অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
Showing posts with label অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়. Show all posts

মধ্যযুগীয় রান্নার পুঁথি—নিমত্‌নামা ● অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মধ্যযুগীয় রান্নার পুঁথি—নিমত্‌নামা
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

একটি বিশেষ গুণের জন্য বহুপরিচিত একজন মানুষ যদি সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে পারদর্শী হন, তবে অবাক হতেই হয়। আর যদি সেই মানুষটা দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা হন, তাহলে তো কথাই নেই। শাসকের কাজ শুধু শাসন ত্রাসন। তিনি যদি বিপরীত দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য কাজে মন দিয়ে ফেলেন, যে কাজটা আদৌ তাকে সাজে না, তবে যেটা হয়, তার প্রমাণ হলেন মহম্মদ ঘিয়াসুদ্দিন শাহ, যাকে ইতিহাস ঘিয়াত শাহ্‌ বলে চেনে।

খুঁতখুঁতে - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

হাসির গল্প

মিনুদি বড় খুঁতখুঁতে ছিল, বা বলতে পারি পিটপিটে। সব ব্যাপারে পারফেকশনিস্ট ছিল মিনুদি, একদম ছোটবেলা থেকেই। হাতের লেখা মুক্তোর মতো। রেজাল্ট --- প্রতি ক্লাসে ফার্স্ট। কিন্তু ওই যে, পারফেকশনিজমের ভূত মাথায় একবার ঢুকলে বেরোতে চায় না --- তাই আরও দশ নম্বর বেশি কেন এলো না, সে নিয়ে নাকি কান্না জুড়ে বাড়িসুদ্ধ লোককে জেরবার করে দিতো মিনুদি।

বিষানল - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মন্দার পর্বত ও সর্পরাজ বাসুকির সাহায্যে সমুদ্র মন্থন করে দেবতারা পেলেন অমৃত আর অসুরদের ভাগ্যে জুটল হলাহল। দেবতারা অমরত্ব লাভ করলেন। বিষ হাতে পেয়ে অসুরেরা নামল ধ্বংসযজ্ঞে।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থের এই কাহিনীর সাথে আমরা সকলেই বহু পরিচিত। কিন্তু বিষের উপর অধিকার কি শুধু নরকের বাসিন্দাদের? সে কি শুধুই শয়তানের হাতের অস্ত্র? হয়তো নয়। শাসকের হাতে সেই বিষ কেমন ভাবে মারণাত্মক হয়ে উঠতে পারে, পৃথিবীর প্রতিটি যুদ্ধ তার সাক্ষী। শাসক তো দেবতারই প্রতিনিধি। তাই অমৃত কিম্বা বিষ, সবেতেই তার একছত্র অধিকার।

মানব ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, রাজনীতিতে বিষ কীভাবে প্রবেশ করে একেবারে জাঁকিয়ে তার অধিকার দাবী করেছে। সম্পদের অধিকারভোগ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ঈর্ষা। ঈর্ষা জন্ম দিয়েছে সন্দেহ। সন্দেহের অজানা কানাগলিতে ওঁৎ পেতেছে মৃত্যু।

পরিমাণে কম হলে বিষ হয় জীবনদায়ী (অমৃত?)। আবার সেই অমৃতরূপী ওষুধ, পরিমাণের আধিক্যে হয়ে ওঠে বিষ। তাই বুঝি অমৃত ও বিষের তফাতটা অতি সামান্যই। দ্রব্য ব্যবহারের গুণে কখনো বিষ হয়ে ওঠে প্রাণদায়ী, আবার কখনো প্রাণহারী।

মানুষ ঠিক কবে থেকে বিষ প্রস্তুতির মশলা আয়ত্ত করল, ইতিহাস ঘেঁটে বার করা কষ্টসাধ্য। কারণ মানবসভ্যতার সব ইতিহাস তো লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়নি! এখনো পর্যন্ত মানুষের হাতে আসা সবচাইতে প্রাচীন পুঁথি প্যাপিরাসে বিষের ঔষধি গুণাবলী লেখা দেখতে পাওয়া গেছে, সেটি আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পুরনো। তবে অন্যান্য নিদর্শন, যেমন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে পাওয়া মানুষের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে পণ্ডিতেরা জানাচ্ছেন—বিষ তৈরির কৌশল আরও প্রাচীন। প্রায় ৪৫০০ খ্রিস্টপূর্বাদ আগেও মানুষ বিষের ব্যবহার জানত।

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে পন্টাসের রাজা মিথিরিডেটস–৬ প্রভূত বিষ আবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কারের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর বিষপ্রয়োগের থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। তিনি নিত্য নতুন বিষ আবিষ্কারই শুধু করতেন না, তার প্রতিষেধক খুঁজে তথ্যসমূহ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। বিষ প্রয়োগে তাকে কেউ হত্যা করবে এই ভয়ে, রোজ একটু একটু করে নিজের শরীরে বিষ ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে সেই বিষের মাত্রা বাড়াতেন। এক কথায় তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক বিষ-পুরুষ। অবশ্য এমন এক বিষ-পুরুষের কামড়ে মানুষ মারা যেত কিনা, সে বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। মিথিরিডেটাসের শত্রু ছিলেন রোমের রাজা পম্পেই। রোমের সৈন্য পন্টাস আক্রমণ করে রাজা মিথিরিডেটসকে বন্দী করে। পম্পেইয়ের বিচারে মিথিরডেটাসের শাস্তি হয় মৃত্যু। শাস্তি এড়াতে রাজা মিথিরিডেটস মৃত্যু বরণ করবার উদ্দেশ্যে নিজেই নিজের শরীরে বিষ প্রয়োগ করেন। কিন্তু বিষ-পুরুষের শরীরে সেই বিষ কোনও কাজ করল না, আর মিথিরিডেটস মারা গেলেন না। অগত্যা রাজা পম্পেইয়ের নির্দেশে মিথিরিডেটসকে কেটে ফেলে হত্যা করা হয়।

৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় সুমের সভ্যতার আরাধ্য বিষ দেবীর নাম - গুলা। বিষ প্রয়োগ করে রোগ নিরাময়ের জন্য মানুষ তার আরাধনা করতো। গুলা দেবীর আরাধনার যে সমস্ত নিদর্শন পাওয়া গেছে, তা থেকে বিষ ব্যবহারে প্রাচীন মানুষেদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয়। গুলা শব্দের অর্থ – মহান। অর্থাৎ মহান ছিল গুলাদেবীর বিষ প্রয়োগের ক্ষমতা। গুলার মা ছিলেন অনু। তিনিও আরোগ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। গুলার বাবা আবু ছিলেন কৃষিকার্যের দেবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে — গুলা তার বাবা ও মায়ের কাছে শেখা ব্যবহারিক জ্ঞান থেকে ভেষজ বিষ বানাবার পদ্ধতি আয়ত্ব করেছিলেন। মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া গুলা দেবীর মন্দিরে অনেক কুকুরের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। সাথে চিনে মাটির কুকুরের মূর্তিও পাওয়া গেছে। কুকুর যে নিজের গা চেটে রোগ নিরাময় করতে পারে, সেটি তখনকার দিনের মানুষের জানা ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে পুরুষ দেবতাদের রমরমা শুরু হতে থাকে। কিন্তু গুলা দেবীর মহিমা বহুকাল পর্যন্ত সমাজে অটুট ছিল।

হিন্দুধর্মে সর্পদেবী হিসেবে মনসার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ববেদে। পুরাণে তাঁকে ঋষি কাশ্যপ ও নাগ-জননী কদ্রুর কন্যা বলা হয়েছে। জনসমাজে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, শিব বিষ পান করার পর মনসা তাঁকে রক্ষা করেন এবং তারপর থেকে ‘বিষহরা’ নামে পরিচিত হন। যদিও দেবীর কুলীন আসন তার কপালে কোনোদিনই জোটেনি।

গুহাবাসী শিকারি-সংগ্রহকারী জীবন থেকে নেওয়া পাঠে মানুষ একদিন হয়তো শিকার করা পশুর পিছনে ছুটে বেড়ানোর পরিশ্রম ও সময় সংক্ষেপের তাগিদেই লতাপাতা থেকে বিষ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে ফেলে। এমনটাই ধারণা পণ্ডিতদের। তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে শিকার করতে শুরু করে একদিন লড়াইতে মানুষ মারার কাজেও সেই বিষ মাখানো তির ব্যবহার করা শুরু হয়। মানুষই হয়ে ওঠে মানুষের শত্রু। রাজনীতি-ধর্মনীতি জন্ম দিল নতুন নতুন বিষ ও মারণাস্ত্রের। প্রাণদায়ী সুধা কখন যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠল, মানব সমাজ জানতেই পারল না। প্রাকৃতিক সম্পদ একজায়গায় কিছু মানুষের হস্তগত হল, কিছু মানুষ হল বঞ্চিত। হিংসা বিদ্বেষ সম্পত্তির লোভ জন্মাল মানুষের মধ্যে। নিঃশব্দ ঘাতকের রূপ নিল মানুষের তৈরি বিষ।

নারী শাসিত যৌথ জীবন থেকে পুরুষ শাসিত সমাজে রূপান্তরের কারণে বিষ প্রয়োগের কৌশলে নারীবাদের তকমা লেগে গেল। বিষ প্রয়োগ করা হয় অজান্তে নিঃসাড়ে। তাই বিষ প্রয়োগ নিছকই নারীজনোচিত কাজ বলে গণ্য হতে থাকল। পুরুষ কেন বিষ প্রয়োগ করবে? সে তো তার পেশীর শক্তি ব্যবহার করে, রক্তপাত ঘটিয়ে, যখন খুশি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। বিষ প্রয়োগে হত্যা করা তাই পুরুষের উচিত কাজ বলে আর গণ্য হল না মানব সমাজে।

সেক্সপিয়ার তার লেখা বিখ্যাত নাটক ‘এন্টনি ও ক্লিয়পেট্রা’ তে দেখালেন—রোমান রানি ক্লিয়োপেট্রা, বিষ প্রয়োগে আত্মহত্যা করছেন। সুন্দরী রানির জীবনে একদিকে বৃদ্ধ সম্রাট জুলিয়াস সিজার, অন্যদিকে প্রেমিক রাজা এন্টনি। জীবনের প্রতি অনীহা আর নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে না পেয়ে, সেক্সপিয়ারের নাটকে অন্তিম দৃশ্যে তাই দেখা গেল—ক্লিয়োপেট্রা বিষধর সাপকে আহ্বান করে বলছে, “হে বিষধর, তোমার শ্বদন্তে আমার জীবনের শেষ গিঁট ছিঁড়ে দাও। এসো তোমার শরীরে ক্রোধ আনো, বিদায় জানাও।”

ক্লিয়োপেট্রা যে সত্যি সত্যি সাপের বিষে প্রাণ দিয়েছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু সেক্সপিয়ারের নাটকে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য চিত্রকর সাপের দংশনে ক্লিয়োপেট্রার মৃত্যুর চিত্র এঁকে গেছেন। বিজ্ঞেরা বলেছেন, সাপটা কিং-কোবরা না হয়ে যায় না। কারণ অন্য কোনও বিষে মারা যাবার পাত্রী ছিলেন না ক্লিয়োপেট্রা। তিনি বিষ নিয়ে গবেষণা করতেন। নিত্য নতুন বিষ বানিয়ে, পরিচারক পরিচারিকার উপর প্রয়োগ করে, ফল পরীক্ষাই শুধু করেননি—নিজেও রোজ অল্প অল্প করে বিষ পান করে ক্রমশ নিজেকে বিষকন্যা করে তুলেছিলেন।

ক্লিয়োপেট্রার আগে বিষ পান করে মারা গিয়েছিলেন বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস। তিনি দেবতার অস্তিত্ব বিনা প্রমাণে মেনে নিতে পারেননি। মানেননি ধর্মীয় প্রভুদের অনুশাসন। যুক্তির উপর দাঁড় করিয়ে জন্ম দিয়েছেন এক নতুন দর্শনের। ফল – মৃত্যুদণ্ড। শাসকের নির্দেশে ৫০০ বিচারকের বিচারের প্রহসনে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রায় দিয়েছিল ২৮০ জন বিচারক। তবে সে যুগে তাঁর মতো প্রখ্যাত জ্ঞানী দার্শনিককে বেছে নিতে বলা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি। তিনি হেমলক বিষ পান করে মৃত্যু বরণ করে নিতে চেয়েছিলেন। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো সক্রেটিসের মৃত্যু দৃশ্যের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। যদিও সক্রেটিসের এই শিষ্যটি তাঁর মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন না। সক্রেটিসকে হেমলকের সাথে খানিকটা আফিম মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তিনি আচ্ছন্ন অবস্থায়, কম যন্ত্রণায় মারা যান। প্লেটোর বর্ণিত দৃশ্য এমন ছিল – সক্রেটিস তাঁর বন্ধু ক্রিটোর হাত থেকে বিষ পাত্র তুলে পান করলেন। ক্রিটো তাঁর পায়ের উপর চিমটি কেটে অনুভব করছেন, সক্রেটিসের শরীরে বিষ অঙ্গ অবশ করতে সক্ষম হয়েছে কিনা। সক্রেটিস জানাচ্ছেন – আস্তে আস্তে বিষ তার শরীরে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এবার হৃদয়ে উঠে এলেই সব শেষ হয়। তারপর ক্রিটো দেখছেন – সক্রেটিস অসাড় হয়ে গেছেন, তাঁর চোখ নিথর হয়ে গেছে। মারা গেছেন সক্রেটিস। বিষ পান করে মৃত্যুপথযাত্রী সক্রেটিসের অনেক ছবি এঁকে গেছেন অনেক বিখ্যাত চিত্রকর, যার মধ্যে ফরাসী চিত্রকর জ্যাকুইস লুই ডেভিসের ছবিটি সবচাইতে বেশি খ্যাতি লাভ করে।

