সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
Showing posts with label সায়ন্তনী পলমল ঘোষ. Show all posts

অভিমন্যু ● সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

 


 

ছেলেটা চারিদিকে একবার তাকাল। নাহ, এই মুহূর্তে হাইওয়েতে সে আর তার সোলার সাইকেল ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তি বা বস্তুর অস্তিত্ব নেই অর্থাৎ তাকে কেউ লক্ষ্য করবে না। দু কিলোমিটার অন্তর নজরদার ক্যামেরা লাগানো আছে কিন্তু তার হিসেব মতো এই জায়গাটা দুদিকের দুটো ক্যামেরার দৃষ্টিসীমার বাইরে।

AU REVOIR - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

উপন্যাস
পূর্বকথা

স্বচ্ছ দেওয়ালের ওপারে তাকিয়ে ছিলেন দীর্ঘকায় পুরুষটি। হাজার হাজার জোনাকির মত আলোকরাজিতে সেজে উঠেছে রাতের শহর। আকাশে হাজার হাজার নক্ষত্ররাজি নিশ্চিন্তে বিশ্রামরত। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটো বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মাথার মধ্যে অনেক হিসেব নিকেশের কাটাকুটি আর কান দুটো সজাগ হয়ে শুনছে ঘরের মধ্যে উপস্থিত দ্বিতীয় ব্যক্তির কথা। কথা না বলে পরিকল্পনা বলাই ভালো। কথা শেষ করে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হয়ত তাঁর মনের খবর বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় ব্যক্তির দিকে ফিরে তাকালেন। মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসির আভাস।

উত্তম পুরুষ - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

রহস্য উপন্যাস

অলংকরণ - মিশন মন্ডল

আজ অমাবস্যা। আমার অমাবস্যা একদম ভালো লাগে না। আকাশটা কেমন কালো চাদর পেতে শুয়ে যায়! আমি ভালোবাসি চাঁদ। পূর্ণিমার দিন যখন আকাশের গোল থালার মত চাঁদটা থেকে জ্যোৎস্না চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে তখন আমি মাদুর পেতে ছাদের ওপর শুয়ে জ্যোৎস্না মাখি আর, আর তার কথা ভাবি।

কুয়াশার আড়ালে - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

অলংকরণ - মিশন মন্ডল

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সূঁচের মত চোখে-মুখে এসে ফুটছে। হাতের কালো ছাতাটা খুলেই ফেললাম। কালো রংটা আমার ভীষণ পছন্দের। এই যে মেঘলা বিকেলটা আস্তে আস্তে রাতের কালো আঁধারে ঢুবে যাবে একটু পরে আমার তখন বেশ আরামবোধ হবে। রাত যত ঘন হয়ে আসে প্রকৃতি রাতের চাদরে আরও এক পোঁচ করে আলকাতরা মাখায় তখন আমার মনে বেশ শান্তি আসে। অথচ বেশিরভাগ মানুষকে দেখো অন্ধকারকে ভয় পায় যেন রূপকথার গল্পের সেই দাঁতওয়ালা বিশাল দৈত্য যে হাঁ করে গিলে খেতে আসছে।

ফাঁদ - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

অলংকরণ - প্রতিম দাস

নামটার পাশে সবুজ বিন্দু দেখেই পৃথার ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি খেলে গেল। তার আঙুলগুলো দ্রুত ফোনের কী-প্যাডে ঝড় তুলল।

“ঘুমওনি এখনও?” নিমেষের মধ্যে অপর প্রান্তের মানুষটি উত্তর দিল, “উঁহু একজনের সাথে কথা বলার অপেক্ষায় আছি।”

“তাই নাকি?”

“হুম। আমি তো একজনের জন্য পাগল হয়ে গেছি কিন্তু সে আমাকে কতটা ভালোবাসে সেটাই বুঝতে পারছি না।”

পৃথা কতগুলো লাভ স্টিকার পাঠিয়ে দিল।

উল্টো দিক থেকে জবাব এল, “এভাবে আর কত দিন? আমরা কি একবার অন্তত দেখা করতে পারি না? তোমাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করে। তোমার প্রোফাইল পিকচারটাও তো ঝাপসা।”

পৃথা নিজের মনেই হেসে এক জোড়া ঠোঁটের ছবি পাঠিয়ে দিল।

“ফোটো নয় সোনা আমি তোমার সাথে সামনাসামনি দেখা করতে চাই, তোমার সাথে কথা বলতে চাই। প্লিজ, আমার কথাটা একবার ভাবো। আমি যাকে এত ভালোবাসি আজ পর্যন্ত তার গলাটাও শুনতে পেলাম না। তোমার হিটলার মায়ের ভয়ে তুমি তো ফোনেও কথা বলো না।”

“ওকে জানু। আই উইল ট্রাই।”

“আর চেষ্টা করার কথা বলো না। রিয়া প্লিজ। আমার কথাটা একটু ভাবো।”

“বিলিভ মি বেবি। আমিও ভীষণ ভালোবাসি তোমাকে। এই সপ্তাহেই আমরা দেখা করবো।” আরও কিছুক্ষণ রসালো প্রেমালাপ চালালো পৃথা তারপর শুভরাত্রি জানিয়ে দিল। কতক্ষণ আর বানিয়ে বানিয়ে ন্যাকা ন্যাকা প্রেমের কথা বলা যায়।

 

ফোনটা বিছানায় রেখে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে পৃথা দেখল মা এখনও জেগে আছেন।

“মা তুমি এখনও ঘুমোওনি কেন?” রাগত স্বরে বলে পৃথা।

“পুজোর মরশুম। অনেক ব্লাউজের অর্ডার আছে। ঠিক সময়ে দিতে না পারলে আর কি কাজ পাবো!”

মাকে জড়িয়ে ধরে পৃথা বলে, “এখন তো আমি রোজগার করি মা। তাও তুমি এত কষ্ট করো কেন?”

ম্লান হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলেন, “ পাগলী মেয়ে। একলা তুই কত টানবি? তোর বাবার চিকিৎসা, বিল্টুর ডাক্তারি পড়ার খরচ সব সামলাতে সামলাতে নিজের দিকে তো একটুও নজর দিস না।”

“ঠিক আছে। এখন করছ করো কিন্তু আর একবছর পরে যখন ভাই ডাক্তার হয়ে যাবে তোমার সব কাজ বন্ধ।”

“আচ্ছা বাবা। ঠিক আছে।”

পৃথা নিজের মনেই ভাবে এই কাজটা তাকে ঠিকঠাক করতেই হবে। এই কাজটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আগেও এই ধরনের কাজ সে করেছে কিন্তু সেগুলো চুনোপুঁটি ছিল। দীপটা হল রাঘব বোয়াল। এটাকে ফাঁদে ফেলতে পারলে হয়ত এই এঁদো গলির দু'কামরার ভাড়া বাড়ি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। দু'বছর আগে পৃথার বাবার হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে যায় তাতে শুধু জমানো টাকা পয়সাই নয় গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত বাবার কারখানার চাকরিটাও চলে যায়। তারপর থেকে পৃথা আর ওর মা সংসারটা কী করে টানছে ওরাই জানে। ওর বাবার ডান দিকটা প্রায় আসাড় হয়ে গিয়েছিল। টানা চিকিৎসা করিয়ে এখন অনেক ভালো। ভাই চিরকালই পড়াশোনায় ভালো তাই যখন ডাক্তারিতে সুযোগ পেল পৃথার বাবা বলেছিলেন যে যেমন করে হোক ছেলেকে ডাক্তার করবেন। বাবার অসুখ হতে ভাই বলেছিল পড়া ছেড়ে দেবে কিন্তু পৃথা আর ওর মা হতে দেয়নি। এত অল্প বয়স থেকে সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়ে চলতে চলতে পৃথার মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে কিন্তু সেই আলস্যকে পাত্তা দেওয়ার মেয়ে সে নয়। এখন তার লক্ষ্য একটাই দীপ সরকারকে ঠিকঠাক ফাঁদে ফেলা, তাহলেই কেল্লাফতে।

বেশকিছু দিন কেটে গেছে দীপ আর অপেক্ষা করতে চাইছে না। পৃথার সাথে দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। অবশ্য ওর কাছে পৃথা হলো প্রিন্সেস রিয়া। ফেক অ্যাকাউন্টটা এই নামেই খুলেছে পৃথা যাতে কাজ শেষে ওর আর কোনও অস্তিত্ব না থাকে। আবার নতুন শিকারের জন্য নতুন নাম, নতুন অ্যাকাউন্ট। আজ অনেকক্ষণ দীপের সাথে চ্যাট করল পৃথা। ওকে পুরো বুদ্ধু বানিয়ে ছেড়েছে সে। এমন ভাব করেছে যেন ওর প্রেমে পাগল হয়ে গেছে। ফোনটা বেজে উঠলো, “স্যার কলিং।” পৃথা তড়িঘড়ি ফোনটা তুলল, “হ্যালো স্যার।” উল্টো দিক থেকে গম্ভীর কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এল “কাজ কেমন চলছে?”

