স্মৃতিতে বাজাচ্ছ। তোমার এত অল্প বয়স, তবু তুমি ত্যাগ জানো, বিচ্ছেদ জানো। এইজন্যেই থার্ড মুভমেন্টটা তুমি অমনভাবে বাজাতে পারো। বেশীরভাগ চেলোবাদকই ওই মুভমেন্টটা বাজায় আনন্দের সুরে। কিন্তু তোমার কাছে সেটা আনন্দের নয়, সেটায় থাকে আনন্দঘন মুহূর্তের স্মৃতি যা ছেড়ে গেছে চিরকালের মতো’।

ওদের মধ্যে এমন ধরণের আলোচনা হ’ত, আর তার পরিপ্রেক্ষিতে ওরও লোভ হ’ত তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করার। কিন্তু যেহেতু পেট্রোভিচের কাছে শেখাকালীন তাঁকে কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার সাহস ওর হয়নি, তাই এলুইজেকেও ও তেমন ধরণের কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি। পরিবর্তে, তাঁর উত্থাপন করা ছোটখাটো বিষয়গুলোতেই—যেমন পোর্টল্যাণ্ডে, ওরিগনে তিনি কেমনভাবে থাকতেন, সেখান থেকে তিন বছর আগে তিনি কীভাবে বোস্টন চলে গেছিলেন, দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে পারী-কে তিনি কেমন অপছন্দ করতেন—আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকত।

বন্ধুত্বের প্রথম দিনগুলোর তুলনায় এখন তিনি অনেক সহজেই হেসে ওঠেন, আর এক্সেলসিয়র থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে বাজারচত্বরটা পেরোলেই নিজের হাত দিয়ে ওর হাতটা জড়িয়ে নেবার অভ্যেস হয়ে গেছে। এই কারণেই আমাদের প্রথম নজর পড়েছিল ওদের দু’জনের ওপর। এক অদ্ভুত জুটি, ওকে যা ওর বয়স তার থেকে অনেক কমবয়সী দেখায়, আর সেই মহিলা কিছুটা মায়ের মতন, কিছুটা, এরনেস্টোর ভাষায়, ‘ছিনালী অভিনেত্রী’র মতো। টাইবরের সাথে আমাদের কথা শুরুর আগে, আমরা ওদের নিয়ে অনেক ফালতু আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করতাম, ব্যান্ডের সদস্যরা যেমন করে আর কি। ওরা যদি আমাদের সামনে দিয়ে হাত ধরাধরি করে হেঁটে যেত, আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলতাম, ‘কী মনে হচ্ছে? চক্কর চলছে, না?’ কিন্তু আন্দাজে এসব বলে মজা পেলেও, পরক্ষণেই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতাম এটা হতে পারে না; ওদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকা ভাবটাই নেই। আর তারপর টাইবরের সাথে আলাপ জমে যাবার পর, বিকেলবেলাগুলো তাঁর স্যুইটে গিয়ে কী কী হ’ত, ও নিজেই সেসব আমাদের বলত। আমাদের কেউই তখন ওকে টিটকিরি দেওয়া বা ওকে নিয়ে মজা করার কথা ভাবতাম না।

তারপর একদিন বিকেলে ওরা যখন স্কোয়্যারে কফি আর কেক নিয়ে বসেছিল, তিনি একজন লোকের সম্বন্ধে বলতে শুরু করলেন যিনি তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল পিটার হেন্ডারসন। তিনি ওরিগনে জমিয়ে গলফের ইক্যুইপমেন্ট বিক্রির ব্যবসা চালাতেন। কেতাদুরস্ত, ভদ্র, সমাজে সম্ভ্রান্ত ব’লে পরিচিত। এলুইজের থেকে বয়সে ছ’বছরের বড়, কিন্তু সেটা তেমন কিছুই না। আগের পক্ষের স্ত্রীর দু’টো বাচ্চা আছে বটে, কিন্তু সেসব আপসে ফয়সালা হয়ে গেছে।

‘তুমি এখন বলো আমি এখানে কী করছি,’ বোকা বোকা একটা হাসি হেসে তিনি বললেন। তাঁর এমন হাসি টাইবর আগে কখনও দেখেনি। ‘আমি গা-ঢাকা দিয়ে আছি। পিটার জানে না আমি কোথায়। আমি জানি আমি খুব নিষ্ঠুর। গত মঙ্গলবার আমি ওকে ফোন করেছিলাম, বলেছিলাম আমি ইতালিতে আছি, কিন্তু কোন শহরে সেটা বলিনি। আমার ওপর খুব রেগেছিল, আর মনে হয় সেটা অন্যায়ও কিছু নয়’।

‘তাহলে, আপনি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে গরমের ছুটি কাটাচ্ছেন,’ টাইবর বলল।

‘না, ঠিক তা নয়। আমি শুধু গা-ঢাকা দিয়ে আছি’।

‘এই পিটারকে আপনি ভালোবাসেন না?’

তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন। ‘ও খুব ভালো মানুষ। আর আমার সামনে যে অনেক সুযোগ আছে, তেমনটাও নয়’।

‘আপনার এই পিটার, গানবাজনা ভালোবাসেন?’

‘ওহ... এখন যেখানে আমি থাকি, ওখানে তো ওকে বলতেই হয়। সবচেয়ে বড় কথা, ও কনসার্টে যায়। আর তারপর, রেস্তোরাঁয় বসে, কনসার্টে যা শুনেছে সেসব সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বলে। তাই ও গানবাজনা ভালোবাসে সেটা তো স্বীকার করতেই হয়’।

‘কিন্তু তিনি... মানে, আপনার প্রশংসা করেন?’

‘ও জানে, একজন সঙ্গীতবিশারদের সঙ্গে থাকা চাট্টিখানি কথা নয়’। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলেন, ‘এটাই আমার সারা জীবনের সমস্যা। তোমার পক্ষেও এটা সহজ হবে না। কিন্তু তোমার আর আমার, আমাদের সত্যি কোনো উপায় নেই। আমাদের একটা সংকল্প আছে’।

এরপর তিনি আর কখনও পিটারের কথা তোলেননি। কিন্তু সেদিনের কথাবার্তার পর ওদের সম্পর্কের একটা নতুন দিক খুলে গিয়েছিল। ওর বিকেলের বাজনা শেষ হবার পর তাঁর চুপ করে থাকার সময়, অথবা বাজারচত্বরে একসাথে বসে থাকার সময়, তিনি যখন বিভোর হয়ে যেতেন, উদাস হয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, ও বুঝতে পারত ওর উপস্থিতি তাঁর কাছে কতটা কাম্য।

***

একদিন বিকেলে ওর একটা টুকরো বাজানো শেষ হ’লে, তিনি আবার একটা ছোট টুকরো বাজাতে বললেন—শুধু আট মাত্রা—শেষের দিক থেকে। যেমন বললেন, তেমনটাই ও বাজাল। কিন্তু তবুও তাঁর কপালে একটু ভাঁজ থেকে গেল।

‘এটা আমাদের মতো শোনাল না’, মাথা নাড়াতে নাড়াতে তিনি বললেন। যথারীতি, তিনি সেই বড় জানালাটার সামনে ওর ঠিক আড়াআড়ি বসেছিলেন। ‘বাকিটা যা বাজিয়েছ সব ঠিক আছে। বাকি সবটা আমাদের মতো। কিন্তু ওই অংশটা...’ তিনি একটু নড়ে বসলেন।

ও ওটা আবার বাজাল, অন্যভাবে, যদিও ঠিক কী বাজাতে চাইছে সেটা না বুঝেই, আর ও মোটেও অবাক হ’ল না যখন ও দেখল এবারেও তিনি মাথা নাড়াচ্ছেন।

‘স্যরি,’ ও বলল। ‘ব্যাপারটা আরেকটু স্পষ্ট করুন। “আমাদের মতো না” বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি না’।

‘তুমি কি বলতে চাইছ আমি তোমাকে বাজিয়ে দেখিয়ে দেব? তাই বলতে চাইছ?’