ডেভিডের আঁকা সক্রেটিসের মৃত্যু দৃশ্য

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে এশিয়া মহাদেশ থেকে ঘরে ফেরার সময়ে ব্যাবিলনে দেহত্যাগ করেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আলেকজান্ডার। তখন তার বয়স মাত্র ৩২। কেউ বলে ম্যালেরিয়ায় হয়ে বা নিয়মোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান আলেকজান্ডার। আবার কেউ বলে বিষপ্রয়োগে মৃত্যু হয় তাঁর। বিশেষজ্ঞদের বর্তমান মত হল—ম্যালেরিয়ার জীবাণু বাহক মশার অস্তিত্ব ব্যাবিলনের মরুভূমিতে পাওয়ার কথা নয়। নিউমোনিয়াও কেন শুধু তারই হল, মহামারীতে আর কেউ মারা যাওয়ার কথা কেন জানা যায় না। তাই তাঁদের মতে, পানীয়ে বিষ মিশিয়ে হয় তাকে হত্যা করা হয়েছিল, বা অসাবধানে কোনক্রমে পানীয়তে বিষ মিশে যাওয়ার ফলে অ্যালেক্সান্ডার মারা যান। পুঁথি বলছে প্রায় বারো দিন রোগে কষ্ট পেয়ে মারা যান রাজা। কী সেই বিষ, যার ফলে দীর্ঘায়ত হয়েছিল তাঁর মৃত্যু? সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, ভেরাটাম এ্যালবাম নামক একধরনের ভয়ঙ্কর বিষাক্ত গাছ আলেকজান্ডারের খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে থাকতে পারে। এই গাছের সাদা ফুল অতি সুন্দর। অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ ওষুধ হিসাবে এই গাছের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। জঙ্গলের পশুরা কিন্তু ভুলেও এই গাছের ধারে কাছে যায় না। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাতেও ভেরাটাম এ্যালবামের শিকড় থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হয় রক্তশূন্যতা, মৃগীরোগ, টাইফয়েড প্রভৃতি চিকিৎসায়।

বিষের প্রয়োগবিধি ও ধরণের উপর যে শাখায় গবেষণা করা হয় সেটি হল – টক্সিকোলজি, বা বিষবিদ্যা। জীবনবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, ঔষধবিদ্যার ব্যবহারিক দিক প্রয়োগ করে বিষ নিয়ে গবেষণা করাই এই শাখার কাজ। তবে বিষের উপর এমন পরীক্ষা নিরীক্ষার ইতিহাস অতি প্রাচীন। সভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে বিজ্ঞানের এই শাখার কাজ ততই জটিল পথ ধারণ করছে নিঃসন্দেহে। রোমান সম্রাট নিরোর সভাবৈদ্য ডায়োস্করডিস সর্বপ্রথম গাছের বিষ ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস করেন। হেমলক সর্বাধিক ব্যবহৃত বিষ, যা হেমলক গাছ থেকে তৈরি করা হয়। এছাড়াও রিসিন একটি অত্যন্ত মারাত্মক বিষ। রিসিন গাছের বীজ থেকে ক্যাস্টর অয়েল বানানো হয়। কিন্তু এই বীজের খোসা প্রাণী শরীরে প্রবেশ করলে প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে। বহু রাজনৈতিক হত্যার পিছনে রিসিনের মারাত্মক বিষ প্রয়োগের কাহিনী লুকিয়ে আছে।

রিসিন
হেমলক
ভেরাটাম

প্রাচীন গ্রীক সাম্রাজ্যে হেমলক ছাড়াও আর একটি বিষের ব্যবহার বিষবিদ্যার গবেষকেরা খুঁজে পেয়েছেন। সেটি হল—একোনাইট। বাংলায় একে বলা হয় কুচিলা। নীল রঙের অতি সুন্দর বাহারি ফুল হয় এই গাছে। গ্রীকেরা তীরে বিষ মাখানোর জন্য একোনাইটের শিকড় ব্যবহার করত। এরপর সমাজের উন্নতির সাথে সাথে বদলে গেল বিষের ব্যবহারের উপকরণ। আর্সেনিক, পারদ, সীসা, সব ধাতুই প্রথমে ওষুধ হিসাবে প্রয়োগ করা হতো। ধীরে ধীরে এদের মারণাত্মক দিকটাও মানুষ আবিষ্কার করে ফেলল।

বিষ প্রয়োগ ও তার ব্যবহারের সাথে সাথে মধ্যযুগীয় রাজনীতিতে জমে উঠল পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে তার আমত্য চাণক্য রাজাকে নির্বিঘ্ন শাসনের পথ খুলে দিতে বিষকেই বেছে নিয়েছিলেন গোপন হত্যায়। বিষকন্যা নিযুক্ত করে উচ্চাসনে আসীন রাজপুরুষদের হত্যা করা সে যুগে খুবই স্বাভাবিক ছিল। বৌদ্ধ ও জৈন পুঁথিতে উল্লেখ করা আছে, চন্দ্রগুপ্তকে চাণক্য প্রতিদিন একটু একটু করে বিষ পান করাতেন, যাতে তার শরীর বিষরোধী হয়ে ওঠে। শত্রুর বিষপ্রয়োগের হাত থেকে মহারাজের প্রাণ বাঁচানোই ছিল তার উদ্দেশ্য। বিন্দুসারের জন্ম নিয়ে একটি কাহিনী বিভিন্ন বৌদ্ধ পুঁথিতে পাওয়া যায়। একদিন চন্দ্রগুপ্ত তার পত্নী দূর্ধারার সাথে প্রাতরাশ করবার সময়ে আপেলে কামড় দিয়ে সেই আপেলই মহিষীকে ভালবেসে খেতে দেন। ঠিক সেই মুহূর্তে চাণক্য প্রাতরাশের জায়গায় এসে পড়েন। দূর্ধারা সেই সময়ে গর্ভবতী ছিলেন। বিষ-পুরুষ চন্দ্রগুপ্তের কামড়ানো আপেল খেয়ে দূর্ধারার আসন্ন সন্তান মারা যাওয়ার আশংকায় চাণক্য তখুনি রানির পেট তরোয়াল দিয়ে কেটে তার পুত্র সন্তানকে বার করে আনেন। এক ফোঁটা রক্ত সদ্যজাতের মাথায় পড়ায় তার নাম হয় – বিন্দুসার। হয়তো আসল ঘটনার সাথে অনেকটাই কল্পনা ও কাহিনী মিশে থাকার সম্ভাবনা আছে। তবে চন্দ্রগুপ্ত স্বয়ং যে একজন বিষ-পুরুষ ছিলেন, এর উল্লেখ বহু লিপিবদ্ধ পুঁথিতেই পাওয়া যায়।

মোগল সাম্রাজ্যর ইতিহাস জুড়ে আছে সন্দেহ, অবিশ্বাস, গুপ্তহত্যা ও নীরবে বিষপ্রয়োগ করে হত্যার অসংখ্য নজির। বাদশারা এক বিশেষ কৌশলে প্রায়শই হত্যার কাজটি সুসম্পন্ন করতেন। সেই আমলে রত্ন মণিমাণিক্য খচিত মূল্যবান পোশাক উপহার দিয়ে অতিথিকে সম্মান জানাবার রীতি ছিল। এমন পোশাককে বলা হত – খিলাত। বশ্যতা স্বীকার করবার প্রমাণ হিসাবে বাদশার সামনেই এই পোশাক পরার রীতি ছিল। পোশাকের মধ্যে কলেরা, স্মল পক্স ও ম্যালেরিয়ার জীবাণু মিশিয়ে দেওয়া হত। ফলে পোশাক গায়ে দিয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কোনও সন্দেহের অবকাশই থাকত না। তবে এইভাবে বিষ মাখানো পোশাক ব্যবহার করে মানুষ মেরে ফেলার চল অতি প্রাচীন। জানা যায় গ্রীক বীর হিরাক্‌লসকেও নাকি একই পদ্ধতিতে মারা হয়। মোগল বাদশাহ আওরঙ্গজেব তার প্রতিদ্বন্দ্বী পৃথ্বী সিংহকে একই উপায়ে স্মল পক্সের জীবাণু মেশানো পোশাক উপহার দিয়ে হত্যা করেন। আওরঙ্গজেবের পুত্র আকবর (দ্বিতীয়) তার পিতার বিরুদ্ধাচারণ করে বিরাগভাজন হন। আওরঙ্গজেব তার মসনদের কাঁটা সরাতে নাকি পুত্রকে বিষ মাখা পোশাক উপহার দেন। পিতার মতিগতিতে সন্দিহান হয়ে আকবর সেই পোশাক সে নিজে না পরে, এক ক্রীতদাসকে সেই পোশাক পরিয়ে দেয়। দুএকদিনের মধ্যেই দাসটি মারা যায়। দ্বিতীয় আকবরের সন্দেহ প্রমাণিত হয় এবং সে তার প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়।

১৭০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিষবিদ্যার বিপ্লব ঘটে গেল। কারণ এই সময়ের মধ্যে হয়েছিল শিল্প বিপ্লব। উন্নতি হল ধাতুশিল্প, খনন কার্জ এবং রসায়ন শিল্পে। এক দল মানুষের হাতে নতুন ক্ষমতা এল। জন্ম নিল ঈর্ষার নতুন দিক, রাজনীতির মোড় ও গতি বদলে গেল। বিষ প্রয়োগের নতুন নতুন কলাকৌশলে মেতে উঠল বিষবিদ্যা। শুধু একজনের প্রতি বিষপ্রয়োগের জায়গা নিল বহু মানুষকে একসাথে মেরে ফেলবার জন্য রাসায়নিক ও জীববিজ্ঞানী মারণাস্ত্র। দুটি বিশ্বযুদ্ধ তার সাক্ষী।

তথ্য ঋণ -

1) The elements of murder, A history of Poison, John Emsley, Oxford University Press, 2003.

2) Historical milestone and discoveries that shaped the toxicological sciences, Antoinetee N. Hayes and Steven G. Gillbert, Research Gate. net publication, 2009.

3) Killer Khilats, “Legends of Poisoned Robes of Honour” in India, Michelle Maskiell and Adrienne Mayor, Routledge Journals; Taylor & Francis Ltd, 2001, pp. 23 – 45.

 

ছবি ঋণ – আন্তর্জাল

মানবী - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

অলংকরণ - প্রতিম দাস

“নাও, চা-টা ধর। ক’টা বেগুনি ভেজে আনি?” কথাগুলো বলতে বলতে অনিন্দ্যর দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিল সঞ্চারী।

মুম্বাইয়ের পাওয়াই লেকের পাশে অনিন্দ্যর এই ছোট্ট ফ্ল্যাটের ব্যাল্কনি থেকে লেকটার বেশ অনেকটাই দেখা যায়। এখন নভেম্বর মাসের শেষ। লেকের দিক থেকে মিষ্টি হাওয়া আসছে। আজ খুব একটা ভাল মুডে ছিল না অনিন্দ্য। কিন্তু এই বাসন্তী হাওয়া আর সঞ্চারীর মিঠে উপস্থিতি, ঠিক এই মুহূর্তটা যেন স্নায়ুতন্ত্রকে টানটান করে, মন ভাল করে দিল।

“না না... ভাজাভুজি খেতে আজ ভাল লাগছে না। তুমিও বরং চেয়ারটা টেনে এনে বস। মা’কে দেখছি না...”

“মা এই সময় সিরিয়াল নিয়ে মেতে থাকেন তুমি জানো তো! রিমোটে বাংলা চ্যানেল কী করে সেট করতে হয়, আমিই শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছি। ন’টার আগে উঠবেন বলে তো মনে হয় না।”

“তাহলে প্রেমালাপটা একটু বেশিক্ষণ করা যাবে, অভয় দিচ্ছ?”

সঞ্চারী খুব সুন্দর করে হাসল। হাসলে ওর গালে টোল পড়ে, আগে যেন লক্ষ করেনি অনিন্দ্য। পড়ন্ত বিকেলের আলো ওর গালে পড়ে কনট্রাস্ট তৈরি করায় গালের টোলটা নজরে এল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সঞ্চারীর হাতটা বাম হাত দিয়ে চেপে ধরে অনুনয় করল অনিন্দ্য, “এ্যাই, একটা গান কর না।”

“বাংলা, না হিন্দি?

“যা খুশি। বিকেলটা আজ বড় সুন্দর লাগছে।”

কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে নিয়ে সঞ্চারী শুরু করে, “দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে, আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমাকে...”

সঞ্চারীর গান যেন কেমন মন উদাস করে, আউল বাউল করে দেয়। গান শেষ হতেই চরম নিস্তব্ধতা। সঞ্চারী কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। দুজনেই চুপ করে খানিকক্ষণ বসে থাকে। লেকের জলের উপর কালো আকাশ ঝুঁকে আসছে। অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে অনিন্দ্যর ব্যাল্কনিতেও। সঞ্চারী লাইট জ্বালাতে উঠে দাঁড়ায়। অনিন্দ্য ওর কনুইতে টান দিয়ে বসিয়ে দিতে গেলে টাল সামলাতে না পেরে ওর কোলে আছড়ে পড়ে সঞ্চারী। আচমকা এমন পতনের কারণে মানবী হলে হয়তো ব্রীড়ানত হয়ে বলে উঠত, “কী যে কর না! অসভ্য!”

কিন্তু সঞ্চারীকে সেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়নি। ওর প্রোগ্রামে এই ছোট্ট ভুলটা শুধরে নিলে জীবনটা আরও মধুর হয়ে উঠবে, এমনটাই মনে হয় অনিন্দ্যর।

“আচ্ছা সঞ্চারী, এই যে গানের মধ্যে দিয়ে বলে উঠলে - ‘পাইনে তোমাকে...’ তুমি কী সত্যিই আমাকে পাওনি? আমার তো মনে হয় অফিসের সময় ছাড়া যে সময়টুকু জুটিয়ে নিতে পারি, তার সিংহভাগ কেবল তোমায় দিয়ে থাকি। আজ তোমার গানের মধ্যে কেমন যেন করুণ সুর বেজে উঠল। যদিও এটা প্রশংসা করতেই হবে, আগের চাইতে গানগুলো তুমি অনেক ভালো গাও এখন। উচ্চারণের জড়তাও অনেকটাই কেটে গেছে।

“তোমার আগের বউয়ের চাইতেও ভালো?” সঞ্চারীর গলায় ব্যঙ্গের সুর শুনে চমকে উঠল অনিন্দ্য। এই খবরটা ওকে কে দিল? নিশ্চয়ই মা। কোনও মানে হয়! এন্ড্রয়েড বউকে এই সব গোপন কথা না বললেই কি চলছিল না? ধুত্তেরি, মা তো সঞ্চারীর আসল পরিচয় জানেই না! আর কী করেই বা জানবে? অনিন্দ্য তো আর সেকথা ফাঁস করেনি মায়ের কাছে!