“ঠিকঠাক স্যার।”

“ওকে ফাইন। এবার তোমার ওই নতুন প্রেমিক প্রবরটিকে একবার দেখা দাও নাহলে যদি আবার তার অভিমান হয়ে অন্য পথে চলে যায় তাহলে তোমার এতদিনের অভিনয় মাঠে মারা যাবে।”

স্যার নামে সেভ করে রাখা হোয়াটস্যাপ নম্বরটায় দীপের সাথে কথোপকথনের একটা স্ক্রিনশট পাঠিয়ে দিল পৃথা। বিছানায় শুয়ে পৃথা বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করল। এত সহজে শিকারকে ফাঁদে ফেলতে পারবে ভাবতেই পারেনি ও। স্যার বলেছেন এই কাজটা ঠিকঠাক করতে পারলে ওর জন্য রিওয়ার্ড আছে। কে জানে কী অপেক্ষা করছে ওর জন্য।

আজ দীপের এত দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। উন্মুখ হয়ে সে পার্কের গেটের দিকে তাকিয়ে আছে।

“আমি এসে গেছি।” পৃথার মিষ্টি কণ্ঠের ডাকে ঘুরে তাকালো দীপ। জিন্স আর সাদা টপ পরিহিতা পৃথাকে যথেষ্ট আকর্ষণীয় লাগছে।

“হাঁ করে কী দেখছ?”

“যাকে দেখার জন্য এতদিন ছটফট করছিলাম তাকে দু'চোখ ভরে দেখছি।”

“ধ্যাৎ। এই জানো আমি না বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না। মাকে অনেক কষ্টে ম্যানেজ করে এসেছি। তুমি তো জানো আমাদের আর্থিক অবস্থা। মা বলে গরীবের মেয়ের দিকে নাকি সবাই হাত বাড়িয়ে থাকে।” কাঁচুমাচু হয়ে বলে পৃথা।

“ওহ সোনা, তোমাকে আর এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি। আজ থেকে তোমার আর তোমার ফ্যামিলির সব দায়িত্ব আমার। যদি তুমি বলো আমি এক্ষুনি তোমার একাউন্টে তিরিশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি তাহলে তোমার মায়ের বিশ্বাস হবে তো আমাকে?”

“না,না আজ তার দরকার নেই। আমি যখন বলব তখন করে দিও।” পৃথা খুশি মনে বলে।

“তাহলে এখন নিশ্চিন্তে বসো তো তোমার সাথে প্রাণ ভরে কথা বলি।”

 

সেদিনের পর থেকে পৃথা সরাসরি ফোনে কথা বলা শুরু করলো দীপের সাথে। এই সিমটা বিশেষ করে এই কাজের জন্যই নিয়েছে পৃথা। দিন কয়েক পরে দীপই লং-ড্রাইভে যাওয়ার প্রস্তাবটা দিল। পৃথা তো সুযোগটা লুফে নিল। এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই তো ছিল সে। পাশাপাশি বসে হাইওয়ে ধরে উড়ে চললো দু'জনে। গোলাপী কুর্তি পরা পৃথাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল দীপের মুগ্ধ চোখ। পৃথার নিজেরই নিজের অভিনয়ের প্রশংসা করতে ইচ্ছে করছিলো।

“দীপ, এই ছেলেটা এখানে ক্যামেরা নিয়ে কী করছে? আর ওই ছেলেটাই বা কে?”

দীপের সাথে ওদের বাগানবাড়ি দেখতে এসেছে পৃথা।

“জানু ও কিছু না। আমি তোমাকে আদর করব আর ওরা সেটা ভিডিও করবে।”

“ম মানে?” বিস্মিত প্রশ্ন পৃথার।

“মানে এটাই আমার ব্যবসা সোনা। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে তোমার মত সুন্দরী মালগুলোকে পটিয়ে জালে তোলা তারপর পানু তৈরি করা। পানু বোঝো?” বিচ্ছিরিভাবে হাসতে থাকে দীপ।

“এসব কী বলছো দীপ!” আতঙ্কিত গলা পৃথার।

“ইয়েস মাই প্রিন্সেস রিয়া। কী বলেছিলাম যেন তোমাকে? আমি বড়লোক বাবার একমাত্র দুলাল। আমার বাবার নাট-বল্টু তৈরির বিশাল কারখানা। আমি আবার নতুন বিজনেস করার প্ল্যান করছি। হা হা হা।” মানুষের হাসি যে এত কদর্য হতে পারে ধারণা ছিল না পৃথার।

“সত্যি মাইরি, কী সহজে জালে পড়লে তুমি। ভাবলে মাল্লুওয়ালা ছেলে ফাঁসিয়ে ফেলেছ। এবার বড়লোকের বউ হয়ে আয়েশ করবে। তোমার ওই ভিখিরি মা-বাপকেও বরের ঘাড়ে পালবে।” খিক খিক করে হাসছে দীপ।

পৃথা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “ আ আমি পুলিশে খবর দেব।”

“শালা গত তিন বছর ধরে পুলিশ আমার টিকি ছুঁতে পারেনি আর উনি আমাকে পুলিশ দেখাচ্ছেন! আমাকে ধরা এতো সোজা নয় মামনি।”

“এই রতন তাড়াতাড়ি কর। তোর পরে আমি একটু চাখবো।” কালো গেঞ্জি পরা ছেলেটা বলল।

“রতন!”

“অবাক হচ্ছ ডার্লিং? এটাই আমার আসল নাম। তোমার মত মাল্লু পটাতে এই অদ্যিকালের নামটা তো চলে না তার উপর এটা আমার আসল নাম, তাই ওই ঝিনচাক নামগুলো নিতে হয়। দীপ, রাহুল, রনি….। হা হা হা।”

“আমার সঙ্গে অসভ্যতা করার চেষ্টাও করো না। ফল ভালো হবে না।” ফুঁসে ওঠে পৃথা।

“কেন সোনা যখন নিজের ঠোঁটের, চোখের ছবি পাঠাতে তখন তো কত ফষ্টিনস্টিওয়ালা কথা বলতে। এখন হঠাৎ সতী-সাবিত্রী হয়ে গেলে নাকি?”

