ঋজু গাঙ্গুলী
Showing posts with label ঋজু গাঙ্গুলী. Show all posts

পোকা ● ঋজু গাঙ্গুলী

 


 

“সুলু সাগরের ঝড় নিয়ে কেউ কাব্য-কবিতা লেখেননি। আসলে লেখার জন্য বেঁচে থাকলে তো! আমাদের জাংক যেভাবে খেলনার মতো ওঠানামা করছিল তাতে আমারও মনে হচ্ছিল— অদ্যই শেষ রজনী, থুড়ি দিন। ঠিক কোথায় আছি, এমনকি কত ঘণ্টা ধরে এই ঢেউ আর বৃষ্টির মধ্যে জাহাজ বাঁচানোর চেষ্টা করছি— খেয়াল ছিল না। কুচকুচে কালো মেঘে ঢাকা আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলক আশপাশ সাদা করে দিচ্ছিল মাঝেমধ্যেই। কিন্তু তাতেও জল ছাড়া কিছুই নজরে পড়ছিল না!

রণ - ঋজু গাঙ্গুলী

অলংকরণ - ষ্টারলগ ম্যাগাজিনে গল্পটি প্রকাশের সময় Boris Vallejo-এর আঁকা ছবি

কারসন চোখ খুলল।

মাথার ওপরে হালকা নীলাভ আকাশ। ও মাটি... না, বালির ওপর শুয়ে আছে। একটা ধারালো পাথর ওর পিঠের নীচে থাকায় ওর ব্যথা লাগছে। একদিকে কাত হল ও। তারপর হাত-পায়ে ভর দিয়ে উঠে বসল।

“আমার মাথাটা গেছে!” বিড়বিড় করল কারসন, “নয়তো আমি মারা গেছি।”

কথাটা ভাবার কারণ ছিল। যে বালিতে কারসন বসে ছিল তার রঙ উজ্জ্বল নীল! ওই রঙের বালি পৃথিবীতে হয় না। অন্য কোনো গ্রহেও হয় বলে কারসনের জানা নেই।

নীল রঙের একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি ডোমের নীচে নীল বালিতে বসে আছে ও!

হ্যাঁ, কারসন স্পষ্ট বুঝতে পারল, ওর মাথার ওপরে যা আছে সেটা আকাশ নয়। দূরে কোথাও একটা জায়গায় সেই ওলটানো বাটির মতো জিনিসটা শেষ হয়েছে। নীল রঙটার দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা যায় না, অস্বস্তি হয়।

কিছুটা বালি হাতের মুঠোয় নিয়ে ও আবার ছেড়ে দিল। বিভ্রম নয়, এটা বালিই। ওর ঘর্মাক্ত হাতে তার কয়েকটা দানা লেগে রইল।

ঘাম? তাই তো। বেশ গরম লাগছে। ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ওর উন্মুক্ত পা দিয়ে। উন্মুক্ত??!

তাই তো! ও একেবারে উলঙ্গ! সেই অবস্থায় শরীরের যেখানে-যেখানে ওই নীল বালি লেগেছে, সেই জায়গাগুলোর রঙ নীল। কিন্তু বাকি শরীর স্বাভাবিক রঙই দেখাচ্ছে। কিছুটা আপনমনেই কারসন ভাবল, “যদি আলোটা নীল হত, তাহলে আমার গায়ের রঙটাও তাই দেখাত। সেটা যখন নয়, তার মানে বালিটা সত্যিই নীল। নীল বালি! আমি কোথায় আছি?”

জায়গাটা গরম। ভীষণ গরম... নরকও তো গরম বলেই ও পড়েছে। কিন্তু নরকের রঙ বোধহয় লাল। তাহলে এটা নরক নয়। তবে কি বুধ? বুধ ভয়ঙ্কর গরম ঠিকই। কিন্তু বুধ তো ওর অবস্থান থেকে প্রায় চারশো কোটি মাইল দূরে।

ওর অবস্থান!

এক ঝটকায় কারসনের সব মনে পড়ে গেল। প্লুটোর কক্ষপথের বাইরে নিজের ছোট্ট স্কাউটশিপে ছিল ও। ওর থেকে লাখ দশেক মাইল দূরেই অবস্থান করছিল পৃথিবীর আর্মাডা। তখনই ওদের স্ক্যানারের রেঞ্জে এসে পড়েছিল বহিরাগতদের একটা স্কাউটশিপ। অ্যালার্মটা আর্তনাদ করেছিল কান-ফাটানো আওয়াজ তুলে। তারপর...

 

এই বহিরাগতদের সম্বন্ধে পৃথিবীতে কেউ কিচ্ছু জানে না। কেমন দেখতে এরা, কী খায়, এমনকি কোত্থেকে এরা এসেছে, সবটাই অজানা। কৃত্তিকা নক্ষত্রমণ্ডলীর দিক থেকে ওরা এসেছে, শুধু এটুকুই নিশ্চিত।

প্রথমে পৃথিবীর সুদূরতম আউটপোস্টগুলোয় হামলা হয়। নজরদারি করা স্পেসশিপের সঙ্গে বহিরাগতদের ছোটো-ছোটো দলের সংঘর্ষ হয়। কোনোটায় পৃথিবীর বাহিনী জেতে, কোনোটায় তারা। কিন্তু একটা জাহাজও ধরা যায়নি। পৃথিবীর যেসব স্টেশন বা কলোনির ওপর হামলা হয়েছিল, সেখানেও কেউ বেঁচে ছিল না যারা হানাদারদের চেহারার বর্ণনা দিতে পারে।

প্রথমদিকে এই হামলাগুলো সংখ্যা বা নৃশংসতায় উল্লেখযোগ্য ছিল না। কিন্তু অবস্থাটা ক্রমেই বদলায়। এটাও স্পষ্ট হয় যে অস্ত্রের দিক দিয়ে পৃথিবীর ফাইটার স্পেসশিপগুলো এগিয়ে থাকলেও গতি আর নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বহিরাগতরা এগিয়ে আছে।

পৃথিবী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী আর্মাডা তৈরি হয়। শুরু হয় অপেক্ষা। তারপর, সৌরজগৎ থেকে প্রায় দু’হাজার কোটি মাইল দূর থেকে বেশ কিছু স্কাউটশিপ খবর পাঠায়, এগিয়ে আসছে বহিরাগতদের বিশাল বাহিনী। সেই জাহাজগুলো ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু তাদের বার্তা থেকে স্পষ্ট, হানাদারদের এই বাহিনী হয় এসপার নয় ওসপার করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।

স্কাউটশিপে বসে কারসন নিজের জীবনের প্রথম লড়াইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছিল। ও জানে, মহাকাশে একটা যুদ্ধ তিন সেকেন্ডের বেশি টেকে না। তাই স্ক্যানারে বহিরাগত স্কাউটশিপটা দেখামাত্র নিজের নার্ভাসনেস, শুকিয়ে আসা ঠোঁট, গলা দিয়ে পিত্ত উঠে আসার তিতকুটে স্বাদ, এ-সব ভুলে কন্ট্রোল প্যানেলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেটাকে নিশানায় নিয়ে তিন...দুই...এক-এর পর যেই ও ফায়ার করতে যাবে, তখনই স্ক্রিন থেকে গায়েব হয়ে গেছিল বহিরাগত স্কাউটশিপটা!

পাগলের মতো এদিক-ওদিকে খুঁজে কারসন একটু পরেই সেটাকে স্ক্রিনে ফিরে পায়। ও দেখে, স্কাউটশিপটা সোজা নামছে মাটির দিকে। ও-ও সেদিকে ঝাঁপ দেয়।

মাটি?!

ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে এতক্ষণে কারসনের খেয়াল হয়। প্লুটোর কক্ষপথের বাইরে যে বিন্দুতে ও ছিল তার সবচেয়ে কাছাকাছি গ্রহ বলতে নেপচুন, সেও প্রায় তিনশো কোটি মাইল দূরে! প্লুটো তো সূর্যেরও ওপাশে। তাছাড়া ওর ডিটেক্টরেও তো কোনো গ্রহ বা ওইজাতীয় বড়ো কিছু ধরা পড়েনি তার আগে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে ওর ওসব ভাবার অবস্থা ছিল না। যাতে মাটিতে আছাড় না খায় সেজন্য কনট্রোলের সঙ্গে যুদ্ধ করতেই কারসন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মরিয়া হয়ে ব্রেক চেপা আর ডানদিকে ঘোরার চেষ্টা করতে গিয়েই ও একলহমার জন্য চোখে অন্ধকার দেখেছিল। আর তারপর এখানে!

 

চারদিকে তাকিয়ে দেখে কারসন। না, ওর স্কাউটশিপ, এমনকি মহাকাশ অবধি দেখা যাচ্ছে না।

উঠে দাঁড়ায় ও। মাধ্যাকর্ষণ কি পৃথিবীর চেয়ে একটু বেশি? হতে পারে।

যতদূর চোখ যায় নীল বালি ছড়িয়ে আছে একেবারে সমতল হয়ে। মাঝেমধ্যে কিছু কাঁটাঝোঁপ, তবে সেগুলোও নীল রঙের নানা শেডের।

সবচেয়ে কাছের নীল ঝোপের তলা থেকে বেরিয়ে এল একটা গিরগিটি। গিরগিটি? চারটের বেশি পা আছে বলে মনে হচ্ছে! গায়ের রঙটাও গাঢ় নীল। কারসন-কে দেখে সেটা আবার ঝোপে ঢুকে গেল।

আকাশ... না, নীল রঙের ওলটানো বাটির মতো ছাদটার নীচে যে জায়গাটা রয়েছে, তার মাঝামাঝি রয়েছে ও। কাছের দেওয়াল বোধহয় একশো গজ দূরে হবে। দূরের দেওয়ালের নীচে লালচে রঙের কিছু একটা জিনিস পড়ে আছে, যার চেহারাটা ঠিকমতো বোঝা না গেলেও কারসনের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল।

তারপরেই ওর মাথার মধ্যে ভেসে এল কথাগুলো।

“আকাশ অনন্ত। মাত্রার সংখ্যাও অসীম। তবু দুটি প্রজাতি মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এদের সংঘর্ষের পর একটি নিশ্চিহ্ন হবে। যেটি টিকে থাকবে সেটিও এতই দুর্বল হয়ে পড়বে যে এগিয়ে চলার বদলে তারা পিছিয়ে যাবে বোধবুদ্ধিহীন স্থবিরতায়। কিন্তু আমি এটা হতে দেব না।”

“আপনি...” কারসন মুখ খুলল না, তবু প্রশ্নটা ওর মনে জমাট বাঁধল, “আপনি কে?”

“আমি কে সেটা তুমি পুরোপুরি বুঝবে না। আমাকে...” কারসনের মনে হল, যেন তার মাথা ঘেঁটে কোনো যথাযথ শব্দ খুঁজে আনতে চাইল কেউ, “বিবর্তনের শেষ ধাপের একজন বলতে পার। তোমরা, বা যাদের তোমরা বহিরাগত বলছ তারা প্রগতির শেষ ধাপে পৌঁছলে আমার মতো হবে, যেখানে একটা গোটা প্রজাতির চেতনা মিশে গিয়ে একটাই সত্তা তৈরি হয়। অমর, অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন, চেতনার অতীত। কিন্তু এই জায়গায় আসতে গেলে তোমাদের শুধু টিকে থাকলেই চলবে না, নিরন্তর এগিয়ে যেতে হবে। যদি তোমাদের যুদ্ধ হয়, তাহলে সেটা অসম্ভব।

তাই আমি হস্তক্ষেপ করব। তারপর যেকোনো একটিই জাতি টিকে থাকবে, অন্যটি নয়।”

“কে...?” কারসন বুঝতে পারল, ওর গলা এতটাই শুকিয়ে আসছে যে ইচ্ছে থাকলেও ও প্রশ্নটা করতে পারত না।

“যে বেশি শক্তিশালী, সেই টিকে থাকবে। অন্যজন নয়।” আওয়াজটা কারসনের মাথায় গমগমিয়ে ওঠে। “সেজন্যই আমি যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে বাইরের দিকের দু’জনকে বেছেছি। তোমাকে, আর অন্যদের একজনকে। দু’জনকেই আমি নিয়ে এসেছি এমন পরিবেশে যা দু’জনের কাছেই অচেনা, এবং একইরকম অস্বস্তিকর। তুমি এবং তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী, দু’জনেই এখানে নিরস্ত্র, বিবসন। তোমাদের মধ্যে কারও যদি গায়ের জোর ঘটনাচক্রে বেশি হয়েও থাকে, সেটার ব্যবহারে আমি বাধা দেব। এই লড়াইয়ে বুদ্ধি আর সাহস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাহস, যেটা না থাকলে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।”

“কিন্তু ইতিমধ্যে তো দুটো বাহিনী...”

“না। স্থান-কালের যে বিন্দুতে তোমরা আছ সেটা আলাদা। যতক্ষণ না তোমাদের এই লড়াইয়ের একটা ফয়সলা হয়, ততক্ষণ এই রণক্ষেত্রের বাইরে সর্বত্র সময় থেমে থাকবে।

আমি বুঝতে পারছি, তুমি ভাবছ এই জায়গাটা সত্যি কি না। এটা সত্যি, আবার সত্যি নয়ও। তোমার সীমিত বোধবুদ্ধি দিয়ে ব্যাপারটা বোঝা শক্ত। তাই এটুকু বলি যে এখানে তোমাদের যা কিছু সহ্য করতে হবে সেটা আসল। তুমি এখানে মারা গেলে সেটা হবে আসল মৃত্যু। আর তোমার মৃত্যুর অর্থ হবে তোমার প্রজাতির মৃত্যু। তোমার এটুকুই জানা দরকার। ব্যস।”

কারসন বুঝতে পারল, ওর মাথার মধ্যে আর কণ্ঠস্বরটা নেই।

 

হঠাৎ কারসন দেখল, দূরে পড়ে থাকা লাল রঙের গোল জিনিসটা, যেটা দেখতে রোলারের মতো হলেও আসলে ওর বহিরাগত প্রতিদ্বন্দ্বী, ওর দিকে গড়িয়ে আসছে। রোলারটা কাছে এগিয়ে আসামাত্র কারসন বুঝতে পারল ঘৃণার একটা ঢেউ যেন ওখান থেকে বেরিয়ে ওকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। সেই ঘৃণা এতই নিঃসীম, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এতটাই হিংস্রতা, যে কারসনের শরীর গুলিয়ে উঠল।

আশেপাশে তাকিয়ে কারসন বুঝল, রোলার, বা গোলকটা এত দ্রুত এগোচ্ছে যে ওর পক্ষে দৌড়ে সেটাকে পেছনে ফেলা অসম্ভব। লুকোনোর মতো কোনো জায়গাও ও দেখতে পেল না। মরিয়া হয়ে একটা ধারালো পাথরের টুকরো হাতে নিয়ে তৈরি হল কারসন। প্রতিপক্ষের সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই ওর। তবু, লড়াই না করে ও হার মানবে না।

গোলকটা দ্রুত ওর দিকে ধেয়ে এল। দশ গজ... পাঁচ গজ...! তারপর ওটা থেমে গেল।

না। ওটাকে থামিয়ে দেওয়া হল। থামবার আগে ওটার একটা দিক চ্যাপ্টা হয়ে গেছিল। ওরকম হয় যখন কোনো বল দেওয়ালে এসে লাগে। ঠিক বলের মতোই কিছুতে ধাক্কা খেয়ে ওটা পিছিয়ে গেল। তারপর ওটা আবার এগিয়ে এল। ধীরে, সতর্কভাবে। আবার ওটা একই জায়গায় থেমে গেল। কিছুটা পাশে সরে গিয়ে ওটা আবার চেষ্টা করল, কিন্তু এবারও ওটা আটকে গেল।

আহ্‌! ব্যাপারটা কারসন বুঝতে পারল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে সমতা রক্ষার জন্য একটা অদৃশ্য দেওয়াল, বা বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। পার্থিব বিজ্ঞানের পক্ষে বোঝা অসম্ভব এমন একটা ফোর্স ফিল্ড। আর সেটা এই জায়গার দেওয়ালের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত অবধি ছড়িয়ে রয়েছে। এই ব্যাপ্তিটা বোঝার জন্য কারসনকে কষ্ট করতে হল না। গোলকটাই কয়েক ইঞ্চি পরপর অদৃশ্য দেওয়ালটার কাছে এসে বোঝার চেষ্টা করছিল, কোথাও কোনো ফাঁক আছে কি না যেটা দিয়ে ওটা এদিকে আসতে পারে।

না। কোনো ফাঁক পায়নি ওটা। কারসন নিজেও কয়েক পা এগিয়ে হাত বাড়িয়েই বুঝতে পারল, ওর সামনে একটা মসৃণ, অনেকটা রবারের মতো নমনীয় কিছু রয়েছে। নমনীয়, তবে অভেদ্য। উষ্ণ, তবে পায়ের নীচের বালির চেয়ে বেশি গরম নয়। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে কারসন বুঝতে চাইল, দেওয়ালটা উপরদিকে কতটা রয়েছে। যতদূর অবধি ও পৌঁছতে পারল দেওয়ালটা যে তা ছাড়িয়েও ওপরে উঠে গেছে এটা বোঝা গেল। এমনকি বালি সরিয়ে ও তার নীচেও খুঁজল। হ্যাঁ, ফুট দুয়েক নীচেও দেওয়ালটা রয়েছে।

তাহলে?

এই অদৃশ্য বাধাটা পেরিয়ে যাওয়ার একটা রাস্তা নিশ্চয় আছে, কারসন ভাবল, নইলে এই দ্বৈরথের তো কখনোই সমাপ্তি ঘটবে না।

ইতিমধ্যে গোলকটা সন্তর্পণে বাধার সর্বত্র খুঁজতে-খুঁজতে ওর কাছে এসে পৌঁছেছিল। কারসনের থেকে বড়োজোর ছ’ফুট দূরত্বে ওটা থেমে গেল। কারসনের মনে হল, ওকে খুঁটিয়ে দেখছে ওর প্রতিদ্বন্দ্বী। অথচ গোলকটাতে কয়েকটা খাঁজ ছাড়া ও চোখ বা কান জাতীয় কিছু দেখতে পেল না। ওই খাঁজগুলোর মধ্যে দুটো থেকে ইঞ্চিখানেক ব্যাসের, দেড় ফুট মতো লম্বা দুটো শুঁড় বেরিয়ে এসে বালিটা ছুঁয়ে, চেপে দেখল। গোলকটা যখন সচল থাকে তখন ওই শুঁড়গুলো যে ভেতরে ঢুকে যায়, এটা কারসন বুঝল। ও এ-ও বুঝল যে গোলকটার নড়াচড়ার জন্য দায়ী তার ভেতরে কিছু একটার এগিয়ে-পিছিয়ে যাওয়া, অনেকটা... ট্যাংকের মতো!

গোলকটার দিকে তাকালেই কারসনের সারা শরীর একটা অদ্ভুত ভয়ে কেঁপে উঠছিল। ও বুঝতে পারছিল, ছ’ফুট দূরত্বে থাকা প্রাণীটি শুধু চেহারায় নয়, মনের দিক দিয়েও সম্পূর্ণ আলাদা, ‘প্রাণী’ বলতে যা কিছু ও জানে বা বোঝে তার সংজ্ঞার বাইরে।

প্রাণীটি টেলিপ্যাথি জানে কি না, সে ব্যাপারে কারসন নিশ্চিত ছিল না। তবে যেভাবে তার ঘৃণা একটা অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো কারসনকে প্লাবিত করেছিল কিছুক্ষণ আগে, তাতে ও বুঝেছিল যে কোনোভাবে নিজের অনুভূতি বা ভাবনাকে ছুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা প্রাণীটির আছে। হয়তো সে ওর ভাবনা বুঝবে এই আশায় কারসন দুটো কাজ করল।

প্রথমে ও হাতিয়ার হিসেবে কিছুক্ষণ আগে বেছে নেওয়া পাথরের টুকরোটাকে নীচে ফেলে দিল। যেমনটা লোকে করে অস্ত্র সমর্পণ বোঝাতে।

দ্বিতীয়ত, ও জোর গলায় বলে উঠল, “আমাদের মধ্যে কি শান্তি একেবারেই অসম্ভব?” সেই আদিগন্ত শূন্যতায় কারসনের নিজের কানেই কথাগুলো বড়ো অদ্ভুত শোনাল। তবু ও বলে চলল, “আমাদের যে এখানে এনেছে, সেই বলেছে, যদি আমরা লড়াই করি তাহলে কী হবে। শুধু একজন নয়, একটা গোটা প্রজাতি মরে যাবে তার ফলে। তার বদলে আমরা যদি নিজেদের মতো থাকি, নিজের-নিজের ছায়াপথে, তাহলে কী ক্ষতি? আমরা কি যুদ্ধ না করে এই ব্যাপারটাতে একমত হতে পারি?”