ঘটা করে, একেবারে মন্ত্র পড়ে, সাত পাক দিয়ে, উলুধ্বনির হুল্লোড়ে, প্রথম বউ সাগরিকার সাথে অনিন্দ্যর বিয়ে হয়েছিল। তখন সে মুম্বাইতে ছিল না, চাকরি করত কোলকাতায়। বিয়ের ব্যবস্থা তাদের গ্রাম চন্দ্রবোড়ায় হয়নি। একবার বলবার চেষ্টা করেছিল অনিন্দ্য – গ্রামে বিয়ে না করলে ব্যাপারটা ভালো দেখায় না। সাগরিকার বাড়ির লোক একেবারে হা হা করে উঠেছিল। আসলে পৃথিবীটা সূর্যের চারিদিকে যতবার পাক খায়, চন্দ্রবোড়ায় জীবন ততবার পাক খায় না। প্রশাসনিক ঢিলেমিই হোক, বা রাজনৈতিক কারণে - দ্বাবিংশ শতাব্দীর ভারতের শহরগুলোকে টেকনোলজির ম্যারাথন দৌড়ে জিতিয়ে দিলেও, কিছু কিছু গ্রাম যেন এখনো শতাব্দী প্রাচীন ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। সভ্যতার আলো এখানে চুপিসারে ঢোকে, জীবন চলতে থাকে গড়িয়ে। চন্দ্রবোড়া ঠিক এমনই একটা গ্রাম।

সাগরিকার সাথে বিয়েটা টেঁকেনি অনিন্দ্যর। আসলে মা ছাড়া আর কেউ ছিল না তার। বাবা তার অল্প বয়সেই চলে যান। একমাত্র ছেলে অনিন্দ্যকে তার মা মানুষ করেন। গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করলেও মনের দিক থেকে তিনি অনেক আধুনিক। সাগরিকার সাথে কোলকাতায় বিয়ে তিনি নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্কুলের চাকরি থেকে রিটায়ার করার পরও নিজে চন্দ্রবোড়া ছাড়তে চাইলেন না। মাঝে মধ্যে অনিন্দ্যর কোলকাতার বাসায় এসে থাকতেন ঠিকই, কিন্তু সাগরিকা তাদের জেট স্পিড জীবন সংসারে শাশুড়িকে একেবারেই মেনে নিতে পারেনি।

 

প্রথম স্ত্রীকে ভোলা অত সহজ ছিল না। ওরা দুজনে একই অফিসে কাজ করত। দুজনের প্রেম ছিল যাকে বলে একেবারে দাপুটে প্রেম। ছ’বছর একটানা প্রেম পর্ব চালিয়ে বিয়ের জোড়ে বাঁধা পড়েও সব কেমন যেন দ্রুত শুকিয়ে গেল। একটা ব্যর্থ সম্পর্ক বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই জেনে, দুজনেই সরে গিয়েছিল নিঃশব্দে। সাগরিকা এখন সাগর পাড়ের কন্যা – ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর কুয়ালালামপুরের চাকরির হাতছানিতে সাড়া দিতে সে সময় নেয়নি। পলিমার টেকনোলজির বিশেষজ্ঞ ছিল অনিন্দ্য। তাই সেও মুম্বাইতে পাড়ি দিয়েছিল নতুন এক কোম্পানির ডাকে।

সাগরিকার নামের আদ্যক্ষরের সাথে মিল রেখে অনিন্দ্য তার এন্ড্রয়েড ঘরণী আকিরার নাম রেখেছিল - সঞ্চারী। জাপানে উন্নত পলিমার তৈরির মেশিনের ট্রেনিং নিতে অনিন্দ্যকে তার কোম্পানি জাপান পাঠায়। নাকাগাওয়ার সাথে আলাপ হয় সেখানেই। লোকটা একটু ছিটিয়াল টাইপের ছিল। সে নিজেও ছিল একজন পলিমার টেকনোলজিস্ট। তবে নিজের মাথাখানাকে একদণ্ড শান্তিতে জিরোতে দিত না। রোবটিক্স নিয়ে সঙ্গোপনে গবেষণা করত।

নতজিমা জাপানের একটা ছোট্ট দ্বীপ। নানাও সিটি থেকে সামান্য দূরে। আফটারনুন রিসেসে কফিশপে কফি খেতে খেতে, নাকাগুয়া তার রোবট বানানোর নিজস্ব ল্যাবের গল্প শুনিয়েছিল অনিন্দ্যকে। নিছক কৌতূহলী হয়ে নাকাগাওয়ার ল্যাব দেখতে যেতে চায় অনিন্দ্য আর নাকাগাওয়াও খুব খুশি হয় ওর প্রস্তাবে।

নানাও সিটি থেকে বোটে করে নতজিমা যেতে যেতে এক ছুটির দিনে সে অনিন্দ্যকে শুনিয়েছিল, অন্য রোবট কারিগরির সাথে তার বানানো রোবটের তফাতের কথা। নাকাগাওয়া জানায়, তার তৈরি হিউম্যানয়েডদের সাথে মানুষের শরীরের ফারাক বার করা মুশকিল। কারণ সে উন্নত পলিমার টেকনোলজির সাথে রোবটিক্স মিশিয়ে দৈনন্দিন কাজের সাথী হিসাবে তাদের বানিয়ে থাকে। অনিন্দ্য জানে, একবিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই হিউম্যানয়েড তৈরি করতে শুরু করেছিল জাপান ও অনেক উন্নত ইউরোপিয়ান দেশ। প্রথমে তাদের সাথে যন্ত্রের তফাত খুব বেশি ছিল না। গত তিরিশ বছরে হিউম্যানয়েডদের বিবর্তন হয়েছে রকেট স্পিডে। এখন এই দ্বাবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের যে কোনও শহরে ডোমেস্টিক হেল্প হিসাবে হিউম্যানয়েডরা বেশ জনপ্রিয়। এখন তারা আর খরচা সাপেক্ষ নয়। ভারতেও মুম্বাই দিল্লিতে অনেক রোবট তৈরির কারখানা গজিয়ে উঠেছে। কিন্তু সেসব হিউম্যানয়েডদের আলাদা করে চিনতে পারা যায়। যদি নাকাগাওয়ার কথা সত্যি হয়, তবে কে জানে এরা একদিন মানুষের চেয়ে উন্নত হয়ে উঠবে!

তখন ডিসেম্বরের শেষ দিক। জাপানেও ঠাণ্ডা বেশ জমিয়ে পড়েছে। বোট থেকে নামতেই প্রায় ঠকঠক করে কাঁপছিল অনিন্দ্য। উঁচু নিচু প্রায় নির্জন রাস্তায় গাড়ি হাঁকাতে হাঁকাতে নাকাগাওয়া এলোমেলো কথা বলে চলেছিল। এই দ্বীপটাতে জনসংখ্যা খুব কম দেখা যাচ্ছে। হয়তো সেইজন্যই নাকাগাওয়া এমন দ্বীপ বেছে নিয়েছে তার গবেষণার জন্য। ঠোঁটের কোণে ব্যাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সে প্রশ্ন করেছিল, “তুমি বিবাহিত, না এখনো সেসবের সময় পাওনি? সারাক্ষণ কাজ নিয়েই বুঝি ব্যস্ত থাক?”

অনিন্দ্য জানিয়েছিল - সে বিবাহিত, কিন্তু ডিভোর্সি। নাকাগাওয়া খুব উৎসাহিত পড়েছিল, তবে তার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেনি। শুধু বলেছিল, “তাহলে তোমার উপযুক্ত কনের সন্ধান একমাত্র আমিই দিতে পারব বুঝলে হে ভারতবাসী!”

আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসার বিন্দুমাত্র উৎসাহ তখন অনিন্দ্যর ছিল না। সাগরিকাকে ভোলা যায় না। তাই নাকাগাওয়ার অবান্তর কথার কোনও গুরুত্ব দেয়নি সে।

নাকাগাওয়ার কাঠের বাড়িতে বসবার ঘরে খুব উজ্জ্বল আলো জ্বালা ছিল সেদিন। অপূর্ব সুন্দরী এক রমণী এসে আরিগাতো জানিয়ে জাপানের বিখ্যাত সবুজ চায়ের দুটো কাপ নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। তার গমন পথের লাস্যময়ী ভঙ্গিমা অনিন্দ্যর শরীরে জমিয়ে বসা ঠাণ্ডা যেন অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিয়েছিল মুহূর্তে। অনিন্দ্যর চোখের নজর লক্ষ করতে করতে নাকাগাওয়া জোরে জোরে হেসে উঠে বলেছিল, “বলেছিলাম না, একেবারে তোমার মন পসন্দ হবে!”

অনিন্দ্য লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে চায়ের কাপ টেনে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার মেয়ে বুঝি?”

নাকাগাওয়া সেই কথায় বেজায় ঠা ঠা শব্দে হেসে উঠে কুতকুতে চোখ নাচাতে নাচাতে বলেছিল, “নিজের ক্রিয়েশন... তাই মেয়ে তো বটেই! তবে কী জান, ওকে এমন অপ্সরা বানাবো বলে ট্রায়াল নিতে গিয়ে যা যা করতে হয়েছে, তাতে বাবা মেয়ের সম্পর্ক কতদূর সঠিক, বলা মুশকিল। চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, জলদি শেষ করে নাও দেখি, আমি বরং দেখি রাতের খাবারের কী ব্যবস্থা হয়েছে।”

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অনিন্দ্য ভাবছিল, লোকটা তার সাথে মজা করছে না তো? এতটাই পারফেকশন যে মেয়েটি রক্তমাংসের কোনও নারী নয়, তা বোঝার উপায় নেই। ভারতে যেসমস্ত রোবট কর্মীদের দেখা যায়, তারা অনেকটাই যান্ত্রিক। হাঁটা চলায় কাঠিন্য আছে। সেটাই স্বাভাবিক, যতই হোক রোবট যন্ত্র ছাড়া তো আর কিছুই নয়।

যন্ত্র মানবীর সাথে বিয়ের প্রস্তাবে বেজায় হাসি পেল অনিন্দ্যর। যদিও শুনেছে এই জাপানেই নাকি অনেক কাল আগে এক রোবট বানানোর কারিগর, তার নিজের বানানো রোবট রমণীকে বেশ ঢাক ঢোল পিটিয়ে বিয়ে করেছিল। এই দ্বাবিংশ শতাব্দীতেও এই গল্প শুনে লোকে হাসাহাসি করে, যদিও টেকনোলজি আপেক্ষিকভাবে অনেক এগিয়ে। তাই আকিরাকে বিয়ে করে হাস্যস্পদ হয়ে উঠতে পারে অনিন্দ্য। কিন্তু ভিতরে ভিতরে এক তীব্র আকর্ষণও বোধ করছে অনিন্দ্য। জীবনটাকে একটু উল্টে পাল্টে দেখলে মন্দ কী?

মেয়েটি এবার ড্রয়িং রুমে ঢুকে অনিন্দ্যকে বাও করে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, তার কিছু প্রয়োজন আছে কিনা। ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে, তাকে অপলক দেখতে দেখতে অনিন্দ্য ভাবে, নাঃ, কোথাও নিশ্চয়ই কিছু ভুল হচ্ছে। মেয়েটি এবার জাপানিস ভাষায় কিছু বলল। একফোঁটাও বোধগম্য না হওয়ায় অনিন্দ্য বলে, “প্লিস স্পিক ইন ইংলিশ, আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড জাপানিস।”

অনিন্দ্যর কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, নাকাগাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ে বলে, “আসলে আমি ওকে ইংরেজিটা এখনো শিখিয়ে উঠতে পারিনি। তুমি চাইলে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খুব কম দিনেই ওকে বাঙলাও শিখিয়ে দিতে পারবে। ওর প্রোগ্রাম মালটিলিঙ্গুয়াল করা আছে, তাই কোনও ভাষাতেই অসুবিধা নেই। তুমি ট্রায়াল নিতে পার।”

এরপর নাগাগাওয়া তার যন্ত্র কন্যাটির সাথে জাপানী ভাষায় মৃদুস্বরে কিছু কথা বলে নিয়ে অনিন্দ্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “চল, আমরা ডাইনিং হলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিই, রাত অনেক হল।”

নিখুঁত ভাবে মেয়েটির খাবার পরিবেশনের কায়দা এবং প্রয়োজনে হাতের কাছে সব সুন্দর ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া দেখে অনিন্দ্য তাকে ভারতে নিয়ে আসবার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার কথা বলেই ফেলল। নাকাগাওয়া খুব খুশি হয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে দুপাক নেচে নিল। যন্ত্র মানবীকে অনিন্দ্যর প্রস্তাব জানিয়ে দিতে সে হেসে উঠল, কিন্তু লজ্জা পেল না সম্ভবত।

 

জাপান থেকে ফেরার সময় রীতিমত সাক্ষী সাবুদ সহ কোর্টে দরখাস্ত করে যন্ত্র সুন্দরীকে নিজের বউ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে দেশে নিয়ে এল অনিন্দ্য। এটা তাকে বাধ্য হয়েই করতে হয়েছিল। নাকাগাওয়া সেক্সটয় হিসাবে তার নিজের হাতে গড়ে তোলা হিউম্যানয়েডকে বেচতে রাজি হয়নি। অনিন্দ্যও আর আপত্তি করেনি। রেজিস্ট্রেশনের সময় আকিরার জাপানী নাম বদলে নাম দিয়েছিল – সঞ্চারী।

সঞ্চারীকে মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে বাংলা শিখিয়ে নিতে প্রায় বছর খানেক লেগে গিয়েছিল অনিন্দ্যর। তার জিভ জাপানী ভাষা থেকে বাংলায় অভ্যস্ত হতে সময় লাগা স্বাভাবিক ছিল। অবশ্য দেশে ফেরার মাস খানেক পর, ঘটা করে বন্ধুবান্ধব ডেকে পার্টি দিয়ে নিজের দ্বিতীয় বিয়ের সামাজিক স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিল অনিন্দ্য। ততদিনে সঞ্চারী ভাঙা ভাঙা বাংলা আর ইংরেজি শিখে নিতে পেরেছিল। কিন্তু সঞ্চারীর আচরণে, সে যে মানবী নয়, এই কথাটা কারো গোচর হয়নি।

সঞ্চারীর যৌন আবেদন যে সাধারণ মানবীর চাইতে অনেক বেশি, সেটা বুঝে নিয়ে নাকাগাওয়ার সৃষ্টিকে সে তারিফ না করে পারেনি। সত্যিই সে যে শুধুমাত্র সেক্সটয় হিসেবে গড়ে ওঠেনি, বোঝা যেত তার নিজস্ব ভালোলাগা, বা না লাগাকে বেশ ভালোরকম গুরুত্ব দেওয়া দেখে। অনিন্দ্যর পছন্দ অপছন্দ বুঝে নিতেও সময় লাগেনি তার। সঞ্চারীর বুদ্ধিমত্তা সমাজের আর পাঁচটা সাধারণ যন্ত্র মানবীর চাইতে অনেক আলাদা হয়ে উঠেছিল খুব কম সময়ের মধ্যে। তাই সঞ্চারীর সাথে বছর খানেক ঘর করার পর নিজের মাকে নিয়ে এসেছিল অনিন্দ্য তাদের চন্দ্রবোড়া গ্রাম থেকে। কিন্তু সঞ্চারী যে যন্ত্র মানবী, সেটা মাকে জানাতে দ্বিধা করেছিল অনিন্দ্য। সঞ্চারীকে জানিয়েছিল - ঘুণাক্ষরেও যেন মা জানতে না পারেন সঞ্চারী মানবী নয়, জাপান থেকে বিয়ে করে আনা এক মেয়ে।

দ্বিতীয়বার বিয়ে করবার ব্যাপারটা জানতে পেরে মা বলেছিলেন, “এটা তুই কী করলি অনি? জাপানী মেয়েটার সাথে ঘর করতে পারবি? আমাদের সাথে ওদের তফাত কত জানিস? সাগরিকার সাথেই তোর বনাবনি হল না, এখন...”