তিনি খুব শান্তভাবেই কথাগুলো বললেন। কিন্তু তারপর তিনি যেই ওর দিকে ঘুরলেন, ও টের পেল একটা আতঙ্ক ওদের মধ্যে নেমে আসছে। তিনি ওর দিকে তাকিয়ে আছেন একদৃষ্টিতে, প্রায় মরিয়া হয়ে, অপেক্ষা করছেন ওর উত্তরের।

অবশেষে ও বলল, ‘না, আমি আবার চেষ্টা করছি’।

‘তুমি হয়তো ভাবছ, আমি নিজে কেন বাজাচ্ছি না, তাই না? কেন তোমার যন্ত্রটা ধার নিয়ে যেটা বলতে চাইছি সেটা দেখিয়ে দিচ্ছি না’।

‘না...’ উদাসভাবে ও মাথা নাড়ল। ‘না, আমার মনে হয় এটাই ঠিক আছে, সবসময় যেমনভাবে আমরা চলি। আপনি মুখে বলে দেন, তারপর আমি বাজাই। এইভাবে করলে তো নকল করা এড়ানো যায়। আপনার কথাগুলো আমার কাছে এক একটা জানালা খুলে দেয়। আপনি যদি বাজিয়ে দেখিয়ে দেন, তাহলে সেই জানালাগুলো খুলবে না। আমার শুধু নকল করাই হবে’।

ওর কথাগুলো তিনি বিবেচনা করলেন, তারপর বললেন, ‘তুমি হয়তো ঠিক বলছ। বেশ, আমি আরেকটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি’।

পরের বেশ কিছুটা সময় তিনি এপিলোগ আর ব্রিজিং প্যাসেজের ফারাক নিয়ে বললেন। তারপর যখন ও আবার ওই কটা মাত্রা বাজাল, তিনি মুচকি হাসলেন আর সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন।

কিন্তু সেদিন বিকেলের সেই বাক্যবিনিময়ের মধ্যে দিয়ে কিছুটা অন্ধকার ঢুকে পড়েছিল। হয়তো সেটা ছিলই, কিন্তু আজ যেন সেটা বন্ধ কৌটো থেকে বেরিয়ে তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। আরেকবার, ওরা যখন বাজারচত্বরে বসেছিল, ও তাঁর কাছে গল্প করছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকাকালীন কীভাবে ওর অনেকগুলো আমেরিকান জিন্সের বদলে এই চেলোটার আগের মালিকের থেকে চেলোটা কিনেছিল। গল্পটা শেষ হ’লে তিনি অদ্ভুতভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘যন্ত্রটা তো বেশ ভালো। চমৎকার আওয়াজ। কিন্তু আমি এই যন্ত্র কখনও তোমার মতো এত ছুঁইনি, তাই আমি ঠিক এটার ভালোমন্দ বিচার করতে পারব না’।

ও বুঝতে পারছিল, তিনি একেবারে খাদের কিনারায় গিয়ে পৌঁছেছেন। তাই ও চট করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

‘আপনার মাপের শিল্পীদের জন্যে অবশ্য এই যন্ত্র যথেষ্ট নয়। এমনকি, আমার ক্ষেত্রেও এটা এখন যথেষ্ট নয়’।

কথা ঘোরানোর পরেও ওর ভয় হচ্ছিল পাছে উনি আবার ওই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তাই ও আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিল না। কথা বলার মধ্যে খুব আনন্দদায়ক পরিস্থিতিতেও ওকে সজাগ থাকতে হ’ত। ওই প্রসঙ্গ উঠলেই তাকে ধামা চাপা দিতে হ’ত। সবসময় হয়তো তাঁর কথা ঘোরানো সম্ভব হ’ত না। তিনি হয়তো বলছেন, ‘ওহ, এটা যে কী সহজ, আমি একবার বাজিয়ে দিলেই বুঝতে!’ সেক্ষেত্রে ও একদম না শোনার ভান করে থাকত।

***

সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি—বাতাসে তখন সবে হিমেল ছোঁয়া—জিয়ানকার্লো অ্যামস্টারডাম থেকে কাউফমানের ফোন পেল; শহরের কেন্দ্রস্থলে একটা ফাইভস্টার হোটেলে চেম্বার মিউজিকের একটা দলে চেলোবাদকের ভ্যাকেন্সি আছে। দলটা সপ্তাহে চারটে সন্ধ্যে ডাইনিং হল লাগোয়া মিন্সট্রেল গ্যালারিতে বাজায়, আর হোটেলে টুকটাক আরও কিছু কাজ করে। থাকাখাওয়ার চুক্তি আছে। শুনেই কাউফমানের টাইবরের কথা মনে হয়েছে এবং ওর জন্যেই পোস্টটা ধরা আছে। ফোন পাবার দিনেই সন্ধ্যেবেলা ক্যাফেতে গিয়ে আমরা টাইবরকে সবকিছু জানালাম। কিন্তু টাইবরের উদাসীনতা দেখে আমরা সকলেই ঘাবড়ে গেলাম। গ্রীষ্মের শুরুর দিকেও, যখন আমরা কাউফমানের কাছে ওর অডিশনের বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলাম, ওর যা মতিগতি ছিল, তার থেকে এখন সম্পূর্ণ আলাদা। ওর ওপর, বিশেষ করে, জিয়ানকার্লো ভয়ানক খাপ্পা হয়ে গেল।

‘তাহলে এসব নিয়ে এতো জলঘোলা করার কী ছিল?’ জিয়ানকার্লো ওর কাছে জানতে চাইল। ‘তুমি কী আশা করছিলে? কার্ণেগি হলে বাজাবে?’

‘আমি অকৃতজ্ঞ নই। তবু, বিষয়টা নিয়ে আমাকে আরেকটু ভাবতে হবে। লোকেরা যখন খাওয়াদাওয়া করতে করতে গল্পগুজব করবে, তখন তাদের জন্যে বাজানো। আর এই যে, হোটেলের অন্যান্য টুকটাক কাজ। এগুলো কি আমার মতো লোকের পক্ষে মানানসই হবে?’

জিয়ানকার্লো বরাবরই বদমেজাজী ছিল, চট করে মাথা গরম করে ফেলত। ও টাইবরের জ্যাকেট খামচে ধরে গালিগালাজ করতে যেতেই আমরা কোনমতে সামাল দিলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার টাইবরের পক্ষ নিয়ে কথা বলা উচিত মনে করল। তাদের মতে, যতই হোক, এটা তার জীবন, তাই যে কাজ তার পোষাবে না, সেটা করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একসময় সব থিতিয়ে পড়ল। টাইবরও মানল যে সাময়িকভাবে হ’লে কাজটা ভালোই। এরপর ও রাখঢাক না করেই বলল যে ট্যুরিস্টদের সীজন চলে গেলে তো শহরটা ব্যাকওয়াটার হয়ে যায়। সেদিক থেকে দেখলে অ্যামস্টারডাম তো অন্তত একটা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল।

‘আমি এই বিষয়টা নিয়ে আরও ভালো করে ভাবব,’ শেষে ও বলল। ‘যদি দয়া ক’রে কাউফমানকে ব’লে দাও যে আমি তিনদিনের মধ্যে আমার সিদ্ধান্ত জানাব, তাহলে খুব ভালো হয়’।

জিয়ানকার্লো এতে সন্তুষ্ট না হ’লেও—ও আশা করেছিল টাইবর একটু গদগদ হয়ে কৃতজ্ঞতাস্বীকার করবে—কাউফমানকে ফোন করে টাইবরের কথাটা জানিয়ে দিল। সেদিন সন্ধ্যের এই বাগবিতণ্ডায় এলুইজে ম্যাককরম্যাকের কথা একবারও ওঠেনি। কিন্তু এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিল যে ও সেদিন যা বলছিল তাতে তাঁর পুরো প্রভাব আছে।

‘ওই মহিলাই ওকে এরকম গোঁয়ারগোবিন্দ বানিয়েছেন,’ টাইবর চলে যাবার পর এরনেস্টো বলল। ‘এমন হাবভাব নিয়ে একবার অ্যামস্টারডাম যাক না, দেখবে সেখানে কেমন ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে’।

***

কাউফমানের কাছে অডিশনের কথা টাইবর এলুইজেকে কখনও বলেনি। অনেকবার বলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রত্যেকবারই পিছিয়ে গেছে। বন্ধুত্ব যতই গাঢ় হয়েছে, ততই এই প্রস্তাবে রাজি হওয়াটাকে ওর প্রতারণা মনে হয়েছে। তাই এই ব্যাপারে এলুইজের সঙ্গে আলোচনা করার ইচ্ছে আর ওর হয়নি বা কোনরকম আভাস দিতেও চায়নি। কিন্তু লুকোনোর ব্যাপারে ও একেবারেই পটু ছিল না, আর এই সিদ্ধান্তটা তাঁর কাছ থেকে গোপন রাখতে যাওয়ার ফল হ’ল একদম অন্যরকম।