“এই রতন ফালতু বকছ কেন রে? জলদি জামাকাপড়গুলা খুলে কাজ শুরু কর।” কালো গেঞ্জির আর যেন তর সইছে না। পৃথার দিকে তাকিয়ে আবার বলে, “এই মেয়ে শুন। আমি রতনের মত ফালতু বকতে পারি নি। সোজা কথা সোজা করে বলছি। প্রথমে রতন তারপর আমি কাজ সারবো। ট্যা ফো করার চেষ্টা করবি নি। বেশি চিল্লা মিল্লি করলে খাল্লাস করে দুব। মা-বাপ একটা চুলের ডগাও খুঁজে পাবে নি। তোর আগে বহু মালকে ভ্যানিশ করেছি। যদি ঝামেলা না করিস কাজ সারার পর আমরা ছেড়ে দুব। আর তারপর পুলিশের কাছে যদি যাস তোর মা-বাপ, ইয়ার-দোস্ত, আত্মীয়, পাড়া পড়শি সবার ফোনে তোর রাসলীলার ভিডিও পৌঁছে যাবে।”

“তাহলে সোনা যা করবে ভেবে চিন্তে করবে। যদি গুড গার্ল হয়ে থাক তাহলে নো প্রবলেম। আমরা একবারের এঁটো মালে দ্বিতীয় বার মুখ দিই না। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে গিয়ে ঘুমতে পারবে আর তোমাকে ডিস্টার্ব করব না। আমাদের নেক্সট মাল রেডি আছে।” রতন চিবিয়ে চিবিয়ে বলে।

পৃথা কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে শুকনো মুখে বলল, “ঠিক আছে। আমি তোমাদের কথা মেনে নিলাম।”

“এই তো চাই। চলে এস সোনা। খুলে ফেল।” রতন এগিয়ে এল পৃথার দিকে। শিকারি নিজেই বোধহয় ফাঁদে পড়ে গেছে।

পৃথা ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে নিজের হাতটা জামার পেছন দিকে নিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার হাতে যে জিনিসটা উঠে এল সেটা দেখে চমকে উঠল রতন আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা।

“এই এটা কী!”

“কেন পানু ছাড়া আর কিছু চেন না নাকি? এটাকে রিভলবার বলে।”

“এই রিয়া কী হচ্ছে এসব? তোমার কাছে পিস্তল এল কোথা থেকে?”

“রিয়া? কে রিয়া?”

“মানে?” রতনের অবাক প্রশ্ন।

“মানে তোমার মত শয়তানদের ফাঁদে ফেলতে এসব রিয়া, পিয়া, জিয়া নাম নিতেই হয় আমাকে।”

“এই রতন হাঁ করে দাঁড়িয়ে করছিস কী? ধর মালটাকে।” ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি চিৎকার করে উঠল। রতন পৃথার দিকে এগোতেই বিদ্যুৎ গতিতে পৃথার হাত-পা দুটোই চলল। মাটিতে ধরাশায়ী অবস্থায় রতন দেখল বাইরে থেকে তার এক সঙ্গী ছুটে ঘরে ঢুকল।

“বস পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। পালাবার কোনও পথ নেই।”

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রতন আর তার সঙ্গীরা দেখল পুলিশের জালে তারা পুরোপুরি আটকা পড়ে গেছে। জাল কেটে বেরনোর কোনও উপায় নেই। ঘরে ঢুকলেন দীর্ঘদেহী পেটানো চেহারার বছর পঞ্চাশের এক অফিসার। রিভলবারটা রতনের সামনে নাচিয়ে বললেন, “কী রতন তালুকদার, এবার নিজেই যে ফাঁদে পড়ে গেলে! একেবারে হাতেনাতে পাকড়াও হলে। সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে এতদিন অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছ। কত মেয়েকে খুন করেছ, কতজন তোমার জন্য সুইসাইড করেছে তার হিসেব হবে এবার। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বেশ বেঁচে যাচ্ছিলে তাই বাধ্য হয়ে তোমার অস্ত্রেই তোমাকে ঘায়েল করতে হলো। তুমি ভাবতেও পারনি যে তুমি প্রিন্সেস রিয়াকে ফাঁদে ফেলছ না নিজেই পুলিশের ফাঁদে পা দিচ্ছ।”

“নিয়ে যান এদের।” অধস্তনদের নির্দেশ দিলেন অফিসার। রতনরা হতভম্ব হয়ে একবার পৃথাকে দেখল তারপর পুলিশদের সাথে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হলো। প্রতিরোধের চেষ্টা বৃথা সেটা ভালো মতোই বুঝে গেছে তারা।

“ওয়েল ডান পৃথা।”

“থ্যাংক ইউ স্যার।”

“তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।”

বিস্মিত পৃথার প্রশ্ন, “কী স্যার?”

“আমার ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে সেই সাথে তোমারও, তবে সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে নয় ইন্সপেক্টর হিসেবে। বিগত কিছু কেস আর সেই সাথে এই কেসটায় তোমার কাজে ডিপার্টমেন্ট ভীষণ খুশি। উই আর প্রাউড অফ ইউ।”

পৃথার মুখে হাজার তারার দ্যুতি খেলে যায়।

“আর একটা কথা ভাড়া বাড়িটা ছেড়ে দাও।”

“কেন স্যার?”

“তোমার জন্য একটা সুন্দর কোয়ার্টার অপেক্ষা করছে।” হাসতে হাসতে বললেন পৃথার স্যার। বর্ষীয়ান পুলিশ অফিসারটি দেখলেন নিজের পরিবার এবং কর্মক্ষেত্রের প্রতি নিবেদিত প্রাণ অকুতোভয় মেয়েটির চোখে আনন্দাশ্রু।

রুবি রায় - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

অলংকরণ - সৌমিক পাল

বজ্রসেন সুরাপাত্রে এক চুমুক দিয়ে দরজার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন। স্পষ্টতই প্রতীয়মান তিনি কারুর অপেক্ষায় উন্মুখ। দুপাত্র সুরা পানের পর তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। নূপুরের ছমছম আর চুড়ির রিনরিনে শব্দ বজ্রসেনের প্রশস্ত ললাটে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল।

“এত দেরী?” নেশাতুর কণ্ঠে বলে উঠলেন বজ্রসেন।

“আপনার পুরস্কারের প্রতীক্ষায় ছিলাম।”

“মানে? আমার পুরস্কার তো তুমি।”

দুর্বোধ্য এক হাসি উপহার দিয়ে সে বলল, “নিজের জিনিস পুরস্কার হিসেবে চাইছেন! আমি তো আপনার জন্য নতুন পুরস্কারের আয়োজন করেছি।” দুহাতে তালি দিল সে। দরজার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন বজ্রসেন। বছর আঠারোর সদ্য যৌবনবতী অসাধারণ রূপসী একটি মেয়ে সারা শরীরে মাদকতা মেখে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটি পেটিকা।

“এই রইল আপনার উপহার। ওর নাম কুমারী আর এই পেটিকায় সামান্য কিছু কাঞ্চন মূল্য আছে আপনার পরিশ্রমের। আমি এখন আসি। পরে আবার আসবো। আমি তো রইলামই।” দরজা টেনে দিয়ে চলে গেল সে। কুমারী এসে বজ্রসেনের পাশে বসলো। তার দুই চোখে নিষিদ্ধ ইশারা, শরীরী ভঙ্গিমায় উদাত্ত আহ্বান। সাধক হলেও ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত নন বজ্রসেন। উপরন্তু পার্থিব বস্তুর ওপর তাঁর আকর্ষণ কিছুটা অত্যাধিকই বলা যায়। কুমারী সেই পেটিকাটি বজ্রসেনের হাতে তুলে দিল, “এর মধ্যে আপনার জন্য একটি বিশেষ মূল্যবান রত্ন আছে।” বজ্রসেনের লোভাতুর চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠলো। পেটিকা খুলে আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলেন বজ্রসেন। স্বর্ণমুদ্রা আর রত্নখচিত স্বর্ণ আভরণে পরিপূর্ণ।

“সেই বিশেষ রত্নটি কোথায়?” অধৈর্য হয়ে ওঠেন বজ্রসেন।

“পেটিকার মধ্যেই আছে। খুঁজে নিন।” অপাঙ্গে চেয়ে বলে কুমারী। পেটিকার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেন বজ্রসেন। কয়েক মুহূর্ত পরেই, “উহঃ।” নিমেষের মধ্যে নীল হয়ে যেতে থাকে বজ্রসেনের শরীর। তিনি যে ষড়যন্ত্রের শিকার বুঝতে বিলম্ব হয় না বজ্রসেনের। একদিন মুহূর্তের দুর্বলতায় বলে ফেলেছিলেন যে গণনা করে দেখেছেন যে তাঁর মৃত্যু হবে সর্পদংশনে তাই এই প্রাণীটি থেকে তিনি দূরেই থাকেন। মৃত্যু আসন্ন বুঝতে পেরে বহু কষ্টে অন্তিম বাক্যগুলি উচ্চারণ করলেন তিনি, “তাকে বলে দিও প্রকৃতির নিয়মকে উলঙ্ঘন করার সাধ্য কারুর নেই। সেও পারবে না। একদিন তাকে পরাজিত হতে হবেই।”

১০ই মে, ২০১৮

প্রখর গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রকৃতি জ্বলছে। এই কাঠফাটা রোদ্দুরের মধ্যেই অর্ক বাড়ির বাইরে যাবার জন্য তৈরি হলো।

“কী রে এই ঘোর দুপুরে কোথায় যাবি?” অবাক হলেন অর্কর মা।

“সাইবার ক্যাফেতে যাব। এই সময় গেলে ফাঁকা থাকে নিশ্চিন্তে কাজ করা যায়।”

“আচ্ছা যা তাহলে। টাকা নিবি নাকি?

