ধূপছায়া মজুমদার
Showing posts with label ধূপছায়া মজুমদার. Show all posts

স্বস্তি পেলেন বিজয়কেতন ● ধূপছায়া মজুমদার


 

(১)

ছোটগোবিন্দপুরের প্রাক্তন জমিদারবাড়ি ‘নন্দন কানন’-এর বর্তমান গৃহকর্তা হলেন বিজয়কেতন রায়। নাম শুনে মনে হতেই পারে ভদ্রলোকের প্রতাপে চোরে পুলিশে চায়ের দোকানে একমাথা হয়ে আড্ডা মারে। কিন্তু না, সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। সে ছিল বিজয়কেতনের বাবা অরূপরতন রায়ের আমলে, স্বর্ণযুগে। এ গাঁয়ে তখন চোর ছিল বাড়ন্ত, পাশের গাঁয়ের কোনো চোর যদি রাতের আঁধারে জায়গা ঠাহর করতে না পেরে গাঁয়ের কারও উঠোন থেকে বালতি তুলে ফেলতো, তবে পরেরদিন সক্কাল সক্কাল অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে থানায় গিয়ে বালতি সমর্পণ করে আসতো। একসময় ভাবা হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে অরূপরতনকে কোনো অনারারি পোস্ট দেওয়া হবে, নানান ডিপার্টমেন্টাল গেরোয় সে আর হয়নি। তা সেসবই এখন ইতিহাস।

বাস্তবসম্মত - ধূপছায়া মজুমদার

হাসির গল্প

।।১।। (ধরে নাও এসব 'গৌরচন্দ্রিকা')

 

সরসতা নাকি ছড়িয়ে রয়েছে দশ দিকে, কেবল কুড়োতে জানলেই হলো। তা, সে জিনিস কুড়োনোর কি স্পেশাল কোনও যন্তর পাওয়া যায় বাজারে? নইলে সংসারের গোড়ায় সারবস্তু জুগিয়ে সংসারের চাকা সচল রাখতে রোজ ভোররাত থেকে মাঝরাত পর্যন্ত যে উস্তুমকুস্তুম লড়াইটা লড়ে যেতে হয় সত্যসাধন দত্তকে, তার মাঝে সরসতা দেখাই বা দেবে কখন, আর ধরাই বা দেবে কখন?

নামকরণের সার্থকতা - ধূপছায়া মজুমদার

হাসির গল্প

অলংকরণ - কৃষ্ণেন্দু মন্ডল
(১)

শেষ কবে সূর্য ওঠা দেখেছি, অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। সূর্যদেব ভদ্রলোক একটু একগুঁয়ে আছেন, রোজ অমন কাক ডাকা ভোরে উঁকিঝুঁকি মারার কী দরকার অ্যাদ্দিনেও বুঝে উঠতে পারলাম না।

এদিকে আবার আমাদের ফ্যামিলির প্রতিটি লোক, মায় কার্নিসে বসা কাক ভানু আর হাওয়াই চটি চিবিয়ে পাড়ার লোকের হাড়ে দুব্বো গজিয়ে দেওয়া নেড়ি দিনেশ অব্দি বেজায় সূর্যভক্ত।

মামুলি একটা গল্প - ধূপছায়া মজুমদার

অলংকরণ : সুমিত রায়
গল্পের আগে

মনে করুন এক মাঝারি শহরের এক মেঘলা সকাল। আকাশের মুখে সেই ভৌতবিজ্ঞান বইয়ের ফুঁ দিয়ে ঘোলা করা চুনজলের মতো একটা রং লেপে দিয়েছে কে যেন। আকাশের রং এরকম থাকলে সবচেয়ে ভালো হয় আধখানা চোখ খুলে অ্যালার্ম বন্ধ করে ফের চোখ বুজে ফেললে। চাই কি অ্যালার্মের ফাণ্ডার আবিষ্কারকের ফ্যামিলির শ্রাদ্ধও সেরে নিতে পারেন মনে মনে। কিন্তু, পেট বড় বালাই, আর কোনও আপিসেই মেঘলা দিনে কামাই করলে মুখ দেখে মাইনে দেবে না। কাজেই ঢিলে মনে গিঁট দিয়ে, যাবতীয় বৈপ্লবিক চিন্তার বাণ্ডিলকে চিলেকোঠায় তুলে রেখে রওনা দিতেই হয় আপিসের জাঁতাকলের পানে। ঠিক আমাদের এই গল্পের প্রদীপ সরখেলের মতো। ছেলেটার বয়েস বেশি নয়, মাথার সামনের দিকটা ফাঁকামতো হলেও দেখতে শুনতে মন্দ নয়, কিন্তু রোজকার এই ঘড়ি মেপে পা ফেলার চাপে কেমন যেন দরকচা মেরে গেছে, দেখলে মনে হয় সংসারের জোয়ালখানা বুঝি ওরই কাঁধে।

সে যাইহোক, আপাতত প্রদীপ মেস থেকে বেরিয়ে বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবার চলুন, আমরাও ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াই, গল্পের খোঁজ করি।

প্রদীপের কথা

আজ কি কোনও ছুটির দিন? পনেরো মিনিট হয়ে গেল হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছি, একটা অটোরও দেখা নেই। গেল কোথায় মালগুলো? ওদিকে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ন’টার এক চুল ওপাশে গেলেই দেড়েল চৌধুরী চশমাটাকে নাকের ওপরে ঠেলে তুলে ঘড়ির দিকে তাকাবে। ঠোঁটে আবার বুলিও ফোটাবে শালা, “ওয়েল ডান ইয়ংম্যান, জাস্ট ফাইভ মিনিটস লেট!” টাইমের জ্ঞান যেন বুড়োর একারই আছে! আর এমন অমায়িক গলা, কেবিনের বাইরের সিটে তিস্তার কানে যাবেই কথাগুলো। ওজ্জন্যই মেয়েটা আমায় দেখলেই মুখ টিপে হেসে ফেলে। নিশ্চয়ই ভাবে কনস্টিপেশনের প্রব্লেম! নইলে আর রোজ রোজ লেট হয়!

