মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
Showing posts with label মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ. Show all posts

হাই মাইলেজ ● জেজি ফ্যাহার্টি ● অনুবাদ: মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ


 

 

‘কেমন? চলে?’ বিয়ারের বোতলে চুমুক দিতে দিতে বলল বব হ্যারিসন, মুখে দুষ্টুমির হাসি।

ঈর্ষা বোধ করল সিড চেম্বারস, কিন্তু সেটা দেখাল না। উল্টে শিস বাজিয়ে বলল, ‘দারুণ।’

‘হ্যাঁ, গতকালই পেয়েছি। দ্য ডব্লিউ-৯, বিক্রেতা আমাকে ভালো ছাড় দিয়েছে। পুরো ছয় হাজার কম নিয়েছে সে!’

শুদ্ধিকরণ - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

গল্প

প্রত্যেকটা বছর একটু একটু করে কমতে থাকে আমার প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা, একজন-দুইজন করে মুছে যেতে থাকে স্মৃতি থেকে। আজ আমরা ডেস্কগুলোকে বৃত্তাকারে সাজিয়েছি; আমাদের শিক্ষিকা, মিস সাদিয়া, বলছেন যে সিন্থিয়া এই দুনিয়ার চাইতে অনেক উত্তরে একটা জায়গায় গিয়েছে।

চিড়িয়াখানা - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

কল্পবিজ্ঞানের গল্প

আগস্ট মাস শুরু হওয়া মাত্র বাচ্চা-কাচ্চারা একদম ফেরেশতার অবতার বনে যায়। আর তেইশ তারিখ কাছিয়ে আসলে তো কথাই নেই...একদম দেবদূত মনে হয় ওদের। কেন না প্রফেসর হিউগোর বিখ্যাত ‘আন্তঃগ্রহ চিড়িয়াখানা’ যে সেদিনই আসে শিকাগোতে।

পুতুল - আগাথা ক্রিস্টি

ভেলভেটে মোড়ানো চেয়ারের উপর শুয়ে আছে পুতুলটা। আলো খুব একটা নেই ঘরে। লণ্ডনের আকাশ অন্ধকার হয়ে আছে। হালকা আলোয় একে-অন্যের মাঝে যেন ডুব দিয়েছে পর্দা, কার্পেট আর অন্যান্য আচ্ছাদন। পুতুলটাও ব্যতিক্রম নয়। সবুজ ভেলভেটের কাপড়, ভেলভেটের টুপি এবং রঙিন মুখোশ পরে শুয়ে আছে সে।

ডায়াল অ্যান আলিবাই - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

‘রালফ,’ মেঘস্বরে বললাম আমি। ‘ধনী কাউকে আত্মহত্যা করতে দেখলে আমার সন্দেহ চাগিয়ে ওঠে।’

‘কেন, হেনরি?’

‘কেননা,’ হাসলাম মলিন হাসি। ‘সন্দেহ করাই আমার কাজ।’

সে যাই হোক, অকুস্থল একদম টিপটপ দেখছি।

অরভিল টাকার, বয়েস ষাটের ঘরের মাঝামাঝিতে হবে, বিকেল তিনটের সময় মৃত অবস্থায় সোফার ওপর মরে পড়ে ছিলেন। স্টাডিতে প্রবেশ করে তখন তার এই দশা দেখতে পায় হাউজকিপার কাম রাঁধুনি। মিসেস ব্রিউস্টার তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার জন্যই এসেছিলেন ঘরে।

টাকারের মাথায় একটা মাত্র ক্ষত পাওয়া গিয়েছে, তবে সেটা বুলেটের বলে সেই একটা ক্ষতই যথেষ্ট। ওর পাশেই পড়ে আছে একটা .৩২ ক্যালিবারের রিভলভার। বাড়ির কেউ নাকি কোন গুলির আওয়াজ শোনেনি!

টাকারের আঙুলের ছাপ মিলেছে বন্দুকে, বাঁ হাতে তিনি একটা কাগজ ধরেছিলেন। টাইপ করে ওতে লেখা: ‘অ্যাড্রিয়ানকে জিজ্ঞেস করো ৫৬৩-২৭০৪।’

দেরি না করে নম্বরটায় ডায়াল করলাম আমি। আবিষ্কার করলাম যে ইউনাইটেড ট্রাবল হট লাইনে ফোন করেছি! বিপদে পড়া লোকদেরকে সাহায্য করে এরা। এই মুহূর্তে অ্যাড্রিয়ান অফিসে নেই, তবে সেদিন সন্ধ্যে সাতটায় পাওয়া যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মহিলার অ্যাপার্টমেণ্ট পাঠিয়ে দিলাম একজন অফিসারকে, তাকে নিয়ে আসতে বললাম টাকারের বাড়িতে।

তারপর মিসেস ব্রিউস্টারকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কাজে মন দিলাম।

‘মিসেস ব্রিউস্টার,’ শুরু করলাম আমি। ‘মি. টাকার কেন আত্মহত্যা করলেন, তা কি আপনি জানেন?’

মধ্য-পঞ্চাশের মহিলার চোয়ালটা বেশ বড়। ‘স্বাস্থ্য তার খারাপ ছিল, খুব বাছ-বিচার করে খেতেন।’

‘কত দিন হলো মি. টাকারের হয়ে কাজ করছেন?’

‘পঁচিশ বছর, দুই-এক বছর এদিক-ওদিক হতে পারে।’

‘ভদ্রলোকের উত্তরাধিকারীদের নাম জানেন নাকি?’

‘আমার জানামতে তেমন আছেন মাত্র একজন, মিস বিয়েট্রিস, তার ভাগ্নী।’

‘আপনার উল্লেখ আছে নাকি মি. টাকারের উইলে।’

‘আমাকে তো আছে বলেই জানিয়েছিলেন।’

‘কী দিয়ে গিয়েছেন, জানেন নাকি?’

‘আমার আনুগত্য এবং উপযুক্ত সেবার কারণে...পঞ্চাশ হাজার ডলার।’

দূরে সরিয়ে নিলাম রালফকে, যেন মহিলা শুনতে না পায়। ‘রালফ, খুন করার জন্য কিন্তু হাজার পঞ্চাশেক ডলার মোটিভ হিসেবে ফেলনা নয়। হয়তো ভদ্রলোক ঘুমিয়ে থাকার সময় মহিলা লুকিয়ে প্রবেশ করে টাকারের কামরায়। তারপর গুলি করে মেরে ফেলা একদম সহজ। বুড়োর আঙুল ট্রিগারে চেপে ধরলেই হলো।’

‘নোটটা? ওটার কথা ভুলে গেলে নাকি, হেনরি?’

‘উম, মানে...নোটটায় তো আর সই করা ছিল না।’

‘তা ছিল না। কিন্তু, হেনরি, ওটা তো আসলে সুইসাইড নোটও না। শুধু একটা নাম এবং ফোন নম্বর আছে ওতে। সই করবেন কেন?’

ঠিক সেই মুহূর্তে কামরায় পা রাখল বিয়েট্রিস, টাকারের ভাগ্নি। মেয়েটির সঙ্গে ধূর্ত-চোখের এক পুরুষ। ‘ইনি হচ্ছেন ক্ল্যারেন্স কেনিকট।’ পরিচয় করিয়ে দিল সে।

মাথা নেড়ে সায় জানাল যুবক, আলতো করে চাপড় বসালো বিয়েট্রিসের হাতে।

কেন যেন আমি আলতো-করে-চাপড়-বসানো-যুবকদের পছন্দ করি না। তাই সন্দেহভাজনের তালিকায় ঢুকিয়ে দিলাম লোকটার নাম।

শুরু হলো আমার জিজ্ঞাসাবাদ। ‘আপনার মামা কেন আত্মহত্যা করলেন, তা জানেন?’

‘বেচারির স্বাস্থ্য খুব একটা ভাল ছিল না। আচ্ছা, তিনি একটি নোট লিখেছেন না?’

‘ওই সেরকমই বলা চলে আরকী। আপনি ছাড়া ভদ্রলোকের কোন উত্তরাধিকারী নেই?’

‘আমার জানা মতে নেই।’

এবার আলোচনায় যোগ দিল কেনিকট। ‘ডাক্তার র‍্যাথবোর্নকে এক লাখ এবং মিস ব্রিউস্টারকে পঞ্চাশ হাজার বুঝিয়ে দেয়ার পর, যা থাকত তা সবই বিয়েট্রিসের।’

চোখ সরু করে জানতে চাইলাম, ‘সে কথা আপনি জানেন কীভাবে?’

‘কারণ আমি অরভিল টাকারের উইল অনুসারে সব বণ্টনের দায়িত্বে আছি।’

আমাকে এবার সরিয়ে আনল রালফ। ‘কিছু বুঝতে পারলে, হেনরি?’

‘রালফ,’ বললাম আমি। ‘মানব-চরিত্র আমি ভালই বুঝি। মেয়েটিকে খুনি হতে পারে না!’

‘কেন?’

‘মেয়েটি ওই ধরনের নয় বলে। কিন্তু ওই কেনিকট ব্যাটাকে পছন্দ হচ্ছে না, লোকটা আততায়ী হতে পারে!’

‘তোমার লজ্জা পাওয়া উচিৎ, হেনরি। বেশ-ভূষা দেখে একজনকে অপরাধী ঠাউরে বসেছ!’

‘বলছি না যে এখনই ওকে গ্রেফতার করতে হবে। কিন্তু যেভাবে বিয়েট্রিসের পেছনে ছোঁক-ছোঁক করছে, তাতে তো মনে হচ্ছে যে মেয়েটিকে বিয়ে করার তালে আছে। পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হলেই, বিয়েটা সেরে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনে বসবে!’

আচমকা কামরায় প্রবেশ করল আমার পাঠানো অফিসার, সঙ্গে কালোকেশি এক তরুণী; বয়েস হবে বিশের কোঠায়।

‘আহ,’ বললাম আমি। ‘আপনি নিশ্চয়ই অ্যাড্রিয়ান?’

মাথা নেড়ে সায় জানাল মেয়েটি। ‘আর আপনি হচ্ছেন ডিটেকটিভ সার্জেণ্ট হেনরি এস. টার্নবাকল।’

অ্যাড্রিয়ান ম্যাককালামের গল্পটা শুনলাম এরপর।

‘মি. টাকার আমাকে গত সপ্তাহে মোট তিনবার ফোন করেন। তবে তখন তাকে টাকার নামে চিনতাম না। নাম জানতে চাইলে কেবল নামের প্রথম অংশটা বলতেন তিনি।’

এই পর্যায়ে এসে নিজের পরিচয়ে আমাকে কিছু কথা জানাবার সিদ্ধান্ত নিল মেয়েটি। ‘আমি প্রতি সপ্তাহে তিন ঘণ্টা করে হটলাইনটায় কাজ করি, শুক্র-শনি বাদে। এর পেছনে যেমন মানবিক কারণ আছে, তেমনি আছে আমার পি.এইচ.ডি.-এর থিসিসও।’

‘টাকার সাহেব কেন হটলাইনে ফোন করছিলেন?’

‘তার স্বাস্থ্যগত সমস্যার জন্য। খুব মন খারাপ করে থাকতেন, এমনকী আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা বলে তাকে থামাতে পেরেছিলাম। মানে তখন সেটাই মনে হয়েছিল আরকী। বারবার ভদ্রলোকের পুরো নাম জানতে চেয়েছিলাম, ইচ্ছে ছিল সাহায্য পাঠাবো। কিন্তু তিনি জানাননি।’

‘মি. টাকার কি আপনাকে নাম ধরে চেয়েছিলেন?’

‘প্রথমবার চাননি। সেবার আমি ডিউটিতেই ছিলাম। তবে তারপরের বারগুলোতে তিনি আমাকে ছাড়া মুখই খুলতেন না!’

দৃশ্যপটে তখন এসে হাজির হয়েছেন ডা. র‍্যাথবর্ন। মাঝবয়সী ভদ্রলোক, এসেই মাথা নাড়লেন কেনিকট এবং বিয়েট্রিসের দিকে চেয়ে। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অরভিল আত্মহত্যা করেছেন?’

‘দেখে সেটাই মনে হচ্ছে, অন্তত এই মুহূর্তে আমরা তেমনটাই ভাবছি। আপনি কি দয়া করে আমাকে অরভিল টাকারের শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে জানাবেন?’

