পার্থ মুখার্জী
Showing posts with label পার্থ মুখার্জী. Show all posts

উৎসব ১৪২৭


 

প্রচ্ছদ— পার্থ মুখার্জী

আশ্রয়ের আঁধার - তানজিরুল ইসলাম

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী
১

ভয়...

ভয় মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি। ভয় একটা মানুষকে ভেতরে ভেতরে মেরে ফেলতে পারে। মানুষটার অস্তিত্বকে করে তুলতে পারে দুর্বিষহ।

দুর্ভাগ্য যে, নিউ কলকাতা চাইল্ড হোমের বাচ্চাগুলোর নিত্যসঙ্গী এই অনুভূতিটাই।

মায়াং-এর পুঁথি - প্রদীপ কুমার বিশ্বাস

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী

সকালে বেড়াতে এসে, পাহাড়ের ঢালে গড়াতে গড়াতে এ সে কোথায় এলো? চারদিকে কুয়াশার চাদরে মোড়া পাহাড়শ্রেণী তাকে ঘিরে আছে। চুড়োয় চুড়োয় আটকে থাকা দলছুট কিছু মেঘ বেশির ভাগ জলকণা মাটিতে ফেলে দিয়ে তাদের কালো রঙ হারিয়ে, জোয়ান থেকে বৃদ্ধ অর্থাৎ সাদা হয়েছে। পাহাড়গুলোর চুড়ো থেকে জলপ্রপাতেরা প্রবল আওয়াজ তুলে ঝাঁপ দিচ্ছে উপত্যকার বুক চিরে এঁকে-বেঁকে বয়ে যাওয়া উপল-ব্যথিত পাহাড়ি নদীতে। কী অদ্ভুত জায়গা! একটু আগেই তো সকালের তরুণ রোদ মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে গাছের পাতায় পাতায় নাচছিল, দুপর না হয়ে বিকালটা নেমে আসে কী করে? নাকি সে এতটাই মুগ্ধ ছিল যে কখন দুপুর হয়েছে বুঝতেই পারেনি?

বিকেলের হাল্কা আলো চুপি চুপি সরে যেতে লাগলো। আকাশ আর পাহাড়ের চুড়োগুলো থেকে বোতল বোতল কালো কালি চারদিকে ছড়াতে ছড়াতে ভয়ঙ্কর দর্শন পাখিগুলো ট্যাঁ ট্যাঁ করে নেমে আসছিল সুমনের চারপাশে। চারদিকে কালো অন্ধকার যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। পাহাড়ি নদীর স্রোতের সোঁ-সোঁ আওয়াজ আসছে। নিজেকে বাঁচাতে সে দৌড়াতে লাগলো সেই দিকে। কোথা থেকে যেন আবছা আলো আসছে। কাছে আসতেই সে দেখে নদীর ওপারে পাহাড়শ্রেণীর সবচাইতে উঁচু চুড়োতে এখন আলো জ্বলছে বেশ অনেকগুলো। একসাথে কেউ কি এতোগুলো উনুন জ্বালায়? তবে কি ওখানে কোনও তান্ত্রিকের সাধনা শুরু হয়েছে? এইরকম কিছু অনেক আগে সুমন পড়েছে তন্ত্রসাধনার কোনও বইতে। সবেমাত্র সে এই কথা ভাবছে, ঠিক সেই সময় যা সে দেখলো তাতে গা শিউরে উঠলো। তবে কি ওখানে কোনও তান্ত্রিকের সাধনা শুরু হয়েছে?

এমনসময় হঠাৎ যা ওর নজরে এল তাতে গা শিউরে উঠলো। দীপশিখার সারির ঠিক মাঝখানের দুটি দীপ একটু ওপরে উঠেই আনুভূমিকভাবে একে অন্যের বিপরীত দিকে সরে গেল। এর পর দুটি দীপই এক সাথে প্রায় সাত আট ফুট সিধা ওপরে উঠে আবার পরস্পরের দিকে এগিয়ে এসে খুব কাছাকাছি চলে এল। মনে হল যেন একটা সাত আট ফুটের মানুষ দুটো দীপ জমি থেকে দুই হাতে তুলে নিয়ে ওঠাল তার মাথার ওপর রাখবে বলে। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হল না।

বাকি দীপগুলোও ঠিক সেইরকম ভাবে উঠে এল তবে চার পাঁচ ফুটের মত। এই রকম প্রায় সাত জোড়া দীপ দেখা যাচ্ছে। সামনের দীপজোড়া সাত আট ফুট উঁচুতে। তার পিছের দীপজোড়াগুলো ক্রমান্বয়ে একটু একটু করে কম উচ্চতার। সব চাইতে পেছনের দীপজোড়া মাটি থেকে প্রায় তার উচ্চতায়।

সেই তন্ত্র-সাধনার বইতে যখন তান্ত্রিক তাঁর ক্রিয়া শুরু করেন তখন এই রকমেরই কিছু অনুষ্ঠানের কথা লেখা আছে বলে আবছা আবছা মনে পড়ছে তার। জ্বলন্ত চোদ্দ প্রদীপের নড়াচড়া দেখতে-দেখতে, সে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল তার মনে আনতে যে এর পর সেই বইটাতে আর কী লেখা ছিল। যদি ধরে নেওয়া যায় যে এগুলো তান্ত্রিকের ক্রিয়া তাহলে এরা দলে মোট সাতজন আর প্রতেকের মাথায় দুটি করে দীপ। সামনে সাত আট ফুট লম্বা কাপালিক আর তার পেছনে তার চেলারা। এক জন ছাড়া বাকিরা সবাই চার থেকে পাঁচফুটের। যারা চার পাঁচ ফুটের তারা হয়ত পূর্ণবয়স্ক। কিন্তু সবার শেষে যে আছে সে হয়ত তারই মতো কিশোর। হয়ত কোনও তান্ত্রিক ক্রিয়ার জন্যই তার বয়েসি ছেলেটি ওখানে আছে।

হঠাৎ সেই তন্ত্রসাধনার বইটার একটা পাতা যেন চোখের সামনে ভেসে এল। আর সেটা মনে হতেই গায়ের সব লোম শিউরে উঠলো। ব্যাপারটা এইরকমও হতে পারে--- ওই পাহাড়ে এক কাপালিক আর তার চেলা- চামুণ্ডারা তান্ত্রিক ক্রিয়া শুরু করবার বিধান অনুযায়ী মাথায় জোড়া দীপক নিয়ে একসারিতে দাঁড়িয়েছে। সেই সারিতে সবার শেষে আছে মাথায় দীপক নিয়ে তার বয়েসি এক কিশোর যাকে সম্মোহিত করে রাখা হয়েছে নরবলির জন্য। হ্যাঁ এইবার সে শতকরা একশো ভাগের বেশিই নিশ্চিত যে তন্ত্রসাধনার সেই বইটাতে তো এইরকমই কিছু লেখা ছিল। হঠাৎ ওইপার থেকে একপাল শেয়াল, কেঁদে ওঠার মত করে খুব জোরে উঁ উঁ উঁ করে, ডেকে উঠলো। সেই শুনে খাদের ধার থেকে কর্কশ আওয়াজে, “ট্যাঁ, ট্যাঁ ট্যাঁ” ডাক দিয়ে একটা বড় পাখি উড়ে গেল নদীর দিকে। এর আগে অনেকক্ষণ ধরে টুই টুই করে একটা রাতজাগা পাখি ডাকছিল। ভয় পেয়ে সেও এবার চুপ করে গেল। একটা কিছু যে নিষ্ঠুর কাণ্ড হতে যাচ্ছে তা এরাও টের পেয়েছে। এবার পাহাড়ের দিকে সে নজর ফেলতেই দেখে যে সেই কাপালিকের দল এবার কিশোরটিকে তাদের মাঝে রেখে, বেশ দ্রুত পদক্ষেপে একসারিতে পাহাড় থেকে নিচে নামছে। নিচে নামলেই তো খরস্রোতা নদী। তবে কি নদীতেই তাকে স্নান করিয়ে সেখানেই নরবলি দেওয়া হবে? এরপর মুণ্ডহীন বাকি ধড় ভাসিয়ে দেবে খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর জলে? মোটামুটি সবার আবছা অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু একী? এই কিশোরটি হুবহু তার মত দেখতে কেন? সে একবার নিজের গায়ে হাত বোলাতে গিয়ে দেখে এটা তো আসলে সে, সম্মোহিত থাকার জন্য সে ঠিক বুঝতে পারেনি। তাকে ঘিরে আছে ভীষণ দর্শন কাপালিকেরা আর তাদের একজনের হাতে একটা বেশ বড়ো বলির খাঁড়া আর একজনের হাতে একটা বিশাল আকারের হাড়িকাঠ। সে এইবার সত্যি ভয় পেয়ে, চিৎকার করে ডাকতে শুরু করল বাবা আর মাকে। কিন্তু তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না কেন? সে আরো জোরে আওয়াজ করবার চেষ্টা করল কিন্তু গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এইজন্য হয়তো আওয়াজ বেরোচ্ছে না। সে একটা প্রাণপণ শেষ চেষ্টায় তাকে ধরে রাখা কাপালিকটাকে মারল সজোরে এক কুংফু স্টাইলের লাথি। কিন্তু নিজে সামলাতে না পেরে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবার সময় তার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। গাঢ় অন্ধকার রুম আর তার চারপাশ। চোখ ভাল করে কচলে সে দেখল যে সে হোটেল মেন্ডাবাড়িতে।

বিকেল থেকে বেতগুড়ির আকাশের মুখভার হয়ে আছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। এমনটা চলতে থাকলে যে কালকের রিম্বিক ঝর্ণাতে তাদের পিকনিকের প্রোগ্রাম বাতিল করতে হবে, সেটা মা বাবা দু’জনেই বলছিলেন। আগের থেকে মা বাবাকে অনেক টানা হেঁচড়া করেছে পাহাড় আর জঙ্গলঘেরা এই ডুয়ারসে আসবার জন্য। মাধ্যমিক পরীক্ষাটা শেষ করেই সেজন্য সে মা বাবার সাথে আসতে পেরেছে এই সুন্দর জায়গাটায়। বৃষ্টি যেন এই এই সুন্দর জায়গাটাকে মন ভরে দেখতে বাধ না সাধে। মা বাবা সুমনকে তার খামখেয়ালী সময়ের সাথে স্বাধীনভাবে চলতে দিয়ে পাশের রুমেই আছে। ভ্যাগিস স্বপ্ন দেখতে দেখতে শেষটায় সে জোরে চেঁচিয়ে ওঠেনি। নইলে মা বাবা দুজনের ঘুম ভেঙ্গে যেত আর তারা এই ঘরের দরজায় নক করা শুরু করে দিতেন আর সব শুনে নিশ্চয় তার ট্যাবটা কেড়ে নিয়ে চলে যেতেন। আজ সন্ধ্যেতে সে একটা অন্যায় কাজ করেছে। মা বাবা রুমে ছিলেন না। বাবার খোলা ব্রিফকেসে একটা তালপাতার লম্বা পুঁথি সে না বলে নিয়ে এসেছে তবে উনি ফিরে আসার আগেই আবার যেখানে ছিল রেখে আসবে ভেবেছিল। সাধারণত পুঁথিতে পুজোর মন্ত্র থাকে। এই পুঁথি থেকে সেই মন্ত্র দেখে সে সুর লাগিয়ে প্রার্থনা করবে বৃষ্টিদেবতার কাছে যাতে কাল যেন বৃষ্টি না হয়। শব্দের মানে না বুঝেও সেগুলো কিছুক্ষণ পড়লে কে যেন তার থেকে সুর বার করিয়ে নেয়। পুঁথিটি বাংলা হরফে লেখা হলেও তার কথাগুলো বোঝবার উপায় নেই। একবার পড়েই সে ঠিক করেছিল একটু আগে গুম্ফাদাড়াতে গিয়ে গুম্ফার লামারা যে সুরে তাদের পুঁথি থেকে পড়ে পুজো করছিল ও সেই সুরেই এই পুঁথির মন্ত্রগুলো গাইবে। এরপর সে একটা হরর ফিল্ম দেখছিল আর সেটা দেখতে দেখতেই মনে হয় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল যার ফলশ্রুতি এই ভয়াবহ স্বপ্ন।

অশরীরীর গল্প এবং সেই নিয়ে তার আগ্রহ প্রবল। এই আগ্রহের দরুন, সে আর তার কিছু বন্ধু মাঝে মাঝে প্ল্যানচেটের আসর বসায় এবং সে খুব ভাল মিডিয়াম বলে বন্ধুরা স্বীকার করে। রাত এখন নিশ্চয় বেশ গভীর। তার রুমের চারপাশে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সহজাত আন্দাজে মনে হল, তার এই রুমে কেউ আছে। সে এখন পুরোপুরি সজাগ, ব্যাপারটা কী দেখতে হচ্ছে। বেড সুইচ কোনদিকে হতে পারে সেই আন্দাজে হাত চালাতে গিয়ে, সে স্পষ্ট শুনতে পেল কেউ তার খুব কাছে থেকে এসে তার নাম ধরে ডেকে আবার দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। তার সহজাত তীক্ষ্ণ অনুভূতিপরায়ণ মন বলতে থাকলো এ কোনো চোর-ছ্যাঁচড় নয়। তাহলে কি কোনও অশরীরী? সে কি তাকে কিছু বলতে চায়? এইরকম কিছু হলে বেশ হয়। সে জানে অশরীরীরা কোনো ক্ষতি করে না বরং তার থেকে বাঁচিয়ে তো দেয়ই, সাথে সাথে অনেক অজানা কিছুও জানা যায়। মনে সাহস এনে সে জিগ্যেস করলে “কে তুমি? কিছু বলতে চাও আমাকে?” মিহি বালিকাকণ্ঠে জবাব এল, “বাঃ তুমি আমাকে কী সুন্দর নিখুঁত সুরেলা আহবান করে ডেকে আনলে আর এখন জানতে চাইছ আমার পরিচয়?” সুমন অবাক হল, “আমি তোমায় আহবান করলাম? কখন?” বালিকা কণ্ঠে জবাব এলো, “মনে করার চেষ্টা কর। আজ বিকেলে তোমার পাশের ঘরে একটা খোলা বাক্স থেকে তুমি একটা পুঁথি নিয়ে এলে আর তারপর প্রথমে ওম, তারপর হ্রিং এবং শেষে ক্রিং এই তিনটি বীজমন্ত্র কী সুন্দর সুর করে গাইলে আর তাতেই তো আমি কতকাল বাদে আবার জাগ্রতা হলাম। এইসাথে তোমার আজ্ঞাচক্রের কিছু অংশ জাগ্রত হয়েছে, অবশ্য সেটা আমার ইচ্ছাধীন। যে কারণে একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেউ আমাকে দেখতে পারবে না “

হঠাৎ তার নজরে আসে যে ঘরের দেওয়াল-আলমারির দরজার পাল্লা খোলা আর সেখানে তার বয়েসি একটি কিশোরী বসে আছে। সে সেইখান থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকল, “তুমি যাবে আমার সঙ্গে, আমার দেশে? সেখানে পাহাড়, বনজঙ্গল, ঝর্ণা, মেঘ আর পাখীর গান সব আছে। আমি অনেকদিন কারো সাথে গল্প করিনি। কিছু সময় আমার সাথে আমার দেশে থেকে তারপর আবার ফিরে এস তোমার মা বাবার কাছে। তার বেশী চিন্তা করবেন না।” আচ্ছন্নের স্বরে সুমন বলে, “বেশ চল তাহলে। ঘুরতে বেড়াতেই তো এসেছি এইখানে।”

রুমের বাইরে সিসি টিভির চোখ এইটুকু দেখতে পেল যে সুমন করিডোরের প্রান্তে চলে যাচ্ছে, হোটেলের পেছনের দিকে। এমন কী পেছনের বাগানে গেটের কাছে দু’জন সিকিউরিটির লোকও তাকে দেখতে পায়নি গেট পার হতে। গেটের বাইরে আসতেই তার পেছন থেকে কে যেন তার নাকের সামনে একটা মিষ্টি গন্ধের রুমাল আনে। এরপর তার যখন ঘুম ভাঙল সেটা বেতগুড়ি থেকে অনেক দূরে। বিকেল বিদায় নিচ্ছে তখন। ঘুপচি নোনা ওঠা দেওয়ালের একমাত্র জানালার গরাদগুলো থেকে ঘরের রোদ লাফিয়ে লাফিয়ে বিদায় নিচ্ছে। এমন সময় সেই চেনা মিষ্টি সুরে বেতগুড়ির হোটেলে সে রাত্রের দেখা কিশোরী তাকে ডাকল, “চল সুমন পাহাড়ে মেঘের আনাগোনা, ঝর্ণা আর পাখীদের গান শুনবে তো চলো আমার সাথে। এতদিন আমাকে দিয়ে কিছু লোক অনেক শয়তানি করিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আজ যখন তুমি এসেছ, আমি এইবার জেগে উঠেছি। ওই বদমাশ কালো তান্ত্রিকটা আমাকে না পারবে ওই ভয়ানক কালো পুতুলটার মধ্যে বন্দী করতে, না পারবে আমাকে দিয়ে আর কোনো খারাপ কাজ করাতে।”

ডিএসপি সোহম, তাঁর চেম্বারের সরকারী ঘড়ির দিকে চেয়ে একটু অস্থির আর বেশ বিরক্ত হচ্ছিলেন বেতগুড়ি সদর থানার আইসি সোনাম ওয়াংদি আর তাঁর ইনফরমারের গ্যাং লিডার বিজয় হাজারীর ওপর। নিজের চেয়ার থেকে উঠে একবার পায়চারী করে আবার ফিরে যেতে যেতে দেখলেন সিটি ট্রাফিক ওয়াচ মনিটরের দিকে। চ্যানেল ৮ মানে বেতগুড়ির কপালেশ্বরী চৌমাথাতে লাগানো সিসিটিভির ক্যামেরা। দেখা যাচ্ছে যে দু’জন কনেস্টেবল মোড়ের ঠিক দক্ষিণদিকের রাস্তার লাগোয়া হোটেল মেন্ডাবাড়ি ইন্টারন্যাশনালের গেটের সামনে আছে আর সাদা পোশাকের লোকেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এই হোটেলের চারপাশে। হোটেলের পাশের রাস্তায় নেপালি ভিখারির মেকআপ নিয়ে গুরুং আর তেজবাহাদুর তাদের হাতের লম্বা চোঙ দিয়ে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাবার বাহানায় আসলে নজর রেখেছে বিশেষ কিছু রুমের জানালা আর ব্যাল্কনির দিকে।

একদিন আগে, মেন্ডাবাড়ি হোটেলের এই রুমগুলোর একটা থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে, কলকাতা থেকে আসা চা ব্যবসায়ী দীপক এবং বিদিশার একমাত্র সন্তান সুমন। সুমন সবেমাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেছে। তার জেদাজেদিতেই বহুদিন পর সপরিবারে উত্তরবঙ্গের এই পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে এসে, এই হোটেলে পাশাপাশি দুটো রুম নিয়েছিলেন। একটা তাঁদের জন্য এবং অন্যটা খামখেয়ালী সময়ে চলা পুত্রের জন্য। প্রথম দিন তাঁরা বেতগুড়ির আশেপাশের চা বাগানগুলো ঘুরলেন। পরদিন তাঁদের রিম্বিক ঝর্ণাতে পিকনিকে যাবার কথা ছিল। সকালে তাঁরা নিজেদের রুমের বাইরে এসে দেখেন যে সুমন তার মোবাইল বিছানার ওপর ফেলে রেখে, কাউকে কিছু না বলেই কোথাও গিয়েছে। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন যে সে রোজকার মত মনিং ওয়াকে দূরের পাহাড়ের দিকে বেড়াতে গেছে। বিকেল পর্যন্ত সে না ফেরায়, হোটেল কতৃপক্ষ পুলিস ডাকে। প্রাথমিক তদন্তে করিডোরে লাগানো সিসি টিভির হার্ড ডিস্ক খুঁজে দেখা যায় যে শেষ রাতের দিকে সুমন তার রুম ছেড়ে, কেমন যেন আচ্ছন্ন অবস্থায় হোটেলের পিছনের বাগানের দিকে যাচ্ছে। সুমনের নিখোঁজ হবার শোকে, তার মা বিদিশা এতটা আঘাত পান যে তাঁকে সেডেটিভে আচ্ছন্ন করে রাখতে হয়। পরের দিন মাঝরাতে দীপকবাবুকে হোটেলের লকার রুমের প্যাসেজে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। বেতগুড়ি এমনিতে শান্ত জায়গা, আইনশৃঙ্খলা সেখানে কোনো সমস্যাই নয়। সেখানে একই হোটেলে, রাজনৈতিক মহলে সুপরিচিত এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী দীপকবাবুর পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীতে পুলিস থেকে গৃহমন্ত্রকের উচ্চপদস্থেরাও বেশ উদবিগ্ন হয়ে পড়লেও মহাকুমার সদ্য চার্জ নেয়া তরুণ ডিএসপি, এতটুকুও না ঘাবড়ে পেশাদারী কায়দায় এই রহস্যময় ঘটনার তদন্তে, তার পুরো দল নিয়ে নেমে পড়েছে।

কনস্টেবল-বডিগার্ড, দরজায় নক করে ঢুকে সোহমকে স্যালুট দিয়ে, মোবাইল তাঁর হাতে দিয়ে বলে, “স্যার, সদরথানা আইসি সাহেব আর একটা অজানা নাম্বার।” অজানা নম্বরটা দেখেই সোহম বুঝতে পারে সেই লাল মারুতিভ্যানের কোনো খবর এনেছে তার শিলিগুড়ির সোর্স হাজারী। সুমনের অপহরণের রাতে, কপালেশ্বরী চৌমাথার কাছে এই লাল মারুতি ভ্যানটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ভ্যানটার নম্বর প্লেটটা ফেক, তাই একে ট্রেস করবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি কোথাও। নিজের চেম্বারের লাগোয়া ওয়াশরুমের নিরিবিলিতে গিয়ে কল করতেই কলকলিয়ে ওঠে হাজারীর গলা। “ছ্যার, আপনি জেঠন(যেমন) বলঠিলেন কার্য সবঠা করেঠি। সেই জালি নম্বর প্লেঠের লাল মারুঠি ভ্যান’ঠা এস এন টি বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে থাকার পর এনজেপি স্টেশনের পারকিং লটে আসে।”

“গুড। মারুতি ভ্যানে কে, কে ছিল?”