কনস্টিপেশনের প্রব্লেম আমাদের বংশে আছে বটে, বাপ ঠাকুর্দা লাইফের মেজর টাইম কলঘরেই কাটিয়ে ফেলেছেন, তবে রোগটা আমায় পেড়ে ফেলতে পারেনি, টাকপ্রবণতার পাশাপাশি পেট খোলসা করার স্বভাবটাও বোধহয় মামারবাড়ির জিন থেকেই পেয়েছি। তবে ইদানীং বাবার কনস্টিপেশন রোজ রাতে হেব্বি জ্বালাচ্ছে আমায়। খেটেখুটে ফিরে মাসির রেঁধে দেওয়া রুটি আর ঘ্যাঁট বেড়ে বসব কি মায়ের ফোন চলে আসবে। তাতে ফিফটি পার্সেন্ট থাকে বাবার কনস্টিপেশন আর তার চাট্টি তুতো রোগের গল্প, আর বাকিটায় থাকে গেঁটে বাত, বাথরুমের শ্যাওলা, কাজের লোকের কামাই আর সিরিয়াল। ওরই মধ্যে মাসে একটা করে মেয়ে দেখে আসবে বাবা মা আর তার বায়োডাটা উগরোবে কানের কাছে, যেন আমার বিয়ে দিলেই সংসারে মা অন্নপূর্ণা এসে সেঁধোবে। আরে বাবা, বিয়ে করলে কি আমি বউকে বাপমায়ের পা টেপাতে বাড়িতে রেখে আসব? এই সোজা সত্যিটা এরা বোঝে না। আমি যেমন বুঝি না বরের পকেটে মাস গেলে বারোহাজার ঢুকলে খুশি হওয়ার মতো মেয়ে আজকাল পাওয়া যায় কিনা। সব তো দেখি টপ টু বটম পালিশ মেরে বরের বাইকে চেপে উড়ে বেড়ায়। আমার কপালেও এমন জুটলে সন্ন্যাসী হয়ে যাবো।

ওই আসছেন এক মহারাজ! শালা অটো তো নয়, অর্জুনের রথ, চালাচ্ছেন কলির কেষ্ট!

“সেণ্ট্রাল পার্ক?”

“খুচরো দেবেন।”

“তোমরা মাইরি পারোও ভাই!”

যাক, ফোর্থ হয়ে বসতে হলো না। পাঁচ দশের হাইট নিয়ে বেঁকেচুরে বসতে হেবি হ্যাঙ্গাম হয়, দামড়া পা-গুলোকে খুলে ঘাড়ে নিতে মন চায়।

“দিদি, প্যাকেটটা একটু...”

“কোথায় রাখব বলুন? দেখছেন তো এদিকে অবস্থা!”

“দিন, আমি ধরছি। আপনি একটু চাপুন ওপাশে।”

“নো নো ইটস ওকে। আই’ল ম্যানেজ।”

হ্যাত্তেরি, প্যাকেটগুলো ধরতেও দেবে না, নিজেও সরবে না। আজব পাবলিক! ন্যাও, এ আবার লোক তুলছে!

“জলদি চ ভাই, লেট হচ্ছে।”

“এই যে দাদা, একটা প্যাসেঞ্জার তুলেই...”

লেহ্, বাচ্চাকাচ্চা আছে দেখছি! শিওর, উঠেই বলবে বাচ্চা ধরতে। অন্যের বাচ্চাকে কোলেটোলে বসাতে আজকাল বড্ড অস্বস্তি হয়। যা দিনকাল, কে কী বুঝবে ভগাদা জানে, লোকের ভালো করতে গিয়ে পাবলিকের ক্যালানি খেয়ে মরবো শেষটায়!

সুনেত্রার কথা

“বাবলি, হাত ছাড়াচ্ছো কেন? ব্যাগ ছাতা বটল নিয়ে পাগল পাগল লাগছে, তুমি আর অসভ্যতা কোরো না।”

“মা, ওই বেলুন, রেড বেলুনটা দাও না মা!”

“একদম না। এতেই এই, এর ওপর বেলুন জুটলে আমি রাস্তায় পড়ে যাবো, তুই একা একা বাড়ি যাবি। যাবি?”

“না। দাও না বেলুন, অনলি ওয়ান!”

“দাঁড়াও, চুপ করে দাঁড়াও এখানে, প্যাকেটটা ব্যাগে ঢোকাই।”

এই বর্ষার তিনটে মাস অসহ্য লাগে। যেখানে যাও ছাতা আর রেনকোট বগলে চেপে নিয়ে চলো। রোজকার এই হ্যাপা আর পোষায় না বাবা! ধুত, নেক্সট মাস থেকে ভ্যানে দিয়ে দেবো বাবলিকে।

“বাবলি!” একে নিয়ে আর পারি না। কোনদিন রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে থাকব এর জ্বালায়।

“এখানে এলে কেন দৌড়ে? বললাম না চুপ করে আমার কাছে দাঁড়াতে? বাবাকে সব বলছি গিয়ে, দাঁড়াও।”

“বেলুন, ওই রেডটা।”

অদম্য জেদ আমার মেয়ের। এই জেদ আর ডেডিকেশন পড়াশোনায় থাকলে কাজে দেবে।

“কত করে বেলুন?”

“দশ। এই নাও বেটা।” এরাও সব রেডি থাকে গছাবে বলে। স্কুলের কাছে রোজ এসে দাঁড়াবেই বেলুনওয়ালা, আইসক্রিম, মেয়েকে আর রোজ রোজ কত বারণ করা যায়! দশটা টাকা খসলোই সেই! বিকেলের মধ্যেই হয়তো ফেটে যাবে বেলুনটা। টাকার শ্রাদ্ধ খালি খালি!

“এই বাবলি চ’ চ’ অটো আসছে!”

উফফ, সেই সাইডে বসতে হবে! বাচ্চা ব্যাগ বেলুন সামলে ধারে বসা যে কি হ্যাপা!

“সেণ্ট্রাল পার্ক?”

“উঠুন।”

“বাচ্চাটাকে একটু ধরবে ভাই?”

“আমায় ওই জিনিসগুলো দিন।”

“আরে ওকে না ধরলে আমি উঠতে পারব না যে!”

কী রে বাবা! সোজা বাংলা বোঝে না কেন এরা? দু’মিনিট মেয়েটাকে ধরবে, তাতে এত কথা কীসের? এত কিছু দু’হাতে সামলে ওঠা যায়?

“বসেছেন?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন এবার।”

“দিদি, আমায় ব্যাগট্যাগ দিয়ে আপনি মেয়েকে নিয়ে বসুন।”

“আমি একদম ধারে বসে আছি ভাই, বাচ্চাটাকে নিয়ে বসতে ভয় করে এখানে। বড় ছটফটে। খুব অসুবিধা হচ্ছে কি?”