শ্রাগ করে জবাব দিলেন ডা. র‍্যাথবর্ন। ‘শরীর তার যথেষ্টই খারাপ ছিল, বয়েস তো আর কমছিল না। তবে আরও দশ-পনেরো বছর ঠিক বেঁচে থাকতে পারতেন।’

হাসলাম আমি, উদ্দেশ্যপূর্ণ হাসি। ‘টাকারের উইলে কি আপনার নাম আছে?’

‘আছে। যত দূর জানি, আমাকে এক লাখ ডলার দিয়েছে। সেই ছেলেবেলা থেকে আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি।’

‘আজ বিকেলে, এই ধরুন দুইটা থেকে তিনটার মাঝে আপনি কোথায় ছিলেন?’

ইতস্তত করলেন ডাক্তার সাহেব। ‘অফিসেই ছিলাম। সে কথা আমার রিসিপশনিস্ট এবং আরও আধ-ডজন রোগী নিশ্চিত করে বলতে পারবেন।’

‘শেষ কবে দেখা হয়েছিল টাকারের সঙ্গে?’

‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যের দিকে। একসঙ্গে দাবা খেলেছিলাম বেশ কিছুক্ষণ।’

অ্যাড্রিয়ানের দিকে ফিরলাম আমি। ‘টাকার সাহব কি কেবল নিজের স্বাস্থ্য নিয়েই কথা বলতেন?’

‘অনেকটা তেমনই। লিভার, কিডনি, পাকস্থলী এবং বাতের ব্যথা নিয়ে অনুযোগ করতেন তিনি।’

ভ্রু কুঁচকে ফেললেন ডা. র‍্যাথবর্ন। ‘কী বললে? বাতের ব্যথা? ওর তো বাত ছিল না!’

কিছুক্ষণ ভেবে জবাব দিল মেয়েটি। ‘এখন মনে পড়েছে, বাতের কথা বলেছিলেন মাত্র একবার।’ পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘আপনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যেয় এখানে এসে ভদ্রলোকের সঙ্গে দাবা খেলেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আটটার দিকে কি পনেরো-বিশ মিনিটের অন্য তিনি উঠে গিয়েছিলেন?’

‘না তো! সাড়ে সাতটার দিকে বসে আমরা প্রায় দশটা পর্যন্ত একটানা খেলেছি।’

‘আহ!’ অ্যাড্রিয়ানের কণ্ঠে বিজয়ের সুর। ‘তাহলে আমাকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আটটার দিকে হটলাইনে ফোন করেছিল কে? যদি টাকার সেদিনে আমাকে ফোন না করে থাকেন, তাহলে পরের দিনগুলোতেও তিনি করেননি! কেননা কণ্ঠ ছিল একই, আমার পরিষ্কার মনে আছে।’

চিবুক ঘষতে লাগলেন ডাক্তার র‍্যাথবর্ন। ‘তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে নিজেকে টাকার বলে পরিচয় দেয়া লোকটা ভুল করে নিজের রোগের কথাই বলে ফেলেছিল।’

আরেকটু হলেই কথাটা আমি বলে ফেলতাম।

কেনিকটের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন ডাক্তার সাহেব। ‘তোমার বাতের সমস্যা আছে না, ক্ল্যারেন্স?’

আমি ভেবেছিলাম, লোকটা খেপে যাবে। বলবে-ওর মতো আরও হাজারো মানুষের বাতের সমস্যা আছে। কিন্তু কেবল শ্রাগ করল লোকটা।

চোখ পিটপিট করল বিয়েট্রিস টাকার। ‘কিন্তু ক্লারেন্স কেন অরভিল মামাকে খুন করবে?’

কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতে চাইলাম। কিন্তু তার আগেই ডাক্তার সাহেব বলে বসলেন, ‘যতদূর জানি, দেনায় ডুবে আছে ও। তবে খুন করতে চাইবার কারণ হিসেবে বলব-তোমাকে বিয়ে করে তোমার মামার সব সম্পদ হাতিয়ে নেবার তালে ছিল ছেলেটা!’

কেনিকটের দিকে তাকাল বিয়েট্রিস। ‘আরে, ক্লারেন্স! যে লোক কিছু হলেই আমার হাতে আলতো করে চাপড় বসায়, তাকে বিয়ে করার কথা তো আমি কল্পনাও করতে পারি না!’

কেনিকটের দিকে তাকাল অ্যাড্রিয়ান। ‘আমি এখানে আসার পর তুমি একটা কথাও বলোনি। নিশ্চয়ই অবাক হয়ে গিয়েছ আমায় দেখে! মুখ খুলছ না, কারণ তোমার কণ্ঠ শোনা মাত্র আমি চিনে ফেলব।’

আমাদের সবার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল লোকটা। তারপর পকেট থেকে একটা কলম আর নোটবুক বের করে তাতে লিখল, ‘আমার উকিল আসার আগে আমি একটা কথাও বলব না!’ তারপর ওটা এগিয়ে দিল আমার দিকে।

আর সন্দেহের অবকাশ রইলো না। সবাই মিলে আমার কেসটার সমাধান করে ফেলেছে। এখনও নিরেট প্রমাণ মেলেনি বটে, কিন্তু অচিরেই যে মিলে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

কিন্তু তাই বলে তো আর আমার মন ভাল হয়ে যায় না! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘রালফ, জীবন এত ছোট...কিন্তু দিনগুলো এত বড় কেন?’

‘মন খারাপ কোরো না, হেনরি।’ সান্ত্বনা জানাল রালফ। ‘একেবারে প্রথম থেকেই তো আন্দাজ করে বলছিলে যে কেনিকট খুনি।’

‘আন্দাজ করা, আর খুঁজে বের করার মাঝে পার্থক্য আছে, রালফ। আমি অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্যটাকে খুঁজে বের করতে চাচ্ছিলাম।’ সবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তাতে কোন বাধা চাইনি।’

‘তা তো তুমি পারতেই, হেনরি। কিন্তু কী আর করবে বলে, সংখ্যায় যে এরা দলে ভারী! সবাই মিলে কেসটার সমাধান করেছে।’

সংখ্যায় ভারী? হাসি ফুটে উঠল আমার মুখে। হুম, তা হতে পারে। যদি আরেকটু সময় পেতাম, তাহলে একাই বন্ধ করে দিতে পারতাম এই কেসের ফাইল!

চন্দ্রাহত - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

এক

এই মানব বসতির লোকদের উৎসবের সুযোগ হয় না বললেই চলে। কষ্টে-ক্লেশে সময় কাটানো মানুষদের আবার ফুর্তি কী? সকালে উঠেই তাদের শুরু হয়ে যায় চিন্তা—রাতটা বাঁচব তো? কোনওক্রমে রাতের তারা দেখার সৌভাগ্য হলে ঘুমাবার আগে একটা কথাই ভাবে: ঘুমটা ভাঙবে কি, নাকি রাতের আঁধারে তেজস্ক্রিয়তা গুটি-গুটি পায়ে এগিয়ে এসে গিলে খাবে?

সালটা আশি এ.ডি.। এ.ডি. আগে অন্য অর্থে ব্যবহার করা হতো। এখন এর অর্থ: আফটার ডেসট্রাকশন। সমাজ ও সভ্যতার ধ্বংস সূচিত হয়েছিল আশি বছর আগে। ক্ষমতালোভী মানুষদের বলির শিকার হতে হয়ে ছিল পৃথিবীকে। সেই পৃথিবী, যাকে এক কালে বলা হতো সুজলা-সুফলা।

আর এখন?

সবুজের চিহ্ন খুঁজে পেতে পাড়ি দিতে হয় শত শত মাইল।

বৈজ্ঞানিকদের ধন্যবাদ। তাদের আপ্রাণ চেষ্টায় কিছু কিছু এলাকার গুটিকয়েক মানুষকে আলাদা করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। মাটির নিচে দীর্ঘ দিন কাটাবার পর, এই বছর বিশেক আগে তারা উঠে আসতে পেরেছে ধরার বুকে। অবশ্য এছাড়া আর উপায়ও ছিল না, পাতালে বায়ু পরিশোধনের যন্ত্রপাতি একে একে সব অকার্যকর হয়ে পড়তে শুরু করেছিল, টান পড়ছিল জমানো খাবারে। আর হয়তো টেনে-টুনে বছর পাঁচেক, তারপর না খেয়ে মরতে হত সবাইকে।

পাতাল থেকে বেরিয়ে, পৃথিবীর বুকে পা রাখার এই সুযোগ করে দেবার সবটুকু কৃতিত্ব পাবে ফিরোজ। এশিয়ার পাতাল শহরে, অনেকটা ধূমকেতুর মত আবির্ভাব ঘটে এই মহানায়কের। প্রলয়ের আগে ছোট, সুন্দর এক দেশ ছিল। নাম নাকি ছিল বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ। আসলে এত দিন পর, ঠিক নামটা বলতে পারে না কেউই।

বাংলাদেশই ধরে নেয়া যাক।

ওই দেশের মানুষের হাতে ছিল না পারমাণবিক অস্ত্র বা অগণিত সম্পদ। ছিল শুধু মেধা। আর সেই মেধাকে কাজে লাগিয়ে তারা সংগঠিত করেছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। যাদের হাতে অস্ত্র নেই, কিন্তু মেধা ও জনশক্তি আছে, কেবল মাত্র তেমন কয়েকটি দেশের জনগণই সেই ভয়াবহ প্রলয় থেকে বাঁচতে পেরেছিল।

ধারণা করা হয়, ফিরোজ কোনও এক বাংলাদেশির বংশধর।

অবশ্য অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখার ইচ্ছা বা মানসিকতা, কোনওটাই বর্তমানের মানুষের নেই। থাকবেই বা কেন? কতিপয় মানুষের লোভের শিকার তারা, তাদের পূর্বপুরুষরা। বাস করার জন্য এখন সারাবিশ্বে রয়েছে মাত্র অল্প কিছু স্থান। মানব বসতির সংখ্যা এখন সারা পৃথিবীতে মাত্র এক শ’!

প্রতিটা বসতিতে কতোজন করে বাস করতে পারবে, তার সংখ্যাও নির্ধারিত—মোটে দশ হাজার। দুনিয়াতে মানুষের সংখ্যা এখন মোটে এক কোটি!

ভাবা যায়!

আট বিলিয়ন মানুষের পদচারণায় যে পৃথিবীর একদিন মুখরিত হয়ে থাকত, সেখানে এখন বাস করে মাত্র এক কোটি লোক!

তবে মহাবিশ্বে মানুষের সংখ্যা এক কোটি নয়। চাঁদে কলোনি আছে যে!

সেই কলোনিতে কাজ করে আরও হাজার পাঁচেক মানুষ। চেষ্টা করছে, উপগ্রহটাকে বাসযোগ্য করে তোলার। তবে কতটা সফল হচ্ছে, বলা মুশকিল। অন্তত বর্তমান প্রজন্মের কেউ বলতে পারবে না যে, চাঁদের বসতি সংক্রান্ত কোনও সুখবর শুনতে পেয়েছে তারা।

সে যাই হোক না কেন, চাঁদের বসতিতে পা রাখার জন্য উদগ্রীব থাকে সবাই। আর থাকবে না-ই বা কেন? ওখানে তেজস্ক্রিয়তার ভয় নেই, নেই আধ-পেটা থাকার হুমকি। এমন কী নেই বুনো পশু বা বিষাক্ত সাপের শিকার হবার আশঙ্কা! সুন্দর আর মজবুত করে বানানো ডোমের ভেতরে থাকে সবাই। পরিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেয়।

ফিরোজ তো বলেছেন, ওরা নাকি রাতে দেরি করে ঘুমায়! আড্ডাবাজি, খেলাধুলা, দুষ্টুমি করে কাটিয়ে দেয় অনেকটা সময়!

ভাবে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পৃথিবীর এক কোটি মানুষ। আধুনিক সমাজ থেকে বিদায় নিয়েছে ধর্ম বিশ্বাস, নইলে হয়তো স্বর্গ বলতে চাঁদকেই বুঝত!

তাদের জীবনে উৎসবের আবহ বয়ে আনে একটাই ব্যাপার, তা পদোন্নতি।

অবশ্য পদোন্নতি না বলে স্বর্গ গমন বললেও অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু ওই যে, স্বর্গ-নরক বোধটাই যে তাদের নেই!