উত্তর এল। ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো ঘৃণা, আক্রোশ, আর রক্ততৃষ্ণার লাল রঙে ছোপানো ভাবনাগুলো ওকে আঘাত করল। টাল সামলানোর জন্য কয়েক পা পিছিয়ে গেল কারসন। বড়ো-বড়ো শ্বাস ফেলে ও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।

দুর্বল লাগছিল কারসনের। কিন্তু ওর ভাববার ক্ষমতা আর মনের জোর অটুট ছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নীচু অথচ স্পষ্ট গলায় কারসন বলল, “তোমার উত্তরটা পেয়েছি। একদম স্পষ্ট ভাষায়। তাই হোক তবে। যুদ্ধ... আমৃত্যু।”

যে প্রাণী এমনভাবে মনোভাব ছুড়ে দিতে পারে, তাকে কি মনের দিক দিয়ে কাবু করা সম্ভব? কারসন নিজের ভেতরের সবটুকু ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা সংহত করে শত্রুর মৃত্যুকামনা করল, তবে তাতে লাভ হল না। বরং দারুণ গরমে ওর মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। বালিতে বসে ও গোলকটাকে দেখায় মনোযোগী হল, যাতে তার কোনো দুর্বলতা থাকলে সেটা ওর চোখে ধরা পড়ে।

 

শুঁড়গুলোর মাথা দ্বিধাবিভক্ত, অনেকটা দুটো আঙুলের মতো। গোলকটা শুঁড় বাড়িয়ে অদৃশ্য দেওয়ালের ওপাশের ঝোপ থেকে ডাল ভাঙছিল। কারসন প্রাণীটির উদ্দেশ্য বুঝতে পারছিল না। তবে তার দেখাদেখি ও নিজেও ওইরকম মোটা ডাল ভাঙতে লাগল। এতে আর কিছু হোক না-হোক, ওই শুঁড়গুলো আর ওর হাতের জোরের তুলনা করা যাবে। ডালগুলো ভাঙতে ওর কষ্ট হল না, যার অর্থ গোলকটা বাইরের শক্ত খোলের আড়ালে আদতে হয় দুর্বল, নইলে ওকে ঠকানোর চেষ্টা করছিল। পায়ের কাছ থেকে ও আবার পাথরের টুকরোটা কুড়িয়ে তৈরি হল।

গোলকটা ঝোপের চারপাশ খুঁজতে গিয়ে হঠাৎই একটা নীল গিরগিটি পেয়ে গেল। গিরগিটিটা শুঁড়ের মধ্যে ধরা পড়ে ছটফট করছিল। গোলকটা গিরগিটির শরীর থেকে একটা-একটা করে পা ছিঁড়ে নিতে লাগল। কারসনের সারা শরীর এই অকারণ নৃশংসতায় গুলিয়ে উঠল। তবু, ও চোখ সরাল না শত্রুর থেকে। প্রাণপণে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা গিরগিটিটা কিছুক্ষণ পর স্থির হয়ে গেল। হয়তো জীবিত অবস্থায় সেটাকে আরও কষ্ট দেওয়া যাবে না বলেই গোলকটা কারসনের উদ্দেশে মৃত গিরগিটিটাকে ছুড়ে দিল।

গিরগিটির শরীরটা কারসনের পায়ের কাছে এসে পড়ল।

বিদ্যুদ্বেগে দুয়ে-দুয়ে চার করল কারসন। যেকোনো কারণেই হোক না কেন, মাঝের দেওয়ালটা এখন আর নেই। সেজন্যই গিরগিটিটার মৃতদেহ ওর কাছে পৌঁছেছে। শত্রুর অকারণ নৃশংসতা আর অবস্থার গুরুত্ব ওকে যে কতটা রাগিয়ে তুলেছিল সেটা ও নিজেও বোঝেনি। কিন্তু এবার ও কিছু না ভেবেই পাথরটা নিয়ে পাগলের মতো ছুটে গেল গোলকটার দিকে।

কিন্তু দেওয়ালটা সরেনি। দারুণ ধাক্কা খেয়ে চোখে সর্ষেফুল দেখল কারসন। মাটিতে পড়ে যাওয়া অবস্থা থেকে ও আবার উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল। হঠাৎ ওর খেয়াল হল, কিছু একটা উড়ে আসছে ওর দিকে। একদিকে ঝাঁপ দিয়ে মাথা বাঁচাতে পারলেও বাঁ পায়ের নীচের মাংসল দিকটায় একটা তীব্র ব্যথা টের পেল ও। ব্যথা উপেক্ষা করে পেছনদিকে গড়িয়ে গেল কারসন। সেই অবস্থাতেই মাথা তুলে ও দেখল, গোলকটা দুই শুঁড়ের মধ্যে একটা বড়ো পাথর তুলে ওর দিকে তাক করছে।

পাথরটা ওর দিকে উড়ে এল। কারসন সহজেই পাথরটাকে পাশ কাটাতে পারল। ও বুঝতে পারল, সোজা ছুড়তে পারলেও কোনো পাথরকে খুব একটা দূরে, বা খুব বেশি জোরে ছুড়তে পারছে না গোলকটা। নিজেকে গালাগাল দিল কারসন। আগের পাথরটা ওর গায়ে লেগেছিল কারণ ও ভ্যাবলার মতো বসে ছিল বালিতে। কিন্তু এখন...

চার গজ দূর থেকে একটা ফুট তিনেক চওড়া গোলক ফসকানোর মতো লোক কারসন নয়। ওর হাত থেকে ধেয়ে যাওয়া পাথরটা সপাটে গোলকটার গায়ে আছড়ে পড়ল। ধারালো দিকটা লাগলে পরিণাম আরও সন্তোষজনক হত নিঃসন্দেহে। তবে চ্যাপ্টা দিকের মার খেয়েও গোলকটা যে কিছু শিখেছে সেটা বোঝা গেল। আরেকটা পাথর তোলার চেষ্টা ছেড়ে দ্রুত পিছিয়ে গেল সেটা। যতক্ষণে কারসন আরেকটা পাথর তাক করেছে ততক্ষণে গোলকটা ওর থেকে প্রায় চল্লিশ গজ দূরে চলে গেছে।

কারসনের মুখে হাসি ফুটল। এই রাউন্ডটা ওই জিতেছে। নেহাত পা দিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছে! তবে এটা নিজে থেকেই থেমে যাওয়া উচিত, কারণ শিরা বা অন্য কিছু কেটেছে বলে মনে হচ্ছে না। কারসন বরং অদৃশ্য দেওয়ালটার স্বভাব বুঝতে উদ্যোগী হল।

দেওয়ালটা ঠেলে কারসন বুঝল, ওটা ওকে যেতে দেবে না। অথচ হাতে বালি নিয়ে সেটা পাচার করার চেষ্টা করে ও দেখল, বালিগুলো ওপাশে পড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ পাথর, বালি, গিরগিটির শরীরটা...

তার মানে কি এই যে নিষ্প্রাণ জিনিসই দেওয়ালটা পেরিয়ে যেতে পারে?

তত্ত্বের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ এল ঝটপট। ঝোপঝাড় নেড়ে আর একটা নীল গিরগিটি পেয়ে সেটাকে ধরল কারসন। ওটা ছুটে পালানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেই সুযোগ না দিয়ে কারসন গিরগিটিটাকে দেওয়ালের দিকে ছুড়ে দিল।

গিরগিটিটা ছিটকে ফিরে এল!

কারসন বুঝল, ওর ধারণাটাই সত্যি। জীবন্ত কিছুই এই দেওয়ালটা পেরিয়ে যেতে পারবে না।

নিজের পায়ের ক্ষতস্থানটা ভালো করে দেখে কারসন এও বুঝল যে রক্তপাত থেমে আসছে। তবে জায়গাটা জল দিয়ে একটু ধুতে পারলে ভালো হত।

জল!

কথাটা ভাবামাত্র তেষ্টায় কারসনের নির্জীব লাগল। ও বুঝতে পারল, জল খুঁজে না পেলে এই লড়াইয়ে ও এমনিতেই হেরে যাবে। বাঁ পা-তে যাতে চাপ না পড়ে সেজন্য সামান্য খুঁড়িয়ে ও দেওয়ালের এ-পাশে, মানে এই রণক্ষেত্রে ‘ওর’ দিকটা ভালোভাবে খুঁজে দেখতে চেষ্টা করল।

 

কিন্তু না। পুরো জায়গাটা, মানে একপাশের ধূসর নীলচে দেওয়াল থেকে অন্যদিক অবধি পুরো জায়গাটা বারবার ঘুরেও কারসন জল পেল না। ও নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে এখানে আসার পর থেকে খুব বেশি হলে ঘণ্টাচারেক কেটেছে। তাতে ওর এতটা জলের জন্য ব্যাকুল হওয়া উচিত নয়। তবু কারসনের শরীর, মন, মাথা সবকিছু তেষ্টায় ছটফট করতে লাগল। অসহ্য তাপ, নীল বালি, নিথর ভারী বাতাস, ঘর্মাক্ত অবস্থা, আর তৃষ্ণা... সব মিলিয়ে কারসন বুঝতে পারল, ওর শরীর লড়াই থেকে পালিয়ে যেতে চাইছে। বালিতে বসে পড়ল ও। তখনই ওর নজর পড়ল বেশ কিছুটা দূরে নিস্পন্দ হয়ে বালিতে বসে থাকা গোলকটার দিকে।

কী যেন বলেছিল সেই কণ্ঠস্বর? হ্যাঁ... একইরকম অস্বস্তিকর! অর্থাৎ শুধু ও নয়, ওর প্রতিদ্বন্দ্বীও এইমুহূর্তে ছটফট করছে জল, বা ওইরকম কিছুর অভাবে।

উঠে দাঁড়াল কারসন। ওর পা এখন ব্যথায় টন্‌টন্‌ করছে। শরীর দুর্বল। জল পাওয়া যাবে না। তবু একটা চেষ্টা ওকে করতেই হবে। এই লড়াইয়ের ফয়সলা যদি করতে হয় তাহলে তার জন্য ওর হাতে খুব বেশি সময় নেই। একটা সময়ের পর ওর শরীর জবাব দিয়ে দেবেই। কিছু একটা ওকে করতে হবে। এখনই। কিন্তু কী করতে পারে ও?

ঠান্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করল কারসন। ও বুঝতে পারল, পা-র একটা ব্যবস্থা করতে না পারলে ও অসহায় হয়ে পড়বে। জল নেই, তাই নিরুপায় হয়ে ঝোপের দিকেই এগোল ও। পাতা বা ওইজাতীয় কিছু একটা ছিঁড়ে ও তাই দিয়ে সযত্নে ক্ষতস্থানটা যথাসাধ্য পরিষ্কার করল। বালি আর জমে থাকা রক্ত ঝরে যাওয়ার পর জায়গাটাকে বাঁধতে গিয়ে কারসন বুঝল, ঝোপের মধ্যে লতানে গাছের আকর্ষগুলো ভয়ানক শক্ত। ছিঁড়তে না পেরে সেগুলোকে ধারালো পাথর দিয়ে কেটে আলাদা করল। তারপর পাতা আর ওই লতা দিয়ে জায়গাটা বাঁধল, যাতে চট করে আবার রক্ত না বেরোয়।

এরপর কারসন লতাগুলোকে একসঙ্গে পেঁচিয়ে একটা বেশ মজবুত দড়ি-গোছের জিনিস তৈরি করল। পাথরগুলোর একটাকে অন্য জিনিসে কুঁদে কিছুক্ষণের অক্লান্ত চেষ্টায় ও একটা ধারালো, ভারী ছুরিও বানিয়ে ফেলল। দড়ি দিয়ে একটা বেল্ট বানিয়ে, তাতে ছুরিটা গুঁজে কারসন কিছুটা আশ্বস্ত হল। ঝোপগুলো ভালো করে খুঁজে কারসন বুঝল, ওখানে আর যে ধরনের গাছ বা গুল্ম আছে তাদের একটা শুকনো আর ভঙ্গুর, একটা নরম, আর একটা প্রায় কাঠের মতোই ভারী আর মজবুত।

কিন্তু কারসন আর কিছু ভাবতে পারছিল না। অসহ্য গরমে ওর মাথা অসাড় হয়ে পড়ছিল।

গোলকটা কী করছে? ওটা মাঝে অদৃশ্য দেওয়ালের কাছে এসে ওকে দেখে গেলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছে। তবে কিছু একটা করছে ওটা। পাথর জমাচ্ছে? কারসন কিছু ভাবতে পারছিল না। তবু যন্ত্রের মতো ও যতগুলো সম্ভব পাথরের টুকরো নিজের কাছে জমা করল, যদি ছোড়ার সুযোগ আসে এই আশায়।

গরম! অসহ্য গরম! আর তেমনই তেষ্টা। কারসন আর কিচ্ছু ভাবতে পারছিল না। ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ও বুঝতে পারল, জল পাওয়া যাক বা না-যাক, তার খোঁজে ওকে একটা মরিয়া চেষ্টা করতেই হবে। বাধা হয়ে থাকা দেওয়ালটার কাছে গিয়ে কারসন বালি খুঁড়তে শুরু করল। দেওয়াল বরাবর প্রায় চার ফুট নীচে ও নিরেট পাথর পেল, কিন্তু জল পেল না।

হাঁচড়পাঁচড় করে উঠে এল কারসন। দাঁড়াতে পারল না। তেষ্টা আর পায়ের ব্যথা ওকে নির্জীব করে দিয়েছিল। বালিতে উপুড় হয়ে শুয়েই ও দেখল, গোলকটা কিছু একটা করছে। কী করছে?

গর্ত খুঁড়তে গিয়ে বালির যে স্তূপটা তৈরি হয়েছিল, তাতে উঠল কারসন। এবার ও ভালোভাবে দেখতে পেল কী বানিয়েছে ওর প্রতিদ্বন্দ্বী। ঝোপ থেকে পাওয়া কাঠ আর লতানে গাছের লতা দিয়ে গোলক একটা গুলতির মতো জিনিস তৈরি করেছে! সেটা দিয়ে কী...? তারপরেই কারসন বুঝতে পারল কী জন্য জিনিসটা বানানো হয়েছে।

একটা বড়োসড়ো পাথর ওর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল।

জিনিসটা এতটাই দূর দিয়ে গেল যে কারসনকে নীচুও হতে হয়নি। কিন্তু পাথরটার সাইজ, এবং সেটা যতটা দূরে গেল তা দেখে কারসনের চুল খাড়া হয়ে উঠল। ওর ‘অর্ধ’-র শেষ প্রান্তে পৌঁছেও ও পুরোপুরি নিরাপদ হবে না। মরিয়া হয়ে কারসন অদৃশ্য দেওয়ালের এদিক-ওদিক নড়ে আর সেখান থেকে পাথর ছুড়ে জিনিসটাকে অকেজো করার চেষ্টা করল বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু হয় ব্যাপারটা বড়ো বেশিরকম মজবুত, নয় ওর হাতে যথেষ্ট জোর ছিল না। বেশ কয়েকটা পাথর ছুড়েও গুলতির মতো জিনিসটার গায়ে আঁচড়ের বেশি কিছু কাটতে পারল না কারসন।

সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ওর পায়ের ব্যথা। কারসন বুঝতে পারছিল, টাটাতে থাকা একটা পা নিয়ে ও পাথরগুলো ঠিকমতো ছুড়তেও পারছে না। তবু ও স্থির হয়ে একজায়গায় বসতে পারছিল না। ও জানত, একবার বসলে ওর অবসন্ন শরীরে ঘুম নামবে, আর একবার ঘুমিয়ে পড়লে সেই ঘুম আর ভাঙবে না।

গোলকের উপহার হিসেবে উড়ে আসা একটা পাথর কারসনের জমানো পাথরে ঠোক্কর খেয়ে আগুনের ফুলকি তুলল। সেদিকে তাকিয়ে কারসনের মাথায় একটা আইডিয়া গজাল।

পাথর ঘষে কি আগুন বানানো সম্ভব?

আদিম মানুষ তো পাথর ঘষেই আগুন বানাত। ও কি তেমন কিছু করতে পারবে? মরিয়া কারসন পায়ের ব্যথা, তেষ্টা, সব ভুলে সামনের ঝোপটার দিকে এগোল ঘষটে-ঘষটে। ওর কপাল ভালো ছিল। ওই ঝোপটা ভেঙেই বেশ কিছু টুকরোটাকরা ও জমা করতে পারল। তারপর ধৈর্য ধরে, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া, বা কিছুটা দূরে আছড়ে পড়া পাথর উপেক্ষা করে কারসন পাথরে পাথর ঘষে ফুলকি তুলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সহজদাহ্য একটা শুকনো ডাল, তারপর গোটা স্তূপটা জ্বলে উঠল দাউদাউ করে।

কারসন দেখল, লতানে গাছের আকর্ষগুলো অত সহজে জ্বলে না। পাতাগুলোও ধিকধিকি জ্বলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। দাহ্য কাঠের টুকরোগুলোকে পাতার মধ্যে রেখে, সেটাকে লতা দিয়ে বেঁধে আধ ডজন বল বানিয়ে কারসনের মুখে হাসি ফুটল।

ছোড়ার মতো জিনিস এবার ওর কাছেও রয়েছে। আগুনে বোমা!

একটা বোমায় আগুন ধরিয়ে সেটা ছুড়ল কারসন। জিনিসটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। ব্যাপারটা বুঝতে গোলকের সময় লাগেনি। ঝটপট ওই গুলতির মতো যন্ত্রটা সরিয়ে দূরে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হল সে। কিন্তু কারসন একেবারে তৈরিই ছিল। একটা মরিয়া মনোভাব, সঙ্গে ভেতর থেকে উঠে আসা একটা আদিম হিংস্রতা ওর নিশানাকে নিখুঁত করে তুলছিল। ওর হাত থেকে ছুটে যাওয়া একের-পর-এক গোলা আছড়ে পড়ল যন্ত্রটায়। চার নম্বরটা আটকে গেল যন্ত্রটার ভেতরে কাঠের ফাঁকে। ওটাতেই কাজ হল।

হু-হু করে জ্বলে উঠল গুলতি-টা।

গোলকটা তার দুই শুঁড় দিয়ে বালি তুলে, জ্বলন্ত অংশের ওপর সেটা ফেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিল। কারসন দেখল, শুঁড় দিয়ে যতটুকু বালি প্রাণীটি তুলতে পারছে সেটা মোটেই যথেষ্ট নয়। আগুনটা নিভল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই যন্ত্রটা প্রায় ভস্মীভূত হয়ে গেল।

গোলকটা কারসনের দিকে ঘুরে স্থির হয়ে রইল। আবার ওর দিকে ভেসে এল রাগ আর ঘৃণার ঢেউ, তবে ধীরে। যেন, তাদের ঠেলে দেওয়ার মতো জোর জোটাতে পারছে না গোলকটা। কারসন একটা পাথর তুলে ছুড়ে দেওয়ামাত্র গোলকটা সরে গেল নিরাপদ দূরত্বে।

বসে পড়ল কারসন। বিজয়োল্লাস নয়, বরং ক্লান্তি, টাটিয়ে ওঠা পায়ের ব্যথা, আর তেষ্টা ছাড়া ওর মাথায় আর কিচ্ছু আসছিল না। নরক কি এমনই হয়? তলিয়ে ভাবার অবস্থাও ওর ছিল না। গোলকটার অবস্থাও যে বিশেষ সুবিধের নয় সেটা বুঝতে পারছিল ও। অথচ মাঝের বাধাটা যতক্ষণ আছে, আর গোলকটা আছে ওর নাগালের বাইরে, ততক্ষণ লড়াইয়ের একটা এসপার-ওসপার করা ওর পক্ষে অসম্ভব।

কী করা যায়?