“মা, তুমি ভুল করছ। সঞ্চারী খুব ভালো মেয়ে। একেবারে বাঙালি হয়ে গেছে মনে প্রাণে। ওকে বাংলার আদব কায়দা, রান্নাবান্না শিখিয়ে তবে তো তোমাকে ডেকে আনছি! আর আপত্তি তুলো না, আমি টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি প্লেনে উঠে পড় দেখি!” উৎসাহ নিয়ে বলেছিল অনিন্দ্য।

মুম্বাইতে অনিন্দ্যর ফ্ল্যাটে ঢুকেই সঞ্চারীর সৌন্দর্য দেখে মা বলেছিল, “এযে একেবারে স্বর্গের দেবী রে! নাঃ, তোর পছন্দের প্রশংসা করতেই হয় অনি।”

মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সঞ্চারীকে প্রণাম করতে দেখে অনিন্দ্য যেমন অবাক হয়েছিল, তেমনিই ওর মা। ইন্টারনেট সার্ফ করে সঞ্চারী বাংলার গ্রাম অঞ্চলের ট্র্যাডিশন কখন রপ্ত করে ফেলেছে - অনিন্দ্যর ব্যস্ত জীবন তা জানতেও পারেনি। তাই মনে মনে খুশি না হয়ে পারেনি।

মুম্বাইতে মায়ের থাকার এক সপ্তাহ কেটে গেল। একদিন অনিন্দ্য ঘরে ঢুকে দেখে ড্রয়িং রুমে মা পা ছড়িয়ে বসে টিভি দেখছে আর সঞ্চারী মায়ের চুলে তেল লাগিয়ে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দিচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দেখে অনিন্দ্যর মা যেন একটু লজ্জা পেলেন। বললেন, “বড় লক্ষ্মীমন্ত বউ রে তোর অনি! এত যত্নআত্তি কি আর আমার পেটে সইবে? কে ওকে এসব শেখাল বল দেখি? জিজ্ঞেস করলে কিচ্ছু বলবে না, শুধু মিটমিট করে হাসবে।”

অনিন্দ্য জানে ওর মা অনেক কষ্ট করে ওকে মানুষ করেছেন। একাকী জীবনে এত সুখ চোখে দেখা হয়নি, তাই সুখের প্রতিটি বিন্দু যেন শুষে নিচ্ছেন প্রাণ ভরে।

মাস খানেক কোথা দিয়ে কেটে গেল টের পাননি অনিন্দ্যর মা। ছেলের বউয়ের আদর যত্নে তার চেহারায় চাকচিক্য ফিরে এসেছে, এটাই একদিন ফলাও করে রাতে ডাইনিং টেবিলে খেতে খেতে ছেলেকে জানাচ্ছিলেন। সঞ্চারীর রাঁধা বিউলির ডাল আর আলুপোস্তর প্রশংসা করতে করতে মা বলে উঠল, “এবার অনেকদিন তো হল অনি, আমার টিকিটটা এবার কেটে দে। বাড়ি তো ফিরতে হবে! তোর বউ যা যত্নে রেখেছে তোকে, এবার আর ফিরে গিয়ে চিন্তা হবে না তোর জন্য। তবে তোদের একটা ছেলেপুলে না হলে, সব কেমন বেসুরো লাগছে। সঞ্চারীকে সকালে এই কথা বলায়, ও দেখি কথা না বলে উঠে চলে গেল।”

ব্রহ্মতালুতে তক্ষকের কামড়েও বোধহয় এত যন্ত্রণা হত না, যতটা মায়ের কথায় অজান্তে ঘটে গেল। এই কথাটা কোনোদিন ভেবে দেখার সময় হয়নি অনিন্দ্যর। আশ্চর্য! এই পরম সত্য, বড় আঘাতের - মাকে বোঝানো অসাধ্য। যন্ত্র মানবী মায়ের সেবাযত্ন, অনিন্দ্যর নরম সহচরী হতে পারলেও, মা হওয়ার ক্ষমতা তার নেই। খাওয়া শেষ করে ওয়াশ বেসিনের দিকে যেতে যেতে অনিন্দ্য শুনল - মা বলছেন, “অনি তুইও সঞ্চারীর মতো আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস?”

সেদিন সঞ্চারী যেন একটু বেশিই শরীরী হয়ে উঠেছিল। একটু পরে ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে বলেছিল, “আমি মা হতে চাই।”

সঞ্চারীর চুলে বিলি কাটতে কাটে অনিন্দ্য বলে, “তুমি বুদ্ধিমতী, ভালো করেই জানো তোমার শরীর সন্তান জন্ম দেওয়ার উপযুক্ত নয়। অবুঝ হয়ো না। আর সন্তান ছাড়া আমরা কি কিছু খারাপ আছি?”

“আছি তো! সারাদিন তুমি থাক না। তোমার মাও চলে যাবেন। আমার সময় কাটবে কী করে। তুমি একটা দত্তক নাও বরং।”

“ইউ মীন এডপশন? আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী বাবা ও মা দুজনকেই সন্তান পালনে সমর্থ হতে হবে, তবেই দত্তক নেওয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে। যখন তারা আমার বউ একজন হিউম্যানয়েড জানতে পারবে, তখন পারমিশন দেবে না। একটু বোঝার চেষ্টা কর।”

“আর মাকে কী বোঝাবে?”

“সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও।”

অনেক রাত পর্যন্ত সেদিন ঘুম এল না অনিন্দ্যর। সব ঠিকঠাক চলছিল। এবার যেন কোথায় হঠাৎ করে সুর কেটে গেছে। যেন সব বাজনা থেমে যাওয়ার পর গায়ক অবাক হয়ে ভাবছে, পরের লাইনটা যেন কী ছিল?

দু-একবার ভাবল অনিন্দ্য – নাকাগাওয়াকে ফোন করলে কেমন হয়? ওই তো সঞ্চারীর জন্মদাতা। তারপর ওর মন বলল, পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে একজন হিউম্যানয়েড হওয়া সত্ত্বেও সে কেমন মানব গুণের অধিকারী হয়ে উঠেছে, এই ব্যাপারটা নাকাগাওয়াকে বোঝানো অসম্ভব। যন্ত্র মানবী এখন অনিন্দ্যর ঘরণী হয়ে ওঠায় হয়তো ভুলেও গেছে তার জন্মস্থানের কথা। আর তার যন্ত্র বিশারদ পিতা নতুন সৃষ্টি নিয়ে হয়ে গেছে মশগুল।      

 

মায়ের যাবার দিন যত এগিয়ে আসে, ততই সঞ্চারী যেন ঝিমিয়ে পড়ে। কখনো কখনো বাড়াবাড়ি রকম কেয়ারিং হয়ে ওঠে সঞ্চারী। ব্যাপারটা মায়ের নজরেও পড়ে। তিনি সঞ্চারীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, “চলে যাব বলে মন খারাপ করছিস? তোদের একটা ছেলেপুলে হলে তাদের কাঁথা বদলানোর জন্য ঠিক চলে আসব দেখবি। আসলে কী জানিস, নিজের জায়গাটা একেবারে নিজস্ব। তাই, ফিরে তো যেতেই হবে। তবে তোর জন্য আমারও খুব মন খারাপ করবে এবার।”

ফিরে যাওয়ার ঠিক দুদিন আগে অনিন্দ্যর মায়ের পা পিছলে গেল। বাথরুমের সামনের প্যাসেজে জল পড়েছিল, কেউ লক্ষ করেনি। পা স্লিপ করতে না করতে সঞ্চারীর রিফ্লেক্স একশন কাজ করল। দুটো বলিষ্ঠ হাত মায়ের পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল। অনিন্দ্যর মা একেবারে বেবাক। কী হয়ে গেল বুঝে উঠতে পারলেন না। সেই সময়ে অনিন্দ্য অফিসে ছিল। মাকে পিছলে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে গিয়ে হাতদুটো যথেষ্ট যান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল। সঞ্চারীর গায়ের জোর আর ক্ষিপ্রতা তাকে এতটাই অবাক করেছিল, মা নিজেও যেন বিমূঢ় হয়ে গেলেন।

বিকেলে অনিন্দ্য বাড়ি ফিরতে ঘটনাটা খুলে বলতেই অনিন্দ্য জোরে জোরে হেসে উঠে বলেছিল, “এতে অবাক হওয়ার কি আছে? ও জাপানের মেয়ে... মার্শাল আর্ট ওর রক্তে! ভাগ্যিস তুমি পড়ে যাওনি! নইলে এখানেই তিন মাস বিছানায় পড়ে থাকতে হত।”

বিপদ ঘনিয়ে এলো যখন বেডরুমে সঞ্চারী বজ্রপাতের মতো ঘোষণা করল, “আমি মায়ের সাথে যাচ্ছি, চন্দ্রবোড়ায়। মাকে একা পাঠানো ঠিক হবে না। আমি দেখেছি ওনার ব্লাড প্রেশার নিচের দিকে, আর সুগার লেভেল অনেকটা উপরে, যদিও অন্য বায়কেমিকাল...”

অনিন্দ্যর কানে কিছু ঢোকে না। একে তো সঞ্চারীকে একা সে কোথাও ছাড়েনি, তার উপর তার ডাক্তারি তাকে আরও বিস্মিত করে তুলেছে। সে সঞ্চারীর কথা শেষ হতে না হতে বলে, “দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি এত সব জানলে কী করে? ডাক্তার দেখিয়েছিলে?”

“আমি নিজেকে ডাক্তারি প্রশিক্ষন দিয়েছি। আমি এখন কারো নার্ভে সামান্য চাপ দিয়েই বুঝে নিতে পারি তার শারীরিক সমস্যা। হয়তো খানিকটা ফেস রিড করতেও শিখে গেছি। এই যেমন ধর, আমাকে ছেড়ে যে তুমি একটা রাতও থাকতে পারবে না, তোমার মুখ বলে দিচ্ছে। আমাকে যে তুমি কোনোদিন একা ছাড়নি, সেটাও তোমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কিন্তু আমারও একটা স্বাধীনতা আছে। মায়ের সাথে যাই। একা ফিরে আসব কিছুদিন পর। এটাতে একটা নতুন ট্রায়ালও হয়ে যাবে।”

সর্বনাশ, এতটা উন্নতি যে কোনও যন্ত্র মানবীর হতে পারে - ভাবতেই পারেনি অনিন্দ্য। এই কেস যে নাকাগাওয়ার হাতের বাইরে চলে গেছে, তাতে কোনও সন্দেহই নেই। আজ সঞ্চারী অনেক জেদি আর আত্মবিশ্বাসী। তাই সহজেই সে অনিন্দ্যকে নিজের দাবী জানিয়ে দিতে দ্বিধা করছে না।

ল্যাপটপ খুলে মায়ের আর সঞ্চারীর ফ্লাইটের টিকিট কেটে ফেলে অনিন্দ্য। যা থাকে কপালে। নিজে যেতে পারলে ভাল হত, কিন্তু সামনেই ওদের অফিসের তত্ত্বাবধানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল সামিট আছে। চন্দ্রবোড়ায় এই সময়ে তার যাওয়া অসম্ভব।

 

মায়ের সাথে সঞ্চারী চলে যাবার পর অনিন্দ্য খানিকটা একা হয়ে গেলেও কাজের মধ্যে ডুবে গিয়ে, সময় যে কখন দুটো পূর্ণিমা দেখে ফেলেছে, জানতেও পারেনি। এদিকে সঞ্চারী গ্রামবাংলার পরিবেশে মুগ্ধ। এখন সে পূর্ণ মানবিক গুণের অধিকারী। শুধু মায়ের অভিযোগ শুনতে হয়, “মেয়েটা মুখে কিচ্ছুটি দেয় না। সারদিন শুধু টোই টোই করে পাড়া বেরিয়ে বেড়ায়। ধানের খেত, আমের বাগান আর পুকুর ধারে ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গী জুটিয়ে নিয়েছে গোটা কতক। শহরের মেয়ে বলে তার খাতির খুব। রান্নার এত ভালো হাত বলে পাড়া প্রতিবেশীর মন জয় করে নিয়েছে সহজেই। তাই বলে আমার যত্নে ভাঁটা পড়েনি একটুও।”

মায়ের আনন্দে আনন্দিত হতে পারেনি অনিন্দ্য। বরং কোথায় একটা ভয় এসে হৃদয়ে জুড়ে বসেছিল। অতিরিক্ত মানবীর জীবন যাপন ওর পক্ষে মারাত্মক হতে পারে, সেটা নাকাগাওয়া না বলেও দিলেও অনিন্দ্যর জানা ছিল।

তার শঙ্কা মিথ্যে হল না। এক সপ্তাহ পর অনিন্দ্যর মা ফোন করে জানালেন, সঞ্চারী বিছানা ছেড়ে উঠছে না। কথাবার্তা প্রায় বন্ধ। ডাক্তার দেখানোর কথা বললে উত্তেজিত হয়ে হাতের ইশারায় বারণ করছে। অনিন্দ্যর চন্দ্রবোড়া চলে আসা অত্যন্ত জরুরি।

কাল বিলম্ব না করে রওনা দেয় অনিন্দ্য। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সঞ্চারীর গায়ের চামড়ায় চাকা চাকা দাগ দেখে চমকে ওঠে অনিন্দ্য। একে অজানা অসুখ, তার সাথে পরিচিতজন আর ডাক্তার দেখানোর জন্য মায়ের পিড়াপিড়ি - দুইয়ের দ্বন্দ্বে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে থাকে অনিন্দ্য। তাই আসল ডাক্তার নাকাগাওয়াকে ফোন করে।

সৃষ্টিশীল নাকাগাওয়া ততদিনে তার নতুন সৃষ্টির আনন্দে আকিরাকে প্রায় ভুলে গেছে। নাকাগাওয়ার একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে অনিন্দ্য। সঞ্চারীর সাম্প্রতিক জীবন যাত্রার বিশদ বিবরণে আর অসুখের ধারা শুনে স্কিন পয়েসনিং হয়েছে বলে রায় দেয় সে।

অনিন্দ্য বোঝে কোনও কারণে চন্দ্রবোড়ায় এসে সঞ্চারীর পলিমার নির্মিত চামড়ায় ভয়ঙ্কর কোনও ক্ষতি হয়ে গেছে। হয়তো পুকুরের জলে ডুব দেওয়া একটা কারণ হতে পারে। পুকুরের জলে আর্সেনিক থাকা বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু সঞ্চারীর কম্পিউটার মাথাও পুকুরের জলের ক্ষতিকারক রাসায়নিকের হদিস দিতে পারেনি কেন?

