সুস্মিতা কুণ্ডু
Showing posts with label সুস্মিতা কুণ্ডু. Show all posts

গোবিন্দগড়ের রাজামশাই - সুস্মিতা কুণ্ডু

হাসির গল্প

অলংকরণ : সুমিত রায়

রাজামশাইয়ের মন খারাপ। খারাপ মানে খুউউউব খারাপ, বেজায়রকমের খারাপ। যেরকম খারাপ হলে নলেন গুড়ের রসগোল্লাও মোটে ন‘টা খেয়েই দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে যেতে হয় কিংবা ধরো রানিমা পাতে পাঁঠার কালিয়ার বদলে মুর্গির ট্যালট্যালে ইস্টু না কী যেন দিলেও রাজমাতার কাছে গিয়ে নালিশ করতে ইচ্ছে করে না, ঠিক সেই রকম মন খারাপ রাজামশাইয়ের। আর হবে নাই বা কেন?

রত্নপুরীর গোলাপবাগান - সুস্মিতা কুণ্ডু

ফ্যান্টাসি গল্প

অলংকরণ - পিয়াল চক্রবর্তী
(১)

রত্নপুরীর রাজপ্রাসাদ সত্যি সত্যিই যেন রত্নে গড়া। দিনের বেলায় যখন সূর্যের আলো পড়ে, সোনার নক্সা করা বড় বড় থামগুলো ঝিকমিক করে। সোনার জাফরি গলে রোদ এসে পড়ে রাজার নবরত্নখচিত সিংহাসনের ওপর। ন’রকমের রঙ ঠিকরে পড়ে লাল রেশমের গালচের ওপর।

বোকাবাক্স - সুস্মিতা কুণ্ডু

অলংকরণ - প্রতিম দাস
এক

বিকেল থেকে আকাশের মুখ ভার। সুধাংশুবাবুরও আকাশের সাথে তাল মিলিয়ে মুখটা ভার ছিল কিন্তু রমলা আদা চা আর একটা কাঁসিতে করে মুড়ি আর ঘরে ভাজা পেঁয়াজি দিয়ে যেতে আর মেজাজটা ততটা তিতকুটে লাগছে না। একমুঠো মুড়ি গালে ফেলে পেঁয়াজিতে কামড় বসালেন। দেওয়াল ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজে খেয়াল হল, খবরের টাইম হয়ে গেছে। রিমোট দিয়ে টি. ভি.-টা অন করলেন সুধাংশুবাবু। বাইরে দুমদাম বাজ পড়ছে, মাঝে মাঝে কাঁচের জানলা দিয়ে আলো ছিটকে আসছে, তারপরই ‘ক্কড়ক্কড়াৎ’।

এ’রকম ওয়েদারে টি.ভি. চালালে খুব রাগ করেন রমলা, কিন্তু সুধাংশুবাবুও কারোর কথা শুনে চলার বান্দা নন। নিজের রিটায়ারমেন্টের পয়সায় কেনা টি. ভি.। নামি কোম্পানির একুশ ইঞ্চির ফ্ল্যাট স্ক্রিন কালার টি. ভি.। বছর দশেক আগে খুব রমরমিয়ে চলত, কিন্তু এখন সব পাতলা পাতলা কী যেন বলে প্লাজমা, এল.ই.ডি. এইসব টি. ভি. এসে এই বড় বাক্সমার্কা যন্ত্রগুলোর দর পড়ে গেছে। সবাই দেওয়ালে ক্যালেণ্ডারের মত প্যাতপ্যাতে ওই টি. ভি.গুলোই ঝোলায়। জায়গা কম লাগে, দেখতেও বাহারী।

রমলার নিষেধকে মোটেও পাত্তা না দিয়ে টি. ভি. চালিয়ে খবর দেখতে বসলেন সুধাংশুবাবু। যত পুরনোই হোক এই টি. ভি.-টা নিয়ে কেউ কাড়াকাড়ি করতে আসে না, রিমোট নিয়ে কেউ টানাটানি করে না। নাতি নাতনী দুটো সারাদিন খেলা আর কার্টুন নিয়ে লড়ছে। এ ঘ্যাঁচ করে ক্রিকেট চালায় তো ও দুম করে টম অ্যান্ড জেরি লাগায়। সন্ধেয় ছেলে শেয়ার মার্কেটের খবর চালালে বৌমা রূপচর্চা বা রান্নার অনুষ্ঠান ঘুরিয়ে দেয়। তার ওপর শাশুড়ি বৌমার অষ্টপ্রহর সিরিয়াল তো লেগেই রয়েছে। বেচারা ক্যালেণ্ডার টি. ভি.-র কী দুর্দশা। তার চে’ বরং এই বাক্সপানা গাবদা টি. ভি.-ই ভালো।

একটা খবরের চ্যানেল লাগিয়ে সবে চা-টায় একটা চুমুক দিয়েছেন ওমনি ভয়ানক জোরালো একটা আলো চমকে উঠল, আর তার কয়েক সেকেন্ড পরেই কানফাটানো শব্দ করে বাজ পড়ল। খুব কাছাকাছিই পড়েছে মনে হয়। বাজ পড়ার সাথে সাথেই টি. ভি. টায় একটা ফটাস করে আওয়াজ হয়ে ছবি চলে গেল। গোটা স্ক্রিন জুড়ে সাদা কালো গুঁড়ি গুঁড়ি পিঁপড়ের মত দানা ঝিরিঝিরি করতে লাগল। সর্বনাশ! বাজ পড়ে পিকচার টিউবটা গেল নাকি ভোগে? রমলা তাহলে আর আস্ত রাখবে না। চা-মুড়ি দিতে এসেও পইপই করে বলে গেছিল টি. ভি.-টা বন্ধ করতে।

সামনের টি-টেবলে চিনামাটির কাপটা আর কাঁসিটা নামিয়ে রেখে সুধাংশুবাবু সুড়সুড় করে এগিয়ে গেলেন টি. ভি. টার সামনে। এদিক সেদিক বেঁকে ঝুঁকে দেখলেন। বেশ ক’বছর আগেও বাড়ির ছাদে সব অ্যান্টেনা থাকত, তাইতে কাক বসলে কিংবা ঘুড়ি আটকালেই এমন দশা হ’ত। কিন্তু এখন তো সে সবের বালাই নেই, প্লাগের মত করে কেবলের তার গোঁজা পেছনে সব। প্রথমে টি. ভি.র মাথায় একটা আলতো চাপ্পড় মারলেন, কোনও লাভ হ’ল না। সেই একরকম ঝিরঝির করতে লাগল। সুধাংশুবাবু তখন কেবলের মোটা কালো তারটা খুলে আনলেন টি.ভি.র পেছন থেকে তারপর পাঞ্জাবির খুঁটটায় তারের মুখের জ্যাকটা একটু থুতু দিয়ে মুছে নিয়ে ফের গুঁজলেন নির্দিষ্ট জায়গাটায়।

দুই

যেই না তারটা গোঁজা ওমনি হঠাৎ করে একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গের মত বয়ে গেল শরীরের ভেতর দিয়ে সুধাংশুবাবুর। না, ঠিক কারেন্টের শক লাগার মত নয়, অদ্ভুত একটা কাতুকুতুমার্কা শিরশিরানি। অনুভব করলেন ওঁর শরীরটা কেমন যেন ছোট হয়ে এবং বায়বীয় হয়ে শাঁআআআ করে ঢুকে গেল কেবলের তারটার ভেতর। তারপর তারের ভেতর দিয়ে সেই ওয়াটার পার্কের সুড়ঙ্গ রাইডের মত চোঁ চাঁ করে একদিকে এগিয়েই যেতে লাগলেন প্রবল একটা টানে। হুশ হাশ করে গিয়ে গিয়ে ধপাস করে পড়লেন একটা নরম নরম জায়গায়। সাদা কালো গুঁড়ো-গুঁড়ো দানা-দানা বালির মধ্যে যেন সাঁতার কাটতে লাগলেন। হঠাৎ করে তাকিয়ে দেখলেন চারদিকের কালো দেওয়ালের মাঝে একটা জায়গায় চারচৌকো একটা জানলামত। কোনওমতে সাদা কালো দানার সমুদ্দুরে সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে গিয়ে জানলায় চোখ রাখলেন।

এ কী! বাইরে কী দৃশ্য এটা? এটা তো সুধাংশুবাবুর নিজের ঘরটাই। ঐ তো সামনে টেবলটায় চায়ের কাপ আর মুড়ির কাঁসি। টেবলের ওপারে আরামকেদারাটা। ঐ তো দেওয়ালের গায়ে আলনাটায় পায়জামা আর পাঞ্জাবি, রমলার সুতির ছাপা ভাঁজ করা ঝুলছে। তবে কি উনি টি.ভি.-টার ভেতর ঢুকে গেছেন? জানালাটা কি তবে টি.ভি.রই স্ক্রিনটা?

হে ভগবান! এ কী অশৈলী কাণ্ড রে বাবা! জানলাটার গায়ে মুঠোয় করে ঘুঁষি মারতে লাগলেন, ডাকতে লাগলেন যদি ওইপারে ঘরের কোনও মানুষ শুনতে পায়।

এমন সময় রমলা এসে ঢুকলেন ঘরে,

—কী গো? আর দু’টো পেঁয়াজি দেব তোমায়?”

এই বলে হাঁকতে হাঁকতে। ঘরে ঢুকে একটু থমকে গেলেন সুধাংশুবাবুকে দেখতে না পেয়ে।

—“এই তো ছিল লোকটা এখানে, গেল কোথায়? নির্ঘাত ক্লাবে গেছে তাসের আড্ডায়। এই ঝড় বাদলার দিনেও যেতে হবে? বলিহারি নেশা সব বাপু! ওই দ্যাখো টি. ভি. টাও বন্ধ করেনি। কত করে বলি যে বাজ পড়লে টি.ভি.-খানা বন্ধ করবে। একটা কথা শুনবে মানুষটা! সারাটা জীবন জ্বালিয়ে গেল...”

রমলা গজগজ করতে করতে টি.ভি.-টা বন্ধ করার জন্য রিমোট খুঁজতে থাকেন। এই প্রথম রমলার গজগজানি এত মধুর লাগে সুধাংশুবাবুর। কিন্তু রমলা টি.ভি.-র স্ক্রিনে সুধাংশুবাবুকে দেখতে পাচ্ছেন না কেন? নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখেন ওঁর শরীরেরও সাদা কালো দানা-দানা রঙ হয়ে গেছে। ওই জন্যই রমলা টি.ভি.-র সাদাকালো ঝিরিঝিরির মধ্যে আলাদা করে সুধাংশুবাবুকে দেখতে পাচ্ছেন না। এতো আচ্ছা জ্বালা হ’ল! বাড়ির লোক তো বুঝতেই পারবে না যে উনি টি.ভি.-র ভেতর বন্দী। সবাই ভাববে সন্ধেবেলায় উনি ক্লাবে তাস পিটতে গেছেন। টেনশনে সুধাংশুবাবুর মাথার দু’পাশের রগদুটো দপ্ দপ্ করতে লাগলো।

এমন সময় হঠাৎ করে সব অন্ধকার হয়ে গেল, চারপাশে সাদা কালো দানা, জানালাটা, কিচ্ছু নেই। নিকষ কালো অন্ধকার, এমনকি নিজের হাত-পাটাও দেখতে পাচ্ছেন না সুধাংশুবাবু। এবার বেজায় ভয় পেতে শুরু করল। মরেটরে গেলেন না তো? হয়ত সোজা আঁধার কালো নরকে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু সেরকম পাপ তো জীবনে কিছু করেননি যে ঘ্যাঁচ করে নরকবাস হবে। হঠাৎ মনে পড়ল গিন্নি রিমোট খুঁজছিল। তাহলে মনে হয় রমলা টি.ভি.-টা বন্ধ করল, তাই এরকম আঁধার ঘনিয়ে এল। নিশ্চিন্ত হয়ে ছোট্ট করে হাঁপ ছাড়লেন। কিন্তু আসল সমস্যাটা তো রয়েই গেল! টি.ভি.-র বাইরে বেরোবেন কী করে!