সেদিন বিকেলের গরমটা ছিল অসহ্য। যথারীতি ও হোটেলে হাজির হয়ে বাজাতে শুরু করল। কিছু নতুন টুকরো, বাড়ি থেকে তৈরি করে এসেছে। মিনিট তিনেক বাজিয়েছে কি বাজায়নি, তিনি ওকে থামতে বললেন,

‘কিছু একটা গোলমাল লাগছে। তুমি যখন এসেছ, তখনই মনে হয়েছে। টাইবর, আমি তোমাকে এখন খুব ভালো করে বুঝি। দরজায় তোমার টোকা দেওয়া শুনে বলে দিতে পারি। এখন তোমার বাজনা শুনে নিশ্চিত হলাম। কোনো লাভ নেই, তুমি আমার থেকে লুকোতে পারবে না’।

ওকে একটু আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল। চেলোর ছড়টা পাশে নামিয়ে রাখতে রাখতে ও ঠিক করে নিলো সমস্ত কথা মন উজাড় করে তাঁকে বলে দেবে। কিন্তু তখনই তিনি হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করলেন,

‘এটা এমন একটা বিষয় যে এর থেকে চাইলেও আমরা পালতে পারব না। তুমি সবসময় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করো, কিন্তু তাতে কোনো লাভ নেই। আমি এটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। গত সপ্তাহের গোটাটা ধরে আমি চেষ্টা করছিলাম এটা নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে’।

‘সত্যি?’ অবাক হয়ে ও তাঁর মুখের দিকে তাকাল।

‘হ্যাঁ,’ তিনি বললেন। তারপর নিজের চেয়ারটাকে টেনে এনে একদম ওর মুখোমুখি বসলেন। ‘আমি তোমাকে কখনও ঠকাতে চাইনি, টাইবর। গত কয়েকটা সপ্তাহ ধরে আমার খুব খারাপ লাগছিল। তার ওপর তুমি আমার এত প্রিয় একজন বন্ধু। আমার খুব খারাপ লাগবে যদি তুমি কখনও ভাবো আমি তোমার ওপর কোনো সস্তা কায়দা ফলিয়েছি। না, প্লীজ, আমাকে এবার থামিয়ে দিও না। আমি বলতে চাই। যদি তুমি এক্ষুণি আমাকে ওই চেলোটা দিয়ে বাজাতে বলো, আমাকে না বলতে হবে, আমি বাজাতে পারব না। পারব না, কারণ যন্ত্রটা খুব ভালো নয় বলে না, তেমন কিছুই না। কিন্তু আমি যা নই, নিজেকে তাই দেখিয়েছি বলে তুমি যদি এখন আমাকে জালিয়াত ভাবো, তাহলে আমি বলব তোমার ভুল হচ্ছে। তুমি সেগুলো দেখো, যেগুলো আমরা দু’জনে মিলে অর্জন করেছি। সেটা কি আমি জালিয়াত নয় বলে প্রমাণ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়? হ্যাঁ, আমি তোমাকে বলেছিলাম যে আমি একজন সঙ্গীতবিশারদ। বেশ, এখন বলি কেন সেটা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম কারণ আমি জন্মেছিলাম এক বিশেষ প্রতিভা নিয়ে, ঠিক তুমি যেমন। তুমি আর আমি, আমাদের এমন কিছু আছে যেটা বেশীরভাগ চেলোবাদকেরই থাকবে না, তাতে তারা যতই কঠিন চর্চা করুক। চার্চে তোমার বাজনা যেদিন আমি প্রথম শুনেছিলাম, সেদিনই আমি তোমার মধ্যে সেটা খুঁজে পেয়েছিলাম। আর যেভাবেই হোক, তুমিও নিশ্চয়ই আমার মধ্যে সেটা খুঁজে পেয়েছ। সেইজন্যেই তুমি প্রথমবার বলাতেই এখানে চলে এসেছিলে।

‘আমাদের মতো বেশী কেউ নেই, টাইবর। আর আমরা একে অন্যকে চিনতে পেরেছি। আমি যে এখনও চেলো বাজাতে শিখিনি, তাতে কিছু উল্টেপাল্টে যায় না। তোমাকে বুঝতে হবে, আমি একজন সঙ্গীতবিশারদ। কিন্তু আমি হলাম এমন একজন যে এখনও উন্মোচিত হয়নি। তুমিও এখনও সম্পূর্ণ উন্মোচিত হওনি, আর বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি সেটাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি তোমার ওপরের পরতগুলো ঝরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি তোমাকে কখনও ঠকানোর চেষ্টা করিনি। শতকরা নিরানব্বই ভাগ চেলোবাদকের ক্ষেত্রে ওই পরতগুলোর নীচে কিছু নেই। তাদের উন্মোচন করারও কিছু নেই। তাই আমাদের মতো লোকেদের উচিত একে অন্যকে সাহায্য করা। আমরা ভিড়ে ঠাসা জায়গায় যখনই একে অপরকে দেখি না কেন, আমাদের একে অন্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, কারণ আমাদের মতো লোকের সংখ্যা খুবই সামান্য’।

ও দেখল তাঁর চোখ ছলছল করছে, কিন্তু গলার স্বর একদম স্থির। এরপর তিনি চুপ করে গিয়ে ওর দিক থেকে আবার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

‘তাহলে আপনি নিজেকে একজন বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন চেলোবাদক মনে করেন,’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও বলল। ‘একজন সঙ্গীতবিশারদ। মিস এলুইজে, আপনার কথা অনুযায়ী, আমরা বাকিরা সাহস করে, নীচে কী আছে সে সম্পর্কে না নিশ্চিত হয়েই, আমাদের নিজেদের উন্মোচন করব। আর আপনি, আপনি নিজেকে উন্মোচন করার ধার ধারবেন না। আপনি কিছুই করবেন না। এদিকে আপনি নিশ্চিত যে আপনি একজন সঙ্গীতবিশারদ...’

‘প্লীজ, রাগ কোরোনা। আমি জানি এটা একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা এটাই, এটাই সত্যি। আমার মা, তিনিই আমার এই বিশেষ ক্ষমতাটা চিনতে পেরেছিলেন, যখন আমি এইটুকু। অন্তত এইজন্যে আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার চার, সাত আর এগারো বছর বয়সে যে যে শিক্ষক তিনি আমার জন্যে খুঁজে দিয়েছিলেন, তারা কেউ ভালো ছিলনা। মা সেটা বুঝতে পারেননি, কিন্তু আমি পেরেছিলাম। বয়সে ছোট হলেও আমার মধ্যে সেই সহজাত ব্যাপারটা ছিল। আমি বুঝে গেছিলাম আমার এই বিশেষ ক্ষমতাটাকে এইসমস্ত লোকেদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে, যাদের হাতে পড়লে এটা পুরো ধ্বংস হয়ে যাবে, তাতে তাদের উদ্দেশ্য যতই ভালো থাকুক না কেন। তাই আমি তাদের রাস্তা বন্ধ করে দিলাম। তোমাকেও তাই করতে হবে, টাইবর। তোমার এই ক্ষমতা ভীষণ মূল্যবান’।

‘মাফ করবেন,’ বাধা দিয়ে টাইবর বলে উঠল, এবার অনেক নম্রভাবে। ‘আপনি বললেন ছোটবেলায় আপনি চেলো বাজাতেন। কিন্তু আজ...’