“না, মানে, আচ্ছা, ঠিক আছে।”

ছেলেটাকে দেখে তো খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না। এত আমতা আমতা করছে কেন? অবশ্য টুবলুও সেদিন বলছিলো, বাসে-ট্রেনে কোনও বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার আগে দু’বার ভাবতে হয় এখন। কে কী ভাববে, কেউ যদি কিছু বলে! সত্যি, কী দিনকাল পড়লো! নোংরামো করে বেড়াবে কয়েকটা শয়তান, আর তার খেসারত দিতে হবে নিরীহ ছেলেগুলোকে। ভাবলেই মাথা গরম হয়ে যায়।

“এই এই আস্তে! বাবলি! মাথা ঠুকলো?”

“না না, আঙ্কেল ধরে নিয়েছে তো!”

“ভাই তুমি ওকে ভালো করে কোলে নিয়ে বসো তো। আমার ভয় করছে। আরেকবার ব্রেক দিলে মাথা ঠুকে যাবে রডে।”

প্রদীপের কথা

ভালো আপদ জুটেছে সকাল সকাল! একে তো ইস্তিরি করা জামাটা চৌপট হয়ে গেল, তারপর বলে আবার ভালো করে কোলে নিয়ে বসতে! এর চেয়ে নিজে নেমে এদের ভেতরে ঢুকতে দিলেই হতো। কোলেফোলে নেওয়ার হ্যাঙ্গামা হতো না। মাইরি অটোটা চালাচ্ছেও যেন মাল খেয়ে! আরেকটু হলেই বাচ্চাটার মাথা ঠুকতো রডে। রিফ্লেক্সে হাত দিয়ে গার্ড করে আটকালাম বলে বাঁচোয়া। মাঠের সব অ্যাকশন ভুলে যাইনি তাহলে এখনও!

“হাসছ কেন আঙ্কেল?”

এইরে! সেই আমার পুরনো রোগ, হাসির কথা ভাবলেই হেসে ফেলা!

“ওই একটা ম্যাচের কথা মনে পড়ে গেল।”

“তুমি খেলো? সেণ্ট্রালের গ্রাউণ্ডে? রোজ বিকেলে?”

“না না, খেলতাম, কলেজে। তোমার নাম কী?”

“শাওনী ঘোষাল। তোমার নাম কী?”

“প্রদীপ।”

“এই যে, হ্যালো, একটু সরতে হবে ওদিকে।”

এপাশের এঁর আবার কী হলো? দিব্যি তো ছিলেন আমার গায়ে যাবতীয় প্যাকেটের ভার চাপিয়ে। শালা কোমরে প্লাস্টিকের প্যাকেটের খোঁচা লেগে ছড়েটড়ে গেছে বোধহয় এতক্ষণে।

“বাচ্চাটাকে নিয়ে... দেখছেন তো!”

“বাচ্চাকে তার মায়ের কাছে দিন। দরদ উথলে উঠছে! আর মায়েরও সেন্স নেই কোনও। দেখে তো মনে হয় শিক্ষিত, চেনা নেই জানা নেই উটকো লোককে বাচ্চা ধরতে দিয়েছে। কিছু হলে তখন কপাল চাপড়াবে। ডিসগাসটিং!”

ভদ্রমহিলা বিড়বিড় করছেন নিজের মনে। মাকেও দেখেছি খুব বেশি রেগে গেলে বিড়বিড় করে। কথাগুলো কানে যেতে কান গরম হয়ে উঠলো। সেই এক কথা, এক ধারণা। এজ্জন্যই শালা লোকের বাচ্চাকে কোলে নিতে নেই, জড়াতে নেই বেশি।

“আরে ভাই গত্তগুলো দেখে চালা! বাচ্চা আছে, ঠুকে যাবে।”

“কোথা দিয়ে চালাবো বলো দাদা? পুরো রাস্তাটার হালত এক! লাইসেন্সের টেস্ট নেয় বোধহয় মালেরা এখানে!”

মেয়েটাকে আরেকটু শক্ত করে ধরে বসি। সত্যি, এই রাস্তাটা আর সারাবে না বোধহয়। এত বছর ধরে একইরকম লঝ্ঝড়ে রয়ে গেল।

কীরকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে যেন! কেউ কি তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে?

শাওনীর মা। এখন আর ঠিক আমার দিকে তাকিয়ে নেই, হয়তো একটু আগে ছিলেন, অস্বস্তি হয়েছিল সেকারণেই। এখন ভদ্রমহিলার চোখ আটকে আছে আমার হাতের দিকে। খুব মন দিয়ে দেখছেন উনি আমার হাতদুটোকে, বলা ভালো হাতের ওঠানামা, নড়াচড়া, হাতদুটো সামনে এলো নাকি শাওনীর ছোট্ট শরীরের আড়ালে চলে গেল, সবকিছু পড়ে চলেছেন মন দিয়ে। চোখ মুখ কান জ্বালা করে উঠলো হঠাৎ, অ্যাসিড ঢেলে দিলো কি কেউ?

সুনেত্রার কথা

চমকে উঠলাম ওপাশের মহিলার কথা কানে যেতেই, ঘাড়ের কাছে কেউ যেন পিন ফুটিয়ে দিলো, যন্ত্রণাটা নেমে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। পাশে বসা ছেলেটার মুখের দিকে চোখ চলে গেল। আমাদের টুবলু এর চেয়ে একটু ছোট বোধহয়। এই তো, কত যত্নে বাবলিকে ধরে রেখেছে, অটোওয়ালার সাথে মুখ লাগাচ্ছে ঝাঁকুনি হচ্ছে বলে। না না, ওই মহিলা বড্ড বাজে বকছেন, ওসব কিচ্ছু নয়। তেমন লোকদের দেখলে বোঝা যায়, সিক্সথ সেন্স কাজ করে। বড্ড বেশি ভাবছি আমি।

মায়েদের সত্যি বড় জ্বালা! একবার কাঁটা ঢুকলে উপড়ে ফেলা খুব মুশকিল। বারবার চোখ যাচ্ছে ছেলেটার দিকে। বাবলিকে আমার কাছে নিয়ে নেবো কি? কিন্তু বসাবো কোথায়? এত জিনিস, ওকে ভালো করে ধরতেও পারবো না, রাস্তার যা কণ্ডিশন, একবার ঝাঁকুনি হলে দুজনেই পড়ে যাবো বোধহয়।

অত ভেবে লাভ নেই। ছেলেটার হাতদুটো কোথায়? ওই তো, বাবলিকে বেড় দিয়ে ধরে রেখেছে দু’হাত দিয়ে। হ্যাঁ, দুটো হাতই চোখের সামনে আছে, নিশ্চিন্দি, একটু খেয়াল রাখলেই হবে শুধু, অন্যমনস্ক হলে চলবে না।

“আঙ্কেল, তোমার হাতের এই রেড সুতোটা বিপদ... বিপদ তাড়ানোর সুতো, না?”