তিন

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই কী যেন একটা সপাটে লাঠির মত দুম করে এসে পড়ল সুধাংশুবাবুর পিঠে। ওমনি কেমন যেন হালকা গোলার মত শাঁআআ করে আকাশে উড়তে লাগলেন উনি। চারপাশটা আর অন্ধকার নেই। নিচে সবুজ মাঠ, মাথার ওপর নীল আকাশ। লোকজনের চিৎকার ভেসে আসছে। সুধাংশুবাবু পাখির মত আকাশে ভেসে চলেছেন, ডানা নেই এই যা। তারপর আবার শোঁওও করে নিচের দিকে নামতে লাগলেন। ঝুপুস করে গিয়ে পড়লেন কারোর হাতের শক্তপোক্ত তালুতে। তারপর তাঁকে নিয়ে কী উল্লাস আর হই-হুল্লোড়। ও হরি! এ কী কাণ্ড ! সুধাংশুবাবু যে একটা বল হয়ে গেছেন ! লাল টুকটুকে একটা বল। মাঠে সবাই তাঁকে নিয়ে লোফালুফি করছে। তার মানে নির্ঘাৎ নাতি এসে ক্রিকেট খেলা চালিয়েছে এই টিভিতে। বাইরের ক্যালেন্ডার টিভি হয় বাজের ভয়ে বন্ধ আছে নইলে রমলা আর বৌমা নির্ঘাত সিরিয়াল দেখছে, তাই সেখানে চান্স না পেয়ে দাদুর ঘরের টিভিতে হামলা করেছে।

এদিকে কোনও একজন প্লেয়ার একদলা থুতু সুধাংশুবাবুর গায়ে, থুক্কুড়ি লাল বলরূপী সুধাংশুবাবুর গায়ে মাখিয়ে, প্যান্টে

বেশটি করে ঘষে বল করতে শুরু করেছে। সুধাংশুবাবু তো বেজায় ঘেন্নায় নাক সিঁটকোতে গেলেন কিন্তু বলের তো আর নাক নেই তাই সিঁটকানোরও উপায় নেই। তবে নাক নেই বলে কি বিদ্রোহও করতে নেই? খামোখা এত পিটুনি খেতে যাবেন কেন শুনি? সুধাংশুবাবু করলেন কী বোলারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া মাত্রই নিজের খুশি মত গড়ানো শুরু করলেন। শূন্যে ঘুরে আসা ব্যাটের নাগাল টপকে, উইকেটকিপারের পায়ের তলা দিয়ে গলে সারা মাঠময় ছুটোছুটি লাফালাফি গড়াগড়ি শুরু করলেন। এক এক করে ফিল্ডাররা, বোলার, ব্যাটসম্যান দু’খান, মায় আম্পায়ার অব্দি তাঁর পেছনে মানে লাল বলটার পেছনে ছুটতে শুরু করল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড।

এমন সময় দূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল,

—“ভোম্বল! মাস্টারমশাই এসেছেন, শিগগির পড়ার ঘরে যাও।”

বৌমার গলা, নাতির অঙ্কের মাস্টার এসেছে। এবার মুক্তি মিলবে, টিভিটা বন্ধ করবে ভোম্বল। এমন প্রাণ নিয়ে লাফালাফির চেয়ে অন্ধকার ঢের ভালো। কিন্তু সুধাংশুবাবুর কপালটাই মন্দ! নাতি টিভি ছেড়ে যেতে না যেতেই নাতনি টুম্পা এসে রিমোটের দখল নিল। এতক্ষণ দাদার চাঁটির ভয়ে সুবিধে করতে পারেনি। চ্যানেল ঘোরানো মাত্র সুধাংশুবাবু তপ্ত কড়াই থেকে এসে পড়লেন সোজা জ্বলন্ত উনুনে।

চার

এতক্ষণ ক্রিকেটের লাল বল হয়ে শুধু ব্যাটপেটা খাচ্ছিলেন, কিন্তু এখন একটা পাঁশুটে রঙের গোব্দামত বেড়াল তাঁকে গপাৎ করে খেতে আসছে। নাতনি ওই টম এ্যান্ড জেরি না কী বলে, সেইটে চালিয়েছে নির্ঘাৎ। আর সুধাংশুবাবু লাল বল থেকে প্রোমোশন পেয়ে, হয়েছেন বাদামী ইঁদুর জেরি। উফফ্ নাতনিটা একটু সুন্দর পরী হুরী মণ্ডামিঠাইওয়ালা কার্টুন চালাতে পারল না! এখন প্রাণ হাতে করে পাঁই পাঁই করে দৌড়তে হচ্ছে সুধাংশুবাবুকে জেরি অবতারে। বিড়ালটাও বড্ড বজ্জাত, কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। চেয়ারের তলা দিয়ে, টেবলের ওপর দিয়ে সে কী দৌড়। আরেকটু হলেই সুধাংশুবাবুর লেজটা বিড়ালটা কপাৎ করে কামড়ে ধরছিল, তার আগেই উনি সামনের দেওয়ালের গায়ে একটা ফোকরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। জিভ বার করে হ্যা হ্যা করে হাঁপাতে লাগলেন।

বদমাইশ বেড়ালটা এদিকে ফোকরটার বাইরে ওঁত পেতে বসে আছে, বেরনো মুশকিল এখন। বাইরে বার হ’বার নামারকম মতলব ভাঁজতে লাগলেন মনে মনে। টেবিলের ওপর দিয়ে ছোটার সময় নজর করেছেন একটুকরো চিজ রাখা আছে একটা প্লেটের ওপর। গন্ধটা এখনও নাকে ভাসছে, পেটটাও গুড়গুড় করছে। কয়েকগাল মুড়ি এর আধখানা পেঁয়াজি আর কতক্ষণই বা পেটে থাকবে। চোখ বুজে, মাথা ঘামাতে লাগলেন একটা উপায় বার করার জন্য।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ নাকে গরম গরম লুচির গন্ধ ভেসে এল। ব্যাপারটা কী! চিজের গন্ধ লুচির গন্ধে বদলে গেল কী করে! চোখ মেলতেই সুধাংশুবাবু যাকে বলে ‘ভ্যাবাচাকা হাম্বা’ তাই হয়ে গেলেন। ভীষণ সুন্দর সাজানো গোছানো একটা বাড়ির পরিপাটি ডাইনিং টেবলের সামলে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। ডাইনিং টেবলের ওপর থরে থরে ফুলকো লুচি সাজানো, সাথে কালোজিরেওয়ালা সাদা আলুর চচ্চড়ি। দেখেই হামলে পড়তে যাচ্ছিলেন সুধাংশুবাবু। হাতটা যেই না বাড়িয়েছেন ওমনি দু’দুটো নারীকণ্ঠ কানে ভেসে এল। একজন বলছে,

—“এটা আলুর চচ্চড়ি হয়েছে? একফোঁটা নুন নেই! বৌমা তোমার বাপের বাড়ি থেকে কি তোমায় কিচ্ছু শিখিয়ে পাঠায়নি? ধোঁকা দিয়ে, আমার অমন সোনার টুকরো ছেলের গলায় মেয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে।”

আরেকটা গলা কানে এল,

—“যেমন দাদা তেমন বোন! একজনকে টিভির সামনে থেকে তুললাম তো অন্যজন এসে বসলেন। যা শিগগির গিয়ে বই নিয়ে বোস। মাআআ! এই ঘরে আসুন, আপনার ছেলে ওই টিভিতে রাজ্যের শেয়ারমার্কেটের খবর চালিয়ে বসেছে। শিগগির আসুন, ‘সোনার সংসার’ শুরু হয়ে গেছে।”

পাঁচ

দ্বিতীয় গলাটা তো বৌমার বোঝাই যাচ্ছে। তার মানে সন্ধে সাড়ে ছ’টা বাজল। বাংলা সিরিয়াল ‘সোনার সংসার’ দেখতে বসবে এবার শাশুড়ি আর বৌমা মিলে। আশ্চর্য! ঝড় বাদলাতে বুড়ো লোকটা কোথায় গেল তাই নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই। ক্লাবে তাস পিটতে গেছে ধরে নিয়েই সবাই যে যার ফূর্তি করতে ব্যস্ত। সব স্বার্থপর। ছেলে বৌমা নাতি নাতনি সব নাহয় কম বয়স কিন্তু রমলা! তারও একবার বুড়ো বরটার কথা মনে পড়ল না? সুধাংশুবাবু ঝড়বাদলায় টিভি চালালে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় আর নিজে যে সিরিয়াল গিলতে বসেছে তার বেলায় কিছু যায় আসে না? এখন তো কই বাজ পড়ে টিভি খারাপ হয় না।

বেশ হয় যদি আরেকটা বাজ পড়ে টিভিটা ওই রকম ঝিলঝিলিয়ে যায়। আর রমলা সুধাংশুবাবুর মত কেবলের তার বেয়ে টিভিতে ঢুকে পড়েন। জোরদার বদলা নেবেন সুধাংশুবাবু। রমলা লাল টুকটুকে ক্রিকেট বল হ’লে, উনি হবেন ব্যাট। রমলা পিচ্চি ইঁদুর জেরি হলে উনি হবেন টম। এমন জব্দ করবেন বুড়িকে! অবিশ্যি এই টিভির ভেতরের আজব দুনিয়ায় কে যে কী রূপ পাবেন তার কোনও ভরসা নেই। আর টিভির বাকি চরিত্রগুলোও কিছু বুঝতে পারে না। টিভির বাইরের মানুষদের কথা একমাত্র সুধাংশুবাবু ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় বলে তো মনে হয় না।

এই যে সামনের আরেকজন মহিলা অনর্গল চেঁচিয়ে চলেছেন তিনি নিশ্চয়ই বাইরে রমলা আর বৌমার গলা শুনতে পাচ্ছেন না। এবার একটু মন দিয়ে সামনের মহিলাকে লক্ষ করলেন সুধাংশুবাবু। জমকালো শাড়ি পরা, গয়নার দোকানের মূর্তিমান বিজ্ঞাপন, কপালে ইয়াব্বড় লাল টিপ! মুখটা চেনা ঠেকছে। ও হো! এ তো সেই ‘সোনার সংসার’ সিরিয়ালের দজ্জাল শাশুড়িটা। এবার নিজের হাত পায়ের দিকে তাকালেন সুধাংশুবাবু। এ কী জ্বালা! তিনি তো ওই দজ্জাল শাশুড়ির ভালোমানুষ গরিব বাড়ির বড়বৌমার চরিত্র হয়ে গেছেন। হা ঈশ্বর! এর থেকে তো লাল বল হয়ে ব্যাটের পিটুনি খাওয়া ভালো ছিল। নিদেনপক্ষে জেরি হয়ে টমের পেটে গেলেও চির শান্তি পেতেন। কিন্তু এখন এই শাশুড়ির বাক্যবাণ সহ্য করতে হবে!

মেজাজটা গরম হতে থাকে সুধাংশুবাবুর। পেটের ভেতরের ছুঁচোগুলোও ডন বৈঠক সেরে এবার মুগুর ভাঁজতে লেগেছে। সুধাংশুবাবু আর সামলাতে না পেরে, হাত বাড়িয়ে টেবলের ওপর থেকে একটা ফুলকোপানা লুচি তুলে, তাইতে করে একখাবলা সাদা আলুচচ্চড়ি মুড়ে নিয়ে, সটান মুখে চালান করে দিলেন। বেশ ভালোই তো হয়েছে আলুচচ্চড়ি, নুন ঝাল সবই ঠিকঠাক। খামোখা ওই দজ্জাল মহিলা অমন করে মুখ করছিলেন বেচারা বৌমাটাকে, থুক্কুড়ি সুধাংশুবাবুকে।

এদিকে বৌমারূপী সুধাংশুবাবুকে খপাৎ করে লুচি খেতে দেখে শাশুড়ি প্রথমে ভড়কে গেলেও তারপর খ্যারখ্যারে গলায় চেঁচাতে শুরু করলেন,

—“এ কী অনাসৃষ্টি কাণ্ড রে বাবা! এ কেমন অলুক্ষুণে মেয়ে! শ্বশুর ভাসুর বর সব না খেয়ে বসে আছে আর উনি পেটপুরে লুচি গিলতে শুরু করলেন। এই রাক্ষসী মেয়েই একদিন আমার ‘সোনার সংসার’ ছারখার করবে, এই আমি বলে দিলুম।”

সুধাংশুবাবু আর সহ্য করতে পারলেন না। টেবিলের ওপর থেকে একটা টমেটো সসের প্লাস্টিকের বোতল তুলে, তার পেটটা টিপে পিচিক পিচিক করে শাশুড়ির গায়ের দামী শাড়িতে লাল সস ছিটিয়ে দিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আশেপাশের বাকিসব ক্যারেক্টারগুলো থ’ হয়ে গেল। সেই সুযোগে সুধাংশুবাবু হেঁকে হেঁকে বলতে লাগলেন,

—“ও রমলা তুমি শুনছো? এটা আমি গো আমি। সুধাংশু ঘোষদস্তিদার। তোমার আদি অকৃত্রিম বর! ও খোকা, বৌমা! তোমরা শুনতে পাচ্ছো? ভোম্বল টুম্পা কই গেলি? আমি দাদুভাই রে! আমি এই টিভির ভেতর আটকা পড়েছি, কিছু একটা করে আমায় বার করো। ডাক্তার-ওঝা-ইলেকট্রিসিয়ান-কেবলের লোক যাকে পারো ডাকো!”