প্রতি মাসে একবার করে পর্দায় দেখা দেন মহানায়ক ফিরোজ। তার অগণিত সফল কাজের মধ্যে একটি, প্রতিটা বসতিতে রয়েছে একটা করে পর্দা। অবশ্য কাজটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে, বুঝে পায় না অন্য কেউ। বুঝতেও চায় না। যে বিজ্ঞান ওদের কাছ থেকে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাটুকু কেড়ে নিয়েছে, তার প্রতি মানুষের এখন রয়েছে কেবলই ঘৃণা... গা শিউরানো, প্রবল-প্রতাপশালী ঘৃণা!

মহানায়ক ফিরোজ নিজে এই পর্দা বসানোর কথা না বললে, ওটা সেই কত দিন আগেই গুঁড়িয়ে ফেলত সবাই!

মাসিক বক্তব্যের সময় নতুন নতুন আশার আলো দেখান তিনি। বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখান দুর্বল মানুষদের। তার এই একবার দর্শন দেয়া যেন এক সিলিণ্ডার অক্সিজেন। বাকি মাসটা চলার সামর্থ্য জোগায় সবাইকে।

প্রায় প্রতিবার-ই মহানায়ক ঘোষণা করেন কয়েকটা করে বসতির নাম, সেই সাথে একটা সংখ্যা। এই সংখ্যাটা কিন্তু নির্ধারিত নয়। কোনও মাসে বাড়ে, কোনও মাসে কমে। এই মাসে কোন বসতি থেকে ক’জন সৌভাগ্যবান চাঁদে যাচ্ছে, সেটার ঘোষণাই দেন তিনি।

এরপর শুরু হয় লটারি।

আশ্চর্যের বিষয়, প্রচণ্ড ক্ষমতালোভী এক প্রজাতির এই বর্তমান বংশধরেরা কিন্তু একদম লোভী নয়! নতুন শিশু এসেছে ধরণীতে, এই আনন্দেই আত্মহারা। আর হবে না-ই বা কেন! তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে মনুষ্য প্রজাতির প্রজনন ক্ষমতা। তাই প্রতিটা শিশু যেন আশীর্বাদ স্বরূপ। মানুষ এখন কোটি দেহ, এক প্রাণ। চিন্তা শুধু প্রজাতির ভাল নিয়েই।

সত্তর নম্বর বসতিটার উৎসবের কারণ ভিন্ন। মাত্র একজন নতুন অতিথি এসেছে এখানে। তাই চাঁদে যাবার সুযোগও মিলবে মাত্র একজনের। এই জনবসতির আনন্দের কারণ, মহানায়ক ফিরোজের পাঠানো দুই কর্মকর্তা আদি আর সৌরভ।

পক্ষপাতিত্ব শব্দটা ভুলতে বসেছে সবাই, নইলে হয়তো মহানায়ককে সেই অপরাধে অভিযুক্ত করত। অবশ্য ফিরোজের দলের প্রায় সবাই ওরই মত। ছোটখাট, শ্যামলা বর্ণ, কালো চোখ আর কালো চুল। শারীরিকভাবে কেউই খুব একটা প্রভাবশালী নয়। তবে মহামতি ফিরোজের নিজ হাতে গড়া দলটার প্রত্যেক সদস্যের ব্যক্তিত্ব আকাশছোঁয়া। সবাই হাসিখুশি, বন্ধু-বৎসল আর বুদ্ধিমান। কিন্তু তাদের অন্য রূপটা জরুরি অবস্থায় পরিষ্কার বোঝা যায়। যে একবার সেটা দেখেছে, মিত্র হিসেবে যে-কোনও বিপর্যয়ে তাদেরকেই সাথে চাইবে।

সৌরভ আর আদি ছাড়াও মহামতি ফিরোজের দলে আছে আরও পঞ্চাশজন লোক। এদের দায়িত্ব ভাগ করা। প্রতি চারটা বসতি থেকে লোক আনা নেয়ার কাজ করে দু’জনের দলে ভাগ হওয়া প্রতিটি ইউনিট।

সত্তর নং বসতিতে কাজ শেষ সৌরভ ও আদির। তাদের কর্মদক্ষতার সাক্ষ্য দিচ্ছে সময়সীমা। নির্ধারিত দিনের একদিন আগেই এসে উপস্থিত হয়েছে দু’জন। ক্লান্তি প্রায় ভেঙে পড়তে চাইছে দেখে, বসতির মুরব্বীরা ওদেরকে একদিন বিশ্রাম নেবার অনুরোধ করেছিল। তাই গত রাত কেটেছে ভোজ আর আনন্দে।

আমাদের জন্য ওরা এতো কিছু করে, আর আমরা ওদেরকে কিছু দেব না—এই ভেবে ক’জন তরুণী গিয়েছিল দুই কর্মকর্তার মনোরঞ্জনের জন্য। কিন্তু না, কর্মকর্তারা তাদের দিকে ফিরেও চায়নি। খুশিই হয়েছে সবাই, ভরে উঠেছিল বুকটা মহামতি-মহানায়ক ফিরোজ আর তার দলের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে।

তবে হ্যাঁ, একেবারে ছেড়ে দেয়া হয়নি সৌরভ ও আদিকে। পৃথিবীর গল্প, ফিরোজের গল্প আর বিশেষ করে চাঁদের গল্প শোনাতে হয়েছে ওদের। সেই গল্পের মাঝে নতুন করে বাঁচার উপকরণ খুঁজে নিয়েছে সবাই।

পৃথিবী ধীরে ধীরে আবারও হতে শুরু করেছে বাসযোগ্য। মহামতি ফিরোজের নেতৃত্বে নতুন নতুন বাসযোগ্য এলাকা খুঁজে বের করছে ওরা। তবে বাসযোগ্য হলেই তো আর বসতি গড়া যায় না। বর্তমান দুনিয়াতে প্রতিটা বসতিই যেন একেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ নগর রাষ্ট্র! পানি, খাবার ইত্যাদির ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করে নিয়েছে। এই তো, সত্তর নম্বার বসতির লাগোয়া মাটিতেই চাষ হয় ফসলের। তৃষ্ণা মেটায় কয়েকটা কূপ। প্রতিটা বসতিতেই এই সংখ্যাটা এক।

তাই আরও অনেকগুলো এলাকা বাসযোগ্য হলেও, ঠিক আবাস যোগ্য হয়ে ওঠেনি। হয় পানির ব্যবস্থা নেই, নয়তো নেই ফসলি জমিন।

তবে চিন্তা কী, সামনে বসে তন্ময় হয়ে সবুজ পৃথিবীর গল্প শুনতে থাকা লোকগুলোকে আশ্বাস দিল সৌরভ। কিছু সময় বেশি লাগলেও, মহামতি ফিরোজ একটা না একটা উপায় ঠিকই বের করবেন।

মাথা নাড়ল বসতির মুরুব্বীরা।

ঠিকই তো, মহামতি ফিরোজ কোনওদিন আশাহত করেছেন?

করেননি!

দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে যেসব দ্রব্যের প্রয়োজন, তার বাইরেও সব কিছুই জোগাড় করে দিয়েছেন তিনি। গতবার যখন সবার ঠাণ্ডা-কাশি হলো, ওষুধ পাঠিয়ে দেননি গাড়ি ভরে?

দিয়েছেন।

তাই ওসব জমিতেও বসতি স্থাপন করবেন নিঃসন্দেহে।

এরপর সৌরভকে ছেড়ে, আদির দিকে মন দিয়েছিল সবাই। চাঁদের গল্প শুনতে চায়।

আসলে চাঁদের বসতিটা গড়া হয়েছিল অনেক আগে!

অনেক বলতে অ... নে... ক...

সেই প্রলয়ের আগেই।

কিন্তু পরে ওখানে যাওয়ার কোনও উপায় কারও জানা ছিল না। মাত্র বছর দশেক আগে, অনেক খুঁজে একটা কর্মক্ষম মহাকাশযান পেয়ে গিয়েছিলেন মনুষ্য সমাজের আরেক ত্রাতা, বিজ্ঞানী উমা। সেই মহাকাশযান কীভাবে চালাতে হবে, সেই জ্ঞানটাও বের করতে পেরেছিলেন। তবে ছোট আকারের যান হওয়ায়, একেক বারে পাঁচশ’র বেশি মানুষ আঁটে না ওতে।

নতুন এই আবিষ্কারের কথা শুনে, আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল সবাই। মানব সভ্যতার ইতিহাস এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে ছিল তখন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও, প্রতিটা বসতি থেকে পাতালে ফিরে যাবার রব উঠেছিল। চাঁদের বসতি আর ভবিষ্যতে আরও মহাকাশ যান নির্মাণের কথা শুনে, শান্ত হয়েছিল সবাই।

কিন্তু আফসোস, বিজ্ঞানী উমা কেন জানি আত্মহত্যা করে বসলেন!

আগে থেকে কেউ টের পায়নি, তা বলা যাবে না। মুখ ভার করে থাকতেন, কথা বলতেন কম। উচ্ছ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল যেন জীবন থেকে। বিশ্বের প্রতিটা মানুষ অবশ্য দুঃখজনক ঘটনাটার জন্য নিজেকেই দায়ী বলে মনে করে। সবার ধারণা, এক কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হওয়ার চাপটা সামলাতে পারেননি মহিলা। মানসিক চাপের সামনে মাথা নত করেন। একদিন বসতি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন বাইরে। তেজস্ক্রিয়তার হাতে সঁপে দেন নিজেকে। লাশটাও পাওয়া যায়নি। তাই এক হিসেবে, বিশ্বের এক কোটি মানুষের প্রত্যেককেই দায়ী বিজ্ঞানীর মৃত্যুর জন্য।

ওসব দুঃখের স্মৃতি আজ মনে করতে চাইল না সত্তর নম্বর বসতির অধিবাসীরা। আজ আনন্দ করবে, নতুন স্বপ্নের হাতে নিজেদেরকে সঁপে দিতে।

চাঁদের স্বপ্ন!

সুখী এক জীবনের স্বপ্ন!

আদি বেচারা এতগুলো স্বপ্নালু চোখের অনুরোধ পায়ে ঠেলতে পারল না। বলব না, নিষেধ আছে করতেই করতেই বলা শুরু করে দিল:

‘মহানায়ক ফিরোজ নতুন একজন বিজ্ঞানীকে দলে নিয়েছেন, এ কথা অনেক আগের। আপনারা সবাই তা জানেন। কিন্তু যেটা জানেন না, তা হলো তিনি নতুন একজন বিজ্ঞানীকে চাঁদেও পাঠিয়েছেন! বিজ্ঞানী প্রীতম চাঁদে গিয়ে দারুণ কাজ দেখিয়েছেন! তিনি যাবার পর থেকে, উল্লেখযোগ্য গতিতে বেড়ে চলছে চন্দ্র-বসতির আকার। এখন মাসে পাঁচশ’জন করে অধিবাসী বাড়লেও সে চাপ সহ্য করতে পারবে ওরা! কিন্তু মহামতি চাইছেন, চন্দ্রবসতির উপর বেশি চাপ না দিতে।

‘আরেকটা সুখবর দিয়ে রাখি আপনাদের, নব উদ্যমে শুরু হয়েছে নতুন মহাকাশযান নির্মাণের কাজ। বিজ্ঞানী উমা আমাদেরকে ছেড়ে যাবার পর...’ বিষাদ নেমে এলো সবার মুখে। ‘...তাঁর সহকারীকে সামনে রেখে কাজ করছিলাম আমরা। কিন্তু তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি এত দিন। এই তো মাস ছয়েক আগে আমরা খুঁজে পেয়েছি বিজ্ঞানী উমার একটা ডায়রি। ওখানে রেখে গিয়েছেন তিনি নতুন নতুন অনেক তথ্য আর নির্দেশনা। সেসব অনুসরণ করেই নতুন মহাকাশযান বানানো হচ্ছে চাঁদে। খুব শীঘ্রই আমরা হয়তো মঙ্গলে পাড়ি জমাতে পারব। হয়তো আমাদের জীবদ্দশায় হবে না। কিন্তু এই বিচ্ছুগুলো...’ বলতে বলতে সামনে বসে থাকা এক বাচ্চাকে কোলে তুলে নিল আদি। ‘...একদিন হয়তো মঙ্গলে বাসা বাঁধবে। সংসার করবে। মঙ্গলকে বানাবে নতুন পৃথিবী!’