“মা বিপত্তারিণীর আশীর্বাদী সুতো। তুমি কী করে জানলে?”

“বাবা, কাকাই পরলো তো ক’দিন আগেই, ঠাম্মি পরালো। আমারও ছিলো, সেদিন ঝোল মাখিয়ে ফেললাম বলে মা খুলে রেখেছে। তোমায় কে পরালো আঙ্কেল সুতোটা?”

“আমায়? আমার মা পরিয়েছে।”

গল্পের পরে

সেণ্ট্রাল পার্ক এসে গিয়েছিল খানিকক্ষণ বাদেই। সুনেত্রা ব্যাগ বোতল বেলুন পার্স সামলে অটো থেকে নেমেছিল সাবধানে, প্রদীপের হাতের দিকে চোখ রেখে। এরপর নেমে এসেছিল শাওনী, নেমেই স্মার্টলি বাড়িয়ে দিয়েছিল ডানহাতটা, প্রদীপের দিকে,

“এসো আঙ্কেল, আস্তে আস্তে নামো।”

শাওনীর নিজের হাতে করে প্রদীপের হাতে মাখিয়ে দেওয়া বিশ্বাসের বর্মে ছিটকে গিয়েছিল সুনেত্রার এতক্ষণের অবিশ্বাসের শেল, খসে গিয়েছিল অটোয় বসে থাকা সেই আরেক মহিলার ছুঁড়ে দেওয়া সন্দেহের তিরও। বিশ্বাসের বর্ম গায়ে চড়িয়ে শাওনীর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে অফিসের দিকে হাঁটা দিয়েছিল প্রদীপ সরখেল, আরেকটা দিন ভালো করে শুরু করার ইচ্ছে বুকে নিয়ে।

খারাপ আসুক, খারাপ যাক, ভালোটুকু টিকে থাক, শাওনীরা সব বেঁচেবর্তে থাকুক, শ্বাস নিয়ে বাঁচুক প্রদীপ আর সুনেত্রারাও।

বাড়িটা


অলংকরণ - সুমন মান্না

আজকের গল্প একটা বাড়িকে নিয়ে। সে আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগেকার কথা, বুঝলে? সবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে, সারা দেশে আস্তে আস্তে দানা বেঁধে উঠছে ইংরেজ শাসকদের ভারতছাড়া করার জন্য আন্দোলন, এরকম একটা সময়ে শহর কলকাতার বুকে তৈরি হয়েছিল বাড়িটা। তারপর বারদুয়েক মালিকানা বদল হয়ে বাড়িটার চাবিগোছা আমার দাদামশাইয়ের হাতে আসে। সময়টা মোটামুটি একান্ন বাহান্ন সাল নাগাদ হবে। উত্তর কলকাতার বাদুড়বাগান এলাকায় তখনকার সার্কুলার রোডের ধারেই একটা দোতলা বাড়ি।

বাড়ির নিচে চওড়া রোয়াক, মাঝে সদর দরজায় ওঠার সিঁড়িটা রোয়াকটাকে দুভাগে ভাগ করেছে। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে একটা সরু প্যাসেজ চলে গেছে ভেতরবাড়িতে, উঠোনের দিকে। প্যাসেজের দু’ধারে দু’খানা ঘর, উঠোনের একদিকে একটা টানা দাওয়া, তার পাশে হেঁশেল আর খাওয়ার ঘর, উঠোনের আরেকদিকটা একটু পিছল মতো, সেদিকটায় চৌবাচ্চা আর বাথরুম। উঠোনের শেষ প্রান্তে ধাপে ধাপে উঠে গেছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি, তার রেলিং কাঠের, সবুজ রং করা। কাঠের দরজা জানলা, দোতলার ঝুলবারান্দা, যেখানে দাঁড়ালে রাস্তা দেখা যায়, তার রেলিং, সবই কাঠের, এবং সবুজ রং করা।

ভাবছ, বাড়িটার বর্ণনা এত খুঁটিয়ে দিতে পারছি কি করে? আরে, এটা যে আমার মামারবাড়ি, আমার ছোটবেলার লম্বা ছুটিগুলো সব যে এই বাড়িটাতেই কাটতো! গ্রীষ্মের দুপুরে কাঠফাটা রোদ্দুরে যখন গোটা পাড়া ঝিমোচ্ছে, তখন আমি দিদার চোখ এড়িয়ে কাঠের নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতাম ছাদে, সেখান থেকে দেখা যেতো পাশেই গনাগুন্ডাদের বাড়ির নোনাধরা দেওয়াল, ছাদের আলসেয় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কোমরটাকে একটা বিশেষ মোচড়ে বাঁকালেই ওদের বাড়ির দেওয়ালে চোখে পড়তো গুপী গাইন বাঘা বাইনের সেই ভূতেদের দলকে, নানাভাবে হাতছানি দিয়ে তারা সব ডাকতো আমায়। আবার কখনও ছাদে একটা মাদুর পেতে চিৎপাত হয়ে শুয়ে ঘাড়ের নিচে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, চোখদুটো প্রথমে একটু জ্বালা করতো, তারপরেই জ্বালা ভাবটা কেটে গিয়ে একটা ঝিমধরা ভাব আসতো, নীল আকাশে সূর্যের আলোয় কতকিছু লেখা হয়ে যাচ্ছে মনে হতো, আস্তে আস্তে চোখ বুজে আসতো। সারা দুপুর কড়া রোদ খেতাম বলে প্রায়দিনই রাতে গা হাল্কা গরম হতো, দিদার কাছে দুধ রুটি খেয়ে সুজনি চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আগে আবার ফিরে আসতো সেই ঝিমধরা ভাবটা, সেইসঙ্গে মনে হতো আমি যেন একা নই, আরও কারা যেন আমার পাশেই বসেটসে আছে, জ্বরের জলে চোখ ঝাপসা বলে আমি তাদের দেখতে পাচ্ছি না, জ্বর সেরে গেলেই খুঁজে পাবো। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, জ্বর সেরে গেলেই ওই মনে হওয়াটাও কেটে যেতো। সেসময় কাউকে একথা বলতে পারিনি, ভয় পেতাম বড়দের, বড় হয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, ওঁরও নাকি জ্বর হলে ঘুম আসার আগে ওরকমটাই মনে হতো, বছরের পর বছর ধরে। কেন, কেউই জানি না।