এবার মাকে সব খুলে বলতে হয় অনিন্দ্যকে। একদিনে মা সঞ্চারীকে কতটা ভালবেসে ফেলেছিলেন, তাকে ডুকরে কেঁদে উঠতে দেখে বুঝতে পারে অনিন্দ্য।

“পুকুরের জল আমার মেয়েটাকে কেড়ে নিল। কতবার বারণ করেছি, শোনেনি... আমি জানতাম শহরের মেয়ে, হয়তো সহ্য হবে না। তখন যদি জানতাম, ও রক্ত মাংসের নয়...”

“ভেঙে পড়ো না মা। ভরসা রাখ। বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই, ওকে সারিয়ে তোলা ডাক্তার কেন, ওর জন্মদাতার পক্ষেও সম্ভব নয়। আর্সেনিক পলিমার ভেদ করে ওর সিস্টেমকে ছুঁয়েছে। এখন আর কিচ্ছু করার নেই।”

অনিন্দ্যর হাত ধরে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সঞ্চারী। তার যান্ত্রিক হৃদয় যে মানবিক যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তার চোখের দৃষ্টি সেই কথা জানিয়ে দিচ্ছে। অনিন্দ্যর চোখের জলে ভেসে যায় সঞ্চারীর পলিমার শরীর। প্রাণের সমস্ত স্পন্দন থেমে যায় ধীরে ধীরে। অনিন্দ্য উঠে গিয়ে বাইরে দাঁড়ায়। সন্ধ্যে নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। পাখিরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে। আচ্ছা, সঞ্চারীর জীবনও কি পাখির দলের সাথে উড়ে গেছে? না না, যন্ত্র মানবীর আত্মা থাকে না। কিন্তু হৃদয়?

গিজার খুফু পিরামিড – এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের তৈরি প্রাচীন সৌধ মানুষকেই কীভাবে বিস্মিত করেছে তার সবচাইতে বড় উদাহরণ মিশরের পিরামিড। মিশরীয় সভ্যতা যে হাজার হাজার বছর আগে উন্নতির আকাশ ছোঁয়া সিঁড়িতে পা রেখেছিল, পিরামিডের সামনে দাঁড়ানো আজকের দিনের পর্যটক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে হয়ত সেই কথাই ভাবে। পিরামিড নিয়ে বিস্ময় জন্ম দিয়েছে তাকে ঘিরে উপকথার, কল্পনার জাল বুনেছে মানুষ, গড়ে উঠেছে মিথ। কারণ, সত্যিটা কোথাও লিপিবদ্ধ করে রেখে যায়নি পিরামিড গড়ার উদ্যোগীরা। আর যদি করে গিয়েও থাকে - কালের করাল থাবা, সেই সংবাদ গ্রাস করেছে চিরতরে। তাই বিজ্ঞানী, ভূতাত্ত্বিক, স্থপতি, নৃতাত্ত্বিক, সবাই ভিড় করেছে পিরামিডের চারপাশে, তার রহস্য অনুসন্ধানে এগিয়ে এসেছে।

বালুকাস্তীর্ন প্রান্তরে একদা মিশরের সমৃদ্ধির সাক্ষী, সুউচ্চ সৌধ, পৃথিবীর অন্যতম এক আশ্চর্য হিসাবে স্বীকৃত - গিজার পিরামিড, যাকে গ্রেট পিরামিডও বলা হয়। পাশাপাশি আছে আর দুটি অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার পিরামিড। স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, মিশরীয়রা কেন বানিয়েছিল এই পিরামিডগুলো? বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত রাজা ও রানীদের সমাধি বানাবার উদ্দেশ্যে পিরামিড বানানো হয়। রাজারা নাকি পাতালের শয়তানকে ভয় পেত। তাই তারা মারা যাবার পর মাটি থেকে উঁচুতে, স্বর্গের কাছাকাছি থাকা বেশি পছন্দ করত। আশ্চর্যের বিষয় হল, মিশরের এই পিরামিড থেকে কোনও শবাধার বা মমি, এমনকি কোনও লিপি কিন্তু আবিষ্কার করা যায়নি। কারো মতে শস্য সংরক্ষণের জন্য এই বিশাল পিরামিড বানানো হত। কিন্তু শস্যের নামগন্ধ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কোনও পিরামিডে। তবে পিরামিডের ভিতরের স্থাপত্য কর্ম দেখে শস্য সংরক্ষণশালা বলে আদৌ মনে হয় না।

মিশরের ঐতিহাসিকদের গবেষণা অনুযায়ী, মিশর সম্রাট খুফুর শাসনকালে গ্রেট পিরামিড বানানো হয়। তাই এই পিরামিডকে খুফু পিরামিডও বলা হয়ে থাকে। আনুমানিক ৪৫০০ বছর আগে নীল নদ উপত্যকায় গড়া ওঠে গিজার গ্রেট পিরামিড। প্রাচীনকালের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম আশ্চর্য স্মারক এই পিরামিড, আজও পৃথিবীর বুকে টিঁকে আছে - বাকি আশ্চর্যগুলি বিলীন হয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে।

গ্রেট পিরামিডের পাশে আরও দুটি ছোট পিরামিড আছে, যাদের নাম হল কফ্রে ও মেঙ্কাউরে। সম্ভবত খুফুর দুই সন্তান এই দুটি পিরামিড নির্মাণ করে, যারা পরবর্তীকালে মিশরের রাজা হয়। কিন্তু পিরামিড তিনটি যে এই সম্রাটদের দ্বারা নির্মিত, তার সপক্ষে খুব জোরালো যুক্তি খুঁজে পাওয়া দায়। অনেকটাই যেন অনুমান সাপেক্ষ।

প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের চাই দিয়ে তৈরি খুফু পিরামিড ১৩ একর জমির উপর বিস্তৃত। ১৮৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার তৈরির আগে পর্যন্ত এটাই ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ ইমারত। এর উচ্চতা ৪৮১ ফুট। যে পাথর দিয়ে পিরামিড তৈরি হয়, বিভিন্ন মাপের সেই পাথরের ওজন ৫০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত। এত ভারী ওজনের পাথর কীভাবে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তা স্থপতিবিদদের কাছে আর এক বিস্ময়। পাথরগুলো খুব সম্ভবত বয়ে নিয়ে আসা হয় নীল নদ থেকে কাটা খাল পথে। কিন্তু এত বড় মাপের পাথর আজকের দিনের অত্যাধুনিক ক্রেন ব্যবহার করেও অত উঁচুতে তোলা প্রায় দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। কীভাবে প্রাচীন পৃথিবীতে সেসব সম্ভব হল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ এমন মতও প্রকাশ করেন, সেই সময়ে এই কাজে নাকি লক্ষাধিক মানুষের শ্রম ব্যবহার করা হয়, যারা ছিল রাজা কুফুর ক্রীতদাস। সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অবশ্য অন্য তথ্য তুলে ধরেছে। পিরামিডের আসেপাশে খনন কার্জ চালিয়ে প্রত্নতাত্মিকেরা বেশ কিছু ঘরবাড়ি ও মানুষের কঙ্কাল আবিষ্কার করেছেন। তাদের মতে, এই জায়গায় পিরামিডের কারিগরেরা বাস করত এবং তাদের জীবনের মান বেশ উন্নত ছিল। উদ্ধার করা কঙ্কাল পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত করা হয়েছে, তারা যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার দাবার খেত। তাই মিশরের রাজা কুফু যে পিরামিড তৈরি করার কাজে ক্রীতদাসদের লাগিয়েছিলেন এমন ধারণা ভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এবার পিরামিডের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখা যাক, কী কী বিস্ময় সেখানে অপেক্ষা করে আছে। প্রবেশ দ্বার পেরলে প্রথমেই একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গ দেখা যাবে। সুড়ঙ্গ পার হয়ে দুটি পথ পাওয়া যায়, একটি নিচের দিকে ও আর একটি উপরের দিকে। উপরের দিকের সুড়ঙ্গ পথ দুভাগে ভাগ হয়ে, একটি চলে গেছে ভূমির সমান্তরাল অলিন্দে - যার শেষ রানীর কক্ষে, আর একটি পথ উপরে উঠেছে, - যাকে বলা হয় গ্র্যান্ড গ্যালারি, এই গ্যালারির শেষে আছে রাজার কক্ষ। সম্ভবত রাজা ও রানীর মরদেহ সংরক্ষণের জন্য এই দুটি প্রকোষ্ঠ বানানো হয়। প্রবেশ পথ পেরিয়ে নিচের দিকের সুরঙ্গটি আর একটি কক্ষে শেষ হয়েছে, যেটি একটি অন্তভৌম কক্ষ। বাস্তুকারেদের মতে, সুড়ঙ্গ পথের এত নিখুঁত শ্রেণী বিন্যাস (alignment) আজকের আধুনিক স্থাপত্যেও বিরল।

দুই ধরণের পাথর দিয়ে গোটা পিরামিডটি তৈরি - গ্রানাইট ও চুনাপাথর বা লাইমস্টোন। পিরামিডের ভিত্তি স্থাপন হয় গ্রানাইট পাথরে, বাকি সৌধ তৈরি হয় চুনাপাথর দিয়ে। পিরামিড নির্মাণ করার পর এক ধরণের বিশেষ চুনাপাথর, যার নাম তুরা লাইম স্টোন, সেই পাথর দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয় পিরামিড। মসৃণ এই পাথরের রং সাদা হওয়ায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে দূর থেকে নয়নাভিরাম পিরামিড যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তুরা লাইম স্টোনের এই আবরণ খসে যায় দুবার ভূমিকম্প হওয়ায়। এখনো পিরামিড চুড়ায় তুরা লাইম স্টোনের অংশবিশেষ অবশিষ্ট, অনেকটা যেন টুপির মত আজও বর্তমান।

গিজার পিরামিড যে ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়নি, তার কারণ ছোট ও বড় আকারের পাথরের এলোমেলো ব্যবহার। স্থপতিবিদেরা জানিয়েছেন, এই ভাবে পাথর সাজানোয় যে কোনও বড় সৌধে গঠনের স্থায়িত্ব আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্রেস ডিস্ট্রিবিউশন’। ফলে এক জায়গায় স্ট্রেস আহরিত হয়ে প্রবল বলের ক্রিয়ায় সৌধ ভেঙে পড়ে না। ছেনির সাহায্যে বিভিন্ন আকারের পাথর কেটে, মসৃণ করে, একের পর এক সাজিয়ে, গড়ে তোলা হয়েছিল পিরামিড। দুই পাথরের সংযোগ স্থলে কোনও সিমেন্ট জাতীয় পদার্থ ব্যবাহার করা হয়নি। শুধু পাথরের ভরের সামঞ্জস্য ব্যবহার করে এই বিশাল স্থাপত্য কর্ম ভূমিকম্পের প্রকোপ থেকে বেঁচে গেছে, যদিও আশেপাশের সমস্ত বাড়ি ঘর ও অন্যান্য স্থাপত্যকর্ম ধসে গিয়ে মাটিতে মিলিয়ে গেছে চিরতরে।

ফরাসী স্থপতিবিদ জিন পিয়েরে হাউডিন, তার সুদীর্ঘ আট বছরের গবেষণার ভিত্তিতে পিরামিড বানানোর কৌশল সম্বন্ধে নতুন আলোকপাত করেছেন ২০০৭ সালে। কম্পিউটর সিমুলেশনের সাহায্যে তিনি দেখিয়েছেন, গিজার পিরামিড বানানো হয়েছিল ভিতর থেকে বাইরে - অর্থাৎ আগে ভিতরের অংশে পাথর সাজিয়ে, তারপর কাঠের লিভারের সাহায্যে ভারী

পাথর সাজানো হতো চক্রাকার প্যাঁচালো সিঁড়ি বানিয়ে। তাঁর গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গ্র্যান্ড গ্যালারি বানানোর উদ্দেশ্য ছিল চেন-পুলি ব্যবস্থা ব্যবহার করে, ৭০ থেকে ২০০ টন ওজনের ভারী পাথর টেনে তোলা। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, গ্রীক বিজ্ঞানী হিরোডেোটস ভারী বস্তু টেনে তোলার জন্য চেন – পুলি আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু অনেক পরে, খৃস্ট পূর্ব প্রথম শতাব্দীতে। মিশরিয় ইতিহাসবিদদের মত অনুযায়ী, পিরামিডের গঠন শৈলী পর্যবেক্ষণ করতে হিরোডোটস নাকি মিশর ভ্রমণ করেছিলেন। পিরামিডের শীর্ষে পাথরের মসৃণ ইরেজি অক্ষর ‘ভি’ এর আকৃতি নির্দেশ করে ফরাসী স্থপতি হাউডিন জানিয়েছেন, চেন-পুলি ব্যবস্থায় শক্ত দড়ি ব্যবহার করা হয় এবং ‘ভি’ আকৃতির খাঁজ ব্যবহৃত হয় দড়ির সুগম যাতায়াতের জন্য। পাথর তোলার জন্য ব্যবহার করা হয় কাঠের ট্রলি। গ্র্যান্ড গ্যালারির দুই পাশে পাথরের বেঞ্চ লক্ষ করে হাউডিন অনুমান করেছেন, এই বেঞ্চের উপর দিয়ে কাঠের ট্রলিতে ভারী পাথর চেন-পুলি ব্যাবস্থায় টেনে তোলা হয়। পিরামিডের বাইরে জমি খুঁড়ে এমন ট্রলি সদৃশ কাঠের খিলান পাওয়া গেছে - কায়রোর সংগ্রহশালায় যা যত্ন সহকারে সংগৃহীত।

গ্রেট পিরামিডের স্থাপত্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট বিশেষ ভাবে বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। (১) ছয় হাজার হেক্টর ভিত্তি প্রস্তর কীভাবে সমান্তরাল করা হয়েছিল, (২) ৫০০ মাইল দূর থেকে গ্রানাইট পাথর কেমন করে বয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল, (৩) রাজার কক্ষ ভূমির সাথে সমান্তরাল করতে কী ধরণের পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহৃত হয়, (৪) লোহা আবিষ্কার না হওয়ায় শুধু মাত্র পাথর ও তামার তৈরি ছেনি দিয়ে এত কম সময়ে পাথর মসৃণ করা গিয়েছিল কী করে? এই সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও পাওয়া যায় না। বিভিন্ন মতের সম্মুখীন হয়ে ঘুরে ফিরে যেন একই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়, এমন অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা হয়েছিল কোন প্রযুক্তিতে?