“নাহ।”

পিচ গলা রাস্তায় পা রাখলো অর্ক। সারা শরীর ঝলসে যাচ্ছে ।

“চললি তাহলে?” রবির গলা। ওদের বাড়িটা রাস্তার ধারে আর রবির রুমের একটা জানালা একদম রাস্তার ওপরে। জানালা লাগাতে এসে রবির চোখ পড়েছে অর্কর ওপর।

“হুম, যাবি তো আয়।”

“না ভাই, আমি তো তোমার মত লাট্টু হইনি যে গরমে সেদ্ধ হতে হতে চুম্বকের টানে যাব।”

অর্ক হেসে রবিদের বাড়ি পার হয়ে গেল। সত্যিই রুবি বৌদি ওকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করছে। অর্ক সাধারণত ওর প্রয়জনীয় কাজকর্ম ওর দাদার ল্যাপটপেই সেরে নেয় কিন্তু অনিক অফিসের একটা ট্রেনিংয়ে একমাসের জন্য ভুবনেশ্বর গেছে তাই সেদিন অর্ক আর রবি ওদের পাড়ার সাইবার ক্যাফেটায় গিয়েছিল। এই বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে ওরা। দুজনেই পড়াশোনায় ভালো তাই বিভিন্ন ভালো কলেজের সন্ধান, এডমিশন টেস্টের ফর্ম ফিলাপ এসব একসাথেই করছিল। কিছুদিন আগে ওরা ঢোকার সাথে সাথেই বছর পঁচিশের একটি বিবাহিতা মেয়ে ঢুকল। কালো শিফন শাড়ি আর স্লিভলেস ব্লাউজে যেন এক বিদ্যুৎ শলাকা। সর্পিনীর মত হিলহিলে শরীর, মাখনের মত পেলব বাহু আর ঠোঁটের ওপরে একটা ছোট্ট তিল। মিষ্টি হেসে অর্ককে জিগ্যেস করল, “এখানে প্রিন্ট আউট করা যাবে? আসলে আমি এ পাড়ায় নতুন তো তাই জিগ্যেস করছি?” ব্যস তার অতল জলের মতো চোখ দুটোতে তলিয়ে গেল অর্ক। চোখ দুটোয় তীব্র এক সম্মোহনী ক্ষমতা আছে। প্রিন্ট আউট নেবার পর কয়েকটা মেল করার জন্য সে আবার অর্কর সাহায্য চাইল। কম্পিউটারে খুব একটা তুখোড় নয় সে। পাশে বসে তাকে সাহায্য করার সময় তার শরীর থেকে মহুয়ার মত মাতাল করা এক ঘ্রাণ ভেসে এসে অর্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। সেই শুরু তারপর থেকে প্রায়ই পাড়ার দোকানে, সাইবার ক্যাফেতে দুজনের দেখা হতে লাগলো। আলাপ-পরিচয়ের পর্ব সাঙ্গ হয়ে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে দুজনের মধ্যে কিন্তু অর্কর মন যে তার চেয়েও বেশি কিছু চাইছে। সে প্রেমিকা হিসেবে পেতে চায় রুবিকে। অর্কর আঠেরোতে পা দিতে আরও কয়েকদিন বাকি। দুজনের মধ্যে বয়সের প্রাচীরটা অনেকটাই চওড়া তারওপর সে বিবাহিতা। অর্ক জানে সে যা চাইছে তা শুধু অনুচিতই নয় এমন এক অসম্ভব কল্পনা যার বাস্তব রূপায়ণ কোনদিনই সম্ভব নয় কিন্তু তার মন যেন বাঁধনহারা ঘোড়া যাকে কিছুতেই লাগাম পরাতে পারছে না। তার এই মানসিক অবস্থার কথা জানে শুধু রবি। রবি তাকে বুঝিয়েছে, “রুবি বৌদির স্বামী বাইরে, একলা থাকে তাই সময় কাটানোর জন্য সে একটু আধটু গল্পগাছা করে তোর সঙ্গে কিন্তু তার মানে এই নয় সে তোর প্রেমে পড়েছে। নিজেকে সামলা তুই। তুই যেটা চাইছিস সমাজের চোখেও সেটা নোংরামি ছাড়া কিছু নয়।” সব বুঝেও অর্ক নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। আজও রুবির সাথে দেখা করতেই সাইবার ক্যাফেতে যাচ্ছে। ওর ওখানে আসার কথা। পকেটে ফোনটা বেজে উঠলো।

“হ্যালো।”

“হ্যালো, আমি রুবি বলছি। অর্ক, লক্ষী সোনাটি আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে?”

“তুমি একবার শুধু বল না কী করতে হবে।”

“আমি ক্যাফেতে আসতে পারছি না। তুমি একটি বার আমার বাড়ি আসতে পারবে?”

“এক্ষুনি আসছি।” হেসে ফেলল অর্ক। মনে মনে খুশিও হলো। রুবি কোনও দরকারে তাকে ডাকছে এটা তার কাছে বিশাল প্রাপ্তি।

“শোনো তুমি পেছনের রাস্তাটা দিয়ে এসো। কেউ দেখলে আবার কিছু বলবে।” রুবির সাবধানী গলা।

দরজার ওপারে দাঁড়ানো রুবি অর্ককে দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো, “তুমি সত্যি এসেছ অর্ক!”

ভেতরে ঢুকে অর্ক বলল, “বল কী দরকারে এত জরুরী তলব?”

“যদি বলি তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল তাই ডেকেছি।” মুখ নিচু করে মৃদু স্বরে বলল রুবি।

অর্ক নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অবাক হয়ে রুবির দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার নজর আটকে গেল রুবির হাতের দিকে। সাদা ধপধপে হাতে কালো দাগ কীসের? কাছে গিয়ে বুঝলো ওগুলো পোড়া দাগ। তার না বলা প্রশ্নটা রুবি নিজেই বুঝে নিল, “ওগুলো সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ। কাল রতন বাড়ি এসেছিল। জানো অর্ক ও কোনওদিন আমায় ভালোবাসেনি। বিয়ের পর থেকেই মারধোর, ছ্যাঁকা দেওয়া এসব চলে। আমি আর পারছি না অর্ক।” ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রুবি। অর্ক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ছুটে গিয়ে রুবিকে জড়িয়ে ধরল। অর্কর বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে রুবি বলল, “আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি অর্ক। আমাকে তুমি ফিরিয়ে দিও না। আমাকে রতনের হাত থেকে মুক্ত হতে সাহায্য কর।”

আবেগ মথিত কণ্ঠে অর্ক বলল, “আমি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালবাসি। বল কী করতে হবে?”