ছয়

ক্রিকেটের বল আর জেরি অবতারে কথা বলার উপায় ছিল না। মনুষ্য অবতারে আসতেই তাই সুধাংশুবাবু সব কাণ্ড বয়ান করতে লাগলেন। এতখানি বলে দম নিলেন, কই রমলা বা বৌমা কারোর গলা তো আর কানে আসছে না। ওরা কী তবে সুধাংশুবাবুর গলা শুনতে পাচ্ছে না? যতক্ষণ টিভিটা সাদাকালো ঝিরঝির করছিল ততক্ষণ তবু ঐ জানলার মত খুপরিটা দিয়ে নিজের ঘরটা, লোকজনদের দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু যখনই কোনও চ্যানেল লাগাচ্ছে কেউ, সুধাংশুবাবু চারপাশে টিভির দৃশ্যটা ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু বাড়ির লোকগুলোর গলাটুকুই শুনতে পাচ্ছেন।

খানিকক্ষণ কান খাড়া করে রইলেন, রমলার বা বৌমার গলা পান কি না। কিন্তু নাহ্! কই কেউ কিচ্ছু বলছে না। মাঝখান থেকে টিভির ভেতরের ওঁর শ্বশুরবাড়ির লোকগুলো কীসব গুজগুজ ফিসফাস করছে। এমন সময় কানে এল রমলার গলা,

—“ও বৌমা দ্যাখো দেখি টিভির ছবিটা কেমন তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছে। কিছু দেখা যাচ্ছেনা। শোনাও যাচ্ছেনা এমন চ্যাঁ চোঁ করে আওয়াজ হচ্ছে। যত রদ্দির জিনিস কেনার দিকে নজর লোকটার। একটা কেমন সুন্দর ছোট্ট পাতলা প্লাজমা টিভি দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিলে কত জায়গাও বাঁচে। ড্রইং রুমের টিভিটা কত সুন্দর লাগে।”

—“মা আপনার ছেলে তো কত করে বলল বাবাকে, কিন্তু উনি শুনলে তো!”

সুধাংশুবাবুর তো মুখে একগাল মাছি। এত চেষ্টা করে বললেন কথাগুলো আর ওরা নাকি শুনতেই পেল না। এক্ষুনি আবার অন্য চ্যানেলে ঘোরালে সাপ ব্যাঙ চেয়ার টেবিল কী অবতারে জন্ম নেবেন কে জানে! রাগের চোটে কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে সুধাংশুবাবুর। কিন্তু কপাল চাপড়ানোর আগেই কে যেন পেছন থেকে সুধাংশুবাবুর হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। সেই ভয়ঙ্কর শাশুড়িরূপী মহিলা ফের আর্তনাদ শুরু করলেন।

—“আমি জানতাম! এরকম কিছুই হবে! পাগল মেয়ে গছিয়ে দিয়েছে আমাদের! আমার সোনার টুকরো ছেলের কপালে শেষে পাগলি জুটল একটা। এ আমার কী সর্বনাশ হ’ল গো! আমার সোনার সংসার ছারখার করে দিল এই ডাইনিটা।”

সুধাংশুবাবু পড়লেন মহা ফাঁপরে। এবার তো এরা সুধাংশুবাবুকে মানে ওই বড় বৌমারূপী মেয়েটিকে ধরে পাগলাগারদে পুরে দেবে। এর বেলা কেউ চ্যানেল বদলাচ্ছে না কেন? কোথায় গেল বাড়ির লোকগুলো সব? এমন সময় হঠাৎ করে একটা চাপা ‘ক্কড়ক্কড়াৎ’ শব্দ কানে ভেসে এল সুধাংশুবাবুর। কানে যেন মধু বর্ষাল। নির্ঘাৎ বাজ পড়েছে, রমলা এবার টিভি বন্ধ করবে নিশ্চয়ই। এতক্ষণ ধরে যা চলছে তার থেকে ওই অন্ধকারই ভালো।

সাত

নাহ্ রমলা টি.ভি. বন্ধ করার আগেই অন্য কাণ্ড হ’ল। আবার সব সেই সাদা কালো ঝিরিঝিরি গুঁড়োতে চারপাশটা ভরে গেল। ঠিক যেমন শুরুতে ঘটেছিল, যখন সুধাংশুবাবু টি.ভি.-র বাইরে বসে টিভি দেখছিলেন। নিজের শরীরের দিকে তাকালেন সেই আগের মত সাদা কালো বুটিতে ভরে গেছে। ফুড়ুৎ করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল সুধাংশুবাবুর। সেই সাথে কানে ভেসে এল রমলার কাতর স্বর,

—“ও খোকা! এদিকে আয়না একবারটি। কী হয়ে গেল টি.ভি.-টা। কেমন ঝির ঝির করতে লাগল বাজ পড়তেই। এইজন্যই সবসময় বজ্রবিদ্যুৎ হ’লে সব কারেন্টের জিনিস বন্ধ করি। এই আপদ বাংলা সিরিয়ালের নেশাতেই এমন দশা হ’ল। এদিকে এই লোকটা ঝড় বাদলায় ক্লাবে তাস পেটাতে গেল। ভালো লাগে না, কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার। সংসার ছেড়ে বিবাগী হ’ব এবার। বৌমাআআ কোথায় গেলে তুমি?”

রমলার কথা শুনতে শুনতে সুধাংশুবাবু ভাবেন, তবু মনে পড়েছে রমলার বরের কথা। আর তাস পেটানো! এখন সেই অ্যালিসের মত তাসের রাণীর দেশে চলে না গেলে হয় টিভির ভেতর দিয়ে। অ্যালিস যেমন গর্তের মধ্যে দিয়ে আজব দেশে পৌঁছে গেছিল তেমনি কেবলের তার বেয়ে সুধাংশুবাবুও টি.ভি.-র ভেতরের অদ্ভুত দুনিয়ায় এসে গেছেন।

রমলাকে আরেকবার ডাকার চেষ্টা করতে গিয়ে হঠাৎ করে লক্ষ করলেন সাদা কালো গুঁড়োগুলো একটা ফানেলের মত জায়গার মধ্যে দিয়ে যেমন হড়হড়িয়ে তেল বা জল গড়িয়ে যায় তেমনি করে গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। সুধাংশুবাবু সেদিকপানে একটু এগিয়ে গেলেন, হঠাৎ করে পা হড়কে ওই ঘূর্ণির মত জায়গাটায় পড়ে গেলেন। ওমনি আবার সেই স্লিপারে যেমন করে বাচ্চারা হড়কে যায় তেমন করে সড়সড় করে গড়িয়ে যেতে লাগলেন উনি। বেশ খানিকক্ষণ শোঁ শোঁ করে গড়িয়ে দুম করে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন শক্ত একটা মেঝেয়। পিটপিট করে চোখ মেলে দেখলেন, এ তো তাঁর নিজেরও ঘরটা।

“ইয়াহু!” বলে চিৎকার করে উঠলেন সুধাংশুবাবু। টি.ভি.-র ভেতর থেকে অবশেষে বেরোতে পেরেছেন। উফফ অবশেষে! কী সাংঘাতিক বিপদেই না পড়েছিলেন। ফের আরেকবার আনন্দে “হুরররররে” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। টি.ভি.-টার দিতে ফিরে তাকালেন, সাদা কালো গুঁড়ো ঝিরঝির করছে। এক্ষুনি এটাকে বন্ধ করতে হবে, তারপর কেজি দরে বেচে দিতে হবে ভেঙে টুকরো টুকরো করে। রিমোটটা কই? নির্ঘাৎ রমলা রিমোট নিয়েই ঘরের বাইরে খোকাকে ডাকতে গেছে।

—“রমলা! খোকা! বৌমা! শুনছো? ভোম্বল টুম্পা কই গেলি?”

আট

গায়ে একটা ঠ্যালা খেয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল সুধাংশুবাবুর। চোখটা খুলে দেখলেন সামনের টেবিলে রমলা চায়ের কাপ আর এক কাঁসি মুড়ি নামিয়ে রাখছে। মুড়ির ওপর দু’টো পেঁয়াজী। চোখটা রগড়ে ভাবার চেষ্টা করতে লাগলেন কী ঘটছে। রমলার গজগজানি কানে এল,

—“কী হল? ঘুমের ভেতর চ্যাঁচাচ্ছ কেন? একবার বাড়িশুদ্ধু লোককে ডাকছ, একবার বাচ্ছাদের মত হাঁকছ। বলি মাথাটা ঠিক আছে? আর টি.ভি.টা চালিয়ে রেখেই নাক ডাকাচ্ছে। কতবার বলেছি বাজ পড়লে টি.ভি. বন্ধ করবে। কী যে এত খবর দেখার নেশা, বুঝি না।

ওই ওই ওই কী জোরে বাজ পড়ল। একী টিভির ছবিটা এমন ঝিরঝিরিয়ে গেল কেন? বাজ পড়ে কিছু হয়ে গেল না তো! কী মুশকিল!”

এতক্ষণ ভেবলু হয়ে রমলার গজগজানি শুনছিলেন সুধাংশুবাবু। ‘ক্কড়ক্কড়াৎ’ আওয়াজে সম্বিত ফিরল। স্বপ্ন দেখছিলেন নাকি সত্যিই হচ্ছিল সব। সামনে তাকিয়ে দেখলেন রমলা এগিয়ে গিয়ে টি.ভি.-র এদিক ওদিক খুটখাট করছে। প্লাগের তার, কেবলের তার সব টি.ভি. থেকে টেনে খুলতে লেগেছে। সুধাংশুবাবুর চিৎকার করে চোখ বুজে ফেললেন,

—“রমলাআআ! টি.ভি.-তে হাত দিও নাআআআআ!’


মাস্টার - সুস্মিতা কুণ্ডু

অলংকরণ : সুমিত রায়

মাস্টার হওয়ার শখ যে কোনওকালে হরিহরের ছিল না এমনটা বলা ঘোর অন্যায় হবে। সেই হাফপ্যান্ট পরে পাঠশালে যাওয়ার বয়স থেকে বুকপকেটে যেমন মার্বেলগুলি, চকের টুকরো জমিয়ে রাখত তেমনি বুকপকেটের একটু ভেতর দিকে মানে ওই বুকের মধ্যেই কিছু শখ আহ্লাদও রঙিন মার্বেলের ভেতর জমা বুদবুদের মত জমে ছিল আর কী। কালে কালে বুকপকেটের ছ্যাঁদা গলে মার্বেলগুলো পড়ে রাস্তায় গড়িয়ে গেছে আর স্বপ্নগুলোও না জানি কোন চুলোয় বেপাত্তা হয়ে গেছে। তবু কুড়িয়ে বাড়িয়ে যে দু’চারটে মনের আনাচে কানাচে জমিয়ে রেখেছে, সেগুলোই রাতের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়ে, শুধোয়,

—“ওহে হরিহর কী করলে জীবনে বাপু? ইস্কুলের ওই ম্যাদামারা ফোর্থ ক্লাস স্টাফ হয়েই কাটিয়ে দিলে। ক্লাস ফুরোলে ঘন্টা মারা, প্লাস্টিকের জগে জল বয়ে আনা, ক্লাসে ক্লাসে রোলকলের খাতা পৌঁছে দেওয়া, বইয়ের তাকের, দেওয়ালের ম্যাপের ধুলো ঝাড়া, হেডস্যার মাধববাবুর জন্য বটকেষ্টর দোকানের কচুরি কিনে আনা, এই তো তোমার কাজ। শখ ছিল বাপের মত মাস্টার হবে। কত কত ছাত্রছাত্রী রিটায়ার করার পরও এসে হাটেবাজারে পেন্নাম ঠুকবে। বলবে, ‘স্যার আপনি ছিলেন বলেই আজ এই জায়গায় পৌঁছতে পারলাম।’ তুমি তাদের সবাইকে না চিনতে পারলেও তারা তোমায় ঠিক চিনে নেবে। তোমার চোখে থাকবে হাই পাওয়ারের চশমা, শ্বেতশুভ্র চুল, স্মিত হাসি! কিন্তু কোথায় কী! যেমন তোমার ছিবড়েমার্কা কপাল তেমন তোমার দড়কচামারা চেহারা। মাস্টার হওয়ার, ভক্তিচ্ছেদ্ধা পাওয়ার যুগ্যিই তুমি নও।”

স্বপ্নগুলোকে আজকাল দুঃস্বপ্ন লাগে হরিহরের। স্বপ্নরা তো কথা কইবে কেমন মিঠে গলায়, আলতো সুরে। কিন্তু এরা তো রীতিমত বেত উঁচিয়ে মাস্টারের ম’তই বকে, এমনধারা অপমান তো হেডস্যারও করেন না। রাতে আজকাল ভালো ঘুম হয় না হরিহরের। স্কুলে গিয়ে তাই সারাদিন কেমন যেন একটা ঝিমোনো ঝিমোনো ভাব থাকে। একদিন তো টুলে বসে বসে ঢুলতেই শুরু করেছিল। লাস্ট পিরিয়ডের ঘন্টা বাজাতেই ভুলে গেছিল, প্রায় মিনিট পনেরো পেরিয়ে যাওয়ার পর, সেভেন-বি এর ঘর থেকে কালিপদ স্যার বেরিয়ে এসে গাঁট্টা মেরে হরিহরেরই মাথায় ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছিল। খুব কান্না কান্না পেয়েছিল হরিহরের, কালিপদ মাস্টার এই সেদিন ঢুকল স্কুলে। হরিহর এই স্কুলে আছে সে প্রায় বছর তিরিশের কথা। সে কিনা এমন অপমান করল!