আজ কেন এত কথা মনে পড়ছে জানো? এখন আমি মামারবাড়িতেই যাচ্ছি, সামনের সপ্তাহ থেকে বাড়িটা ভাঙা শুরু হবে, তাই এই সপ্তাহের মধ্যে বাড়ির যা কিছু দামী জিনিস বিক্রিবাটা করে দিতে হবে, আর যা কিছু ডেওঢাকনা বাতিল জিনিস, সেসব হয় ওজন দরে বেচে দিতে হবে, নইলে কুচিয়ে পুড়িয়ে উড়িয়ে মিশিয়ে দিতে হবে পঞ্চভূতে। এ বড়ই গুরুদায়িত্ব। মামারা এখন থাকেন গুজরাটের এক শিল্পশহরে, পৈতৃক ভিটেয় ফিরে আসার সম্ভাবনা তাঁর, বা আমার মামাতো ভাই কুশল, কারোরই এই মুহূর্তে নেই। দিদা গত হয়েছেন আজ প্রায় পনেরো বছর হলো, এই বিশাল পোড়ো বাড়ি এতদিন আগলাতেন আমার মা, আর কিছুটা আমি। তা, গত বছর মা চলে গিয়েছেন তাঁর মায়ের কাছে, বাবার মুখ আমার মনে পড়ে না। কাজেই, এখন আমি বন্ধনহীন। চেনা জায়গায় একলা থাকা বড় কষ্টের, স্মৃতিগুলো বড্ড কাঁদায় সারাক্ষণ। বলতে পারো কিছুটা স্মৃতির হাত থেকে বাঁচতেই ব্যাঙ্গালুরুতে ট্রান্সফার নিয়ে নিলাম। পরের মাসে শিফট করব, তাই যাওয়ার আগেই মামারবাড়িটার একটা গতি করে দিয়ে যাচ্ছি। প্রোমোটারকে বিক্রি করা হয়েছে বাড়িটা, আমরা দুটো ফ্ল্যাট পাবো, আর নগদ কিছু টাকা। কাগজপত্র সইসাবুদ সব হয়েই গেছে গতমাসে, মামা এসেছিলেন, যেটুকু বুঝে নেওয়ার বুঝে নিয়ে বাকি আইনি কাজকর্মের জন্য আমাকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে তিনি ফিরে গেছেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে।

লক্ষ্য করেছি, ফিরে যাওয়ার আগের ক’দিন তিনি যেন কেমন বাড়িটার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে থাকতেন, ওবাড়িতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই কেমন যেন কুঁকড়ে যেতেন, দুই একদিন তো আমাকে একাকেই পাঠিয়েছেন, যখন ভ্যালুয়েশন করতে মিউনিসিপ্যালিটির লোক এলো। প্রোমোটার বিশ্বেশ্বর সামন্ত লোক ভালো, তবে মালিকপক্ষের কারও তো থাকা উচিত এসব কাজের সময়। আমি ছেলেমানুষ ছেলে, কত আর বুঝব, তাই জোর করেই মামাকে টেনে নিয়ে যেতাম। ওবাড়িতে ঢুকেই মনে হতো, মামা যেন কি একটা অপরাধবোধে ভুগছেন। বাড়িটার ঘরদোর, দরজা জানলার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছেন না, কিসের থেকে যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, দোতলার ঝুলবারান্দায় তো গেলেনই না, যদিও বারান্দা আর সিঁড়ির কাঠের রেলিং প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। মামার ওই অপরাধবোধের কারণ সেদিন বুঝিনি, এখন বোধহয় অল্প অল্প বুঝতে পারছি।

এই দেখো, কথায় কথায় পৌঁছেই গেলাম,

“হ্যাঁ দাদা, সামনের রাইট টার্নটায় ইউ টার্ন নিয়ে এই রাধাচূড়া গাছটার সামনে দাঁড় করাবেন, ওই ভাজাওয়ালার দোকানটার সামনে।”

বলেই খেয়াল হলো, তাই তো, রাধাচূড়া গাছটা তো দিব্যি আছে, গাছের ডালে সেই কাকেদের বাসাটাও আছে নিশ্চয়ই! ওদের বাসার তো আর অত রক্ষণাবেক্ষণ দরকার হয় না, যে, বছরকয়েক বাসিন্দাদের পা না পড়লেই সেটার ইঁটকাঠ খসে পড়বে, ‘পোড়ো বাড়ি’ বলে দাগিয়ে দেবে চেনামুখেরাও!


আজ রাতে এখানেই থাকব, আগে একদিন এসে একটা ঘর সাফসুতরো করে গিয়েছি, ওইঘরেই একটা বেঁটে কালো আলমারিতে বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় সব গুছিয়ে রাখা আছে, জানি, গামছা, আমার একসেট টিশার্ট বারমুডা, আর মায়ের একজোড়া শাড়িও। মায়ের কাজ খুব গোছানো ছিল তো, হুট করে কখনও এসে পড়লে যাতে অসুবিধা না হয়, তাই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। দ্যাখো দেখি, আমার তো আজ সত্যিই কাজে লাগছে!

রাতের খাবার খেয়েই এসেছি, বিছানা পেতে ঘর থেকে বেরোলাম বাকি ঘরগুলোয় ঘুরে আসব বলে। চারপাশে বড্ড মাকড়সার জাল হয়ে রয়েছে, মুখেচোখে জড়িয়ে যাচ্ছে। আহা, এরা যদি বাড়িটার দেখভাল করতে পারতো, এই মাকড়সা ইঁদুর চামচিকে পায়রার দল, তাহলে আর বাড়িটা ভেঙে স্ট্যান্ড অ্যালোন অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড় করাতে হতো না! এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি মামা এসে কেন বাড়িটা থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন!