চোখ মুছে রুবি যা বলল তার সারমর্ম এই যে রতন এক তান্ত্রিকের কাছে যাতায়াত করে। রুবি যদি রতনকে ডিভোর্স দিতে চায় তাহলে তান্ত্রিক তার ক্ষমতা বলে রুবির ক্ষতি করবে। এদিকে রুবি এক সিদ্ধ পুরুষের সন্ধান পেয়েছে যিনি তাকে এক সাধন মার্গ দর্শন করিয়েছেন। সেই পথে সাধনা করলে রতনের সঙ্গী তান্ত্রিক দুর্বল হয়ে পড়বে কিন্তু একলা সেই সাধনা সম্ভব নয়। একজন সঙ্গী প্রয়োজন।

অর্ক রুবির হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল, “আমি প্রতি মুহূর্তে তোমার পাশে আছি।”

১৩ই মে, ২০১৮

খুব সন্তপর্ণে বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল অর্ক। তার মা-বাবা, বৌদি সবাই গভীর নিদ্রায় মগ্ন। তাদের অজ্ঞাতেই গত দুদিন ধরে রাত সাড়ে এগারোটা বাজলেই নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে রুবির বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। তাদের বাড়ির পেছন দিয়ে একটা সরুগলি পথ রুবির বাড়ি পর্যন্ত চলে গিয়েছে। রুবির বাড়িটা পাড়ার একপ্রান্তে বহুদিন তালা বন্ধই পড়ে ছিল। মালিকরা বাইরে থাকে। তারপর রুবি ভাড়া নিয়েছে। চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। সেই কৃষ্ণ সায়রের মধ্যে অর্কর টর্চের আলোটা বিন্দুসম। গন্তব্যে পৌঁছে অর্ক বুক ভরে একবার শ্বাস নিল। আজ রাত বারোটা বাজলেই তার সাবলকত্ব প্রাপ্তি হবে আবার আজই তাদের সাধনার অন্তিম দিন। এরপর রতনের লৌহজাল থেকে রুবির মুক্তি কেউ আটকাতে পারবে না। রাত বারোটা থেকে তিনটে পর্যন্ত চলে বিভিন্ন পূজাচার। তারপর অর্ক ফিরে যায় বাড়ি। তাকে বিশেষ কিছুই করতে হয় না। যা কিছু সব রুবিই করে সে শুধু খালি গায়ে একটা লাল কাপড় লুঙ্গির মত করে পরে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। অবশ্য তাকে মড়ার খুলিতে করে একটা পুতি গন্ধময় জঘন্য তরল খেতে হয়। সেটা খাবার পর ঘন্টা দুয়েক মাথাটা ঝিমঝিম করে, সব কিছু ঝাপসা লাগে তারপর সব ঠিক হয়ে যায়। সে যাই হোক রুবির জন্য সে নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে পারে। সমস্ত উপকরণ রুবিকে সেই সিদ্ধ পুরুষই জোগাড় করে দিয়েছেন। রুবির বাড়ির পেছন দিকে একটা ঘর আছে। সেই ঘরটাই সাধনার জন্য রুবি ব্যবহার করছে। মেঝেতে ওর সেই গুরুর নির্দেশ মত সিঁদুর দিয়ে কিছু নকশা আঁকা। ঘরের এক প্রান্তে পাঁচটা মড়ার খুলি সাজানো আর আরও বিভিন্ন উপচার রাখা আছে। অর্ক ঢুকতেই রুবি ওকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। অর্ক হেসে বলল, “এখনও তো পনের মিনিট বাকি।” রুবি ওর নাকটা টিপে দিয়ে বলল, “তখন তো সুযোগ হবে না পুজোয় বসে যাব।”

১৫ই জুন, ২১১৮

কাঁচের জানালার ওপাশে ঝকঝকে আকাশ। এখন পৃথিবীর মানুষ অনেক সচেতন তাই দূষণের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। একসময় তো পৃথিবী ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছিল। শেষে আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা জাতি-ধর্ম, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে একত্র হয়ে কিছু সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যার ফলস্বরূপ আজকের এই দূষণ মুক্ত পৃথিবী।

কায়া টবে লাগানো কৃত্রিম মানিপ্ল্যান্টটার গায়ে পরম মমতায় হাত বুলাচ্ছিল। এখন প্রায় সব বাড়িতেই এই ধরনের কৃত্রিম গাছ রাখা থাকে। সাধারণ গাছের তুলনায় এদের সালোকসংশ্লেষের হার প্রায় তিন গুণ ফলে বাড়ির পরিবেশ নির্মল থাকে। কায়ার চোখের কোল বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে মানিপ্ল্যান্টটার পাতার ওপর পড়ে জানালা দিয়ে আগত সূর্যরশ্মিতে হীরকদ্যুতির সৃষ্টি করল। এই গাছটা তাকে রিকি উপহার দিয়েছিল একুশ বছরের জন্মদিনে। নিজের পকেটমানির টাকা বাঁচিয়ে দিদির জন্য কিনে এনেছিল সে। বিয়ের পরে এই আপ্যার্টমেন্টে আসার সময় কায়া এটা সাথে নিয়ে এসেছিল। ছোট ভাইটা যে তার ভীষণ প্রিয়, ভীষণ আদরের কিন্তু আজ সে কোথায় আছে, তার কী পরিণতি হয়েছে কায়া কিচ্ছু জানে না। রিকি আদৌ বেঁচে আছে তো? কথাটা মনে আসতেই দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো কায়া। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে খেয়াল নেই তার। কাঁধের ওপর একটা স্পর্শ অনুভব করে মুখ তুলল সে। রাজ ফিরে এসেছে বাইরে থেকে। তাদের আপ্যার্টমেন্টে অপরিচিত লোক ছাড়া দরজা খোলার দরকার হয় না। যাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট সিস্টেমে লোড করা আছে তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যান করে আপনিই দরজা খুলে যায়।

“চল।”

“কোথায়?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে কায়া।

“গেলেই বুঝতে পারবে।” শান্ত গলায় বলে রাজ।

“প্লিজ রাজ, তুমি যদি আমার মন ভালো করার জন্য….।” কায়াকে কথা শেষ করতে দেয় না রাজ, “আমি তোমার এন্টারটেইনমেন্ট করার জন্য কোথাও যাব না। অন্য একটা জায়গায় যাব। আমার ওপর ভরসা নেই তোমার?”

রাজের হাতটা ধরে নিয়ে কায়া বলে, “রাগ করো না প্লিজ। জানো তো আমার মনের অবস্থা। তুমি দাঁড়াও আমি রেডি হয়ে আসছি।”

গাড়ির ম্যাপিং ডিসপ্লে বোর্ডে গন্তব্য স্থল হিসেবে রাজ সেট করল, “গ্রাভিটি "। কায়া অবাক হয়ে বলল, “গ্রাভিটি মানে তো তোমার সেই হাফ ম্যাড প্রফেসর সেনের বাড়ি।”

“হুম” সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় রাজ।

“প্রফেসর সেনের বাড়ি যাবে এখন?”

“হুম, গাড়ি সিগন্যাল দিচ্ছে রাস্তায় জ্যাম আছে। স্কাই পাথই বেটার।” গাড়ির সিস্টেম চালু করে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসল রাজ। মুহূর্তের মধ্যে তার গাড়ির চাকাগুলো ভেতরে ঢুকে গিয়ে তার বদলে চারখানা ফ্লিপার বেরিয়ে এল। মাটির থেকে তিরিশ ফুট ওপরে স্কাই পাথ বেয়ে বাতাস কেটে এগিয়ে চলল তাদের গাড়ি। দামি গাড়ির মালিকরা এখন স্কাই পাথটাই পছন্দ করে কারণ কমদামি গাড়িতে এই সুবিধা না থাকায় স্কাই পাথে ভিড় কম হয়।

“এই সময় হঠাৎ প্রফেসর সেনের বাড়ি যাচ্ছ?”