চাঁদের আফিমে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষরা সেদিন রাতটা মরে যাবার ভয়ে নয়, বরঞ্চ নাতি-পুতির সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে কাটাল!

দুই

পরের দিন শুরু হলো দারুণভাবে। অনেক দিন পর, তেজস্ক্রিয় মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন সুয্যি মামা! মৃদু মন্দ বাতাস আর নির্মল সকাল, সুখী হতে এর চাইতে খুব বেশি কিছু দরকার আছে? সবার কাছে না হলেও, অন্তত এই সত্তর নম্বর বসতির অধিবাসীদের কাছে নেই! তার উপর গত রাত্রির ভোজ আর চাঁদের নতুন গল্পের প্রভাব তো আছেই!

সপ্তাহে এক দিন গোসল করে সবাই, উৎসবের আবহে সেটাকে এই একবারের জন্য দু’দিনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।

তা ছাড়া, দুপুরে শুরু হবে দারুণ লটারি। তার আগেই কাজ সেরে নিতে হবে সব। আনন্দঘন দিন হলেও, কাজে ফাঁকি দেবে না কেউ।

দশ বছর ধরে চলে আসছে লটারির এই প্রথা। বসতির দশ হাজার জনের সবার নামে তো আর লটারি করা সম্ভব না, তাই ভাগে-ভাগে করতে হচ্ছে। প্রতিটা বসতি আবার একশ’টা পাড়ায় বিভক্ত। প্রতিটা পাড়ায় থাকে সমান সংখ্যক মানুষ। পরিবারের সদস্য বেশি হলে অবশ্য একসঙ্গেই তাদেরকে থাকার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু মোটামুটিভাবে, প্রতিটা পাড়াতেই প্রায় সমান মানুষের বাস।

প্রথমে এই একশ’টা পাড়ার মধ্যে হয় নির্বাচন। এই নির্বাচন আবার সবার সামনে হয় না। পাড়ার প্রধানদেরকে সামনে নিয়ে, মহামতি ফিরোজের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন কে কী করবে। এরপরের ধাপে আমলে নেয়া হয় সেই নির্বাচিত পাড়ার প্রতিটা পরিবারকে। পরিবার প্রধানের নাম লিখে, সেটা ফেলে দেয়া হয় একটা বাক্সে। মহানায়ক ফিরোজের প্রতিনিধি তারপর টেনে নেয় একটা কাগজ।

এরপরের নির্বাচনে আর হাত থাকে না তার। কেউ কেউ প্রথম-প্রথম বলতো, কে চাঁদে যাবার যোগ্য, তা নির্ধারণ করার জন্য ফিরোজ কে? আর তাঁর নিযুক্ত প্রতিনিধি যে দুই নম্বুরি করবে না, তা-ই বা বলবে কে? হয়তো প্রতিনিধি যুবক, আর নির্বাচিত পরিবারে এক অনিন্দ্য সুন্দরী আছে! সেক্ষেত্রে কি মেয়েটা বাড়তি সুবিধা পাবে না?

কিন্তু মহামতি ফিরোজ এই বিশেষ নির্বাচন পদ্ধতি খুলে বলার পর, বিরুদ্ধচারী হবার কোনও সুযোগ রইল না! কেননা শেষ নির্বাচনটা করবে পরিবারের সদস্যরা। নিজেকে বাদে, অন্য কারও নাম লিখে বাক্সে ফেলবে তারা। যদি এতেও বিজয়ী নির্ধারিত না হয়, তাহলে শেষ ভোটটা দেবে পাড়ার প্রধান! যে প্রধানকে বসতির জনগণরাই নির্বাচিত করে।

যাই হোক, তাই আজ সকাল-সকাল কাজ সেরে ফিরতে চাই সবাই দুপুরের আগে।

প্রথম ধাপের নির্বাচন শেষ হতে বেশিক্ষণ লাগবে না।

সবাই চায়, দিনে-দিনে লটারির কাজটা শেষ করে ফেলতে। মহামতি ফিরোজের প্রতিনিধি আসার আগেই, পাড়ার সব পরিবারের নাম লেখা ভোট যেন বাক্সে থাকে।

দিনটা বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য বেশি আনন্দের। খেলাধুলার সুযোগ তারা পায় না বললেই চলে। যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ, প্রবাদটা সম্পর্কে না জানলেও, নিজেদেরকে সেভাবেই প্রস্তুত করে নিচ্ছে মানুষ। তাই আরও বিষণ্ণ কোনও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে যেতে চায় সন্তানদের।

ফলাফল একটু অমানবিক। রাত-দিন কেবল পড়া আর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিয়েই ব্যস্ত থাকে বাচ্চারা। গড় আয়ু চল্লিশে নেমে এসেছে বলে, পনেরো বছর বয়সেই প্রত্যেককে সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বনে যেতে হয়! ছুটি বলতে তাই মাত্র মাসে একদিন।

আজকের দিনটায় তাই ছুটোছুটিতে ব্যস্ত বাচ্চারা। এই পাড়া থেকে ওই পাড়ায় যাচ্ছে অবাধে। নতুন পোশাকে দেবশিশু বলে মনে হচ্ছে তাদেরকে। অবশ্য দেবশিশুদের মাঝে বাস্তবতার ছোঁয়া নেই। দুষ্টামি করছে, কিন্তু মাত্রায় থেকে। হাসছে, খেলছে, কিন্তু সীমা ছাড়াচ্ছে না।

হঠাৎ খবর শোনা গেল, মহামতি ফিরোজের প্রতিনিধি, সৌভাগ্যবান পাড়া হিসেবে বেছে নিয়েছে সাঁইত্রিশ নম্বর পাড়াকে !

অন্য পাড়ার অধিবাসীদের মন খারাপ হয়নি, তা না। সবাই আগ্রহ নিয়ে সাঁইত্রিশ নম্বর পাড়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

এরপরের ধাপটা শেষ হয়ে গেল দ্রুত। পাড়াটা যেহেতু আদি বেছে নিয়েছে, তাই পরিবার বেছে নেয়ার ভার পড়ল সৌরভের কাঁধে। সালেহা বেগমের পরিবার বেছে নিল ও। অবশ্যই লটারিতে!

সালেহা বেগম বয়স্কা মানুষ, কিন্তু প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজের মত নয় এই সমাজ। তাই সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যই পরিবারের প্রধান।

আধঘণ্টা সময় দেয়া হলো তাদেরকে, কে চাঁদে যাবে সে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য।

 

সালেহা বেগমের পরিবারের সদস্য পাঁচ জন। তিনি নিজে, তাঁর দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রী। সন্তান হয়নি কোনও ছেলের ঘরে। স্বামী অনেক আগেই গত হয়েছেন। সালেহা বেগমের বয়স মাত্র পঁয়তাল্লিশ হলেও, পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে চুল। শক্ত-সমর্থ মহিলা যৌবনে বসতির মানুষের পোশাক তৈরি করতেন। এখনও তাই করেন।

‘আমার মনে হয়, ছোট বউয়ের চাঁদে যাওয়া উচিত।’ পরিবারের সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসেছেন তিনি। আধঘণ্টার মাঝে ঐক্যমত্যে পৌছাতে না পারলে, নির্বাচন করে দেবে ফিরোজের লোক।

ছোট বউয়ের নাম প্রস্তাব করার কারণ আছে, মেয়েটা প্রায়শই অসুস্থ থাকে। সকাল-সন্ধ্যা জ্বর আর খুশখুশে কাশি তার নিত্য সঙ্গী। বছর চারেক আগে বিয়ে হয়েছে মেয়েটার। কিন্তু এখনও সন্তান হয়নি। এক হিসেবে না হওয়াটাই ভালো হয়েছে। হলে হয়তো সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে মারাই যেত বেচারি!

সালেহা বেগমের ছোট বউকে চাঁদে পাঠাতে চাওয়ার আরও একটা কারণ আছে, ছেলেকে আবার বিয়ে দিতে চান। যদি নাতির মুখ দেখা যায়!

‘আমি বলি কী,’ বড় বউ বলে উঠল। ‘আম্মাই চাঁদে যান না কেন? এমনিতেও তাঁর বয়স হয়েছে। আজীবন কষ্ট করেছেন। এতটুকু তো তাঁর প্রাপ্য!’

হাসলেন সালেহা। ‘আরে বউ মা যে কী বলো না! আমি চলে গেলে, বসতির পোশাক নির্মাণের ব্যাপারটা দেখবে কে? গাছের পাতা পরে দিন কাটাতে চাও নাকি!’

‘অসুবিধা হবে না মা!’ এবার ছোট ছেলে বলল। ‘ভাবী তো অনেকদিন ধরেই তোমার সাথে আছেন। তিনিই চালিয়ে নিতে পারবেন।’

মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল বড় ছেলে এবং ছোট বউ।

সালেহা বেগম বুঝতে পারলেন, এরা আগে থেকেই আলোচনা করেছে।

‘এই তাহলে ব্যাপার না? বুড়ো হয়েছি বলে তাড়িয়ে দিতে চাও?’ কপট রাগে বললেন তিনি। মনটা ভরে গেছে প্রশান্তিতে। তাকে নিয়ে তাহলে ছেলে-ছেলের বউরা ভাবে! সংস্কারের প্রশংসা করতে হয়!

তাঁর অবশ্য যেতে খুব একটা আপত্তি নেই। বড় বউ যথেষ্ট দক্ষ। মেয়েটা স্বভাবেও ভালো, কোনওদিন অনুযোগ করার সুযোগ দেয়নি। তাঁর অবর্তমানেও খুব একটা সমস্যা হবে না।

ছোট বউ বলল, ‘মা, এভাবে বলবেন না! আমরা তো আজীবন আপনার ছায়ায় থাকতে চাই। কিন্তু, মা, নিজের দিকটাও একটু ভেবে দেখুন। আমাদের মাঝে যে-কেউ গেলেই ভেঙ্গে যাবে জোড়া। এদিক দিয়ে চিন্তা করলেও কিন্তু বসতির ভালর জন্য আপনার যাওয়া উচিত!’

‘ঠিক আছে, তোমরা যদি তাই চাও...’

তিন

সকাল থেকেই বিষাদে ভরে আছে সালেহা বেগমের বাড়ির পরিবেশ। মুখ ভার করে আছে দুই ছেলে ও ছেলের বউ। মুখ ভার সালেহার নিজেরও। শেষ মুহূর্তে মনে পড়ছে নানা স্মৃতি। বড় ছেলেটার জন্ম, ছোট ছেলেটার গুটি-গুটি পায়ে হাঁটা... এমন কী ছোট বউ-মা’র অসুস্থতাকে ছেড়ে যেতেও মন চাইছে না। মানবজন্মের এই এক সমস্যা, মায়ার বাঁধন আটকে ফেলে মনকে। মানবেতর জীবন-যাপনের সময়, এই বৈশিষ্ট্যটা যন্ত্রণা দেয় বেশি।

ভোর হয়েছে কেবল, সৌরভ আর আদি গাড়ি নিয়ে পাড়ার ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। এই গাড়িতে করেই কমাণ্ড সেন্ট্রালে যেতে হবে। গত রাতেই সৌরভ এসে সব বুঝিয়ে দিয়েছে সালেহাকে।

এখান থেকে বেরিয়েই পড়বে তেজস্ক্রিয় এলাকা। সেই এলাকায় যেন কোনও ক্ষতি না হয়, সেজন্য পরতে হবে বিশেষভাবে বানানো সুট। নতুন কারও পক্ষে ওটা পরা একটু কঠিনই। তাই আগে থেকেই প্র্যাকটিস করিয়ে রেখেছে। আসলে, গাড়িতে চড়ার আগেই সুটটা পরে নিতে হবে সালেহা বেগমকে।

সে কাজটাই করছিলেন এতক্ষণ তিনি। সুট পরা শেষে, বাইরে বেরিয়ে এলেন। ছোট বাচ্চার মতো তাকে থপথপ করে হাটতে দেখে, হেসে ফেলল সবাই। তবে কিছু মনে করলেন না রাশভারী মহিলা। এরকম মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। যা ভারী সুট!

বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন তিনি। যতক্ষণ দেখা গেল, চেয়ে রইলেন ছেলে ও ছেলেবউদের দিকে। আর কোনওদিন দেখা হয় কি না, কে জানে!