খুফু পিরামিডের প্রধান কক্ষ - যাকে রাজার কক্ষ বলা হয়, সেটি লাল গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি। এর দৈর্ঘ ৩৪ ফুট, প্রস্থ ১৭ ফুট ও উচ্চতা ১৯ ফুট। ১৫৩ ফুট লম্বা সুউচ্চ গ্র্যান্ড গ্যালারি পার হওয়ার পর জমির সমান্তরাল এক সুড়ঙ্গ নিয়ে যাবে রানীর কক্ষে। এটি রাজার কক্ষ থেকে দৈর্ঘে কিছুটা কম হলেও, প্রস্থ ও উচ্চতায় প্রায় সমান মাপের। প্রবেশ পথের ঢালু সুড়ঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে ভূমির ২০ ফুট নিচে অন্তভৌম কক্ষে। এর দৈর্ঘ কিন্তু রাজার কক্ষের চাইতেও বেশি। এই কক্ষ কেন তৈরি করা হয়, এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র খুফুই দিতে পারতেন, যদি তিনি আজও বেঁচে থাকতেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, রাজা খুফুর মরদেহ সংরক্ষণের জন্যই এই কক্ষটি বানিয়ে, পরে মত পাল্টে, উপরের দিকে পৃথক কক্ষ বানানো হয়। কেউ এমন মতও প্রকাশ করেছেন যে, এই কক্ষ শেষ কথা নয়, আরও নিচে হয়তো অন্য গুপ্ত কক্ষ আছে - যার সন্ধান অনেক অভিযান করেও পাওয়া যায়নি।

রাজা ও রানী কক্ষ থেকে বাতাস চলাচল করবার জন্য দুটি করে অতি সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। এই চারটি সুড়ঙ্গ এমন ভাবে তৈরি করা হয়, যাতে চারটি সুড়ঙ্গ দিয়ে কাল্পনিক রেখা টানলে আকাশের বিশেষ চারটি তারাকে সেই রেখা নির্দেশ করে। মিশরের স্থপতিরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়ে কতটা উন্নতি লাভ করেছিলেন, গিজার পিরামিডের স্থাপত্যের এই উদাহরণ দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।

এত সুবিশাল পিরামিডে মাত্র তিনটি কক্ষ? হতেই পারে না। তাই মিশর সরকার ১৯৬৬ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ ডক্টর লুই আল্ভারেজকে (১৯৬৮ সালে নোবেল বিজয়ী হন) দায়িত্ব দেয় এক্স-রে ব্যবহার করে গিজার গ্র্যান্ড পিরামিডের ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রকোষ্ঠ আবিষ্কারের করবার জন্য। কিন্তু এত বড় স্থাপত্য কর্মের এক্স-রে হবে কীভাবে? তাই আল্ভারেজ স্থির করলেন, সূর্যের আলোর পথে বর্ষিত হওয়া কসমিক পার্টিক্‌ল ব্যবহার করতে হবে। ব্যস, তিনি তার দলবল নিয়ে পিরামিডের ভিতর বসিয়ে দিলেন স্পার্ক চেম্বার, কাউন্টার, ওঅসিলোস্কোপ, আরও সব যন্ত্রপাতি। কণা পদার্থবিদ আল্ভারেজ জানতেন, সূর্য থেকে ক্রমাগত বর্ষিত কসমিক পারটিক্‌ল পিরামিডের দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে পরে। পিরামিডের ভিতর ফাঁকা জায়গা যদি থাকে তবে সেই দিক থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি কণা আসবার কথা। আর যদি নিরেট দেওয়াল হয়, তবে চারিদিক থেকে প্রতি মিনিটে একই সংখ্যার কণা আসবে। আল্ভারেজের গবেষণার জন্য হিউলেট প্যাকার্ড কোম্পানি দিল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি, আনুষঙ্গিক খরচা খরচ যোগাল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি, আই বি এম দিল আধুনিক কম্পিউটর। কিন্তু ফলাফল শূন্য - কসমিক পারটিক্‌ল প্রায় ধরাই পড়ল না। কারণ জানতে অন্য বিজ্ঞানীরা লেগে পড়লেন। জানা গেল, চুনা পাথরে উপস্থিত জলের কারণে কসমিক পারটিক্‌ল আটকে যায়। কাজেই আল্ভারেজের ব্যবহৃত পদ্ধতি গুপ্ত কক্ষ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।

এর আগেও পিরামিডের পাথর যে জলে সম্পৃক্ত - একথা বিজ্ঞানীদের শুধু নয়, সাধারণ দর্শনার্থীদেরও জানা ছিল। মিশরের বালুকা বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিডের বাইরেটা একেবারে শুকনো খটখটে। তাহলে পাথরে এত জল এল কোথা থেকে? কেউ বললেন, এর নিচে দিয়ে বয়ে গেছে অনেক গুপ্ত জলের খাল, আবার কেউ দোহাই দিলেন – স্বর্গীয় বন্যার। বাইবেলে লেখা আছে সেই বন্যার কথা, যার প্রভাবে সারা পৃথিবী হয়েছিল জলমগ্ন, নোয়া তার নৌকোয় তুলে নিয়েছিল সর্ব প্রকারের দুটি করে প্রাণী। কারো মতে পিরামিডের গায়ে যে আঁচড়ের দাগ দেখা যায়, সেটা দীর্ঘকাল জলের তলায় থাকার ফল। এই বিষয়ে সঠিক কোনও যুক্তিগ্রাহ্য বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি এখনো। তবে স্বর্গীয় বন্যা না হোক, নীল নদের বন্যার ফলে জলে দীর্ঘকাল জলে ডুবে থেকে চুনা পাথরের জলে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক ভূবিজ্ঞানীরও।

সাধারণত পিরামিডের চারটি পার্শ্বীয় তল (lateral faces) দেখা যায়। কিন্তু গিজার পিরামিডের আটটি পার্শ্বীয় তলের পিছনে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী মাথার চুল ছিঁড়ে চলেছেন। তবে গিজার পিরামিডের আকৃতির সাথে জ্যামিতিক পিরামিডের তফাত এইখানে, গিজার পিরামিডের নিম্নতল বর্গাকৃতি। এর চারটি পার্শ্বীয় তল চার দিশায় সারিবদ্ধ – অর্থাৎ চারটি তল সঠিক ভাবে উত্তর দক্ষিন পুর্ব পশ্চিমকে নির্দেশ করে।

১৯৪০ সালে আকাশপথে যেতে যেতে এক পাইলট পিরামিডের আটটি পার্শ্বীয় তলের সন্ধান পান। খালি চোখে, মাটিতে দাঁড়িয়ে পিরামিডের এই অতিরিক্ত তলের হদিস পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র বিষুবন বা ইকুইনক্সের (দিন ও রাত যখন সমান সমান হয়) সময় নিচে দাঁড়িয়েও খালি চোখে পিরামিডের আটটি পার্শ্বীয় তলের হদিস পাওয়া যায়, কারণ তখন সূর্যালোক সরাসরি পিরামিডে পড়বার জন্য, ছায়া সৃষ্টি হয়ে বিভ্রম ঘটায় না। খুফু পিরামিডের সঠিক দিশা-নির্দেশ কোন কৌশলে করা হয়েছিল, সে বিষয় বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে - কারণ, কম্পাসের আবিষ্কার কিন্তু এর অনেক পরে হয়েছে। তাহলে অনুমান করা যেতেই পারে, পিরামিড স্থপতিরা গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান গণনা করেই পিরামিড গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এত সঠিক মাপজোকের পিছনে তাদের কী উদ্দেশ্য ছিল, তা সঠিক ভাবে আজও জানা যায় না।

এবার দেখা যাক খুফু পিরামিডের ভিতরে অবস্থিত সুরঙ্গগুলির নির্মাণ বৈশিষ্ট কী কী। ভিত্তি বরাবর যে ঢালু সুরঙ্গটি নিচের দিকে নেমে গেছে, তার কৌণিক মাপ ২৬ ডিগ্রি - এতটুকু হেরফের নেই। আবার উপরের দিকে যে সুরঙ্গটি গ্র্যান্ড গ্যালারি বরাবর উঠে গেছে, সেটিও ২৬ ডিগ্রি কৌণিক মাপে বিন্যস্ত। এই সুরঙ্গগুলির মাপ এমনই যে দর্শনার্থীকে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হবে লম্বা পথ। মিশরীয় বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, চোরেদের নাস্তানাবুদ করতেই সুরঙ্গের গঠন এমন ভাবে করা হয়।

সম্প্রতি পদার্থবিদেরা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কারের দাবী করেছেন। এই বিজ্ঞানীরা প্রমান করবার চেষ্টা করেছেন - গিজার গ্রেট পিরামিড তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ অনুরণিত হয়ে এক জায়গায় একত্রিত করতে পারে। আশ্চর্য জনক ভাবে দেখা গেছে, বিশেষ তরঙ্গ দৈর্ঘের তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ একীভূত হয় রাজা ও রানীর কক্ষে। অন্য তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়ে যায়। তাহলে কী সূর্য শক্তির ব্যবহার করার বিশেষ কৌশল হস্তগত ছিল পিরামিড নির্মাতাদের? এর সপক্ষেও এখনো পর্যন্ত কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী, ভবিষ্যতের অনুসন্ধান গিজার পিরামিডের অনেক রহস্যই উদ্ঘাটিত করতে সক্ষম হবে।

সাড়ে চার হাজার বছর আগে মিশরের মানুষ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিল, একথা মানতে চান না অনেক বিশেষজ্ঞই। তারা এমন কথা বলেন যে, আজকের বিজ্ঞান পিরামিডের যে বিশেষ তাৎপর্য আবিষ্কার করেছে, তা নিতান্তই কাকতালীয়। অনেকে প্রমান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, অনেক কম লোকবলে, নিম্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এমন সৌধ তৈরি করা সম্ভব। আবার বিজ্ঞানীদের একদল বলেছেন, মাত্র দুই দশকে এই বিপুল পিরামিড গড়ে তুলতে হলে এমন প্রযুক্তি প্রয়োজন ছিল, যাতে দিনে বারো ঘণ্টা কাজের হিসেব ধরলে, প্রতি আড়াই মিনিটে একটি করে পাথরের চাঁই কেটে বসানো হয় - লোকবল ও উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া যা অসম্ভব।

কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই শুধুমাত্র নিজেদের শৌর্য বীর্য অমর করে রেখে যাবার জন্যই পিরামিড বানাতেন মিশরের রাজা ফারাওরা, একথা যারা পিরামিডকে সশরীরে চাক্ষুষ করেছেন, তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া অবশ্যই কষ্টকর। কল্পবিজ্ঞান ফ্যান্টাসিও গুজব ছড়িয়েছে পিরামিড ঘিরে। ভিন গ্রহের প্রাণী, অর্থাৎ এলিয়েনদের নাকি হাত ছিল পিরামিড তৈরির পিছনে - এমন মতও অনেকে প্রকাশ করেছে।

পিরামিড তৈরির পিছনে নির্মাতাদের কী উদ্দেশ্য ছিল সঠিক ভাবে জানা না গেলেও, কোনও এক বা একাধিক উদ্দেশ্য যে ছিল - সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিজ্ঞানীদের নিরলস সাধনা, খুফু পিরামিডের নির্মাণ শৈলীর অনেক বিচিত্র জটিল বিষয় আবিষ্কার করায়, ‘কাকতালীয় ভাবে পিরামিড তৈরি হয়েছিল’- এমন ধারণার অস্তিত্ব আধুনিক জগতে বিলীন করে দিয়েছে। বরং হদিস দিয়েছে উন্নততর এক মানব জীবনের।

তথ্যসূত্র :

1. The message of the sphinx - Graham Hancock & Robert Bauval, Three Rivers Press New York, 1996.

2. The Egypt Code - Robert Bauval, The Disinformation Company Ltd., 2008.

3. Electromagnetic properties of the Great Pyramid: First Multipole Resonances and Energy Concentration - Mikhail Balezin, Kseniia V. Baryshnikova, Polina Kapitanova, and Andrey B. Evlyukhin, Journal of Applied Physics 124, 034903 (2018)

বুম্বা


বুম্বাকে আমি প্রথম দেখি এক বিয়ে বাড়িতে। নেমন্তন্ন খেতে যাব বলে হাতে একটা মোটাসোটা গল্পের বই নিয়ে বিয়ে বাড়ি ঢুকে দেখি তখনো তেমন কিছু অতিথি সমাগম হয়নি। কবজি উল্টে ঘড়ি দেখে বুঝলাম একটু তাড়াতাড়িই আসা হয়ে গেছে। যাক, এসেই যখন পড়েইছি, মোটা বইটা কোলের উপর রেখে একটা চেয়ারে সোজা হয়ে বসলাম।

বিয়ে বাড়ির লোকজন খুব ব্যস্ত সমস্ত হয়ে আসা যাওয়া করছে। বর মশাই কখন আসবে জানা নেই। বাড়িটা একটা একান্ন বর্তি পরিবার। এ বাড়ির সবচাইতে ছোট ছেলের মেয়ের বিয়ে। সে এক কলেজে পড়ায়। মাঝে মধ্যে আমার বইয়ের দোকান থেকে বই টই কিনে থাকে। সেই সুত্রে আলাপ। ওর অনুরোধে দুএকবার কলেজ স্ট্রিট থেকে খুঁজে পেতে দুচারটে দুস্প্রাপ্য বই এনে দিয়েছিলাম। তার নিমন্ত্রণেই বিয়ে বাড়িতে পদার্পণ। আর কাউকে চিনি না বলে একটু চিন্তায় আছি। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, “কে আপনি?”, তো পরিচয় কী দেব সেই নিয়ে মাথা চুলকচ্ছি। পরিচয় যুতসই না হলে বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। জিজ্ঞাসা করলে কী বলব? বইয়ের দোকানদার? আজকাল লোকে বই টই বিশেষ পড়ে না। বইয়ের দোকান চালাই শুনলে লোকে কেমন যেন করুণার চোখে দেখে।

সার দেওয়া চেয়ারে গুটি কতক লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। তারা অতিশয় সাধারণ মাপের। অন্তত এ বাড়ির সাথে খাপ খায় না। দুঃস্থ আত্মীয়ও হতে পারে। ভিতরের ঘরে হালে পানি না পেয়ে হয়ত বাইরে এসে সময় কাটাচ্ছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি আট দশ বছরের রোগা পটকা একটা ছেলে চেয়ারে বসে একমনে মোবাইলে ভিডিও গেম খেলে চলেছে। আজকাল এই হয়েছে বাচ্চাদের এক বেয়াড়া ধরণের এ্যাডিকশন। সময় কাটানোর জন্য ভাবলাম এর সাথেই খানিক আলাপচারিতা করা যাক।

আমি নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কী খেলছ বাবু? আমায় দেখাবে?”