“সার জি, এরা কেউ গ্যাংটক- রংপো বা শিলিগুড়ির কিডন্যাপার বা রাউডি নয়। আসামের কোনো মালদার পার্টি। এনজেপি স্টেশনের পার্কিং লটে এরা নেমেছিল, সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকা একটা অল্পবয়েসি ছেলে। এই ছেলেটির স্কেচ আপনি পাঠিয়েছিলেন। ছেলেটাকে দেখে বেশ রহিস ঘরের লোক বলেই মনে হল, তবে অসুস্থ হতে পারে। লোকদুজন গাড়ি থেকে নেমে দুপাশ থেকে ছেলেটাকে ধরে, ওই ঘুমন্ত অবস্থাতেই স্টেশনের আপার ক্লাসের ওয়েটিং রুমের দিকে চলে গেল। ওদের মধ্যে যে বেশ খাটো আর স্বাস্থ্যবান, তাকে আমাদের একজন লোক প্লাটফরমে একজন টিটির সাথে কথা বলতে দেখেছে। ওর কানে এসেছে যে আসামের দিকে কোনো এক জায়গায় যেখানে ট্রেন অল্পসময় থামে, সেখানে বেশি সময় থামাবার জন্য টি টি মারফত গার্ডের সাথে কিছু লেন-দেনের কথা। আমাদের লোকগুলো অন্য আর এক ধান্দায় ছিল, তারা এর বেশি দেখেনি। আপনি স্যার চাপ নেবেন না। গুয়াহাটি স্টেশন আর তার আগে-পিছে সব জায়গায় আমাদের সেটিং আছে। ছেলেটাকে নিয়ে উড়ে তো যাবে না। যে গাড়িতেই যাক আমার কাছে খবর আসবেই। আপনাকে আর একটু পরেই ওদের খবর দিচ্ছি।”

বললেন, “আমাকে আপডেট করতে থাকবে। আই সি-র ফোন আসছে বোধহয় তুমি ছাড় এখন।”

হাজারী বলে, “স্যার, আইসি সাহেব সব জানেন। আরপিএফ-কে বলেছেন উনি নজর রাখতে।”

আই সি সদর, ইনস্পেক্টর সোনাম ওয়াংদিকে কড়া ধমক লাগালেন সোহম, “আরপিএফ-কে নজর রাখতে বলে তুমি হাত ধুয়ে বসে আছ? গুয়াহাটি ডিআইজি অফিসে লাইটনিং কল কেন দাওনি? গুয়াহাটি না গিয়ে ওরা আর অন্য কোনো ট্রেনেও যেতে পারে। এখনি আমার হয়ে রেডিও মেসেজ পাঠাও গুয়াহাটির আশেপাশের সব থানাতে আর সেই সাথে রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ সুমনের ফটো আর ডিটেলস দাও।”

আই সি সদর ওয়াংদির কাছে, মহকুমায় সদ্য জয়েন করা তরুণ ডিএসপি সোহমের থেকে আরও ধমক থেকে বাঁচবার জন্য তার নিজের সোর্সদের পাওয়া কিছু খবর ছিল। অবিচলিত স্বরে সে বলে, “স্যার গুয়াহাটি থেকে আমার শিলিগুড়ির সোর্সেরা কিছু জরুরি খবর পেয়েছে। আপনাকে সেগুলো এখনি বলা দরকার।”

ওয়াংদির কথার সুর বুঝে সোহম বলল, “এখন কেউ নেই আমার চেম্বারে, বলে যাও।”

ওয়াংদি গলার স্বর কমিয়ে বলে, “স্যার, শিলিগুড়ির সোর্সদের মধ্যে শইকিয়ার বাড়ি গুয়াহাটিতে। সে কিছুদিন আগে বিয়েবাড়ির নেমতন্ন রাখতে বাইকে করে গিয়েছিল একটা গ্রামের দিকে। ফেরবার সময় গুয়াহাটি-মারিগাও হাইওয়েতে একটা কালো রঙের স্করপিও তার আগে আগে চলছিল। পথে মায়াং যাবার ক্রসিঙে ট্রাফিক সিগন্যালে থামবার সময় সে ওই স্করপিওটার একদম পিছনেই ছিল। তখন তাঁর নজরে আসে যে স্করপিওটার সাদা রঙের নম্বরপ্লেট, সেটা শুধু অসমিয়াতে লেখা হলেও কিন্তু তার নম্বর বেঙ্গলের। তাতে পেছনের সিটে ঘুমন্ত অবস্থায় একটা অসুস্থ কিশোরকে ধরে রেখেছিল কালো সানগ্লাস পরা বড়োলোক ঘরের একজন ম্যাডাম। গাড়িটা চালাচ্ছিল যে তাকে দেখে গাড়ির মালিক বলেই মনে হচ্ছিল।”

সোহম বিরক্ত গলায় বলে “গাড়িটা কোনদিকে গেল সেটা নিয়ে কোনো খবর দিতে পারলো?”

ওয়াংদি বলে, “স্যার, এরপরে শুনুন। সিগন্যাল সবুজ হতেই, গাড়িটা মায়াং যাবার রাস্তাতে বাঁক নিয়েও হঠাৎ আবার হাইওয়েতে ফিরে আসে। গাড়ির ড্রাইভার তখন তার মুখটা বার করে একবার পেছনে সইকিয়ার দিকে আর একবার হাইওয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। সইকিয়া অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও আর তার বাইকটা ড্যামেজ হয়। সে ডেমারেজ আদায়ের জন্য, স্করপিওটাকে ফলো করতে শুরু করে কিন্তু শেষ অবধি স্করপিওর স্পীডের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। এরপর শইকিয়া পুরো গৌহাটি এবং মারিগাওতে অনেক গ্যারাজ আর হাইওয়ের ধাবাগুলোতে জিগ্যেস করে জেনেছে বেঙ্গলের নাম্বারের কোনো গাড়ি শুধু অসমীয়াতে তারা আজ অবধি দেখেনি।”

সোহম একমনে সব শুনে ওয়াংদিকে বলল, “তাহলে এটা এখন আপাতত ধরে নেওয়া যেতে পারে যে নাম্বারটা ফেক। তবুও তুমি একবার আর টি ও অফিসে খোঁজ লাগাও, গুয়াহাটি, শিলিগুড়ি আর মারিগাওতে। সইকিয়াকে বল এই স্করপিওটা না পেলেও এর ড্রাইভার আর পেছনে যে ম্যাডাম ছিল তাদের খুঁজতে।”

আই সি ওয়াংদি বলে, “স্যার, আমরা শইকিয়াকে আর বিজয় হাজারীর লোকদের শিলিগুড়ি থেকে এখানে আনিয়েছিলাম। শইকিয়া স্করপিওটার ড্রাইভার আর ঘোমটা দেওয়া সেই ম্যাডামকে যতটুকু দেখেছে, সেই বর্ণনা শুনে শুনে আমাদের পুলিস আর্টিস্ট ওদের ছবি এঁকেছে। এছাড়া স্যার, সইকিয়ার লোকের বর্ণনা শুনে, সে এন জে পি স্টেশনে সেই দু’জন লোক যারা সেই ঘুমন্ত ছেলেটাকে নিয়ে প্ল্যাটফরমের ভেতর যাচ্ছিল তাদের সবার স্কেচ করেছে।”

“গুড জব ওয়াংদি। ছবিটা পাঠিয়ে দাও আমাদের সাইবার সেলের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এস আই শ্রেয়া মজুমদারকে। দেখি ও যদি কোন লিড দিতে পারে।”

ওয়াংদি এরপর যা বলল তাতে সোহমের মনে হল ভাগ্যিস সে একটু আগে কফিটা শেষ করেছে। সেটা না করলে এটা শোনবার পর কফি মাগ তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে যেত। এই অবস্থায় থেকে সে ওয়াংদিকে বলল, “ওয়াংদি তুমি যা বললে আর একবার সেটা রিপিট করো।”

“শইকিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী আর্টিস্ট যে ছবি এঁকেছে দু’জনের, তাতে স্করপিও ড্রাইভার আর দীপকবাবু যেমন অনেকটা মিলে যাচ্ছেন তেমনি মাথার ঘোমটা বাদ দিলে সেই ম্যাডামের স্কেচটা দাঁড়াচ্ছে ওনার স্ত্রী বিদিশার। আমি আর একজন আর্টিস্ট লাগিয়েছিলাম। দুই আর্টিস্টের ছবির তেমন কোনো ফারাক নেই। ঠিক তেমনি ঘুমন্ত যে ছেলেটিকে দুজনে দু’পাশ থেকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, যাকে শিলিগুড়ি স্টেশন আর গুয়াহাটি দু’জায়গাতেই দেখা গেছে সেই ছেলেটির স্কেচ আর হোটেল মেন্ডাবাড়ি থেকে নিখোঁজ দীপকবাবুদের ছেলে সুমন দু’জনেই একই বলে মনে হচ্ছে।”

সোহম বলে,”কিন্তু দীপকবাবু পরশু রাত থেকেই দারুণ চোট নিয়ে নার্সিং হোমে আর বিদিশা ম্যাডাম সেই দুদিন আগে তাঁদের নিখোঁজ ছেলের শোকে এখনো সেডেটিভের আশ্রয়ে আছেন। তাহলে সুমনের সাথে এরা সব কারা?”

ওয়াংদি বলে “স্যার, ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো-প্যাঁচালো। কলকাতা আর টি ও অফিস থেকে মেসেজ এসেছে যে নম্বর প্লেট এবং গাড়ির মেক মানে এই স্করপিও গাড়িটা এই দুটোই দীপকবাবুর কালো স্করপিওর সাথে মিলে যাচ্ছে। কিন্তু স্যার আমরা সোর্স মারফত খুব ভালো করে জানি যে দীপকবাবুর ওই কালো স্করপিও গাড়ির ইঞ্জিন আর গিয়ার বক্সের কাজ চলছে শিলিগুড়িতে কোম্পানির কারখানায়। যে দু’জন লোক ঘুমন্ত সুমনকে দু’পাশ থেকে ধরে ধরে গাড়ি থেকে ওঠনামা করাচ্ছিল, তাদের একজনের মুখের দাড়ি বাদ দিয়ে দিতেই চেনা গেল। সে হচ্ছে একজন কুখ্যাত ক্রিমিনাল বুলাকি। কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে একটু আগে খবর এসেছে যে বুলাকিরামের ছিন্নভিন্ন দেহ রেললাইনের ওপর পাওয়া গেছে। শিলিগুড়ি টিম প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর কিছু লিড পেয়েছে। তাতে তারা মনে করছে যে বুলাকিরামকে অন্য কোথাও মার্ডার করে তার ডেডবডি যাতে চেনার অযোগ্য হয়ে পড়ে, সেই মতলবে রেললাইনের ওপর ছেড়ে গেছে। বুলাকিরামের মা আর ভাই এই বেতগুড়ির পাহাড়তলীর নেপালী বস্তিতে থাকত। তারা বাড়ি-বাড়ি এবং অনুষ্ঠানে বড়ো রান্নার কাজ করে। ওদের বস্তিতে গিয়ে আমাদের লোকেরা জেনেছে যে ওর মা আর ভাই দু-তিন দিন আগে বাইরের কোনো অনুষ্ঠান বাড়িতে রান্না করতে গেছে। বেতগুড়ির অঞ্চলপ্রধানের মেয়ের বিয়ে কালকে। সেজন্য তাদের আজ বা কালের মধ্যে ফিরে আসবার কথা। স্যার এই কেসের এখনো অবধি সব আপডেট দিয়ে আমি একটা রিপোর্ট বানিয়ে সেটা পেন ড্রাইভে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। দীপকবাবু, বিদিশা ম্যাডামের এবং হোটেল মেন্ডাবাড়ীর সব ফোন আমরা ট্যাপ করে রেখেছি। আমাদের দুজন এ এস আই আর মোবাইল ভ্যান সব সময় সেইদিকে নজর রাখছে। স্যার, ওদের ছেলে সুমনের নিখোঁজের আজ দু’দিন কেটে গেলেও র‍্যানসাম চেয়ে এখনো কোনো কল আসেনি। ।”

সোহম বলে, “সে রকম কিছু এলেই আমাদের অ্যাকসন প্ল্যান তৈরিই আছে। সেই অনুযায়ী কাজ হতে যেন একটুও দেরি না হয়।”

ওয়াংদি বলে, “একদম নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। ফুলবডি স্ক্যান অনুযায়ী দীপকবাবুর চোট শুধু পিঠে লেগেছে এবং সেটা তেমন কিছু সিরিয়াস নয়, একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে বলে নার্সিংহোম তাঁকে আর একটু পরে ছেড়ে দেবে বলছে। তাহলে স্যার ওনার সাথে আমরা আর একটু পরে...”

সোহম বিরক্ত হয়ে বলে, “ওয়াংদি, ওনাকে সকালটা হোটেলেই আরাম করতে দাও। বিকেলের দিকে যদি সম্ভব হয় তবে ওনাকে সসম্মানে নিয়ে আসবে আমার বাংলোতে। তবে দরকারে আমরা ওনাকে হয়তো একটু কড়া গ্রিলিং করতে পারি। তুমি ভিডিও টিমকেও সঙ্গে আনবে। যদি দরকার হয় তবে উনি যা বলবেন তার ভিডিও রেকর্ডিংও আমরা ডকুমেন্টেশনের জন্য রাখতে পারি। ওই মহিলা এবং তাঁর দলবলের আপডেট পেলেই বিন্দুমাত্র দেরি না করে আমাকে দেবে।”

ওয়াংদি একটু বিব্রত সুরে বলে, “স্যার মারিগাও আসামে। সেইজন্য সেখান থেকে সোর্স মারফত কিছু খবর পেতে গেলে, আমাদের কন্টিজেন্সি ফান্ড তেমন নেই। আর আসাম পুলিস তো জানেনই স্যার, শুধু আমাদের কাছ থেকে খবর নেবে। কিন্তু দেবে না কিছু।”

সোহমের কপালে এবার সত্যি বেশ বড়ো ভাঁজ পড়ে যায়। হঠাৎ করে একটা দিশা সে পেয়ে যায়, “গুড হেভেন্স! এস পি মারিগাও, পুজেশ্বর সইকিয়া আমাকে খুব ভালো করে চেনে। পুলিস একাডেমিতে আমার থেকে দু বছরের সিনিয়র ব্যাচ। ওনাকে আমার নামে একটা লাইটনিং কল দাও আর কানেক্ট করবার অল আউট এফোর্ট লাগাও।” ওয়াংদি বলে, “স্যার আমার একটা ব্রেনওয়েভ এসেছে। মারিগাও এর কাছেই হচ্ছে তন্ত্রমন্ত্র আর জাদুবিদ্যার পিঠস্থান মায়াং।”

ক্রুদ্ধ সোহম বলে, “তুমি কি চাও ডিপার্টমেন্ট এবার ইনভেস্টিগেশন ছেড়ে দীপকবাবুর ছেলে সুমনের অপহরণ কেসে তান্ত্রিক আর জাদুকরদের শরণাপন্ন হবে? তোমার পিএ, এ এস আই বড়গোহাই এর সাথে-সাথে তোমার এগেন্সটেও ডিপারটমেন্টাল তদন্ত চালু হোক, সেই চাও?”

ডিএসপি সাহেবের কথাতে ওয়াংদি কিন্তু একটু হেসে বলে, “স্যার বড়গোহাই এর শ্বশুরবাড়ি কিন্তু ওই মায়ংয়ে। ওখানে লোকে যে শুধু তন্ত্রমন্ত্র শিখতে যায় তা নয়, মন্দ উদ্দেশ্যেও অনেক ক্রিমিনাল গ্যাঙ্গের আনাগোনা চলতেই থাকে। বড়্গোহাইএর শালা ওখানে হোটেল থেকে আরম্ভ করে, বিভিন্ন ঠেকের লোকদের সাথে ওঠাবসা আছে। তাকে যদি এই মহিলা বা সুমনের স্কেচ দেখিয়ে কোনো হদিস পাওয়া গেলেও যেতে পারে। স্যার এই মায়ংয়ের অনেক জায়গা আছে যেখানে পুলিসও যেতে চায় না। ।”

সোহম একটু ভেবে বলে, “ঠিক আছে। পুলিসের এই দুর্বলতার সুযোগ যে সুমনের অপহরণকারীরা নেবে না এমন সম্ভাবনা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। তুমি এক কাজ কর। গুরুঙ্গের গ্যারাজ থেকে আমার নাম করে একটা জাইলো গাড়ি নিয়ে এখনই বড়গোহাইকে সপরিবার রওয়ানা করিয়ে দাও মায়ংয়ে। ওকে বলে দাও ওর এগেন্সটে যে এনকোয়েরি চলছে তাতে আমি নিজে রেকমেন্ড করবো কম সাজার, যদি এই কেসে ও কোনো পজিটিভ লিড আনতে পারে।”

ওয়াংদির সাথে কথা বলার সময়ে সোহমের নজর আটকে ছিল ট্রাফিক মনিটর চ্যানেল এইটের দিকে অর্থাৎ বেতগুড়ির কপালেশ্বরী চৌমাথাতে লাগানো সিসি টিভির ক্যামেরা যাতে এখন আর একটা ক্যামেরা লাগানো হয়েছে হোটেল মেন্ডাবাড়ির দিকে। এই ছাড়া আর একটা ক্যামেরা যুক্ত আছে চ্যনেল এইটের সাবচ্যানেলে যেটা লাগানো হয়েছে হোটেলের পেছনের বাগানের দিকে।

হোটেলের পেছনের বাগানে একজন হিপিচুলের বিদেশী আর তার সাথে একজন সিটকে রোগা লম্বা লোককে দেখে সোহম চমকে ওঠে। একবার নিশ্চিত হবার জন্য তার ডেস্ককে বলে হোটেলের রিসেপসন- ইন- চার্জ গোমেজ যেন এখুনি কথা বলে। প্রায় সাথে সাথে গোমেজের গলা ভেসে আসে। “গুড মর্নিং স্যার। কী হুকুম বলুন”

সোহম বলে, “গোমেজ, বিদেশী কোনো গেস্ট এখন আছে?”

গেস্ট রেজিস্টারের পেজগুলো তার মুখস্থ। তবু একবার দেখে নিয়ে বলে, “না স্যার, এই মাসে কোনো গেস্ট আসেনি, তবে তিনদিন পর এক আমেরিকান কাপলের বুকিং আছে।”

“ওকে গোমেজ, কিপ টাচ।”

গোমেজের সাথে কথা শেষ না হতেই কপালেশ্বরী মোড় থেকে কনস্টেবল গুরুং অয়ারলেসে মেসেজ পাঠায়, “সাহেব, হোটেলের পেছনের গেট দিয়ে একজন সাহেব আর তার সঙ্গী বেরিয়ে এসে চকবাজারের দিকে গেল। এদের চলাফেরা দেখে আমার কেমন যেন সন্দেহ হল। হোটেলের রিসেপসন এদের সম্বন্ধে কিছু বলতে তো পারলো না, উপরন্তু বলে যে হটেলে এখন কোনও বিদেশী গেস্ট নেই। স্যার আমি চকবাজারে টহলদারি মোবাইল ভ্যানকে এদের সম্পর্কে জানিয়েছি।”

সোহম নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, “গুড জব ডান গুরুঙ্গ। আমি দেখছি ব্যাপারটা।”

সোহম নিজের ডেস্ক কম্পিউটারের “মাই ফোটোজ” এ ক্লিক করে তার প্রবেশন পিরিয়ডের সময় নিজের গুরুর ছবি আর একবার দেখে নেয় আর মৃদু হাসতে থাকে। এই কেসে এখনো পর্যন্ত সে বা তার টিম তেমন কোনো লীড পায়নি। দু’দিন পর শিলিগুড়িতে ডিআইজির ক্রাইম কনফারেন্স আছে। সেইসময় অবধি যদি এই অপহরণ কেসে উল্লেখযোগ্য কোনও প্রগ্রেস না হয় তবে বেশ কড়া কথা শুনতে হবে, বিশেষ করে যখন দীপকবাবুর শাসকদলে বেশ ওঠাবসা আছে। প্রবেশনের সময় তার এই গুরু বারবার বলেছিলেন যে কেসের লিড পাচ্ছিস না, তাতে ইনফরমারদের দেওয়া খবরগুলোর রেকর্ডিং বারবার শুনবি। দেখবি এর মধ্যেই আছে লিড আর সেখানে হিট করলেই বাজি মাত।

হিপিচুলে বিদেশীর বেশ ধরে সেই রহস্যময় লোক আর তার সঙ্গী চকবাজারে গেলে নিশ্চয় যাবে অ্যান্টিক দোকানগুলোতে। বেশীর ভাগ বিদেশী এইসব জায়গাতেই যায়। ট্রাফিক চ্যানেল টু আর থ্রি অর্থাৎ চকবাজার সাউথ আর নর্থ যেখানে বেশীরভাগ অ্যান্টিকের দোকানগুলো আছে, তার বাইরে বড়ো লাইটপোস্টে লুকিয়ে রাখা সি সি ক্যামেরার ছবি নিজের মনিটরে ফোকাসে রেখে, সোহম নিজের গুরুর উপদেশ মতো ইনফরমারদের সাথে হওয়া কথাগুলোর রেকর্ডিং শুনছিল। হঠাৎই তার মনে হল এই নকলি ভেকধারী বিদেশী আর তার স্যাঙ্গাত এইসব দোকানে আসবে কেন? এরা তো টুরিস্ট নয়। এরা যে এসেছে অন্যকিছুর খোঁজে সেটা তো সে একটু আগেই বুঝতে পেরেছে। কথাটা ভাবতে না ভাবতেই সে ট্রাফিক মনিটরে স্পষ্ট দেখল যে গুরু চেলা দু’জনেই ঢুকছে ভুটিয়া অ্যান্ড লিম্বুর দোকানে। এখানে অ্যান্টিকের সাথে সাথে সিকিমিদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক, চমরী গরুর শিং, আর নানারকম মুখোশ বিক্রি হয়। গুরু-চেলা সোহমের আন্দাজের সামান্য এদিক ওদিক করেছে এবং সেটার পেছনেও নিশ্চয় এই গুরুর কোনও প্ল্যান নিশ্চয় আছে। সোহমের জানা উচিত সেটা। এর সাথে এই প্যাঁচালো কেসের লিঙ্ক তো আছেই। ওয়্যারলেস চ্যানেল টু’তে সোজা পাওয়া যাবে কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা মোবাইল ইউনিট থার্ড’কে। সোহম ওয়্যারলেসে কল দিলো। “কাপ্রোজিনে কলিং মোবাইল থ্রি, আর্জেন্ট। ওভার”