ভদ্রমহিলার মনের অবস্থা টের পেল মহামতি ফিরোজের দুই কর্মকর্তা। এরকম দৃশ্য প্রতি মাসেই দেখতে হয় তাদেরকে। সালেহা বেগমের মন ভোলানোর জন্য তাই চাঁদের নানা গপ্প জুড়ে দিল তারা।

শুনতে-শুনতে মন ভালো হয়ে গেল সালেহা বেগমের।

বিরান পৃথিবীর বুকে যার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে, চাঁদের সবুজ খেতের কথা শুনে তার মন ভরবে না কেন?

চাঁদের সমৃদ্ধ জীবনের কথা, দুনিয়ার দুঃখকে ভুলিয়ে দেবে না, তো কী দেবে?

আচমকা একটা লাল নিশানা দেখা গেল রাস্তায়। সৌরভ বলল, ‘হেলমেট পরে নিতে হবে। এখান থেকে তেজস্ক্রিয়তা অনেক বেশি।’ হাতের পাশের হেলমেটের দিকে সালেহা বেগম হাত বাড়াতেই, হা-হা করে উঠল সে। ‘ওটা না, ওটা আদি ভাইয়ের। আপনারটা আলাদা। ওজন আর বয়সের ভিত্তিতে অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা করা আছে হেলমেটে। একজনেরটা আরেকজনের পরা ঠিক হবে না। ওই যে আপনারটা।’

সৌরভের দেখানো হেলমেটটা পরে নিলেন মহিলা। তাঁরও কেমন যেন লাগছিল, মনে হচ্ছিল অক্সিজেনের পরিমাণ কমে এসেছে বাতাসে।

হেলমেট পরে বুকভরা শ্বাস টানলেন তিনি। আরামে বুজে আসছে চোখ। তাতে ক্ষতি কী? কাজ তো নেই কোনও। এখনই দৌড়ে ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে না, অথবা দরকার নেই বার-বার ছোট বউয়ের ওষুধ খাবার সময় হলো কি না, তা দেখতে যাবার!

শরীরকে সবসময় কঠিন শাসনে রেখেছেন। আজ শরীরের দাবি মেনে নিলেন। মনকে চাঁদের স্বপ্ন দেখার আদেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন সালেহা বেগম।

চার

‘শেষ?’ সামনের সিট থেকে জানতে চাইল আদি।

‘হু।’

‘সেণ্ট্রাল কমাণ্ডে জানিয়ে দে।’

‘দিই।’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সৌরভ। প্রতি মাসেই এই কাজটা করতে হয় ওদেরকে। বসতি থেকে একজন বা দুইজনকে নিয়ে আসা। রাস্তার মাঝখানে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তাদের মরদেহ! চাঁদ-ফাঁদের গল্প সব ধাপ্পাবাজি। মহামতি ফিরোজের আদেশ অমান্য করে যখন সবাই পাতালে ফিরে যেতে চাইছিল, তখন প্রয়োজনের খাতিরেই বিজ্ঞানী উমাকে ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেয়া হয় চাঁদের গল্প।

বিজ্ঞানী উমা সবার সাথে করা এ ধোঁকাবাজির চাপ বেশি দিন নিতে না পেরে আত্মহত্যা করেন।

তবে মহামতি ফিরোজ এ কারণেই মহামতি, প্রয়োজনের সময় কড়া সিদ্ধান্ত নিতে জানেন তিনি। তাই বন্ধ করেননি প্রচারণা। পরে যখন দেখা গেল, বসতিতে নতুন প্রাণ বাড়তি চাপের সৃষ্টি করছে, সেই চাপ কমাবার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

ফলশ্রুতিতে এই লটারির নাটক।

অন্তত মরতে কষ্ট পেতে হয়নি সালেহা বেগমকে। কার্বন-মনো-অক্সাইড তার কাজ নিঃশব্দেই সেরে ফেলেছে।

সেণ্ট্রাল কমাণ্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হচ্ছে।

একটু পরেই দেখা যাবে মহান ফিরোজের চেহারা।

সৌরভ ও আদি জানে, অচিরেই আরেকটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে ওদেকে।

একটা বাচ্চা জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে, দু’জন করে প্রাপ্তবয়স্ককে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে চাঁদে, কেননা পৃথিবী যে প্রাণ রক্ষায় একেবারেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে!


দ্য সিক্রেট নাম্বার - মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ

ড. সাইমন টমলিনের পূর্ণ মনোযোগ সামনে বসা লোকটার দিকে। ক্রমাগত সামনে-পেছনে দুলে চলছেন তিনি, কাঁধ দুটো ঝুঁকে আছে। চোখের দৃষ্টি স্থির নেই, এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছে কেবল। কয়েক সেকেন্ড পরপর কেঁপে উঠছে উপরের ঠোঁট। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়ে যে এই লোকই কিছুদিন আগে বিশ্বসেরা গণিতজ্ঞদের একজন ছিলেন।

‘আজ কেমন আছে, প্রফেসর আর্শাইম?’ জানতে চাইলেন ড. টমলিন।

‘ভালো, ভালো। আপনাকে ধন্যবাদ জিজ্ঞাসা করার জন্য। বেশ ভালো আছি।’ ওর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলেন প্রফেসর।

‘ঘুম ভালো হয়েছে?’

‘হ্যাঁ। আজকাল ভালোই হয়, দুধের বাচ্চার মতো ঘুমাই।’ জবাব দিলেন আর্শাইম, এখনও দুলে চলছেন; এখনও তাকাননি ডাক্তারের দিকে।

‘শুনে খুশি হলাম।’

আর্শাইম আচমকা দুলুনি বন্ধ করে, সরাসরি টমলিনের চোখের দিকে তাকালেন। ‘এই ভালোমানুষির নাটক বন্ধ করুন তো, ডাক্তার।’ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন তিনি। ‘আপনি যে আমাকে পাগল ভাবেন, তা আমি জানি না মনে করেছেন? সবাই কিন্তু লাযলো ব্লিমকেও তাই মনে করত। ওরা সেটাই চায়!’ সরাসরি টমলিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি, অপলক চোখে।

‘এসব কী বলছেন, প্রফেসর? কে আপনাকে পাগল প্রমাণ করতে চায়?’

‘সংখ্যাগুলো, ডাক্তার, সংখ্যাগুলো। মানুষ বলে, অঙ্ক নাকি কখনও মিথ্যা বলে না। ভুল কথা। মিথ্যা বলে, হরহামেশাই বলে... বলে অহরহ। কিন্তু আমার সাথে মিথ্যা বলে পার পায় না। আমি ওদের প্রতারণা পরিষ্কার ধরতে পারি। ওরা কী লুকোচ্ছে, সেটাও টের পাই।’ বললেন আর্শাইম, আবার দুলতে শুরু করেছেন।

‘কী লুকোচ্ছে, প্রফেসর?’

‘ব্লিম, আর কী? ব্লিমকে লুকোচ্ছে!’ চিৎকার করে উঠলেন আর্শাইম। ডেস্কের উপর দুম করে ঘুষি মেরে বসলেন তিনি। তারপর টমলিনের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, ‘তিন আর চারের ভেতরে লুকিয়ে আছে ওই পূর্ণ সংখ্যা।’

‘এ নিয়ে আমরা আগেও কথা বলেছি, প্রফেসর। তিন এবং চারের মাঝে কোন পূর্ণসংখ্যা নেই।’

‘সেটা লাযলো ব্লিমকে বলুন, ডাক্তার।’ বললেন আর্শাইম। ‘কিন্তু পারবেন না,’ যোগ করলেন তিনি। ‘কেননা তিনি মারা গিয়েছেন।’ কণ্ঠ খাটো হয়ে এল তার, ‘ব্লিমকে যেন সবার সামনে আনতে না পারেন, সেইজন্য খুন করা হয়েছে তাকে।’

‘লাযলো ব্লিমের মৃত্যু হয়েছে গাড়ি দুর্ঘটনায়, প্রফেসর।’

‘মাথা খাটান তো! এক থেকে বিশের মাঝে কোন অজানা পূর্ণসংখ্যা আছে—এই বিষয়ে একটা প্রতিবেদন লিখলেন তিনি; জানালেন যে অচিরেই সেটাকে আমাদের সামনে প্রমাণসহ তুলে ধরবেন! আর তার মাত্র এক সপ্তাহের মাথা... পুফ! দুর্ঘটনায় মারা গেলেন তিনি! শুধু তাই না, তার বাড়ি আগুনে পুড়ে গেল; ফলে হাতে লেখা কোন নোট আর অবশিষ্ট রইল না। পরের দিনই, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সিস্টেম ক্রাশ করে ইলেকট্রনিক নোটগুলোও ধ্বংস হয়ে গেল! ব্লিম আসলে একটু বেশিই কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তাই সরে যেতে হলো তাকে। আমার কথা যদি আপনি শোনেন, তাহলে আমাকেও সরে যেতে হবে!’

মন দিয়েই কথা শুনছিলেন টমলিন, এবার ঠিক করলেন—তুরুপের তাসটা খেলবেন।

‘ঠিক আছে, প্রফেসর। ধরে নিই, আপনার কথা সত্যি। আসলেই তিন এবং চারের মাঝে একটা পূর্ণসংখ্যা আছে। ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যাকে তো আমরা গুণতে পারি। তাই না?’

‘ঠিক বলেছেন, ডাক্তার সাহেব।’ মাথা ঝাঁকালেন আর্শাইম। তারপর যেন সেটা প্রমাণের জন্যই গুণতে শুরু করলেন, ‘এক, দুই, তিন, ব্লিম, চার...’

‘আর দরকার নেই, প্রফেসর।’ বাধা দিলেন টমলিন। ‘যদি ব্লিম আসলেই গণন যোগ্য সংখ্যা হয়, তারমানে ব্লিম সংখ্যক কিছু একটা গুণে আলাদা করা যাবে, তাই না?’

‘অবশ্যই,’ বললেন আর্শাইম। ‘আমার জানা ছিল না যে আপনিও একজন গণিতজ্ঞ, ডাক্তার সাহেব।’

‘আমার কথা শুনুন, প্রফেসর।’ বলে পকেট থেকে একটা ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগ বের করে আনলেন তিনি।

‘ওটা কী?’

‘জেলি বিন,’ হাসতে হাসতে জবাব দিলেন টমলিন। তারপর ব্যাগ ছিঁড়ে ভেতরের সবগুলো বিন ফেলে দিলেন ডেস্কের ওপর। প্রায় দুই ডজন নানা রঙের বিনে ভর্তি হয়ে গেল টেবিল।

‘এবার, প্রফেসর আর্শাইম, ব্লিম সংখ্যক জেলি বিন গুণে আলাদা করুন তো।’ আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল ডাক্তারের চেহারায়।

‘ঠিক আছে,’ বললেন আর্শাইম। হাত বাড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিলেন তিনটা বিন। ওগুলোর দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি, তারপর আবার তাকালেন জড়ো হয়ে থাকা বিনগুলোর দিকে। নিজের তিনটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে, আরেকটা বিন টেনে এনে রাখলেন ওগুলোর পাশে। এক মুহূর্ত চারটা বিনের উপর স্থির হলো তার দৃষ্টি। তারপর চতুর্থটা ঠেলে দিলেন টমলিনের দিকে। কিন্তু অর্ধেকটা পথ যাবার আগেই, আবার সেটাকে নিজের তিনটার সাথে লাগালেন।

অস্থির হয়ে উঠছেন প্রফেসর। চারটাকেই তুলে চোখের সামনে ধরলেন একবার, এদিক-ওদিকে করলেন কিছুক্ষণ। অবিশ্বাসের দৃষ্টি তার চোখে। সবগুলো পরখ করা শেষে হেলান দিলেন নিজের চেয়ারে, চোখে-মুখে তার তীব্র হতাশা।

‘পারব না, ডাক্তার।’ বললেন তিনি।

‘ব্লিম তাহলে পূর্ণসংখ্যা না।’ বিজয়ের সুর টমলিনের কণ্ঠে।

‘না!’ ক্ষেপে উঠে হাতের ধাক্কায় ভেঙে ফেললেন বিনের স্তূপ। ‘ব্লিম আছে! কিন্তু কিছু একটা আমাকে গুণতে দিচ্ছে না। আমি তিনটা বা চারটা বিন নিতে পারছি। কিন্তু ব্লিম সংখ্যক না!’