জবাব দিতে বসা শরীরকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করল কারসন। ইতিহাস হাতড়ে ও বোঝার চেষ্টা করল প্লাস্টিক আর ধাতুর উদয়ের আগে মানুষ কী ধরনের অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করত।

পাথর? হয়ে গেছে। নাগালের বাইরে।

গুলতির সাহায্যে ছুড়ে দেওয়া পাথর, আর সেই পদ্ধতিতেই পরে বারুদকে কাজে লাগিয়ে কামানের গোলা? বারুদ নেই। গুলতি হয়ে গেছে। তাছাড়া ওর ‘দিক’- এমন কাঠকুটো নেই যা দিয়ে ওইরকম ভারী যন্ত্র বানানো যায়।

তির-ধনুক? নাহ্‌! কারসন জানে, কলেজে একেবারে উঁচু দরের জিনিস হাতে নিয়েও ওর নিশানা একেবারেই ভালো হত না। এখন ও যদি নিজের হাতুড়ে জ্ঞান কাজে লাগিয়ে কিছু বানায়ও, তাতে লক্ষ্যভেদ করা যাবে না।

বল্লম? হুঁ, এটা ভালো আইডিয়া! হাতের কাছে থাকা পাথরের স্তূপ আর কাঠের টুকরো ঘেঁটে কারসন পাথর হাতড়ে বল্লম বানাতে ব্যস্ত হল। ও জানত, খুব একটা দূর থেকে বল্লম ছুড়ে ও ওই গোলকের তেমন একটা ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু নাগালের মধ্যে পেলে যদি ওটা ছুড়ে মারা যায়...! ইতিমধ্যে কারসন বুঝে গেছে, গোলকটার গায়ে কোনো অতিরিক্ত আস্তরণ বা আবরণ নেই। তাই শুধু আহত করা নয়, যদি একবার হাতিয়ারটাকে গোলকের গায়ে হারপুনের মতো গেঁথে দেওয়া যায়, তাহলে ও গোলকটাকে মাঝের দেওয়ালটার কাছে টেনে আনতে পারবে। তারপর ধারালো পাথর ছুড়ে...!

কিন্তু সে-সব পরে হবে। আপাতত কারসন একটা কাঠের টুকরোর মাঝখানটা দু’ভাগ করে, সেখানে একটা লম্বা, ভারী, আর ধারালো পাথর গুঁজে, সবটাকে লতা দিয়ে টাইট করে বেঁধে বল্লম বানানোয় ব্যস্ত হল। সময়ের দিকে খেয়াল ছিল না কারসন-এর। তবে বেশ কিছুক্ষণ পর একটা মোটা দাগের, কিন্তু কার্যকরী বল্লম তৈরি হল। তারপর সেটার একপ্রান্তে ও লতা জুড়ে বানানো একটা মজবুত দড়ি বাঁধল। অন্য প্রান্তটা বাঁধল নিজের হাতে, যাতে বল্লম তথা হারপুনটা গোলকের গায়ে গেঁথে দেওয়ার পর ও-ও সেটার কাছে যেতে পারে।

শেষ গিঁটটা বাঁধার পর কারসন আবিষ্কার করল, ও মাথা তুলতে পারছে না। বালিতে চাপ দিয়ে উঠতে গিয়ে ও বুঝল, শরীর আর মগজের আদেশে সাড়া দিচ্ছে না। বারতিনেকের চেষ্টায়, হাঁটুতে ভর দিয়ে কিছুটা উঠেও ধুপ্‌ করে বালির ওপর পড়ে গেল কারসন।

ঘুম। ঘুম চাইছে শরীর। ঘুমোতেই হবে ওকে। কিন্তু এখানে নয়। ও দেওয়ালের বড্ড কাছে রয়েছে। দূরে যেতে হবে। দশ গজ... বিশ গজ...

অন্ধকার।

 

মাথার কাছে একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল কারসনের। ও একটা স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্নটা ওর মনে পড়ল না, তবে সেটা যে ভয়ানক কিছু ছিল এ ব্যাপারে ও নিঃসন্দেহ ছিল।

নীল আকাশ। নীল বালি।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও? এক দিন? এক মিনিট?

ওর মুখে বালি ছিটিয়ে দিয়ে খুব কাছে এসে পড়ল একটা পাথর। দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে কারসন দেখল, অদৃশ্য দেওয়ালটার গা ঘেঁসে, বিশ গজ মতো দূরত্বে এসে স্থির হয়ে রয়েছে গোলকটা। ওকে উঠতে দেখেই গোলকটা পিছিয়ে গেল, যতটা দূরে যাওয়া সম্ভব।

কারসনের মুখে একটা তিক্ত হাসি ফুটল। নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার আগেই ও জ্ঞান হারিয়েছিল। যদি গোলকটা বুঝত ও এই মুহূর্তে কতটা দুর্বল, তাহলেও কি এভাবে পালাত ওটা?

মাথা ঘামাল না ও। বরং হাত-পায়ে ভর দিয়ে ও নিজেকে নিয়ে গেল দূরে। আরও দূরে। একেবারে পেছনের দেওয়াল অবধি। তাতে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজল কারসন। এখন ও নাগালের বাইরে রয়েছে। এবার...

আবার যখন চোখ মেলল কারসন তখন এমনিতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে ওর চরম ক্লান্তির অবস্থাটা কেটে গেছে। ঘুম, বা অজ্ঞান হয়ে থাকাটা শরীরকে সেটুকু বিশ্রাম দিয়েছে। মুখের ভেতরটা শুকনো, জিভটা ভারী আর ফোলা। আর... ব্যথা! কীসের ব্যথা?

নড়ার চেষ্টা করামাত্র কারসনের বাঁ পা এমন প্রতিবাদ জানাল যে যন্ত্রণায় কারসন চোখে অন্ধকার দেখল। নীচে তাকিয়ে ও বুঝতে পারল, অবস্থা খুবই খারাপ। এই ‘রণ’-ক্ষেত্রে কী ধরনের জীবাণু আছে তা ও জানে না। তবে তাদের ছোঁয়ায় ওর ক্ষতস্থান, এমনকি পুরো বাঁ পা-ই ফুলে উঠেছে বীভৎসভাবে। যে লতাগুলো দিয়ে ও জায়গাটাতে পাতা বেঁধেছিল, সেগুলোই ওর মাংসে কেটে বসেছে একেবারে।

পাতাগুলো সরিয়ে কারসন বুঝল, সংক্রমণের ফলে রক্তে বিষ মিশেছে। শুধু হাঁটুর নীচের অংশ নয়, থাইয়ের অর্ধেকটাও ফুলে উঠেছে। জল, ওষুধ, কাপড়ের অভাবে ওর মেয়াদ আর বেশিক্ষণ নয়।

কারসন হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু একটা তথ্য, একটা ভয়ংকর জ্ঞান ওকে বসে থাকতে দিল না।

ওর মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে মানবজাতি।

বল্লমটা ধরে, যন্ত্রের মতো আবার এগোতে শুরু করল কারসন। হামাগুড়ি দিয়ে, নিজেকে ছেঁচড়ে ও নিয়ে গেল দেওয়ালের কাছে। কতক্ষণে ও সেখানে পৌঁছল, ওর খেয়াল নেই। এক ঘণ্টাও হতে পারে, এক যুগও হতে পারে। কিন্তু ওর এই চরৈবেতি মন্ত্র জপ করার একটাই লক্ষ্য ছিল। কোনোভাবে যদি ও একবার গোলকটাকে নাগালে পায়...!

না। গোলকটা নাগালের বাইরে ছিল। শুধু তাই নয়, চোখটা যথাসাধ্য ধারালো করে কারসন বুঝতে পারল, গোলকটা পাথর ছোড়ার জন্য আরেকটা গুলতি-গোছের যন্ত্র বানাতে শুরু করেছে। ওটা আগের তুলনায় অনেক ধীরে নড়াচড়া করছে। অর্থাৎ গোলকটার অবস্থাও সুবিধের নয়। তবে গুলতিটা তৈরি হয়ে গেলে কারসনের আর কোনো পালানোর জায়গাও থাকবে না।

তবে যন্ত্রটা তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ হওয়া অবধিও কি টিকবে কারসন? আপন মনে মাথা নেড়ে ও শুয়ে পড়ল আবার।

“শুনতে পাচ্ছ?”

একটা ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে এল কারসনের কানে। না, কানে নয়, মাথায়।

চমকে উঠল কারসন। এটা তো সেই গলাটা নয়! এটা কি... স্তম্ভিত বিস্ময়ে কারসন বুঝতে পারল, একটা গিরগিটির কাছ থেকে আসছে আওয়াজটা।

“চলে যাও।” কারসন চোখ বন্ধ করে বলার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর জিভ নড়ল না। “তুমি আসলে নেই। গিরগিটি কথা বলতে পারে না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি!”

“আহত।” গলাটা বলল, “মেরে ফেলো। আহত – মেরে ফেলো। এসো।”

চোখ খুলল কারসন। না, গিরগিটিটা ভ্যানিশ করে যায়নি। ওটা আছে। ওটা অদৃশ্য দেওয়াল বরাবর একটু এগিয়ে-পিছিয়ে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে।

“আহত।” কারসন আবার শুনল। “মেরে ফেলো। এসো।”

বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল কারসন। কিন্তু এই অদ্ভুত আদেশ বা অনুনয় ওর মাথায় ধাক্কা মেরেই চলল। চোখ খুলে, গিরগিটিটার চলাফেরার দিকে তাকিয়ে ও বুঝতে পারল, গিরগিটিটা ওকে কোনো একটা দিকে যেতে বলছে। কোন্‌ দিকে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কারসন বুঝল, উত্তরটা না বোঝা অবধি এই অদ্ভুত আদেশ বা কাতর আর্তির হাত থেকে ও রেহাই পাবে না। কোনোরকমে গিরগিটিটাকে অনুসরণ করল ও। মাঝের বাধা বরাবর বেশ কিছুটা এগিয়ে এসে ও দেখতে পেল, একটা গিরগিটি ছটফট করছে।

এটা কি... হ্যাঁ! এটাই তো সেই গিরগিটিটা যার শরীর থেকে জ্যান্ত অবস্থাতেই একটা-একটা করে পা ছিঁড়ে নিচ্ছিল গোলকটা। কিন্তু ওটা কি তাহলে মরেনি?

যে গিরগিটিটাকে অনুসরণ করে এসেছিল কারসন, তার দিক থেকে বারবার ভেসে এল আর্তি, “আহত। মেরে ফেলো! আহত। মেরে ফেলো!” ছটফট করতে থাকা গিরগিটির কাছে গিয়ে নিশ্চিত হল কারসন। হ্যাঁ, এটাই সেটা। যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে বেচারি। ছুরিটা বের করে গিরগিটিটাকে যন্ত্রণার হাত থেকে নিষ্কৃতি দিল কারসন। অন্য গিরগিটিটা পালিয়ে গেল।

দেওয়ালে ভর দিয়ে তাকাল কারসন। গোলকটা কাজ চালু রেখেছে। ধীরে, অথচ নিশ্চিতভাবে মাথা তুলছে আরেকটা প্রকাণ্ড গুলতি। ওটার কাছে পৌঁছনোর মতো কোনো উপায় ওর নেই। ওর আর কিচ্ছু করার নেই।

নিদারুণ হতাশার একটা অন্ধকার সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছিল কারসন। রক্তের বিষক্রিয়ার শিকার হয়ে তিলে-তিলে মরা, বা ধেয়ে আসা পাথরের ঘায় থেঁতলে যাওয়া। এদের তুলনায় দ্রুত, যন্ত্রণাহীন কোনো মৃত্যুর ব্যবস্থা কি ওর পক্ষে নিজের জন্য করা সম্ভব? ছুরিটা...

নাহ্‌, ক্লান্তভাবে মাথা নাড়ল কারসন। ওটা ও পারবে না।

দেওয়ালে হেলান দেওয়া নিজের হাত দুটোর দিকে নজর পড়ল কারসনের। ওর হাতগুলো কি এত সরু ছিল? এত রুক্ষ? ঠিক কতদিন ধরে এই নরকে রয়েছে ও? এই অবস্থায় আর কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে ও এই অসহ্য গরম, এই অনন্ত তৃষ্ণা? এইরকম আধমরা হয়ে...

মাথার এলোপাথাড়ি ভাবনার তুফানের মধ্যে হঠাৎ একটা শান্ত, স্থির বিন্দু খুঁজে পেল কারসন। সেটা এল একটা প্রশ্নের আকারে?

গিরগিটিটা জ্যান্ত অবস্থায় দেওয়াল ভেদ করে এদিকে কীভাবে এসেছিল?

 

বালিতে বসে পড়ল কারসন। এখনও পর্যন্ত দেওয়ালটা নিয়ে দেখা, বোঝা ঘটনাগুলো মনে-মনে সাজিয়ে উত্তরটা খুঁজতে চাইল ও। ঘটনাক্রম পরপর সাজালে এটা স্পষ্ট যে গিরগিটিটা আধমরা, বা আরও সঠিকভাবে বললে অজ্ঞান ছিল বলেই সেটা দেওয়াল ভেদ করতে পেরেছিল।

তাহলে কি এটা আসলে কোনো দেওয়াল নয়? এটা কি তাহলে ভাবনা, বা চেতনা থেকে তৈরি হচ্ছে? সেজন্যই কি অচেতন জিনিস, বা জীব এটাকে ভেদ করতে পারছে?

কারসন বুঝতে পারল, ওর হাতে আর একটাই দান বাকি আছে। এটা ছাড়া ওর কাছে আর কিচ্ছু নেই। সেটাকে কাজে লাগানোর জন্য ধীরে-ধীরে নিজেকে বালির স্তূপটার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল ও। খুঁড়তে-খুঁড়তে এই স্তূপটা তো ওই বানিয়েছিল? কবে...? জানে না ও। কয়েক ঘণ্টা আগে, কয়েক দিন আগে, যা খুশি হতে পারে। তবে মোদ্দা কথা হল, বালির স্তূপটার ওপরে উঠে ও যদি কোনোভাবে নিজেকে অজ্ঞান করে দিতে পারে তাহলে ওর শরীরটা পড়বে দেওয়ালের ওপর।

না। দেওয়ালটা তখন থাকবে না। ও পড়বে ওপাশে!

গুঁড়ি মেরে বালির স্তূপে উঠল কারসন। ও দেখে নিল, ছুরিটা আছে ওর কোমরে, বল্লম-তথা-হারপুনটা রয়েছে বগলে, তার একটা প্রান্ত বাঁধা রয়েছে ওর এক হাতে। অন্য হাতে একটা ভোঁতা পাথর নিয়ে নিয়েছিল কারসন। স্তূপের মাথায় পৌঁছে সেই ভোঁতা পাথরটা দিয়ে নিজের মাথায় সপাটে একটা ঘা...

যন্ত্রণাই কারসনের জ্ঞান ফিরিয়ে আনল। কোমরের কাছে একটা তীব্র, হঠাৎ হওয়া ব্যথা, যেটা ওর মাথায় দপদপ করতে থাকা ব্যথার থেকে আলাদা।

কিন্তু কারসন এটার অপেক্ষা করছিল। তাই ও নড়ল না। বরং চোখের পাতাগুলো আণুবীক্ষণিক মাপে খুলে ও বুঝতে চাইল, কী ঘটছে। হ্যাঁ, ওর অনুমান সঠিক। গোলকটাই দুই শুঁড়ের মাঝে ধরা একটা পাথর ওর দিকে ছুড়ে বুঝতে চেয়েছে ও জীবিত না মৃত। গোলকটা আপাতত বিশ ফুট দূরে, তবে ওটা আরও কাছে আসছে।

কারসন নিথর হয়ে রইল। গোলকটা কাছে এল। আরও কাছে। পনেরো ফুট এসে ওটা আবার থেমে গেল।

কারসন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও সাহস পাচ্ছিল না। তার চেয়েও বেশি করে ও মাথাটা ফাঁকা রাখার চেষ্টা করছিল, যাতে ওর টেলিপ্যাথিক শত্রু ওর সচেতন অবস্থাটা টের না পেয়ে যায়। তার ফলে গোলকটার ভাবনাগুলো ও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছিল।

এতটা অন্যরকম, এতটা অমানবিক ভাবনার পরিচয় এর আগে কখনও পায়নি কারসন। এমন বহু ভাব আর আবেগ ওকে ছুঁয়ে গেল, যেগুলো মানুষের ভাষায় প্রকাশই করা যায় না। তবে ও এটা বুঝল যে ওদের এই ‘রণ’-ক্ষেত্রে নিয়ে আসা সত্তাটি ঠিকই বলেছিল। মানুষ আর এই প্রাণীদের সহাবস্থান একেবারেই অসম্ভব।

আরও কাছে এল গোলকটা। কারসনের শরীরটা থেকে মাত্র ফুটখানেক দূরে থেমে গোলকটা তার শুঁড়গুলো বের করল...

উঠে বসল কারসন। যন্ত্রণার অনুভূতি আর কাজ করছিল না ওর মধ্যে। বরং হারপুনটা বের করে, শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সেটা ও ছুড়ে দিল গোলকটার দিকে। হারপুনটা গোলকের গায়ে গেঁথে গেল!

গোলকটা পিছিয়ে গেল। কারসন পিছু নিল। উঠে দাঁড়াতে পারছিল না ও। যন্ত্রণার অনুভূতিটা না থাকলেও পা কাজ করছিল না। তবু, গোলকটা নড়ার সঙ্গেই কারসনের হাতে বাঁধা লতায় টান পড়ছিল। তাতে সাড়া দিয়ে ও ঘষটে-ঘষটে এগিয়ে গেল গোলকটার দিকে।

একটা জায়গায় পৌঁছে থেমে গেল গোলকটা। শুঁড়দুটো দিয়ে, অনেক চেষ্টা করেও হারপুনের ধারালো প্রান্তটা নিজের শরীর থেকে বের করতে পারল না সেটা। কারসন এগিয়ে এল ওটার কাছে, আরও কাছে। গোলকটা বোধহয় ততক্ষণে বুঝতে পেরেছিল, ওটার পক্ষে আর নড়াচড়া সম্ভব নয়। ওটাও শুঁড় বের করে ওর কাছে এগিয়ে এল।

কারসনের কোনো ধারণা ছিল না যে ওর মধ্যে তখনও ওই শক্তিটুকু আছে। কিন্তু নিজেকেও অবাক করে দিল ও। ছুরিটা নিয়ে গোলকের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল কারসন। ওর শরীর থেকে মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছিল শুঁড়গুলো। কিন্তু ও টের পাচ্ছিল না। ওর শরীর জুড়ে ছিল রাগ, আর একটা অদম্য হিংস্রতা। ও আঘাত করল, করেই চলল, করেই চলল, করেই চলল...!

 

কোথাও একটা বেল বাজছে। একটা... অ্যালার্ম?

নিজের অবস্থা আর অবস্থান বুঝতে বেশ কিছুটা সময় নিল কারসন। ও দেখল, ও নিজের স্কাউটশিপেই বসে আছে। সামনের স্ক্রিনে কোনো বহিরাগত স্পেসশিপ নেই। আশেপাশে কোনো অসম্ভব গ্রহ নেই।

অ্যালার্মটা বাজছে সামনে, রিসিভার থেকে। কেউ ওকে ডাকছে। যন্ত্রের মতো সুইচ টেপে কারসন। ওর মতো স্কাউটশিপদের প্রধান বেস তথা মাদারশিপ ম্যাগেলান-এর ক্যাপ্টেন ব্র্যান্ডারের মুখটা ভেসে ওঠে সামনের ছোট্ট স্ক্রিনে।

“কারসন? শুনতে পাচ্ছ?” অধৈর্য গলাটা ভেসে আসে। “সাড়া দাও। আর ডিউটি করতে হবে না। যুদ্ধ শেষ। আমরা জিতেছি।”

স্ক্রিনটা আবার অন্ধকার হয়ে যায়।

পুতুলের মতো কারসন বসে থাকে বেশ কিছুক্ষণ।

এটা কীভাবে হল? ঠিক কী হয়েছিল?

নিজের শারীরিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করে কারসন। ও সুস্থ। কোথাও কোনো চোট্‌-আঘাত নেই। ওর পা...

ট্রাউজারের নীচের দিকটা তুলে স্তম্ভিত হয়ে যায় কারসন। একটা লম্বা সাদা দাগ রয়েছে সেখানে! যেমনটা হয় কোনো ক্ষতস্থান পুরোপুরি সেরে গেলে। কারসন নিশ্চিত, এই দাগটা আগে ছিল না। ঝটপট শার্ট খুলে আয়নার সামনে দাঁড়ায় ও। হ্যাঁ! ওর সারা শরীর জুড়ে রয়েছে অজস্র ছোটো-বড়ো আঘাতের চিহ্ন। তবে সেগুলো সবই সেরে যাওয়ার পরের, প্রায় দেখাই যায় না এমন।

ঘটেছিল! ওর আর ওই বহিরাগতের লড়াইটা সত্যি ঘটেছিল তাহলে!