“রজার। মোবাইল থ্রি অনলাইন স্যার। সাব ইন্সপেক্টর গুরুং বলছি স্যার। অ্যালারট ফর অর্ডার স্যার। ওভার।” (রজার মানে অন্যপ্রান্তের কথা এই প্রান্তে সবটা শোনা এবং বোঝা গেছে)

“রজার। গুরুং এখন তোমাদের টার্গেট ওয়াচ ওয়ান অ্যান্ড টু সম্পর্কে বলছি। এই দুজনে এখনই ঢুকেছে ভুটিয়া অ্যান্ড লিম্বুতে। তোমার ভ্যানের প্লেন ক্লোদস’এর কাউকে পাঠিয়ে কভার করো দোকানের ভেতরে আর দেখ ওই দু’জন ওই দোকানে কী করছে বা কী চাইছে? আমাকে সোজা রিপোর্ট ব্যাক করো। ওভার।”

“রজার। স্যার আমি প্লেন ক্লোদসের লেডি কনস্টেবলকে পাঠিয়ে দিচ্ছি স্যার। ওভার।”

“রজার, ওভার।”

গুরু চেলা দুজনেরই মুখের কথার চাইতে দৃষ্টি বিনিময় আর হাতের আঙুলের ইশারাতে কথা বেশী হয়। একজন বিদেশী আর একজন এদেশির মধ্যে তাই স্বাভাবিক। ভুটিয়া অ্যান্ড লিম্বুতে ঢুকে দুজনে কিছুক্ষণ এটা ওটা দেখবার পর, বিদেশী তাঁর এস্কর্টকে ইশারা করলেন মুখোশের কথা। সেলসের মেয়েটি ওপরের তাক আর মাঝখানের কিছু জায়গা থেকে বেশ কিছু বাক্স থেকে একের পর এক মুখোশ বার করে দেখাচ্ছিল। সাহেব সেসব দেখে হাসিমুখে ভেরিগুড ভেরিগুড বললেও প্যাক করতে মানা করল। হতাস সেলস গার্ল মুখোশের প্যাকগুলো ফেরত পাঠাচ্ছিল আর তখন সাহেব তার গাইডকে কিছু একটা ইশারা করছিল। সেলস গার্ল’কে গাইড লোকটি নেপালিতে বললে, “দেখ সাহেব এইসব জীব জন্তুর, বা দৈত্য দানবের ভয়ঙ্কর মুখোশের প্রশংসা করলেও, উনি চাইছেন এমন মুখোশ যা পরলে তাঁকে অন্য মানুষের মতো দেখাবে।”

মেয়েটি একবার দুজনের দিকে তাকিয়ে একটু নিচু গলায় বললে, “স্যার আপনারা ওপরে শপ ম্যানেজারের কিউবিকিলে যেতে পারেন। আমার কাছে এই ধরনের কিছু নেই।” সিনেমার সুপরিচিত ভিলেন ড্যানী ডিঙ্গোপার মতো দেখতে শপ ম্যানেজার তাঁর কুতকুতে চোখ মেলে শাঁসালো ফরেনার কাস্টমারকে দেখে খুব সহাস্যে এবং সবিনয়ে অভ্যর্থনা করে বসতে বলে ড্রিঙ্কস আর সিগারেট অফার করলেন। সেসব সবিনয়ে প্রতাখ্যান করে তিনি তার গাইডকে ইশারা করলেন, সে শপম্যানেজারকে বলল, “এই সাহেব অনেক জায়গাতে শুনেছে যে তোমার দোকানে সেরা মুখোশ কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু নিচে তোমদের কাউন্টারে যা দেখালো সাহেব তা চাইছেন না। উনি চাইছেন সেইরকম মুখোশ যা একইরকম আদলের মুখের লোক যদি পরে তবে দূর থেকে তাকে হুবহু অন্য কেউ বলে মনে হবে।”

ম্যানেজার ওদের কথা শুনছিল আর তাঁর কুতকুতে চোখদুটো দিয়ে তাঁর উল্টোদিকে বসা লোকদুটিকে বুঝে নেবার চেষ্টা চালাচ্ছিল। ব্যাপারটা তার কাছে সুবিধেজনক মনে হচ্ছিল না। একটু ভেবে নিয়ে সে বলে, “স্যারেরা, আমরা সচরাচর এইরকম মুখোশ বিক্রি করি না। কিন্তু কোনো শিল্পী এসে খুব পীড়াপীড়ি করলে কিছু দিন রাখি যদি এই বিক্রি থেকে সে ক’টা পয়সা পেয়ে যায়। কিছুদিন আগে এইরকম একটি লোক এসেছিল, সেগুলি বিক্রি হয়ে গেছে। বেশ অনেকদিন সেই লোকটি আসেনি। আপনারা আপনাদের ফোন নম্বর রেখে যান। লোকটা এলে আমি আপনাদেরকে খবর দেব।” বিদেশী লোকটি এবার তাঁর গাইডকে কিছু ইশারা করল, সে তার ওয়ালেট বার করে দুটো পাঁচশো টাকার নোট ডেস্কে রেখে একটু শাসনের সুরে বলল, “এই টাকাগুলো তোমার হতে পারে যদি তুমি সেই লোকটির নাম আর সে কোথায় থাকে আমাদেরকে বলে দাও।” টাকাগুলো ডেস্ক থেকে নিজের হাতে নিতে নিতে সে বলে, “বুলাকি নামের এই লোকটাকে পাহাড়তলির নেপালি বস্তিতে আমার লোকেরা কয়েকবার দেখেছে। ওখানে খোঁজ করলে তোমরা পেয়ে যেতে পার।” তিনবার বিপ বিপ করে একটা আওয়াজ ম্যানেজারের ঘরে হতেই সে বলল “দোকানে পুলিসের টিকটিকি এসেছে। তোমাদেরকে কিছু জিগ্যেস করলে মুস্কিলে পড়তে পারো। এই কিউবিকলের পেছনের দরজা খুলে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নিচে গিয়ে, সামনের পাহাড়ি ঢালে পায়েচলা পাহাড়ি পাকদন্ডী রাস্তা ধরে নেমে গেলেই নেপালি বস্তি পাবে।”

পাহাড়ি ঢালের রাস্তাটা খারাপ নয়। নিচে নামতে নামতে মেকআপ খুলে, লিকুইড জেল আর টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে নিয়েছে এস এস পি ( সি আই ডি) শেখর সোম আর তাঁর বডিগার্ড সঞ্জয়। একদম পাহাড়তলির কাছে একটা মাঠে যে ছেলেটা গরু চরাচ্ছিল সে তার হাতের ছড়ি দিয়ে দেখিয়ে দিলে বুলাকির বাড়ি। মাঠেরই এককোণায় একটা জীর্ণ দশার বাড়ি, তার মাটির পাঁচিলও জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গা। সেই ভাঙ্গা পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা লোক বাড়ির দাওয়ায় বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে আর তার মা ঘরের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে “ছিদ্দন, এ ছিদ্দন” বলে ডেকে গেলও ছিদ্দনের তাতে তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। বুলাকির নাম ধরে ডাকতেই ছিদ্দন বেরিয়ে এসে বলে “দাদা একহপ্তা হল বাড়ি আসেনি। তোমরা কে?”

শেখর সে কথার জবাব না দিয়ে বলে, “বুলাকি নেই? তার ভাই ছিদ্দন বাড়ি আছে কি? তাকেই ডেকে দাও।”

ছিদ্দন বলে, “আমিই ছিদ্দন। তোমাদের কে পাঠিয়েছে? কেন এসেছ তোমরা?”

এই প্রশ্নের উত্তরে শেখর একটা চাল দিলেন, লাগে যদি তাহলে বাজি মাত, না লাগলেও অন্য উপায়ের কথা ভেবেই রেখেছেন, “ম্যাডাম পাঠালেন। কিছু দিন আগে বুলাকি, ম্যাডামকে কিছু জিনিষের স্যাম্পল দিয়েছিল। ম্যাডামের পছন্দ হয়ে যাওয়াতে সেই স্যাম্পেলর পুরো দুটো কার্টনই চেয়েছিলেন। সেই কার্টন দুটো যদি এনেছ তাহলে সেগুলো দাও। সেজন্য ম্যাডাম হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। বুলাকি না থাকলে তোমাকেই দিতে বলেছেন।”

ছিদ্দন যেন আকাশ থেকে পড়ে, বলে, “দুটো কোথায়? ভইয়া তো একটাই এনেছে হপ্তাভর পহেলে। তারপরে তো ভইয়া আর আসেনি।” এই সময় তার মায়ের গলার আওয়াজ আসে, “এ ছিদ্দনোয়া, আরে শুন তো ইহা।” ছিদ্দন ঘরের ভেতর যেতেই সঞ্জয় ফিসফিসিয়ে বলে, “স্যার এ লোকটার তো নেপালি কাটিঙের মুখ। কিন্তু এর মা হিন্দি বলছে বিহারীদের টানে।”

শেখর বলেন, “এখানে অনেকে বিহার থেকে আসে, চা বাগানের শ্রমিকের কাজ করতে। তারা অনেকেই স্থানীয়দের বিয়ে শাদী করে এইখানেই পাকাপাকি রয়ে যায়। এদেরই কেউ কেউ দুটো বেশি পয়সার লোভে অন্ধকার জগতে চলে যায় যেমন এই বুলাকি। পুরো ব্যাপারটা আমাদের কাছে ধীরে-ধীরে পরিস্কার হচ্ছে। এখন আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লাম মাত্র। দেখা যাক এখন ছিদ্দন কী আনে আর কী বলে।” ছিদ্দন আসছে আন্দাজ করে দুজনেই চুপ হয়ে যায়। ছিদ্দন দুটো মাঝারী সাইজের কার্টন এনে ওদের হাতে দিয়ে বলে, “ভইয়া আর একটা ডিব্বা এনে মায়ের কাছে রেখে দিয়েছিল। ম্যাডামজীকে বলবেন যে আমরা খুব তখলিফের মধ্যে গুজারা করছি। আমি চা ফেক্টারির বয়লারের কাজও জানি। গারডেনে এখন নোতোন লোক লিবার অসুবিধা থাকলে হাম চা ফেকটারিমে ভি কাম করতে পারি।”

প্যাকেট দুটো নিয়ে পাহাড়ি পাকদন্ডী রাস্তায় এসে, রাস্তায় একটা পায়ের ছাপ আর দূরে বাঁকের কাছে একটা সরকারী মারুতি জিপ দেখে উনি একবার নিজে মনেমনে হাসলেন। একটু নিচু গলায় সঞ্জয়কে বললেন, “তুমি এই প্যাকেট দুটো নিয়ে জীপে ওঠো আর ডিএসপি সাহেবকে বলবে যে উনি যেন গাড়ির ইঞ্জিন চালু না করে, পার্কিং ব্রেক আর ক্লাচ ছেড়ে, ঢালু গড়ানে আমার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে একটা বাঁক পেরিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করেন। আমি এইখান থেকে জিপে উঠছি সেটা ছিদ্দন দেখলে গড়বড় হয়ে যেতে পারে।”

সঞ্জয়ের হাতে স্টিয়ারিং ছেড়ে দুজনে ড্রাইভারের পেছনের সিটে বসে চলেছেন মাজিটঁড়ে, বৌদ্ধতন্ত্রের প্রফেসর এমেরিটাস ডঃ দেবু সেনের বাড়ি। সোহম ওয়্যারলেসে বেতগুড়িতে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে যে ছিদ্দন আর তার মা’কে একটা গাড়িতে শিলিগুড়ি মর্গে পৌঁছে দিতে এবং অন্ত্যেষ্টির পর তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনাবার ব্যবস্থা করতে। পুলিস লাইনের মেসে দু’জন রাঁধুনির কথা মেস ম্যানেজার সবাইকে বলছিল। যদি সম্ভব হয় তবে ছিদ্দন আর তার মাকে সেই কাজে নিতে বলল সোহম।

রাস্তায় এগোতে এগোতে ছিদ্দনের দেওয়া দুটো প্যাকেটের মধ্যে একটায় পাওয়া গেল মানুষের চামড়ার স্বাভাবিক রঙের সাথে মিলে যাওয়া মুখের বিভিন্ন আকৃতির সাথে মেল খাইয়ে একাধিক মুখোশ। মুখের আদল মিলে গেলে সেই মুখোশ পরে থাকতে যেমন কষ্ট হচ্ছে না তেমনি রাস্তায় পড়া তিস্তা বাজারের ট্রাফিক পুলিস সোহমকে চিনতে না পেরে স্যালুট তো দিলোই না, স্টিয়ারিঙে বসা সঞ্জয়কে তাকে বলতে হল যে ডিএসপি সাহেবের বাড়ির লোক এনারা, কলকাতা থেকে এসেছেন। অন্য প্যাকেটটা খুলতেই প্রথমেই পাওয়া গেল একটা পুঁথি আর তার তলায় কলাপাতার ওপর তুলোর মোড়কে ঢাকা একটা প্যাকেট থেকে কুচকুচে কালো রঙের একটি ভয়ানক দর্শন হিংস্র মুখ উঁকি দিচ্ছে। দ্বিতীয় প্যাকেটটা দেখে শেখর বললেন, “এই পুঁথি আর মূর্তির ব্যাপারে আমাদেরকে আলোকিত করবেন ডঃ সেন। ওনার সাথে এই নিয়ে আলোচনা আমাদেরকে এই কেসের ব্যাপারে অনেক সাহায্য করবে।”

সোহম বলে, “স্যার, আমি আর একটা পুঁথি পেয়েছি। ওর প্যাকেটটা আমার সিটের নিচে রেখেছি। আপনাকে আর সঞ্জয়কে ভুটিয়া এন্ড লিম্বুতে দেখে আমি আন্দাজ করতে পারি যে আপনারা ওখানে কীসের সন্ধানে যাচ্ছেন। ডিপার্টমেন্ট এই কেসের ব্যাপারে যুক্ত সবার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে ফাইল বানিয়ে ফেলেছে। সে ফাইলটাই আমি সেইসময় দেখে নিচ্ছিলাম। দীপকবাবুর ফাইলটা পড়তে-পড়তে আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে। আমি মেন্ডাবাড়ি হোটেলের লকার রুমে দীপকবাবুর লকারের আশেপাশের যেসব লকার খালি থাকার কথা, সেগুলো হোটেলকে দিয়ে খোলাই। এর মধ্যে একটাতে আমি এই পুঁথিটি পেয়ে যাই। হোটেল আমাকে জানায় যে এটি দীপকবাবু শুরুতে নিলেও একদিনের মধ্যে খালি করে দেন। হতে পারে দীপকবাবু এটি খালি করবার সময় এই পুঁথিটি ফেলে যান এবং হোটেল সেরকম কিছু চেক না করেই এতে চাবি লাগিয়ে দেয়। হতে পারে এই পুঁথির ব্যাপারে দীপকবাবুকে জেরা করলে, এই কেসের ব্যাপারে কিছু লিড হয়তো পাওয়া যেতে পারে। আমি তাই এটি রেখে নিয়েছি।”

শেখর বলেন, “সোহম, আমরা এই দুটি পুঁথি ডঃ সেনকে দেখাব। দেখি উনি কী বলেন আর এই পুঁথি আমাদের কতটা সাহায্য করতে পারে।”

পথচলতি লাঞ্চের জন্য, সিংটাম চকবাজারে গাড়ি রাস্তার ধারে থামিয়ে সঞ্জয় এনে দিয়েছিল চিকেন রোস্ট আর রুমালি রুটি। সিংটাম ব্রিজ পেরিয়ে, তিতিলঝোরার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে তিনজনে লাঞ্চ সেরে নিলেন। ঝোরার জল চোখে মুখে ছিটিয়ে শেখর বললেন, “এই কেসের উল্লেখযোগ্য কী-পয়েন্ট হচ্ছে অপহরণকারী দলটা মুখোশের সাহায্যে সবাইকে ধোঁকা দেবার সফল চেষ্টা করেছে। অপহরণটাও বেশ রহস্যজনকভাবে করেছে। মুক্তিপণ চেয়ে যখন কোনো কল এখনো আসেনি তখন ধরে নেয়া যেতে পারে যে এই কাজের মূল কুচক্রি অর্থের কারণে এই কাজ করেনি এবং সেক্ষেত্রে কেসটা বেশ জটিল হলেও একদিকে ভেবে দেখলে আমাদের এখন প্রধান টাস্ক হল এই অপহরণের মোটিভটা কী, তা জানা। সেটা ঠিকমত বার করে ফেললে অপরাধীকে ধরা আর অপহৃতকে তাড়াতাড়ি ফিরে পেতে সময় লাগবে না। যাই হোক এরা কিছু ভুল করেছে যেটা আমরা কাজে লাগাব। বুলাকিকে মেরে ফেলে এরা আমাদের হাতে অনেকটা লিড দিয়ে দিয়েছে। বুলাকি ভুটিয়া এন্ড লিম্বু ছাড়া আর কোন কোন অ্যান্টিক অপারেটরকে সাপ্লাই দিত সেটার খোঁজ করলে কিছু জরুরি লিড আমারা পেয়ে যাব। মাজিটাড় পৌঁছাতে পৌঁছাতে, তুমি আমাকে এই দীপকবাবু যার ছেলে সুমনকে অপহরণ করা হয়েছে তার এবং এই কেসের সাথে যারা কানেক্টেড তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, তোমরা যা জোগাড় করেছ আমাকে বল।”

সোহম বলে, “আমার কাছে সেই ফাইলটা এই ট্যাবে আছে। আপনাকে পড়ে শোনাচ্ছি--- ডুয়ারসের সামসিং অঞ্চলে দীপকবাবুর ঠাকুরদার অনেকগুলো বড়ো বড়ো টি এস্টেট ছিল। দীপকবাবুর বাবা এইখানে এইগুলো দেখাশোনার সাথে সাথে জুয়ার নেশাও ছিল। জুয়াতে বড়ো রকমের ধন দৌলত পাবার আশায় এক তান্ত্রিক গুরুর কবলে পড়েন। প্রথমে বেশ কিছু সাফল্য পেলেও পরে এই জুয়া আর তান্ত্রিক আচারের পেছনে অনেক অর্থ খরচ হবার ফলে বিশাল দেনাতে জড়িয়ে পড়েন যার কারণে এই সব এস্টেটগুলি একে একে বেচে দেন। পাছে দেউলিয়া হয়ে যান, সেইজন্য তিনি নিজের চা বাগানের বিক্রির টাকার সিংহভাগ গুরুর পরামর্শে সোনা-জহরত কিনে আসামের কোনো এক জায়গায় গুপ্তধন করে লুকিয়ে রাখেন। সেই গুপ্তধনের ঠিকানা তাঁর গুরুদেব আর তিনি ছাড়া আর কেউ জানতেন না। কিন্তু গুরু-চ্যালা দু’জনেরই কলকাতার কাছেই তাঁদের এক বাগানবাড়িতে কোনো তান্ত্রিক ক্রিয়া চলবার সময় রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়। সেই সময়কার ইনভেস্টিগেশন এবং কেস ডায়েরি থেকে পাওয়া গেছে যে বাগানবাড়ির সেই মন্দিরের ভেতর কোনো তান্ত্রিক ক্রিয়া চলবার সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। মৃত্যুর সময় দুটো মৃতদেহেই আতঙ্কের ছাপ এবং অজানা প্রাণীর দংশনের দাগ আছে। দীপকবাবু ওই বাগানবাড়ি বিক্রি করে বিভিন্ন বাগান থেকে চা এনে প্যকেজিং এবং পরে চা রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন। বছর পাঁচেক আগে দীপকবাবু এই ব্যবসার সাথে সাথে বিদেশের বিভিন্ন চা আমদানি কোম্পানির হয়ে টি অকসন এজেন্টের কাজ করতে থাকেন। এই কাজে তিনি শিলিগুড়ি এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন টি এস্টেটে প্রায়ই আসতেন। এইসময় তিনি অ্যান্টিকের বিজনেসেও নেমে পড়েন। শিলিগুড়ি এবং কলকাতা দু’জায়গাতেই প্রাইম লোকেসনে তাঁর বেশ বড়ো দোকান আছে। আমাদের নিজস্ব ইনভেস্টিগেশন সোর্স জানাচ্ছে যে বেতগুড়িতে তিনি প্রায়ই আসেন। প্রথমে তিনি মেন্ডাবাড়ি হোটেলে উঠতেন। পরে এই তল্লাটের সবচাইতে বড়ো চা বাগান যাদের বাগানের সাথে সাথে বিশাল টি প্রসেসিং প্লান্টও আছে সেই বেড়াবাড়ি টি এস্টেটে যাওয়া আসা এবং বাগানের ভেতর তাঁদের গেস্ট হাউসেও থাকতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের সোল সেলিং এজেন্ট হয়ে যান। এরপরই দীপকবাবুর আর্থিক অবস্থা এতটাই ভাল হয়ে যায় যে তাঁর পুরানো বাগানবাড়িটি আবার কিনে নিতে সক্ষম হন। এই বাগানের মালিক বর্তমানে বিপাশা দেবী যিনি তাঁর স্বামী নরেন্দ্র সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর সব সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারিণী হয়ে এই বাগানের বর্তমান মালিক হন। বিপাশা দেবী খুব কম বেতগুড়িতে নিজের চা বাগানে আসেন। টি অকশনের সময় দীপকবাবুর সাথে শিলিগুড়িতে টি অকশন হাউসে তাঁকে দেখা গেছে।”

শেখর, সোহমকে থামতে ইশারা করে বললেন, “এক্সেলেন্ট জব ডান বাই টিম। আমি যা বুঝলাম তাতে আমার মনে হয় তোমরা দীপকবাবুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানে তাঁর নাইট লাইফ, ড্যান্স বারে বন্ধুদের নিয়ে ফুর্তি, এইসব নিয়ে কোনো খবর নিয়েছ?”