মফস্বলের এই সাদামাটা স্কুলটার শিক্ষক ছিলেন হরিহরের বাবা নিজেই। কিন্তু হরিহরের যখন মোটে বছর বারো বয়স তখন বাবা মা দু’জনেই দক্ষিণেশ্বরে পুজো দিতে গিয়ে পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। সেদিন থেকেই, হরিহর, কেয়ার অফ হরিহরই থেকে গেছে। শহরের দিকে পা বাড়ানোর সাহস আর ওর হয়নি। এই ময়নামতী গ্রামেরই এক পাড়াতুতো পিসির টুকরোটাকরা স্নেহ পেয়ে আর পিসির রান্না পুঁইডাঁটার চচ্চড়ি খেয়ে বড় হয়েছে। কালেকালে সে পিসিও পরলোকের পথ ধরল, হরিহর তখন সবে আঠেরোয় পা দিয়েছে। স্কুল ফাইনালের গণ্ডি বার তিনেকের চেষ্টাতেও ডিঙোতে না পেরে, পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়েছে। ময়নামতী গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন হেড মাস্টারমশাই সমরবাবু হরিহরের বাবার বন্ধুমানুষ ছিলেন। দয়াপরবশ হয়ে স্কুলের এই ফোর্থ ক্লাস স্টাফের চাকরিটা তিনিই দিয়েছিলেন, সে আজ প্রায় বছর তিরিশ আগেকার কথা। তার পর আরও দুবার হেডমাস্টার বদল হয়েছে, কিন্তু হরিহরের চাকরি টিকে গেছে এতগুলো বছর ধরে। তার একটাই কারণ, হরিহরের সারা অস্তিত্বের সাথেই জুড়ে আছে এই স্কুলটা।

ময়নামতী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার মাস্টারমশাই ছিলেন হরিহরের বাবা, হরিহর দে। হ্যাঁ হরিহরের বাবার নাম, হরিহর। ব্যপারটা একটু অদ্ভুত লাগছে, নয় কি? হরিহর দে তাঁর একমাত্র ছেলের নাম রেখেছিলেন প্রদীপ। কিন্তু বাবা মা দুজনে একসাথে প্রদীপকে অনাথ করে চলে যাওয়ার পর সবাই বেশিরভাগ সময় ‘হরিহরের ছেলেটা’ বলে ডাকতে ডাকতে কখন যে সেটা ‘হরিহর’ই হয়ে গেছে ও নিজেও জানে না। বাবার স্কুলেই পড়াশোনা করছিল, কিন্তু বরাবরই পড়াশোনায় তেমন মাথা ছিল না ওর। লাল কালিওয়ালা রেজাল্ট দেখে মা রাগ করে বলত,

—“মাস্টারের ঘরে জন্ম হয়েও গোমুখ্য হয়েই থাকবে ছেলেটা।”

বাবা বলত,

—‘আহা! পড়াশোনা শিখলেই কি প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায়?’

আজ এই কালিপদদের মত শিক্ষকদের দেখলে পরে হরিহরের বড্ড বাবার কথা মনে পড়ে। লোকে যে ওর আসল নামটা ভুলে বাবার নামেই ডাকে সেটা ভেবে বেশ গর্ব গর্ব লাগে হরিহরের।

***

আর পাঁচটা দিনের মত আজও স্কুলে এসেছে হরিহর। পুঁইশাক কুমড়ো আর চুনোমাছ দিয়ে রান্না তরকারি আর আগের দিনের বাসি পান্তাভাত খেয়ে। টিফিনের আগে অব্দি সবই ঠিকঠাক চলছিল। টিফিন শেষের ঘন্টা দিয়ে টুলে বসে ঝিমোচ্ছিল, হঠাৎই একটা চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে এল হেডস্যারের ঘরের দিক থেকে।

—“সত্যি করে বল কোথায় রেখেছিস! আজ হাতেনাতে ধরা পড়েছিস, কিছুতেই ছাড়ব না তোকে, ছোটোলোকের জাত...”

পড়ি কী মরি করে দৌড় লাগায় হরিহর। গিয়ে দেখে হেডস্যারের ঘর নয়, ওই ঘরের লাগোয়া ছোটো ঘরটা থেকে আওয়াজটা আসছে। জিনিসপত্রে ঠাসা ঘরটায় যত রাজ্যের ফাইলপত্র, চক ডাস্টার, পরীক্ষার খাতা, আর একটা আলমারিতে গল্পের বই আছে। তার মাঝে একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার। ছোটো স্কুলের ততোধিক ছোটো লাইব্রেরি। ছাত্রদের তাই ফ্রি পিরিয়ডেই বই দেওয়া হয় শুধু। ক্লাসের কেউ একজন বই নিয়ে গিয়ে ক্লাসে জোরে জোরে পড়ে শোনায়, বাকিরা শোনে। বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কোনও নিয়ম নেই।

ঘরের একটা চেয়ারের হাতল ধরে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে, হরিহর চেনে ওকে। বলাই সোরেন, ক্লাস সেভেন-বি এর ছাত্র। খুব গরিব, ময়নামতী গ্রামের বাগদিপাড়ার যে ক’জন আসে স্কুলে পড়তে, ও তাদের একজন। তবে বাকিদের মত ও যে মিড-ডে মিলের লোভে আসে না সেটা হরিহর বোঝে। কোনওদিনও চেয়ে খাওয়ার নেয় না ছেলেটা। বলাইয়ের হাতের দিকে চেয়ে কেঁপে ওঠে শরীরটা হরিহরের। টেবিলের ওপর চিৎ করে পাতা কচি হাতদুটো, তার ওপর লম্বা লম্বা লাল লাল দাগ। সামনে লিকলিকে একটা বেত নিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে কালিপদ মাস্টার।

—“খুব ফাঁকতাল পেয়েছিস না? টিফিনের পর সবাই যে যার ক্লাসে, হেডস্যারও ক্লাস নিতে গেছে। সেই ফাঁকে দরজা খোলা পেয়ে, এই কাণ্ড! পড়াশোনার জন্য না ছাই, মিলের লোভে সব জুটেছে এসে যত। প্রায়ই দেখি একটা দু’টো করে বই গায়েব!

কী করিস বইগুলো চুরি করে শুনি? বেচে দিস না কি?”

বাতাস কেটে ফের বেতটা নেমে আসতে লাগল হাতদুটোর ওপর। হরিহর আর থাকতে না পেরে ঘরের ভেতর ছুটে ঢুকে এল। কালিপদ মাস্টারের হাত থেকে বেতটা এক হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল,

—“মাস্টারবাবু কী করছেন? অতটুকু বাচ্চা! ও চুরি করেনি, ও চুরি করেনি। ওকে মারবেন না ও’রকম করে।”

ফোর্থ ক্লাস স্টাফের এই আচরণে রাগে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে কালিপদ বেতটা চালাতে থাকে হরিপদর ওপর। প্রবল ধাক্কায় ও ছিটকে পড়ে দরজার পাল্লার ওপর। লোহার কড়াটায় মাথাটা ঠুকে রক্ত বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে আশেপাশের ক্লাসের আরও কয়েকজন মাষ্টারমশাই আর বেশ কিছু ছাত্র এসে জড়ো হয়েছে। কালিপদর সামনে কুঁকড়ে পড়ে থাকা হরিহরকে ক’জন ধরে সরিয়ে নিয়ে যান। হেডস্যারও এসে চিৎকার করেন,

—“কালিপদবাবু থামুন! কী করছেন কী!”

এক লহমায় যেন ঝড় বয়ে যায় শান্ত গ্রাম্য স্কুলটায়। সেইদিনের মত হাফছুটি দিয়ে হেডস্যার সবাইকে বাড়ি যেতে বলেন। আরও দু’জন মাস্টারমশাইয়ের সাথে হরিহরকে বাড়ি পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন। তাঁদের কাঁধে ভর দিয়ে এগোনোর সময় হরিহর অপ্রকৃতিস্থর মত বিড়বিড় করতে থাকে, ‘পড়াশোনা শিখলেই প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না’। হেডস্যার মাধববাবু, কালিপদ আর বলাই সোরেনকে নিয়ে বসেন নিজের ঘরে।

—“হ্যাঁরে বলাই সত্যি করে বল তুই বই চুরি করেছিস কি না? সত্যি বললে কোনও শাস্তি হবে না তোর, আমি বলছি।”

বছর বারো তেরোর ছেলেটা এতক্ষণ ঘাবড়ে ভয়ে থম মেরেছিল, এবার হাঁউমাঁউ করে কেঁদে বলে ওঠে,

—“না গো না হেডস্যার আমি কিছু করিনি। সেদিন কেলাসে এই বইটা পড়ে শোনাচ্ছিলো তো। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই ঘন্টা পড়ে গেসল, আর আমার গল্পের শেষটা জানতে বড্ড মন হচ্ছিলো। তাই আজ টিফিনের পর বাইরে থেকে দেখনু বইয়ের আলমারিটা খোলা। তখনই এসে বইটা নিয়ে পড়ছিনু, কালি মাস্টারমশাই ভাবল কি না আমি চুরি...”

লাল লাল হয়ে যাওয়া হাতদুটোয় করে বইটা এগিয়ে ধরে বলাই,

‘টোয়েন্টি থাউজাণ্ড লিগস আণ্ডার দ্য সি’-এর বাংলা অনুবাদ।

কিছুক্ষণ বইটার দিকে তাকানোর পর চোখ তুলে কালিপদর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান মাধববাবু। ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে আছে। বি. এড পাশ করে, এস. এস. সি. পাশ করে ছেলেটা অঙ্কের মাস্টারের পদে যোগ দিয়েছে বছরখানেক হল। কলকাতার ছেলে, সরকারি চাকরির মায়ায় এতদূরে এসে রয়েছে। হপ্তাশেষে বাড়ি যায় মনে হয়। এখনকার ছেলেরা যেমন হয় তেমনই। শিক্ষকতা আর পাঁচটা পেশার মতই একটা পেশা, এমনটাই মনে হ’ত এর ব্যবহার দেখে মাধববাবুর। এই মুহূর্তে ছেলেটার নিচু মাথা আর আহত চোখের দৃষ্টিটা যদিও অন্য কথা বলছে। গলাটা ঝেড়ে মাধববাবু জিজ্ঞাসা করেন,

—“ঠিক কী হয়েছে বলবে কালিপদ? কেন তোমার মনে হ’ল বলাই বই চুরি করেছে?”