‘এগারো বছর বয়সের পর থেকে আমি আর চেলো ছুঁইনি। মিস্টার রথের কাছে কেন আর শিখতে পারব না তার কারণ ব্যাখ্যা করে যেদিন মাকে সব বললাম সেদিন থেকে। আর তিনি সবটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনিও বলেছিলেন কিছু না করে আমার অপেক্ষা করাই ভালো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে আমার বিশেষ ক্ষমতাটা নষ্ট হতে না দেওয়া। এখনও হয়তো আমার দিন আসতে পারে। হ্যাঁ, কখনও কখনও মনে হয় অনেকদিন হ’ল ছেড়ে দিয়েছি। আমার বয়স এখন একচল্লিশ। কিন্তু যে বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে আমি জন্মেছি, তা অন্তত আমি নষ্ট করিনি। এত বছরে আমি অনেক শিক্ষক দেখেছি যারা বিভিন্ন সময় আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল, কিন্তু আমি তাদের স্বরূপ বুঝতে পেরে গেছিলাম। টাইবর, কখনও কখনও আমাদের পক্ষেও বলা খুব কঠিন হয়ে যায়। এইসমস্ত শিক্ষকরা, এরা এতটাই... পেশাদার, এরা এতটাই ভালো কথা বলে যে শুনেই তুমি বুদ্ধু বনে যাবে। শেষে হয়তো তুমি কাউকে পেয়ে ভাববে সে তোমাকে সাহায্য করবে, সে হয়তো আমাদেরই মতো একজন। তারপর তুমি বুঝবে সে সেরকম কিছুই নয়। আর তখনই তোমাকে শক্ত হতে হবে আর নিজেকে বন্ধ করে দিতে হবে। মনে রেখো, টাইবর, অপেক্ষা করা সবসময় ভালো। কখনও কখনও এটা ভাবলে আমার খারাপ লাগে যে আমি এখনও আমার এই বিশেষ ক্ষমতাটা মেলেই ধরতে পারলাম না। কিন্তু আমি এটাকে নষ্ট করিনি, আর সেটাই হ’ল সবচেয়ে বড় ব্যাপার’।

ও তারপর তৈরি করে আসা গোটা দুয়েক টুকরো বাজাল, কিন্তু সেদিন কারুর মধ্যেই স্বাভাবিক ছন্দটা ছিল না বলে সেদিনের সেশনটা আগেভাগেই শেষ হয়ে গেল। তারপর হোটেল থেকে নেমে বাজারচত্বরে এসে ওরা কফি খেল, কিছু কথাবার্তা বলল। তারপর ও শহর ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে বাইরে যাবার পরিকল্পনার কথা তাঁকে জানাল। ও বলল ওর সবসময় আশপাশের গ্রামাঞ্চলগুলোতে বেড়াতে ভালো লাগে, আর সেজন্যেই ও কয়েকদিনের ছুটি কাটানোর ব্যবস্থা করেছে।

‘এতে তোমার ভালো হবে,’ তিনি মৃদুস্বরে বললেন। ‘কিন্তু বেশীদিন বাইরে থেকো না। আমাদের এখনও অনেককিছু করার বাকি আছে’।

বড়জোর এক সপ্তাহ, তার মধ্যেই ফিরে আসবে ব’লে ও তাঁকে আশ্বস্ত করল। তবুও যাওয়ার সময় দেখা গেল তাঁর হাবভাবে একটা অস্বস্তির ছোঁয়া তখনও রয়ে গেছে।

ওর যাবার ব্যাপারে পুরোটা সত্যি ও বলেনি; ওর তখনও পর্যন্ত কোনো তোড়জোড়ই ছিল না। সেদিন বিকেলে এলুইজের কাছ থেকে বেরিয়ে ও বাড়ি ফিরল। তারপর অনেকগুলো ফোনকল করল। সবশেষে আমব্রিয়ান সীমান্ত প্রদেশের পাহাড়ের ইউথ হস্টেলে একটা বেড ভাড়া করল। সেইদিন রাতেই ও ক্যাফেতে এলো আমাদের সাথে দেখা করতে। ওর বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান প্রোগ্রাম সব আমাদের বলল। আমরাও সবাই যে যেমন পারলাম উপদেশ দিলাম, কোথায় যাবে, কী দেখবে এসব নিয়ে। ও সেসব দিকে পাত্তা না দিয়ে কিছুটা ভয়ে ভয়ে জিয়ানকার্লোকে বলল সে যেন কাউফমানকে জানিয়ে দেয় যে ওর কাজটা নেবার ইচ্ছে আছে।

‘এছাড়া আমি আর কী করতে পারি?’ ও আমাদের জিজ্ঞেস করল। ‘আমার বেড়িয়ে ফিরে আসতে আসতে আমার হাতে আর কিছু টাকাই থাকবে না’।

***

গ্রামের দিকে বেড়াতে গিয়ে ছুটিটা ভালোই কাটল টাইবরের। যদিও কয়েকজন জার্মান হাইকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়া আর খেতে গিয়ে খরচখরচা একটু বেশী হয়ে যাওয়ার কথা ছাড়া ও বেড়ানো সম্বন্ধে আর তেমন কিছু আমাদের বলেনি। এক সপ্তাহ পরে ও যখন ফিরল, ওকে বেশ তরতাজা লাগছিল। কিন্তু ওর ভয়ও ছিল পাছে এরমধ্যে এলুইজে ম্যাককরম্যাক চলে যান।

ট্যুরিস্টদের ভিড়টা তখন আসতে আসতে কমে যাচ্ছিল। ক্যাফের ওয়েটাররা হীটারগুলো নামিয়ে ঝাড়পোছ করে বাইরের টেবিলগুলোর মাঝে বসাচ্ছিল। যেদিন ফিরল, সেদিন বিকেলেই টাইবর সময় মতো চেলো হাতে নিয়ে এক্সেলসিয়রে গিয়ে হাজির হ’ল। এলুইজে ওর জন্যে শুধুমাত্র অপেক্ষাই করছিলেন তাই নয়, ওর অভাবও অনুভব করেছেন যথেষ্ট। এসব দেখেশুনে টাইবর খুব খুশি হ’ল। বাড়িতে লোকজন এলে যেমন তাদের খাবারদাবার, পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করতে বাড়ির লোকজন ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তেমনি টাইবরকে নিয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আসার সাথেসাথেই ওকে টেনে নিয়ে গিয়ে সেই চেয়ারটায় বসালেন। তারপর নিজেই হন্তদন্ত হয়ে কেস থেকে চেলোটাকে বার করতে করতে বললেন, ‘চলো, বাজাও! এক্ষুণি আমার জন্যে বাজাও!’

বিকেলটা তাদের একসঙ্গে চমৎকার কাটল। তাঁর সেদিনের সেই স্বীকারোক্তি আর তারপর ওদের ওইভাবে বিদায় নেওয়ায় ওর আসার আগে একটু চিন্তা হচ্ছিল সব কেমন কী থাকবে না থাকবে। কিন্তু ওখানে গিয়ে পৌঁছনোর পর সব দুশ্চিন্তা উবে গিয়েছিল, আর পরিবেশটাও মনে হচ্ছিল আগের থেকে অনেক ভালো। এমনকি যখন, ওর একটা টুকরো বাজানোর পরে, তিনি চোখ বুজে ওর বাজনার লম্বাচওড়া সমালোচনা শুরু করলেন, তখনও ওর রাগ হ’ল না, বরং তাঁকে যতটা সম্ভব বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। পরের দিন এবং তার পরের দিন, একইভাবে চলল; বেশ নিশ্চিন্ত মনে, কখনও কখনও ঠাট্টাতামাশার মধ্যে দিয়ে, আর ওর মনে হতে লাগল ও জীবনে এত ভালো কখনও বাজায়নি। ওদের মধ্যে টাইবরের বেড়াতে যাবার আগের সেইসব কথাগুলো ওঠেনি, আর তিনিও ওর গ্রামে ছুটি কাটাতে যাওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। তাদের মধ্যে শুধু বাজনা নিয়েই কথা চলল।

ও ফিরে আসার চতুর্থ দিনের দিন এমন কয়েকটা গণ্ডগোল ঘটে গেল—যার মধ্যে একটা ছিল ওর ঘরের টয়লেটের সিস্টার্ন লিক করা—যাতে ওর এক্সেলসিয়রে পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেল। যাবার পথে ক্যাফের কাছাকাছি পৌঁছনর সময়েই আলো অনেক কমে গিয়েছিল, ওয়েটারগুলো কাচের পাত্রের ভেতর রাখা মোমবাতি জ্বালাচ্ছিল। আমাদের কয়েকজন ওখানে ছিলাম। ও হাত নাড়ল আমাদের দিকে, তারপর স্কোয়্যারটা আড়াআড়ি পেরিয়ে চলে গেল হোটেলের দিকে। চেলোটা সাথে নিয়ে হাঁটার জন্যে দূর থেকে ওকে দেখে মনে হচ্ছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।

ও খেয়াল করল সেদিন রিসেপশনিস্ট এলুইজেকে ফোন করতে একটু ইতস্তত করছে। তারপর ঘরের সামনে পৌঁছনর পর তিনি যখন দরজা খুলে ওকে অভ্যর্থনা জানালেন, কেমন যেন একটু খটকা লাগল। ও কিছু বলার আগেই তিনি তাড়াতাড়ি বলতে শুরু করলেন,

‘টাইবর, খুব ভালো লাগছে তুমি এসেছ। এইমাত্র আমি পিটারকে তোমার সম্বন্ধে সবকিছু বলছিলাম। ঠিক ধরেছ, অবশেষে পিটার আমাকে খুঁজে পেয়েছে’। তারপর তিনি ওকে নিয়ে ঘরে গেলেন, ‘পিটার, ও এসেছে! টাইবর এসেছে! আর সাথে চেলোটাও এনেছে!’