সোহম মাথা নেড়ে বলে, “স্যার আমরা এই ব্যাপারে একটা রুটিন সার্চ করেছি। উনি নিজের ব্যবসা এবং তাঁর অবসরে নিজের পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটান। শৈশব থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে বড়ো হয়েছেন দীপকবাবু এবং সেই ভাবধারাতেই এখনো চলেন। বেশির ভাগ ছুটির দিন এবং প্রতিটি উৎসবের দিন উনি সপরিবারে বেলুড় মঠে চলে যান। ওনার স্ত্রী বিদিশাও বিয়ের আগেই দীক্ষা নিয়েছিলেন।”

শেখর জিগ্যেস করলেন, “বিদিশাকে উনি সামজিক বিয়ে করেন না লাভ ম্যারেজ?”

“স্যার, সেটা বলা যাচ্ছে না। তবে যে বছর উনি বিয়ে করেন তার পাঁচ-ছ’বছর আগে এবং এখনো অবধি কোনো রেকর্ডে তাঁর বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়নি। তবে ওনার স্ত্রীর মা বাবা অল্প বয়েসেই মারা যান। তাঁর কাকা-কাকিমা যাদের নাম উনি বলেছেন, সেই দু’জনেই সদ্য প্রয়াত।”

ট্যাব থেকে একটা ফাইলে ক্লিক করে সোহম বলে, “স্যার, সুমন মাঝারি মাপের ছাত্র। তার প্রধান আকর্ষণ কবিতা ও গান লেখা এবং তাতে সুর দেওয়া। প্রকৃতি সে খুব ভালোবাসে। তবে এই ধরনের কিশোরদের যে হৃদয়গত কিছু ব্যাপার থাকে তা কিন্তু এর নেই বলে জানা গেছে। আধিভৌতিক, পারলৌকিক ভূত-প্রেত, হরর এইসব তার খুব পছন্দের। বেশ কয়েকবার ও বন্ধুদের সাথে প্ল্যানচেটে মিডিয়ম হতে গিয়ে বিপদে পড়লেও এই নেশা তার আছে। মা বাবার কড়া বকুনি সত্ত্বেও সে এটি এইখানে বেড়াবার কিছুদিন আগেও করেছে। সুমনের ঘর তল্লাস করে এবং কলকাতা পুলিসের তদন্তে তার কোনো রকম নেশা বা ড্রাগের খবর জানা যায়নি।”

শেখর বললেন, “সোহম, বেড়াবাড়ি টি এস্টেটের মালকিন বিপাশা দেবীর ব্যাকগ্রাউন্ড অনুসন্ধান তোমরা করেছ কি?”

সোহম বলে “স্যার উনি এই কেসে কোনোভাবে জড়িত নন বলে আমরা মনে করছি। সেইজন্য এইসময় আমরা ওনার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করিনি। কিন্তু আমি জয়েন করবার পর ওনার স্বামী নরেন্দ্র তার শোবার ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় হার্ট ফেল করে মারা যান। বিপাশা তার সব সম্পত্তির একছত্র অধিকারিণী হওয়ায় আমরা ওনার সম্বন্ধে অনুসন্ধান শুরু করি। বিপাশা দেবীর সম্বন্ধে প্রথমে বেশী কিছু জানতে পারিনি। উনি বেশ সুন্দরী এবং শিক্ষিতা তা সত্ত্বেও নিজের বয়েসের চাইতে প্রায় ডবল বয়েসি লোককে কেন বিয়ে করলেন আর ওনার বাপের বাড়ি কোথায় এই খবরগুলো পেতে বেশ সময় লেগে যায়। বিভিন্ন পুলিস ফাইলস থেকে জানা যায় যে একদম শৈশবে উনি নিরুদ্দেশ হয়ে নিউ দিল্লি স্টেশন প্লাটফর্মে ঘুরতেন। পুলিস ওনাকে একটি মিশনারির হাতে তুলে দেয়। এরপর ভাগ্য সহায় হয়। মিশনারিদের স্কুলে ইংরাজি মাধ্যমে স্কুলের পড়া শেষ করে, বিশেষ স্কলারশিপ এবং অনুদান পেয়ে হোটেল ম্যনাজমেন্টে ডিগ্রি পান। দিল্লি ও কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলে ফ্রন্ট অফিসে কাজ করার সময়, শিল্পপতি নরেন্দ্রর সাথে আলাপ ও সামাজিক বিয়ে। বিয়ের প্রায় পরেই নরেন্দ্র তাঁর সব সম্পত্তির একছত্র উত্তরাধিকার বিপাশাকে দিয়ে যান। শুরু থেকেই, বেড়াবাড়ি টি এস্টেটে বিপাশা খুবই কম থাকেন। তাঁদের উইন্ডমিল, সৌর বিদ্যুত, এছাড়া এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের বিজনেস ছড়ানো আছে দেশে ও বিদেশে। উনি সেইগুলো দেখবার কাজে ব্যস্ত থাকেন।”

প্রফেসর দেবু সেনের বাংলো বাড়ির আউটহাউসে দু’ঘন্টা বিশ্রাম নেবার পর তাঁর বিশাল লাইব্রেরি রুমে ডাক পড়ল। এককোণে একটি টেবিলে দুটি বড় থারমোসে চা, কফি আর হটপট ভরতি গরম সামোসা রাখা আছে। যেমন ইচ্ছে খাও, কোনো ফর্মালিটি নেই। ওরা দু’জন এইখানে পৌঁছাবার সময়ই, পুঁথি দুটি স্টাডি করবার জন্য ডঃ সেন তাঁদের কাছ থেকে নিয়েছেন। ওরা এইসাথে সেই মুখোশের প্যাকেটটিও তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সিকিম- বাংলা এই দুই রাজ্যের প্রায় সীমান্তে এই গ্রাম মাজিটাড়। সারাটি দিন একটু গরম ছিল, তাই সন্ধ্যে হতেই অঝোরে বৃষ্টির সাথে সাথে অন্ধকার আকাশ জুড়ে মাঝে মাঝেই দেখা দিচ্ছে বিদ্যুতের আলপনা। চা পানের পর্বেই প্রফেসর তাঁদের অনুরোধ জানালেন যে বিপদসঙ্কুল পাহাড়ি রাস্তায় ফিরে না গিয়ে রাতটা তাঁর এইখানেই কাটিয়ে যেতে। শেখর বললেন, “স্যার, আপনার সাথে যতটা সময় কাটানো যায় ততই নিজের অন্ধকার কাটে।” বিপত্নীক প্রফেসর সেন তাঁর পরিচারককে বললেন, “রাত্রে আজ দম বিরিয়ানি আর বুরহানি বানাবার ব্যবস্থা করে ফেল। দেখি আজ তোমার হাতের কেরামতি আর এনারা কী বলেন সেটাও শুনি।”

“আপনাদের কাছ থেকে আমি মোট চারটে জিনিস পেয়েছি। দুটো পুঁথি, একটি ধ্যানমূর্তি এবং মুখোসের একটা প্যাকেট। চারটে জিনিসই কিন্তু একে অন্যের সঙ্গে এক যোগসূত্রে বাঁধা। আমি প্রথমে মুখোশের কথায় আসছি কেননা পুঁথিদুটোর স্তোত্রতে এই মুখোশকে ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়তলিতে সেনসা নামে এক আদিম জনজাতি সম্প্রদায় বাস করত যারা জীবিকার জন্য চাষবাসের কাজ করতে বাধ্য হলেও তারা আদতে ছিল উঁচুমানের শিল্পী। দ্বিমাত্রিক কোনো চিত্র থেকে ত্রিমাত্রিক রূপ এবং বিমূর্ত প্রতীক চিত্র ইত্যাদি তৈরি করতে পারত। এদের একটি অংশ কোনো কারণে তিব্বতে এবং নেপালে গিয়ে পৌঁছায় যেখানে স্তোত্রপাঠের অর্থ বুঝিয়ে দিলে তারা তান্ত্রিক দেবদেবী এবং অপদেবতাদের মুখোশ বানিয়ে ফেলতে পারত। বৌদ্ধতন্ত্রে একটি উপাসনার পদ্ধতি ছিল যেখানে সাধক এইসব মুখোশ পরে সাধনার মধ্যে নিজের আত্মার মধ্যে সেই দেবদেবী বা অপদেবতাকে আহ্বান করত। কিছুসময় পরে এদের এক বড়ো অংশ আসামে বসবাস করতে শুরু করে এবং এদের এই প্রতিভাকে আসামের তান্ত্রিকেরাও কাজে লাগান। সবস্থানেই ভাল এবং দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা থাকে। কিছু তান্ত্রিক, কারো ক্ষতি সাধনের জন্য এদের দিয়ে যার ক্ষতি করতে হবে তার মুখের চিত্র এদেরকে দেখিয়ে সেই মুখের হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করাতেন। এরপর পুঁথিতে লেখা মন্ত্রোচারণ করে সেই মুখে নানারকম সুচ ফুটিয়ে আসল ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে হত্যা করতেন। এই তান্ত্রিকদের একটা বড় অংশ মায়াং-এ বসবাস করতে শুরু করে। মায়ং-এ তন্ত্রের ভালো এবং মন্দ দুদিকেরই সাধনা হতে থাকে। এই সময় অনেক মন্ত্র যা মুখে মুখে ছিল তা পুঁথির আকারে লেখা শুরু হয়। এই পুঁথির শুরুতে, শেষে এবং মধ্যে এই পুঁথির লেখক নাগধর বেজ বলে লেখা আছে। আমি এই নামে একজনকে জানি যিনি বিভিন্ন শাস্ত্রে সুপণ্ডিত এবং তন্ত্রাচার্য এবং এনার নাম বিনয় হাজারিকা বলে সরকারী কাগজপত্রে লেখা থাকলেও পুরো মায়াং এ লোকে ওনাকে নাগধর বেজ বলেই জানে। এই অঞ্চলে যারা তন্ত্রাচার্য এবং কুলগুরু হন তাঁরা বংশ পরম্পরায় একই নাম রাখেন যাতে তাঁদের শিষ্যরাও সেই বংশ পরম্পরা মেনে চলেন। এই পুঁথির যে অংশটি সোহম পেয়েছেন তাতে শুধু বীজমন্ত্র আছে, পরেরটিতে উপাসনা এবং স্তবস্তুতি ও প্রার্থনা আছে। দুটি পুঁথিই মায়াং নিবাসী নাগধর বেজের লেখা। এগুলি নিঃসন্দেহে মায়াং এর পুঁথি।”

শেখর বললেন, “আপনার কথার মাঝখানে বলার জন্য মাফ করবেন স্যার। বীজমন্ত্র আর উপাসনা একটু যদি বুঝিয়ে বলেন। এই অপহরণ কেসে হয়ত এই পুঁথির লিঙ্ক থাকতে পারে।”

ডঃ সেন বোঝাতে গিয়ে বললেন, “একটু সরল করলে, মায়াং থেকে আনা ছোট পুঁথিটি হচ্ছে ঘরে ঢোকবার চাবি আর দ্বিতীয় পুঁথিটি হচ্ছে ঘর। বীজমন্ত্রে শরীরের মধ্যে নানা চক্রের মধ্যে যেটি দরকার সেইটিকে জাগ্রত করা হয়। যেমন এই পুঁথিতে অনান্য চক্রের সাথে জোর দেয়া হয়েছে ভ্রু র মাঝখানে আজ্ঞাচক্রকে জাগ্রত করাতে যাতে আবাহিত শক্তিকে অথবা কোনো অপশক্তি, অশরীরী ইত্যাদি দর্শন করা যায় এবং পরের পুঁথিটি পাঠ করে সেই দেবী বা অপদেবীকে উপাসনা করে তাঁকে ধ্যানমূর্তিতে আবদ্ধ করে পরে তাঁকে দিয়েই নিজের দুরভিসন্ধি সাধন করা, যেমন যার ক্ষতি করতে হবে তাঁর পুতুল বানিয়ে, একের পর এক সুচবিদ্ধ করে হঠাৎ করে অজানা রোগে মেরে ফেলা। আপনারা পুঁথির সাথে যে ভীষণদর্শনা কালো রঙের মূর্তি আমাকে দিয়েছেন এটি সেইরকম এক ধ্যানমূর্তি।”

ডঃ সেনের সাথে মিটিং-এর সাথে সাথে ইটিং অর্থাৎ রাতের ডিনারও চলছিল। তবু সব শেষ হতে প্রায় মাঝরাত পেরিয়ে গেল তারা দু’জন গেস্টরুমে যখন বিশ্রাম নিতে এলেন। রুমে আসতেই এস এসপি শেখরের মোবাইলে রিং হতে লাগলো। শেখর, সোহমকে বললেন, “দিল্লি এসবি’র ফোন। দারুণ অ্যাকটিভ এরা, সত্যিকারের পেশাদার।” ফোন তুলে উনি বলেন, “বোল বলবীরা, মিলা কুছ?” এরপর দিল্লী পুলিশের কাছ থেকে কিছু খবর শুনে বসে পড়লেন নিজের শয্যায়। সব শুনে বললেন, “সচ মে বলবীরা? ওহ মারভেলাস। তোমরা দুটো ছবি মিলিয়ে নিয়েছ টেকনিক্যাল এক্সপার্ট দিয়ে? রিয়েল গুড জব বাই ইয়োর টিম, থ্যাংকস টু অল অফ দেম।” ফোন সুইচ অফ করে তিনি সোহমকে জড়িয়ে ধরেন, “তোমার ব্রেন ওয়েভ দারুণ কাজ করেছে। আমরা এখন অপরাধীর খুব কাছে। সে অপহরণ ছাড়া কমপক্ষে দু’ দুটি অপ্রমাণিত হত্যার সাথেও জড়িত। কিন্তু আমাদের ঘরের ছেলেরা কী করছে এতক্ষণ ধরে? দুটো সামান্য কাজ, তা করতে এতো সময় কেন নিচ্ছে?”

সোহম বলে, “স্যার, ওরা অনেক আগেই সে কাজ করে ফেলেছে। আমরা তখন ডঃ সেনের সাথে আলোচনা আর ডিনারে ব্যস্ত ছিলাম।”

“আমি কল করছি” এই বলে শেখর মাথা নেড়ে বলেন, “নাঃ বেটার ইউ কল দেম।” সোহম কল করতেই ইনস্পেকটর, সি আই ডি অরিজিৎ বোস বললেন, “হ্যাঁ স্যার, আমরা ওই বছরের ম্যারেজ রেজিস্ট্রেসনের রেকর্ড পেয়ে গেছি। স্যার, এস এস পি সাহেব কি ওইখানে আছেন? ওনার সাথে একটু কথা বলে নিতে চাই।”

শেখর বললেন, “ভেরি গুড অ্যান্ড কুইক জব বাই টিম। ওই অ্যাকশন প্ল্যানের ব্যাপারে বলবে তো?”

“হ্যাঁ স্যার। আপনি যা অনুমান করেছিলেন আমরা আজ স্পটে গিয়ে তাই দেখতে পাই। এই বাড়ির মেরামতির কাজের আর সিকিউরিটির ঠিকাদার আমার চেনা লোক। আমার কথামত সে বাড়ির মন্দিরের কাছে জঙ্গল সামান্য পায়ে চলার মতো রাস্তা বানিয়ে বন্ধ করে, লোকদের এইখানেই অন্য কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। বাড়ির মালকিন যদি ফোন করেন তবে তাকে কী বলতে হবে শিখিয়ে দিয়েছি। টাস্ক ফোর্সের কম্যান্ডোরাও আমাদের সাথে ছিল। তাদের অফিসারকে ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝিয়ে অনসাইট দেখিয়ে দিয়েছি এবং তারাও ঠিক করে নিয়েছে রেস্কিউ অপারেশনে কোথায় কোথায় পজিশন নিয়ে থাকবে। পুরো বাড়িটায় আর বাগানে অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়ে গেছে। আমাদের এস টি এফের লোকেরাই সিকিউরিটি সেজে থাকবে। আমি প্রত্যেক প্রধান লোকদের সাথে আলাদা আলাদা করে মিটিং করে বুঝিয়ে দিয়েছি যে ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে সোজা মনে হলেও সামান্য ভুলচুক হলেই একটি কিশোর ছেলের প্রাণ যেতে পারে, ব্যাপারটা নিয়ে মিডিয়া ঝড় তুলতে পারে।”

শেখর বললেন, “আমি নিজেও কাল পৌঁছচ্ছি, যদিও তুমি যেখানে আছ সেখানে আমার দেখার কিছু নেই। ওকে সো লং দেন।”

শেখর মোবাইলের দিকে চেয়ে বলেন, “আমি এই গাড়িটা নিয়ে বাগডোগরা এগোচ্ছি। ফ্লাইটে’ই একটু রেস্ট নিয়ে নেব। এস পি মারিগাও পুজেশ্বরের টিম মায়াং থেকে গাড়িটা বেরোতেই শিলিগুড়ি অবধি গাড়িটাকে কভার করবে। সব চেকপোস্টকে বলে দেওয়া আছে যে গাড়িতে ভি আই পির পরিবার আছে, কেউ যেন চেকিং না করে। শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা রুটের ব্যপারটা তুমি অরগানাইজ করো। একদম তৈরি থেকো। ওই গাড়ি শিলিগুড়ি পেরবার পর দীপকবাবু আর তার স্ত্রীকে নিয়ে তুমি নিয়ে চলে আসবে কলকাতায়। কোনোভাবেই তারা যেন কলকাতার কোথায় আর কেন যাচ্ছ সেটা বলবে না, বলবে একদম শেষের দিকে। অবশ্য তখন ওরা নিজেরাই বুঝে নেবেন।”

দমদমের পোড়ো বাড়িটার মন্দিরের রাস্তা বেশ ভালোভাবে তার চেনা। শ্বশুর- শাশুড়ি তাকে প্রথমে মেনে না নিলেও পরে এই বাড়িতেই একটা ছোটো অনুষ্ঠান করে বরণ করে নেন। বিরক্ত হচ্ছিলেন তিনি, পয়সা অঢেল দিলেও ঠিকাদার কাজ কিছু করেনি। তার সঙ্গে থাকা এই পরিবারের কুলগুরু নাগধর’ও বিরক্ত হচ্ছিলেন। আগাছা আর ঝোপের ভেতর দিয়ে যেতে আর অচেতন সুমনকে তাঁকেই সামলাতে হচ্ছিল। কোনোমতে সেইখানে পৌঁছে তিনি বললেন, “আমি প্রস্তুত হচ্ছি, বেশী সময় নেব না। আমি পুজোতে বসলেই তুমি ছেলেটাকে সামলাবে। এ এই বংশের উত্তরপুরুষ এবং মায়াং-এও দেখেছি এর ওপর ভর হতে বেশী সময় লাগে না। ভর শুরু হতেই আমি অন্য পুঁথিটি থেকে পাঠ শুরু করে তোমাকে ইশারা করব। তুমি এই কৃপাণ ছেলেটির বাম বাহুর ওপরের মোটা শিরাতে সামান্য চাপ দিলেই যে রক্তপ্রবাহ বেরোবে তা এই প্রদীপে সংগ্রহ করবে। দেবীকে সেই রক্ত নিবেদনে তুষ্ট করে তবেই জানা যাবে মায়াং থেকে সাতটি রূপার ঘড়া ভর্তি সোনার গিনি দীপকের বাবা কোথায় রেখেছে। ঘড়াগুলো পেয়ে গেলেই, আমি কুলগুরুর পাওনা নিয়ে সরে যাবো। এই ছেলেটিকে যা করার তা তুমি স্থির করবে।”

সুমনের শরীরে কম্পন শুরু হতেই নাগধর সুরেলা কণ্ঠে দ্রুত শ্লোকপাঠ করে জিজ্ঞাসা করলেন, “দেবী প্রসিদং, প্রসন্নে ভবঃ ইয়হ তিষ্ঠঃ।” সুমন হেসে ওঠে উচ্চস্বরে, “দেবী আসেননি পাপিষ্ঠ, আমি দীপকের বাবা শমীন্দ্রনাথ এসেছি। তোর বাপ আমার গুরু ছিল আর সে ছিল সত্যিকারের সাধক, তোর মত লোভী, বদমাশ নয়।” নাগধর কুটিল হেসে বলে, “সেই সুযোগ নিয়ে এই মন্দিরেই তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়ে তার পাওনা না মিটিয়ে তোর পোষা প্রেত দিয়ে শেষ করিয়েছিলি। কিন্তু বাবার আর এক দেহরক্ষী অপদেবতা পরে এই ঘরেই তোকে আঁচড়ে, আঁচড়ে শেষ করেছিল। এবার বল সেই গিনি সোনা ভর্তি সাত ঘড়া কোথায় রেখেছিস?”

“আমার কষ্টার্জিত অর্থ, তোর বাপের বুদ্ধিতে ডুবতে বসেছিল। আমি নিয়ে এসেছি। তা তোর হাতে দেব কেন? যা, যা পালা। আমি দেখতে পাচ্ছি তোর দুর্দিন সামনে।”

নাগধর বলে, “তুই তাহলে কালনাগিনীকে ভুলে গেছিস। দেখ, দেখ তোর সামনেই তৈরি আছে। ছেড়ে দি ওকে তোর কাছে। কামড়ের জ্বলুনিতে ছটপট করবি।”

“না, না তুমি আমার নাতি সুমনের ক্ষতি করো না। সবকটা ঘড়া আছে মন্দিরের গর্ভগৃহে, দেবীর পঞ্চমুণ্ডী আসনের তলায়। তোর ক্ষমতা আছে তো যা নিয়ে আয়।”

নাগধর বলে, “সেই কাজ তুই কর। তোর আরাধ্য দেবীর কাছে, তুই নিয়ে আয়। দেরি করলে কালনাগিনীকে...”