মৃদুস্বরে কালিপদ উত্তর দেয়,

—“অ্যানুয়াল পরীক্ষাগুলো সব শেষ হওয়ার পর দিন দশেক ছুটি ছিল। রেজাল্ট বেরনোর পর নতুন ক্লাস শুরু হ’ল। তার ক’দিন পর বই মেলাতে গিয়ে দেখি বেশ ক’টা বই গায়েব। টেনিদা সমগ্র, ফেলুদা সমগ্র, রবীন্দ্র রচনাবলীর দু’টো খণ্ড, শার্লক হোমস অনুবাদ, গোটা কয় পুরনো পূজাবার্ষিকী...”

হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন মাধববাবু...

—“থাক থাক আর বলতে হবে না বুঝতে পেরেছি। ইসসস দোষটা আমারই... আমার নাতি মানে মেয়ের ছেলেটা পরীক্ষা শেষ হ’তে ক’দিনের জন্য এসেছিল আমার কাছে। বই পড়তে ভালোবাসে বলে ছেলেটা আমিই স্কুল লাইব্রেরি থেকে এই বইগুলো নিয়ে গেছিলাম। তখন স্কুলে ক্লাস বন্ধ ছিল, শুধুমাত্র অফিসটাই খোলা ছিল। আমি তাই বইগুলো এমনিই নিয়ে চলে গেছিলাম। তুমি লাইব্রেরির দায়িত্বে, ভেবেছিলাম স্কুল খুললে তুমি এলে, বলে দেব। কিন্তু বইগুলোও ফেরত আনতে ভুলে গেছি আর তোমাকে জানাতেও। বড্ড ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেল, আমারই জন্য!”

বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে টেবিলের দু’প্রান্তে বসে থাকেন দু’জন শিক্ষক।

***

গত চারদিন ধরে স্কুলে আসছে না হরিহর, কালিপদ মাস্টারেরও রেজিস্টারের খাতায় নামের পাশের খোপটায় সই নেই ক’দিন। কী হ’ল কে জানে দুজনের। মাধববাবু একে তাকে জিজ্ঞাসা করে সদুত্তর না পেয়ে, এবং কালিপদর মোবাইল নাম্বারও বারবার ট্রাই করে না পেয়ে, চিন্তায় পড়লেন। শেষে শনিবার হাফছুটির পর সেভেন বি-এর বলাই সোরেনকে নিয়ে হরিহরের বাসার দিকে রওয়ানা দিলেন। একতলা বাড়ি, সামনে খানিকটা বাগান, বাঁশের বাতা চিরে বেড়া বানানো। ক’টা আম জাম গাছ আর গুচ্ছের পুঁইশাকের মাচা। নড়বড়ে দরজাটার কড়া নেড়ে হাঁকেন,

—“হরিহর আছো না কি?”

কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে যে বেরিয়ে আসে তাকে দেখে অবাক হয়ে যান মাধববাবু।

—“কালিপদ তুমি?”

চিনেমাটির তিনটে কাপে লিকার-টি ঢেলে একটা স্টিলের থালায় বসিয়ে নিয়ে আসে হরিহর, আরেকটা গ্লাসে আধ গ্লাস দুধ। চা বানানোরই গুঁড়ো দুধ গোলা মনে হয়, বলাইয়ের জন্য। মাধববাবু লক্ষ করেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই হরিহরের মুখে শিশুর মত হাসি ঝরে পড়ছে। কালিপদর মুখখানাও উৎসাহে উজ্জ্বল।

চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন,

—“কী ব্যাপার? তোমাদের দু’জনেরই কামাই? সব ঠিক আছে তো? হরিহর তোমার শরীর...”

তড়বড়িয়ে হরিহর বলে,

—“না গো হেডস্যার, আমার শরীর ফাসটোকেলাস আছে। জ্বর এসেছিল কিন্তু এই কালিপদবাবু স্যার ওষুধ খাবারদাবার সব দিয়ে গেলেন। তারপর এই পরশু আর কাল দু’দিন আমরা কলকাতা ... দাঁড়ান দাঁড়ান আপনাকে দেখাই...”

বলে হরিহর উঠে দৌড় লাগায় পাশের ঘরে। ওর কাণ্ডকারখানা দেখে হাসি পেয়ে যায় মাধববাবুর।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে হেডস্যার মাধববাবু তাকান কালিপদর দিকে। কালিপদ মৃদু স্বরে বলে ওঠে,

—“আসলে স্যার সেদিনের ঘটনার পর, হরিহর যখন প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় ‘পড়াশোনা শিখলেই প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না’ বলতে থাকে তখনই কী যেন একটা হয়ে গেছিল আমার মাথার ভেতরটায়। বলাইয়ের ফুলে ওঠা লাল হাতদুটো বারবার চোখে ভাসছিল, অপরাধবোধে ভুগছিলাম। সন্ধে বেলাতেই ছুটে আসি হরিহরের বাড়ি, এর ওর তার থেকে সন্ধান করে। জ্বরে পড়েছিল মানুষটা, শিগগিরই সেরে ওঠে যদিও। তারপরেই ...”

হরিহর দু’হাতে দুটো বড়বড় চটের ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে, মাঝপথে কথা থামায় কালিপদ। উঁকি দিয়ে মাধববাবু দেখেন ব্যাগদুটো বইয়ে ভর্তি।

—“স্যার আমি একা মানুষ, সাতকূলে কেউ নেই। থাকি এই বাপ-পিতেমো’র ভিটেয়, যাই হোক কচু-ঘেঁচু রেঁধে পেট ভরিয়ে নিই। স্কুল থেকে পাওয়া মাইনের প্রায় সবটাই জমে যায়। জানেন স্যার কলকাতা শহরে বাবা মা গাড়িচাপা পড়ে মরে যাওয়ার পর আর কোনওদিন যেতে সাহস হয়নি। খালি মনে হ’ত চারপাশ থেকে সব দত্যি এসে পিষে দেবে। এই কালিপদ মাস্টার কত যত্ন করে হাত ধরে ধরে আমায় কলকাতা নিয়ে গেছে। সে একটা রাস্তার দু’পাশে কত বইয়ের দোকান, ছোটো বড়ো মাঝারি। কত ছেলেমেয়ে বই কিনছে, পড়ছে। আমরা দু’জন মিলে এই বইগুলো কিনে এনেছি ওখান থেকে।”

হতবাক হয়ে শুনতে থাকেন মাধববাবু। বলাই সোরেন ততক্ষণে গুটিগুটি পায়ে চটের ব্যাগ থেকে একটা নতুন বই বার করে তার পাতাটা খুলে মুখ ডুবিয়ে নতুন বইয়ের গন্ধ নিচ্ছে বুক ভরে।

—“হরিদা এই এ্যাতগুনো বই সব তোমার?”

—“না রে না পাগলা! আমি অত বই যদি পড়তুম তবে আমিই তোদের মাস্টারমশাই হতুমনি? ওগুলো সব তোদের জন্য।”

বলে হাসতে থাকে হরিহর।

কালিপদ বলে,

—“স্যার হরিদা এই বাড়িতে একটা লাইব্রেরি বানাতে চায়। আমি ওকে যথাসাধ্য সাহায্য করছি। স্কুলের পুরনো যে বাতিল চেয়ার বেঞ্চ টেবিলগুলো আছে ওগুলো যদি পাওয়া যেত, তাহলে খুব ভালো হ’ত। বইয়ের আলমারি আমার কলকাতার বাড়িতে বেশ ক’টা আছে। ওগুলো আমি আনবার ব্যবস্থা করছি শিগগিরই। আপনি যদি একটু অন্য মাস্টারমশাইদেরও বলেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে।”

—“হেডস্যার আমরা আবার বই কিনতে যাব সামনের হপ্তায়। আপনি যাবেন আমাদের সাথে? এই হপ্তায় আমার শরীরটা একটু দুর্বল ছিল তো তাই কালিপদ স্যার আর যেতে দিলেন নে।”

মেঝেয় থেবড়ে বসে বলাইয়ের সাথে বইগুলো বার করতে করতে বলতে থাকে হরিহর।

—“বলাই, নিমপাতা জোগাড় করবি, শুকিয়ে বইয়ের আলমারিতে রাখব নইলে পোকায় কাটবে। তোর কেলাসের, অন্য কেলাসের সবাইকে বলবি আসতে আমার লাইব্রেরিতে।

না না আমার লাইব্রেরি নয়, এটা ‘প্রদীপের লাইব্রেরি’। বাপ-মার দেওয়া নামটা একটা কাজে লাগুক। বলেন স্যার? ভালো হবে না?

কালিপদ স্যার আমার নামের ইতিহাস শুনে বললে এই নামটি দিতে”

লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে হরিহর ওরফে প্রদীপ অথবা প্রদীপ ওরফে হরিহর।

মাধববাবু পাশে বসে থাকা কালিপদর কাঁধে হাতটা রেখে, আলতো চাপ দেন। কালিপদ তখন অপলক দৃষ্টিতে দেখছে হরিহর, বলাই আর বইগুলোকে।

জীবন যে কাকে কখন কোন শিক্ষা দিয়ে প্রকৃত শিক্ষক বানিয়ে তোলে, তা এতদিন ধরে শিক্ষকতা করার পর আজ বুঝি অনুধাবন করলেন ‘ময়নামতী উচ্চ বিদ্যালয়ের’ হেডমাস্টারমশাই।

মণিময় দারোগা


অলংকরণ - সুমিত রায়
(১)

এলেম আছে বটে মণি দারোগার! আশেপাশের পাঁচ-সাতটা গাঁয়ের লোক একবাক্যে তাঁর নামে সেলাম ঠোকে। মণি দারোগা যাকে বলে এক্কেরে নয়নের মণি সকলের। হ’বেন নাই বা কেন! যবে থেকে তিনি বটুকপুর থানার অফিসার-ইন-চার্জ হয়েছেন তবে থেকে এ তল্লাটে আর একটাও চুরি ডাকাতি হয়েছে বলে দেখাতে পারবে কেউ? গেরস্ত মানুষেরা দরজা জানালা হাট করে খুলে নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমোন। একটা স্টিলের গেলাস কিংবা ছেঁড়া গামছাটুকুনও চুরি হয়না।

বটুকপুরের দোকানগুলোতেও আজকাল আর তালা চাবি বিক্রি হয় না। সেই সেবার মদন চাটুজ্জের সদ্য বিয়ে হওয়া ছোটোজামাই কী বিপদেই না পড়ল। অষ্টমঙ্গলায় মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছে জোড়ে, সেখান থেকে সটান যাবে বর্ধমান। ফেরার দিন হ’ল চিত্তির। সাধারণত বড় বড় সুটকেস তো সব বাসের মাথাতেই তুলে দেয় কন্ডাকটার-রা। এদিকে সুটকেসের ছোট্ট পিচ্চি তালাটা গেছে ভেঙ্গে। দোকানে দোকানে ঘুরে মদন চাটুজ্জে তালা আর পায়না। শেষমেষ নতুন জামাইকে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা সুটকেস নিয়েই বর্ধমান যেতে হ’ল।

নিন্দুকে অবশ্য বলে মণিময় দারোগা তন্ত্রমন্ত্র জানেন, তাঁর নাকি পোষা ভূত আছে একগণ্ডা। সেই ভূতেরাই তো সব চোর ডাকুদের শায়েস্তা করে রাখে। যেমন মণিময় মুকুজ্জে দারোগা হয়ে আসার মাস খানেক পরের কথাটাই ধরুন না। রামাপদ চোর তার সিঁধকাঠিটি নিয়ে হরনাথ মল্লিকের গোয়াল ঘরের মাটির দেওয়ালে ঝুরঝুর করে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছিল সবে। হরনাথ সম্পন্ন কৃষক, সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ মানুষ। তিন চারটে জার্সি গরু পোষা রয়েছে, দাম কম নয় সেগুলোর। গোয়ালঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বাড়ির মধ্যে চলে যাওয়ার পথ রয়েছে। রামাপদ তাই সিঁধ দিয়ে ভেতরে ঢুকে তারপর গরু নিয়ে গোয়ালঘরের দরজা খুলে পালানোর মতলব ভেঁজেছিল। কিন্তু যেই না আদ্ধেকটা শরীর ফুটো দিয়ে গোয়ালের ভেতর গলিয়েছে ওমনি ওপাশ থেকে কে যেন কানের কাছে বলে উঠল,

-“ছ্যা ছ্যা রামাপদ শেষমেষ তুমি গরু চুরি করবে! তোমার বাবা কৃষ্ণপদ কত বড় চোর ছিলেন, জমিদারের গিন্নির গলার সীতাহার চুরি করে তোমার মা-কে উপহার দিয়েছিলেন। তোমার ঠাকুর্দা হরিপদ, ইংরেজ দারোগার কোমর থেকে পিস্তল চুরি করে শ্রীপতি ডাকাতকে দশটা মোহরের বিনিময়ে বেচে দিয়েছিলেন। এইসব নমস্য ব্যক্তিদের বংশধর হয়ে তুমি শেষটায় গরু চুরি করবে?”