টাইবর ঘরে ঢুকতেই লম্বাচওড়া, একটু ঝুঁকে পড়া, পাকাচুলওয়ালা এক ভদ্রলোক হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন। গায়ে ফ্যাকাসে একটা পোলো শার্ট। তিনি খুব শক্ত করে টাইবরের হাতটা ধ’রে বললেন, ‘ওহ, তোমার কথা আমি সব শুনেছি। এলুইজে তো ধরেই নিয়েছে তুমি একজন বড় স্টার হবে’।

‘পিটার একদম নাছোড়বান্দা,’ এলুইজে বললেন। ‘আমি জানতাম ও আমাকে শেষমেশ খুঁজে বার করবেই’।

‘আমার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে পারবে না,’ পিটার বললেন। তারপর তিনি টাইবরের জন্য একটা চেয়ার টেনে এনে দিলেন। ক্যাবিনেটের আইস বাকেটে রাখা শ্যাম্পেনের বোতল থেকে এক গ্লাস শ্যাম্পেন ঢেলে টাইবরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এসো, টাইবর, আমার রিইউনিয়ন সেলিব্রেট করতে সাহায্য কর’।

টাইবর শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে খেয়াল করল পিটার নিতান্ত কাকতালীয়ভাবেই ওর চেলো বাজাতে বসা চেয়ারটা টেনে এগিয়ে দিয়েছেন। এলুইজে কিছুক্ষণের জন্যে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিলেন। হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস ধরা অবস্থাতেই টাইবর আর পিটার কথা বলছিল। পিটার স্বভাবে বেশ নম্র, টাইবরকে অনেককিছু জিজ্ঞেস করছিলেন। হাঙ্গেরির মতো একটা দেশে টাইবরের বড় হয়ে উঠতে কেমন লেগেছে? পশ্চিমের দিকে যখন প্রথম এসেছিল তখন কি খুব অবাক লেগেছিল?

‘আমি কোনো একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে চাই,’ পিটার বলতে লাগলেন। ‘তুমি খুব ভাগ্যবান। আমার খুব শিখতে ইচ্ছে করে। যদিও একটু দেরি হয়ে গেল মনে হয়’।

‘ওহ, আপনি কখনও বলবেন না দেরি হয়ে গেল,’ টাইবর বলল।

‘ঠিক বলেছ। দেরি হয়ে গেল বলাটা ঠিক নয়। দেরি হয়ে গেল বলাটা একটা অজুহাত। না, আসল কথা হ’ল, আমি খুব ব্যস্ত মানুষ। আমি মনে মনে বলি আমি ব্যস্ত বলে ফ্রেঞ্চ শিখতে পারছি না, কোনো বাজনা শিখতে পারছি না, ওয়র অ্যান্ড পীস পড়তে পারছি না। আর যা যা আমার করাবার ইচ্ছে ছিল। এলুইজে যখন বাচ্চা ছিল, ও বাজাত। আমার মনে হয় ও তোমাকে এই ব্যাপারে বলেছে’।

‘হ্যাঁ, বলেছেন। আমি বুঝি, তাঁর অনেক সহজাত গুণ আছে’।

‘ওহ, আছেই তো। যে ওকে জানে, সে-ই বুঝবে। ও ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ। ও এমন একজন যার উচিত এই সমস্ত কিছু শেখা। আর আমি, আমি একটা ঢ্যাঁড়স,’ ব’লে তিনি হাত তুলে হো হো ক’রে হাসতে লাগলেন। ‘আমার পিয়ানো শেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এমন হাত দিয়ে তুমি কী করবে? এই হাত দিয়ে মাটি কোপানোই ভালো হবে, যেটা আমার পূর্বপুরুষরা করতেন। কিন্তু ওই ভদ্রমহিলা’—ব’লে তিনি হাতের গ্লাসটা তুলে দরজার দিকে দেখালেন—‘ওর এই ব্যাপারে ভীষণ সংবেদনশীল’।

অবশেষ, একটা গাঢ় রঙের সান্ধ্য পোশাক আর অনেক গয়নাগাটি পরে এলুইজে বেডরুম থেকে বেরোলেন।

‘পিটার, টাইবরের মাথা খেয়ো না,’ তিনি বললেন। ‘গলফে ওর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই’।

পিটার হাত ছড়িয়ে দিয়ে সনির্বন্ধ দৃষ্টিতে টাইবরের দিকে তাকালেন। ‘টাইবর, তুমিই এখন বলো। আমি গলফ সম্বন্ধে একটা কথাও তোমাকে বলেছি?’

টাইবর বলল ওর এখন ফিরে যাওয়া উচিত; কারণ ও দেখতে পাচ্ছে ওর জন্যে তাদের ডিনারে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। এই শুনে ওঁরা দুজনেই একসাথে প্রতিবাদ করে উঠলেন। পিটার বললেন,

‘আমার দিকে তাকাও। আমাকে দেখে মনে হচ্ছে কি আমি ডিনারে যাবার পোশাক পরে আছি? তুমি কিছু না বাজিয়ে যেতে পারবে না। আমি তোমার বাজনা নিয়ে ইতিমধ্যে এত প্রশংসা শুনেছি’।

কী করবে ভেবে না পেয়ে, সবে টাইবর চেলো কেসটা খুলতে শুরু করেছে, তখন এলুইজে বেশ দৃঢ়ভাবে, একদম অন্য সুরে বলে উঠলেন,

‘টাইবর ঠিকই বলেছে। সময় হয়ে যাচ্ছে। এই শহরের রেস্তোরাঁগুলোয় সময় মতো হাজির না হ’লে ওরা তোমার জন্যে টেবিল ধরে রাখবে না কিন্তু। পিটার, তুমি জামাকাপড় বদলে নাও। দাড়িটাও কামিয়ে নেবে নাকি? আমি টাইবরকে একটু এগিয়ে দিতে যাচ্ছি। ওকে আলাদা করে কয়েকটা কথা বলার আছে’।

লিফটে নামার সময় ওরা শুধু চোখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসল, কোনো কথা বলল না। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল বাজারচত্বরের সব আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। স্থানীয় বাচ্চারা বলে লাথি মারছে, ফোয়ারাটার চারদিকে দৌড়দৌড়ি করছে। পুরোদমে সান্ধ্যভ্রমণ শুরু হয়ে গেছে আর আমার মনে হয় আমাদের গানের সুরও ভেসে ভেসে ওরা যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেই অবধি পৌঁছচ্ছিল।

‘হ্যাঁ, তাই হ’ল,’ অবশেষে তিনি বলে উঠলেন। ‘ও আমাকে খুঁজে বার করল। তাই আমার মনে হয়, ও আমাকে পাবার যোগ্য’।

‘খুব মজার মানুষ,’ টাইবর বলল। ‘এখন কি আমেরিকা ফিরে যাবেন ভাবছেন?’

‘হ্যাঁ, মনে হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যেই’।

‘বিয়ে করবার ইচ্ছে আছে নাকি?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে’। খুব আন্তরিকভাবে টাইবরের দিকে একঝলক তাকিয়ে নিয়েই আবার অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন, আর আবার একই কথা বললেন, ‘তাই তো মনে হচ্ছে’।

‘আপনার সুখশান্তি কামনা করি। উনি খুব দয়ালু মানুষ। গানবাজনাও ভালোবাসেন। আর এটা আপনার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ’।

‘হ্যাঁ। সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ’।

‘একটু আগে যখন আপনি তৈরি হচ্ছিলেন, আমরা গলফ নয়, গানবাজনা শেখার ব্যাপারে কথা বলছিলাম’।

‘ওহ, সত্যি? মানে, কার ব্যাপারে, ওর না আমার?’

‘দু’জনেরই। যাই হোক, আমার মনে হয় না, পোর্টল্যান্ড বা ওরিগনে খুব বেশী শিক্ষক পাবেন বলে, যারা আপনাকে শেখাতে পারবে’।

তিনি এবার হেসে ফেললেন। ‘আমি যেটা বলেছিলাম, আমাদের মতো মানুষদের পক্ষে এটা কঠিন’।

‘হ্যাঁ, আপনার প্রশংসা করতে হয়। এই বিগত কয়েক সপ্তাহের পর আরও বেশী করে আপনার প্রশংসা করতে হয়’। তারপর ও আরও বলল, ‘মিস এলুইজে, যাবার আগে একটা কথা আমি আপনাকে বলতে চাই। আমি খুব তাড়াতাড়িই অ্যামস্টারডাম চলে যাচ্ছি, ওখানে একটা বড় হোটেলে কাজ পেয়েছি’।

‘দারোয়ানের কাজ করতে যাচ্ছ?’