সে মোবাইলের বোতাম টিপতে থাকল। কিচ্ছু বলল না। আমি ওর সাথে কথাবার্তা চালাবার জন্য বললাম, “তুমি স্কুলে পড়? কোন স্কুল, কী ক্লাস?”

ছেলেটি মোবাইলে গেম খেলা বন্ধ করে কানফাটানো তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “এত প্রশ্ন কর কেন তুমি? আমাকে ডিস্টার্ব করছ! বলব কেন তোমাকে? তুমি কে?”

সভয়ে বলে উঠি, “তুমি খেল বাবু। কিছু বলতে হবে না। খেল তুমি, খেল। তোমাকে ডিস্টার্ব করার এতটুকু ইচ্ছে আমার নেই।”

“না খেলব না। তুমি নষ্ট করে দিয়েছ। তুমি বাজে লোক। বিচ্ছিরি।”

“আচ্ছা আচ্ছা বাবু, আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি চলে যাচ্ছি।”

চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াচ্ছি, হটাত তিনি আমার হাতের বই কেড়ে নিয়ে ফ্যারফ্যার করে মোড়ক ছিঁড়ে ফেললেন। মোড়ক উন্মুক্ত, “ছিন্নমস্তার অভিশাপ” বেরিয়ে পড়ল। বিব্রত হয়ে হাত থেকে বই কাড়তে গিয়ে বিপদ হল, তিনি চেয়ারের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে দৌড়াতে লাগলেন। আমিও ছুটি তার পিছন পিছন। সে বাড়ির বারান্দায় উঠে পড়তেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক জিন্স-টপ সুশোভিত, হিলাসনা সুন্দরী। হিল তোলা জুতোর উপর বরতনু ব্যালান্স করতে করতে তিনি তেড়ে এক ধমক লাগালেন, “বুম্বা!!! হোয়াট আর ইউ ডুইং? ফেরত দাও, এখুনি আঙ্কেলের বই ফেরত দাও। নটি বয়, এমন করে কখনো?”

ভদ্রতা করে বলি, “থাক থাক, বাচ্চা তো! ছেড়ে দিন। আমি না হয়...”

“ইস, আপনার বইটার কভার ছিঁড়ে গেছে। আপনি নিশ্চই গিফট করছিলেন, এখন...”

ছিন্নমস্তার করাল বদনের দিকে তাকিয়ে বলি, “হেঁ হেঁ, আর একটা মলাট না হয় পাশের দোকান থেকে...”

“বুম্বা, যাও আঙ্কেলকে সরি বল, বল বলছি। ইউ নটি বয়!”

সজোরে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিল বইটা, আমার ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ মাটিতে গড়াগড়ি। মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ধুলো ঝাড়লাম। বইয়ের কারবারি বলে বইয়ের উপর আমার একটু দুর্বলতা আছে। বুম্বার মা ছেলের এক হাত চেপে ধরে আমার মাটি থেকে বই কুড়নোর দৃশ্য দেখতে লাগলেন। তারপর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অন্তঃপুরে বিলীন হলেন। আমি চললাম ছিন্নমস্তাকে পোশাক পরাতে।

***

কলেজের এক অধ্যাপক প্রায়ই আমার দোকানে আসেন বই কিনতে। তার আবার একটু লেখালেখির বাতিক আছে। এক আধটা বই আমার দোকানে বিক্রি হবার জন্য রেখেও ছিলেন। ক্রেতা না পেয়ে, ধুলোয় বিবর্ণ হয়ে, শোকেসে তারা আজও বিরাজমান। তা তিনি আবার একটা বই লিখেছেন। আমাদের এই মফস্বল শহরে তো আর কলেজ স্ট্রিট নেই। তাই বই ছাপা হয়ে যাওয়ার পর তার মোড়ক উন্মোচন হল তারই বাড়িতে। সেখানে মাঝে মধ্যে সাহিত্যের আসরও বসে। আমি অবশ্য সেই আসরে কোনোদিন আসিনি।

অধ্যাপক আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন একদিন দোকানে স্বয়ং এসে। জানাতে ভুললেন না, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে মিষ্টি মুখের ব্যবস্থাও আছে। জঠর দেবতার পুজো না থাকলে আজকাল কেই বা এমন সব অনুষ্ঠানে যেতে চায়! এও জানা আছে, আমাকেই প্রকাশিত বই বিক্রির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। উনি আবার একটু সেকেলে, ফেসবুক টুক করেন না। কাজেই বিজ্ঞাপনের অভাবে একটা বইও বিক্রির সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

অধ্যাপক সামন্তর বাড়িতে গিয়ে দেখি জনা বিশেক লোকের সমাগম হয়েছে তার ড্রয়িং রুমে। বুম্বা সেখানে বিরাট একটা খেলনা এরোপ্লেন নিয়ে সারা ঘর জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ঢুকতে গিয়ে তাই আমি একটু থমকে গেলাম। প্রমাদ গনলাম, এখানেও বুম্বা?

বুম্বার মা ঘরে ঢুকলেন হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে। আমাকে দেখে একগাল হেসে বললেন, “আপনি? এখানে?” যেন আমি এক অনাহূত অতিথি।

অধ্যাপক সামন্ত বললেন, “ইনি ইন্দিরা, সম্পর্কে আমার শ্যালিকা হন। আর ইনি বিমল বাবু। স্টেশন রোডে এনার একটা বইয়ের দোকান আছে।”

উপস্থিত অতিথিরা আমার দিকে তাচ্ছিল্য পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। ভাবখানা, বইয়ের দোকানদার বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অনুস্থানে আবার কী করছে। এমন ভাবার কারণ আছে। আমার না আছে গাল ভর্তি দাড়ি, না আছে কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা। একটা ভদ্রস্থ পাঞ্জাবিও নেই।

প্রাথমিক চা পর্ব সারা হলে বুম্বার মা বলে উঠলেন, “এবার অধ্যাপক সামন্তর লেখা কবিতার বই – ‘আবার আসিব ফিরে’র মোড়ক উন্মোচন হবে। আপনারা একটু কাছে এগিয়ে আসুন।”

সমবেত করতালিতে সামন্ত মশাইয়ের ড্রয়িং রুম কেঁপে উঠলো। তার চাইতে জোরে কেঁপে উঠল অন্তপুর থেকে এক মহিলা কণ্ঠের আর্তনাদ। বুম্বার মা ভিতরে ছুটলেন। গিফট র‍্যাপে মোড়া কবিতার বইগুলো অনুন্মোচিত রয়ে গেল। সামন্ত মশাই ড্রয়িং রুম ছেড়ে শ্যালিকার পিছন পিছন ছুট লাগালেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “নিশ্চই বুম্বা কিছু ঘটিয়েছে।”

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বুম্বাকে চিনতে আমার বাকি নেই। যে কোনোরকম দুষ্কর্ম করায় সে সিদ্ধহস্ত। বুম্বা মা সহ ফিরে এলে জানা গেল, সে রান্নাঘরের ওয়াটার ফিল্টারের কল খুলে দিয়ে কোন ফাঁকে পালিয়ে গিয়েছে। রান্নাঘর জলে থৈথৈ। বাড়ির কাজের লোক রেগে আগুন।

কিছুক্ষণ পর বুম্বা ড্রয়িং রুমে ফিরে এসে মুখ গোঁজ করে বসে থাকল। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন সামন্ত মশাইয়ের শ্বশুর মশাই। অনুষ্ঠান শেষে সবার হাতে একটা করে মিষ্টির প্যাকেট ধরিয়ে দেওয়া হল। অধ্যাপককে বিদায় জানিয়ে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি, দেখি আমার প্যাকেটটা বেমালুম বেপাত্তা। বুঝলাম আবার বুম্বার কাজ। আর একটা প্যাকেট চাইতে ভদ্রতায় বাধল। বইয়ের দোকানদার হতে পারি, তাই বলে হ্যাংলা হিসাবে নাম কেনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। অগত্যা ভগ্ন হৃদয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখি মিষ্টির প্যাকেট থেকে একটা একটা করে খাবার পাঁচিলের উপর দিয়ে প্রজেক্টাইল বানিয়ে ছুঁড়ে চলেছে বুম্বা। বেজায় রাগ হল। পিছন থেকে ওর ডান কান ধরে মুচড়ে দিয়ে বলি, “আমার জিনিষের উপরই তোর এত রাগ কেন রে হতভাগা?”

বুম্বা উঠে দাঁড়ালো। তারপর পা দিয়ে আমার পায়ের পাতার উপর সজোরে একটা লাথি কষিয়ে দিল। আমি কঁকিয়ে উঠে আবার ওর কান ধরতে যেতেই দেখি, বুম্বার মা। আমাকে দেখে আবার বলে উঠলেন, “কী বিমল বাবু, বুম্বার সাথে গল্প করছেন বুঝি! আপনার তো বইয়ের দোকান। আসবেন আমাদের বাড়িতে। ওকে গল্প শুনিয়ে যাবেন মাঝে মধ্যে। বেশি দূর না, এই কাছেই থাকি আমরা। জানেন, বুম্বার বাবাও অনেক গল্প জানে। কিন্তু, কি করবে বলুন? সময় পায় না। অফিস নিয়ে সদাব্যস্ত!”

মনে মনে ভাবি, বুম্বাকে গল্প শোনাতে এসে শেষে নিজের প্রাণটাই খোয়াই আর কী! বুম্বার বাবার প্রক্সি দেওয়ার দুর্মতি যেন ইহজীবনে না হয়!

***

তারিণী মোহন সিনিয়ার সেকেন্ডারি স্কুলে আমি নিয়মিত স্কুলের বই সাপ্লাই করে থাকি। অনেকদিন ওরা আমার পেমেন্ট আটকে রেখেছিল। রিসেপ্সনিস্টের অনুমতি নিয়ে প্রিন্সিপালের ঘরে ঢুকতেই তিনি একগাদা ফাইলের উপর থেকে চোখ তুলে বলে উঠলেন, “আরে বসুন বসুন বিমল বাবু। আপনার চেক রেডি করাই আছে। সই করে দিয়ে দিচ্ছি। আপনি একটু অপেক্ষা করুন।” বলেই তিনি বেল বাজিয়ে এটেন্ডেন্টকে ডেকে ফাইল আনতে নির্দেশ দিয়ে আবার একমনে কাজ করে যেতে লাগলেন।

আমি এসির ঠাণ্ডা হাওয়ায় শরীর জুড়াচ্ছি। হটাত প্রিন্সিপালের ঘরের দরজা সজোরে খুলে গেল। বিরক্ত মুখে উনি দরজার দিকে তাকালেন। আমার পিঠের পিছন থেকে কোনও মহিলা কণ্ঠ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “ম্যাম, আবার এই ছেলেটা সাংঘাতিক এক কাণ্ড ঘটিয়েছে”!

পিছন ফিরতেই শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। আবার বুম্বা। পৃথিবীর যেখানেই যাই, বুম্বা আমার পিছন ছাড়বে না, এটাই সত্য।

প্রিন্সিপাল বিরক্তি এড়াতে পারলেন না, কিন্তু সামনে একজন বাইরের লোক উপস্থিত ভেবেই হয়ত নিজেকে সংযত করে জিজ্ঞেস করলেন, “আবার কী ঘটাল এ? তোমাদের না বলেছিলাম একটু নজরে রেখ ছেলেটাকে...”

“ম্যাম, আজ যা করেছে, ওর সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বায়োলজি প্র্যাক্টিকাল ক্লাসে আমাদের মাছের একোয়ারিয়ামে হাত ঢুকিয়ে মাছ বার করে এনেছে। শুধু তাই না, কোথা থেকে যেন একটা ব্লেড নিয়ে এসে সেই মাছটাকে আবার কেটেওছে।”

“আশ্চর্য। প্র্যাক্টিকাল ক্লাস চলছে, আর কেউ ওকে দেখতে পেল না?”

“তখন ক্লাস ছিল না। নিজের ক্লাস থেকে বেরিয়ে রোজ সারা স্কুল ঘুরে বেড়ায়। গার্জেন কল করেও কিছু করা যায়নি। যেই দেখেছে প্র্যাক্টিকাল রুমে কেউ নেই অমনি...। ভাগ্যিস মাত্র একটা মাছই কেটেছে, নইলে আজ কি যে হত!”

বুম্বা, এতক্ষন তাকে নিয়ে যা আলোচনা হচ্ছে, গম্ভীর মুখে পিছনে হাত রেখে এতক্ষণ শুনে যাচ্ছিল। এবার সে জোরের সাথে প্রশ্ন করে, “বাজার থেকে আমরা যে মাছ কেটে আনি রোজ, তখন কী হয়? আমি কাটলেই দোষ?”