ম্যাগেলান-এ পৌঁছেই ব্রান্ডারের খোঁজ করল কারসন। ব্র্যান্ডার নিজের চেম্বারেই ছিলেন। কারসন স্যালুট করে দাঁড়াল।

“আহ্‌ কারসন!” ব্র্যান্ডারের গলা শুনে কারসন বোঝে, ভদ্রলোক এখনও পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেননি, “তুমি কী জিনিস মিস্‌ করলে, তা তুমি নিজেও জান না!”

“কী হয়েছিল স্যার?”

“আরে আমি নিজেই ঠিকমতো জানি না!” উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন ব্র্যান্ডার, “শুধু আমি নয়, পুরো আর্মাডায় কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। আমরা একবার ফায়ার করেছিলাম। মাত্র একবার! তাতেই ওদের পুরো বাহিনী উড়ে গেল! কী বলব তোমাকে? মনে হল... যেন একটা স্পেসশিপ থেকে আগুন আরেকটা স্পেসশিপে ছড়িয়ে গেল, এমনকি যেসব স্পেসশিপ আমাদের অস্ত্র তো দূরের কথা, দৃষ্টির নাগালের বাইরে ছিল, সেগুলোও উড়ে গেল! আমাদের একটা জাহাজের গায়ের রঙ অবধি চটেনি!

সত্যি বলছি, এতে আমাদের কোনো কৃতিত্ব নেই। আমার মনে হয়, ওদের স্পেসশিপগুলোতে এমন কিছু একটা উপাদান ছিল, যাতে একঢিলে লাখখানেক শিকার... তবে মোদ্দা কথা হল, স্কাউটশিপে ছিলে বলে এমন একটা দুর্ধর্ষ আতশবাজি তুমি মিস্‌ করে গেলে। এটাই বড়ো দুঃখের ব্যাপার।”

কারসন একবার ভাবল, ও কিছু বলবে কি না। তারপর ওর মনে হল, বিশ্বসংসারের সবচেয়ে বড়ো মিথ্যেবাদী হওয়ার অপবাদটা মাথায় নিয়ে কী লাভ? বরং ‘আসলে’ যা হয়েছে, সেটা ওই শুধু জানুক।

“ঠিকই বলেছেন স্যার।” মুখে দুঃখের ভাব ফুটিয়ে বলে কারসন, “আমি সব মিস্‌ করে গেলাম!”

 

[মূল কাহিনি: ফ্রেডরিক ব্রাউন-এর ‘এরিনা’, প্রথম প্রকাশ~ ‘অ্যাস্টাউন্ডিং সায়েন্স ফিকশন’ পত্রিকার জুন, ১৯৪৪ সংখ্যা। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম কল্পবিজ্ঞান কাহিনিগুলোর মধ্যে অন্যতম এই গল্পটি ‘সায়েন্স ফিকশন হল অফ ফেম’-এ স্থান পেয়েছে।]


গলদ - ঋজু গাঙ্গুলী

অলংকরণ - অরিজিৎ ঘোষ

গ্রেলিং ডিন থেকে মাইলটাক দূরে, একটা লম্বা ঝিলের একদম গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটা। ওঁরা দু’জন সেদিকেই হনহনিয়ে হেঁটে আসছিলেন।

তখন আকাশের লাল সরিয়ে সন্ধ্যা নামছে।

কালচে সবুজ টিলাগুলোর মাঝে বানানো, আদতে লাল, এখন কালচে ইটের বাড়িটা সম্বন্ধে সুপারিনটেন্ডেন্ট হ্যাডলে বা ডক্টর গিডিওন ফেল্‌ কিছুই জানতেন না। বাড়ির সামনের লনটা ছিমছাম লাগলেও একেবারে নিষ্প্রদীপ ঘরগুলো দেখে তাঁরা থমকে গেলেন।

“এই যে!” এতক্ষণ ধরে চলতে থাকা তর্কটা চালু রাখার পক্ষে একটা মোক্ষম উদাহরণ হাতে পাওয়ার মতো করে বাড়িটা দেখিয়ে হ্যাডলে বললেন, “এই হচ্ছে আমার গ্রামগঞ্জে না থাকার সবচেয়ে বড়ো কারণ। এখানেও আমরা একা! সামনের বাড়িটায় আদৌ কেউ থাকে, নাকি এটা পরিত্যক্ত, তাই বোঝার উপায় নেই। এর চেয়ে শহরে...”

“আমরা এখানে কিন্তু ঠিক একা নই।” হ্যাডলেকে মাঝপথে থামিয়ে বলেন ফেল্‌।

ফেল্‌-এর হাতের বিশ্বস্ত লাঠির ইঙ্গিত দেখে লেকের দিকে তাকালেন হেডলি।

জলের একদম ধার বরাবর একজন দাঁড়িয়েছিলেন। তরল অন্ধকারেও জলে ঝিকমিকিয়ে ওঠা শেষ আভাটুকু দিয়ে তাঁর চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছিল।

ছোটোখাটো উচ্চতা। গাঢ়রঙা টিপটপ পোষাক। মাথায় লিনেনের একটা সাদা হ্যাট।

ভদ্রলোক জলের দিকে ঝুঁকে কী যেন দেখছিলেন। হ্যাডলে আর ফেল্‌-এর পায়ের ঘষটানি শুনে বোধহয় তাঁর সম্বিত ফিরল। ঘুরে হ্যাডলে আর ফেল্‌-কে দেখলেন ভদ্রলোক।

“আমি কোনো রাজহাঁস দেখছি না।” খুব চিন্তিত মুখে ওঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন মানুষটি, “আপনারা দেখতে পাচ্ছেন?”

“না।” গম্ভীরভাবে বললেন ফেল্‌, “দেখতে পাওয়ার কথা আছে বুঝি?”

“একটা।” অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক, “একটা রাজহাঁস দেখতে পাওয়ার কথা। মরা। গলায় রক্ত মাখা। ওই...ওখানে ভাসার কথা।”

“মেরে ফেলা হাঁস?”

“অবশ্যই।” আবার মাথা দোলালেন মানুষটি, “খুন হওয়া। মানুষের মতোই।”

“কিছু মনে করবেন না।” লম্বা আর রোগাটে হ্যাডলে-র গলাটা এবার ছুরির মতোই ধারালো শোনাল, “আমরা ভেবেছিলাম এই বাড়ির বাসিন্দারা কেউ নেই। তাই এখান দিয়ে শর্ট-কাট করছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমরা অনধিকার প্রবেশ করে ফেলেছি।

ফেল্‌!” বিপুলদেহী মানুষটি হ্যাডলের দিকে তাকালেন। “আমরা বরং টিলার ওই দিক দিয়েই...?”

“ক্ষমা করবেন।” মানুষটির গলায় একটা মার্জিত, ধীরস্থির ভাব ছিল যেটা একটু আগের কথাগুলোর সঙ্গে খাপ খায় না। হ্যাডলে থমকে গেলেন। “ওসব কথা আমার বলা উচিত হয়নি। আসলে... তিরিশ বছর ধরে আমি প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে চলেছি। তাই বলে ফেলেছিলাম।

অনধিকার প্রবেশ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, কারণ এই জমির মালিক আমি নই। একসময় এখানে থাকতাম অবশ্য। তখনকার কথাগুলোই মনে পড়েছিল!

এখানে একটা বেঞ্চ আছে। তাতে যদি আপনারা একটু বসেন... মানে খুব অসুবিধা যদি না হয়...!”

ঘনায়মান সন্ধ্যায়, সেই নিস্তব্ধ লেক আর লনে, সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো উড়িয়ে দিতে পারেননি হ্যাডলে আর ফেল্‌। ঝিলের ধারে একটা মর্চে ধরা বেঞ্চে বসে তাঁরা ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনেছিলেন।

“আমি জোসেফ লেসিং।” নিভু-নিভু গলায় বলছিলেন ভদ্রলোক, “বুঝতেই পারছি, আপনারা আমার নাম শোনেননি। তাহলে আমার সৎ বাবা, ই.এন.টি বিশেষজ্ঞ ডক্টর হার্ভে লেসিং-এর নামও আপনাদের শোনার কথা নয়।

সেই সময় আমরা এই বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসতাম। আমরা মানে... দাঁড়ান, একটু গুছিয়ে বলতে হচ্ছে ব্যাপারটা।

ডক্টর লেসিং-এর প্রথম স্ত্রী যখন মারা যান, তখন তাঁদের তিনটি সন্তান ছিল। দু’বছর পর যখন তিনি আমার মা-কে বিয়ে করেন, তখন মা-র প্রথম পক্ষের সন্তান হিসেবে আমি এই পরিবারের সদস্য হই।

দুঃখের বিষয়, আমার মা-ও ওই বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যে মারা যান। তবে ডক্টর লেসিং দয়ালু মনের মানুষ ছিলেন। এই পরিবারে আমার কোনো রকম অনাদর হয়নি তার পরেও।

আমরা চার ভাইবোন, মোটের ওপর, ভালোই ছিলাম।

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ছিল ব্রাউনরিগ। প্রচুর হাসত ও। একসময় ভালো অ্যাথলিটও ছিল। তবে ওর কথা ভাবতে গেলেই মনে হয়, লোককে ঠেস দিয়ে কথা বলা, রাশিরাশি আখরোট খাওয়া, এগুলোই ওর বৈশিষ্ট্য ছিল। ও ডেন্টিস্ট ছিল।

তারপর ছিল হার্ভে জুনিয়র। লম্বা-লম্বা পা ফেলে হাঁটত হার্ভে। “ভাইসব!” বলে, কেমন একটা বক্তৃতার স্টাইলে আমাদের সম্বোধন করত ও। একজায়গায় স্থির হয়ে থাকা ওর ধাতে ছিল না। সবসময় অস্থিরভাবে, হাত ছুঁড়ে কিছু-না-কিছু নিয়ে কথা বলতে-বলতে চলেফিরে বেড়াত ও। তবে জুনিয়রের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস ছিল জলবিহার। গণ্যমান্য লোকজন টেমসে নৌকো করে বেড়ানোর সময় যেমন লাল-সাদা পিনস্ট্রাইপ ব্লেজার আর খড়ের টুপি পরতেন, ও-ও সেরকম সাজগোজ করে নৌকোয় চেপে ঝিলে ঘুরত। ও তখন ডাক্তারি পড়ছে।

শুধু চা-এর পরের সময়টা বাদ যেত। তখন ডক্টর লেসিং-কে বিরক্ত করার প্রশ্নই ছিল না। উনি তখন দিবানিদ্রার জন্য ওই সামারহাউসটায় আসতেন।”

এতক্ষণে খেয়াল করলেন হ্যাডলে আর ফেল্‌। অন্ধকার লেকের মাঝামাঝি জায়গায়, লতার আড়ালে ঢাকা পড়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে আছে একটা একতলা ছোট্ট বাড়ি।

কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে রইল লন। তারপর জোসেফ আবার কথা শুরু করলেন।

“ডক্টর লেসিং-এর তৃতীয় সন্তান ছিল মার্থা। প্রায় আমারই বয়সী ছিল ও। ওকে আমি খুব... পছন্দ করতাম। আর্থার সমার্স, মানে যার সঙ্গে ওর বিয়ে হওয়া ঠিক হয়ে গেছিল, একটা লাইন রেজিমেন্টে কমিশনড অফিসার ছিল। চমৎকার ছেলে। মার্থা বাদে এই বাড়িতে আমিই ছিলাম ওর সবচেয়ে কাছের লোক। আমরা ওর আসার অপেক্ষাতেই ছিলাম যখন... ঘটনাগুলো ঘটে।

সেবার সাংঘাতিক গরম পড়েছিল।

আমি একজন মণিকারের দোকানে কাজ করতাম। ছুটি পড়ার পর এখানে এসে চারদিকে সবুজ, শান্ত পরিবেশ পেয়ে মনে হয়েছিল, বাঁচলাম।

আর মার্থা!

সেবারের ছুটির কথা ভাবতে গেলেই দুধসাদা পোশাকে রাজকন্যার মতো গরবিনী মার্থার কথা মনে পড়ে। হাসি, খেলা, আর ছুটোছুটি। এই নিয়েই থাকত ও।

বেলা দু’টো-র পর আমরা লাঞ্চ আর চা-এর মাঝামাঝি একটা কিছু সারতাম। ১৫ই অগস্ট সেসব মেটার পর আমরা প্রত্যেকেই বেরিয়ে পড়ার প্ল্যান করেছিলাম। ওই...”

জোসেফের আঙুল অনুসরণ করে অন্ধকার বাড়িটার দিকে তাকান হ্যাডলে আর ফেল্‌। বাড়ির একদম মাঝামাঝি, দেওয়াল থেকে বাইরের দিকে বাক্সের মতো এগিয়ে আসা একটা জানলা দেখালেন জোসেফ।

“ওই জানলার পাশেই টেবিলটা সাজানো হয়েছিল।

ডক্টর লেসিং সবচেয়ে আগে টেবিল থেকে ওঠেন। একে গরম, তায় হাওয়ার অভাবে দুপুরটা এমন ঝিম-ধরা হয়ে উঠেছিল যে আমারও ঘুম পাচ্ছিল।

ঝিলের ধারেই জুনিয়র ইট, কাঠ, এসব দিয়ে একটা ছোটোখাটো জেটি বানিয়েছিল। তার ধারেই রাখা ছিল একটা দাঁড়টানা নৌকো, আর একটা ‘পান্ট’, মানে পোল দিয়ে টানতে হয় এমন চ্যাপ্টা নৌকো।

ডক্টর লেসিং-কে আমরা সবাই দেখতে পেয়েছিলাম। বগলে একটা বালিশ, আর হাতে একটা বই নিয়ে উনি লন পেরিয়ে দাঁড়টানা নৌকোর কাছে যান। তারপর নৌকোটার দাঁড় বেয়ে সামারহাউসে পৌঁছন।

তারপর ওঠে মার্থা। ওর যেমন স্বভাব, তেমনই করেছিল। হেসে, চেয়ারটাকে পেছনে ঠেলে, ও দৌড়ে বেরিয়ে গেছিল।

তার একটু পরেই আমিও উঠে বেরিয়ে গেছিলাম। আমার পর টেবিল ছেড়েছিল জুনিয়র। শুধু ব্রাউনরিগ আলসেমি করে সেদিন টেবিল ছেড়েই ওঠেনি। রোদ্দুর যাতে গায়ে না লাগে সেজন্য চেয়ারটাকে এক পাশে সরিয়ে, এক কাঁড়ি আখরোট নিয়ে ও সারা দুপুরটা কাটিয়ে দিয়েছিল।

এসব কথার সাক্ষী ছিল একজন।

রবিনসন বলে এক মালী জানলার নীচেই বাগানে কাজ করছিল। সে আমাদের কথা শুনেছিল, আমাদের বেরিয়ে যেতে দেখেছিল। সামারহাউসে ডক্টর লেসিং ঢুকে যাওয়ার পর যে তার সামনের আর পেছনের দুটো দরজাই ভেজানো ছিল, এবং তারপর সারা দুপুর, বিকেল, এমনকি সন্ধে অবধি আর কেউ ওখানে যায়নি, এটাও সে দেখেছিল।

ছ’টা নাগাদ আমরা ফিরে এসেছিলাম।

যখন লনে ছায়াগুলো লম্বা হতে শুরু করল, আশপাশটা একটু বেশিই ফাঁকা লাগতে শুরু করল, তখন আমাদের ব্যাপারটা খেয়াল হল।

ডক্টর লেসিং তখনও বেরোননি!

ব্যাপারটা আমাদের সবার কাছেই অস্বাভাবিক লেগেছিল। আমরা তীর থেকে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ পাইনি।

বয়সে বড়ো হওয়ার সুবাদে ব্রাউনরিগ খবরদারি করার সুযোগ পেলে ছাড়ত না। তখনও ও আমাকে, একদম ফাইফরমাশ খাটানোর মতো করে বলে দিল ডক্টর লেসিং-কে ডেকে তুলতে।

আমি ‘পান্ট’ একেবারেই সামলাতে পারতাম না। এদিকে দাঁড়টানা নৌকোটা তখনও সামারহাউসের সামনেই বাঁধা আছে দেখছিলাম। শেষ অবধি জুনিয়র আমার সঙ্গে হাত লাগাল। আমরা দু’জনে, প্রচুর কসরত করে শেষ অবধি সামারহাউসে পৌঁছে ঘরে ঢুকলাম।

এক নজরে মনে হয়েছিল, ডক্টর লেসিং ঘুমিয়েই আছেন।

এক পাশ ফিরে শুয়ে ছিলেন মানুষটা। বালিশে মুখটা প্রায় গুঁজে ছিল। একটা হাত নীচে ঝুলছিল। নীচে, মেঝেতে, ‘থ্রি মেন অন আ বোট’ বইটা পড়েছিল।

তারপরেই আমার মনে হল, কিছু একটা গোলমাল আছে। জুনিয়র তখনই দেখাল, মানুষটির কান থেকে কিছু একটা বেরিয়ে এসেছে। কাছে গিয়ে দেখলাম সেটা কালচে লাল, চকচকে... রক্ত!

ডাক্তার বলেছিলেন, ঘুমের মধ্যেই মারা গেছিলেন ডক্টর লেসিং। তাঁর ডান কানের মধ্য দিয়ে একটা গোল, কিন্তু মাথার দিকে সরু, শক্ত, আর ধারালো জিনিস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টুপি ঝোলানোর পেরেকের চেয়ে চওড়া, অথচ পেন্সিলের চেয়ে সরু সেই জিনিসটা, অর্থাৎ খুনির হাতিয়ারটা, পুলিশ কোথাও খুঁজে পায়নি।”

জোসেফ লেসিং চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। গাছের মাথাগুলোকে দুলিয়ে দিয়ে গেল একটা কনকনে হাওয়ার দাপট। তারাভরা আকাশের নীচে জোসেফের মাথার সাদা টুপির ওঠানামা থেকে হ্যাডলে আর ফেল্‌ বোঝেন, মানুষটি মাথা দুলিয়ে কিছু ভাবছেন, কিছু কথা সাজিয়ে নিচ্ছেন।

“হুঁ।” বিপুল শরীরের ভার বেঞ্চে ছেড়ে দিয়ে এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন ফেল্‌, কিন্তু এবার তিনি প্রশ্ন করলেন, “পুলিশ কাকে সন্দেহ করেছিল?”

“আমাকে।” নীচু স্বরে বললেন জোসেফ। “ওখানে সেদিন যতজন ছিল, তাদের মধ্যে শুধু আমিই সাঁতার কাটতে পারতাম।”

“কিন্তু...” উত্তেজিত হয়ে ওঠেন হ্যাডলি, “আপনি যে বললেন...?”

“আমি বুঝিয়ে বলছি।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন জোসেফ।

“এই খুনের মোটিভ হিসেবে পুলিশ অর্থলিপ্সাকেই চিহ্নিত করেছিল।

ডক্টর লেসিং যথেষ্ট ধনী ছিলেন, এবং তাঁর সম্পত্তি মোটামুটি সমান চার ভাগেই ভাগ করে আমাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল।

ব্রাউনরিগ যে ঘর ছেড়ে নড়েনি, সেটা রবিনসনের কথায় স্পষ্ট হয়।

মার্থা ওর এক বান্ধবীর সঙ্গে দুপুরটা কাটিয়েছিল।

জুনিয়রের কোনো অ্যালিবাই ছিল না, কারণ ও হাঁটাহাঁটি করতেই বেরিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ওকে সন্দেহ করার মতো কোনো কারণ পায়নি।

আমিই ছিলাম একমাত্র ‘বেমানান’ সদস্য। তার ওপর লোকের মুখের ওপর চ্যাটাং-চ্যাটাং কথা বলার বদভ্যাস, সন্দেহবাতিক, এসবের জন্য আমাকে দোষী ভেবে এগোনোটা বোধহয় সহজ ছিল।”

হ্যাডলে আর ফেল্‌ নীরব রইলেন। জোসেফ আবার মুখ খুললেন।

“ইন্সপেক্টর ডিয়ারিং-এর মতে, আমার প্ল্যানটা ছিল এরকম।

আমি আগে এটা নিশ্চিত করব যে বাড়ির আশেপাশে কেউ থাকবে না। তাহলে সবাই ভাবতে বাধ্য, যে খুনি বাইরে থেকে এসে, ‘পান্ট’ চালিয়ে সামারহাউসে গিয়ে খুনটা করে আবার ফিরে এসেছে। যেহেতু ‘পান্ট’ আমি একেবারেই ম্যানেজ করতে পারি না, তাই আমাকে লোকে সন্দেহ করবে না।

তারপর, ইন্সপেক্টরের মতে, আমি ঝিলের ওই পারে ওই... যেখানে বেশ কয়েকটা গাছ ঝুপসি হয়ে রয়েছে, ওখানে আসি। খাওয়ার ঘরের জানলা আর সামারহাউসের সঙ্গে একই রেখায় রয়েছে ওই জায়গাটা। আমি নাকি আগেই পোষাকের নীচে স্নানের পোষাক পরেছিলাম। তাই, জামাকাপড় খুলে আমি জলে নামি।

বিশ গজ সাঁতার কাটা সত্যিই আমার কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না। ইন্সপেক্টরের মতে আমি পেছন দিক থেকে যখন সামারহাউসে পৌঁছই, তখন ব্রাউনরিগ স্বাভাবিকভাবেই এই বাড়ির দোতলার জানলা দিয়ে আমাকে দেখতে পায়নি, কারণ আমি আড়াল হয়ে গেছিলাম। তারপর আমি সামারহাউসের জানলার নীচে আসি, আর খোলা জানলা দিয়ে সেখানে ঢুকি।

স্নানের পোশাকের মধ্যেই নাকি আমি খুনের অস্ত্রটি লুকিয়েছিলাম। খুন করে আমি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি। রোদের তেজ ছিল মারাত্মক, তাতেই আমার গা-হাত-পা শুকিয়ে যায়।

এভাবেই নাকি আমি, দুনিয়াতে আমার প্রতি সহানুভূতি দেখানো একমাত্র মানুষটিকে মেরে ফেলেছিলাম।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন জোসেফ। ঝিলের দিক থেকে বয়ে আসা হাওয়া গাছগুলোতে আওয়াজ তুলল। নড়েচড়ে উঠলেন দুই শ্রোতা।

আবার জোসেফ কথা শুরু করলেন।

“আমি বারবার বলেছিলাম, আমি এই কাজ করিনি। তাছাড়া কোনো সাক্ষী নেই, কোনো প্রমাণ নেই, শুধু গায়ের জোরে এইভাবে কিছু বলা...