যে ঘরটায় আমি রয়েছি, তার উল্টোদিকের ঘরটায় পুজো হতো, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, আর সরস্বতী পুজো। এমনিতে সারা বছরের নিত্যপুজোর ঠাকুরের আসন পাতা থাকতো দোতলায়, দিদার ঘরে, সেখানে রোজ দুবেলা পুজো আচ্চা সেরে দিদা নিচে নামতেন। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আর সরস্বতীপুজোর দিনে বেশ লোকজন আসতো, পাড়ার লোকেরা, দাদুর, মামার, মায়ের বন্ধুরা, তাই নিচের বড়ঘরেই ব্যবস্থা করা হতো। সেই দুটো দিনে বাড়ি একেবারে গমগম করতো।

সেসব দিনের কথা ভাবতে ভাবতে উঠোনের দিকে এগোচ্ছি, একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এলো। ধূপ, প্রদীপের সলতে জ্বলা গন্ধ, ফুল, কাটা ফল, দুধ, মধু আর কর্পূরের গন্ধ মেশানো একটা গন্ধ, ঠিক যেন এবাড়ির কোনও একটা ঘরে পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। মনে পড়ল, ছোটবেলার পুজোর দিনগুলোতে এই গন্ধটা সারাক্ষণ ঘিরে থাকতো আমায়। গন্ধটা কোত্থেকে আসছে খুঁজতে খুঁজতে পুজোর ঘরের দরজায় ফিরে এসে থমকে গেলাম।

ঘরের মধ্যে দেওয়ালের কাছে জলচৌকিতে বসে আছেন সাদা শাড়ি পরা মা সরস্বতী, ঠিক সেই আগের দিনগুলোর মতো, তাঁর সামনে আসনে বসে ঘটে তেল-সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক আঁকছেন তক্কদাদু, মামারবাড়ির বহুকালের পুরনো পুরোহিত ব্রজপতি ভটচায তর্করত্ন, তাঁর এক পাশে বসে ফল কেটে পেতলের থালায় রাখছেন আমার মা, আরেকপাশে বসে ফুল বেলপাতা পঞ্চরত্ন পঞ্চশস্য পঞ্চগব্য সব একে একে থালায় থালায় সাজিয়ে রাখছেন দিদা, একটা একদম নিচু মোড়ায় বসে। দিদার পায়ে ব্যথা, তাই তিনি মেঝেয় বসতে পারতেন না, বহুবছর ধরে। ঘরের একপাশে শতরঞ্চি পাতা, সেখানে চুপ করে বসে আছে পাশের বাড়ির দোলা আর ওর বোন তুলাই, দুজনের পরনেই একই ছিটের দুটো হলদে শাড়ি। হঠাৎ দিদা মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। মুখখানা দেখে বুকটা জুড়িয়ে গেল, কতদিন পর এই মুখটা দেখলাম! শেষ কয়েক বছর নানান অসুস্থতায় মুখ ফুলে গিয়েছিল দিদার, কষ্ট হতো দেখলে, আজকের মুখটা সেই আগের মতো, মনে হলো ছুট্টে গিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে আদর খাই, আগের মতো, জিজ্ঞেস করি কি অন্যায় করেছিলাম আমি যে ফল কাটতে বসা ওই মহিলাকে অত তাড়াতাড়ি নিজের কাছে নিয়ে গেলেন! দিদা নিজেও বড় তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছিলেন, কেন, সে উত্তরও নিতে হবে। একা থাকলে প্রশ্নগুলো বড় জ্বালায়। এসব ভাবছি, দিদা একগাল হেসে আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। তাড়াতাড়ি এগোতে যাবো, আমায় পাশ কাটিয়ে দেখি কে একটা বাচ্চা মতো রোগা ছেলে দৌড়ে গিয়ে দিদাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর হেসে কথা বলতে বলতে এদিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। কে ও? চোখ নাক মুখ এক্কেবারে আমার মতো! ও কি তবে আমিই? এতক্ষণে ঘোর কাটলো, এখানে যা যা হচ্ছে তা যে স্বাভাবিক নয়, ওপারে চলে যাওয়া মানুষগুলো এখানে পুজোর জোগাড় করছেন, এ যে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো একখানা ঘটনা, সেটা মাথায় আসতেই সারা শরীর ঝিমঝিম করে উঠলো। তবে এদের মাঝে আমি কি করছি? মানে, ওই ছোট্ট আমি টা? তারপরেই বুঝতে পেরে হেসে উঠলাম নিজের মনে, ও হো! ও তো আমার ছেলেবেলা। সে তো কবেই মরেহেজে গেছে। যদিও বা একটু বেঁচে ছিলো, এই বাড়িটার সঙ্গে, কাল থেকে বিক্রিবাটা আর পরের হপ্তা থেকে ভাঙাভাঙি শুরু হলে সেও তো হারিয়ে যাবে কালের কোঁচড়ে।

“কই রে, সব গেলি কই? বাউন দা পুজোয় বসে গেছ নাকি? নাতিটাকে নিয়ে এলুম যে, হাতেখড়ি দিইয়ে দিবিনে?”

একটা বছর চারেকের ছেলের হাত ধরে সদর দরজা দিয়ে ঢুকছেন এক প্রৌঢ়া, আরে এঁকে আমি চিনি, দিদার বান্ধবী ইনি, লেবুতলা পার্কের কাছে বাড়ি এঁদের। একবার ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পায়ে পেরেক ফুটে রক্তারক্তি কান্ড হয়েছিল, এঁদের বাড়ি গিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে ডিম দেওয়া ঘুঘনি আর চন্দ্রপুলি খেয়ে বাড়ি এসেছিলাম। পায়ের নিচে পেরেকের দাগটা এখনও আছে।

“অ মা, খুকু যে! কি ভাগ্যি, নাতির হাতেখড়ির নামে তাও নবাবনন্দিনীর পায়ের ধুলো পড়ল এবাড়িতে!”