সঙ্গের দিদিমণিটি চেঁচিয়ে উঠে বলে, “এ্যাইইইই, ক্লাস টু এর ছেলে, মুখে আট পাকা কথা কেন রে! এমন ছেলের মুখ থাবড়ে লাল করে দিতে হয়।”

“করে দেখো, আমি তোমার মুখের কী করি!” বুম্বা অস্ফুটে বলে। মনে হয় যেন আমাকে বলল। দিদিমণিটি এত রেগে ছিলেন, বোধহয় কথাটা তার কানে যায়নি।

প্রিন্সিপাল রেগে উঠে বললেন, “গার্জেন কল কর। এখুনি। আজই এই ছেলের টিসি দিয়ে দেব। দুষ্ট গরুর চেয়ে...”

“শূন্য গোয়াল ভাল”, টিকাটি সম্পূর্ণ করল বুম্বা স্বয়ং। দুই দিদিমণির সম্মিলিত চিৎকারে যেন ঘরের মধ্যে বোমা ফাটল। আমি দেখলাম, আজ আর চেক পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই গুটি গুটি সবার অলক্ষ্যে বাইরে চলে এলাম।

***

হপ্তা দুয়েক কেটে গেছে। বুম্বার ঘটনা ভুলে গিয়েছি, কারণ স্কুলের দারোয়ান এসে পাওনা চেকটা দিয়ে গেছে। টাকা অনেক ঘটনা ভুলিয়ে দেয়। একদিন সকালে দোকান খুলে সবে বসেছি। এ পাড়ার খিটকেলে বুড়ো রোজকার মতো দোকানের বাইরের টুলে বসে দু নম্বর কাগজ ছেড়ে তিন নম্বরে হাত বাড়িয়েছে। বইয়ের সাথে দুচার খানা খবরের কাগজ না রাখলে মান থাকে না। শুধু খবরের কাগজ পড়া উদ্দেশ্য নয় বুড়োর। দোকান খোলার পর দুখিরাম চাওয়ালার দোকান থেকে বাচ্চা ছেলেটা চা দিয়ে যায়। বয়স্ক মানুষের সামনে একা একা কী আর চা খাওয়া যায়? দুখিরামের ছেলেটাকে আর বলতে হয় না- নিজে থেকেই দুগ্লাস চা রোজ দোকানের কাউন্টারে ঠকাঠক নামিয়ে দেয়। বিনি পয়সায় চা আর খবর সাঁটানো বুড়োর মুন্ডুপাত করতে করতে ধুপকাঠি জ্বালিয়েছি – বামাকণ্ঠ মুখরিত হল, “আরে কাকাবাবু, কেমন আছেন? অনেকদিন দেখি না!”

মুখ তুলে দেখি ইন্দিরা, বুম্বার মা। সাতসকালে মনে হচ্ছে একরাশ জুঁই ফুল যেন! আজ ময়ূরকণ্ঠী রঙের শাড়িতে। খিটকেল বুড়ো একগাল হেসে বলে, “তোমাকে তো ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে মা! ঠিক যেন সরস্বতী। তো এত সকালে কোথায় চললে?”

সাক্ষাত সরস্বতীকে দেখে আমার হাতদুটো আপনা থেকেই বুকের কাছে জড়ো হয়ে নমস্কার জানাল। ইন্দিরা আমাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল।

“এইটা আপনার দোকান? আমরা খুব বেশীদিন আসিনি তো, তাই জানতাম না”

“এখন চিনে গেলেন, আর আসতে অসুবিধা হবে না নিশ্চই”, ভদ্রমহিলাকে ভদ্রতা করে বলি।

নাছোড়বান্দা বুড়ো আবার বলে উঠলো, “কোথায় গিয়েছিলে সেজেগুজে, সেটা বললে না তো!”

“আর বলবেন না। বুম্বার স্কুল থেকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ওর বাবা যা ব্যস্ত, তার সময় নেই ছেলের স্কুলে হাজিরা দেওয়ার। আর ছেলেটা যা দুষ্টু হয়েছে না, বলার নয়! স্কুলের টিচারগুলোও হেয়েছে তেমনি। একটা বাচ্চা ছেলের দুষ্টুমি ম্যানেজ করতে পারে না, তারা আবার নিজেদের টিচার বলে!”

আমি হেসে ফেলে বলি, “আবার কী করল বুম্বা?”

“কিচ্ছু না। শুধু একটু বাচ্চাদের টিফিন খেয়ে ফেলেছে। কি কথাটাই না শোনালো! আচ্ছা, আমাদের সময় এমন দুষ্টুমি তো কতজন করত! তার জন্য গার্জেন কল হয়েছে কখনো? হয়নি, বলুন!”

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাই। খিটকেল বুড়ো সরব হয়, “বাচ্চারা তো দুষ্টুমি করবেই। তাদের শাসন করতে হবে, বোঝাতে হবে। ওর বাবাকে বলে দেখ।”

“তবেই হয়েছে কাকাবাবু। তার সময় হলে তো! যত ঝক্কি আমার উপর।”

আমি বুম্বার নামে অভিযোগ দায়ের করবার মতো বলে উঠলাম, “কিন্তু এই সেদিন স্কুলের ল্যাবে গিয়ে যে বুম্বা মাছ ধরে ডিসেকশন করে ফেলল, সেটা কী সমর্থন করা যায় বলুন?”

মুখ ফস্কে বলে ফেলেই ভাবলাম, এবার আর ভবিষ্যতে এনার হাতে একটা বইও বিক্রি হবার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বুম্বার মা আমার কথায় উত্তেজিত হয়ে কাউন্টারের একেবারে সামনে এগিয়ে এসে বললে, “আপনিও জেনে গেছেন সেকথা? জানেন, আমিও প্রিন্সিপালকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছি, আগে আমাকে এক্সপ্লেন করা হোক, বুম্বা ব্লেডটা কোথায় পেল, তারপর ওর বিচার করবেন।”

আমার সস্তা মোবাইল অসময়ে বেজে ওঠায় কল রিসিভ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বুম্বার মায়ের মুখে তার ছেলের দুষ্কর্মের সাফাই শোনা আর হয়ে উঠল না। অপরপ্রান্তে অধ্যাপক সামন্ত। তিনি আবার দশ কপি ‘আবার আসিব ফিরে’ দোকানে রেখে যাবেন বলছেন। বিক্রি না হওয়া বইয়ের চাপে তাকে আর জায়গা নেই। তাকে বোঝাতে লাগলাম, আপাতত দু কপিতেই হবে।

***

সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই নববর্ষ এসে গেল। হালখাতার পাটই রাখিনি দোকানে। শুধু খান পঁচিশেক “বাৎসরিক রাশিফল” কাউন্টারে সাজিয়ে রেখেছিলাম। সবকটি বিক্রি হয়ে গেছে, কাজেই মনের আনন্দে দশ টাকার আলুর চপ আনিয়ে সবে কামড় দিয়েছি, বোমারু বিমানের মতো বুম্বা এলো মায়ের সাথে।

“দাদা, বুম্বাকে একটু আপনার কাছে রেখে যাব। আমার না একটা খুব দরকারি কাজ পড়ে গেছে। বুঝতেই তো পারছেন, ওর বাবা নেই... মানে বাড়ি থাকে না... আজ আবার ওদের ইশকুল ছুটি।”

সর্বনাশের শেষ নেই আজ! বুম্বাকে দোকানে রাখব? পয়লা বৈশাখের শুভ দিনে আশু বিপদ বুঝে আমি বলে উঠি, “আমি, মানে বুম্বাকে সামলানো...”

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বুম্বার সুন্দরী মা শরীরে বিচিত্র ভঙ্গী তুলে, আমাকে বিবশ করে বললেন, “ও কিচ্ছু করবে না। আমি ওকে বুঝিয়ে বলেছি। বুম্বা, নো দুষ্টুমি! আই নো ইউ আর এ গুড বয়...”

“না আআআআ, আমি গুড বয় হতে চাই না। আমি থাকব না। তোমার সাথে যাব।”

বুম্বার চিৎকারে রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছিল, তারা সচকিতে দোকানের দিকে তাকাল। কী করব ভেবে পাচ্ছি না।

“তুমি বরং আঙ্কেলকে পোয়েম শোনাও...।

“না আআআআ, শোনাব না আআআ। আমি কিচ্ছু শোনাব না।”

“বুম্বা বিহেভ ইয়োরসেলফ। তুমি জান, আঙ্কেলের কাছে কত বই। উনি কত গল্প জানেন! তোমাকে উনি গল্প পড়ে শোনাবেন।”

মনে হল, বলে দিই, দোকানের বইগুলো থেকে একটা গল্পও কোনোদিন পড়ে দেখিনি। কোন দুঃখে পড়তে যাব। ময়রা কী তার দোকানের মিষ্টি চেখে দেখে নাকি?

নাছোড়বান্দা বুম্বার মা কিন্তু পনের মিনিটের চেষ্টায় ছেলেকে রাজি করিয়ে ছাড়লেন, একগাদা চিপসের প্যাকেটের বিনিময় মুল্যে। শাড়ির আঁচল উড়িয়ে ইন্দিরার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম নিজের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করে।

“তোমার মোবাইলটা দেখাও তো?”

চমকে উঠে বুম্বার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমার ফোন দিয়ে তুমি কী করবে?”

“আঃ, যা বলছি কর না। আমি গেম খেলব।”

“আমার মোবাইলটা স্মার্ট নয় বাবা, গেম টেম কিছুই খেলা যায় না।”

“ধুর, ল্যাপটপও নেই দেখছি। নাঃ, তুমি কোনও কম্মের নও।”

“কম্মের হলে কী আর বইয়ের দোকান দিতাম?”

বুম্বা কী বুঝল কে জানে! আমার দশ আটের দোকানের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে, উঠে গিয়ে একটার পর একটা বই টেনে বার করতে লাগল। আমি হাঁ হাঁ করে তেড়ে যেতে গিয়েও থেমে গেলাম। যেদিকে ছেলেটা বই ঘাঁটাঘাঁটি করছে, সেখানে মান্ধাতার আমলের পুরনো ইশকুলের বই রাখা আছে। দুচারটে ছিঁড়ে দিলেও পৃথিবীর বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে না।

আমার মোবাইল বেজে উঠতে ক্যাশ বাক্সের পাশে রাখা মোবাইল তুলে নিলাম। অধ্যাপক সামন্ত। বছরের প্রথম দিনই মুডটা খারাপ হয়ে গেল।

“বিমল বাবু, কেমন আছেন? শুভ নববর্ষ।”

“শুভ নববর্ষ স্যার”, গলার তিক্ততা যতটা সম্ভব ঢেকে ঢুকেই বললাম।

“আমার কবিতার বইগুলোর কিছু হল?”

আর একটু হলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, নতুন বলে এখনো দোকানের পোকাদের পছন্দ হয়নি। কদিন যেতে দিন, ওদের পেটেই যাবে, ওইসব দূর্বোদ্ধ কবিতার বই পড়ে কে আর পেট গরম করবে? তার চাইতে বচ্ছরকার দিনে রসগোল্লা কিনে বাড়ি ফিরবে বরং।

আমাকে নিরুত্তর দেখে অধ্যাপক অনুনয় করে বললেন, “একটু প্রচার করুন। কাউন্টারের সামনে রেখে দিন। আপনার ছোট্ট দোকানে বইয়ের ভিড়ে কারো চোখে পড়ছে না। আপনি বুঝতে পারছেন না, জীবনানন্দর পর এমন বই আর কেউ লেখেননি।”

ইচ্ছে হল বুম্বার হাতে অধ্যাপকের বই তুলে দিই। যথার্থ সম্মান পাবে। তাকিয়ে দেখি খুব মনোযোগ দিয়ে বুম্বা একটা বই খুলে দোকানের মেঝেতে বসে পড়ে চলেছে। আমার অমনোযোগ অধ্যাপক অন্তর্যামী হয়ে বোধহয় দেখতে পেলেন। তার গলায় শ্লেষের ঝাঁজ ফুটে উঠল।

“এইজন্যই মফস্বলের বুক সেলারদের কিছু হয় না। কলেজ স্ট্রীটে দেখুন, কিভাবে বই বিক্রি করে ওরা! আপনি তো কলেজ স্ট্রিট যানই না। এখানে বসে বসেই...”

মোবাইলটা কাউন্টারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বুম্বা কী পড়ছে দেখার জন্য ঝুঁকে পড়লাম। বুম্বা আমার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার যেন সময় নেই। বিড়বিড় করে বলল, “এখানে একটা স্টেপে ভুল আছে।”

মেঝেতে উবু হয়ে বসে দেখি বইটা এগারো বারো ক্লাসের কঠিন এক অঙ্কের বইয়ের সল্যুশন, জয়েন্টের পরীক্ষার জন্য অনেক বছর আগে খুব বিক্রি হত। এখন সব উত্তর ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। তাই এ বই কেউ কেনে না। কিন্তু বুম্বা? সে কি করে বুঝে ফেলল অঙ্কের স্টেপে ভুল আছে?

“তোমার কাছে পেন আছে?” বুম্বা এবার গলা উঁচু করে আমার দিকে ফিরল। চোখ দুটো তার যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।

আমি চমক ভেঙে তাড়াহুড়ো করে একগাদা পেন কাউন্টার থেকে তুলে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। বুম্বা বলল, “একটাই যথেষ্ট। আমি স্টেপটা ঠিক করে দিচ্ছি।”

আমি বরাবর অঙ্কে ফেল করে এসে জীবনের এত পথ পেরিয়ে এখন বইয়ের দোকানের মালিক। মাথায় কিছুই ঢুকল না। বিস্ময় বালককে আবিষ্কার করার বিস্ময় এতটাই ঘোর লাগিয়ে দিল, কী করব ভেবে উঠতে পারলাম না। ওর জড়িয়ে ধরে মাথায় তুলে নাচতে নাচতে সারা স্টেশন রোডে ঘুরে বেড়াব, নাকি চকলেটে ওকে মুড়ে দেব কিছুই বুঝতে পারলাম না।

তাক থেকে এক কপি “আবার আসিব ফিরে” তুলে ওর হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “অটোগ্রাফ স্যার, একটা অটোগ্রাফ!”

বুম্বা আমার হাতের থেকে বইটা তুলে নিয়ে মলাটের উপর বড় বড় করে লিখল, ০/০। ওটুকু অঙ্ক আমারও জানা আছে। তাই তার মাথার ঘন চুলগুলো একটু এলোমেলো করে দিলাম।