তবু আমার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। লাইব্রেরিতে, কোর্ট বসানোর মতো করে, ওরা আমাকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। ওরা মানে... মূলত ব্রাউনরিগ। মার্থা শুধু কাঁদছিল। জুনিয়র কয়েকবার ‘ফেয়ার-প্লে’, ন্যায়বিচার, এসবের কথা তুলেও দম-ফুরোনো পুতুলের মতো চুপ করে গেছিল। কিন্তু ব্রাউনরিগ মসৃণভাবে, হিসহিসে সুরে, কথাগুলো বলছিল।

‘হয় আমাদের এটা মেনে নিতে হবে, যে তুমিই খুনটা করেছ।’ ব্রাউনরিগ বলছিল, “নইলে মানতে হবে যে কোনো ভূতপ্রেত এই কাণ্ডটা করেছে! দ্বিতীয়টা মানা অসম্ভব। তাই তুমিই...! কাজকম্মো না করে টাকা কামানোর সহজ রাস্তা বেছে নিয়েছিলে, তাই না?’

তবে এসব কথা বললেও ওদের আমি ভয় পাইনি। আমার আশঙ্কা ছিল ইন্সপেক্টর ডিয়ারিং-কে নিয়ে।

পুলিশ আমায় গ্রেফতার করেনি, কারণ তাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছিল না। কিন্তু রোজই মনে হত, হয়তো আজকেই ওরা আমার বিরুদ্ধে কিছু খুঁজে পাবে। ডক্টর লেসিং-এর অন্ত্যেষ্টির পর, যখন গরম আরও বাড়ল, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল মার্থার কান্নাকাটি, তখন মনে হচ্ছিল এই সন্দেহ আর অভিযোগের নরক থেকে ফাঁসিকাঠও ভালো।

আর তারপরেই...

ওই জানলাটা দেখতে পাচ্ছেন?”

জোসেফের আঙুল অনুসরণ করে হ্যাডলে আর ফেল্‌ বাড়িটার একদম ওপরে, ছাদের ঠিক নীচেই একটা জানলার দিকে তাকালেন। অল্প আলোতেও জানলাটার একটা বিশেষত্ব ওঁদের নজর এড়ালো না।

“গরাদ লাগানো আছে দেখছি জানলাটায়।” বললেন হ্যাডলে।

“হ্যাঁ।” অন্ধকারেও টুপিটার নড়াচড়া দেখা গেল, “ঘরটার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিই আপনাদের।

ঘরটা ছোটো। চৌকো। একটা দরজা, আর একটা জানলা আছে ওতে। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন ওই ঘরে আসবাব বলতে কিচ্ছু ছিল না। একবার ওই ঘরে একটা ট্র্যাজেডি হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ঘরটা ওইরকম ফাঁকা আর তালাবন্ধ হয়ে থাকত। ঘরের চাবিটা থাকত ডক্টর লেসিং-এর কাছেই।”

একটা দেশলাই জ্বলে উঠল। অন্ধকারের মধ্যে লাফিয়ে ওঠা আলোয় হ্যাডলে আর ফেল্‌ একটা পাইপ, খাড়া নাক, টানা চোখ, আর শনের মতো সাদা লম্বা চুল, এটুকুই দেখতে পেলেন।

“২২শে অগস্ট বিকেলবেলা। এই পরিবারের যিনি সলিসিটর ছিলেন, তিনি আগেভাগে কিছু না জানিয়েই এখানে হাজির হলেন। আমি বাকিদের ডাকতে গিয়ে দেখি, ব্রাউনরিগ এক বোতল হুইস্কি নিয়ে নিজের ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি, জুনিয়র হাঁটতে বেরিয়েছে, আর মার্থা নিজের শোয়ার ঘরে।

ক’দিন ধরেই মার্থা বলছিল, ও অসুস্থ। মুশকিল হল, অসুস্থতাটা ঠিক কী ধরনের, তা না বলে ও শুধু কান্নাকাটি করছিল। বুঝতে পারছিলাম, ও আর্থার, মানে যার সঙ্গে ওর বিয়ে হওয়ার কথা হয়েছিল, তার জন্য অপেক্ষা করতে-করতে অস্থির হয়ে পড়েছে। অথচ বেচারি ছুটি না পাওয়ায় আসতে পারছিল না।

সেদিনও ওর ঘরে উঁকি মেরে দেখেছিলাম, ও একটা চেয়ারে গা এলিয়ে রয়েছে। হাতে একটা স্মেলিং সল্টের বোতল। কেঁদে-কেঁদে চোখগুলো ফোলা। একটা ধবধবে সাদা পোশাক পরে, মাথার চুলগুলো চূড়া করে, একটা ওই... ঘড়ি-লাগানো পেনড্যান্ট গলায় ঝুলিয়ে কাত হয়ে শুয়েছিল ও। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ও কেমন আছে? উত্তরে ও আমার দিকে একটা বই ছুড়ে আবার কাঁদতে শুরু করল!

নিরুপায় হয়ে আমি একাই গেলাম সলিসিটরের সঙ্গে কথা বলতে। নীচের ঘরে বসে যখন আমরা কথা বলছি, তখনই একটা শব্দ শুনলাম।

আমি একা নই, শব্দটা সলিসিটর ভদ্রলোকও শুনেছিলেন। আমরা দু’জনেই বুঝেছিলাম, আওয়াজটা ওপর থেকে এসেছে। দোতলায় উঠে দেখি, মার্থা তার ঘরে নেই। ও কোথায় যেতে পারে সেটা আন্দাজ করলাম ছাদের ঘরে যাওয়ার সিঁড়ির মুখের দরজাটা খোলা দেখে। আমরা ওপরে উঠলাম।

ওপরে গরম আরও বেশি ছিল। ওই বন্ধ ঘরের দরজাটা আধখোলা হয়ে ছিল। তার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি কাজের মেয়ে, কী যেন নাম... বোধহয় জেন ডসন... যাকগে, সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। কোনোক্রমে সে শুধু আঙুল তুলে ঘরের ভেতরটা দেখাতে পেরেছিল।

ঘরটা, আগেই বলেছি, ছোটো সাইজের। ফাঁকা। একটা ময়লাটে খয়েরি রঙ ছিল দেওয়ালে। সূর্য নীচে নেমে এলেও তার দাপট কমেনি। সেই চোখ-ধাঁধানো আলো জানলার গরাদের ছায়া ফেলেছিল মার্থার সাদা পোশাকে।

ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় পড়েছিল মার্থা।

আমি ওকে তুলে ধরে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। তখনই দেখেছিলাম, ওর চোখ থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তের ধারা!

ঘরে আর কেউ ছিল না।

কাজের মেয়েটি বলেছিল, ও মার্থাকে ডক্টর লেসিং-এর বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে। মার্থা তখন, ওই স্কার্ট পরেও, প্রায় দৌড়চ্ছিল। সেই অবস্থাতেও ও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। মার্থাকে ওইভাবে ওপরের ঘরে যাওয়ার সিঁড়ি খুলে ছুটতে দেখে মেয়েটি ভয়ই পেয়ে যায়, এবং ওর পিছু-পিছু ওপরে আসে।

ওপরে উঠে মেয়েটি দেখে, মার্থা এই বন্ধ ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢোকে। তারপর... তারপর মার্থা বন্ধ না করলেও দরজাটা নাকি ওর পেছনে-পেছনে বন্ধ হয়ে যায়। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর আশঙ্কার বশে মেয়েটি তখনই দরজাটা খুলতে চেষ্টা করেনি। কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ও যখন কী করবে ভাবছে, তখনই সেই অদ্ভুত শব্দটা হয়, যেটা আমরাও নীচে বসেই শুনেছিলাম।

শব্দটা কেমন ছিল তা মেয়েটি বর্ণনা করতে পারেনি। তবে সেটা যথেষ্ট জোরে হয়েছিল। দেওয়াল-জড়ানো লতানে গাছে বসা পাখিরা উড়ে গেছিল। এমনকি ঝিল যেখানে বাড়িটার একদম কাছে এসেছে, ওই যে... হ্যাঁ, ওখানে, রাজহাঁসগুলোও নাকি ওখানে জল থেকে উঠে এসেছিল।

মেয়েটি ভয়ে-ভয়ে দরজা কিছুটা ফাঁক করে ঘরের ভেতরে তাকিয়ে দেখেছিল। ওইভাবে পড়ে থাকা মার্থা ছাড়া ঘরে তখন আর কেউ ছিল না।

আমরা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।

মেয়েটির বয়ানে কোনো ফাঁক ছিল না। এমনকি পুলিশও সেখানে অবিশ্বাস করার মতো কিছু পায়নি। মেয়েটি বারবার বলেছিল, মার্থাকে, এবং শুধু মার্থাকেই সে ওই ঘরে ঢুকতে দেখেছিল। ঘর থেকে কেউ বেরোয়নি। ঘরের মধ্যে লুকোবার কোনো জায়গা ছিল না। জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে কারও পালানোর প্রশ্নই ওঠেনি। আর ঘরের মধ্যে যে কোনো যন্ত্র-টন্ত্র লুকোনো ছিল না, সেটাও ইন্সপেক্টর ডিয়ারিং তন্নতন্ন করে খুঁজে নিশ্চিত করেছিলেন।

তবে হ্যাঁ, এটা পুলিশ খেয়াল করেছিল যে ঘরটার সিলিং বা দেওয়ালে ধুলোবালি থাকলেও মেঝেটা ছিল একদম পরিষ্কার।

ব্যাপারটা শুনতে যতটা অবিশ্বাস্য লাগছে, বিশ্বাস করুন, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি ছিল। মার্থা! কীভাবে?? কেন?

পরে আমি আর জুনিয়র হাঁটতে-হাঁটতে এই ঝিলের ধারে এসেছিলাম। জুনিয়র কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, কেন মার্থা ওপরের ওই ঘরে গেছিল। সেই প্রশ্নটাই ও বারবার আমাকে, নিজেকে, বিশ্বসংসারকে করে চলেছিল। তখনই জলের ধারে ভেসে আসা থাকা ওই নলবনের মধ্যে একটা কিছু আমাদের চোখে পড়ল।

জিনিসটা দেখে এক নজরে মনে হয়েছিল, যেন জলের মধ্য দিয়ে তীরের দিকে ভেসে আসছে একটা লম্বা নখের মতো কিছু। কাছে এলে বুঝতে পারলাম, ওটা একটা রাজহাঁসের গলা, যার মাথাটা গলা থেকে, কিছু একটার ঘায়ে, প্রায় আলাদা হয়ে গেছে!

আমরা একটা নৌকো টানার হুক দিয়ে ওটাকে জল থেকে তুলে দেখেছিলাম।”

জোসেফ লেসিং চুপ করে গেলেন। অন্ধকার ঝিলের জলে, আর গাছের পাতায় দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো আওয়াজ তুলে ঘুরপাক খেল হাওয়া। হ্যাডলে অবশ্য তার মধ্যেও ফেল্‌-এর লম্বা-লম্বা শ্বাসের শব্দ পাচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, নিজের রাগটাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন ফেল্‌।

“হুঁহ্‌!” গলা নয়, বরং নাক দিয়ে শব্দটা বের করলেন ফেল্‌, “তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, এগুলো কীভাবে হয়েছিল, সে ব্যাপারে আপনি কিচ্ছু জানেন না?”

“মানে?” জোসেফ লেসিং যে বিলক্ষণ চমকেছেন, সেটা বোঝা গেল।

“মানে আপনি সত্যিই জানেন না, কীভাবে এই খুনগুলো করা হয়েছিল?”

“না।” স্পষ্ট গলায়, গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন ছোটোখাটো মানুষটি।

“আচ্ছা বেশ।” সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে ফেল্‌ বলেন, “তাহলে আর একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি হাওয়ায় তির ছুঁড়েছেন কখনও?”

“এক মিনিট! এক মিনিট!” সোজা হয়ে বসেন হ্যাডলে। “কী বলতে চাইছেন? কেউ হাওয়ায় তির ছুড়ে মার্থাকে মেরেছিল?”

“ধুর!” কথাটা উড়িয়ে দিলেন ফেল্‌। “আমি ছেলেমানুষি খেয়ালের কথা বলছি। যেরকম খেয়াল থেকে লোকে হাওয়ায় পাথর বা তির ছুঁড়ে দেখে, সে কতটা উঁচুতে পাঠাতে পারল জিনিসটাকে। আমার আশঙ্কা, জোসেফ লেসিং মহোদয় এসব ছেলেমানুষি জিনিসে আনন্দ পান না। আর পান না বলেই এই মামলার সবচেয়ে বড়ো গলদগুলো তাঁর চোখে পড়েনি।

যেমন ধরুন, পাখিরা কারও গলার আওয়াজ, এমনকি চিৎকার শুনেও দল বেঁধে আকাশে ওড়ে না। আপনি যেরকম বললেন তাতে বাড়ির আশেপাশে, এমনকি ঝিলের পাখিরাও জুনিয়রের হাঁটাচলা আর বকবক দেখে ওই ধরনের আওয়াজে অভ্যস্ত ছিল। তাছাড়া পাখিরা উড়লেও রাজহাঁসেরা জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসার মতো কাজ শুধু তখনই করে যখন তাদের গায়ে, বা তাদের মাঝখানে কিছু এসে পড়ে।

অর্থাৎ, ওই জানলা দিয়ে কেউ, বা কিছু একটা জিনিস জলে পড়েছিল।

তারপর আসুন আরেকটা সহজ কথায়। কোনো মহিলা কখনও ভয় পেয়ে ওপরের একটা তালাবন্ধ ঘরে ছুটবে না, বিশেষত সেই ঘরের সঙ্গে যখন, আপনার কথামাফিক, একটা ট্র্যাজেডি জড়িয়ে আছে। সে নীচে যাবে, যেখানে লোকজন রয়েছে।

মার্থা ওপরের ওই ঘরটায় গেছিল একটাই কারণে।

না, কোনো জিনিস খুঁজতে সে যায়নি, কারণ ওখানে কিচ্ছু ছিল না। তাহলে কেন গেছিল ও?

আমরা জানি, বেশ কিছুদিন ধরেই মার্থা নিজের বাগদত্তা ওই ছেলেটির আসার জন্য দিন গুনছিল। ওর ওই কান্নাকাটি, অসুস্থ বলে নিজেকে সরিয়ে রাখা, এসবই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, সপ্তাহের-পর-সপ্তাহ ধরে আর্থারকে দেখতে না পাওয়া, আর ডক্টর লেসিং-এর মৃত্যু, এই দুয়ের চাপ ও আর নিতে পারছিল না।

এটাও লক্ষণীয় যে, ওই ঘরটা সবচেয়ে উঁচুতে বলে ওর জানলা দিয়েই কিন্তু গ্রাম থেকে এদিকে আসার রাস্তাটা সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।

তাহলে, কেউ যদি মার্থাকে বলে যে তার মনে হয়েছিল, ... দূর থেকে দেখার ফলে সেটা ভুলও হতে পারে, কিন্তু তবু... আর্থারকে সে গ্রাম থেকে এদিকে আসার রাস্তায় দেখেছে, তাহলে মার্থা ওই অবস্থায় কী করত?

ফাঁদ পাতা হল।

ডক্টর লেসিং-এর ঘরে গিয়ে, বাক্স থেকে চাবিটা বের করে, স্বস্তিতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে মার্থা ওই ঘরে গেল। দরজা খুলে মার্থা দেখল, ওর চোখে সূর্যের আলো পড়ে একদম ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। তখন, আরও স্পষ্টভাবে রাস্তাটা দেখার জন্য ও জানলার দিকে এগোল, কারণ, কোনো সদয় ব্যক্তি ওকে সাহায্য করার জন্য জানলার ধারে একটা কিছু রেখে দিয়েছিলেন। কেউ যাতে ধুলোয় পড়া পায়ের ছাপ থেকে তাঁকে চিনতে না পারে, তাই মেঝেটা ঝাড় দিয়েও রেখেছিলেন তিনি।

কী রাখা হয়েছিল সেখানে?”

“একটা দূরবীন।” খসখসে গলায় কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন হ্যাডলে।

“তবু,” তর্ক করার মতো করে বললেন ফেল্‌, “যে জানলায় গরাদগুলো এতই কাছাকাছি যে সেখান দিয়ে হাতও গলানো যায় না সহজে, সেখানে একটা দূরবীন লাগিয়ে দেখা যে খুবই কঠিন, তা আমরা সবাই জানি। যেদিকেই ঘোরান, গরাদগুলো সামনে পড়বে, আর ওগুলোই ফোকাসে আসবে। তখন আপনি কী করবেন?

আপনি অধৈর্য হয়ে দূরবীনটা কাত করে জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে আগে বাইরে বের করবেন। তারপর দু’টো গরাদের মধ্য দিয়ে হাত বের করে, গরাদে নাক-মুখ ঠেকিয়ে আপনি দূরবীনটা চোখে ফিট করবেন। তাই তো?”

অদ্ভুত শান্ত, ভদ্র, কিন্তু হিংস্র রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন ফেল্‌। তবু নিজেকে শান্ত রেখে বলে চললেন তিনি।

“কিন্তু এই দূরবীনটা তো খুব সাদামাটা জিনিস ছিল না।

মার্থা সেটাতে চোখ লাগিয়েই বুঝেছিল, ছবি ঝাপসা আসছে। তাই সে মাঝের স্ক্রুটা ঘুরিয়ে ফোকাসটা ঠিক করার চেষ্টা করল। আর তখনই আঘাত হানল মৃত্যু! বিস্ফোরিত হওয়ার মতো করে একটা ধারালো স্টিলের হুক বেরিয়ে এল দূরবীনের পেছন দিকটা দিয়ে, আর মার্থার চোখ দিয়ে একেবারে মাথার ভেতর অবধি পৌঁছে গেল।

মার্থা পেছনদিকে ঠিকরে গেছিল সেই ধাক্কায়। সেজন্যই ও ঠিক জানলার কাছে ছিল না। কিন্তু ওর হাত থেকে নীচে পড়ে গেছিল দূরবীনটা, আর তার ভারী স্টিলের হুকটাই নীচের একটা রাজহাঁসের মাথাটা গলা থেকে প্রায় আলাদা করে দিয়েছিল। তারপর, দূরবীনটা তলিয়ে গেছিল জলে।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ফেল্‌। একটা চুরুট হাতে নিয়েও সেটা না ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন তিনি।

“ব্যস্ত সলিসিটররা ‘হঠাৎ করে’ কোথাও আসেন না। তাঁদের ডেকে আনা হয়। ব্রাউনরিগ মাতাল অবস্থায় ছিল। জুনিয়র বাড়িতে ছিল না। দূরবীনটার নীচে পড়া দেখার জন্য কেউ ছিল না। কিন্তু খুনির একটা জবরদস্ত অ্যালিবাই দরকার ছিল। তাই ওই সলিসিটারকে ডেকে আনা হয়েছিল। মার্থাই ছিল এই বাড়ির একমাত্র সদস্য, যাকে ফাঁদে ফেলে ওইভাবে মারা যেত, যাতে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে, তাদের নজর ডক্টর লেসিং-এর খুনির থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।

বাড়িতে একজনই ছিল যে, নিজের জবানবন্দি অনুযায়ীই, মার্থার মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কথা বলেছিল।

বাড়িতে একজনই ছিল যে মণিকারের সঙ্গে কাজ করত, এবং তার ফলে একটা দূরবীনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার মতো দক্ষতা এবং যন্ত্রপাতি, দুই-ই যার কাছে ছিল।

ফলে প্রশ্ন থাকে একটাই।”

সোজা জোসেফ লেসিং-এর দিকে ঘুরে প্রশ্নটা করলেন ফেল্‌। অন্ধকারেও তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।

“পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করেনি কেন?”