‘শান্ত হন, প্রফেসর। আমি এখানেই ছিলাম, আপনার প্রতিটা কাজ দেখেছি। কিছুই আপনাকে বাধা দিচ্ছিল না। আপনি ব্লিম সংখ্যক বিন গুণতে পারেননি, কারণ ব্লিমের কোন অস্তিত্ব নেই!’

‘আছে! নিশ্চয়ই আছে।’ স্তিমিত কণ্ঠে বললেন আর্শাইম। পরক্ষণেই জোরাল স্বরে যোগ করলেন। ‘আমি প্রমাণও করতে পারব।’

‘কীভাবে করবেন, প্রফেসর? আপনিই না বললেন, কোন এক সর্বময় ক্ষমতা আপনাকে প্রতি পদে বাধা দিচ্ছে? ব্লিমকে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছে?’

‘মনে রাখবেন, ডাক্তার।’ বললেন আর্শাইম, কণ্ঠে ষড়যন্ত্রের সুর। ‘আমি এখন গণিতজ্ঞ, এবং বেশ ভালো মানের একজন। সব ধরনের গণিতকে এমনভাবে বানানো হয়েছে যেন তা ব্লিমের অস্তিত্বকে লুকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু একেবারে নিখুঁতভাবে সেই কাজটা সারা হয়নি। বছর বিশেক আগে, গণিতের এক শাখা আমি আবিষ্কার করেছিলাম—অদ্ভুত এক সংখ্যা-তত্ত্ব আমার ধারণা, ওটার কিছু নীতি ব্যবহার করে আমি প্রমাণ করতে পারব যে তিন এবং চারের মাঝে কোন একটা পূর্ণসংখ্যা আছে। নইলে গণিতের কোন ভিত্তিই থাকে না! আমার লেকচারের বিষয়ও ছিল সেটাই। কিন্তু আমার কিছু সহকর্মী বেয়াদবের মতো বাগড়া দেয়ায়, আমি মেজাজ খুইয়ে বসি।’

তা খুইয়েছেন বটে, ভাবলেন টমলিন। যে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছেন তা ঠিক করতে দুই সপ্তাহ লেগেছে।

‘আপনার ওই সহকর্মীরা কিন্তু এই তত্ত্ব মেনে নেননি, প্রফেসর।’ বললেন টমলিন।

‘কারণ, আমি এখনও সেই প্রমাণটা একেবারে খুঁত-হীন করতে পারিনি।’ জবাব দিলেন আর্শাইম। ‘অবশ্য করলেও লাভ হতো না। ওই অজ্ঞ, অসভ্যরা আমার গবেষণার কিছু বুঝলে তো!’ রাগতস্বরে যোগ করলেন। ‘তবে আমি কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছি, ডাক্তার সাহেব। অনুভব করতে পারছি সেটা। আমাকে আমার গবেষণায় ফিরে যেতে দিন, কয়েক মাসের বেশি লাগবে না। নইলে আমাকে অন্তত কিছু কাগজ আর কলম দিন, তাহলেই হবে! এখানেই কাজ করব।’

আর্শাইম যে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, তা টের পেলেন টমলিন। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে আজকের মতো যথেষ্ট হয়েছে।

‘ঠিক আছে, প্রফেসর।’ বললেন তিনি। ‘আপনার কথাগুলো ভেবে দেখব। তবে আরেকটা প্রশ্নের জবাব দিন।’

‘কী?’

‘একটা পূর্ণসংখ্যাকে গোপন করে কার কী লাভ?’

‘আমি ঠিক জানি না।’ মাথা নেড়ে জবাব দিলেন আর্শাইম। ‘হয়তো ব্লিমের জাদুময় কিছু বৈশিষ্ট্য আছে—আমার দিকে ওভাবে তাকাবেন না, ডাক্তার। অন্তত যারা লুকিয়ে রাখছে, তারা হয়তো সেটাই বিশ্বাস করে।’ এক মুহূর্ত নীরবতার পর উজ্জ্বল হয়ে উঠল আর্শাইমের চেহারা। ‘অথবা... অথবা... ব্লিমের জ্ঞান হয়তো আমাদেরকে নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। হয়তো সময়-পরিভ্রমণ, আলোর চাইতে দ্রুত গতিতে চলা—এসবের জ্ঞান লাভ করতে পারব আমরা!’

‘বুঝলাম।’ বললেন টমলিন। ‘আপনার বিশ্বাস, ব্লিম আবিষ্কার করলে, এসব বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব হবে?’

‘তা জানি না, কিন্তু হতেও তো পারে।’ যোগ করলেন আর্শাইম।

‘বুঝতে পেরেছি আপনার কথা,’ বললেন টমলিন। ‘যাক, প্রফেসর। আপনার সাথে এসব আলোচনা করে ভালো লাগল। ভাবনার অনেক খোরাক পেয়েছি। কয়েকদিন পর আবার আলোচনা হবে।’

করমর্দন করে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর্শাইম। টমলিন চুপচাপ বসে রইলেন কিছুক্ষণ, মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা বিনের দিকে তার নজর।

কী দুঃখের কথা, ভাবলেন তিনি। যে লোকটা নিজের সারা জীবন সংখ্যার জ্ঞানার্জনে কাটিয়ে দিল, সেই সংখ্যাকেই আজ সে শত্রু ভাবছে! অবশ্য তেমনটাই হবার কথা। যেটা নিয়ে পাগল গণিতজ্ঞ, প্যারানয়াটা তো সেটাকে ঘিরেই তৈরি হবে।

টমলিন কিন্তু বিকালের এই সেশন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। ভেবেছিলেন, জেলি বিন ব্যবহার করে প্রফেসরকে তার চিন্তার অবাস্তবতা ধরিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ফল হলো উল্টো, আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন আর্শাইম। তবে একটা প্রতিক্রিয়া তো পাওয়া গেল। আর্শাইমের ভ্রমের কোন স্পর্শকাতর জায়গায় খোঁচা লেগেছে বলে মনে হচ্ছে।

অগ্রগতি কিছু হয়েছে ভেবে, বাড়ি ফিরলেন টমলিন। তবে হাসপাতাল ছাড়ার আগে আর্দালিদের জানালেন, আর্শাইমকে যেন কোন ভাবেই লেখালেখি করার কোন উপকরণ দেয়া না হয়।

 

সেরাতে ঘুমাতে কষ্ট হলো ডাক্তার সাহেবের। চোখ বন্ধ করা মাত্র দেখতে পেলেন, দানবাকার একদল সংখ্যা তাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা অবয়ব—ব্লিম। বিরক্ত হয়ে বিছানার পাশে রাখা একটা নোটপ্যাড তুলে নিলেন তিনি। এক থেকে দশ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো লিখতে শুরু করলেন। দেখে তো নিরাপদ বলেই মনে হয়, ভাবলেন তিনি। কাগজের উপর কয়েকটা দাগ মাত্র। অথচ বিজ্ঞানে এবং সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে এই সংখ্যাগুলোর উপরেই। প্যাডের দিকে তাকালেন তিনি। মনে মনে গুণতে শুরু করলেন: এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ। সবগুলোই আছে জায়গামতো। ব্লিমের না কোন দরকার আছে, আর না আছে ওকে বসাবার মতো কোন স্থান। মন শান্ত হয়ে এলো, ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।

ঘুম ভাঙল পরদিন সকালে, টেলিফোনের আওয়াজ। জিনি ফোন করেছে, হাসপাতালের একজন আর্দালি। জানাচ্ছে—আর্শাইম উধাও হয়ে গিয়েছেন!

ছুট লাগালেন টমলিন। পৌঁছেই দেখতে পেলেন জিনিকে। কী হয়েছে সব খুলে বলল সে; যতবার সুযোগ পেল, প্রত্যেকবারই দায় অস্বীকার করল। আগের রাতে, দশটার সময় বহাল তবিয়তেই ছিলেন আর্শাইম। জিনি শেষবার তখনই দেখেছিল তাকে। কিন্তু সকাল ছয়টায় যখন আবার রাউণ্ডে যায়, তখন ঘরে ছিলেন না গণিতজ্ঞ। বাইরে থেকে বন্ধ ছিল আর্শাইমের ঘরের দরজা। রাতের দারোয়ান জানাল—উল্টো পাল্টা কিছু ঘটেনি সারা রাতে। মনে হচ্ছে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন আর্শাইম।

‘ওর ঘরটা আপনার দেখা দরকার।’ পরামর্শ দিল জিনি।

আর্শাইমের ঘরের দিকে গেলেন টমলিন; এক নজরে দেখেই বুঝতে পারলেন—যা ভয় পাচ্ছিলেন, সেটাই হয়েছে।

ঘরের সবগুলো দেয়াল নানা ধরনের গাণিতিক চিহ্ন আর অঙ্কে ভর্তি। ওসবের অধিকাংশ জীবনে চোখেও দেখেননি টমলিন। কেমন যেন কাঁপা কাঁপা হাতে, লালচে-বেগুনি রঙে লেখা হয়েছে ওগুলো। চাঁদের আলোয় নিশ্চয়ই সারা রাত কাজ করেছেন প্রফেসর।

কালি হিসেবে কী ব্যবহার করেছেন, তা খুঁজতে বেগ পেতে হলো না। একপাশে পড়ে আছে একটা প্লাস্টিকের কাপ; মেঝেতে পড়ে আছে তরল। আঙুল চুবিয়ে স্বাদটা পরখ করে দেখলেন তিনি—আঙ্গুরের রস। স্ট্র কেটে বানানো কলমটাও আছে ওখানেই। আরেক পাশে স্তূপাকারে পড়ে আছে আর্শাইমের সব কাপড়। কিন্তু প্রফেসরের কোন হদিস নেই।

‘আমাদের জন্য কিছু নাস্তা রেখে গিয়েছেন দেখি।’ টমলিনের পেছন থেকে বলল জিনি।

ঘুরে দাঁড়ালেন ডাক্তার, দেখলেন যে জিনি দাঁড়িয়ে আছে নাইট টেবিলের পাশে। ওটার উপরে থাকা তিনটা ছোট ছোট বস্তুর দিকে বাড়াচ্ছে ওর হাত।

‘ওগুলো ধরো না।’ চিৎকার করে উঠলেন টমলিন।

‘জেলি বিন, ডাক্তার।’ উত্তর দিল জিনি, তারপর একটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল উপরে।

ভয়ের সাথে টমলিন দেখলেন, বিনটা উপবৃত্তাকারে কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে, জিনির মুখের ভেতর গিয়ে পড়ল।

‘খাবেন নাকি?’ অবশিষ্ট বিনগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল জিনি।

টমলিন তাকালেন নাইট টেবিলের দিকে, তিনটা জেলি বিন শান্ত হয়ে শুয়ে আছে ওখানে।


মোবাইল


(বিদেশী গল্প অনুকরণে)

অদ্ভুতভাবে মারা গেল লিলি।

রাজশাহী পার্কে হাঁটছিল ও সেদিন। ভরা বিকেল, তাই আচমকা চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকাল। এমন আবহাওয়া পরিবর্তন আগে দেখেনি কখনও। সন্ধ্যা নামতে এখনও অনেক দেরী। কিন্তু মেঘ করেছে আকাশে, এত দ্রুত যে মনে হচ্ছে ঝড় শুরু হবে যেকোন সময়! রাগে যেন ফুঁসছে মেঘ, থেকে থেকে গর্জে উঠতে শুরু করেছে।

ঝড়ের সময় দুটো কাজ করা মানা, এক তো হচ্ছে মোবাইল বের করে কাউকে ফোন করা। আরেকটা হলো, গাছের নিচে আশ্রয় নেয়।

দুটোই করে বসল লিলি।

বৃষ্টি ঝরতে শুরু করার সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল একটা বট গাছের নিচে। তারপর হ্যান্ডব্যাগ হাতড়ে বের করে আনল মোবাইল ফোন।

‘পিয়াল,’ ভাইকে ফোন করল ও। ‘আমি পার্কে আছি। বৃষ্টিতে আটকা পড়েছি।’

কথা শেষ করার আগেই বজ্র আছড়ে পড়ল গাছটায়। পঁচাত্তর হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ মোবাইল সেট হয়ে আশ্রয় খুঁজে নিল মেয়েটির মস্তিষ্কে। কয়েকবার খিঁচুনি দিয়েই থেমে গেল দেহটা, মোবাইল হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল প্রায় একশো ফুট দূরে।