সুমন কাঁপতে কাঁপতে বলে, “চল দেবীর কাছে। আমি পঞ্চমুণ্ডীর আসনে পাতা দেবীর ঘট সরিয়ে এক এক করে সাতটা ঘড়া নিয়ে আসব। তুই তোর প্রাপ্য পেয়ে যাবি। কিন্তু সুমনের কোনও ক্ষতি যদি করিস তাহলে তুই কুলগুরুর বংশধর হলেও আমি ছেড়ে কথা বলবো না।”

মন্দিরের গর্ভগৃহে তিনজনে প্রবেশ করতেই এক প্রচণ্ড ধাক্কায় নাগধর ছিটকে পড়েন, দু পাশ থেকে দু জন কমান্ডো চেপে ধরে তাকে। দু’জন মেয়ে কম্যান্ডো সামনে পেছনে এগিয়ে যাচ্ছিল বিপাশার দিকে। কিন্তু বিপাশা তাদের চাইতে ক্ষিপ্রগতিতে গর্ভগৃহের প্রবেশ পথের কাছে সরে এসে,সুমনের গলায় কাছে একটু আগে নাগধরের দেওয়া কৃপাণ ধরে চিৎকার করে বলে, “কেউ এগিয়ে এলে সুমনের গলার কাছে ধরা কৃপাণটা তার কাজ করে নেবে।” পর মুহূর্তেই পেছন থেকে একজন তার কাঁধে এক প্রচণ্ড আঘাত করতেই বিপাশা ছিটকে পড়ে। নিজের হাতের কৃপাণ হারিয়ে সে তার জিনস এর পকেটে হাত বাড়াতে যাবার আগেই তার কব্জিতে নিজের রেসিং শু র স্পাইক দিয়ে আঘাত করে চেপে ধরে নিজের নাইন এম এম তার দিকে তাক করে সোহম বলে “মেঝেতে যেমন আছেন তেমনি শুয়ে থাকুন। স্মার্ট হবার সামান্য চেষ্টা করলেই আমার দেরি হবে না এটা চালাতে।” সোহমের কথা শেষ হবার সাথে সাথে নারী কম্যান্ডোরা তাকে জাল বিছিয়ে বেঁধে ফেলে।

ভাঙ্গাচোরা বাড়িটার গাড়িবারান্দায় শেখরের দুপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুমনের সাথে তার মা- বাবা। হাতকড়া পরানো বিপাশা আর নাগধরকে, সোহম এবং এস টি এফের কম্যান্ডোদের সাথে আসতে দেখেই তিনি দীপককে বললেন, “রেজিস্ট্রি করে আইনসম্মত ভাবে এখনও প্রথমা স্ত্রী বিপাশা যিনি বিদিশা ম্যাডামের দিদি তাঁর সাথে বা আপনার কুলগুরু নাগধরের সাথে আপনার পরিচয়ের দরকার নেই। আপনার প্রথম যৌবনে যখন আপনার বাবা একের পর এক চা বাগান বিক্রি করছেন দেনার দায় থেকে বাঁচবার জন্য তখন ইনি আপনার ঘর ছেড়ে আরো কোনো উজ্বল ভবিষ্যতের আশায় ঘর ছাড়েন যা আপনি লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে রাখেন। ভাগ্যদেবী যখন আবার আপনার সহায় হন তখন এক টি অকশন মিটে আপনি আপনার প্রথম প্রেমকে আবার খুঁজে পান। ততদিনে উনি বেড়াবাড়ী টি এস্টেট এবং আরো অনেক ব্যবসার মালিক … সামাজিক বিয়ে করে ফেলেছেন। পুরাতন প্রেমের দুর্নিবার আকর্ষণে তখন উনি তাঁর পথের কাঁটা … সরিয়ে ফেলেন খুব সম্ভবত তাঁর সুপরিচিত গুরু নাগধরের সহায়তায় কোনো তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আগেরবার আপনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও আপনাদের পরিবারের গোপন কথাটির খবর উনি জানতেন। আপনার সাথে ওনার পুরানো প্রেম জেগে ওঠবার সাথে সাথে বিপাশা আপনার বাবার গুপ্তধন পুনরুদ্ধারের উপায়টিও মাথায় রাখেন। আপনার মন জয় করবার জন্যই দমদমের বিশাল বাড়িটি কেনবার জন্য আপনাকে ব্যাঙ্কের ঋণভার থেকে উনি মুক্ত করেন তবে মালিকানাটি নিজের নামে করে নেন। গুপ্তধন পাবার জন্য মায়াং এ উনি নাগধর বেজকে নানা প্রলোভন দেখান। নাগধর আর বিপাশা, দু’জনেরই ধারণা ছিল যে এই গুপ্তধন মায়াং এর কোনো তন্ত্রস্থানে লুকিয়ে রাখা আছে। নাগধর মায়াবিদ্যার সবরকম উপায় কাজে লাগিয়েও এর কোনো কিনারা করতে পারেননি। অবশেষে তাঁর মাথায় আসে যে আপনাদের বংশের কিশোর বংশধর অর্থাৎ সুমন’কে এই কাজে লাগালে তবেই গুপ্তধনের কিনারা পাওয়া যাবে। সুমন কিন্তু ওনাদের কাজ অনেক সুগম আর সোজা করে দেয়।” সোহম আর আর শেখর দু’জনেই লক্ষ করেন যে বিদিশার তাঁর স্বামীর এই নতুন পরিচয় শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। শেখর, সোহম বলেন, “সোহম, অ্যারেস্ট ওয়ারান্ট আসতে আর কতো দেরি হতে পারে?”

সোহম বলে, “স্যার আর মিনিট দশেক লাগতে পারে।”

বিদিশা বলেন, “শেখর স্যার আপনি থামলেন কেন? আমার আর সুমনের সব জানা উচিত।”

শেখর বললেন, “বেশ চলছিল দীপকবাবুর টি বিজনেস কিন্তু উনি এর সাথে অ্যান্টিকের বিজনেস শুরু করে অনেক কিছুতে জড়িয়ে পড়লেন, অন্ধকার জগতের অনেকের সাথে ওনার চলা শুরু হল। এর মধ্যে ওনার হাতে এলো মায়ং থেকে আসা একটা পুঁথি। এই পুঁথির খুব ডিম্যান্ড দেখে উনি আরো দাম পাবার জন্য এই হোটেলের লকার রুমে লুকিয়ে রেখে শাঁসালো বিদেশী খদ্দের খোঁজা শুরু করলেন। এই সময় কিছু খদ্দের পেয়ে সেটি লকার রুম থেকে উনি নিজের ঘরে আনেন। এই সময় এটি সুমনের হাতে পড়ে যায় এবং ঘটনা চক্রে এই পুঁথি পাঠ করে দীপকবাবুর ছেলের সাথে একটা অলৌকিক কিছু ব্যাপার হয় যা অপহরণকারীদের, যারা সুমনের মর্নিং ওয়াকের অপেক্ষা করছিল, কাজটা অনেকটা সোজা করে দেয়। এদিকে উনি ছেলে আর মহামূল্যবান পুঁথি দুটোই হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। পুঁথি হয়ত লকার রুমেই রেখেছেন এই ভেবে সেদিকে যাবার পথে কারো আক্রমণে আহত হন। দীপকবাবু আপনি কি তাঁকে দেখতে পেয়েছিলেন?”

বিব্রত হয়ে দীপকবাবু বলেন, “দেখেছিলাম আর চিনেওছিলাম কিন্তু সেকথা…”

সোহম বলে, “আপনি পুলিসকে কিছুই বলেননি তখন। কেন?”

“আমি নিজেই আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি।”

শেখর বলেন, “কেননা আপনি দেখেছিলেন যে আপনার স্ত্রী আপনাকে পেছন থেকে আঘাত করছেন। অথচ তাঁর কিছু আগে আপনি দেখেছেন যে কড়া ডোজের সেডেটিভ নিয়ে তিনি এখন আচ্ছন্ন হয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন। আপনি আপনার এই কথা তখন আমাদের জানালে আমরা তদন্তের কাজে অনেক এগিয়ে থাকতাম। তবে বিপাশা দেবী আপনি দীপকবাবুর কাছে খবর পেয়ে, ছিদ্দনের দাদাকে কাজে লাগিয়ে কিছু মুখোশ পেয়ে যান। আপনার আর আপনার বোনের মুখের একই আকৃতির সুবিধাটা কাজে লাগিয়ে যথাযথ মুখোশটা পরে বিদিশা দেবী হয়ে গিয়ে আমাদেরকে খুব ভাল ধোকা যেমন দিয়েছেন তেমনি এই মুখোশের সূত্র ধরে আমরা তদন্তের কাজে ভালো লিডও পেয়ে যাই। আমরা বুঝে যাই যে মুখোশের আড়ালে সম্ভাব্য অপরাধীদের মধ্যে আপনি একজন। এর সাথে বুলাকিকে মেরে ফেলার ব্যপারে সুপারি যে আপনি দিয়েছেন সেটা জানতে পেরে আমাদের কাছে ব্যাপারটা অনেক পরিস্কার হয়ে আসে। আপনি এবং আপনার গুরু মুখোশ পরে আমাদেরকে ধোঁয়াশায় ফেললেও অনান্য সব সূত্র ধরে বিশেষত দীপকবাবুর ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজে আমরা বুঝে যাই আপনাদের মোটিভ, এবং এটা জানতে দেরি হয়নি যে সুমনকে আসলে হিপ্নোসিস করে তার ভেতরে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার সূত্র ধরে আপনারা বুঝে যান যে গুপ্তধন মায়ং-এর কোথাও নয় বরং সেটা সরিয়ে নিয়ে দমদমের বাড়িতেই রাখা আছে। সুমনের সাথে এই অলৌকিক ব্যাপারটা না হলে আপনাদেরকে মায়ং-এ এই রকম হাতেনাতে ধরবার সুযোগ পেতাম না।”

সোহম বলে “স্যার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট এসে গেছে। চলুন গুরু আর চেলা দুজন। আজ রাতটা আমাদের আতিথ্যে কাটান, তারপর দেখি কোর্ট কী বলে পুলিস কাস্টডি না এই দমদমের জেল কোনটাতে আপনারা থাকবেন।”

সবাই চলে গেলে সোহম শেখরকে বলে “আপনার কাছে আমার এখনও অনেক শেখা বাকী আছে স্যার। কিন্তু স্যার সুমন বলছে ওর ওপর সেই মেয়েটির ভর হওয়া বা কোনো মানুষের পুতুল বানিয়ে মায়াং-এ যে অলৌকিক শক্তির কথা শুনি তার কি সত্যতা আছে?”

নিজের হাভানা চুরুটে আগুন লাগিয়ে শেখর বলেন, “আমরা পুলিস--- অপরাধীর,অপরাধের সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড় করে আইনের হাতে তুলে দিতে পারি কিন্তু সব দরজা চেষ্টা করেও খোলা যায় না। এগুলোও তাই বলে ধরে নিতে হবে।”

বন্ধ ঘরের ভেতর - বিভাবসু দে

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী
(১)

ঘরে ঢুকতে গিয়েই খিল-ভাঙা দরজাটার দিকে চোখ পড়েছিল ইনসপেক্টর খানের। কাঠের তৈরী সাদামাটা একটা দরজা, গায়ে খয়েরি রঙ করা। ঘরটাও খুব জমকালো নয়, তবে সুন্দরভাবে সাজানো-গোছানো। অজিতেশবাবু চিরকালই এমন পরিপাটি মানুষ।

ওঁর সঙ্গে খানের পরিচয় চাকরিজীবনের একেবারে শুরুতে। ইনসপেক্টর খান তখন সদ্য পুলিশে ঢুকেছেন আর অজিতেশ ব্যানার্জি সেই সময় পুলিশের নামকরা দুঁদে অফিসার। এককথায় বলতে গেলে ‘ডিপার্টমেন্টাল হিরো’। তাঁর রেকর্ডবুকে জাঁদরেল খুনি, গুন্ডাদের ধরা থেকে শুরু করে এনকাউন্টারে হিটলিস্টের মোস্ট-ওয়ান্টেড দুষ্কৃতী মারা, সবই ছিল। যেকোনও নতুন জয়েন করা অফিসারের কাছে অজিতেশ ব্যানার্জি ছিলেন আদর্শ। আর রশিদ খানও তার ব্যতিক্রম নন। এখনও মনে পড়ে, অজিতেশবাবুর সলভ করা প্রতিটা কেস সেই পুলিশ ট্রেনিং-এর দিন থেকে খানের নখদর্পণে ছিল।

ঘরটার ভেতর ঢুকতে ঢুকতে যেন কুড়ি-একুশ বছর আগের সেই স্মৃতিগুলোই ভিড় করে আসছিল খানের চোখে। এমন একজন মানুষ হঠাৎ এই কাজ কেন করতে যাবেন? ডিপ্রেশন? আসলে খবরটা শোনার পর থেকেই প্রশ্নগুলো বারবার খচখচ করছিল ইনসপেক্টর খানের মাথায়। কোথায় যেন কী একটা হিসেব ঠিক মেলাতে পারছেন না কিছুতেই।

ঘরটা আরেকবার চোখে মেপে নিলেন খান। পুবের দেওয়াল ঘেঁষে একটা বিছানা—অজিতেশবাবুর নিথর রক্তাক্ত শরীরটা এখনও সেখানেই পড়ে আছে। ফরেনসিকের লোকেদের স্যাম্পল আর ছবি নেওয়া শেষ হলেই একটু পরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে পোস্টমর্টেমের জন্যে।

বিছানাটার ঠিক পাশে একটা জানালা, আরেকটা জানালা দক্ষিণের দেওয়ালে। আর দক্ষিণ-দেওয়ালেরই শেষ মাথায় সেই দরজাটা—এটাই ঘরের একমাত্র দরজা। উত্তর দিকে দেওয়াল ঘেঁষে একটা স্টাডি টেবিল, তার ঠিক পাশে বইয়ের আলমারি আর দেওয়ালের ওপরদিকে একটা টিউব লাইট। পশ্চিম দিকের, মানে অজিতেশবাবুর বিছানার ঠিক উল্টোদিকের দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো এক-দুটো পারিবারিক ছবি, অজিতেশবাবুর বিভিন্ন সময়ে পাওয়া কিছু মানপত্র, পুরস্কার গ্রহণের ছবি আর একজোড়া বাঁশবেতের সোফাসেট, এই। আর হ্যাঁ, একদম ওপর দিকে একটা এসি, এখনও চলছে।

“অজিতেশবাবু কি রাতে এসি চালিয়ে শুতেন?”

“হ্যাঁ স্যার। আসলে দরজা-জানালা তো সবই বন্ধ রাখতেন।” কথাগুলো বলতে বলতেই খানের দিকে এগিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক। বয়স আন্দাজ বত্রিশ কি তেত্রিশ হবে। মোটামুটি লম্বাই বলা চলে, গায়ে একটা সাধারণ টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ভদ্রলোকের চেহারার আদলে যে অজিতেশবাবুর সঙ্গে বেশ মিল আছে, সেটা চোখ এড়াল না ইনসপেক্টর খানের।

“আপনি?”

“আমি অজিতেশ ব্যানার্জির ছেলে। অমিতেশ ব্যানার্জি।”

অমিতেশকে বেশ ভালো করে একবার দেখে নিয়ে খান জিগ্যেস করলেন, “আপনিই কি প্রথম ঢুকেছিলেন?”

“হ্যাঁ। তবে একা নই, সঙ্গে মৈত্রী, বসন্ত আর আমাদের দু’জন প্রতিবেশীও ছিলেন।”

“মৈত্রী আর বসন্ত কে?” ইনসপেক্টর খান ততক্ষণে প্রায় বিছানার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। সঙ্গে অমিতেশও।

“মৈত্রী আমার স্ত্রী। ডাঃ মৈত্রী ব্যানার্জি।” আঙুলের ইশারায় বাইরে দাঁড়ানো বছর তিরিশের এক ভদ্রমহিলাকে দেখালেন অমিতেশ। “আর বসন্ত আমাদের ড্রাইভার।”

মৈত্রীকে এক ঝলক দেখে নিয়ে খান আবার চোখ ফেরালেন অমিতেশের দিকে, আর তারপর সেই বিছানাটার দিকে।

বিছানার অনেকটা জুড়ে রক্তের দাগ। অজিতেশবাবুর গলার কাছটায় একটা গভীর চির; রক্ত জমাট বেঁধে কালচে হয়ে আছে। বামহাতটা বুকের কাছে ভাঁজ করা আর ডানহাতটা এলিয়ে আছে বিছানার ওপাশে। আর তার ঠিক পাশটায় একটা রক্ত-লাগা ছুরি।

“বাবা যে হঠাৎ কেন এমন করতে গেলেন, কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার।” গলাটা যেন ধরে এল অমিতেশের।

স্যাম্পল নেওয়ার কাজ তখন প্রায় শেষ, বডির পজিশনও মার্ক করে দেওয়া হয়েছে। ঘরের বাইরে থেকে ভেসে আসছে সাব-ইনসপেক্টর অরিন্দম দত্তের গলা, বোধহয় বাড়ির কারও বয়ান নিচ্ছেন।

“হ্যাঁ, আ...” কিছু একটা বলতে গিয়েও হঠাৎ যেন থমকে গেলেন খান। ভুল দেখছেন না তো? না, মোটেই না। খান বেশ খানিকটা ঝুঁকে পড়লেন অজিতেশবাবুর গলার কাছটায়। মাথার ভেতরটা যেন কেমন চিড়িক করে উঠল। সরু হয়ে উঠল তাঁর ধারালো চোখদুটো। যেন এটাই খুঁজছিলেন তিনি। নিজের অজান্তেই তাঁর ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দিয়ে উঠল একটা শিকারী হাসি। যদিও সেটা অমিতেশের চোখে পড়ল না।

“হ্যাঁ, বলুন কী যেন বলছিলেন।” অমিতেশের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন খান।

“মানে, বাবা হঠাৎ এমনভাবে আত্মহত্যা করতে গেলেন কেন সেটাই আমাদের মাথায় ঢুকছে না।”

“হুম। ঠিকই বলেছেন। অজিতেশ ব্যানার্জির মতো অসাধারণ সাহসী অফিসার এভাবে নিজের গলায় কেন ছুরি দিতে যাবেন সেটা আমারও মাথায় ঢুকছে না!” খানের গলায় যে একটা হালকা ব্যঙ্গের সুর ছিল, বুঝতে মোটেই অসুবিধে হল না অমিতেশের। “আচ্ছা অমিতেশবাবু, পুরো ঘটনাটা একটু খুলে বলুন তো।”

অমিতেশ একবার ছোট্ট করে ঢোক গিলে নিয়ে শুরু করলেন, “আসলে বাবা রোজ ভোরেই হাঁটতে বেরোতেন। এই ধরুন মোটামুটি ছ’টা নাগাদ। কিন্তু আজ সাতটা বাজার পরেও যখন দেখলাম বাবার ঘরের দরজা বন্ধ তখন একটু চিন্তা হল। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো শরীর খারাপ, ঘুমোচ্ছেন। তাই ডাকিনি। কিন্তু যখন আটটা বেজে গেল তখন মৈত্রী ব্রেকফাস্টের জন্যে ডাকতে এল।

“কিন্তু অনেক ডাকাডাকির পরও বাবার কোনও সাড়াশব্দ নেই। আমিও ততক্ষণে মৈত্রীর গলা পেয়ে এসে পড়েছিলাম। বেশ জোরে জোরে আরও কয়েকবার ডাকলাম, দরজাও ধাক্কালাম, কিন্তু বাবা খুললেন না।

“আমাদের ডাকাডাকি শুনে বসন্তও বোধহয় এসে পড়েছিল ততক্ষণে। বাবার হার্টের প্রবলেম ছিল, তাই আমি আর বসন্ত দেরি না করে তখনই পাশের বাড়ির আরও দু’জনকে ডেকে এনে দরজা ভেঙে ফেলি। কিন্তু তখন কি জানতাম যে ভেতরে... বাবা এভাবে...”। শেষের কথাগুলো বলতে বলতে গলাটা কেঁপে উঠল অমিতেশের।

“দরজা যে ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, আপনি শিওর?” অমিতেশের দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে আরেকবার দরজার দিকে তাকালেন ইনসপেক্টর খান। দরজার ভেতরদিকে ঠিক মাঝখান বরাবর আড়াআড়িভাবে একটাই খিল, বেশ বড় সাইজের। যদিও আপাতত ভাঙা। খিলের হাতলটা ছিটকিনির মতোই, মানে ভেতর থেকে তালা দেওয়ার কোনও সুবিধে নেই। তবে ভেতর থেকে টেনে দিলে বাইরে থেকে খোলারও কোনও উপায় নেই।

“হ্যাঁ। বাবা দরজা-জানালা সব ভেতর থেকে বন্ধ করেই শুতেন। এসি চলত সারারাত।”

খানের মাথার ভেতর শিরাগুলো কেমন যেন দপদপ করে উঠল। লোহার গ্রিল লাগানো জানালাগুলো যে এখনও একইভাবে ছিটকিনি-আঁটা, সেটা ঘরে ঢুকেই চোখে পড়েছিল তাঁর। তাহলে কি...

“স্যার, মর্গের গাড়ি এসে পড়েছে। বডি পাঠিয়ে দেব?” সাব-ইনসপেক্টর দত্তের কথায় হঠাৎ যেন চমক ভাঙল খানের।

“হ্যাঁ, পাঠিয়ে দাও।”

“স্যার, বাবাকে, মানে মর্গ থেকে কখন...” একটু নিচু গলায়ই জিগ্যেস করলেন অমিতেশ।

খান বললেন, “সন্ধে নাগাদ পেয়ে যাবেন হয়তো। আপনি বরং দত্তের কাছ থেকে একটু মর্গ ইনচার্জের মোবাইল নম্বরটা নিয়ে রাখুন।”

মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন অমিতেশ। এখন ঘরের ভেতর শুধু ইনসপেক্টর খান আর অজিতেশ ব্যানার্জির মৃতদেহ। বাইরে মর্গের লোকেদের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে, সঙ্গে দত্তের গলা। রামতনু দরজার বাইরে পুলিশের হলদে টেপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে—বডি নিয়ে গেলেই সিল করে দেওয়া হবে পুরো ঘরটা।

কিন্তু এই সবকিছুর বাইরে একগাদা প্রশ্ন যেন ঝোড়ো হাওয়ার মতো বারবার থেমে থেমে আছড়ে পড়ছে খানের মাথার ভেতর। তাঁর সরু চোখ দুটো শিকারী বাঘের মতো কিছু যেন খুঁজছে এদিক-ওদিক। কিছু একটা, কোনও একটা সূত্র—এমন কিছু যা হয়তো চোখে পড়ছে না কারও!