“করেছিল।” শান্তভাবে বললেন জোসেফ লেসিং, “আমি মাত্র মাসখানেক হল ব্রডমুর থেকে ছাড়া পেয়েছি।”

আবার একটা দেশলাই জ্বলে উঠল অন্ধকারে। নিভে যাওয়া পাইপটা ধরিয়ে নিলেন জোসেফ।

“তাহলে আপনি...” রাগ, বিস্ময়, বিরক্তি, সবকিছু নিজের গলায় মিশিয়ে বলে উঠলেন হ্যাডলে, “এতক্ষণ ধরে আমাদের এইসব শোনাচ্ছিলেন কেন? কী জানতে চাইছিলেন আপনি?”

“আহ্‌! আপনাদের তো গোড়াতেই গলদ হয়ে গেছে।” শান্তভাবে বলেন জোসেফ লেসিং, “ডক্টর লেসিং আর মার্থা-কে কে খুন করেছিল, সেটা আমি আদৌ জানতে চাইনি। আমার প্রশ্নটা অন্য।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ব্রাউনরিগ আর জুনিয়র বলেছিল, আমার মা পাগল ছিলেন। আমিই ওদের বাধ্য করেছিলাম কথাটা বলতে। বলেছিলাম, ওরা যদি ওইরকম বলে আমার ফাঁসি যাওয়া ঠেকিয়ে ব্রডমুরের পাগলাগারদে যাওয়ার ব্যবস্থা না করে, আমি সত্যি কথাটা বলে দেব।

সত্যি এটাই, যে আমার নয়, বরং ওদের, মানে ব্রাউনরিগ-জুনিয়র-মার্থা-র মা পাগল ছিলেন। ওই ওপরের ঘরটা থেকেই তিনি নীচে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন, তাই জানলায় গরাদ লাগানো হয়েছিল। ব্রাউনরিগ আর জুনিয়র দু’জনেই ভেবেছিল, তাদের মা পাগল ছিলেন, এই কথাটা জানাজানি হলে তাদের পেশাগতভাবে সর্বনাশ হবে।

তাই, আমার প্রশ্ন একটাই মহোদয়গণ।”

অন্ধকারে উঠে দাঁড়ান জোসেফ লেসিং। তাঁর সাদা টুপির নড়াচড়া, আর পাইপের মধ্যে ধিকিয়ে ওঠা ফুলকি দেখতে পান হ্যাডলে আর ফেল্‌।

“আমি পাগল নই, ছিলামও না। আর আমার মা-বাবাও সুস্থই ছিলেন।

তাহলে আমার আশ্রয়দাতা, সহৃদয় মানুষটিকে, এবং তারপর একটা বাচ্চা, হাসিখুশি মেয়েকে, আমি কেন মারলাম বলতে পারেন?”

লনে ঘন হয়ে ওঠে নৈঃশব্দ্য।

হাওয়ায় মড়মড়িয়ে ওঠা গাছের নীচ দিয়ে, অন্ধকারের সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার মতো করে সাদা টুপি পরা মাথাটা দুলতে-দুলতে সরে যায়।

মূল কাহিনি: “দ্য রং প্রবলেম”
প্রথম প্রকাশ: ১৪ই অগস্ট, ১৯৩৬, লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায়

রাস্তা


মূল গল্প “দ্য গেটওয়ে অফ দ্য মনস্টার” প্রথম প্রকাশিত হয় The Idler পত্রিকায় 1910 সালে। সেই সময়ে গল্পের অলংকরণ করেছিলেন Florence Briscoe - যা এই অনুবাদের সঙ্গে পরিবেশিত হয়েছে।

কারনাকির কাছ থেকে গল্প, থুড়ি ওর অভিযানের রোমাঞ্চকর আখ্যান শোনার কয়েকটা নিয়ম আছে।

আমাদের কাছে কার্ড মারফৎ আমন্ত্রণ আসবে। কার্ডে লেখা দিনটিতে, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে সময়মতো ৪২৭ নম্বর চেইন ওয়াক-এ ওর বাড়িতে পৌঁছতে হবে। খাওয়াদাওয়া হবে, তবে সেই সময় মূল ব্যাপার নিয়ে কিচ্ছুটি বলা যাবে না। খাওয়ার পর কারনাকি মুখ খুলবে।

সেদিনও তাই হল। ওর কার্ড পেয়ে আমি, জেসপ, টেলর, আর কার্টরাইট ওর বাড়িতে পৌঁছলাম। আদর্শ গৃহস্বামীর মতো কারনাকি আমাদের আপ্যায়ন করল। জমিয়ে ডিনার সারা হল। হাতে চুরুট, পাইপ, কফি এইসব নিয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছে বসা হল।

কারনাকি, যাকে ইদানিং অনেকেই কিছুটা ব্যঙ্গ, আর কিছুটা সম্ভ্রম মিশিয়ে ‘গোস্ট-ফাইন্ডার’ বলছে, শুরু করল ওর সাম্প্রতিকতম ভূতান্বেষণের কাহিনি। চোস্ত গল্প-বলিয়ের কথার ওপর আমার কলম চালানো সাজে না, তাই ও যা-যা বলেছিল, সেটাই লিখে দিলাম এখানে।

 

“আমি কোথায় গেছিলাম সেটা বলা যাবে না। এমনকি ক্লায়েন্টের নামটাও বলা বারণ, তবে ধরে নাও তাঁর নাম… হেন্ডারসন।

হেন্ডারসন আমার কাছে এসেছিলেন একটা সমস্যা নিয়ে। লন্ডন থেকে বেশ কিছুটা দূরে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে একটা বিশেষ ঘর আছে। ঘরটাতে নাকি ভূতুড়ে উপদ্রব চলে। এর বেশি কিছু হেন্ডারসনের কথা থেকে বোঝা গেল না। তবু, আমি বলে দিয়েছিলাম, ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

নিজের মতো করে ওই বাড়ির সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নিয়ে আমি দু’দিন পর হেন্ডারসনের বাড়িতে পৌঁছলাম। তখন সন্ধে নামছে। বাড়িটা যে বহু-বহু পুরোনো, সেটা দেখেই বুঝতে পারছিলাম। ওই বাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন বাসিন্দা, বাটলার… ধরে নাও, তার নাম পিটার, আমার অপেক্ষায় ছিল। হেন্ডারসন তাকে বলে রেখেছিলেন, আমাকে যেন সব রকম ভাবে সাহায্য করা হয়।

একা-একা ডিনার সারা, তাও আবার ওইরকম একটা চুপচাপ বাড়িতে, বড়োই কঠিন কাজ। সময় কাটানোর জন্যই আমি পিটারকে সেই ঘরটা নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে দিয়েছিলাম। তার কথা শুনে বুঝলাম, ‘গ্রে রুম’ নামে পরিচিত ওই ঘরের সমস্যা দুটো।

প্রথমত, প্রতিদিন সকালে দেখা যায় যে ওই ঘরের বিছানার চাদর কুঁচকে-মুচকে ঘরের এক কোণে পড়ে আছে।

দ্বিতীয়ত, এবং আসল সমস্যা হল, ওই ঘরের দরজা মাঝরাতে খুলে যায়, আর তারপর দড়াম করে বন্ধ হয়। কখনও একবার, কখনও একাধিকবার! আর এই পুরো ব্যাপারটা হয় যখন ঘরের দরজায় তালা তো দেওয়া থাকেই, সেই তালার একমাত্র চাবিও ঝোলে প্যান্ট্রিতে রীতিমতো নজরদারদের চোখের সামনে।

আমাকে কথাগুলো বলতে গিয়ে পিটারের ঘাম ছুটে গেছিল। ও খুব স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছিল, প্রায়ই এমন হয় যে না ঘুমিয়ে ও কান পেতে অপেক্ষা করে সেই মুহূর্তটার জন্য যখন তালাবন্ধ গ্রে রুমের দরজাটা খুলে যাবে, আর সপাটে বন্ধ হবে, একবার, দুবার, তিনবার…!

আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ঘরটা সেই রাতেই একবার দেখতে হবে।

আমার কথা শুনে প্রথমে পিটার ভেবেছিল, আমি বোধহয় ঠাট্টা করছি। সেটা করছি না বুঝতে পেরে ও প্রাণপণে আমাকে থামাতে চেয়েছিল। আমি আগেই জানতাম, বেশ কয়েক শতাব্দী ধরেই রাত নামলে ওই ঘরে ঢোকা নিষেধ। তবু আমি একগুঁয়ে হয়ে ওকে বলেছিলাম, ঘরটা তখনই দেখব আর কয়েকটা জায়গায় সিল লাগাব, যাতে কেউ বদমায়েশি করলে সেটা চট করে ধরে ফেলা যায়।

“আপনি বরং দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিন।” আমি হেসেই বলেছিলাম, “আমার পিছু-পিছু ওই ঘর থেকে অন্য কিছুও যাতে বেরিয়ে না আসে।”

“ওই ঘর থেকে কখনও কিছু বেরিয়ে আসে না স্যার।” ক্ষয়াটে গলায় বলেছিল পিটার, “আমাদের এই বাড়ির মতো … কিছু আপনি কোথাও পাবেন না।”

অস্বীকার করব না, যাবতীয় অভিজ্ঞতা নিয়েও আমার বুকটা ধুকপুক করছিল।

 

ঘরটা বিশাল। দেওয়ালে মাথা ঠেকানো একটা বড়ো খাট, দেওয়ালে ঝোলানো কয়েকটা অযত্নে বেরঙা ফটো, ফায়ারপ্লেস, কয়েকটা কুলুঙ্গি, একটা সোফা, আর তিনটে টেবিল, এছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না ঘরটায়। ওই টেবিল আর ম্যান্টেলপিসে যেক’টা মোমবাতি ছিল, সবগুলো জ্বালানোর পর ঘরের অসহ্য দমবন্ধ পরিবেশটা একটু হালকা হল। আমি চারপাশে এক চক্কর লাগিয়েই জানলা, কুলুঙ্গি, ফায়ারপ্লেস, ফটো, সবকিছুর ওপর রিবন লাগিয়ে মোম আর গালা দিয়ে সিল করা শুরু করলাম।

এই পুরো সময়টা পিটার দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। আমি ওকে ভেতরে আসতে বললাম, ও এল না। আমি ওকে বললাম চলে যেতে, কিন্তু কর্তব্যের খাতিরেই হোক বা হেন্ডারসনের ভয়ে, ফ্যাকাশে চেহারাতেও ও দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। তবে পিটারের মুখ থেকে বেরোনো টুকরো-টাকরা শব্দ থেকেও বুঝতে পারছিলাম, ও বলতে চাইছে, এই ঘরটা যে ঠিক কতটা বিপজ্জনক, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।

বিশ্বাস করো, একে তো ঘরে ঢোকার পর থেকেই মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেছিল, তার ওপর পিটারের এই বিড়বিড় শুনে আমার স্নায়ুর ওপর চাপ আরো বাড়ছিল। তবু, নিরেট দেওয়াল ছাড়া আর সবকিছু আমি রিবন আর সিল দিয়ে ঢেকে দিলাম, যাতে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কেউ ও ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলেই সেটা ধরা পড়বে।

এইসব করতে যে কতটা সময় লাগবে, সেটা ঠিক বুঝতে পারিনি। হঠাৎ, বারান্দার বড়ো ঘড়িতে এগারোটা বাজার শব্দ শুনতে পেয়ে চমকে উঠলাম। তখন পিটারের অবস্থা যদি তোমরা দেখতে! যদি ঘরে ঢোকার সাহস ওর থাকত, তাহলে ও বোধহয় আমার ঘাড় ধরে ঘর থেকে টেনে বের করত।

আমি কোটটা খুলে সোফায় রেখে কাজ শুরু করেছিলাম। পিটারের মুখচোখ দেখে বুঝলাম যে এরপর আমি ঘরে থাকলে ওরই হার্ট অ্যাটাক হবে। ধীরেসুস্থেই কোটটা পরছিলাম। কিন্তু পিটার প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, “আপনি এক্ষুনি বেরিয়ে আসুন স্যার! আপনি বুঝতে পারছেন না, সামনে … খুব বিপদ!”

ম্যান্টেলপিসের ওপরের একটা মোমবাতি তখনই নিভে গেল!

সত্যি বলছি, পিটারের কথার সঙ্গে মোমবাতিটার এই বেমক্কা নিভে যাওয়া মিলে আমার এমন অবস্থা করেছিল, মনে হয়েছিল এক লাফে ঘরের বাইরে চলে যাই! কিন্তু জানতাম, যত ভয়ই পাই না কেন, সেটা প্রকাশ করা যাবে না। তাই নিজেকে সংযত করে, যথাসাধ্য দ্রুত হেঁটে আমি আগে ম্যান্টেলপিসের ওপর থেকে তখনও জ্বলতে থাকা মোমবাতিটা তুলে নিলাম। তারপর অন্য মোমবাতিটা, আর ঘরে জ্বলতে থাকা বাকি মোমগুলোর কাছে গিয়ে সেগুলো নিভিয়ে সবক’টা মোমকে হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

এই সময়টায়, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ঘরের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা বাতাসের ছোঁয়া পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো একটা অদৃশ্য জানলা কেউ খুলে দিয়েছে। এমনকি গ্রে রুমের দরজাটা বন্ধ করার জন্য টানতে গিয়েও আমার মনে হল…

মনে হল, যেন কেউ দরজাটা ঘরের ভেতর থেকে টেনে ধরেছে।

তবু, গায়ের জোরে আমি দরজাটা বন্ধ করলাম, লক করলাম, সিল করলাম, এমনকি চাবির ফুটোটার ওপর আমার একটা কার্ডও সেট করলাম যাতে ভেতর থেকে কেউ লক নিয়ে কারিকুরি করলেই সেটা বোঝা যায়।

পিটারকে সঙ্গে নিয়ে আমি যখন নীচে নামলাম, তখন ওর ফ্যাকাশে মুখ, আর প্রায় কাঁপতে থাকা চেহারা দেখে আমি আরেকবার বুঝলাম, ও বেচারাও এতক্ষণ ধরে কী সাংঘাতিক চাপ সহ্য করেছে!

ঘুমোনোর জন্য তৈরি হতে-হতে প্রায় মাঝরাত হয়ে গেল। ইতিমধ্যে, যাতে অন্য কোনো ঘরের দরজা খুলে বা বন্ধ করে কেউ আমাকে চমকাতে না পারে, সেজন্য আমি করিডরে গ্রে রুম আর আমার ঘরের মাঝের সবক’টা দরজায় সিল মেরে এসেছিলাম। ক্লান্তি, আর স্নায়ুর ওপর একটু অপ্রত্যাশিত রকমের চাপ, দুয়ের বশে ঘুম আসতে দেরি হল না।

 

বেশ কিছুক্ষণ পরে, সেটা কতক্ষণ আমি জানি না, গভীর ঘুমের মধ্য থেকেও আমি জেগে উঠলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি, কেন ঘুমটা ভেঙেছে। তারপরেই করিডরের কোথাও দড়াম করে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেয়ে মাথাটা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, ঘুমের মধ্যেও আমি এমন একটা আওয়াজ পেয়েছিলাম।

এক হাতে মোমবাতি, অন্যটায় পিস্তল নিয়ে দরজা খুললাম। ঠিক করেই রেখেছিলাম, গ্রে রুমে গিয়ে একটা এসপার-ওসপার করব কিন্তু… যা কখনও হয়নি, সেটাই হল তখন।

তোমরা জান, আমি ভীতু নই। ভীতু হলে এই লাইনে আমি টিঁকতে পারতাম না। কিন্তু করিডরে দাঁড়িয়ে দারুণ ভয়ে আমি প্রায় জড়বৎ হয়ে গেলাম!

না! আমি কিছু দেখিনি। অন্তত তখনও কিছু হয়নি দেখার মতো। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, যেন নরক থেকে উঠে আসা একটা নোংরা, কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই ঘরটার কাছেই। ফলে ঘরটার দিকে আমি এক ইঞ্চিও এগোতে পারছিলাম না।

কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর আমি আর পারলাম না। সুবোধ বালকের মতো নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লক করলাম, খাটে এসে বসলাম, আর সারা রাত জেগে ওই ঘরের দরজার সপাটে বন্ধ হওয়ার শব্দ ও তার প্রতিধ্বনি শুনলাম।

 

অবশেষে আকাশের গা থেকে কালো কম্বলটা সরিয়ে ভোর এল। তার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই দরজা সপাটে বন্ধ হওয়ার ব্যাপারটা থেমেছিল। ভোর হওয়ামাত্র আমি ফ্রেশ হতে শুরু করেছিলাম। আমি জানতাম যে এমন ঘটনার মাঝে ভয় পেয়ে যাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় আমাদের অবচেতন মন এই ভয় পাইয়ে দিয়েই আমাদের অনেক কিছু সম্বন্ধে সতর্ক করে। কিন্তু তবু ভয় পেয়ে নিজের ঘরে খাটের ওপর বসে রাত জাগার পর আমি যে বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম, সেটা অস্বীকার করব না।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখি পিটার ট্রে-তে আমার জন্য কফি নিয়ে উঠে আসছে। বেচারির চেহারা দেখে বুঝতে পারছিলাম, সারারাত ও-ও ঘুমোয়নি। আমি হাসিমুখে কফির জন্য ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, “রাতভোর না ঘুমিয়ে দরজার শব্দ শোনার পর এটা না হলে বিপদ ছিল।” শুনে পিটার বলেই ফেলল, “ঈশ্বর আপনাকে সুবুদ্ধি দিয়েছেন স্যার। আমি তো ভেবেছিলাম, আপনি ঝোঁকের মাথায় না রাতে ওই ঘরে আবার ঢুকে পড়েন!

পিস্তল দিয়ে রক্তমাংসের দুশমনের মোকাবিলা করা যায় স্যার, কিন্তু ওই ঘরে যা আছে…!”

আমি আর কথা না বাড়িয়ে গ্রে রুমের দিকে এগোলাম, পিটারও পিছু নিল।

দরজার কাছে গিয়ে দেখলাম, চাবির ফুটোর ওপর লাগানো আমার কার্ডটা যেমন ছিল, তেমনই আছে। কিন্তু দরজার সিলটা ভেঙে গেছে। সেটাকে পুরোপুরি সরিয়ে আমি, খুউব সাবধানে, দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম।

ঘরে এক নজর বুলিয়ে মনে হল, সব ঠিকঠাক আছে। জানলাগুলো দিয়ে তখন আলো ঢুকছিল। আসবাব সব ঠিকঠাক জায়গাতেই ছিল। আমি একটা নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলতে যাব, তখনই পিটার চেঁচিয়ে বলল, “বিছানার চাদরগুলো দেখুন স্যার!”

তাই তো! বিছানার চাদরগুলো কেউ বিছানা থেকে তুলে ঘরের এককোণে ছুড়ে ফেলেছে।

তার মানে, কাল রাতে এই ঘরে কেউ, বা কিছু ছিল!

পিটার চাদরগুলো তুলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি ওকে আটকালাম। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আমি ঘরের আগাপাস্তালা পরীক্ষা করে বুঝলাম, আমার একটি সিলও কেউ ভাঙেনি। মানুষী বদমাইশির কোনো চিহ্ন না পেয়ে আমি পিটারকে বললাম ঘর গুছিয়ে ফেলতে। ও বিছানা আবার পরিপাটি করে সাজানোর পর আমরা বেরিয়ে এলাম।

ব্রেকফাস্ট, ও এক রাউন্ড হাঁটাহাঁটির পর মাথাটা একটু সাফ হল। ঠিক করলাম, আরো খুঁটিয়ে ঘরটা দেখতে হবে। পিটার, আর একটি কাজের মেয়ের সাহায্য নিয়ে আমি ঘর থেকে সব আসবাব, খাট, এমনকি দেওয়ালের ফটোগুলো অবধি বের করে দিলাম। তারপর আতস কাচ দিয়ে ঘরের ইঞ্চি-ইঞ্চি জায়গা দেখে নিশ্চিত হলাম, সত্যিই ওই ঘরে এমন কেউ বা কিছু আগের রাতে কোনোভাবে এসেছিল, যে পায়ের ছাপ বা আঁচড়, কিছুই ফেলে না!