যে সময়ের ঘটনা, তখনও সিটিসেল কো¤পানি পুরোদমে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। রিমের প্রচলন হয়নি। আশ্চর্য হয়ে দেখা গেল, জেডটিই ব্রান্ডের সেটটা এতকিছুর পরেও ঠিক কাজ করছে। লিলিকে কবর দিয়ে আসার পর সেটা চলে গেল পিয়ালের হাতে। কিন্তু ওটাকে দেখলেই যেন ছেলেটার মনে পরে যায় মৃত বোনের কথা। তাই বিক্রি করে দিল মাস শেষ হবার আগেই।

ফয়সাল আহমেদ নামের এক ভদ্রলোক কিনলেন ওটাকে। তাঁর ছেলে, সুমিত আহমেদ, মোবাইল মোবাইল করে বেশ কিছুদিন হলো জ্বালাচ্ছে। নিজে প্রযুক্তির সাথে অতটা পরিচিত নন ফয়সাল। তাই কম দামে মোবাইলটা পেয়ে আর হাতছাড়া করলেন না।

 

‘ধন্যবাদ, বাবা।’ আদ্যিকালের সেটটা হাতে নিয়ে বলল সুমিত। রাগ দেখাবে না খুশি হবে তা বুঝতে পারছে না। মোবাইল একটা থাকলে ভাল হয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেট ওর চাহিদা ছিল না; ওটা দরকার ছিল কেবল বন্ধু-মহলে তাক লাগিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু এখন যে হিতে-বিপরীত হলো। বুঝতে পারছে, জিনিসটা ওর স্বাধীনতা অনেকাংশেই কমিয়ে দেবে। এখন আর ক্লাস চলার ধুয়ো তুলে সন্ধ্যার পর বাইরে চুটিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে না। কলেজ ফাঁকি দিয়ে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘোরার দিনও শেষ।

আবার হাতি যে মরলেও লাখ টাকা। মোবাইল সেট, হোক না তা আদ্যিকালের বা সিটিসেলের, মোবাইল তো। কম কথা না!

ফয়সাল আহমেদ রাজশাহী শহরে বাড়ি বানিয়েছেন অনেক আগেই। আশপাশের ছাত্রদের কাছে মেস হিসাবে ভাড়া দিয়েই তার দিন চলে যায়। খুব একটা বেশি কামান না, দয়ার শরীর তাঁর। প্রায়শই দেখা যায়, অর্ধেক ছাত্রের ভাড়া মাফ করে দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী, মিসেস রোখসানা আহমেদও দয়ালু মানুষ। তাই তিনিও কোন উচ্চবাচ্য করেন না। সুমিত জানে, সংসারে টানাটানি না থাকলেও, ইচ্ছামত বিলাসিতা করার সুযোগ নেই। তাই নিজেও আর কথা বাড়াল না।

‘সুমিত, একটা কথা বলে রাখি। মোবাইলের খরচ কিন্তু তোমাকে হাতখরচ থেকে বাঁচিয়েই চালাতে হবে। আমি আলাদা টাকা দেব না।’

‘আচ্ছা, বাবা।’

সন্তান হিসেবে সুমিতের তুলনা হয় না। পরিবারের অবস্থা বোঝে ও, প্রায়শই বাবাকে টুকটাক কাজে সাহায্যও করে। তবে হ্যাঁ, এরকম ছোট শহরে উত্তেজনার খোরাক পাওয়া যায় না বললেই চলে। সুমিতের কাছের বন্ধুরা কলেজে পড়ার জন্য ঢাকায় গিয়েছে। ও নিজেও যেতে চেয়েছিল, কিন্তু একমাত্র সন্তানকে কাছছাড়া করতে চাননি ওর বাবা-মা। সেজন্য রাজশাহী কলেজেই পড়তে হয়েছে ওকে। এখন অবশ্য সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে; ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার স্বপ্ন সেই ছোটবেলা থেকেই, সময় গুণছে তাই। কবে যে ঢাকায় যাবে, জীবনে আসবে চাঞ্চল্য।

বেচারা জানে না, অচিরেই আমূল পরিবর্তন হতে যাচ্ছে ওর পরিবেশের...

একদিন বিকালে, এই সাড়ে চারটার দিকে, আচমকা বেজে উঠল ফোন। ক্রিং ক্রিং...ক্রিং ক্রিং...বিরক্তিকর শব্দটা বেশ কয়েকবার বাজার পর ঘুম ভাঙল সুমিতের। এই নাম্বারটা খুব অল্প কয়েকজনকে দিয়েছে। ওর বাবা-মা, সিজার ওর প্রাণের বন্ধু, স্কুলের পরিচিত কয়েকজন মুখ আর প্রিয়া নামের এক মেয়েকে। ঘুম ভাঙতেই লাফিয়ে উঠল সুমিত, যদি পছন্দের মানুষটার ফোন হয়!

কোনক্রমে ফোনটা টেবিলের উপর থেকে হাতে নিয়েই রিসিভ করে বসল, নাম্বার দেখার ঝক্কিতেও গেল না।

‘হ্যালো?’ বৃদ্ধ একটা কণ্ঠ ওর আশার গুড়ে যেন বালি ঢেলে দিল।

‘হ্যালো।’ ধরেই নিয়েছে সুমিত, রঙ নম্বর থেকে ফোন এসেছে।

‘আমার একটা কাজ করে দিতে হবে,’ কিছুটা অধৈর্য ভঙ্গিতে বলল কণ্ঠটা। ‘বিলশিমলা গিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করো।’

‘বুঝলাম না...’ বলতে শুরু করল সুমিত।

‘ওকে বোলো আমার রুপোর আঙটিটা ফ্রিজের নিচে আছে। তাহলেই হবে।’

‘কে আপনি?’

‘আমি রিয়াজ। তুমি আমার স্ত্রীকে চেন। মিসেস লাবনী হোসেন। ১০ নং বিলশিমলা, দ্বিতীয় তলায় থাকে। ওকে জানিয়ো।’

‘আপনি নিজেই বলছেন না কেন?’ বিরক্তি ঝরল ছেলেটার গলায়।

‘পারলে কি তোমাকে বলতাম?’ বিরক্ত শোনাল বৃদ্ধকেও। ‘মনে কোরে বোলো কিন্তু যে আঙটিটা ফ্রিজের নিচেই আছে।’

‘আসলে…’

‘ধন্যবাদ।’

কেটে গেল লাইন। এই দ¤পতিকে চেনে ও। বাবার ম্যানেজার ছিলেন লোকটা, আর তার স্ত্রী এসে মাঝে-সাঝে মাকে সাহায্য করতেন। রাজশাহীর মত ছোট জায়গায়, সবাই সবাইকে চেনে। আসলে না চিনে উপায় নেই। প্রায় বছরখানেক আগে আচমকা চাকরী ছেড়ে দেন রিয়াজ, ক্যান্সার ধরা পড়ায়। টাকা-পয়সা যা ছিল, তাই নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন চিকিৎসা করাতে।

আচমকা একটা কথা মনে হতেই ভয় পেয়ে গেল সুমিত ভদ্রলোক ওর নাম্বার পেলেন কোত্থেকে?

 

পরেরদিন বিকালে দেখা গেল, বিলশিমলার দশ নাম্বার বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে একটি ছেলে।

আসতে চায়নি সুমিত, সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছে ফোনকল পেয়ে। কিন্তু কখন যে ওর অবচেতন মন ওকে এখানে নিয়ে এসেছে তা বুঝতেই পারেনি। যা হবার হবে, নিজেকে বুঝ দিয়ে চলে এল বাড়িটার সামনে। মনস্থির করে নিয়ে বাজাল ঘণ্টি।

পরক্ষণেই মনে হলো বোকার মত কাজ করে বসেছে। এখানে আসার দরকারই ছিল না কোন। ফিরে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় দরজা খুলে গেল। মিসেস হোসেন দাঁড়িয়ে আছেন দোরগোড়ায়। সুমিতকে দেখে হাসি ফুটে উঠল মুখে। আগে যেমন দেখেছে, বলতে গেলে তেমনই আছেন মহিলা। তবে একটু বয়স্ক মনে হচ্ছে, সেই সাথে শুকিয়েও গিয়েছে বেশ।

‘আরে, সুমিত? তুমি!’ হাসিমুখেই বললেন মহিলা। ‘কেমন আছ?’

‘আমি ভাল আছি, আণ্টি। আপনি কেমন আছেন?’

‘এই তো, বাবা। আছি একরকম।’ অস্বস্তিকর একটা নীরবতা নেমে এল জায়গাটায়। কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলা নিজেই ভাঙলেন সেই নীরবতা। ‘ভেতরে এসো?’

‘না, না। বাসায় যাচ্ছিলাম, স্কুল ছুটি হলো।’

‘তোমার আব্বু-আম্মু কেমন আছেন? ছাত্রাবাস কেমন চলছে?’

‘ভাল, সব ভালই আছে।’ সুমিত ঠিক করল, যা বলতে এসেছে তা আর কোন ভণিতা না করে বলেই ফেলবে। ‘আসলে গতকাল একটা ফোনকল এসেছিল। আপনাকে একটা খবর দিতে এসেছি।’

‘কী?’

‘আংকেলের কাছ থেকে এসেছে খবর।। তার আঙটি নাকি ফ্রিজের নিচে আছে…’ বলতে বলতেই থেমে গেল ছেলেটা। মহিলার চেহারার সাদা হয়ে যাওয়াটা ওর নজর এড়ায়নি। মনে হচ্ছিল যেন কেউ তার চেহারায় থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে।

‘কী...?’ বিড়বিড় করে বললেন তিনি।

‘বলল যে তার আঙটিটা ফ্রিজের নিচে আছে। এটা বললেই নাকি আপনি বুঝবেন।’

‘ফাইজলামি করছ?’

‘নাহ। সত্যি বলছি!’

‘তোমাকে তো আমি ভাল ছেলে মনে করেছিলাম। তুমি এমন একটা কাজ...’ বলতে বলতেই ফোঁপাতে শুরু করলেন লাবনী, এক মুহূর্ত পর সুমিতের মুখের উপর বন্ধ করে দিলেন দরজা।

হতভম্বের মত কিছুক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল বেচারা।

 

সেদিন রাতে, খেতে বসে, কথাচ্ছলে প্রসঙ্গটা তুলল সুমিত। জানাল যে পথে লাবনী আণ্টির সাথে দেখা হয়েছে ওর। তবে ফোন আসার কথা কিছুই বলল না।

‘বেচারী লাবনী!’ মহিলাকে পছন্দই করেন মিসেস রোখসানা। ‘অনেকদিন হলো দেখা হয় না। কবর দেয়ার সময় শেষ দেখেছিলাম।’

‘কার কবর?’ প্রশ্নটা করল বটে সুমিত, কিন্তু উত্তর কী হবে সেটা আঁচ করতে পেরেছে অনেক আগেই।

‘ওর স্বামী, রিয়াজ। মনে নেই? ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিল বেচারা। আশ্চর্যের কথা, বিড়ি-সিগারেট ¯পর্শও করত না। সবই আসলে কপাল।’

লাল হয়ে গেল সুমিত। কেউ একজন ওর সাথে ঠাট্টা করেছে। কে হতে পারে? সিজার? সম্ভব। ব্যাটা একটা হাড়বজ্জাত। তবে এখনো কানে বাজছে কণ্ঠটা, বয়স্ক একটা গলা। কোন সন্দেহ নেই সুমিতের। তরুণ কেউ গলা নকল করলেও এতটা নিখুঁতভাবে করতে পারবে না।

ব্যাপারটা ঠাট্টা ছিল না।

 

কয়েকদিন পর, একেবারে আচমকা লাবনী আণ্টির সাথে দেখা হয়ে গেল সুমিতের। বলতে গেলে ভদ্রমহিলায় ওর পথ আটকে দাঁড়ালেন।

‘কেমন আছেন, আণ্টি?’ লজ্জায় মহিলার চোখে চোখ রাখতে পারছে না সুমিত, তাকিয়ে আছে নিচের দিকে।

কিছুক্ষণ পর উত্তর না পেয়ে চোখ তুলে তাকাল। দেখে, ভদ্রমহিলা অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওকে দেখছেন। মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা বলতে চাইছেন তিনি, আবার পারছেনও না। চোখ ভরে আছে পানিতে, তবে ওগুলো আনন্দাশ্রু। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘তুমি আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।’

‘আমি দুঃখিত,’ হড়বড়িয়ে বলে ফেলল সুমিত। ‘আমি জানতাম না যে...’