‘না, হোটেলের ডাইনিং-এ একটা চেম্বার মিউজিক ব্যান্ডের সাথে বাজাতে হবে। হোটেলের গেস্টরা যখন খাবেন, আমরা তখন তাঁদের মনোরঞ্জন করব’।

কথাগুলো বলতে বলতে ও এলুইজের দিকে লক্ষ করছিল, দেখল তাঁর চোখের মধ্যে কিছু একটা জ্বলে উঠেই যেন নিভে গেল। তারপর তিনি নিজের হাতটা ওর হাতের ওপর রেখে মৃদু হাসলেন।

‘ভালো কথা। শুভেচ্ছা রইল’। তারপর তিনি আরও যোগ করলেন, ‘ওই হোটেলের গেস্টদের জন্যে। তাদের জন্যে অনেক মজা অপেক্ষা করে রয়েছে’।

‘আমারও তাই মনে হয়’।

হোটেলের সামনের আলোর রোশনাইটা পার করে ওরা আরও কয়েকটা মুহূর্ত একসাথে দাঁড়িয়ে রইল, ওদের মাঝে বিশালাকার চেলোটা।

‘আর আমার এও মনে হয়,’ ও বলল, ‘আপনি পিটারের সঙ্গে খুব সুখী হবেন’।

‘আমারও তাই মনে হয়,’ তিনি বললেন আর আবার হেসে উঠলেন। এরপর তিনি ওকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে একটা চুমু খেলেন আর বললেন, ‘তুমি সাবধানে থেকো’।

টাইবর তাঁকে ধন্যবাদ জানাল, আর তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল তিনি পিছন ঘুরে এক্সেলসিয়রের দিকে হাঁটা লাগিয়েছেন।

***

এর কিছুদিন পরেই টাইবর আমাদের শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। শেষ যেদিন ওর সঙ্গে আমরা খানাপিনা করছিলাম, সেদিন খুব স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল ওর কাজটার জন্যে ও জিয়ানকার্লো আর এরনেস্টোর কাছে এবং বন্ধুত্বের জন্যে আমাদের সকলের কাছে কতটা কৃতজ্ঞ। কিন্তু তবুও আমি বুঝতে পারছিলাম, ও আমাদের একটু যেন এড়িয়ে চলছে। শুধু আমি নই, আমাদের মধ্যে আরও কয়েকজন এটা বুঝতে পেরেছিল, যদিও জিয়ানকার্লো তখন টাইবরের পক্ষই নিয়েছিল। তার বক্তব্য ছিল ও বেচারা জীবনের পরের ধাপে পা ফেলে ভীষণ উত্তেজিত আর ভীতও।

‘উত্তেজিত? ও উত্তেজিত হবে কী করে?’ এরনেস্টো বলেছিল। ‘গোটা গ্রীষ্মটা ও কাটিয়েছে এই জেনে যে ও একটা জিনিয়াস। সেই জায়গায় হোটেলে কাজ তো অবনতি। আমাদের সাথে বসে কথা বলাও ওর কাছে অবনতি। গ্রীষ্মের শুরুতে ও একটা দারুণ ছেলে ছিল। কিন্তু ওই মহিলা ওর যা করে গেলেন, তারপর ভালোই হ’ল আমাদের আর ওকে নিয়ে থাকতে হচ্ছে না’।

আমি এইসব যা বললাম, এগুলো সব ঘটেছিল সাত বছর আগে। সেইসময়ের ছেলেদের মধ্যে আমি আর ফ্যাবিয়ান ছাড়া জিয়ানকার্লো, এরনেস্টো, আরও অন্যান্যরা সব এদিকওদিক চলে গিয়েছিল। সেদিন ওকে ওই বাজারচত্বরে দেখার আগে অবধি আমার অনেক দিন আমাদের ওই ইয়াং হাঙ্গেরিয়ান ওস্তাদের কথা মনে ছিল না। ওকে চিনতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। একটু মোটা তো হয়েছেই, তার সাথে কাঁধের কাছটা অনেকটা চওড়া হয়েছে। আর যেভাবে আঙুলের ইশারায় ওয়েটারকে ডাকছে, তাতে—হতে পারে সেটা আমার অনুমান—ওকে অধৈর্য্য, কিছু তিক্ততার কারণে রুক্ষ বলে মনে হচ্ছিল। হতে পারে, আমার এই ভাবনাটা ঠিক নয়। যতই হোক, আমি ওকে একঝলক মাত্র দেখেছি। তাতেই আমার মনে হচ্ছিল ওর অল্পবয়সের সেই লোককে খুশী করার প্রবণতা, তখনকার সেই সাবধানী আচরণ আজ আর নেই।

আমি ওর কাছে গিয়ে কথা বলতে পারতাম, কিন্তু আমাদের বাজানো শেষ হবার পর দেখা গেল ও ওখান থেকে তার আগেই চলে গেছে। আমার মনে হচ্ছিল, ও শুধুমাত্র বিকেলের জন্যেই এখানে এসেছিল। একটা স্যুট পরেছিল—খুব একটা জেল্লাদার কিছু নয়, সাধারণ একটা স্যুট—বোধহয় কোনো অফিসে ডেস্কে বসে কাজ করে। হতে পারে কাছাকাছি কোথাও কোনো কাজে এসেছিল, আর পুরোনো দিনের টানে আমাদের শহরে এসে হাজির হয়েছিল। কে জানে? যদি ও আবার এই স্কোয়্যারে ফিরে আসে, আর আমি তখন না বাজাই, তাহলে আমি ওর কাছে যাব আর ওর সঙ্গে একটু কথা বলল।

এক রাতের গল্প


অলংকরণ - অরিজিৎ ঘোষ

সেবার বেড়াতে গিয়ে তিনদিন আটকে পড়ে ছিলাম হোটেলেই। কারণটা আর কিছু নয় বৃষ্টি আর বৃষ্টি। আর সঙ্গে এলোমেলো হাওয়া। পাহাড়ের সবই ভাল তবে বৃষ্টি শুরু হলেই মুস্কিল। দোষ আমারই, সেপ্টেম্বর মাসে পাহাড়ে যায় কেউ? এসেছিলাম ইস্ট সিকিমের অখ্যাত একটা গ্রামে। ওয়েদার যে এত খারাপ হবে বুঝতে পারিনি। আমি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টিটিভের কাজ করতাম। নানা জায়গায় ঘুরতে হত কাজের জন্য। কাজের জন্যই এসেছিলাম সিকিমের রংপো। ভাগ্যিস অফিসের কাজ আমি প্রথমদিনেই মিটিয়ে নিয়েছিলাম। কোম্পানি থেকে আমার জন্য একটা নিম্নমানের হোটেল ঠিক করেছিল। অর্ধেক সময় কারেন্ট থাকত না। জেনারেটরও ছিল না। আমার বয়স বছর তিরিশ হবে। বাড়িতে মা, বোন, দিদি, ভাই অনেকের দায়িত্ব। সেই সময় মোবাইল ছিল না। ৯০ এর দশক চলছে। চিঠির যুগ। এখন আমার অনেক বয়স। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবি। এই ঘটনাটা মনে পড়লে এখনও ভয় লাগে। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভাবলাম লিখে ফেলি। গল্পের পাঠকই বিচার করবেন অলৌকিক বলে সত্যি- ই কিছু আছে কি? না, সবটাই উদ্ভট মস্তিষ্কের কল্পনা? আমি নিজে অলৌকিক কিছু মানি না। স্নায়ুর রোগ থাকলে এরকম অনেক অলৌকিক জিনিস দেখা যায়।

সিকিমে আগেও এসেছি তবে এমন বৃষ্টির মধ্যে পড়িনি কখনও। আমি যে হোটেলে ছিলাম সেখানে সম্ভ্রান্ত লোক বিশেষ আসে না। সেই সময় টুরিস্ট খুব কম ছিল। যে ক'জন ছিল কর্মসূত্রেই এসেছিল আমার মতন। তবে একজন ছিল অন্যরকম। তাঁকে দেখলে সমীহ হত। একমুখ দাড়ি হলেও ভদ্রলোক বেশ সুদর্শন। বয়স চল্লিশের বেশি। বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের লোক, দেখেই মনে হত। ওঁর মধ্যে এমন কিছু ছিল, চট করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। কারোর সঙ্গেই কথা বলতেন না। সব সময় মোটা একখানা বই নিয়ে বসে থাকতেন রিসেপশানে। আদৌ পড়তেন কি-না জানি না, অনেক সময় দেখেছি বই এর দিকে দৃষ্টি নেই ওপরে কিছু দেখছেন, আর কীসব বিড়বিড় করে বলছেন।

একদিন রাত্তিরে মোমবাতির আলোয় ডিনার করছি। বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। ভৌতিক এক রহস্যময় পরিবেশ, আমার মন্দ লাগছিল না। খাবার ঘরে আমি ছাড়াও কয়েকজন ছিল। খেতে খেতে মুখ তুলে দেখি সেই দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক একটু দূরে একটা টেবিলে বসে আছেন এবং আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। কারেন্ট এসে গিয়েছিল তাই বুঝতে পারলাম। আমিও তাকিয়ে রইলাম। উনি কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলেন না। নিজের টেবিল থেকে উঠে তিনি চলে এলেন আমার টেবিলে। বললেন, ‘আপনার আপত্তি না থাকলে এখানে বসতে পারি কি?’