সবকিছু আগের জায়গায় রেখে দিয়ে, আবার সর্বত্র সিল আর রিবন লাগিয়ে আমি ঘরটা তালাবন্ধ করলাম। ডিনারের পর, পিটারের সাহায্য নিয়ে আমি গ্রে রুমের ঠিক উলটোদিকের দরজায় আমার ক্যামেরা আর ফ্ল্যাশলাইটটা ফিট করলাম। লেন্সের ঢাকনা খুলে আমি সবকিছু একেবারে তৈরি করে রাখলাম, যাতে দরজা খোলা হলেই একটা সুতোয় টান পড়ে, ফ্ল্যাশ ঝলসে ওঠে, আর দরজার ওপাশে যে বা যাই থাকুক না কেন, তার ছবি উঠে যায়।

তারপর শুরু হল আমার অপেক্ষা।

 

মোমবাতি জ্বালিয়ে, ঘড়িতে রীতিমতো অ্যালার্ম দিয়ে, শুতে গেছিলাম। ফলে ঠিক রাত বারোটায় আমার ঘুম ভেঙে গেল। ড্রেসিং গাউনের পকেটে পিস্তল নিয়ে আমি দরজা খুললাম। হাওয়ায় নিভে গেলে বিপদে পড়ব ভেবে আমি একটা ঢাকা লণ্ঠনের ব্যবস্থা করেছিলাম। সেটারই মৃদু আলোয় বাইরেটা দেখে নিলাম।

করিডর শুনশান! বাড়ি নিস্তব্ধ।

আমি নিজের ঘরের দরজায় গুছিয়ে বসলাম। মুখ রইল গ্রে রুমের দিকে, যেখানে আমার ক্যামেরা অপেক্ষা করছিল কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য।

প্রায় ঘণ্টাদেড়েক পর মনে হল, আমার মাথার পেছনদিকটায় কেমন একটা… অনুভূতি হচ্ছে! মনে হচ্ছে, যেন কিছু একটা ফুঁটছে সেখানে। আমার হাত ঘামতে শুরু করল। মনে হল, কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

আর তখনই ফ্ল্যাশলাইটের চোখ-ধাঁধানো আলোয় করিডরটা সাদা হয়ে গেল!

তারপরেই এল অন্ধকার। ওই সাদা আলোর তীব্র ঝলকের পর আমার হাতে ধরা লণ্ঠনের আলোটা হাস্যকর লাগছিল। তবু তাতেই আমি বোঝার চেষ্টা করলাম, গ্রে রুম থেকে কেউ, বা কিছু, বেরিয়ে আসছে কি না।

দরজাটা সপাটে বন্ধ হল তখনই।

শব্দটা বাড়িটাকে তো বটেই, মনে হচ্ছিল যেন আমার হাড়ে, দাঁতে, মগজে, সবকিছুতে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে। একটু ধাতস্থ হওয়ার আগেই দরজাটা আবার আওয়াজ তুলল, দড়াম! দড়াম!! দড়াম!!!

তারপর সবকিছু চুপচাপ হয়ে গেল।

তারপর কতক্ষণ কাটল, খেয়াল নেই। কয়েক মিনিট, কয়েক ঘণ্টা, কয়েক যুগ… কিন্তু ওই নিস্তব্ধতা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না! মনে হচ্ছিল, অন্ধকারে, আমার দৃষ্টির আড়ালে, কিছু একটা যেন গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।

হঠাৎ আমার হাতে ধরা লণ্ঠনটা নিভে গেল!

সত্যি বলছি, ভয় নয়। আমার তখন অন্য একটা কথা মনে হল।

কী সাংঘাতিক বোকামি করছি আমি! আমার শত্রু কে তা না জেনে, তার শক্তি সম্বন্ধে কিচ্ছু না বুঝে, আমি অন্ধকারে তার সামনে নিজেকে বলির পাঁঠার মতো পেশ করেছি!

উঠে দাঁড়ানো, এক লাফে নিজের ঘরে ঢোকা, আর দরজাটা সপাটে বন্ধ করা, এই কাজগুলো আমি প্রায় যন্ত্রের মতো করে ফেলেছিলাম। ভাগ্যিস! নইলে দরজা দিয়ে কিছু একটা জিনিসের আমার দিকে এগিয়ে আসার অনুভূতি, তারপর দরজাটা বন্ধ করার মুহূর্তে আমার খুব কাছে একটা মৃদু গলা-খাঁকড়ানোর মতো শব্দ শোনার পর আমার অবস্থা, এসব মাথায় রাখতে গেলে আমি পুতুলের মতো অনড় হয়ে যেতাম, আর তারপর যে কী হত…!

নিজের বিছানায় বসে, দরজার দিকে পিস্তলটা তাক করে যখন বসেছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, আমার হাত-পা সব রবার দিয়ে বানানো। পিস্তলটাও মনে হচ্ছিল খেলনা। আমি বুঝতে পারছিলাম, হ্যাঁ, আমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছিলাম যে দরজার ওপাশে কিছু একটা আমার জন্য অপেক্ষা করছে… যার সামনে আমার গায়ের জোর, বা এই পিস্তলটাও তুচ্ছ।

শেষ অবধি ওইভাবে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। এক টুকরো চক দিয়ে ঘরের মেঝেতে একটা পেন্ট্যাকল, মানে পঞ্চভুজ আঁকলাম, তারপর সেই জায়গাটাতে ঢুকে বসে রইলাম যতক্ষণ না ভোর হয়। এই সময়টা গ্রে রূমের দরজা, কিছুক্ষণ পর-পর, সপাটে বন্ধ হচ্ছিল। সেই আওয়াজ আমার হাড়পাঁজরা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু আমি নড়িনি।

অবশেষে সেই অসহনীয় রাতটা শেষ হল। অন্ধকার পাতলা হওয়ার পর দরজাটা আর আওয়াজ তুলছিল না। পুরোপুরি আলো ফোটার আগে আমি একরকম মরিয়া হয়ে গ্রে রুমের উলটোদিকে রাখা আমার ক্যামেরার লেন্সের ক্যাপটা আটকানোর জন্য এগোলাম। সত্যি বলছি, ভয়ে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল! কিন্তু কিছু করার ছিল না। লেন্সের ক্যাপটা না আটকালে ভোরের আলোয় প্লেটটা নষ্ট হয়ে যেত। আমি কোনোক্রমে সেটুকু করে, ঘরে ফিরে, পেন্ট্যাকলটা মুছে খাটে বসে রইলাম।

আধ ঘণ্টা পর পিটার কফি নিয়ে আমার ঘরের দরজা খটখটাল।

 

আমরা দুজনেই ওই ঘরে গিয়ে দেখেছিলাম, এক কোণে কুঁচকে পড়ে থাকা বিছানার চাদর ছাড়া ঘরের বাকি সব কিছু, যেখানকার যা সব সেখানেই আছে। একটা সিলও ভাঙেনি। এত কষ্ট করে ফটো তোলার চেষ্টা করেও প্লেটটা ডেভেলপ করে দেখলাম, তাতে আধখোলা দরজাটা ছাড়া আর কিছুই আসেনি। একে তো রাতজাগার ফলে স্নায়ুর ওপর চাপ, তায় প্লেটে কিছু না পাওয়ার হতাশা, সর্বোপরি ঘরটায় ঢুকে সিলগুলো পরখ করার সময়েও একটা অদ্ভুত অস্বস্তি… সব মিলিয়ে আমার একদম ভালো লাগছিল না। কিন্তু এও বুঝতে পারছিলাম, পালিয়ে যাওয়া যাবে না। গভীর রাতে এই ঘরে যেই আসুক না কেন, তার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া না করে আমি শান্তি পাব না।

দুপুরের খাওয়া সেরে, নিজের সাজসরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে আমি আবার গেলাম গ্রে রুমে।

নতুন করে কয়েকটা জায়গায় সিল লাগালাম। তারপর একটা কাজ করলাম যেটা তখন খুব দরকারি বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন ভাবতেও খারাপ লাগছে।

একটা ছোট্ট ঝুড়িতে, নরম বিছানা বানিয়ে, একটা বেড়ালের বাচ্চাকে তার মধ্যে শুইয়ে দিলাম। সেটা গা-হাত চেটে চটপট ঘুমিয়েও পড়ল। ঝুড়িটা ঘরের এক কোণে আমার নজরের মধ্যেই রাখার সময় আমার মাথায় এটা ছিল যে পশুপাখি অনেক সময় সতর্ক করে দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেয়, কিন্তু…

যাইহোক। আগের রাতে লাগানো রিবন, আর ক্রিসক্রস করে থাকা সুতোগুলো সরিয়ে দিলাম সবচেয়ে আগে। তারপর ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে ঠিক একুশ ফিট ব্যাসের একটা বৃত্ত মেপে নিলাম। জায়গাটা হিসপ, মানে এক ধরনের সুগন্ধি লতা দিয়ে বানানো ব্রাশ দিয়ে সাফ করলাম। তারপর জায়গাটা চক দিয়ে আঁকা একটা বৃত্ত দিয়ে চিহ্নিত করে নিলাম। ঠিক করে নিলাম, গ্রে রুমের অনাহূত অতিথির সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য ওই বৃত্তাকার জায়গাটাই হবে আমার দুর্গ।

যেসব তন্ত্রমন্ত্রের সাহায্য নিয়ে আমি আমার ওই দুর্গকে সুরক্ষিত করলাম, তার বিস্তারিত বিবরণ তোমাদের কাছে ক্লান্তিকর ঠেকবে। শুধু এটুকু বলি যে পুরোনো বইয়ের পাতা ঘেঁটে জানা সবকিছু দিয়েও যে সবসময় ওই ধরনের… জিনিসের মোকাবিলা করা যায় না, সেটা জানা ছিল বলে আমি পেন্ট্যাকল, ওয়াটার সার্কল, এসব করেও শান্তি পাচ্ছিলাম না। ঠিক তখনই, ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো করে একটা কথা আমার মাথায় চিড়িক দিয়ে উঠল!

প্রফেসর গার্ডার তাঁর ‘এক্সপেরিমেন্টস উইথ আ মিডিয়াম’ বইয়ে বেশ স্পষ্ট করে বলেছিলেন, মিডিয়ামকে কোনোভাবে একটা ইলেকট্রিকাল ফিল্ডের মধ্যে রাখতে পারলে তার শক্তি একদম চলে যায়। মনে হয় যেন চেতনার অতীত যে জায়গাটার সঙ্গে তার সংযোগ ছিল, সেই জায়গাটা থেকে মিডিয়াম একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সেই সময়ে।

বিস্তর মাথা খাটিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বাঁচতে চাইলে আমাকে ইলেকট্রিসিটির সাহায্য নিতেই হবে। তবে শুধু আলো জ্বালানো নয়। মন বলছিল, যে জিনিসের সামনে পড়তে চলেছি তার হাত থেকে বাঁচতে গেলে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জেনে আসা তথাকথিত ‘ম্যাজিক ফিগারটা’ না জুড়লে বিপদ ঠেকানো যাবে না।

ঠিক করলাম, এমনভাবে ভালভ আর ব্যাটারি দিয়ে জিনিসটা সাজাব, যাতে তার প্রতিটি কোণ চক দিয়ে আঁকা পঞ্চভুজাকৃতি নক্ষত্র, মানে পেন্ট্যাকলের কোণের সঙ্গে মিশে যায়। তাই করলাম। সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করলাম, যাতে আমার ‘ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকল’-এর যেগুলো ভ্যালি, মানে ভেতরে ঢুকে আসা নীচু জায়গা, সেগুলো যেন ওয়াটার সার্কলের নানা জায়গায় রাখা আশীর্বাদী জলের শিশিগুলোর সঙ্গে পেন্ট্যাকল তথা বৃত্তাকার জায়গার কেন্দ্রের সঙ্গে এক রেখায় থাকে।

এসব করতে-করতে দিনের আলো ফুরিয়ে কখন যে রাত নেমেছে, টেরও পাইনি। তবে আঁধার ঘনাচ্ছে বুঝেই চটপট ওয়াটার সার্কলের নানা জায়গায়, বেশ হিসেব কষে রাখা মোমবাতিগুলো জ্বালালাম। তারপর ব্যাটারি জ্বালিয়ে আমার ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকলকে সচল করলাম।

বৃত্তের মধ্যে বসে দেখে নিলাম, আমার ক্যামেরা আর ফ্ল্যাশলাইট, দুটোই ঠিকঠাক আছে। পিস্তলটা সামনে রেখে, চারপাশের আলো দেখে এক মুহূর্তের জন্য বেশ নিশ্চিন্ত লাগল।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর, ঘড়ি দেখিনি বলে বলতে পারব না তখন কত রাত, আমার মনে হল, ঘরের মধ্যে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে! মনে হল, বন্ধ ঘরের মধ্যেও আমি যেন ঠান্ডা, অনেকটা থেঁতলানো রসুনের মতো গন্ধের একটা বাতাসের উপস্থিতি টের পাচ্ছি। মোমবাতির শিখাগুলো সেই অদ্ভুত হাওয়ায় দুলে উঠছে, ঘরের মধ্যে আলোর পরিমাণটাও একরকম না থেকে যেন বাড়ছে-কমছে!

বুঝতে পারলাম, ঘরের যে কোণে বিছানার চাদরগুলো কুঁচকে পড়ে থাকতে দেখেছি দু’বারই, সেখান থেকেই যেন হাওয়াটা আসছে। কিন্তু কীভাবে…

আর তারপরেই মোমবাতিগুলো নিভে যেতে শুরু করল।

মনে হল, যেন চোখের পলক ফেলার আগেই ওই বৃত্তের সীমা বরাবর জ্বালিয়ে রাখা সবক’টা মোম নিভে গেল। ঘরের আর বাইরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে বৃত্তের মধ্যে বন্দি আমার সঙ্গে রইল শুধু ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকলের হালকা নীলচে আভাটুকু।

ওই অল্প আলোয় ঘরের মধ্যে বেশিদূর নজর চলে না। তার মধ্যেও মনে হল, ওই অদ্ভুত বাতাসটার সঙ্গে মিশে যেন একতাল অন্ধকার চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে বৃত্তের চারপাশে। মাঝেমধ্যেই আমি অন্ধকারটাকে ঘরের সর্বত্র ঘন হয়ে ওঠা ছায়ায় হারিয়ে ফেলছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে একটা কিছু আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়তে পারে। ঘেমে ওঠা হাতেও আমি পিস্তলটাকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে একটু সাহস জোগাতে চেষ্টা করছিলাম।

হঠাৎ একটা মৃদু, কোনো সরীসৃপের বুকে হেটে এগোনোর মতো আওয়াজ পেলাম।

দারুণ ভয়ে আমার চুল খাড়া হয়ে উঠেছিল। তবু, মাথা ঠান্ডা রেখে বুঝতে পারলাম, বিছানার চাদরগুলোকে কেউ ধীরে-ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে। জঘন্য কোনো অপরাধ করার আগে যেভাবে অপরাধী তার শিকারের দিকে এগিয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই যেন কেউ চাদরগুলোকে টেনে নিচ্ছে নিজের দিকে।

সব থেমে গেল কিছুক্ষণের জন্য। আমার চোখে পলক পড়ছিল না। বিছানার চাদরগুলো অনড় হয়ে কিছুক্ষণ পড়ে রইল খাটের ওপর। তারপর আবার শুরু হল ধীরলয়ে, একটা তেলতেলে মেঝেতে সাপের এগিয়ে যাওয়ার মতো করে চাদরগুলো টেনে নেওয়া।

আমার স্নায়ুগুলো জবাব দেওয়ার মতো অবস্থায় এসে গেছিল। তার মধ্যেও আমার মনে পড়ল, আমার নাগালের মধ্যেই আছে একটা ফ্ল্যাশলাইট, আর একটা ক্যামেরা। বিছানা থেকে নজর না সরিয়েই ক্যামেরার দিকে হাত বাড়ালাম।

তখনই, একটা মারাত্মক রকমের রাগ আর হিংস্রতার সঙ্গে বিছানার চাদরগুলো ছুড়ে ফেলা হল ঘরের ওই বিশেষ কোণে!

ঠিক কীরকম ছিল আমার তখনকার মানসিক অবস্থা, সেটা বুঝিয়ে বলতে পারব না। চোখের সামনে ওই ঘটনাটা ঘটতে দেখে আমার মতো পোড়খাওয়া লোকও… তার চেয়েও বড়ো কথা কী জান? সেই রাতের আসল খেল তখনও শুরুই হয়নি!

আমি যখন ভাবার চেষ্টা করছি, এরপর আমার কী করা উচিত, তখনই মনে হল, আমি যেন দরজার কাছে কিছু একটা আওয়াজ শুনলাম। অনেকটা… অনেকটা কোনো পোকার চিটিরপিটিরের মতো। তারপরেই বুঝলাম, ব্যাপারটা কী।

ঘরের দরজায় লাগানো সিলটা কেউ ভেঙেছে!

ক্যামেরাটা আমি হাতে নিলাম, কিন্তু কিছু করার সুযোগ পেলাম না। ঠিক তখনই দরজাটা বন্ধ হল! সপাটে। মনে হল, যেন আমার কানের গোড়ায় বাজ পড়ল। ফাঁকা ঘরের মধ্যে সেই বিশাল আওয়াজের ধাক্কা সামলানোর আগেই অন্য একটা আওয়াজ আমার কানে এল।

আমি শুনতে পেলাম, বেড়ালের বাচ্চাটা যে ঝুড়িতে রাখা ছিল, সেটা থেকে হালকা ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ উঠছে। পরমুহূর্তেই বেড়ালটা একটা বীভৎস আর্তনাদ করে উঠেই থেমে গেল!

আমি ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালাম। দেখলাম, ঝুড়িটা উলটে গেছে। বেড়ালের বাচ্চাটার শরীর যেভাবে তার থেকে বেরিয়ে ঝুলেছিল, তা থেকে এটাও স্পষ্ট হচ্ছিল যে তার শরীরে আর প্রাণ নেই।

চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে গেলাম, ঘরের মধ্যে যে এসেছে সে অশুভ, এবং চরম ক্ষতিকর।

আলোটা গরম হয়ে উঠছিল। সেটা নেভাতে বাধ্য হলাম। তৎক্ষণাৎ মনে হল, পেন্ট্যাকলের ওই মৃদু নীলাভ আলো ছাড়া ঘরের সর্বত্র যেন একটা অন্ধকারের সমুদ্র তৈরি হয়েছে। দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, সেই সমুদ্রে ঢেই তোলার মতো করে কিছু একটা ঘুরছে বৃত্তের চারপাশে।

ধীরে, অতি ধীরে, আমার চোখ সেই অন্ধকারেও মানিয়ে নিল। তখন আমি ওটাকে দেখতে পেলাম!

ওয়াটার সার্কেল, মানে আশীর্বাদী জলভরা ছোটো শিশিগুলো বসিয়ে যে বৃত্তাকার জায়গাটা আমি চিহ্নিত করেছিলাম, তার কাছ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল ওটা। মনে হচ্ছিল, যেন অন্ধকারেরই কিছুটা অংশ জমাট বেঁধে একটা প্রকাণ্ড মাকড়সার আকার নিয়েছে! তবে খুব কাছে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলেই ছ্যাঁকা লাগার মতো করে ওটা ছিটকে পিছিয়ে যাচ্ছিল আবার।

ঘুরেই চলছিল ওটা। বারবার। কিন্তু একটা সময়ে, সেটা কতক্ষণ পর তা আমি সত্যিই বলতে পারব না, কারণ মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল ধরে ওটা আমার চারপাশে ঘুরছে, ওটা ঘুরপাক খাওয়া বন্ধ করল।

দেখে নয়, বরং অনুভব করছিলাম, জিনিসটা আরো জমাট বাঁধছে। একটা মরিয়া চেষ্টা করার আগে যেমন পাঁয়তারা কষা হয়, তেমন করে ওটা যেন নিজেকে তৈরি করছে।

তারপর ওটা আমার দিকে ধেয়ে এল!