দিদা হইহই করতে করতে এসে এই ‘খুকু’ দিদাকে ঘরে নিয়ে গেলেন। আর তখনই দুহাতে দুটো শালপাতার থালার বান্ডিল নিয়ে বাড়ি ঢুকলেন মামা। দেখে প্রথমে চমকে উঠলাম, ‘নেই মানুষ’দের ভিড়ে মামা কি করছেন? তবে কি মামাও....? খবরটা পাইনি এখনও? এক মুহূর্তের জন্য পায়ের নিচের মাটিটা দুলে উঠল। হা ঈশ্বর! আমায় এভাবে একেবারে একা করে দিও না, প্লিজ! ওই একটা লোক এখনও আছে, যে আমায় ডাকনামে ডাকে, তাকেও নিয়ে নিও না এমন করে। তারপরেই মনে পড়ল, মামার চেহারা এই এত বছরে প্রায় কিছুই বদলায়নি, চুলে পাক ধরা ছাড়া, কলপ করেন বলে সেটুকুও বোঝা যায় না। তাই হয়তো ভুল ভেবেছিলাম, আসলে এই মামা আমার ছোটবেলার মামা, যুবক মামা। আমার যেমন শৈশব হারিয়ে গেছে, তেমনই মামার তারুণ্য, যৌবনও হারিয়ে গেছে, তাই ছোট্ট আমি-র মতোই যুবক মামাও আজ ‘নেই মানুষ’দের দলে।

মনটা ভার হয়ে এলো। এসব কান্ড দেখে ভয় পাওয়ার কথা হয়তো, কিন্তু আমার ভয় করছে না, কষ্ট হচ্ছে। আপনজনদের দেখে কেউ কখনও ভয় পায় কি? এই যে আমি ছুট্টে গিয়ে ওই ফল কাটতে বসা মহিলার কোলে মুখ গুঁজে দিতে পারছি না, তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বলে উঠতে পারছি না, “মা, তুমি কোত্থাও যাওনি, এই তো আমার কাছে আছো, তাই না?” বলতে পারছি না, “মা, আমাদের বাড়িতে এখন আর বাগানটা নেই, তুমি বাড়ি চলো, আবার নতুন করে সব গাছ লাগাবো।” এই না পারায় ভয়ের চেয়ে কষ্টটাই তো বেশি হচ্ছে। এই কষ্ট বুকে নিয়েই বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু করিয়ে দিয়ে আমায় চলে যেতে হবে ব্যাঙ্গালুরু।

নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিলাম কষ্টটার হাত থেকে। এভাবে চলতে পারে না। তার চেয়ে বরং অন্য ঘরগুলো ঘুরে দেখি। যদি ওই ছোট্ট আমিটার সঙ্গে আলাপ জমাতে পারতাম, বেশ হতো। দুজনে মিলে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখা যেতো।

“আমায় খুঁজছো? কি বলবে বলো?”

চমকে তাকিয়ে দেখি আমার জামা ধরে টানছে ছোট্ট আমি, সেই কুড়ি বছর আগের তাতাই। কি আশ্চর্য, আমায় দেখতে পাচ্ছে! ভাবতে ভাবতেই শুনি,

“আমিই শুধু তোমায় দেখতে পাচ্ছি, বাকিরা না। অন্য ঘরগুলো ঘুরে দেখবে তো? এসো, হাত ধরো আমার।”

এগিয়ে চললাম দুজনে। উঠোনের ধারে খাওয়ার ঘর, দরজায় শেকল টানা। একটা ভাঙা চেয়ার টেনে তাতে উঠে ‘ঝনাৎ ‘ শব্দে শেকল খুলে ফেলল তাতাই।

“এসো “

ঘরে ঢুকে দেখি কালো কাঠের গোল টেবিলটা আর ছ’খানা চেয়ার ঠিক তেমনিই আছে, টেবিলের পাশে জালের দরজা দেওয়া মিটসেফটাও, আর তার চারটে পায়ার নিচে বসানো চারটে প্লাস্টিকের বাটি, পিঁপড়ের হাত থেকে বাঁচতে যেগুলোয় ঢালা হতো জল বা কেরোসিন।

“তাতাই, মনে আছে তোর, মিটসেফের ওপর সারে সারে বিস্কুটের কৌটো সাজানো থাকত, মেরী বিস্কুট আমি খেতে চাইতাম না, মা গজগজ করতো, দিদা চিনি বিস্কুট বের করতো মাকে থামিয়ে!”

“আমি এখনও খাই চিনি বিস্কুট”, রিনরিনে গলায় বলে উঠল তাতাই।

“তা তো খাবেই! মামারবাড়ির আদরে রয়েছ যে! আমার মতো হাত পুড়িয়ে রাঁধতে হলে বুঝতে।”

“তুমি খাবে? দিই দাঁড়াও।”

মিটসেফের ওপরে রাখা একটা বয়াম থেকে চিনি বিস্কুট বের করে আমার হাতে দিলো তাতাই, নিজেও নিলো। দুজনে দুটো চেয়ারে বসে কুড়মুড় করে বিস্কুট খেতে খেতে এটা সেটা গল্প করতে লাগলাম।

কথা বলতে বলতে নিজেরই অদ্ভুত লাগছে। বিকেল অব্দিও ভাবতে পেরেছিলাম, নিজের অতীতের সঙ্গে আড্ডা মারব এভাবে? একে কি বলা যায়? ভূতুড়ে ঘটনা? নাকি অদ্ভুতুড়ে?

খাওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠছি, হঠাৎ পায়ের নিচটা দুলে উঠছে মনে হলো। মাথা ঘুরছে? রেলিংটা ধরে ফেললাম। নাহ, কাঁপুনি থামছে না। ভূমিকম্প নয় তো?

“নেমে এসো, নেমে এসো শিগগির, পালাতে হবে তোমায়। ভূমিকম্প হচ্ছে।” আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিচে নিয়ে চলল তাতাই। ততক্ষণে অশ্বত্থের চারা গজানো দোতলার দেওয়ালে ধরা চিড়টা আরও চওড়া হচ্ছে আমার চোখের সামনেই, চোখ ফেরাতে পারছি না, চিৎকার করে বলছি তাতাইকে,

“ছেড়ে দে তাতাই, এখানেই থাকব, থাকতে দে আমায়, এই তো আমার শেকড়, এ ছেড়ে কোথায় যাবো আমি?”

তাতাই শুনছে না,

“না না, এ বাড়ি আর তোমার জন্য নয়, এবাড়ি এবার ভূত হতে চলেছে, এখানে তোমার আর জায়গা হবে না। তোমায় আলোয় যেতে হবে, তোমায় বাঁচতে হবে, আমাদের জন্য, আমাদের এখানে তোমার থাকার জায়গা এখনও তৈরি হয়নি, যাও, বেরিয়ে যাও এক্ষুনি!”