‘হ্যাঁ বসুন না!’ এ ছাড়া আর কিই বা বলতাম?

‘আসলে আজ রাত্তিরটা খুব ভয়াবহ।’ ভদ্রলোকের চোখে মুখে একটা আতঙ্ক দেখতে পেলাম।

আমি হেসে ফেললাম। বললাম,' বৃষ্টি দেখে বলছেন? এরকম রাতেই তেনারা আসেন শুনেছি।’

ভদ্রলোক কিন্তু হাসলেন না। তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে আমায় দেখতে লাগলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন?’

এবার আর না বলতে পারলাম না। মা এত পুজো আচ্ছা করেন! হাতে ধাগা বেঁধে দিয়েছেন মা দুর্গার। আমরা সবাই মানি ভগবানকে। ভদ্রলোক হেসে উঠলেন। ‘প্লাস থাকলে মাইনাস থাকবে। পজিটিভ এনার্জি থাকলে নেগেটিভ এনার্জি থাকবে। ভগবান থাকলে শয়তানও থাকবে।’

আমি চুপ করে ছিলাম। আমাদের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোকের চোখে মুখে ভয় ফুটে উঠল আবার। বললেন, ‘জানেন আজ ২১ সেপ্টেম্বর। আমার জন্মদিন।’

‘শুভ জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা আপনাকে।’

আমার শুভেচ্ছায় খুশি হতে পারলেন না। বললেন, ‘আজকের দিনেই সেই ভয়ানক ঘটনাটা ঘটে। আজকের দিনেই সে আমাকে নিয়ে যেতে চায়। আমাকে একটু সময় দিতে পারবেন? আমি আপনাকে সব বলতে চাই। সব কনফেস করব আবার যদি সে আমায় মুক্তি দেয়।’

বললাম, ‘বলুন না! আমরা ঘরে গিয়ে বসি।’ ভদ্রলোক মানসিক ভাবে অসুস্থ। এইসব মানুষের একটু কেয়ার দরকার।

আমরা দোতলায় এলাম। ভদ্রলোককে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। বিছানার ওপর আমি বসলাম আর ভদ্রলোক বসলেন চেয়ারে। নিজের কথা শুরু করলেন।

‘আমি সুমন ব্যানার্জি। এখানেই একটি কলেজে অধ্যাপনা করি। ছোট থেকেই পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলাম। বেড়ে উঠেছিলাম বিত্তশালী পরিবারে। বাবা মা দুজনেই ভাল চাকরি করতেন। আমি কনভেন্টে পড়াশোনা করতাম। কখনও সেকেন্ড হইনি জীবনে। খুব অহঙ্কার ছিল আমার। দেখতেও মন্দ ছিলাম না। আমি নিজে জানতাম আমি সুদর্শন। একদিন স্কুল থেকে কলেজে গেলাম। বোটানি অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম নামি একটি কলেজে। সেখানে প্রচুর মেয়ে বন্ধু হল। আমার মন জয় করার চেষ্টা করতো তারা। আমি সব বুঝতে পারতাম। আর মনে মনে ভীষণ খুশি হতাম। আমার বাড়ির খুব কাছেই থাকত পিসি - পিসেমশাই। পিসি হাউস ওয়াইফ আর পিসেমশাই ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। স্বচ্ছলতা ছিল পরিবারে। পিসেমশাই প্রচুর সম্পত্তি পেয়েছিলেন পৈত্রিক সূত্রে। তাঁদের কোনও সন্তান ছিল না। আমি যাতায়াত করতাম প্রায়-ই। ওঁরাও আমাকে খুব ভালবাসতেন। পিসেমশাই এর বাড়ির তরফে আর কোনও আত্মীয় বিশেষ কেউ ছিল না। আমি জানতাম আমি নিজেই একদিন এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হবো। কিন্তু আমার মনে কোনও লোভ ছিল না। কারণ আমি যথেষ্ট অর্থবান পরিবারের ছেলে। এবং পড়াশোনাতেও ভাল তাই উজ্জ্বল কেরিয়ার পেতে আমার অসুবিধা হবে না।

এর মধ্যে একদিন ঘটে গেল এক দুর্ঘটনা। পিসি আর পিসেমশাই একটি মেয়েকে দত্তক নিলেন। আমার আদরের ভাগীদার এসে গেল। আমি আর আগের মত স্বচ্ছন্দ ভাবে ওই বাড়িতে যেতে পারতাম না। মেয়েটিকে বোন বলে মানতে পারিনি। সম্পূর্ণ উড়ে এসে জুড়ে বসা এক মেয়ে। অজ পাড়া গাঁয়ের মেয়ে। জানি না পিসি আর পিসেমশাই এর মন কী করে জয় করেছিল! নাকে নোলক আর তেলে জবজবে চুল, ডুরে শাড়িকে দেখলেই গা জ্বলে উঠত আমার। কমলা প্রথমে এসেছিল বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সে গুণ করে ফেলল আমার পিসি আর পিসেমশাইকে। ওঁরা আইনসন্মত ভাবে ওকে দত্তক নিলেন। কমলা প্রাইভেটে পড়াশোনা করতে লাগল। ডুরে শাড়ি ছেড়ে রেশমি শাড়ি ধরল। চুলে তেলের বদলে দামি শ্যাম্পুর সুবাস পেতাম। দামি পারফিউম আর ম্যাচিং জুয়েলারিতে নিজেকে সব সময় সাজিয়ে রাখত। এক এক সময় ভুলে যেতাম আমিও, যে একে আমি পচ্ছন্দ করিনা। কমলা পড়াশোনায় ভাল ছিল। মাধ্যমিক ভাল ভাবেই উতরে গেল। কলেজে ভর্তি হল। আমাকে দাদা দাদা করে পাগল করে দিত। বাচ্চা মেয়ে ছিল কতই বা বোঝে সংসারের মারপ্যাঁচ। পিসি মাঝে মাঝে অনুযোগ করতেন আজকাল কম আসি বলে। আমি বলতাম পড়াশোনার চাপে আটকে গেছি। তখন আমি এম.এসসি পড়ছি। ভাই দ্বিতীয়ার সময় আমি বেড়াতে চলে যেতাম প্রতিবার বা মামার বাড়ি যেতাম মামাতো বোনেদের থেকে ফোঁটা নিতে। কমলার হাত থেকে ফোঁটা নিতে রুচি হত না।

একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে দেখলাম কমলা একটি ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে এক পার্কের সামনে। ছেলেটিকে দেখেই মাথায় আগুন জ্বলে উঠল কেন জানি না। খুব লোফারের মত দেখতে। কমলার রুচি আর কত ভাল হবে। ইস, এইভাবে আমার পিসির টাকা নষ্ট করছে। যে টাকায় একদিন আমার সম্পূর্ণ অধিকার হতো।

বাবার মুখে একদিন শুনলাম পিসেমশাই আর পিসি নাকি ওঁদের সমস্ত সম্পত্তি কমলাকে দিয়ে যাবেন। আমি এতদিন জানতাম অর্ধেক সম্পত্তি আমি অন্তত পাবো। পিসির বাড়ি যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিলাম।