আদ্ধেক শরীর নিয়ে ঝুলন্ত ত্রিশঙ্কু অবস্থায় কেউ যদি অমন কানের পাশে ফিসফিস করে, তাহলে অতি বড় ঠাণ্ডা মাথার চোরেরও পিলে চমকে যেতে বাধ্য! রামাপদ তো কোন ছার! ভয়ের চোটে চেঁচিয়ে উঠল,

-“ক্কে কে ওখানে? কে কথা কইল?”

কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে ‘কে’-এর পর বাকিটা শুধু ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরলো। তারপর শুরু হ’ল বেদম কাশি। এদিকে রাতদুপুরে ওরকম কাশি আর ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে ভড়কে গিয়ে গোয়ালঘরের কোমলি ধবলি আর হেবলি, তিন জার্সি গাই মিলে গলার ঘন্টা প্রবল বেগে নাড়িয়ে, পা দাপিয়ে সে এক মহা শোরগোল শুরু করল। তাদের ক্ষুরের ঠোকায় গোয়ালঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা গোবর খানিক ছিটকে এসে পড়ল রামাপদর মাথায়। রামাপদ কোনওমতে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে সিঁধের গর্তটা থেকে গোয়ালঘরের বেরোতে চেষ্টা করতে গেল। গা ভর্তি তেলের গুণে পিছলে খানিকটা বেরলেও মাটি লেগে গিয়ে তেলতেলে ভাবটা উবে গেল আর হেথাহোথা বেশ ভালোরকমই ছড়ে গেল, ছাল চামড়া উঠে গেল। সেই অবস্থাতেই কোনওমতে ছুটতে শুরু করল রামাপদ। যতই ছুটুক না কেন একটা বিটকেল ‘হাঃ হাঃ হাঃ’ করে অট্টহাসিও যেন ওর পেছন পেছন ছুটতে লাগল। বাড়িতে ঢুকেই দরজায় খিল এঁটে, কান অব্দি কাঁথামুড়ি দিয়ে, শুয়ে পড়ল। তারপর তো দিন আষ্টেক আর কাজেই বেরোতে পারেনি বেচারা। খালি মনে হত যেন সেই অট্টহাসিটা পেছনে তেড়ে আসছে।

(২)

শুধু কি রামাপদ চোর? মাধব ডাকাতও কি ভুক্তভোগী নয় নাকি? এমনিতে মাধব বেচারা ডাকাতির বিজনেসে বড় একটা নাম করতে পারেনি। তবে মাধবের ওপর পূর্বপুরুষদের নামের বোঝা ছিলনা, রামাপদ চোরের মত। মাধবের পূর্বপুরুষরা আবার কলকাতা শহরের সব এক একটা আস্ত গাঁটকাটা, পকেটমার। মাধবেরও হাতে খড়ি হয়েছিল পকেট কাটাতেই। হাতের আঙুলের ফাঁকে আধখানা ব্লেড রেখে নরম লাউয়ের ওপর কাপড় জড়িয়ে, তাইতে দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করেছিল মাধব। লাউয়ের খোলায় একটা আঁচড়ও পড়ত না এমনই নিপুণ হাত হয়েছিল মাধবের।

তা একদিন শ্যালদা স্টেশনে মাধব গেল পৈতৃক ব্যবসায় হাতেখড়ি করতে। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু নির্জনে লাউয়ের খোলায় মকশো করা আর ওই ভিড়ে ঠাসা স্টেশনে, হকারের ঠেলা, ঠেলাগাড়ির গুঁতো, কুলির ধাক্কা খেয়ে ব্লেড চালানো আরেক জিনিস। একজন নাদুসনুদুস শেঠজি টাইপের লোকের হাতের আঙ্গুলে বেশ চকমকে পাথর বসানো সোনার আংটি, গলায় হার দেখে, পকেটে মোটা মানিব্যাগ থাকবে এই আশায়, আঙুলের ফাঁকে ব্লেডটা বাগিয়ে ধরে এগিয়েছিল পা টিপে টিপে। এমন সময় পেছন থেকে এক কুলি এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ঘাড়ে, মাধবও ওমনি ছিটকে শেঠজীর বদলে পাশের মুশকোমত ষণ্ডামার্কা একটা লোকের ঘাড়ে পড়ল। হাতের ব্লেডটায় খোঁচা লেগে লোকটার সার্টিনের শার্টটা “ফ্যাঁঅ্যাঁসস্” করে আর্তনাদ করে অনেকটা ফেঁসে গেল। জামা তো ফাঁসলই, সেই সাথে ফেঁসে গেল বেচারা মাধব। লোকটা ঘুরে কপাৎ করে চেপে ধরল মাধবকে। তারপর যা হওয়ার তাই হ’ল, জনতা জনার্দন উত্তম মধ্যম পিটিয়ে, হাতের সুখ করে নিল।

কোনওমতে পকেটমারদের আড্ডায় ফিরে আসার পর মাধবের জীবিকাতুতো ভাই বেরাদররা তো বটেই, এমনকি মাধবের নিজের বাপ-কাকা অব্দি বেজায় হাসি ঠাট্টা করল ওকে নিয়ে। ওর নামই দিয়ে দিল সবাই “তালকানা মেধো”। তখনই মেধো মানে মাধব প্রতিজ্ঞা করেছিল এই পকেটমারীর অপমানের লাইনে থাকবে না মোট্টে আর। না না তাই বলে সৎ পথে করে কম্মে খাবে এতটাও বড় শপথ করেনি। কথায় বলে না ‘মারি তো গণ্ডার/ লুটি তো ভাণ্ডার’, তাই মেধো ঠিক করল ডাকাতির দল খুলবে। হ্যাঁ! ওইটে ভারি সম্মানের কাজ, লোকের পিটুনি খাওয়ার চেয়ে লোককে পিটুনি দেওয়ার সুযোগ বেশি। রণ-পা পরে হাঁটাটাও বেশ জম্পেশ হবে। আর ওই ‘হারে রেরে রেরে’ করে মশাল বল্লম নিয়ে তেড়ে যাওয়াটার মধ্যেও একটা বেশ ইয়ে মানে বীর বীর ব্যাপার আছে।

কিন্তু কলকাতা শহরের বুকে ডাকাতদল করাটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে, মাধব ভুলবশতঃ মার খেলেও বুদ্ধি যে একেবারেই নেই তা নয়। তাই চলে এল পিসির বাড়ি বটুকপুরে। এখানে দু’চারটে ছিঁচকে চোরের সাথে দোস্তি করল। তাদের একটু কলকাত্তাইয়া চুরি ডাকাতি পকেটমারির গল্প শুনিয়ে বেশ একটু সমীহ আদায় করল। তারপর জনা চারেক চ্যালা হ’তেই ডাকাতদল খুলল। এদিকে ডাকাতদল খোলায় পিসি ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে মাধবকে দিল ঘর থেকে বার করে। তা ভালোই হয়েছে, ডাকাতদলের সর্দার পিসির বাড়িতে থাকে, পিসির পান সেজে দেয়, পুকুর থেকে জল বয়ে এনে দেয়, প্রয়োজনে আলু পটল ঝিঙে কেটে দেয় এমনটা কেউ শুনেছে কখনও? তার চে’ জঙ্গলের মধ্যে পোড়ো মন্দিরে বাস করা বেশি ভালো।

(৩)

তা দলবল গড়ার পর মন্দ ডাকাতি হচ্ছিল না। বিশু গাইনের যাত্রাদলের তাঁবুতে হামলা করে বেশ কিছু জরি চুমকি বসানো রাজা মন্ত্রীর পোশাক বাগিয়েছিল। সেগুলো মাঝেসাঝেই অঙ্গে গলিয়ে বসে থাকে মাধব। বেশ কেষ্টবিষ্টু লাগে নিজেকে। তারপর সেবার দুর্গাপুজোর ভাসানের পরেরদিন চণ্ডীমণ্ডপে হামলা করে প্যাণ্ডেলের বাঁশ কাপড় ত্রিপল সব খুলে এনেছিল। যদিও মাধবের ডানহাত ভেনো একবার বলার চেষ্টা করেছিল, এইসব ডাকাতিগুলোর সাথে ছিঁচকে চুরির আর পার্থক্যটা কোথায়! কিন্তু মাধব তাকে এক হুঙ্কার দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল।

এতবড় মূর্খ যে ডাকাতি আর ছিঁচকে চুরির মধ্যে তফাৎ বোঝে না হতভাগা। ইচ্ছে করে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দল থেকে বার করে দেয়, কিন্তু নেহাতই দলের সবচেয়ে করিৎকর্মা ডাকাত ওই ভেনোটাই কিনা। আরে বাবা এই যে ডাকাতি করতে বেরনোর আগে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে মা কালীর ছ’ইঞ্চির বাঁধানো পটের সামনে যে বলি দেয়, এটা কোনও ছিঁচকে চোর করে? বলির ব্যাপারেও কত ফ্যাঁকড়া ভেনোর, বলে কিনা নরবলি না হোক নিদেনপক্ষে একটা পাঁঠাবলি হোক। মাধব কি মাংসের দোকানের কসাই নাকি যে পাঁঠা কাটবে। মাধব বিশুদ্ধ বৈষ্ণবমতে ডাকাত তাই সব্জি বলি দেয়। ঝিঙে চিচিঙে কুমড়ো আখ সব ওর হাতের কাঠারির এক কোপে দু’টুকরো হয়ে যায়।

যাকগে এভাবে মাধব আর মাধবের দলের বৈষ্ণবমতে নিরামিষ ডাকাতি ভালোই চলছিল কিন্তু গোল বাঁধল মণিময় দারোগা এখানে আসার কিছুদিন পরেই। অনেকদিন ধরেই মাধব ডাকাতির প্ল্যান ছকে রেখেছিল কালুরাম কলুর তেলের ঘানিতে। বেশ ক’টা জারিকেন ভর্তি সর্ষের তেল ডাকাতি করে আনতে পারলে কাজে দেবে। যদিও ভেনো এখানেও বাগড়া দিয়ে বলেছিল যে,

-“সর্ষের তেল কি ডাকাতি করার মত বস্তু?”

মাধবও খেঁকিয়ে উত্তর দিয়েছিল,

-“কেন সর্ষের তেল কোন কাজে লাগেনা শুনি? রান্না করতে, গায়ে মাখতে, প্রদীপ জ্বালাতে...”

-“নাকে দিয়ে ঘুমোতে...” মাধবের কথার মাঝেই ফোড়ন কেটেছিল ভেনো।

মাধব এইসব ছোটোখাটো বাধাতে পাত্তা না দিয়ে বলির কাজে মন দিয়েছিল। স্নান টান সেরে শুদ্ধ পট্টবস্ত্র পরে কপালে ইয়া লম্বা সিঁদুরের তিলক কেটে বলির কাঠারি নিয়ে রেডি হয়েছে। সামনের বেদীতে একটা একটা করে সব সব্জী সাজানো।

‘ওম হুম হ্রিং ক্রিং ট্রিং’ বলে কাঠারিটা তুলেছে, ওমনি কে যেন বলে উঠল,

-“দেখিস মাধব, লাউ কাটতে গিয়ে যেন আবার কারোর জামা কেটে ফেলিসনি!”

মাধব তো ভয়ানক রকমের হতভম্ব হয়ে ইতিউতি দেখতে লাগল, সব্বার আগে দেখল ভেনোর দিকে। নাহ্! সে ব্যাটা তো চুপটি করে বসে বসে নখ কামড়াচ্ছে। বাকি দুই মক্কেল গজা আর ভজা বসে বসে ঝিমোচ্ছে সব্জির ঝুড়ি নিয়ে। এক একটা করে সব্জি এগিয়ে বেদীতে রাখে, আর মাধব ঘ্যাঁচ করে কাটে। বেদীতে একটা কুমড়ো রেখে বসেছিল দু’জন। মাধবের কাঠারি মাঝ আকাশে থেমে যেতে গজা-ভজা বলে উঠল,

-“কী হ’ল সদ্দার! কী হ’ল সদ্দার!”