কায়ার প্রশ্নে একটু চুপ করে থেকে তারপর মুখ খোলে রাজ, “তোমাকে একটা কথা বলিনি। যখন বুঝতে পারলাম রিকির অন্তর্ধান রহস্য ভেদ করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না আর আমরাও কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি না তখন আমি প্রফেসরের কাছে যাই। তুমি তো ওনার অগাধ পাণ্ডিত্য, অসাধারণ বুদ্ধি সম্পর্কে সবই জানো। মানুষটা একটু খ্যাপাটে হলেও সারা পৃথিবীর মানুষ ওনার প্রতিভার সামনে নতজানু হয়। যদি কিছু বুঝতে পারেন এই ভেবে গিয়েছিলাম। উনি সময় চেয়েছিলেন। আজ উনি তোমাকে সাথে নিয়ে যেতে বলেছেন।”

“তুমি আমাকে আগে কিছু বলনি কেন?”

“বললে তোমার মনে আশা জাগত। হয়ত বাবা-মাকেও বলতে কিন্তু আদৌ কোনও পথ বেরবে কিনা আমি নিজেই জানি না তাই বৃথা তোমাদের কষ্ট আর বাড়াতে চাইনি।”

কথা বলতে বলতে ওরা প্রফেসর সেনের বাড়ি পৌঁছে গেল। শহর ছাড়িয়ে কয়েক একর জায়গার ওপর প্রফেসরের “গ্রাভিটি” অর্থাৎ বাড়ি আর ল্যাবরেটরি। বাড়ির নামটা প্রফেসর নিজেই রেখেছেন। রাজ আগেই সিগন্যাল পাঠিয়েছিল তাই নির্বিঘ্নে ল্যান্ডিং প্যাডে নামতে পারল ওরা।

“আরে এসো এসো ভেতরে এস। তোমাদের মত ইয়ং কাপলরা মুখ গোমড়া করে রাখলে একটুও দেখতে ভালো লাগে না তাই স্মাইল প্লীজ।” প্রফেসরের উষ্ণ অভ্যর্থনায় কায়ার মনে একটু আশার আলো উঁকি দিল। পারলে এই মানুষটাই পারবেন।

“একী চেহারা করেছ?” কায়াকে দেখে আঁতকে উঠলেন প্রফেসর। তিনি নিজে খুব স্বাস্থ্য সচেতন। লম্বা, ফর্সা মানুষটিকে দেখলে মনেই হবে না পঞ্চান্ন বছর বয়স হয়ে গেছে তাঁর।

“সবই তো জানেন। আপনার তো এত বুদ্ধি পারেন না আমার ভাইটাকে খুঁজে দিতে?” কায়া কেঁদে ফেলল।

“কেঁদো না কায়া। আমি এই বিষয়েই কথা বলতে তোমাদের ডেকেছি।”

কায়া আর রাজ একবুক আশা নিয়ে প্রফেসরের দিকে তাকায়।

“আমি তোমাদের আগে একটা গল্প শোনাতে চাই।”

অবাক হলেও কায়া আর রাজ চুপ করে থাকে কারণ তারা জানে এই গল্প শোনানোর পেছনে নিশ্চয়ই কিছু গূঢ় অর্থ আছে।

প্রফেসর জ্যোতির্ময় সেন শুরু করেন, “আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে এই বঙ্গদেশের বুকে রজনী নামে এক রূপজীবিনি ছিল। কোন জায়গায় থাকত বলছি না কারণ সেসব নাম এখন বদলে গেছে তোমরা বুঝতে পারবে না। তার রূপের মোহে কত আমির হয়েছে ফকির, কত প্রেমিক হয়েছে উন্মাদ তার ঠিক নেই। তার রূপের জালে যে একবার ধরা দিত রজনী তাকে নিঙড়ে নিত। কিন্তু এই রজনীর মনেও একটা আশঙ্কা ছিল। নিজের ওই ভরা জোয়ারের মত যৌবন হারাবার ভয় তাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়াতো। সে ভালো করেই জানতো তার এই রূপ-যৌবন চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে ভাটার টান আসবেই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। নিজের রূপ-যৌবন ধরে রাখার উপায় খুঁজছিল সে। এমন সময় তার সাথে এক তান্ত্রিকের পরিচয় হয়। সাধনার দ্বারা অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিল সেই তান্ত্রিক। সেই তান্ত্রিকের সাধন সঙ্গিনী হয়ে রজনী এক অদ্ভুত ক্ষমতা লাভ করে। উপযুক্ত তন্ত্র সাধন ক্রিয়ার মাধ্যমে তার যৌবনের পিয়াসী সুলক্ষণ যুক্ত বিপরীত লিঙ্গের মানুষের অর্থাৎ বলা যায় একজন পুরুষের জীবনী শক্তি হস্তগত করতে সমর্থ হয় সে। এই তান্ত্রিক ক্রিয়ার ফলে রজনীর বয়স পঁচিশেই আটকে থাকে আর একজন পুরুষের জীবনী শক্তি হরণ করার পর সে একশ বছর ওই ভাবে কাটাতে পারে। একশ বছর পর আবার তার সর্ব সুলক্ষণ যুক্ত পুরুষের দরকার হয়। এক কথায় বললে রজনী অমরত্ব এবং চিরযৌবন দুটোই করায়ত্ত করেছে। এক আঠারো বছর বয়সী সৈনিক ছিল তার প্রথম শিকার। এই তন্ত্র সাধনার নিয়ম অনুযায়ী প্রতি একশ বছর পর তাই তার আঠারো বছর বয়সী পুরুষেরই প্রয়োজন হবে নিজের রূপ-যৌবন রক্ষা করার জন্য। একটা কথা বলা হয়নি, ক্ষমতা লাভ করার পরই সে তার গুরু সেই তান্ত্রিককে ছলনা করে মেরে ফেলে।” এতদূর বলে প্রফেসর একটু থামলেন। কায়া আর রাজ মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে। জল খেয়ে প্রোফেসর আবার শুরু করলেন, “তোমরা অবাক হচ্ছ জানি কারণ আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এগুলো গল্প-কথা ছাড়া কিছুই মনে হবে না কিন্তু আমি কেন এই একথাগুলো বলছি তোমরা অচিরেই বুঝতে পারবে। আমি কিছুদিন আগে আমার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে আমাদের আদি বাড়িতে গিয়েছিলাম। জায়গাটা একসময় একটা মফস্বল শহর ছিল। এখন অনেক উন্নতি হয়েছে সে যাই হোক সেখানে পুরোনো একটা আলমারী থেকে আমার ঠাকুরদার অল্প বয়সের একটা ডায়েরী হাতে পাই। সেই ডায়েরী থেকে জানতে পারি আজ থেকে একশ বছর আগে রুবি রায় নাম্নী এক অসাধারণ সুন্দরী যুবতীর আবির্ভাব ঘটে ওই পাড়ায়। অর্ক দাশগুপ্ত নামে একটি বছর সতেরোর ছেলে পাগলের মত তার প্রেমে পড়ে যায়। রুবি রায়ও তাকে প্রশয় দেয় এবং নিজের স্বামীর অত্যাচারের কথা বলে তাকে এক তান্ত্রিক ক্রিয়ায় সামিল করে। অর্ক যেদিন আঠারো বছরে পা দেয় সেদিন রাত থেকে অর্ক এবং রুবি দুজনেই নিখোঁজ হয়ে যায়। রুবির বাড়িতে তান্ত্রিক ক্রিয়ার কিছু উপচার আর ছাইয়ের স্তুপ ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি।”

প্রফেসরকে বাধা দিয়ে কায়া বলে ওঠে, “এতো একদম ভাইয়ের মতো ব্যাপার!”