আমি হাঁটু মুড়ে বসেছিলাম। কী ঘটছে সেটা ভেবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাইনি। কিন্তু তবু, আমার শরীর নিজে থেকেই ছিটকে গেল পেছন দিকে। ঘেমে যাওয়া ডান হাত দিয়ে আমি পিস্তলটা তুলে তাক করার চেষ্টা করলাম। তবে যখন দেখলাম… যখন দেখলাম যে আমার ওয়াটার সার্কেল আর অন্যসব বাধা পেরিয়ে জিনিসটা সোজা আমার দিকে আসছে, আমি বোধহয় ভয় পেয়ে চেঁচিয়েই উঠেছিলাম!

একেবারে শেষ মুহূর্তে, জিনিসটা যখন আমার থেকে বড়োজোর কয়েক ফুট দূরে, ওটাকে ছিটকে পিছিয়ে যেতে দেখলাম আমি! মনে হল, যেন কিছু একটা শক্তি, যার জোর ওই জমাট বাঁধা অন্ধকারের চেয়েও বেশি, জিনিসটাকে দূর করে দিল আমার সামনে থেকে।

ঠিক কতক্ষণ লেগেছিল স্বাভাবিক হতে, বলতে পারব না। একটু-একটু করে বুঝতে পারলাম, আমি নিরাপদ!

তলিয়ে দেখে বুঝলাম, আমার নড়াচড়ার ফলে কোনো এক সময় একটা জলভরা শিশি উলটে গেছিল। তার ফলেই জিনিসটা ওয়াটার সার্কেল ভেঙে এগোনোর সুযোগ পেয়েছিল। সামান্য ওই শিশিটুকুই উলটে গিয়ে, আমার ‘দুর্গে’ ঢোকার মতো একটা রাস্তা বানিয়ে দিয়েছিল জিনিসটার জন্য।

আরো বুঝলাম, জিনিসটা আসলে একটা বিশাল হাত!

অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকেও আমি হাতটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু টের পাচ্ছিলাম, ওটা আছে। ঘরের মধ্যেই আছে। আর সুযোগ খুঁজছে, যাতে আমার নাগাল পাওয়া যায়।

মাঝে হাতটা মরা বেড়ালের বাচ্চাটাকে তুলে নিল। আর তারপর সেটাকে মাটিতে আছড়ে চলল! বিশ্বাস করো, সেই ভোঁতা আওয়াজটা শুনতে-শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, যেন নরকবাস করছি!

কিছুক্ষণ পর সেটাও থেমে গেল। তারপর দরজাটা একটু খুলেই সপাটে বন্ধ হল। স্নায়ুর ওই টানটান অবস্থার মধ্যে দরজার আওয়াজটা একেবারে দাঁতে-দাঁত ঠেকিয়ে দিল আমার।

একটু পরেই হাতটা আবার আমার দিকে ধেয়ে এল!

না, আমাকে কোনোভাবে তৈরি হওয়ার সুযোগ দেয়নি হাতটা। অসাবধানে আমার একটা হাত রাখা ছিল ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকলের একটা বাহুর ওপর। ঠিক সেই বরাবর হাতটা আমার দিকে ছুটে এসেছিল।

অস্ফুট একটা আর্তনাদ করে আমি হাতটা সরিয়ে পেছনদিকে ঠিকরে গেলাম।

হাতটাও ঠিক পেন্ট্যাকলের ওপর এসে শক খাওয়ার মতো ছিটকে সরে গেল।

বুকের ভেতর এত জোরে আওয়াজ হচ্ছিল, যে মনে হচ্ছিল উত্তেজনা আর ভয়েই আমার কিছু একটা হয়ে যাবে। হাতটার আর আমার নাগাল পাওয়ার দরকার হবে না। তবু, সেই অবস্থাতেও, আমি একটু তলিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম, এই নিয়ে পরপর যে দুটো ‘দুর্ঘটনা’ হাতটাকে আমার কাছ অবধি পৌঁছতে দিল, সেগুলো কি সত্যিই ঘটনাচক্রে হয়েছিল?

নাকি, আমার অজান্তেই হাতটা আমাকে দিয়ে এমন কিছু করাচ্ছে, যাতে ও আমার নাগাল পায়?

কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থেকে আমি হঠাৎ নিজের পা-টা লম্বা করে দিলাম। ভাবটা করলাম, যেন আমার অজান্তেই পা-র ধাক্কা লেগে একটা জলভরা শিশি উলটে গেছে। শিশিটা কাত হয়ে একটু জল পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু সতর্ক ছিলাম বলে সেটাকে চটপট সোজা করে দিতে পেরেছিলাম আমি।

তবু, সেই সময়টুকুতেও হাতটা আমার দিকে এগিয়ে এসেছিল। আমার মুখ থেকে খুব সামান্যই দূরত্বে ছিল ওটা, তবে কোনো কারণে, কিছু একটাতে ধাক্কা খেয়ে, ওটা আবার ছিটকে গেছিল পেছনে। আমার নাগাল না পেলেও জিনিসটার সঙ্গে জড়িত একটা হিংস্র, অশুচি, অশুভ শক্তি আমার চেতনায় এমনভাবে ঘা দিয়েছিল যে মনে হয়েছিল… আমি আর কোনোদিন আমার ভেতরের শুদ্ধতাকে ঠিক আগের মতো চেহারায় ফিরে পাব না!

পেন্ট্যাকলের মাঝে গুঁড়ি মেরে আমি আবার অপেক্ষা করতে থাকলাম। এবার শুধু হাতটাকে নয়, আমি নিজেকেও সতর্ক নজরে রাখছিলাম। একটু আগের ঘটনা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আমার দুর্বল হয়ে আসা স্নায়ুর ওপর কোনোভাবে জোর খাটিয়ে ওয়াটার সার্কেলকে ভাঙা হচ্ছে। ফলে হাত-পা টানটান করতে গেলে, বা বসার ভঙ্গিটা বদলাতে গেলেও মনে হচ্ছিল, আমাকে দিয়ে কিছু করানো হচ্ছে না তো?

হাতটা আমার চারপাশে ঘুরছিল। ঘরের মধ্যে সেই হাওয়াটাও বইছিল, যেটা আমি পেয়েছিলাম আগের রাতে। ঠান্ডা, একটা অদ্ভুত গন্ধমাখা, গায়ের প্রতিটি লোম খাড়া করে দেওয়া সেই হাওয়া আমার শরীর-মনের ওপর যে কী ভয়াবহ অত্যাচার চালিয়েছিল তা … তা আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না।

অবশেষে ভোর হল। সবচেয়ে আগে বন্ধ হল ওই হাওয়া। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আমি বুঝতে পারলাম, হাতটা ঘরের কোথাও নেই। আলো বাড়ল, আকাশ থেকে চুঁইয়ে নেমে এসে সেই আলো ঘরকেও ভরিয়ে তুলল। ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকলের মৃদু নীল আলোটা প্রায় অদৃশ্য হয়ে এসেছিল। তবু, পুরোপুরি দিন না হওয়া অবধি আমি আমার দুর্গ ছেড়ে বেরোনোর কোনো চেষ্টা করিনি। বেশ কিছুক্ষণ পর, যখন শুধু আলো নয়, অন্যান্য আওয়াজ থেকেও বুঝতে পারছিলাম যে রাত, এবং তার আড়ালে ওত পেতে থাকা বিভীষিকাটি বিদায় নিয়েছে, তখনই আমি চক দিয়ে আঁকা ওই বৃত্তের বাইরে বেরোলাম। বেশি কিছু করার অবস্থায় ছিলাম না। কোনোক্রমে গ্রে রুম থেকে বেরিয়ে দরজাটা লক করলাম। নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুলাম। পিটার এল কিছুক্ষণের মধ্যেই। ওর আনা কফিটা নিঃশব্দে শেষ করলাম। পিটার নিজেও কোনো কথা বলল না, চুপচাপ কাপটা নিয়ে চলে গেল। আমি বিছানায় শুলাম। তারপর ঘুমোলাম না অজ্ঞান হলাম, অত জানি না।

 

দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হব-হব করছে, তখন আমার ঘুম ভাঙল। ফ্রেশ হয়ে, অত বেলায় লাঞ্চের বদলে যা পাওয়া যায় তাই খেয়ে, আবার গ্রে রুমে ঢুকলাম। আমার প্রথম কাজ ছিল মৃত বেড়ালটার একটা সদ্গতি করা, নইলে পিটার এবং ওই বাড়ির অন্যদের শুধুশুধু ভয় আর কষ্ট পেতে হবে। ওটাকে বাড়ির পেছনের জংলা জায়গায় পুঁততে গিয়ে ছায়ারা আরো লম্বা হয়ে গেল। তারপর ওই ঘরে ঢুকে আমি ঘরের ওই কোণটার ওপর মনোনিবেশ করলাম যেখানে বিছানার চাদরগুলো ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। সেই বিশেষ হাওয়াও যেহেতু ওই কোণ থেকেই এসেছিল, আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এখানেই কিছু একটা আছে।

সাদা চোখের খোঁজাখুঁজিতে কিছু পেলাম না। কিন্তু দেওয়ালের গায়ে লাগানো প্যানেল আর মেঝের জোড়ের জায়গায় কয়েকটা গর্ত করে সেখানে সরু শিক ঢুকিয়ে দেখতে গিয়েই একটা জিনিস পেলাম! বেশ কসরত করে ওটাকে দেওয়ালের নীচের সেই গর্ত থেকে বের করে জানলার কাছে নিয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম, জিনিসটা একটা আংটি!

একটা অদ্ভুত ধূসর ধাতু দিয়ে পঞ্চভুজাকৃতি তারার আকারে বানানো হয়েছে আংটিটাকে। তবে তাতে কোণগুলো উঠে নেই, বরং একেবারে মসৃণ হয়ে রয়েছে। যাঁরা এই জগতটা নিয়ে চর্চা করেন তাঁরা জানেন, পঞ্চভুজাকৃতি নক্ষত্রের পাঁচটা শীর্ষদেশ যদি ঠিকঠাক আগলানো হয়, তাহলে সেটা একটা রক্ষাকবচ। কিন্তু এই আংটিটা তা নয়। যদি এতে ওই পাঁচটা কোণ উঁচু হয়ে থাকত, তাহলে এটা উপত্যকাকে পাঁচটা পাহাড় দিয়ে ঘিরে রাখার মতো করে ধারককে সুরক্ষিত করত। তার বদলে এটা কিছু একটার জন্য রাস্তা হিসেবে কাজ করছে!

তার মানে, একদা হেন্ডারসন পরিবারের সম্পত্তি, এবং দীর্ঘ অদর্শনে প্রায় কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া তথাকথিত ‘লাক রিং’ বা সৌভাগ্যের আংটি আমি খুঁজে পেয়েছি!

হেন্ডারসন পরিবারের কোনো এক পূর্বপুরুষ ক্রুসেডে গিয়ে এই আংটিটা নিয়ে এসেছিলেন। যে অবস্থায়, যেখান থেকে আংটিটা পাওয়া গেছিল তাই নিয়ে বিস্তর গল্প আছে। আমি এই পরিবার, তথা গ্রে রুম নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়েই সেগুলো শুনেছিলাম। এই আংটিটা এক কালে বংশানুক্রমে বাবা থেকে ছেলের কাছে যেত, তাতে নাকি পরিবারের সৌভাগ্য অটুট থাকত। কিন্তু আংটিটা যেন কখনও পরা না হয়, এ ব্যাপারে একেবারে কড়া আদেশ ছিল।

শুধু, স্যার হালবার্ট, হেন্ডারসনের এক পূর্বপুরুষ, এই আদেশ মানেননি। নেশার ঘোরে বাজি ধরে ভদ্রলোক একরাতে আংটি পড়ে শুতে যান। এই গ্রে রুমটিই ছিল তাঁর শোয়ার ঘর। পরদিন সকালে হালবার্টের স্ত্রী এবং শিশুপুত্রের মৃতদেহ পাওয়া যায় এই ঘরের খাটে। বীভৎসভাবে গলা টিপে মারা হয়েছিল দু’জনকেই! সবার সন্দেহ এসে পড়ে হালবার্টের ওপর। লোকে ভাবে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাগে বা বিরক্তিতে তিনিই দুজনকে মেরেছেন। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য হালবার্ট এই ঘরেই পরের রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরও একই দশা হয়। তারপর থেকেই গ্রে রুমে রাত কাটানো বন্ধ হয়ে যায়। পাকেচক্রে আংটিটাও হারিয়ে যায়।

 

কমে আসা আলোয়, জানলার ধারে আংটিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করল।

আমি জানতাম, গ্রে রুমে যদি আমি রাত কাটাই, তাহলে সেই রাতে একটা চরম চেষ্টা হবেই আমার নাগাল পাওয়ার জন্য। আমি এও জানতাম, যদি কোনোভাবে অশুভ শক্তি, মানে যেটা দানবিক হাতের আকারে ওই ঘরে জেগে উঠছে অন্ধকার নামলে, এই আংটিটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে সে আমার নাগাল পাবে না।

আমি তৈরি হলাম সেই রাতের জন্য।

তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেও আমার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করতে, বিশেষ করে ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকলটিকে ঠিকঠাক সাজাতে প্রায় ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। যখন আমি আংটিটা নিয়ে পেন্ট্যাকলের মধ্যে ঢুকে বসলাম, তখন রাত নেমেছে। আমার প্রবল অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু প্রাণের মায়া ছিল বলেই পিস্তল হাতে নিয়ে, মোমবাতির হলুদ আর পেন্ট্যাকলের হালকা নীল আলোয় আলোকিত পরিবেশে বসে আমি ঘরের ওই কোণটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, যেখান থেকে বাতাস বয়েছিল আগের রাতে।

প্রায় ঘণ্টাদুয়েক কাটল। মাঝে কয়েকবার আমার মনে হয়েছিল, বিপদ আমার খুব কাছে এসেছে। কিন্তু সতর্ক থেকেও আমি কিছু দেখতে বা শুনতে পাইনি।

রাত তখন বারোটা। আমার হঠাৎ মনে হল, সেই হাওয়াটা অনুভব করছি।

আর… সেটা আসছে আমার পেছন থেকে!

দারুণ আতঙ্কে আমার চুল খাড়া হয়ে উঠল। শক খাওয়ার মতো করে পেছনে ফিরে আমি বুঝতে পারলাম, হাওয়াটা আসছে ওই আংটি থেকে।

ওই দানব যে রাস্তা দিয়ে এই ঘরে, এই দুনিয়ায় ঢোকে, আমি সেটাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে এসেছি!

নিজের ভুল নিয়ে আক্ষেপ করার সময়টুকুও আমার কাছে ছিল না। চেষ্টা করছিলাম আংটিটা তুলে নিয়ে সেটাকে আমার ‘দুর্গের’ বাইরে ছুড়ে ফেলতে। কিন্তু একটা জীবন্ত জিনিসের মতো সেটা পিছলে বেরিয়ে গেল আঙুলের ফাঁক দিয়ে! আরেকবার সেটা তুলতে গিয়েই মনে হল, কিছু একটা জিনিসে ধাক্কা খাচ্ছি।

দেখতে পেলাম, হালকা কুয়াশা, বা কালো ধোঁয়ার মতো করে কিছু একটা বেরিয়ে আসছে আংটিটা থেকে, ওই হাওয়ায় ভর দিয়ে। বুঝলাম, সেই দানবিক হাতটা, আমার পাশেই, ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকল তথা ওয়াটার সার্কলের মধ্যে, জমাট বাঁধছে!

না। আমি আর কিছু ভাবিনি। অতটা ভয় পেলে হয়তো অন্য কেউ জড়বৎ হয়ে যেত। কিন্তু আমি এক লাফে পেন্ট্যাকলের ভালভ, জলের শিশি, চক দিয়ে আঁকা বৃত্ত, সব পেরিয়ে বাইরে এসে পড়লাম।

হাতটা কোনো প্রকাণ্ড শিকারি প্রাণীর মতো থাবা মারল আমার দিকে। কিন্তু আগের রাতে ঠিক যা হয়েছিল, এবারও তাই হল। একটা অদৃশ্য প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে হাতটা আবার পিছিয়ে গেল পেন্ট্যাকলের মধ্যে।

আমি গ্রে রুমের দরজাটা খোলার চেষ্টা করলাম! সাপের চোখে চোখ রেখে স্থির হয়ে যাওয়া প্রাণীর মতো ওই হাতটা থেকেও আমি নজর সরাতে পারছিলাম না। তবু, কোনোভাবে, আমি দরজাটা খুলে করিডরে বেরিয়ে আসতে পারলাম। দরজাটা সজোরে বন্ধ করা, পকেট হাতড়ে চাবিটা বের করা, সেটা দিয়ে দরজাটা তালাবন্ধ করা, প্রায় দৌড়ে নিজের ঘরে ঢোকা, আর ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজের বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে পড়া: এই কাজগুলো আমি ভেবে করিনি, কারণ ভাবতে গেলে হয়তো পারতাম না। হয়তো অজ্ঞানই হয়ে যেতাম!

তবে একটা দৃশ্য আমার মনে ছিল, আছে, থাকবে।

একটা বিশাল, কালো হাত বারবার চেষ্টা করছে পেন্ট্যাকলের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে, কিন্তু পারছে না!

 

আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বা, একথাই বলা ভালো যে অবসাদ, ক্লান্তি, ভয়, সাংঘাতিক বিপদের হাত থেকে শেষ মুহূর্তে রক্ষা পাওয়ার অনুভূতি, সব মিলিয়ে আমার শরীর আর মনের ওপর অচেতনতার একটা পুরু চাদর টেনে দিয়েছিল। পিটার কফি নিয়ে এসে আমাকে না তুললে আমি কতক্ষণে উঠতাম, কে জানে!

কফি খেয়ে, ফ্রেশ হয়ে, আমি পিটারকে নিয়ে গ্রে রুমে গেলাম।

ঘরের মোমবাতিগুলো তখনও জ্বলছিল। পেন্ট্যাকলের নীল আলোগুলো নিষ্প্রভ হয়েও টিঁকে ছিল। আমার গড়া সেই দুর্গের মধ্যে নিতান্ত সামান্য চেহারায় পড়ে ছিল আংটিটা।

ঘরের অন্য কিচ্ছুটি ছোঁয়া হয়নি।

দানবটা ইলেকট্রিক পেন্ট্যাকলের ওই গণ্ডি পেরোতে পারেনি!

আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। দরজাটা তালাবন্ধ করলাম। আরো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, ফ্রেশ হয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে, আমি বেরোলাম কিছু জরুরি জিনিস নিয়ে আসতে। দুপুরের মধ্যেই আমি সেসব নিয়ে ফিরে এলাম ওই বাড়িতে। জিনিসগুলো ছিল একটা অক্সি-হাইড্রোজেন জেট, আর দুটো সিলিন্ডার। আমি সেসব নিয়ে গ্রে রুমে ঢুকলাম, পাঁচ মিনিটে আংটিটা একটা গরম ধাতুর পিণ্ডে পরিণত হল।”

 

কারনাকি কথা থামিয়ে, কোটের পকেট থেকে একটা কাগজে মোড়া কিছু একটা জিনিস বের করে আমায় দিল। আমি সযত্নে কাগজের মোড়কটা খুলে দেখলাম, তার মধ্যে রয়েছে ধাতুর একটা ছোট্ট বলের মতো জিনিস। অনেকটা সীসার মতো রঙ সেটার, কিন্তু অনেক বেশি উজ্জ্বল।

“হুম!” জিনিসটা আমরা সবাই নেড়েচেড়ে দেখার পর আমি জানতে চাইলাম, “তা এরপর কি ঘরটাতে আর কিছু… মানে আর কোনো সমস্যা হয়নি?”

“নাঃ!” পাইপে তামাক ঠেসতে-ঠেসতে বলল কারনাকি, “আমি সেই রাতে, এবং তারপর আরো দু’রাত ওই ঘরেই ঘুমিয়েছিলাম। প্রথমে তো পিটারের হার্ট অ্যাটাকই হয়ে যাচ্ছিল আমার পরিকল্পনা শুনে, কিন্তু তৃতীয় রাতের মধ্যে ও অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। আমার তো মনে হচ্ছিল, ঘরটা একেবারে সাধারণ, আর পাঁচটা ঘরের মতোই হয়ে গেছে বলে বেচারি একটু মুষড়েই পড়েছে!

আসলে রাস্তা! একটা রাস্তা খোঁজে শুধু ওরা। সেটা পেলেই দানব হোক বা মানব, অন্ধকার ঢুকে পড়তে পারে আমাদের ঘরে, আমাদের দুর্গে!”