মাধব নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবল নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে, বলল,

-“কিছু নয়! লাউটা সরিয়ে একটা আখ বসা দেখি।”

গজা-ভজা বলে উঠল,

-“লাউ কোথা সদ্দার? কুমড়ো তো! তোমার পিসির বাড়ির মাচা থেকেই তো তুলে আনলুম।”

-“অ্যাঁ কী সব্বোনাশ করেছিস! পিসি তো এবার আমাকেই কুমড়োর ছক্কা বানিয়ে ছেড়ে দেবে রে!”

মাধব দাঁত কিড়মিড় করে ফের কাঠারি তোলে, সামনে চেয়ে দেখে কুমড়ো কই? সবুজ চকচকে একটা লাউ সামনের বেদীতে। আর কানের কাছে ফিসফিসিনি আওয়াজ,

-“কাঠারি দিয়ে কাটবি মেধো নাকি আধখানা ব্লেড আনব?”

এইবার মাধব কাঠারি ফেলে এক লাফে বেদী থেকে তিন হাত দূরে সরে গেল। সেবারের মত বলি ক্যানসেল হয়ে গেল। মাধব ঘামতে ঘামতে পিসির বাড়ি গিয়ে জ্বর এসেছে বলে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল, পিসির চ্যাঁচানি শুনতে শুনতে।

-“কোন অলপ্পেয়ে হতচ্ছাড়া ড্যাকরা অমন নধর কুমড়োখানা মাচা থেকে তুলে নিয়ে গেল! পোড়ারমুকো! ওই কুমড়ো তোর পেটে সইবে না অনামুখো!”

তারপর থেকেই আর ডাকাতি করতে বেরোতে সাহস হয় না মাধবের। মাধবের দলের আরেক চ্যালা বগলা হ’ল গিয়ে গুপ্তচর। বগলা খবর আনল নতুন দারোগা মণিময় নাকি ভূত পোষেন। আর সেই ভূত বগলদাবা করে নিয়েই নাকি তিনি বটুকপুরে এসেছেন। এই ভূতই নাকি বটুকপুরের সব চোর ডাকাতদের অবস্থা টাইট করে রেখেছে।এই খবর পাওয়ার পর ভেনো ভজা গজা অনেক করে বললেও খুব একটা লাভ হয়নি। মাধব কিছুতেই আর বলিও দেয়নি, ডাকাতিও করতে বেরোয়নি।

(৪)

রামাপদ, মাধব, মাধবের স্যাঙাতরা, আরও এদিক ওদিকে গাঁয়ের চোরেরা সব বেজায় নাজেহাল অবস্থায় দিন কাটাতে লাগল। যেই কেউ চুরিচামারি বা অন্যায় কোনও কাজ করতে যায় ওমনি কানের কাছে সেই ফিসফিস। ওদিকে মণিময় দারোগা দিনদিন একটার পর একটা পদক বাগাচ্ছেন পুলিশ বিভাগ থেকে ওঁর অসামান্য কর্মকাণ্ডর জন্য, আর ভুঁড়িটিও সেই সাথে বাগাচ্ছেন। একেই বলে ‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।”

এই চোর ডাকাতদের দলবলের মধ্যে ভেনো বেশ বুদ্ধি ধরে, আট ক্লাস অব্দি পড়ালেখা করেছে। ভেনো চুপিচুপি বগলাকে ডেকে বলল,

-“হ্যাঁরে ব্যাটা বগলা! তোর হঠাৎ কেন মনে হল যে মণিময় দারোগা ভূত পোষে? ভূত কি গরু না ছাগল? ভূত দুধ দেয় গোবর দেয় যে লোকে পুষবে? আর পুষবে বললেই হ’ল? ভূত পাবে কোথায়? সে কি হাটে বাজারে পাঁচ হাজারটাকায় জোড়া কিনতে মেলে? যদিও বা মেলে, সে ভূত মানুষের পোষ মানবে কেন? উল্টে মানুষেরই ঘাড় মটকে মেরে ফেলবে।”

ভেনোর এত প্রশ্নে বগলা বেজায় রেগে গিয়ে বলল,

-“ত্ ত্ তবে কী আমি মিছে বলচি? ওই তো সেদিন থ্ থ্ থানার হাবিলদার ম্ ম্ মাণিকলাল আর প্ প্ প্ পুরন্দর হাটে এসেছিল। আমিও তখন ঘুরঘুর করছিলুম হাটের এদিক ওদিক, যদি কিছু হ্ হ্ হাতসাফাই করতে পারি সেই মতলবে। এমন সময় দেখলুম ওরা নিজেদের মধ্যে ব্ ব্ বলাবলি করছে। ‘বড়সাহেবের পোষা ভ্ ভ্ ভূত আছে।’ আমি নিজের কানে আ আ আড়ি পেতে শুনলুম।”

বগলা তোতলাতে তোতলাতে যা বলল সেটা সবাই একবাক্যে বিশ্বাস করলেও ভেনোর মনে সন্দেহ জাগল। ভেনো স্থির করল সরেজমিনে তদন্ত করেই দেখবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। সন্ধেবেলায় সূয্যিমামা পাটে যেতেই একটা কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ভেনো চলল মণিময় দারোগার বাড়ির দিকে। বেশ বড়সড় সাদা বাড়ি, সরকার বাহাদুরের টাকায় তৈরি, বটুকপুরের দারোগার জন্য। বাড়ির চারদিকে উঁচু বেড়া দেওয়া। তবে বেড়ার গায়ে একটা বাবলাগাছ রয়েছে, তার ডালপালাগুলো বেড়া টপকে বেশ ভেতরে বাড়ির জানালার সামনে অব্দি চলে গেছে। ভেনো বহুকষ্টে কাঁটা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে একটা ডাল বেয়ে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি মারল ঘরের ভেতর।

এই ঘরটা মনে হয় বৈঠকখানাই হবে। একটা মেহগনি কাঠের গোল টেবিলের ওপর ফুলদানি রাখা। একটা চেয়ার টেনে বসে আছেন মণিময় দারোগা। দারোগাগিন্নি একটা ট্রে-তে করে দু’কাপ চা এনে টেবলে রেখে, আরেকটা চেয়ার টেনে বসেন।

চা-টা খেতে গিয়ে দারোগাগিন্নি বলে ওঠেন,

-“এই যাহ্! বিস্কুটের কৌটাটা আনতে ভুলে গেলুম।”

মণিময় দারোগা হাঁকলেন,

-“সুখো, ওরে সুখময়! দে না বাবা বিস্কুটের কৌটোটা তাক থেকে পেড়ে এনে একটু।”

চোখ দুটো ছানাবড়ার মত করে ভেনো বাবলা গাছের ডালে বসে দেখল, একটা কৌটো হাওয়ায় উড়তে উড়তে এসে থামল মণি দারোগার মাথার কাছে, শূন্যে ভাসতে লাগল। আপনা আপনিই কৌটোর ঢাকনার প্যাঁচটা ঘুরে ঘুরে খুলে গেল। দুটো বিস্কুট বেরিয়ে এল কৌটোর ভেতর থেকে। সোজা ভেসে ভেসে দুলে দুলে ল্যান্ড করল মণি দারোগার প্লেটে। ফের দু’টো বিস্কুট একইভাবে উড়ে এসে জাঁকিয়ে বসল দারোগাগিন্নির প্লেটে। তারপর কৌটোর ঢাকনা বন্ধ হয়ে নিজে থেকেই যথাস্থানে চলে গেল। শুধু তাই নয়, ঘর ঝাড়ু দেওয়াও নিজে নিজেই করছে একটা মুড়ো ঝাঁটা। চা খাওয়া হ’তে টেবলের ওপরের কাপ প্লেটগুলোও ওই বিস্কুটের মত ভেসে ভেসে চলে গেল, রান্নাঘরের দিকে বোধ হয়।

কিন্তু এমন অশৈলী কাণ্ড দেখে ভেনো আর যথাস্থানে থাকতে পারল না। বাবলা গাছের কাঁটাভরা ডালে হাত পা ছিঁড়ে স্থানচ্যূত হয়ে পড়ল নিচের ঝোপে। ঝোপে পড়ামাত্র সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল, ভেনো হাড়ে হাড়ে মানে চামড়ায় চামড়ায় বুঝতে পারল বিছুটির ঝোপে পড়েছে। কিন্তু ঝড়ঝড় করে শব্দ হওয়াতে মণি দারোগা উঠে এসে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাজখাঁই হাঁক ছেড়েছেন,

-“কে রে ওখানে?”

তাই বিছুটির ঝোপের মধ্যেই চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে রইল ভেনো। কিছুক্ষণ পরে মণি দারোগা জানালার কাছ থেকে সরে যেতে, কোনওক্রমে উঠে গা চুলকোতে চুলকোতে দৌড় লাগাল কষে।

(৫)

পৈতৃক প্রাণটা হাতে নিয়ে ফিরে তো এল ভেনো কিন্তু বুঝতে পারল যে সুখো ভূতের জন্যই ওদের এই দুরবস্থা। কাজেই ওদের চুরি ডাকাতির ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালাতে গেলে মণিময় দারোগার পোষা সুখময় ভূতের একটা গতি করতে হবে। মাধবের একার দ্বারা কিছু হবে বলে মনে হয় না। এলাকার সমস্ত চোর ডাকাতকে এক করতে হবে। এত সহজে ঘাবড়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ভেনো মস্তান নয়।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ, চারপাশের এলাকার সব চোর ডাকাতদের জড়ো করে নিজের মতলবের কথা বলল ভেনো। মাধব দলের লিডার হ’লেও ভূতে বড্ড ভয় পায় তাই এ ব্যাপারে ভেনোর কর্তৃত্বই নির্বিবাদে মেনে নিল।

নির্দিষ্ট দিনে, বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে মাধব ডাকাতের আস্তানায় এসে হাজির হ’ল তান্ত্রিক ঘুটঘুটেশ্বর। অন্ধকারের মত কালো ঘুটঘুটে রঙ বলে তাঁর নাম ঘুটঘুটেশ্বর। তাঁর গুরু হ’লেন ফটফটেশ্বর, তিনি খড়ম ফটফটিয়ে হাঁটতেন কিনা। তাঁর গুরু হ’লেন কুটকুটেশ্বর। শোনা যায় যে তাঁর দাড়ি আর জটার এমন জঙ্গল ছিল মুখ আর মাথাময় যে সেখানে উকুন তো নস্যি, ছারপোকা, তেলেপোকাও বাস করত নাকি!

ভালোমত খোঁজখবর করেই তান্ত্রিক জোগাড় করেছে ভেনো। তান্ত্রিক এসেই হুঙ্কার ছেড়ে ডাকল,

-“নমোঃ গুরু ফটফটেশ্বর! নমোঃ তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর! কোথায় তোদের দারোগার পোষা ভূত। এক্ষুনি তার দফা শেষ করব। বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, ঘুটঘুটেশ্বর ছুঁলে ঘায়ের ওপর ঘা! মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! গোদের ওপর বিষফোঁড়া!”

বলতে বলতে উত্তেজনায় পোড়ো মন্দিরের গায়ের বুড়ো অশ্বত্থগাছের শেকড়ে প্রায় হুমড়ি খেয়েই পড়ে যাচ্ছিলেন তান্ত্রিক মহাশয়। বগলা ছুটে গিয়ে ধরল তান্ত্রিকমহাশয়কে।

-“ঘ্ ঘ্ ঘ্ ঘুট্ ঘুট্...”

বগলার জিভের এই ঘ্যাচাং করে ব্রেক লেগে ঘটঘটাং চিৎকারে তান্ত্রিক মহাশয় আর্তনাদ করে উঠলেন,

-“ওগো মাগো ঘ্যাঁঘা ভূতে ধরলো গো...”

ভেনো জলদি ছুটে এসে সামাল দেয়,

-“তান্ত্রিক ঠাকুর, ও ঘ্যাঁঘা ভূত হ’তে যাবে কেন! ও তো বগলা!”