“হুম, রাজ যখন আমাকে জানায় রিকির বন্ধুরা জানিয়েছে যে রিকি রেবেকা নামে একটি পঁচিশ বছরের মেয়ের প্রেমে পড়েছিল এবং নিজের আঠারো বছরের জন্মদিনে উধাও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় রেবেকার বাড়িতে মড়ার খুলি, ছাই এসব পাওয়া গেছে তখনই আমি চমকে উঠি। তোমরা জানই তো বিভিন্ন বিষয়ে আমার আগ্রহ। আমি পুরনো দিনের বইপত্র খুব পড়ি আর সংগ্রহও করি। দাদুর ডায়েরি পাওয়ার পর এ বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে আমি অনেক পুঁথি, পুরনো তুলট কাগজ আরও বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে যেসব কাটা কাটা সূত্র পাই সেগুলোকে জুড়ে আমি এই গল্পটা খাড়া করতে পেরেছি। মাঝের কথা জানা নেই তবে আমার ধারনা রজনী, রুবি আর রেবেকা একই ব্যক্তি।”

“তার মানে ভাই আর...।” কেঁদে ওঠে কায়া।

“তুমি ঠিকই ধরেছ কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।” প্রফেসর বলেন।

“কী কথা প্রফেসর?” রাজের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।

“এই রজনী বা রুবি যাই বল না কেন একে না আটকালে প্রতি একশ বছর পর একটা করে জীবন অকালে শেষ হয়ে যাবে।”

“কীভাবে ওকে আটকান যাবে? ওকে আমরা খুঁজব কীভাবে?” কায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে।

“ওকে বর্তমান সময়ে খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল আশা করি সেটা তোমরা বুঝতে পারছ।”

“তাহলে?” রাজ প্রশ্ন করে।

“আমার ল্যাবে চল।”

প্রফেসরকে অনুসরণ করে ওনার ল্যাবে এল ওরা। উনি সঙ্গে থাকায় নিরাপত্তার বেড়াজাল সহজেই পার হয়ে গেল। বিশাল ল্যাব ওনার। কয়েকজন সহকারী কাজ করছে। তারা প্রত্যেকেই বিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রছাত্রী।

“তারা, রুম নম্বর থ্রিতে যাব আমরা।”

“ওখানে!” সহকারী মেয়েটি অবাক হয়।

“হুম।” গম্ভীর স্বরে বললেন প্রফেসর।

স্বয়ংক্রিয় দরজার ওপারে গিয়ে দাঁড়ায় ওরা। প্রফেসর ওদের দিকে ঘুরে বলেন, “আমি যা বলছি আগে মন দিয়ে শোন। এটা কী বলত?” সামনে রাখা গাড়ির মত একটা জিনিস দেখিয়ে জিগ্যেস করেন।

“নতুন ধরনের কোনও গাড়ি।” রাজ উত্তর দেয়।

“নো, ইয়ং ম্যান। ইটস আ টাইম মেশিন। মাই নিউ ইনভেনশন।” বিস্ময়ে রাজ আর কায়ার চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। প্রফেসর আবার শুরু করেন, “এটার কাজ এখনও শেষ হয়নি, সবে শুরু হয়েছে, মানে এটাতে আরও পারফেকশন আনতে হবে। ইটস আ ভেরি টাফ জব। এখন পর্যন্ত এটার সীমা ১৯৬৮ সাল থেকে ২১১৭ সাল পর্যন্ত ।”

“মানে?” কায়া প্রশ্ন করে।

“মানে অতীত কালে ১৯৬৮ সালের চেয়ে আরো পিছিয়ে যেতে পারবে না আবার ২১১৭ সালের জানুয়ারির পরেও ঢুকতে পারছে না অর্থাৎ গত সতেরো মাসের মধ্যেও ঢুকতে পারছে না। ভবিষ্যতের দিকে এখনও কাজ শুরুই করিনি। আসলে এটার প্রসেস অতন্ত্য জটিল। যাই হোক এবার আসল কথায় আসি। তোমরা বুঝতেই পারছ আমার পক্ষে এই মুহূর্তে একমাস পিছিয়ে রিকিকে রক্ষা করা সম্ভব নয় তাই আমি ঠিক করেছি একশ বছর আগে পিছিয়ে অর্ক দাশগুপ্তকে বাঁচাবো আর সেই সঙ্গে রুবিকে ধ্বংস করব। আমার গাট ফিলিং বলছে রজনী, রুবি,রেবেকা… দে আর সেম পার্সন। বলতে পার একটা চান্স নিতে চাই। যদি একটা ছেলেও বাঁচে।”

“আপনি একলা যাবেন?” কায়া প্রশ্ন করে।

“হুম, টাইম ট্রাভেল ইজ আ কমপ্লিকেটেড ম্যাটার। কিছু যদি গণ্ডগোল হয়, বর্তমানে নাও ফিরতে পারি। আরও বড় বিপদও হতে পারে।”

“আমি আপনার সঙ্গে যাব।” দৃঢ় কণ্ঠে বলে কায়া।

“কায়া ঠিক বলেছে। আমিও যাব।”

প্রফেসর প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না কিন্তু ওদের অনুরোধ-উপরোধের সামনে শেষে পরাজিত হলেন। ঠিক হল কিছু প্রস্তুতি নিয়ে অভিযান শুরু হবে।

১৩ই মে, ২০১৮

একটা তীব্র ঝাঁকুনি তারপর সব অন্ধকার। কয়েক মুহূর্ত পরে প্রফেসরের গলা, “লেটস গো গাইজ। ওয়েল কাম টু মাই নেটিভ প্লেস।” চোখ খুলে টাইম মেশিনের বাইরে বেরিয়ে এল ওরা। টাইম মেশিনটা দেখলে যে কেউ ভাববে একটা দামি চার চাকা গাড়ির অতিরিক্ত কিছু নয় এটা। চারপাশে তাকিয়ে ওরা বুঝতে পারল জায়গাটা একটা বাড়ির ব্যাকইয়ার্ড। বাড়ির পেছনে অনেকটা পাঁচিল ঘেরা জায়গা তার মধ্যেই এখন টাইম মেশিন শুদ্ধ ওরা তিনজন। ওদের প্রাথমিক বিস্ময় কাটতে প্রফেসর বললেন, “এটা আমারই বাড়ি তবে একশ বছর আগে। আমার দাদু শ্রী রবিন সেনের ডায়েরি অনুযায়ী আজ বাড়িতে শুধু আমার দাদু আছেন। বাকিরা একটা শ্রাদ্ধ বাড়িতে গেছেন। পরশু ফিরবেন। একটা কথা বলা হয়নি আমার দাদু ছিলেন অর্ক দাশগুপ্তের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। রুবি যেসব কথা বলতে বারণ করেছিল দাদুর চাপাচাপিতে অর্ক সেসব প্রিয় বন্ধুকে বলে ফেলেছিল। দাদুর কাছ থেকেই সব জেনে রুবির বাড়িতে সবাই খোঁজ করতে গিয়েছিল। অর্ককে বাঁচাতে দাদুর সাহায্যের খুব প্রয়োজন হবে আমাদের। চল ভেতরে যাই। পেছনে কুয়ো তলার খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো ওরা। গান ভেসে আসছে, “দেখা জো তুঝে ইয়ার দিল মে বাজি গিটার...।” একটি ছেলে স্যান্ড গেঞ্জি আর গন্ডা খানেক পকেটওয়ালা বারমুডা পরে উদ্বাহু হয়ে গানের তালে নাচছে। প্রফেসর দেখে মনে মনে ভাবলেন, “এইরকম নাচের স্টাইলকেই কি ভাসান ডান্স বলত আগে?”