আর তখনই হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল অজিতেশবাবুর স্টাডি টেবিলের নিচটায়। কিছু যেন পড়ে আছে সেখানে। কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন খান। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন—দশ বারোটা আলপিন। কিন্তু পকেট থেকে ছোট একটা চিমটে বের করে একটা পিন তুলতে গিয়েই ধাক্কা খেলেন খান। সবগুলো পিন গায়ে গায়ে লেগে আছে! আরও ঝুঁকে পড়লেন পিনগুলোর কাছে—আর সঙ্গে সঙ্গে যেন মাথার ভেতর বিদ্যুৎ খেলে গেল! রক্ত, হ্যাঁ রক্তই। একটা পিনের মুখে খুব অল্প শুকনো রক্ত লেগে আছে।

খান যা ভাবছেন যদি তা-ই হয় তবে খুনি আর বেশি দূরে নেই!

পিনগুলো স্যাম্পল প্যাকে ভরে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন খান। “রামতনু...”

(২)

“সেদিন থেকে দেখছি, কী অত ভাবছেন স্যার? অজিতেশবাবুর সুইসাইড কেসটা নিয়ে?” খানের কেবিনে ঢুকতে ঢুকতেই প্রশ্নটা করলেন সাব-ইনসপেক্টর দত্ত।

ঘড়িতে এখন সন্ধে সাড়ে সাতটা। একটু আগেই ফরেনসিক রিপোর্টগুলো এসেছে। সেগুলোই নেড়েচেড়ে দেখছিলেন খান। তাঁর চওড়া কপাল জুড়ে চিন্তার রেখাগুলো বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল।

“সুইসাইড? বলছ?” দত্তের কথায় খানের ঠোঁটে বাঁকা হাসির একটা রেখা যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল।

দত্ত ততক্ষণে সামনের চেয়ারটা টেনে বসে পড়েছেন। “তাহলে? বন্ধ ঘরের ভেতর অন্য কেউ কীভাবে ঢুকবে? এছাড়া স্যার, ছুরির হাতলে তো অজিতেশবাবুর আঙুলের ছাপও পাওয়া গেছে।”

খানের হাসিটা যেন আরেকটু বাঁকা হয়ে উঠল। “গলার চিরটা ভালো করে দেখেছিলে ভায়া?”

“হ্যাঁ, মানে দেখেছিলাম তো। কেন স্যার?”

“দাঁড়াও, বলছি।” টেবিলের দেরাজ ঘেঁটে একটা ছোট প্লাস্টিকের স্কেল বার করলেন ইনসপেক্টর খান। “নাও, ধরো। মনে করো এটা ছুরি, এবার চালাও দেখি গলায়।”

খানের কথামতো দত্ত স্কেলটা ডানহাতে নিয়ে নিজের গলায় বসিয়ে টান দিলেন, ঠিক যেভাবে কেউ গলায় ছুরি দেবার সময় করে।

“কী, কিছু বুঝলে?”

ঘাড় নাড়লেন দত্ত। “না স্যার।”

“বলছি। তুমি ডানহাতে ছুরি, মানে স্কেলটা ধরে গলায় চালালে, যেভাবে অজিতেশবাবু চালিয়েছিলেন। ঠিক?”

“একদম ঠিক।”

“গলার ওপর কোনদিক থেকে কোনদিকে টানটা দিয়েছিলে? আর কোনদিকে প্রেশার বেশি পড়েছিল?”

গলায় আরেকবার স্কেলটা ঠেকিয়ে একটু ভেবে নিয়ে দত্ত বললেন, “বাম থেকে ডানে টান দিলাম। আর স্বাভাবিকভাবেই প্রেশারটাও বামদিকেই বেশি পড়ল।”

“দারুণ! তাহলে গলার চিরটাও বামদিকেই বেশি গভীর হবে? আর যত ডানদিকে যাবে তত হালকা হয়ে আসবে?”

“হ্যাঁ। সেটাই তো হবার কথা।”

“বাহ্! বেশ!” খাম খুলে একটা ছবি দত্তের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে খান বললেন, “তাহলে এবার অজিতেশবাবুর গলার ছবিগুলো দেখো তো।”

একটা ছবি হাতে নিয়ে দেখতে দেখতেই হঠাৎ যেন চোখদুটো গোলগোল হয়ে উঠল সাব-ইনসপেক্টর দত্তের। “স্যার, এখানে তো...তার মানে...”

“হ্যাঁ দত্ত। তার মানে এটা মোটেই আত্মহত্যা নয়, খুন।” একটু থেমে খান আবার বললেন, “সেদিনই আমার চোখে পড়েছিল ব্যাপারটা। অজিতেশবাবুর গলার ডানদিকে চিরটা বেশি গভীর, আর সেটা বামদিকে যেতে যেতে ক্রমশ হালকা হয়ে এসেছে। অজিতেশবাবু যদি ডানহাতেই ছুরি ধরে থাকেন তাহলে সেটা কখনই সম্ভব নয়। এটা একমাত্র তখনই পসিবল যখন সামনে থেকে কোনও দ্বিতীয় ব্যক্তি গলায় ছুরি বসায়।”

“মাই গড! আর তারপর ছুরিটা অজিতেশবাবুর হাতে একবার চেপে বসিয়ে দেওয়া হয় যাতে আঙুলের ছাপ পড়ে যায়। কিন্তু স্যার...”

দত্তকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে খান বললেন, “এটাই জিগ্যেস করবে তো যে দরজা-জানালা সব যদি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল তাহলে খুনি বেরোল কীভাবে? আর যদি দরজা দিয়েই বেরোয় তাহলে সেটা আবার ভেতর থেকে বন্ধ করল কে?”

“এগজেক্টলি স্যার। এটা তো তাহলে ‘লকড রুম পাজল’-কেস হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”

“হুম। লকড রুম পাজলই বটে! কিন্তু সেটা আমার চিন্তার কারণ নয়—ওটা তো সেখানে দাঁড়িয়েই সলভ করে ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম খুনিও বুঝি হাতের মুঠোয়। কিন্তু এখন এই পোস্টমর্টেম রিপোর্টগুলো হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে সব হিসেব যেন ওলোট-পালট হয়ে গেল।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিঠটা চেয়ারে আরেকটু এলিয়ে দিলেন ইনসপেক্টর খান।

টেবিলের ওপর বেশ খানিকটা ঝুঁকে পড়ে দত্ত জিগ্যেস করলেন, “অ্যাঁ! বলেন কী! আপনি সেই লকড রুম মিস্ট্রি সলভ করে ফেলেছেন? খুনি কে স্যার? আর লকড রুম বানালই বা কীভাবে?”

একটু হাসলেন ইনসপেক্টর খান। “দাঁড়াও হে, দাঁড়াও। এই কেস অত সোজা নয়। যে ব্যাটা এত মাথা ঘামিয়ে লকড রুম ক্রিয়েট করে গলায় ছুরি বসিয়েছিল, সে আসলে মরা মানুষের গলা কেটে এসেছে!”

“মানে?” দত্ত যে বেশ ভালো রকমই চমকে গেছেন, তাঁর চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

“নাও, এই রিপোর্টটা দেখো।” স্টেপল করা কয়েকটা কাগজ দত্তের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে খান বললেন, “পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, অজিতেশবাবু মারা গেছেন হার্ট ফেইল্যুরে, রাত সাড়ে বারোটা থেকে একটার মধ্যে। আর গলায় ছুরি দিয়ে চির দেওয়া হয়েছে একটার পরে। মানে তখন অজিতেশবাবু অলরেডি মৃত।” একটু থেমে খান আবার বললেন, “কিন্তু হার্টফেলটাও আসল কেস নয়।”

দত্ত রিপোর্টায় বেশ ভালো করে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জিগ্যেস করলেন, “এখানে তো লেখা আছে যে অজিতেশবাবুর শরীরে অ্যাকোনাইট পাওয়া গেছে। তাহলে কি...”

“হ্যাঁ। তাঁর হাতের তালুতেও অ্যাকোনাইটের ট্রেস পাওয়া গেছে। এটা খুব সাংঘাতিক একধরণের বিষ, দুই থেকে তিন মিলিগ্রামেই কাজ হয়। এতে মুখে কোনও গ্যাঁজলা ওঠে না, কিন্তু পেটে যাবার দুই থেকে ছয় ঘন্টার মধ্যে মানুষ হার্ট ফেইল্যুরে মারা যায়।”

“সর্বনাশ!”

“হুম। আমার ধারণা ভুল না হলে খুনি অজিতেশবাবুর স্টাডি টেবিলে রাখা বইয়ের পাতায় ওই বিষ মাখিয়ে রেখেছিল। রামতনুকে একটু আগেই পাঠিয়েছি বইগুলো ফরেনসিকে দেবার জন্যে।” একটু সময় কী যেন ভেবে খান আবার বলতে লাগলেন, “খুনি অজিতেশবাবুর খুব কাছেরই কেউ। বাড়ির লোক। সে জানত যে অজিতেশবাবু প্রতিদিন সন্ধেবেলা কিছুক্ষণ বই পড়েন, আর সে এটাও জানত যে তাঁর আঙুলে থুতু লাগিয়ে পাতা ওল্টাবার বদভ্যাস আছে। আর তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই বিষটা লাগিয়েছিল বইয়ের পাতায়, যাতে সহজেই সেটা অজিতেশবাবুর মুখে পৌঁছে যায়।”

“কিন্তু স্যার, একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না, খুনি যদি বিষ দিয়েছিল তাহলে আবার ফিরে এসে পরে গলায় ছুরি বসাতে গেল কেন? ডেথ কনফার্ম করবার জন্যে?”

ঠোঁটে একটা ছোট্ট মুচকি হাসি টেনে উঠে দাঁড়ালেন ইনসপেক্টর খান। “না হে দত্ত, ভুল করছ। খুনি যে একজন সেটা তোমায় কে বলল?”

“মানে আপনি বলতে চাইছেন যে বিষ দিয়েছে সে ছুরি চালায়নি?”

“কেন চালাবে? একবার নিজেই ভেবে দেখো না, ছুরি না চালালে কেসটা কী দাঁড়াত। ন্যাচারাল ডেথ ডিউ টু কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। কারণ পেটে অ্যাকোনাইট আছে সেটা তো তখন ধরা পড়বে যখন পোস্টমর্টেম হবে। কিন্তু সাধারণ একটা হার্ট ফেইল্যুরের কেসে এসব কিছু হবার প্রশ্নই ওঠে না। ডাক্তার আসবে, খালি চোখে একটু বডি নেড়েচেড়ে হার্ট ফেইল্যুরে মৃত্যু বলে একখানা ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে চলে যাবে। ব্যস, ল্যাটা চুকে যেত! চারজনে মিলে কাঁধে তুলে ‘বলো হরি, হরিবোল’ হাঁকতে হাঁকতে শ্মশানে নিয়ে ফুঁকে দিত। না থাকত লাশ, না কোনও প্রমাণ, না কোনও সন্দেহের কারণ। আস্ত একটা জলজ্যান্ত মার্ডার কেস ন্যাচারাল ডেথ হিসেবেই হাওয়ায় উড়ে যেত। পুলিশও আসত না আর পোস্টমর্টেমও হতো না।

“কিন্তু গলায় ছুরি দেওয়ায় পুরো কেসটাই কেঁচে গেল। যেটা ন্যাচারাল ডেথ হবার কথা ছিল সেটা হয়ে গেল সুইসাইড... পুলিশ এল, পোস্টমর্টেমও হল আর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে অ্যানাকোন্ডা বেরিয়ে পড়ল।”

“আরিব্বাস!” মাথার পুলিশি টুপিটা খুলে বার দুয়েক মাথা চুলকে নিয়ে দত্ত বললেন, “মানে দুজন লোক একই দিনে অজিতেশবাবুকে খুন করার প্ল্যান করল, আলাদা আলাদাভাবে। কেউই কারও খবর জানত না! কিন্তু স্যার লকড রুমটা যে ছুরি-চালানো খুনিই বানিয়েছিল, সেটা কীভাবে বুঝলেন?”

“তোমার কী মনে হয়?” টেবিলের ভর দিয়ে দত্তের দিকে সামান্য ঝুঁকেই প্রশ্নটা করলেন খান।

“হুমমম, বুঝেছি। কারণ বিষ যে দিয়েছিল সে জানত অজিতেশবাবু ন্যাচারাল ডেথে মারা যাবেন, তাই লকড রুম তৈরির কোনও প্রয়োজনই তার ছিল না। কিন্তু যে ছুরি দিয়ে গলা কাটতে গিয়েছিল, সে চাইছিল ঘটনাটা সুইসাইড বলে প্রমাণিত হোক। আর তাই সে লকড রুম ক্রিয়েট করল।”

“একদম ঠিক বলেছ। আর মজার ব্যাপার কী জানো, ছুরিটা কে চালিয়েছে সেটা আমি জানি।”

“জানেন! কে? বাড়ির কেউ?” আপনা থেকেই যেন পিঠটা টানটান হয়ে গেল সাব-ইনসপেক্টর দত্তের। “চলুন, আজই অ্যারেস্ট করি ব্যাটাকে।”

“হ্যাঁ, বাড়ির লোকই।” পিঠটা সোজা করে বসলেন খান। “না, তবে এখনই ধরব না। আরেকটু খেলিয়ে নিই! ওর ওপর নজর রাখার জন্যে লোক লাগিয়ে রেখেছি, পরে সময় মতো দেখে নেব। কিন্তু আগে আসল খুনিকে ধরি, যে বিষ দিয়েছিল। ওটাকে পেলেই একসঙ্গে সব রহস্য খোলসা করে দেব। লকড রুম পাজলটাও।”

কিছুক্ষণ কী যেন ভেবে দত্ত বললেন, “সে তো স্যার বিষের খোঁজ করলেই বিষধরকেও পাওয়া যাবে।”

“হুম। ঠিকই বলেছ। এই দায়িত্বটা তাহলে তোমাকেই দিলাম।”

মুখে একচিলতে হাসি টেনে উঠে দাঁড়ালেন সাব-ইনসপেক্টর দত্ত। “জো হুকুম স্যার। আমি এক্ষণই লেগে পড়ছি।”

(৩)

দিন তিনেক পর সকালবেলা হঠাৎ বেশ হন্তদন্ত হয়েই খানের কেবিনে এসে ঢুকলেন দত্ত। হাতে একটা পাতলা ফাইল।

“কী খবর দত্ত? মুখের জেল্লা দেখে মনে হচ্ছে কিছু জব্বর জিনিস পেয়েছ!”

“ঠিকই ধরেছেন স্যার।” একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে দত্ত বললেন, “আপনার ধারণা একদম ঠিক ছিল। বিষের পেছনে বাড়ির লোকই আছে।”

“তা গুণধরটি কে?”

“খুলেই বলছি স্যার।” হাতের ফাইলটা টেবিলে রেখে দত্ত আবার বলতে লাগলেন, “অ্যাকোনাইটের মেইন সোর্স হল মঙ্কসহুড নামে একধরণের বেগুনি-ফুল-ফোটা গাছ। মূলত পাহাড়ি অঞ্চলেই হয়। গ্রামে-গঞ্জে আদিবাসীরা এককালে শিকারের কাজে এই বিষ ব্যবহার করত, এখনও করে হয়তো। কিন্তু সরাসরি গাছের শেকড়-বাকড় থেকে গ্রাম্য পদ্ধতিতে এই বিষ তৈরি করলে তাতে কিছু ইমপিউরিটি থেকে যায়। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে অজিতেশবাবুর পেটে যেই বিষ পাওয়া গেছে তা একদম পিওর, মানে কেমিক্যালি রিফাইনড।”

“ভেরি গুড! তার মানে যে বিষ দিয়েছে সে কোনও ল্যাব বা দোকান থেকেই এটা কিনেছে।”

“এগজেক্টলি স্যার। যদিও এই অ্যাকোনাইট কিছু কিছু হোমিওপ্যাথিক ওষুধে অল্প পরিমাণে ব্যবহার হয়, কিন্তু তাতে অন্যান্য কমপাউন্ড যেমন ইথানল, এসব মেশানো থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটাও ছিল না। বিষটা একদম পিওর ফর্মে ইউজ করা হয়েছে।”

“তাহলে সেটা পাওয়াও নিশ্চয়ই যথেষ্ট কঠিন হবে?”

“হ্যাঁ স্যার। আমাদের রাজ্যে এটা শুধুমাত্র স্টেট মেডিক্যাল কলেজের পয়জন কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট থেকেই পাওয়া সম্ভব।”

চোখদুটো সরু হয়ে উঠল খানের। “কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই এমনি এমনি যাকে-তাকে দিয়ে দেবে না?”

“রাইট স্যার। শুধুমাত্র কোনও সরকারি ডাক্তার যদি নিজের লেটারহেডে লিখিতভাবে ঠিক-ঠাক কারণ দেখিয়ে অ্যাপ্লাই করেন তাহলেই দেওয়া হয়।” শেষের কথাগুলো বলতে বলতেই ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে ইনসপেক্টর খানের দিকে এগিয়ে দিলেন দত্ত। “এই যে স্যার, এটাই সেই অ্যাপ্লিকেশন।”

“ডাঃ মৈত্রী ব্যানার্জি!” পুরো কাগজটায় আগাগোড়া একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন খান। “আচ্ছা দত্ত, এই মৈত্রীদেবী কি নিজেই গেছিলেন এই অ্যাপ্লিকেশন দিতে আর বিষ আনতে?”

“না স্যার। সুজিত সরকার নামে তাঁর একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট নাকি গেছিলেন, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে। ১২-ই জানুয়ারি।”

খান কথাগুলো ঠিক শুনতে পেলেন কি-না বোঝা গেল না। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইলেন দরজার দিকে, কপালের ভাঁজগুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠল।

“কিছু ভাবছেন স্যার?” বেশ একটু নিচু গলায়ই বললেন দত্ত। “বললে মৈত্রী ব্যানার্জির নামে একটা ওয়ারেন্ট বের করে ফেলি?”

“হু... ম... না, এখনই নয়।”

“কিন্তু স্যার...”

“হিসেবটা মিলছে না দত্ত। একবার ভেবে দেখো তো যেই খুনি এত বুদ্ধি খাটিয়ে প্ল্যান করে একটা মার্ডারকে প্রায় ন্যাচারাল ডেথ বানিয়েই ফেলেছিল, সে কি এত বোকা হতে পারে যে নিজের নামের লেটারহেড দিয়ে লোক পাঠিয়ে বিষ আনাবে? তাও আবার মেডিক্যাল কলেজ থেকে! যেখানে কে বিষ নিয়েছে সেটা ডিটেক্ট করা অনেক অনেক সোজা। সেই তুলনায় খুনি যদি কোনও গ্রামটাম থেকে এই বিষ জোগাড় করে আনত তাহলে বাপের জন্মেও আমরা খুঁজে বের করতে পারতাম না।” একটু থামলেন খান। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে আবার বললেন, “ভায়া হে, আমার সিক্সথ সেন্স বলছে মৈত্রী ব্যানার্জিকে কেউ ইচ্ছে করে ফাঁসাতে চাইছে, তাই এমন সুন্দরভাবে প্রমাণগুলো ছড়িয়ে রেখেছে।”

“হুম, কথাটা ভুল বলেননি স্যার।”

“আচ্ছা, মেডিক্যাল কলেজের ওই পয়জন সেকশনে সিসিটিভি আছে নিশ্চয়ই? সেই সুজিত সরকার নামক বস্তুটির চেহারা দেখা যাচ্ছে কি?”

“না স্যার, আমি ফুটেজ চেক করেছি। লোকটি এমনভাবে হুডি পরেছিল যে মুখ দেখা যাচ্ছে না।” একটু সময় চুপ করে থেকে দত্ত আবার বললেন, “কিন্তু স্যার লোকটার ডিটেইলস আছে। পয়জন সেকশনের রেজিস্টারে তার নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর আর আধার কার্ডের ফটোকপিও আছে।”

“খোঁজ নিয়ে দেখেছ? ভুঁয়ো নিশ্চয়ই?”

“না স্যার, সেটাই তো আশ্চর্যের। আমি লোক লাগিয়ে খোঁজ নিয়েছি, সেই ঠিকানায় সত্যিই সুজিত সরকার বলে একজন আছে। এমনকি আধার কার্ডটাও আসল!”

চোখদুটো হঠাৎ যেন চকচক করে উঠল খানের। “বলো কী হে! এত বছরের পুলিশ জীবনে এই প্রথম শুনলাম কোনও ঠিকানা ভুল নয়!”

“কিন্তু স্যার, লোকটা মোটেই মৈত্রী ব্যানার্জির কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়, বরং একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে।”

“হুম! চলো তবে এই সুজিত ভায়ার সঙ্গে একটু মোলাকাতটা সেরেই আসা যাক, নইলে কেসটা যে বড্ড ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে।”

(৪)

“সুজিত সরকার, ১৭/২, রামনগর-৩ (প্রিয়া ভ্যারাইটিজের উল্টোদিকে)”—জিপ থেকে নামতে নামতে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই একবার ঠিকানাটা আউড়ে নিলেন ইনসপেক্টর খান। নীলচে মত একটা সাধারণ একতলা বাড়ি, বাইরে জংধরা ছোট লোহার গেট। রোদে-বানে অনেকদিন আগেই রং চটে গেছে।

ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে একবার দু’পাশটা দেখে নিলেন খান। ডানদিকে ছোট্ট এক টুকরো জায়গা, কয়েকটা গাঁদাফুলের গাছ—এক দুটো ফুলও ফুটে আছে। একপাশে একটা তুলসীর বেদি আর তার উল্টোদিকে, মানে বামদিকে ঘরের দরজা।

কলিং বেল টিপতেই মিনিট দুয়েকের মধ্যে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে বেশ একটা অপ্রস্তুত ভাব—হঠাৎ ঘরের দুয়ারে পুলিশ এসে দাঁড়ালে যেটা হয় আরকী!

“বলুন।”

“আপনি সুজিত সরকার?” একটু গম্ভীরভাবেই জিগ্যেস করলেন খান।

“হ্যাঁ। কেন স্যার? কিছু হয়েছে?”