“তাতাই, শোন ভাই”, নিজেকে কি ভাই বলে ডাকা যায়? ওই অবস্থাতেও মাথায় এলো প্রশ্নটা,

“এই বাড়িটার ওপাশে আমার নিজের আর কেউ নেই ভাই। আমায় এখানেই জায়গা দে একটু, এখানে আমার মা আছে, মাকে ছেড়ে কোথায় যাবো বল?”

“না না, চলে যাও, চলে যাও এখান থেকে, এখানে অতীত হয়ে বাঁচতে তুমি পারবে না। আমরা সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে আছি, তোমার মধ্যে বাঁচব বলে আমরা দিন গুনি রোজ। তুমি বর্তমান, ভবিষ্যতের তোমাকে আমাদের কথা জানানোর জন্য তোমায় আলোয় থাকতে হবে, ফিরতে হবে ওধারে। যাও, ফিরে যাও।”

“তাতাই, একটি বার মায়ের সঙ্গে...”

“না, দুর্বল কোরো না নিজেকে। আচ্ছা, দাঁড়াও, একটা জিনিস দিই, সঙ্গে রেখো।”

যেঘরে কালো বেঁটে আলমারিটা থাকে, সেঘরে ঢুকল তাতাই। গোটা বাড়িটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে, উঠোনের ওপাশে বাথরুমের একটা দেওয়াল বোধহয় ভেঙে পড়ল হুড়মুড়্ করে, এপাশের দেওয়ালগুলোর চিড়ের দাগও বেড়ে চলেছে। বাঁচতে হলে পালাতে হবে সত্যিই, পালিয়ে বাঁচতে পারব কি? এখানে যে রয়ে গেল আমার শেকড়!

আমার ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে বেরিয়ে এলো তাতাই, আরেক হাতে একটা চৌকোনা মোড়ক, খবরের কাগজে মোড়া।

“নাও, তোমার জিনিস। আর, এটা সঙ্গে রেখো, সবসময়। এতেই আমরা আছি, থাকব চিরকাল। মন খারাপ কোরো না, পালাও এক্ষুনি।” বলে একরকম ঠেলে বাড়ির বাইরে বের করে দিলো তাতাই আমায়। এইটুকু ছেলের গায়ে এত জোর! আমি তো এমনটা ছিলাম না। তখন অবশ্য আর ভাবার সময় নেই।

বাড়ি ভেঙে পড়ার হুড়মুড় আওয়াজ পিছনে ফেলে রেখে কাঁধে ব্যাকপ্যাক আর হাতে চৌকোনা মোড়কটা নিয়ে এসে দাঁড়ালাম রাস্তায়, ল্যাম্পপোস্টের নিচে। পাড়ার লোকে সেখানে জড়ো হয়েছে ইতিমধ্যেই, ভূমিকম্প হলে রাস্তায় নেমে আসাই দস্তুর। আমায় ঘিরে ধরে শুরু হয়ে গেল প্রশ্নপর্ব,

“তুমি শুভদার ভাগ্নে তো? এই পোড়ো বাড়িতে রাত কাটাতে এসেছিলে?”

“ভগবান বাঁচিয়েছেন তোমায়! কি হতো বলো তো?”

“আসছে হপ্তা থেকে বাড়ি ভাঙার কথা ছিল না? শুভদাকে বলেছিলাম একগাড়ি রাবিশ লাগবে আমার, তার আগেই এভাবে...”

কথাগুলোকে পাশ কাটিয়ে জটলা থেকে একটু দূরে সরে এসে সঞ্জুমামার দোকানের সিঁড়িতে বসে হাতের প্যাকেটটার দিকে মন দিলাম। খবরের কাগজের মোড়কটা খুলতেই বেরিয়ে এলো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি, হলদেটে হয়ে এসেছে, তাও চেনা যায় সবাইকেই। ছবিটার মাঝখানে চেয়ারে বসে আছেন মায়ের ঠাকুমা, তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন আমার দাদু আর দিদা, তাঁদের দুজনের দুপাশে বাবা আর মা, মায়ের কোলে এক্কেবারে কচি আমি। মায়ের ঠাকুমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে সদ্য দাড়িগোঁফ গজানো মামা।

ছবিটা বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁধ ভেঙে আসা চোখের জলটাকে আটকালাম কোনওমতে, এখানে কেউ আমার কান্নার মানে বুঝবে না, ভাববে সম্পত্তি তছনছ হয়ে গেছে বলে কাঁদছি। মুখ তুলে দেখলাম, কর্পোরেশনের টাঙিয়ে দেওয়া ‘বিপদজনক বাড়ি’ নোটিশবোর্ডটা সদর দরজার ভাঙা দেওয়ালের পাশে কাৎ হয়ে পড়ে আছে। আর, সেই ভাঙা দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে তাতাই।

“তাতাই!” অস্ফুটে ডেকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, হাত নেড়ে ও তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে গেল। ওখানে তো শুধুই ইঁটকাঠের স্তুপ, ওখানে কোথায় খুঁজে পাবো তাতাইকে, আমার মাকে, আমার ফেলে আসা অতীতকে? কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লাম রাস্তায়। এখন সামনে অনেক কাজ, সবার আগে মামাকে ফোন করতে হবে, আমাদের অতীতের মৃত্যুসংবাদ জানাতে হবে, তারপর বেরোতে হবে বাড়িটার মৃতদেহ নিয়ে, সৎকারের কাজে।

“হে অতীত, শক্তি দাও আমায়, তোমরা ছাড়া এই মুহূর্তে আমায় আর কে ভরসা দেবে বলো? তোমরা এভাবে ছেড়ে যেয়ো না!”

ছবিটা বুকে চেপে বিড়বিড় করতে লাগলাম৷ আস্তে আস্তে বুকের ভেতরটা শান্ত হয়ে এলো। কার যেন আলতো ছোঁয়া মনে হলো সারা গায়ে প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে। কে যেন আমার কাঁধে নরম হাত রাখলো। চোখ তুলে দেখলাম, কাউকে দেখতে পেলাম না। পাবো না, জানতাম। পাড়ার লোকেও একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। একটা ভেঙে পড়া পোড়ো বাড়ির জন্য কে আর রাতের ঘুম নষ্ট করে!

ভাঙা বাড়িটার সামনে রাস্তার ধারে বসে রইলাম আমি, আমায় ঘিরে বাকি রাতটুকু আগলে রইলো আমার অতীত। পুবের আকাশ লাল হতে শুরু করতেই ফোনটা পকেট থেকে বের করলাম, মামার নম্বরটা ডায়াল করতে হবে।