তান্ত্রিক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন,

-“জানি হে ছোকরা! আমি আবার ভূত চিনব না?! কোথায় তোদের সুখো ভূত? তাকে ঝেড়ে যদি দুখোভূত না করে দিয়েছি, তবে আমার নামটাই বদলে দিস।”

এই বলে নানারকম বিটকেল বিটকেল জিনিস ঝোলা থেকে বার করে যজ্ঞের আয়োজন করতে থাকেন ঘুটঘুটেশ্বর। গিরগিটির চোখ, কাকের পালক, শেয়ালের লেজ, ব্যাঙের ঘিলু, দেখে গা গুলিয়ে ওঠে সকলের। ‘হ্রিম ক্লিম ফট্ ফটাস’ করে মন্ত্র পড়তে থাকে ঘুটঘুটেশ্বর।

ওদিকে ভেনোর প্ল্যানমতো ভজা আর গজা দৌড়ে যায় থানায়। ভর দুপুরবেলায় ভুঁড়ির ওপর চেপে বসে থাকা বেল্টটা আলগা করে, চেয়ারে পা তুলে মিহি সুরে নাকটা ডাকতে শুরু করেছিলেন মণিময়। দুপুরে গিন্নি চারতলা টিফিন ক্যারিয়ারে চর্ব্য চোষ্য ভরে সুখময়ের হাতে করে আকাশপথে পাঠিয়েছিলেন। খাওয়াটা একটু অপরিমিতই হয়ে গেছে। ঠিক এমন সময় হাঁউ মাঁউ করে ভজা আর গজা এসে আছড়ে পড়ল মণি দারোগার দুই হাঁটুর ওপর। মণিময় চমকে বিষম খেয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলেন।

ভেনোর দেওয়া ট্রেনিং অনুযায়ী ভজা আর গজা পালা করে করে বলে চলল,

-“হুজুর মাই বাপ!”

-“হুজুর ধর্মাবতার!”

-“বটুকপুরের জঙ্গলে...”

-“পোড়ো মন্দিরে...”

-“এক বিটকেল কাপালিক এসেছে...”

-“নরবলি দেবে বলে আয়োজন করেছে...”

-“হুজুর আপনি বাঁচান!”

-“হুজুর আপনি রক্ষা করুন!”

‘কাপালিক’, ‘নরবলি’, এসব শুনে তো বেজায় ভড়কে গেলেন মণিময় দারোগা। বিড়বিড় করে জপতে থাকলেন,

-“বাবা সুখময়! বাছা একটু দ্যাখো দিকিনি! কীসব নরবলি কাপালিক বলছে! ওগুলো তো তোমার ডিপার্টমেন্ট কিনা।”

এদিকে জোরে জোরে ভজা আর গজাকে বললেন

-“ঠিক আছে ঠিক আছে! তোরা যা আমি এক্ষুনি ফোর্স নিয়ে যাচ্ছি।

পুরন্দর! মাণিকলাল! বন্দুক লে আও!”

ভজা আর গজা মুখ টিপে হাসতে হাসতে থানা থেকে বিদেয় হ’ল।

ওদিকে সুখময় তখন গিন্নিমার আজ্ঞামত আসনে ফোঁড় তোলা, শুকনো জামা কাপড় তুলে এনে ইস্ত্রি করা, ভাঁজ করা, বিকেলের জলখাবারের লুচির ময়দা মাখা, জল তোলা, সুপুরী কাটা, সব কাজ একসাথে করছিল। অবশ্য সুখময়ের এসব বাম হাতের তর্জনীর কাজ। শুধু ইশারা করলেই কাজ হ’তে থাকে আপনা আপনি। হাত লাগাতে হয়না, যন্ত্রপাতি এমনিই চলে নিজে থেকে। তাই গিন্নিমা ওকেই সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে দুপুরবেলায় একটু গড়িয়ে নেন। দারোগা মশাই স্মরণ করতেই সুখময়ের ধোঁয়ার টিকি খাড়া হয়ে উঠল! ছুটল... ইয়ে মানে উড়ল বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরের কাপালিকের সন্ধানে।

(৬)

পোড়ো মন্দিরে ততক্ষণে বিশাল এক আগুন জ্বেলেছে ঘুটঘুটেশ্বর। তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নেত্য করে চলেছে আর মন্ত্র পড়ছে,

-“ওম দুম ফটাস! হিং ক্লিং চটাস! ফটফটায় পিড়িং! কুটকুটায় কিড়িং! ফট ফটাস! চট চটাস!”

ওই ফটাস আর চটাসগুলো অবশ্য মশা মারার শব্দ। কাপালিকের চারপাশে রামাপদ চোর, মাধব ডাকাত, ভেনো শাগরেদ, বগলা গুপ্তচর, ভজা-গজা, আশপাশের গাঁয়ের আরও খানক’তক চোর ডাকু, সব উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তান্ত্রিক কেমন করে মণি দারোগার পোষা ভূতটাকে ধরে সেটা দেখবে বলে।

হঠাৎ একটা জোরে ঝড় উঠল মন্দিরকে ঘিরে। চারপাশের গাছের পাতা উড়ে এসে পড়তে লাগল যজ্ঞের আগুনের ওপর। ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। চারপাশের ভিড় নিমেষে পাতলা হয়ে এল। সবাই পোড়ো মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল এক লাফে। ভাঙ্গা দেউলের মধ্যে যদি ঠাকুর আগলায় ভূতের হাত থেকে। ওদিকে ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক মনে মনে বেজায় ভয় পেলেও মুখের জোরটা বহাল রাখে,

-“কে রে হতচ্ছাড়া মর্কট ভূত! শিগগির দেখা দে। নাহলে এক্ষুনি মন্তর পড়ে তোকে নিকেশ করে যমের দক্ষিণ দোরে পাঠাব। জানিস আমি কে? আমি ঘুটঘুটেশ্বর তান্ত্রিক, আমার গুরু ফটফটেশ্বর তান্ত্রিক, তস্য গুরু কুটকুটেশ্বর ... ”

উড়ন্ত ধুলোগুলো আস্তে আস্তে একটা জমাট অবয়ব ধরে। সেই ধুলোর মূর্তি হা হা করে হেসে বলে ওঠে,

-“ও ঘুটঘুটে তান্ত্রিক! সে সব তো বুঝলুম তুমি বিশাল তান্ত্রিক।

কিন্তু আমি ভূত না মর্কট সেটা তো ঠিক করে দ্যাখো আগে। আর মরা ভূতকে মেরে যমের বাড়ি পাঠাবে! আমার বোধ হচ্ছে তোমার মাথায় ঘিলুর কিঞ্চিৎ অভাব ঘটেছে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। দাঁড়াও আমিই তোমার ব্যবস্থা করি।”

এই বলে সেই ধুলোর মূর্তি মানে সুখো ভূত জোরসে ফুঁ দিল। ওমনি মাটিতে রাখা ব্যাঙের ঘিলু, গিরগিটির চোখগুলো সব উড়ে গিয়ে পড়ল ঘুটঘুটেশ্বরের মাথায়। সেসব মাখামাখি হয়ে একসা কাণ্ড! তান্ত্রিক তো রেগে লাল হয়ে আরও জোরে মন্ত্র পড়তে লাগল আর তাণ্ডব নৃত্য করতে লাগল। তখন সেই ধুলোর মূর্তি বেশটি করে গা ঝাড়া দিল। সব ধুলো ঝরে গিয়ে একটা ছাইরঙা ধোঁয়ায় গড়া মূর্তি বেরিয়ে এল। তার আবার মাথায় ধোঁয়ার টিকি, এটাই সুখময়ের আসল রূপ।

এবার সুখময় টিকটা টিং টিং করে নাড়াতেই কাকের পালকগুলো আর শেয়ালের লেজ উড়ে গিয়ে বেদম কাতুকুতু লাগাতে শুরু করল তান্ত্রিককে। সে ব্যাটা তো,

-“তবে রে! হা হা হি হি! দেখাচ্ছি মজা! উহুহু! ভুঁড়িতে নয় ভুঁড়িতে নয়! নচ্ছার ভূত! হো হো হো!”

এই বলে পরিত্রাহী চিৎকার করতে করতে তাণ্ডবনৃত্য ছেড়ে বাঁদরনাচ শুরু করল।

পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে যত সব চোর ডাকাতের দল তো ভয়ে আধমরা হয়ে সুখো ভূতের হাতে ঘুটঘুটেশ্বরের এই দুর্দশা দেখতে লাগল। সুখো ওদের ভয় দেখানোর জন্য যেই একটু বিকট মূর্তি ধরে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে গেল, ওমনি সবক’টা মিলে ‘বাবা গো মা গো’ করে পালাতে গিয়ে এমন ধাক্কাধাক্কি শুরু করল যে সেই পুরনো নড়বড়ে দেউলের দেওয়াল ভেঙ্গে হুড়মুড়িয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ে।

ওদিকে মণি দারোগা সুখো ভূতকে স্মরণ করার খানিকক্ষণ পর ভাবল,

-“এতক্ষণে সুখো নিশ্চয়ই কাপালিক ব্যাটাকে জব্দ করে ফেলেছে। এবার তবে আমি নিশ্চিন্তে অকুস্থলে যেতে পারি।”

এই ভেবে পুরন্দর আর মাণিকলাল হাবিলদারকে সঙ্গে নিয়ে, ক’টা জংধরা গাদা বন্দুক নিয়ে রওয়ানা দিলেন।

বটুকপুরের জঙ্গলের পোড়ো মন্দিরে পৌঁছে দেখলেন এক বিকটদর্শন কাপালিক চিৎকার করে পাগলের মত নাচছে। শুধু তাই নয়, পোড়ো মন্দিরের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে আর তার তলায় একগাদা লোক চাপা পড়েছে। যে সে লোক নয়, এলাকার সব নাম করা চোর ডাকু। আর দেখলেন সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরটা পাশের অশ্বত্থ গাছের ডালে বসে ধোঁয়ার ঠ্যাংদুটো দোলাচ্ছে।

তড়িঘড়ি চোর ডাকুগুলোকে আর সেই সাথে ফেরেব্বাজ তান্ত্রিককেও বেঁধে, থানায় নিয়ে গিয়ে সোওওজা হাজতে পুরলেন মণি দারোগা। সুখো ভূতের ভয়ে তাদের আর ট্যাঁ ফোঁ করারও ক্ষমতা ছিল না।

(৭)

এই ঘটনার পর বটুকপুর তো বটেই পুলিশের ওপর মহলেও সুখময় ভূতের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল। পুলিশের বড়কর্তারা ভাবলেন এবারে তো তবে মেডেল সুখময়কে দিতে হয়, মণিময় দারোগা কেন মিছে নাম কামাবেন। কিন্তু সমস্যা একটাই সুখময়ের ধোঁয়ার শরীরের হাওয়ার গলায় মেডেলটা ঝোলাবেন কীকরে। কেউ কেউ সমাধান জানাল, সুখময়ের জীবদ্দশার কোনও ছবি জোগাড় করে তাইতেই মেডেল ঝোলালে হয়। কিন্তু সে উপায়েও সমাধান হ’লনা। কারণ সুখময়ের মনেই নেই তার জীবদ্দশার কথা। মণিময় দারোগার বাড়ির বাগানে হঠাতই নিজেকে প্রেতদশাপ্রাপ্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেছিল সুখময়, আর কিছুই মনে ছিলনা। কীভাবে মারা গেল, কী হয়েছিল, কোথায় বাড়ি, কিচ্ছু না! চোর ডাকাতের মুখ দেখে তাদের অতীত জেনে নিতে পারলেও সুখময় নিজের অতীত মনে করতে পারত না। কেজানে হয়ত নিজের মুখটা ধোঁয়াশা হয়ে গিয়ে, দেখতে পেত না, তাই হয়ত। গিন্নিমা প্রথমে বাড়িতে ভূতের আবির্ভাবে ভির্মি খেলেও পরে বেশ পোষা বেড়ালটির মত পোষ মানিয়ে নিয়েছিলেন সুখময়কে। ‘সুখময়’ নামটাও গিন্নিমারই দেওয়া, মণিময়ের সাথে মিলিয়ে।

অবশ্য যাকে মেডেল দেওয়ার জন্য এত চিন্তাভাবনা তার এই বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। সুখো ভূত মাধবের পিসির বাড়ির খড়ের চালে বসে গান শুনতে ব্যস্ত। মাধবের পিসি ভাইপোর ডাকাতির জন্য ভিটেয় যে পাপ লেগেছে তাই শুদ্ধি করতে হরিনামের আসর বসিয়েছে। পিসির আবার ভূতে ভারী ভয় কি না।

“হরি দিন তো গেল ... সন্ধে হ’ল... পার করো আমারে!”

সুখময় চালে বসে তাল দিয়ে হরিনাম সংকীর্তন শুনতে থাকে আর ভাবতে থাকে নামগানের গুনে যদি প্রেতদশা থেকে উদ্ধার পায়। ব্যাটাচ্ছেলের এটাও মনে নেই যে ভূতেদের ‘হরিনাম’ শোনা মানা!