“সে তো অনেক কিছুই হয়েছে। আপাতত আপনার সঙ্গে একটু কথা বলার ছিল।”

“আসুন।” ছোট্ট একটা ঢোক গিলেই বললেন ভদ্রলোক।

বসার ঘরটাও বাড়িটার মতোই সাধারণ। একটা নেঁতিয়ে-পড়া সোফাসেট আর মধ্যিখানে একটা চামড়া-ওঠা টেবিল।

হাতের রুল আর মাথার টুপিটা খুলে টেবিলে রাখতে রাখতে খান জিগ্যেস করলেন, “আচ্ছা আপনি ডাঃ মৈত্রী ব্যানার্জি নামে কাউকে চেনেন?”

“না স্যার।” মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক।

“দেখুন কোনও ধরণের মিথ্যে কথা কিন্তু বলবেন না, কারণ এটা খুনের কেস। মিথ্যে বললে নিজেই ফেঁসে যাবেন। তাই একটু ভেবেচিন্তেই বলবেন।”

“সত্যি বলছি স্যার, ওই নামে কাউকে চিনি না।” মুখটা আস্তে আস্তে শুকিয়ে আসছে ভদ্রলোকের।

“তাহলে মৈত্রী ব্যানার্জির লেটারহেড নিয়ে গত ১২-জানুয়ারি স্টেট মেডিক্যাল কলেজে কেন গেছিলেন? যাইনি বলবেন না যেন, আমরা সেখানে আপনার সাইন করা আধার কার্ডের ফটোকপি পেয়েছি!”

“আমি সত্যি বলছি স্যার, মা কালীর দিব্যি! আমি ১২-ই জানুয়ারি মেডিক্যাল কলেজে যাইনি। আমি তো সেদিন সারাদিন রামকৃষ্ণ মিশনে ছিলাম। স্বামীজীর জন্মদিনের উৎসবে। চাইলে আপনি সেখানকার মহারাজকে জিগ্যেস করে দেখতে পারেন।”

একমুহূর্তের জন্যে একটা ছোট্ট মুখ চাওয়াচাওয়ি হয়ে গেল খান আর দত্তের মধ্যে। এবার দত্ত বেশ একটু কড়া গলায় জিগ্যেস করলেন, “তাহলে আপনার সাইন করা আধার কার্ডের কপি সেখানে গেল কীভাবে? দেখুন তো” পকেট থেকে একটা কাগজ বের করতে করতে, “এটা আপনার সাইন নয়?”

কাগজটার দিকে দেখতে দেখতে মুখটা যেন আরও শুকিয়ে গেল ভদ্রলোকের। “হ্যাঁ...মানে... সাইনটা তো আমারই। কিন্তু আমি...”

“কী কিন্তু! দেখুন সত্যি কথা বের করার কিন্তু অনেক রাস্তা আছে পুলিশের হাতে।” শেষ কথাগুলো বেশ একটু জোরেই বললেন দত্ত।

“একটু দাঁড়াও দত্ত।” পকেট থেকে তিনটে পাসপোর্ট সাইজ ছবি করে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিলেন ইনসপেক্টর খান। “দেখুন তো এদের কাউকে চেনেন কি-না?”

মুহূর্তে চোখদুটো গোলগোল হয়ে উঠল তাঁর। উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করে উঠলেন ভদ্রলোক, “চিনি স্যার... এই... এই একেই তো...”

খানের ঠোঁটের কোণ ছুঁয়ে ঝিলিক দিয়ে ওঠা বাঁকা হাসিটা চোখ এড়াল না দত্তের। এই হাসির একটাই মানে—‘কেস সলভড!’

(৫)

টিং-টং!

“আসছি।” সাত সকালে দরজা খুলতেই হঠাৎ ইনসপেক্টর খান আর সাব-ইনসপেক্টর দত্তকে দেখে বেশ ভালোই চমকে গেলেন মৈত্রী। “আপনারা!... আসুন।”

“হ্যাঁ। একটু বাড়ির সবাইকে ডাকবেন কাইন্ডলি?”

মৈত্রী ওদের বসতে বলে ঘরের ভেতর চলে গেলেন অমিতেশকে ডাকতে। একটু পরেই অমিতেশ বেরিয়ে এলেন আর বাইরের দিকের একটা ঘর থেকে বসন্তও এসে ঢুকল।

“আসুন, বসুন সবাই।”

“কিছু জরুরি দরকার ছিল কি?” সোফায় বসতে বসতে জিগ্যেস করলেন অমিতেশ।

“না। আজ আর কোনও দরকার নেই। আজ শুধু একটু গল্প শোনাতে এলাম।” খানের মুখে একটা হালকা হাসি।

“কিন্তু আমাকে যে বেরোতে হবে স্যার। আমার হাসপাতালের সময় হয়ে যাচ্ছে।” কথাটা বলতে বলতে প্রায় উঠেই পড়েছিলেন মৈত্রী, খান থামিয়ে দিয়ে বললেন, “সরি মেডাম, আজ যে একটু লেট্ হবে আপনার। কিছু করার নেই।”

“মানে?” ভুরু দুটো কুঁচকে উঠল মৈত্রীর। “শুধু শুধু একটা সুইসাইড কেস নিয়ে আর কত জলঘোলা করবেন আপনারা? বাবা যেদিন মারা গেলেন সেদিন একবার আমাদের সবার আঙুলের ছাপ নিলেন, ব্লাড স্যাম্পল নিলেন, তারপর আবার একদিন এক হাবিলদারকে পাঠিয়ে বাবার ঘর থেকে সব বইপত্র তুলে নিয়ে গেলেন! আজ আবার বলছেন আমি হাসপাতালে যেতে পারব না! ডিসগাস্টিং!”

একটু সোজা হয়ে বসলেন খান। টিকালো নাকের ওপর বার দুয়েক আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, “সুইসাইড যে সেটা এত শিওর হলেন কীভাবে? অজিতেশবাবুর খুন হয়েছিল মেডাম।”

“খুন!” গলাটা হঠাৎ যেন কেমন নেঁতিয়ে গেল মৈত্রীর।

“আজ্ঞে, খুন। তাই দয়া করে একটু কোঅপারেট করুন—কথা দিচ্ছি আজকের পর আর জ্বালাতে আসব না।”

ডাঃ মৈত্রীর মুখ দিয়ে আর কোনও কথা সরল না। অমিতেশ টেবিলের ওপর বেশ খানিকটা ঝুঁকে উত্তেজিত গলায় বলে উঠলেন, “খুন! কিন্তু কীভাবে? কে করল?”

“সেই গল্পই তো বলতে এলাম স্যার!” ডানহাতটা সোফার হাতলে ছড়িয়ে দিয়ে বেশ একটু পিঠ এলিয়ে বসলেন ইনসপেক্টর খান। “তাহলে গল্প শুরু করা যাক? কী বলো দত্ত?”

“আলবৎ স্যার। আমি তো কবে থেকে মুখিয়ে আছি শোনাবার জন্যে।”

“বেশ! প্রথমেই বলে রাখি এই কেসে একটা দারুণ লকড রুম সিচুয়েশন আছে, যার জন্যে এটাকে সহসা খুন বলে ভাবাই যায় না। দরজা-জানালা সব ভেতর থেকে বন্ধ, বিছানায় গলা-কাটা অবস্থায় পড়ে আছেন অজিতেশবাবু। ডানহাতের পাশে রক্তাক্ত ছুরি। প্রথম দেখায় যে কেউ আত্মহত্যাই ভাববে। আমারও তাই মনে হয়েছিল, যদিও অজিতেশ ব্যানার্জিকে যদ্দূর চিনতাম তাতে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন। তাই একবার নিজে বডিটা খুঁটিয়ে দেখতে গেলাম, অমিতেশবাবুও তো সঙ্গে ছিলেন তখন।”

অমিতেশ ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।

“আর তখনই হঠাৎ জিনিসটা চোখে পড়ে। গলার চিরটা ডানদিকে বেশি গভীর আর বামে ক্রমশ হালকা হয়ে গেছে। কিন্তু যেকোনও মানুষ ডানহাতে ছুরি ধরে গলায় চির দিতে গেলে হবার কথা উল্টো। মানে বামে বেশি গভীর আর ডানদিকে ক্রমশ হালকা। ব্যস, মাথার ভেতর পুলিশি পোকাগুলো একেবারে চাগাড় দিয়ে উঠল। বুঝতে পারছিলাম, খুনি খুব বুদ্ধি করে একেবারে গোয়েন্দা উপন্যাসের কায়দায় একটা লকড রুম ক্রিয়েট করেছে, যেটা ভাঙতে না পারলে কিছুতেই এগোনো যাবে না।

“সারাটা ঘরের আনাচে-কানাচে চোখ বুলাতে লাগলাম, যদি কিছু একটা ক্ল্যু, কিছু একটা লুপ-হোল চোখে পড়ে যায়! আর তখনই হঠাৎ চোখ গেল অজিতেশবাবুর স্টাডি টেবিলের নিচটায়। দশ-বারোটা আলপিন পড়ে আছে। কিন্তু তুলতে গিয়ে দেখি সেগুলো গায়ে গায়ে লেগে রয়েছে, ঠিক যেমনভাবে চুম্বকের গায়ে লোহা লেগে থাকে। আর যায় কোথা! সঙ্গে সঙ্গে আমার টনক নড়ল, একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল রাত্তিরবেলা কী ঘটেছে এই ঘরে।” দম নেওয়ার জন্যেই যেন একটু থামলেন খান। দত্ত প্রায় শ্বাস আটকে তাকিয়ে আছেন খানের দিকে, লকড রুমের পুরো ব্যাপারটা শোনার জন্যে।

খান আবার শুরু করলেন, “চুম্বক। খুব পাওয়ারফুল একটা চুম্বক ব্যবহার করা হয়েছে। সেটা জোগাড় করা খুব কঠিন কিছু নয়, গাড়ির পার্টসে বা কলকারখানায় একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়। অজিতেশবাবুর দরজার খিলটা ছিল আড়াআড়িভাবে লাগানো, কিন্তু আলগোছেই খোলা যেত। মানে জংধরা গোছের টাইট নয়। এবার খুনি করল কী হাতে সুন্দরভাবে রবারের দস্তানা পরে নিয়ে চুম্বক হাতে এসে দাঁড়াল দরজার বাইরে। বাইরে থেকে আড়াআড়িভাবে খিল বরাবর চুম্বকটা লাগিয়ে টান দিল—ব্যস, খুলে গেল দরজা! এবার বাকি কাজ তো সোজা, ঘুমন্ত অজিতেশবাবুর গলায় ছুরি ধরে গলা কাটতে আর কতক্ষণ! কিন্তু গোলমালটা হল তারপরেই। খুনি ঘরে ঢুকে গলা কাটবার সময় চুম্বকটা অজিতেশবাবুর স্টাডি টেবিলে রাখল, কিন্তু সে জানত না যে সেখানে একপাশে কিছু আলপিনও রাখা আছে। ব্যস, আলপিনগুলো এসে লেগে গেল চুম্বকের গায়ে।

“কিন্তু অন্ধকারে সেটা খুনি দেখতে পেল না। বেরোবার সময় যখন চুম্বকটা তুলতে গেল, একটা আলপিন ফুটে গেল হাতে আর সঙ্গে সঙ্গে রিফ্ল্যাক্স অ্যাকশন হিসেবে চুম্বক হাত থেকে সোজা মাটিতে, আর আলপিনগুলো ছিটকে টেবিলের তলায়। কিন্তু স্কুলে সবাই পড়েছি যে লোহা খুব শক্তিশালী চুম্বকের কাছে এলে নিজেও চুম্বক হয়ে ওঠে, ম্যাগনেটাইজড হয়ে যায়। আর সেটাই হয়েছিল আলপিনগুলোর ক্ষেত্রেও। খুনির কপাল খারাপ যে সেটা পড়বি তো পড় আমার চোখেই পড়ল।

“আমার হাইপোথিসিসটা যে মোটেই ভুল ছিল না সেই প্রমাণও সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছিলাম। একটু খুঁটিয়ে দেখতেই একটা আলপিনের মুখে একটু শুকনো রক্ত চোখে পড়ে যায়। আর কী, হয়ে গেল কেল্লা ফতেহ! রামতনুকে ডেকে তখনই আপনাদের ব্লাড স্যাম্পল নিতে বললাম—যার সঙ্গে ম্যাচ করবে সে-ই খুনি।”

কথাগুলো শুনতে শুনতে যে একজনের মুখটা ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে, সেটা বেশ ভালোভাবেই লক্ষ করছিলেন খান।

“কিন্তু স্যার, খুনি কে?” অমিতেশ জিগ্যেস করলেন।

জবাবটা দিতেই যাচ্ছিলেন খান, কিন্তু তার আগেই হঠাৎ দরজার দিকে দৌড়ে পালতে গেল বসন্ত—পারল না! রামতনু সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ঝাপটে পড়ে ধরে ফেলল তাকে।

“নিন অমিতেশবাবু, আপনার জবাব খুনি নিজেই দিয়ে দিল।”

“বসন্ত!” অবাক চোখে একজন আরেকজনের দিকে তাকালেন অমিতেশ আর মৈত্রী। “কিন্তু কেন? তুমি হঠাৎ বাবাকে খুন করতে গেলে কেন?” প্রশ্নটা মৈত্রীই করলেন।

বসন্ত তখন প্রায় খাঁচায় আটকা পড়া কোনও জানোয়ারের মতো হাঁপাচ্ছে। চোখদুটো লাল। একটু সময় চুপ থেকে ফ্যাসফেসে গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “যা করেছি বেশ করেছি। একটা এগারো বছরের বাচ্চাকে যখন চোখের সামনে নিজের বাবার রক্তাক্ত লাশ দেখতে হয় তখন কেমন লাগে, বোঝেন আপনারা?”

হঠাৎ যেন পুরো ঘর জুড়ে এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ ছেয়ে গেল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে খানের দিকে তাকিয়ে থেকে বসন্ত আবার বলতে লাগল, “আমার তখন মাত্র এগারো। আপনজন বলতে কেবল বাবা—মা মারা গেছিল জন্মের সময়ই। এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে, খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন—ঘরের দুয়ার অবধি জল জমে গেছিল। বাড়িতেই ছিল বাবা। হঠাৎ বেশ রাতের দিকে একটা ফোন আসে, একটা বিজনেস ডিল ছিল বাবার। খুব জরুরি একটা ডিল—সেই বৃষ্টিতেই রেনকোট গায়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।” একটা দীর্ঘশ্বাস যেন পাঁজর ঠেলে বেরোতে গিয়েও আটকে গেল বসন্তের বুকেই। “পরদিন সন্ধেবেলা বাবা ফিরল, সাদা চাদরে জড়ানো রক্তভেজা লাশ হয়ে। বুকে-পেটে মোট সাতটে গুলি লেগেছিল।”

খান বেশ একটু নিচু স্বরেই বললেন, “বসন্ত, এটা ভুলো না যে তোমার বাবা একজন কুখ্যাত ড্র্যাগ ডিলার ছিলেন। বেশ কিছু খুনের চার্জও ছিল তার ওপর। সেদিন রাতে তোমার বাবাকে অ্যারেস্ট করতেই গেছিলেন অজিতেশবাবু, কিন্তু অপরপক্ষ আচমকা গুলি চালাতে শুরু করলে...”

বসন্ত যেন কিছুই শুনতে পেল না। তখনও আচ্ছন্নের মতো বলে চলেছে, “খবরের কাগজে ছবি দেখেছিলাম ওই শয়তান অজিতেশ ব্যানার্জির। আমার বাবার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের প্রোমোশনের রাস্তা সাফ করেছিল হারামজাদাটা! সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, একে না মেরে মরব না। বদলা আমি নেবই!”

এবার উঠে দাঁড়ালেন খান। বেশ একটু শ্লেষের সুরেই বলে উঠলেন, “পারোনি হে, পারোনি! তুমি যখন গিয়ে অজিতেশবাবুর গলা কেটেছিলে, তার প্রায় আধঘন্টা আগেই তিনি মারা গেছেন।”

বসন্ত যেন ঘায়েল বাঘের মতো চোখে তাকাল খানের দিকে। দৃষ্টিতে একটা স্পষ্ট অবিশ্বাসমাখা চাউনি।

খান একবার ধারালো চোখে মেপে নিলেন সবাইকে, তারপর আবার বলতে শুরু করলেন। “এই কেসটা খুব মজার, বুঝলেন অমিতেশবাবু? একটা খুন, কিন্তু দু’জন খুনি! দু’জনেই আলাদা আলাদাভাবে একই দিনে অজিতেশবাবুকে খুন করবার প্ল্যান করল। অথচ কেউই অন্যজনের খবর জানত না!”

“দু’জন খুনি!” অমিতেশের চোখে বিস্ময়ের গাঢ় রেখা। “একজন তো বসন্ত, তাহলে আরেকজন কে?”

মুচকি হাসলেন খান। “বলছি বলছি, অত অধৈর্য হবেন না। বলতেই তো এসেছি। বসন্ত তো শুধু ডেডবডির গলায় ছুরি চালিয়েছে, মানে লজিক্যালি সে খুনিই নয়। যদিও ইনটেনশন অফ মার্ডারের জন্যে আই.পি.সি ৩০৭ মোতাবেক কিছুদিন জেল খাটতে হবে ওকেও। যাই হোক, এবার তবে আসল খুনির কথায় আসি।”

মৈত্রী যে বারবার ঢোক গিলছেন, সেটা চোখ এড়াল না খানের।

“অজিতেশবাবুর পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তাঁর পেটে অ্যাকোনাইট নামে একধরণের বিষ পাওয়া গেছে।” খান আড়চোখে একবার তাকালেন অমিতেশের দিকে। “এই অ্যাকোনাইট বিষটা খুব হেব্বি জিনিস, বুঝলেন! মাত্র দুই থেকে তিন মিলিগ্রাম, মুখে কোনও গ্যাঁজলা ওঠে না। প্রথম প্রথম একটু ডাইরিয়া মতন হয়, মাথা ঘোরে, গা ব্যথা করে আর তারপর দুই থেকে ছয় ঘন্টার মধ্যে মানুষ হার্ট ফেইল্যুরে মারা যায়। কী সুন্দর ব্যাপার না! একবার ভেবেই দেখুন, এই ব্যাটা আহাম্মক বসন্তটা যদি অজিতেশবাবুর গলায় ছুরি না দিত তবে পুরো খুনটাই একটা ন্যাচারাল ডেথ হয়ে যেত। আর আপনিও ধরা পড়তেন না!”

“মানে! কী আবোল-তাবোল বকছেন?” উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন অমিতেশ ব্যানার্জি।

“চেল্লাবেন না অমিতেশবাবু।” বেশ কড়া গলায় একটু টেনে টেনেই কথাগুলো বললেন ইনসপেক্টর খান। “প্ল্যানটা দারুণ ছিল, কিন্তু ওই যে কপাল! কপালদোষে সব মাটি হয়ে গেল। আপনি ভাবতেই পারেননি যে ব্যাপারটা এমন মোড় নিতে পারে। ভেবেছিলেন সকালে দরজা ভেঙে ঢুকবেন, দেখবেন অজিতেশবাবু হার্টফেল করে মারা গেছেন—ব্যস একটা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে খই ছিটোতে ছিটোতে শ্মশানে চলে যাবেন। কিন্তু সব এক্কেবারে কেঁচে গেল!”

দত্ত ততক্ষণে উঠে বেশ শক্ত করে চেপে ধরেছেন অমিতেশের হাতটা। থিরথির করে কাঁপতে কাঁপতে সোফায় বসে পড়লেন অমিতেশ। মৈত্রী যেন পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে।

খান আস্তে আস্তে গিয়ে সোফায় বসলেন। ঠিক অমিতেশের মুখোমুখি। “একটা কথা বলুন তো, নিজের স্ত্রীকে কেন ফাঁসাতে চাইছিলেন?”

মৈত্রীর লাল ছলছলে চোখদুটো একমুহূর্তে ফিরে গেল খানের দিকে। খান যেন তাঁর মনের প্রশ্নটা বুঝতে পেরে নিজে থেকেই বলতে লাগলেন, “মৈত্রীদেবী, আপনি যেহেতু একজন ডাক্তার তাই নিশ্চয়ই ভালোভাবেই জানেন যে কেমিক্যালি রিফাইনড অ্যাকোনাইট আমাদের রাজ্যে শুধু স্টেট মেডিক্যাল কলেজের পয়জন কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ইউনিটে পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা শুধু কোনও সরকারি ডাক্তারই পেতে পারেন, এবং তার জন্যে তাঁকে নিজের লেটারহেডে বা কোনও অথেন্টিক কাগজে লিখিত অ্যাপ্লিকেশন দিতে হয়। আপনার স্বামী, অমিতেশবাবু আপনার লেটারহেডে আপনার নামে ভুয়ো অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে মেডিক্যাল কলেজে যান সেই বিষ আনতে। পরিচয় দেন আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে। কিন্তু সেখানে একটা গোলমাল হয়ে যায়। রিসেপশনিস্ট অমিতেশবাবুর কাছে আই.ডি প্রুফ চেয়ে বসেন, যেটা মোটেই ওঁর প্ল্যানে ছিল না। কিন্তু তখনই অমিতেশবাবুর হঠাৎ মনে পড়ে যে পকেটে সুজিত সরকার বলে একজনের আধার কার্ডের সাইনড ফটোকপি পড়ে আছে—ব্যস, অমিতেশবাবু নিজের নাম সুজিত সরকার বলে সেই ফটোকপিটাই জমা দিয়ে আসেন। রিসেপশনিস্টও আর অত ছবিটবি খেয়াল না করেই কাগজটা জমা নিয়ে অমিতেশবাবুকে অ্যাকোনাইট দিয়ে দেন। তারপর আর কী, বিষটা এনে মাখিয়ে দিলেন অজিতেশবাবুর বইয়ের পাতায়, যাতে পাতা ওল্টাবার সময় আঙুল হয়ে সহজেই বিষ পেটে চলে যায়—খেল খতম!”