একহাত তুলে ওকে থামিয়ে দিলেন লাবনী। ‘রিয়াজ মারা গিয়েছে মাস দুয়েক আগে। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওর সেবা করেছি আমি।’

‘আম্মুর মুখে শুনলাম। আমি আসলে…’

‘আমরা আঙটি বানিয়েছিলাম একজোড়া, জানো? রুপার, ও আবার সোনার কিছু পরত না। সাতাশ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল আমাদের। দামী কিছু না। বিয়ের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বানানো হয়েছিল ওগুলো। আমারটায় ওর নামের আদ্যক্ষর লেখা ছিল, ওরটায় আমার নামের। রিয়াজ মারা যাবার পর, ওর আঙটিটা অনেক খুঁজেছি। আমার কাছে ওটার দাম যে অনেক! খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম, রোগটা ধরা পরার আগে শেষ এই অলংকার দুটোই বানানো হয়েছিল। টাকার দরকার থাকা সত্ত্বেও বিক্রি করিনি। কিন্তু ওটা ওর হাতে ছিল না, অনেক খুঁজেও পাইনি।’ বলতে বলতেই থেমে গেলেন তিনি, টিস্যু বের করে চোখ মুছলেন।

‘তুমি কী করে জানলে আমি জানি না। কিন্তু ফ্রিজের নিচে খুঁজতে গিয়েই পেলাম ওটাকে। শেষের দিকে খুব শুঁকিয়ে গিয়েছিল বেচারা। হয়তো সেজন্যই আঙুল থেকে পড়ে গিয়েছে! তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’

সুমিতের মাথায় একবার হাত বুলিয়েই হাঁটা ধরলেন মহিলা। ছেলেটা জানে, এখন আর ওর উপর রেগে নেই ভদ্রমহিলা।

বরঞ্চ ওকে ভয় পাচ্ছেন তীব্রভাবে!

 

সেদিন বিকালে, ঠিক সাড়ে চারটার সময়েই, আবার বেজে উঠল ফোন।

‘আমাকে তুমি চেনো না,’ বলল একটা নারী কণ্ঠ। ‘তবে তোমার পরিচিত একজনের সাথে দেখা হলো। তার কাছ থেকেই পেলাম নাম্বার। বললেন, তুমি চাইলে আমার একটা বার্তা পৌঁছে দিতে পারো।’

‘কী?’ কণ্ঠের ভয় লুকাতে পারল না সুমিত।

‘আমার নাম নিপা হাসান। আমার মায়ের নাম মরিয়ম বেগম। থাকেন উপশহরে, ১৪/৪-এ। ওকে বলবে, শুধু শুধু হাসানকে দোষ দিচ্ছে সে। যা হয়েছে, তাতে কারোই হাত ছিল না। ওরা দু’জন যদি আপোসে সব ঠিক করে নেয়, তাহলে আমি খুব খুশি হবো।’

এবার আর সরাসরি ঠিকানায় গিয়ে উপস্থিত হলো না সুমিত, খোঁজ-খবর নিয়ে গেল। আসলেই ওই ঠিকানায় থাকেন মরিয়ম বেগম। তার বড় কন্যা নিপা হাসান, স্বামী হাসান ফেরদৌস। ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে আসার সময় অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায় নিপা, তখন চালক ছিল হাসান।

মরিয়ম বেগমের সাথে দেখাই করল না সুমিত, অনেক হয়েছে। আর এসবে জড়াতে চায় না। আর তাছাড়া, ফোনকলের মাধ্যমে ওকে এসব বলা হয়েছে। এই কথা সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ বিশ্বাস করবে?

 

ক্রিং ক্রিং...ক্রিং ক্রিং

আজকাল খুব বাজতে শুরু করেছে ফোনটা।

‘আমার নাম রাকিব, রাকিব চৌধুরী। নিপা হাসানের কাছ থেকে তোমার নাম্বার পেয়েছি। আমার মেয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে? ওর স্বামী ধোঁকাবাজি করছে, আরেক মেয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে স¤পর্কে। আমার মেয়েটার সাথে দেখা করে বলবে…’

‘আমার মায়ের সাথে দেখা করতে হবে। তিনি আমাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন প্রায়। যদি জানতে পারেন যে আমি এখানে সুখেই আছি, তাহলে হয়তো…’

‘মিস নাহিদার সাথে দেখা করতে হবে। আমি ওর বড় বোন।’

এভাবেই চলতে লাগল দিনের পর দিন। কয়েকসপ্তাহ পর দেখা গেল, একেক দিনে সাতটা-আটটা করেও ফোন আসছে!

কিন্তু একটা বার্তাও পৌঁছে দিল না সুমিত।

এই ঘটনার কথা ও আব্বু-আম্মুকে বলতে চায়, বলতে চায় প্রিয়াকে...সিজারকে। কিন্তু বলি-বলি করেও বলতে পারে না। সবাই যে ওকে পাগল ঠাউরাবে!

মৃতদের সাথে যোগাযোগের একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে ও। কেন জানে না, জেডটিই ব্র্যান্ডের এই মোবাইল ফোনটা পরকালের সাথে সংযোগ স্থাপনেও সক্ষম। কীভাবে এসব সম্ভব হলো, কে জানে? তবে সম্ভব যে হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ওপারেও নিশ্চয়ই খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তাই তো বেড়ে গিয়েছে ফোন কলের সংখ্যা।

‘আমার চাচাকে বোলো…’

‘আমার স্ত্রীর সাথে একটু দেখা করতে পারবে...?’

‘মামাদের জানা দরকার...’

ক্রিং ক্রিং শব্দটা হওয়ামাত্র এখন আঁতকে ওঠে সুমিত। আর সহ্য হচ্ছে না ওর। শেষ পর্যন্ত একেবারে বন্ধ করে রাখল মোবাইলটা। কাপড়-চোপড়ের নিচে চাপা দিয়ে ভুলতে চাইল ওটার অস্তিত্ব। তারপরেও যেন কল্পনাতেও ওর পিছু ছাড়ল না যন্ত্রটা।

দুঃস্বপ্ন দেখতে লাগল বেচারা। ভূত দেখে, স্বপ্নে হানা দেয় গা থেকে মাংস খসে আসা লাশ। মনে হয় যেন ওর কামরার বাইরেই অপেক্ষা করছে, ওর সাথে কথা না বলে যাবে না।

 

ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন ফয়সাল এবং রোখসানা আহমেদ।

ছেলে ঠিকমত খায় না, ঘুমায় না। লেখাপড়াতেও মন নেই আর। ভয় পেয়ে গেলেন তাঁরা। আঁতকে উঠলেন সম্ভাবনাটার কথা চিন্তা করে।

তাঁদের সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়েনি তো?

অনেক ভেবে-চিন্তে একদিন রাতের খাবারের পর বসলেন সুমিতকে নিয়ে। সরাসরি প্রশ্ন করলেন না, এই বয়সী বাচ্চাদেরকে ওভাবে প্রশ্ন করা যায়-ও না। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এটা-সেটা জানতে চাইলেন তারা।

আচমকা রোখসানা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার ফোন কোথায়?’

কুঁচকে গেল সুমিতের চেহারা।

‘অনেকদিন হলো তোমাকে ওটা ব্যবহার করতে দেখি না।’ বললেন ফয়সাল আহমেদ।

‘পরীক্ষা সামনে।’ জবাব দিল সুমিত। ‘দরকারও হয় না খুব একটা। সবার সাথে তো দেখাই হয়। আর তাছাড়া, ফোন ব্যবহার করতেও ভাল লাগে না।’

হাসলেন ফয়সাল, রাতটা ভালই কেটেছে তাঁর পরিবারের। তাই আর বেশি চাপ দিলেন না। কেবল বললেন, ‘দরকার মনে করলে আমাকে দিতে পারো। আর একেবারে প্রয়োজন মনে না করলে বিক্রিও করে দেয়া যায়।’

‘তাহলে তো খুব ভাল।’ আনন্দে যেন লাফিয়ে উঠল সুমিতের মন। সাথে সাথে ফোনটা এনে দিয়ে দিল আব্বুকে।

অনেকদিন পর, দুঃস্বপ্নহীন একটা রাত কাটাল সুমিত আহমেদ।

 

এক সপ্তাহ পরের কথা।

বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন ফয়সাল আহমেদ। বাসায় টিঅ্যা-টি ফোনের লাইনটা বেশ কয়েকদিন ধরেই ঝামেলা করছিল। সেটা ঠিক করতে লোক এসেছে। মাঝে-মধ্যে সেদিকে তাকিয়ে দেখছেন।

সামনেই টেবিলের উপর পড়ে আছে সুমিতের ফোনটা। বেচব-বেচব করেও বেচা হয়নি। আজকেই কিছু একটা করতে হবে। মনে মনে ভাবলেন তিনি। বুঝতে পেরেছেন যে সুমিতের আসলে সেট পছন্দ হয়নি। তাই ঠিক করেছেন, নতুন আরেকটা কিনবেন। বন্ধুদের সাথে বান্দরবনে গিয়েছে ছেলেটা, ফিরলেই উপহার দেবেন দামী একটা সেট।

আচমকা দরজায় দেখা গেল মিসেস রোখসানাকে। স্ত্রীকে শোবার ঘরে রেখে এসেছিলেন ফয়সাল আহমেদ। শরীর ভাল নেই ভদ্রমহিলার। তাই শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলেন। অবশ্য এখন দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি অসুস্থ।

‘কী হলো?’ জানতে চাইলেন ফয়সাল আহমেদ। একসাথে বিশ বছর হলো সংসার করছেন। তাই স্ত্রীকে দেখেই বুঝতে পারছেন যে কোন একটা সমস্যা হয়েছে। এত লম্বা সময় ঘর করলে, সব কথা মুখে বলতে হয় না।

‘টিভিতে দেখলাম…’ বলেই থেমে গেলেন মিসেস আহমেদ।

‘কী দেখলে?’

‘সুমিত...বান্দরবনের রাস্তায় নাকি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।’ কেঁদে ফেলবেন যেন মিসেস রোখসানা। নাহ, কোন খারাপ খবর পাননি তিনি। আসলে কোন খবরই পাচ্ছেন না, সেজন্যই আরও বেশি ভেঙে পড়েছেন মনে মনে। ‘খবরে দেখাল, একটা বাস নাকি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। ওতে কলেজ-পড়–য়া অনেকগুলো বাচ্চা ছিল। অনেকেই নাকি মারা গিয়েছে।’

‘ওটা তো সুমিতের বাস না-ও হতে পারে। বছরের এই সময়টায় অনেকেই বেরাতে বেরোয়। তাই বাসের তো কোন অভাব নেই।’

‘কিন্তু সময় যে মিলে যায়। আজ সকালেই সুমিতের বান্দরবনে পৌঁছবার কথা।’

‘সিজারদের বাসায় ফোন করেছ?’ সুমিতের বন্ধুদের মাঝে একমাত্র সিজারেরই নিজস্ব ফোন আছে। ছেলেটা নিশ্চয়ই হোটেলে পৌঁছে জানিয়েছে বাড়িতে। পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল ফয়সাল আহমেদের টিঅ্যা-টি লাইন তো নষ্ট। ফোন করার কোন উপায় নেই।

পরক্ষণেই দেখতে পেলেন মোবাইল ফোনটাকে। ‘ফোন লাইন ঠিক করছে। এটা দিয়ে ফোন করা যায়।’

বলেই যন্ত্রটাকে হাতে তুলে নিলেন তিনি...

...ক্রিং...ক্রিং...

ঠিক সেই মুহূর্তেই বাজতে শুরু করল ওটা।

অবাক হয়ে গেলেন ফয়সাল আহমেদ। তাড়াতাড়ি রিসিভ বাটনটা চাপলেন ফোনের।

‘হ্যালো, আব্বু।’ ওপাশ থেকে সুমিতের কণ্ঠ শোনা গেল। ‘আমি বলছি।’