একদিন সকালে শুয়ে ছিলাম নিজের ঘরে। দুমদুম দরজায় ধাক্কা শুনে উঠে বসলাম। আমি শুয়ে থাকলে কেউ আমাকে এভাবে ডাকে না। খুলে দেখি কমলা দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি। আমার ঘরে ঢুকে পড়ল হুড়মুড় করে। আমাকে প্রণাম করল। হাতে বেঁধে দিল রাখী। আমি হাত থেকে রাখী খুলে ফেলে দিলাম ঘরের মেঝেতে। বললাম, ‘আমার ঘরে এভাবে কেন এসেছিস? খুব ভাল করেই জানিস তোকে আমি বোন বলে মনে করিনা। বেরো এখান থেকে!’ এত রুঢ় ব্যবহার সে আমার কাছে আশা করেনি।

কমলা কেমন থতমত খেয়ে গেল। বলল, ‘দাদা তুমি আমার সঙ্গে কেন এরকম করছ? আজ রাখী আর আজ তোমার জন্মদিন ও। আমি তোমায় শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলাম।’

‘যা এখান থেকে। আমার থেকে দূরে থাকলেই তোর ভাল হবে। জোর করে সম্পর্ক পাতানো যায় না। যেটা তুই ভাল পারিস, কিন্তু আমার কাছে পারবি না। আমি পিসি পিসেমশাই এর মত দুর্বল চরিত্রের নই।’

‘তোমার মধ্যে দেখছি মনুষ্যত্ব বোধ নেই।’ এই কথায় প্রচণ্ড রেগে গেলাম, কমলাকে এক প্রচণ্ড চড় কষিয়ে দিলাম। ও মেঝেতে পড়ে গেল। কমলা আস্তে আস্তে নিজেই উঠে দাঁড়াল। আমার মুখের দিকে একবার তাকাল। সুন্দর দুই চোখে জলের ধারা। আমার মায়া হল না। মুখ ফিরিয়ে নিলাম। মেঝে থেকে রাখীটা কুড়িয়ে নিল হাতে। তারপর আর দাঁড়াল না বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।’

সুমনবাবু থামলেন। বোতল থেকে একটু জল খেলেন। আমি এতক্ষণ দম বন্ধ করে শুনছিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তারপর কী হল’?

‘তারপর আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেল। সেই দিন কমলা আর বাড়ি ফিরল না। একটা অ্যাকসিডেন্ট কেড়ে নিল ওর জীবন। বাবার মুখে শুনেছি হাতের মুঠিতে তখনও ধরা ছিল সেই রাখী। পিসির সব সম্পত্তি পেয়েছিলাম।’

‘তাহলে কমলা এইভাবে আপনাকে মুক্তি দিল?’

‘নাহ! সে আমাকে মুক্তি দেয়নি।’ চিৎকার করে উঠলেন সুমনবাবু।

‘সেই রাতেই কমলা আমার ঘরে আসে। চোখে জল। মাথার এক জায়গা থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। হাতে ধরা সেই রাখী। আমি চেঁচিয়ে উঠি, কিন্তু ও যায় না। কতবার বলেছি আমাকে ক্ষমা করিস তুই। কিন্তু ও শোনে না। প্রথম কিছু বছর সে রোজ আসতো। গত দু বছর ধরে সে এই ২১ সেপ্টেম্বর রাত বেছে নিয়েছে। ওই যে শুনতে পাচ্ছেন না ওর পায়ের শব্দ। নূপুরের শব্দ হচ্ছে ওই তো।’

‘ঝড়ের শব্দ ছাড়া আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। দরজায় যে আঘাতের শব্দ হচ্ছে সেটা ঝড়ের জন্য হচ্ছে।’ মাথা নেড়ে বললাম। সত্যিই মনে হচ্ছে কেউ যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। প্রকৃতিই মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়।

‘কারণ আপনার সাথে তার কোনও শত্রুতা নেই। জানেন আমার স্ত্রী আমাকে পাগল ভেবে ছেড়ে চলে গেছেন! কিন্তু আমি পাগল নইইইই! আমার মা বাবা গত হয়েছেন মনের কষ্ট নিয়ে, যে একমাত্র ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি যক্ষের মত এত সম্পত্তি নিয়ে পড়ে রয়েছি। কমলা সত্যিই আসে প্রতি জন্মদিনের রাতে। কী করে বোঝাই আপনাকে!’ সুমন বাবু দাঁড়িয়ে পড়েন। উত্তেজিতভাবে সারা ঘর পায়চারি করতে লাগলেন। দপ করে ঘরের আলো নিভে গেল। বাইরে জোর বাতাস বইছে। ঘরের দরজা খুলে গেল বিচ্ছিরি একটা শব্দ করে। বললাম, ‘হাওয়ায় খুলে গেছে দরজাটা। এইসব সস্তার হোটেলের ঘরের ছিটকিনিও তেমন মজবুত নয়।’ আমি মোমবাতি ধরালাম। দরজা বন্ধ করতে গেলাম। আমার সঙ্গে একটা ঠাণ্ডা কিছুর জোর ধাক্কা লাগল। ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপট ছাড়া আর কিছুই নয়। উফ একদলা বরফের সঙ্গে যেন আমার কলিশান লাগল। পড়ে গেলাম মেঝেয়। সুমন বাবু হাসলেন। আমি হেসে বললাম, ‘প্রকৃতির তাণ্ডবকে ভৌতিক কিছু ভাববেন না।’ মোমের আলোয় দেওয়ালে আমাদের নিজেদেরই কালো কালো ছায়া দেখে অসহ্য লাগছে। সুমনবাবুকে আমি হাল্কা ডোজের একটা ঘুমের ওষুধ দিলাম। উনি আমার বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। চেয়ারে বসে আমিও চোখ বুজলাম। মনের মধ্যে অপরাধবোধ থেকে সুমনবাবুর আজ এই দশা। বাথরুমে যাবার দরকার পড়ল। চোখ খুলতেই দেখলাম দেওয়ালে এক কালো বিশাল ছায়া। আস্তে আস্তে সেই ছায়া সুমন বাবুর শরীরের ওপর চেপে বসেছে। আর কিছুই আমি দেখিনি। আমার এতক্ষণের সাহস আমাকে ছেড়ে বিদায় নিল। ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। সেই ছায়া অদৃশ্য হল। তারপর দুর্গা নাম জপেছিলাম বাকি রাতটুকু।

সকাল থেকে ঝড় বৃষ্টি একদম কমে গেল। তবে রাস্তা বন্ধ হয়ে সে আরেক গল্প। এদিকে সুমনবাবু একদম সুস্থ হয়ে গেলেন। মনেই হচ্ছিল না এনাকে মানসিক রোগী মনে হচ্ছিল ক'দিন আগেই। আমার সঙ্গে ভালই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সিকিমের বাড়িতে উনি একাই থাকতেন একজন বিশ্বস্ত কাজের লোককে নিয়ে। ওনার এই অসুস্থতা বছরের এই নির্ধারিত সময়েই বা দিনেই দেখা দিত। অনেক চিকিৎসা করেও ভাল হননি। আমাদের মধ্যে পত্রালাপ চলত। আমি বলেছিলাম, ‘আপনি নিজেকে ক্ষমা করে দিন। অনেক কষ্ট নিজেকে দিয়েছেন আর নয়।’ উনি হেসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘নাহ। সে আমাকে ক্ষমা করেনি। ওই রাত আমি যেখানেই থাকি লন্ডন বা প্যারিস, কলকাতা বা সিকিম, বড়লোকি হোটেল বা সস্তার হোটেল সে ঠিক আসবে।’ আরও পাঁচ বছর পর এক ২১ সেপ্টেম্বরের রাতে সুমনবাবুর মৃত্যু হয়েছিল ঘুমের মধ্যে। আমাকে ফোনে জানিয়েছিল ওঁর সবসময়ের বিশ্বস্ত হেল্পিং হ্যান্ড মহেন্দ্র। আমিই ফোন করেছিলাম সুমন বাবুকে। মহেন্দ্র জানিয়েছিল গোটা ব্যাপারটা। আমি এখনও ভাবি সেই ঝড় জলের অন্ধকার রাতে দেওয়ালে আর সুমন বাবুর শরীরের ওপর যার কালো অশুভ ছায়া দেখেছিলাম, সে কি সত্যিই ওপার থেকে এসেছিল না আমার মনের কল্পনা! আর বরফের মত ঠাণ্ডা কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ব্যাপারটাও কেমন যেন অদ্ভুত মনে হয়। কিছুই বুঝতে পারি না, আসলে মনের অসুখ বড় ছোঁয়াচে জিনিস।