মৈত্রীর ভেজা চোখদুটো যেন আরও লাল হয়ে উঠল।

খান অমিতেশের দিকে ফিরে বললেন, “জানেন অমিতেশবাবু, অনেক সময় আউট অফ সিলেবাস প্রশ্ন এলে বাচ্চারা ভড়কে গিয়ে ভুলভাল উত্তর লিখে আসে, আপনিও ঠিক তেমনই আউট অফ প্ল্যান কিছু সিচুয়েশনের কারণে ধরা পড়ে গেলেন। প্রথমত বসন্তের ব্যাপারটা আপনার কাছে সম্পূর্ণ সারপ্রাইজ ছিল। আর দ্বিতীয়টা হল আধার কার্ডের ব্যাপারটা। রিসেপশনিস্টের সামনে হঠাৎ চাপ খেয়ে গিয়ে আপনি সুজিত সরকারের আধারকার্ডটা দিয়ে এলেন। আর সেটাই ফাঁসিয়ে দিল। সুজিত সরকার আপনার ছবি দেখামাত্রই চিনে ফেলেছিলেন। ভদ্রলোক সেদিন সকালেই আপনার অফিসে এসেছিলেন একটা ফ্ল্যাট বুক করবার জন্যে, আর তখন নিজের আই.ডি প্রুফের একটা কপি আপনাকে দিয়ে গেছিলেন। মেডিক্যাল কলেজে রিসেপশনিস্ট যখন প্রুফ চাইলেন, তাড়াহুড়োয় সেটাই বের করে ধরিয়ে দিলেন। কী, ভুল বলছি না তো?”

অমিতেশ তখনও একইভাবে মাথা নুইয়ে বসে আছেন। কোনও জবাব দিলেন না।

“আচ্ছা, নিজের স্ত্রীকে কেন ফাঁসাতে চাইছিলেন সেটা নাহয় না-ই বললেন—আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, আপনারা বুঝুন গে; কিন্তু অজিতেশবাবুকে কেন মারলেন সেটা যে বলতেই হবে। নইলে এই দত্তবাবুর কিন্তু আবার বেজায় মাথা গরম, কথায় কথায় রুল উঁচিয়ে পেটাতে শুরু করেন।” শেষের কথাগুলো বলতে বলতে একবার আড়চোখে দত্তের দিকে তাকিয়ে হাসলেন খান।

“প্রোমোটিং বিজনেসের জন্যে আমার অনেকগুলো টাকা দরকার ছিল স্যার।” অমিতেশের গলার কাঁপন এখনও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। “নতুন একটা অ্যাপার্টমেন্ট শুরু করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কিছুই টাকা ছিল না হাতে। বাবাকে বলেওছিলাম যে ফ্ল্যাট বুকিং শুরু হলে কিছুদিনের মধ্যেই ফিরিয়ে দেব। অনেকবার বুঝিয়েছিলাম, কিন্তু...”

“কিন্তু উনি দেননি আর তাই নিজের বাবার মুখেই বিষ ঢেলে দিলেন! ধন্যি সন্তান বটে!” পেছন ফিরে খান বললেন, “রামতনু, নিয়ে যাও এদের। ভ্যানে তোলো নিয়ে দুটোকেই।”

মৈত্রী তখনও পুতুলের মতো স্থির হয়ে বসে আছেন সোফায়। রামতনু বসন্ত আর অমিতেশকে নিয়ে দরজার দিকে এগোতে লাগল, সঙ্গে সাব-ইনসপেক্টর দত্তও।

“জানি না, আজ অজিতেশবাবু বেঁচে থাকলে তাঁর নিজের ছেলের ওপর ঘেন্নাটা বেশি হতো না আমাদের ওপর গর্বটা!” স্বগতোক্তির মতোই যেন দীর্ঘশ্বাস-মাখা কথাগুলো বেরিয়ে এল ইনসপেক্টর খানের গলা ঠেলে। শুধু দত্ত ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না।

( কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ডাঃ স্বাগতা দত্ত, পাঞ্চালী পালিত )

নিঝুম দ্বীপের রাজকুমার - রনিন

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী

(প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক ‘স্যর’ ম্যালকম রসের সহকারী কেন কোবার্নের লাইব্রেরি থেকে উদ্ধারকৃত একটি ডায়েরির কয়েকটি ছেঁড়া পাতা থেকে আহৃত আখ্যান—ম্যালকমকে পাঠানো ইংরেজি অনুবাদের আসল প্রতিরূপ।)

2nd April, 2088

(সময়ের হিসেব মেঘনাদ সেন এবং বৃতি সেনের তৈরী ‘সমান্তরাল সূর্যঘড়ি’ অনুসারে (হ্যাঁ, বাবা এবং মা, সত্যি ওটা নির্ভুল সময়ের হিসেবে দেয় এখনও!)

মন খারাপ।

হ্যাঁ, আজ আমার মন খারাপ।

মিথিলা - দেবলীনা পন্ডা

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী
এক

দিগন্তের শেষপ্রান্ত থেকে আলোকবর্ণালীর উজ্জ্বল ছটায় সমগ্র আকাশ ভরিয়ে দিতে দিতে এদিনের মতো বিদায় জানালেন তেজোদীপ্ত দিনমণি। লাল-কমলা-সোনালী বর্ণের অনুপম শোভায় নববধূর মতো সেজে উঠছে চরাচর, বিশ্রামকক্ষের উন্মুক্ত গবাক্ষে মুগ্ধ দুই চোখ মেলে সেদিকেই তাকিয়েছিলেন মহারাজ।

কমরেড - নীলাদ্রি মুখার্জি

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী

‘রজতদা, ওরা বজ্র গাড়ি এনেছে আর সাথে জলকামান আর বুলডোজার।’

সরোজিনী ইনস্টিটিউটের মাঠে তখন দিনের শেষ আলো এসে ছুঁয়েছে। কথাটা শুনে একবার ওর চারপাশে জড়ো হওয়া ভিড়ের ওপর চোখ বোলাল রজতাভ। সদ‍্য কুড়ি পার করা ছেলেমেয়েগুলোর চোখে ভয়মিশ্রিত অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট এবং তার যথার্থতা রয়েছে। গত তিনদিন ধরে রাষ্ট্রশক্তি ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে ওদের আন্দোলনকে ভন্ডুল করার। সংবাদমাধ্যমকে কলেজের চৌহদ্দি মারাতে দেয়নি,গোটা কলেজ ঘিরে রেখেছে শাসকদলের ক‍্যাডার বাহিনী আর উর্দিধারীরা। নেহাত কলেজের পঁচিশ ফুটের দেওয়ালটা টপকাতে পারছে না তাই বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি নাহলে এতক্ষণে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাকে বলে, দেখিয়ে দিত সরকার বাহাদুর। পারেনি মূলতঃ রজতাভর গেরিলা কৌশলের জন্য, কেননা যতবারই ক‍্যাডাররা পাঁচিল টপকাতে গেছে ততবারই রজতাভর মোতায়েন করায় ছেলেরা পাঁচিলের এপার থেকে লাঠির খোঁচা দিয়ে তাদের নামিয়ে দিয়েছে ওপারে। পঞ্চাশ জন ছেলেমেয়ে এমনভাবে মূল ফাটককে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে যে তাদেরকে বুলডোজ না করে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। তবে আর আশা নেই পাঁচিল ভেঙেই ভিতরে ঢুকবে ওরা, আর তারপর...

কৃশানু মারা যাওয়ার পরের দিনই শুরু হয়েছে এই অবরোধ। গরীব দিনমজুরের ছেলে কৃশানু, সেমেস্টারে ভালো ফল করে ক‍্যাম্পাস প্লেসমেন্টের প্রথম দফাতেই একটি বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি পেয়ে সুখের স্বপ্ন বুনেছিল চিরকালীন নির্বিবাদী ছেলেটা। কিন্তু সেই ঘটনাটা তছনছ করে দিল কৃশানুর জীবন; সে যে বড় ভালোবাসত মেয়েটাকে। কলেজ থেকে ফেরার পথে রেল-কলোনির পাশের জঙ্গলে পৌষালিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সম্রাট আর ওর বন্ধুরা। সদ‍্য সাবালিকা শরীরটাকে ভোগ করে পাশবিক উল্লাসে তার যোনিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ড্রাফটারের স্কেলটাকে। পৌষালি কিন্তু বিনাযুদ্ধে পালিয়ে যায়নি, এরপরেও দশদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিল আইসিইউ এর বিছানায়। পাগলের মতন বাঁকুড়ার বাড়ি থেকে ছুটে এসেছিল কৃশানু, পৌষালির বাবা-মাকে সাথে নিয়ে বিচারের ভিক্ষা চেয়ে বেরিয়েছিল লোকাল থানা আর পার্টি অফিসগুলোতে। পুলিশ অবশ্য একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকেনি, চার্জশিটে সম্রাট ও তার বন্ধুদের নাম উল্লেখ না করে লিখেছিল ‘ব‍্যবসায়িক গোলযোগে জনৈকা দেহপসারিনী ধর্ষিতা হয়েছেন অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীদের হাতে’। পুলিশকে অবশ্য বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না, কেননা সরোজিনী ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার এবং শাসক দলের লোকাল কমিটির চেয়ারম্যান হলেন, সম্রাটের বাবা অভিমন্যু দাস। আর কৃশানুদের সাথে সাধারণত যা ঘটে থাকে, এক্ষেত্রেও তার অন‍্যথা হয়নি। হস্টেলের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়া দেহটা আঁকড়ে স্থবির হয়ে বসে ছিল সনৎ, কৃশানুর সুহৃদ, তারই সহপাঠী সনৎ মন্ডল। ঘটনার সময় কলেজেই ছিল অভিমন্যু দাস; খবরটা শুনেই অবশ‍্য পিঠটান দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে, কিন্তু ততক্ষণে সচেতন হয়ে যাওয়া রজতাভর রচনা করা চক্রব‍্যুহ ভেদ করার ক্ষমতা এ যুগের অভিমন্যুরও ছিল না।

অসহায়ের মতন মাঠের গোলপোস্টে হেলান দিয়ে বসে আছে রজতাভ। অসহায়তার যথেষ্ট কারণও আছে, লড়াই তো শুধু সরকার আর শাসক দলের সঙ্গে নয়, লড়াই খিদের সাথে, লড়াই ধৈর্ঘ্যের সাথে। কলেজের সামনের দোকানের নিবারণদা, পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে প্রথমদিন বিস্কুট আর জল দিয়েছিল বটে কিন্তু ক‍্যাডাররা খবর পেয়ে সেটাও বন্ধ করেছে। সদ‍্য কুড়ি পেরোনো ছেলে মেয়েগুলোর পরিবারের জন্য উৎকন্ঠা ও আর নিদারুণ খিদে তেষ্টায় শুকিয়ে যাওয়া মুখগুলোর দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না।

হঠাৎ একটা কন্ঠস্বর শুনে চমকে ফিরে তাকাল রজতাভ,

—‘রজতদা, ওরা পজিশন নিয়ে নিয়েছে। আর মিনিট কুড়ির মধ্যে সব ছারখার করে দেবে ওরা। তুমি কিছু একটা করো।’

সামনে নিশ্চিত হার জেনেও, সনৎকে সেটা বলার মত সাহস জোগাতে পারল না রজতাভ। শুধু বলল

—‘পাঁচিলের পাশ ছেড়ে সব ছেলেকে বল গেটের সামনে ব্লক করে দাঁড়াতে আর তার আগে সৌম‍্যজিৎকে বল সমস্ত মেয়েদের পুকুর পাড় দিয়ে কলেজের বাইরে বের করে দিতে, ওদিকটা এখন ফাঁকা হয়ে যাবে।’

—‘আর তুমি?’

সনৎ এর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ধীর পদক্ষেপে ডিরোজিও ব্লকের দিকে এগিয়ে গেলো রজতাভ।

ডিরোজিও ব্লকে লবিতে গিয়ে দুটো ঘর ছাড়ালেই অভিমন্যু দাসের অফিস। এই কদিনে অভিমন্যু ও তার সহকারী নেপাল কাহিল হয়ে পড়লেও মচকায়নি এতটুকু। রজতাভ ঘরে ঢুকতেই হিংস্র নেকড়ের মতন লাফিয়ে উঠে নেপাল বলল,

—‘শুয়োরের বাচ্চা, এবার তোরা বুঝবি কত ধানে কত চাল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার নামলেই গেট ভেঙে কলেজে ঢুকবে আমাদের পার্টির ছেলেরা। তারপর তোদের মেয়েগুলোকে আমাদের ছেলেদের হাত থেকে আর পুলিশের ক‍্যালানির হাত থেকে তোদেরকে কে বাঁচায় দেখবো!’

নেপালের কথার যথার্থ জবাব যে রজতাভর কাছে ছিল না, এমন নয়। কিন্তু এই রজতাভ যেন একেবারে অন্য মানুষ,অভিমন্যুর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে সে শুধু বলল

—‘সেটা হলেও, আপনি যে পার পেয়ে যাবেন এমন ভাবার কোন কারণ নেই।’

তিনদিনের ধকলের চোটে টেবিলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ছিলেন অভিমন্যু, রজতাভর কথা শুনে মাথাটা তুলে ক্রুর হাসি হেসে বললেন,

—‘আমার কথা না ভেবে, তোমার বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলোকে কীভাবে বাঁচাবে সেটা ভাবো।’

—‘ছেলেমেয়েদের কথা আপনাকে না ভাবলেও চলবে মিঃ দাস, আপনি নিজের কথা ভাবুন।’

— ‘আমি ভাববো না তো কে ভাববে? তুমি? না তোমার সেই পালিয়ে যাওয়া বন্ধু সুভাষ ব‍্যানার্জী।’

পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল রজতাভর, হঠাৎ করে যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ শরীরের ভিতর দিয়ে খেলে তার অঙ্গপ্রত‍্যঙ্গগুলোতে কম্পন ধরিয়ে দিল। ঠিক জায়গায় ঘা দিয়েছে পোড় খাওয়া নেতা অভিমন্যু, কেননা সে জানে, এর জবাব রজতাভর কাছে নেই।

সুভাষ, সুভাষ ব‍্যনার্জী রজতাভর সহপাঠী ও সহযোদ্ধা ছিল‌ সরোজিনী ইনস্টিটিউটে। যেকোন অন‍্যায়ের প্রতিবাদে রজত-সুভাষ ছিল কমরেড কম, সহোদর বেশী। কলেজে পড়াকালীন কত রাতে তারা ছুটে গেছে পাশের সাঁওতাল গ্রামের মানুষগুলোর বিপদে পাশে দাঁড়াতে। তাদের দুজনের উপস্থিতিতে কোন রাজনৈতিক দল অথবা বহিরাগত শক্তির ক্ষমতা ছিল না সরোজিনীতে কোন অনৈতিক কাণ্ড ঘটাবার। ট্রাস্টি বোর্ড থেকে নিয়ে স্থানীয় শাসক দলের ক‍্যাডাররা পর্যন্ত। সমীহ করে চলত রজত-সুভাষের জনপ্রিয়তাকে। ছাত্র-ছাত্রী-অভিভাবকদের কাছে তারা ছিল ভগবানতুল‍্য, রক্তদান থেকে দুঃস্থ পড়ুয়াদের জন‍্য চাঁদা তোলা, সবেতেই এই জুটি ছিল পুরোধা। দুজনেই অসম্ভব মেধাবী হওয়ার দরুণ ছিল অধ‍্যাপকদের নয়নের মণি, এমনকি এই অভিমন্যু দাস ও তার পারিষদবর্গও সমঝে চলত এদের।

সুখের দিন চিরকাল থাকে না, সরোজিনীর ভাগ‍্যও তার ব‍্যতিক্রম ছিল না। চতুর্থ বর্ষের ক‍্যাম্পাস প্লেসমেন্টে বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি পেল রজতাভ-সুভাষ। রজতাভ সরোজিনী আর গ্রামের মানুষদের ছেড়ে যেতে নারাজ হলেও, অন‍্য পথে হাঁটল সুভাষ। রজতাভ পড়ে রইল নীলপাহাড়িতে সরোজিনীকে নিয়ে আর সুভাষ পাড়ি জমাল দিল্লিতে। রাগে, ঘেন্নায় সুভাষকে আটকানোর চেষ্টা করেনি রজতাভ, যোগাযোগ ও রাখেনি আর কোনোদিন তার সাথে।

এতবছর পর সুভাষের কথা মনে করে ক্ষণিকের জন‍্য বিহ্বল হয়ে পড়লেও নিজেকে সামলে নিল রজতাভ। ক‍্যাডার বাহিনী ঢোকার আগে তাকে কাজটা সারতে হবে না হলে কৃশানুর আর পৌষালির আত্মা শান্তি পাবে না কোনদিন। চকিতে কোমরের পেছনে গোঁজা ওয়ান শটারটা বার করে সরাসরি অভিমন্যুর কপালের মাঝামাঝি তাগ করল রজতাভ।ঘটনার আকস্মিকতায় বাকরুদ্ধ হয়ে ফ‍্যালফ‍্যাল করে রজতাভর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে নেপাল, তার অন্নদাতাকে বাঁচাবার সব প্রচেষ্টা যেন কোন অভিশাপে রুদ্ধ হয়ে গেছে।

রজতাভ ট্রিগারটা চাপতে যাবে, ঠিক এমন সময় দৌড়ে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল সনৎ। রক্তশূন্য মুখ আর ঠিকরে পড়া চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে গেল রজতাভর। তার হাতের পিস্তল তাক করা অভিমন্যুর দিকে অথচ সেদিকে যেন ভ্রুক্ষেপই করছে না সনৎ!

—‘কি হয়েছে, সনৎ?’

—‘রজতদা বাইরে এসো এক্ষুনি!’

অন্ধকার নেমে এসেছে সরোজিনী ইনস্টিটিউটের চারপাশে। দৌড়ে গেটের বাইরে এসে এক অভাবনীয় দৃশ্য চোখে পড়ল রজতাভর। মূল ফাটকের খানিকটা বাইরে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সনৎ ও বাকি ছাত্ররা, কিন্তু পুলিশ আর ক‍্যাডাররা কোথায়! তাদের কে তো আর সেখানে দেখা যাচ্ছে না। সনৎই রজতাভকে ডেকে সরোজিনীর পশ্চিম প্রান্তে আঙ্গুল তুলে দেখাল যেদিকে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে। পশ্চিমের টিলার ওপরের সাঁওতালদের গ্রামটা থেকে প্রায় হাজার দুয়েক গ্রামবাসী তীব্রগতিতে ছুটে আসছে সরোজিনীর দিকে। গামছা গায়ে খাটো ধুতি পরা হাড় হাভাতে খেটে খাওয়া আপাতশান্ত মানুষগুলো আজ যেন কোন যাদুবলে মহাযুদ্ধের যোদ্ধাতে পরিণত হয়েছে। টাঙ্গি, বল্লম, কাটারি নিয়ে তারা ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসছে সংখ‍্যালঘু পুলিশ আর ক‍্যাডারবাহিনীর দিকে। শাসক দলের দালাল বীরপুঙ্গবেরা কতগুলো গরিব মানুষের ভয়ে, হাতে অটোমেটিক পিস্তল আর বন্দুক থাকা সত্ত্বেও থরথ‍র করে কাঁপছে। ভিড়টা ততক্ষণে প্রায় কলেজের সামনে এসে পড়েছে, রজতাভ উল্টো দিকে তাকিয়ে দেখল খানিকটা পিছু হটছে শত্রুপক্ষ। গ্রামের মানুষের দলটা এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ঠিক কলেজের গেটের সামনে, ওদের মধ‍্যে মুরুব্বি গোছের একটা লোক এগিয়ে এসে উল্টোদিকের ভিড়টার দিকে তাকিয়ে বলল

—‘শোনেন বাবুরা, ই বাচ্চা ছেলেনগুলাকে মাইরবার কথা যদি ভেইবেও থাকেন, তাইলে কিন্তু আজ নীলপাহাড়িতে রক্তগঙ্গা বইবে।’

লোকাল থানার বাবুরা আর পার্টির ক‍্যাডাররা এটা বিলক্ষণ জানে যে আদিবাসীরা একবার ক্ষেপে গেলে তারা একজনও তাদের পৈতৃক প্রাণ নিয়ে এখান থেকে ফিরতে পারবে না। কাজেই সুড়সুড় করে পিছু হটল রাষ্ট্রীয় গুন্ডারা। এতক্ষণ হতবাক হয়ে এদের কাণ্ডকারখানা পর্যবেক্ষণ করছিল রজতাভ, এবার আর থাকতে না পেরে মুরুব্বি গোছের লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল,

—‘আচ্ছা, আপনারা গত দুইদিন কেউ তো আসেননি, আজ এলেন যে হঠাৎ?’

—‘কী আর বলি রে বাপ। আমরা হলাম গিয়া মজদুর মানুষ, চাইলেও আসতে পারি নাই। কিন্তু আজ দাদাবাবু এসে এমনভাবে বুইললেন যে আমাদিগের মাথা আর ঠিক থাকল না রে!’

এসব কী বলছে লোকটা! কোন দাদাবাবু? মস্তিস্কে বিদ্যুৎ খেলে গেল রজতাভর। তাইলে কি...? কিন্তু সে কোথা থেকে আসবে এখানে? সে তো এখন বহুজাতিকের হাওয়াতে সহস্র ক্রোশ দূরে আরামে জীবন যাপন করছে। তবুও রজতাভর সন্দিহান মন আর একবার জিজ্ঞেস করল,

—‘সে আপনাদের সাথে এল না কেন?’

—‘সে তো বুলতি পারবো না বাপ, তবে ....’

মুরুব্বির কথা শেষ হতে না হতেই, ডিরোজিও ব্লকের দিক থেকে পরপর দুটো গানশটের আওয়াজ ভেসে এল। হতবাক হয়ে রজতাভ ছুটতে শুরু করল অভিমন্যুর ঘরের দিকে। উর্ধশ্বাসে ঘরে ঢুকে থতমত খেয়ে পিছিয়ে এল রজতাভ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে টেবিল আর টেবিলের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে নেপাল আর অভিমন্যু। মাথার ক্ষত দেখে রজতাভ বুঝতে পারল যে খুব কাছ থেকে গুলি মেরেছে আততায়ী। টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে নেপালের মুঠোতে ধরা রক্তভেজা কাগজটা সন্তর্পণে বার করে নিল রজতাভ, তাতে লেখা,

ইগোটা এবার একটু কমা রাস্কেল।

একবার তো ডাকতেও পারতিস!

ইতি

যে ঘরে ফেরে নাই