“দেখছ এই ব্যক্তিটিই ভবিষ্যতে আমার ওপর খবরদারি করবেন। আমাকে ভদ্রলোক করার চেষ্টা করবেন আবার বাবাকে বলে আমার প্রথম প্রেম অঙ্কুর তো দুরস্থান বীজেই নষ্ট করবেন।” প্রফেসরের বলার ভঙ্গিতে ওরা হেসে উঠলো। নাচতে নাচতে এতক্ষণে রবির চোখ গেল ওদের দিকে। হঠাৎ করে এমন অনাহুত অতিথি দেখে রবি হতভম্ব হয়ে গেল। কিছু বলতে গেল সে কিন্তু তার আগেই প্রফেসর তাঁর পকেট থেকে পিস্তলের মত একটা জিনিস বের করে রবির দিকে তাক করে বললেন, “বেশি ট্যা ফো করবে না। ভবিষ্যতে অনেক জ্বালাবার সুযোগ পাবে আমাকে। যা বলছি মন দিয়ে শোনো এখন। আমরা ভবিষ্যতের মানুষ। আমি তোমার আপন নাতি। আজ থেকে দশ বছর পর আমার ঠাকুমার কপাল পুড়বে। তোমার একমাত্র ছেলের একমাত্র ছেলে আমি। রুবি রায়ের হাত থেকে অর্ককে বাঁচাতে এসেছি আমরা।” রবি কাঁপতে কাঁপতে প্রশ্ন করে, “আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”

“জানি তো তোমার বুদ্ধির বহর। ঠাকুমা কি আর সাধে বলত এই লোকটা আমার জীবনটা শেষ করে দিল। যাই হোক শোনো এখন।” প্রফেসর ভালো করে সমস্ত ব্যাপারটা এবং তাঁদের আসার উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বললেন রবিকে।” শুনতে শুনতে রবির মুখটা ক্রমশ হাঁ হয়ে যাচ্ছিল। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তার কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রফেসর তার বিশ্বাস অর্জন করেই ছাড়লেন। হাজার হোক দাদু-নাতির সম্পর্ক। কায়ার দুচোখ ভরা জল দেখে ভারী মায়া হলো রবির। তার দিদির মতোই তো তাছাড়া এঁদের কথা অনুযায়ী অর্কর সামনে বড় বিপদ। রুবি বৌদিকে শুরু থেকেই কেমন একটা লাগতো তার। অর্ককে যেন বশ করে ফেলেছে। সমস্ত চিন্তাভাবনা যেন লোপ পেয়েছে ছেলেটার। রবি ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “অর্ককে সব বলে দিলে হয় না?”

“না হয় না, কারণ প্রথম কথা অর্ক আমাদের কথা বিশ্বাস করবে না। প্রেমে পড়লে মানুষ অন্ধ, বোবা, কালা সব হয়ে যায়। এই কথাটা আমার দাদু মানে তুমিই আমাকে বলেছিলে যখন কলেজে পড়তাম। আর দ্বিতীয়ত আমার লক্ষ্য শুধু অর্ককে বাঁচান নয়, রুবির ধ্বংস নাহলে ও তো আবার নতুন শিকার খুঁজে নেবে।

“আমরা তাহলে কী করব?”

“আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে শোনো মন দিয়ে।” খাটের উপর সবাই বসলেন। প্রফেসর তাঁর পরিকল্পনা ভালো করে বুঝিয়ে বললেন ওদের। সবশেষে বললেন, “আমার প্ল্যান যে সাকসেসফুল হবেই তার কোনও গ্যারান্টি নেই কিন্তু চেষ্টার তো কোনও বিকল্প নেই।”

১৩ই এপ্রিল, ২০১৮

“কাকিমা, অর্ককে একটু নিয়ে যাব আমার সাথে? আমার এক দাদু এসেছেন ওনাকে মহামায়া মন্দিরে নিয়ে যাব।”

“কীসে যাবি তোরা?”

“দাদুর ফোর হুইলার আছে।”

“আচ্ছা নিয়ে যা তাহলে।” নিশ্চিন্ত হন অর্কর মা।

“ফিরতে দেরি হলে চিন্তা করো না।”

“ঠিক আছে।”

বাড়ি থেকে বেরিয়ে অর্ক বলে, “তোর কোন দাদু এসেছেন রে?” মুচকি হেসে রবি বলে, “নাতি দাদু।”

“মানে?”

“মানে ওনার নাম ওটা।”

“ভারী অদ্ভুত নাম তো। আচ্ছা আজ তো তোদের কোথায় যেন অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণ ছিল ?”

“ছিল তো সবাই গেছে। দাদুর জন্য আমি রয়ে গেছি।” মনে মনে রবি ভাবে, “আজকের রবি তো সপরিবারে বর্ধমানে মাসির বাড়িতে কব্জি ডুবিয়ে খাচ্ছে। তুই তো জানিস না আমি হলাম একমাস পরের রবি।”

অর্ককে নিয়ে রবি ওদের বাড়ির পেছনে এল।

“তোর দাদুর গাড়িটা দারুণ।” মুগ্ধ হয়ে বলে অর্ক।

“চল গাড়িতে উঠি। দাদু গাড়িতেই আছেন।” গাড়িতে ওঠার পর জ্যোতির্ময় বলেন, “ইয়াং ম্যান হ্যাভ আ ড্রিংক।” জ্যোতির্ময়ের বাড়ান ড্রিঙ্কের ক্যানটা থেকে দু চুমুক খাওয়ার পরই অর্কর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো। জ্যোতির্ময় তারিখ আর সময় সেট করলেন।

১৩ই মে, ২০১৮

চারিদিক নিস্তব্ধ শুধুমাত্র ঝোপের মধ্য থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। কায়া আর রাজ রুবির বাড়ির পেছন দিকে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের কয়েক হাত দুরেরই রুবির বাড়ির ভাঙা পাঁচিল আর তার বামদিকে সেই ঘরখানা। প্রফেসরের তৈরি নাইট ভিশন স্পেক্টাগ্লাসের সাহায্যে ওরা সবকিছু দিনের আলোর মত পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে। অর্ককে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আগেই রুবি ওই ঘরে ঢুকেছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল প্রফেসর আর রবি এখনও এলেন না। শেষ রক্ষা কি সম্ভব হবে? কায়া এবং রাজ দুজনের মনেই আশঙ্কার কালো মেঘ উঁকি দিচ্ছে। হঠাৎ মাটিতে মৃদু কম্পন শুরু হলো ।কয়েক সেকেন্ড পরে প্রফেসরের টাইম মেশিন দৃশ্যমান হলো। ভেতরে প্রফেসর, রবি আর অচৈতন্য অর্ক। প্রফেসর বেরিয়ে এসে বললেন, “আর দেরি নয়। কায়া তোমাকে কী করতে হবে মনে আছে তো?”

“ইয়েস প্রফেসর।”

“ওকে, তুমি তোমার জায়গায় চলে যাও। আমার সিগন্যাল পেলেই কাজ শুরু করবে আর রাজ তোমরা অর্কর জামা-কাপড় খুলে লাল কাপড়টা পরিয়ে নিয়ে এসো।”

জানালার একচিলতে ফাঁক দিয়ে প্রফেসর দেখলেন ঘরের মাঝখানে তান্ত্রিক ক্রিয়ার একটা নকশার ওপর বসে আছে অর্ক। সে যে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তার সামনে বসে রুবি মন্ত্রোচ্চারণ করছে। হাতের কব্জিতে পরা ঘড়ির মত যন্ত্রটায় বোতাম টিপে সিগন্যাল পাঠালেন প্রফেসর।

যত সময় পার হচ্ছে রুবির মনটা এক অপার্থিব আনন্দে ভরে উঠছে। আর অল্প কিছু তান্ত্রিক ক্রিয়ার পরই আবার একশ বছরের জন্য সে নিশ্চিন্ত। তার প্রথম শিকার ছিল এক রাজ সৈনিক, তারপর একে একে এক তরুণ ভাস্কর, জমিদার তনয়, নবীন ব্যবসায়ী হয়ে আজকের এই অর্ক। অপ্রতিরোধ্য সে। উত্তুঙ্গ তার আত্মবিশ্বাস। অকস্মাৎ চমকে উঠল রুবি। মূল বাড়ির দিক থেকে এক পৈশাচিক আওয়াজ ভেসে আসছে। হাড়হিম করা ভয়ানক সে আওয়াজ। বাড়িটাও কাঁপছে মনে হচ্ছে। অর্ক কোথাও পালাবার মত অবস্থায় নেই তাই তাকে অরক্ষিত রেখেই রুবি বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। সে বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে প্রফেসর তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে অসম্ভব দ্রুততায় ঘরে ঢুকলেন। ঘরে উপস্থিত অর্কর জায়গায় তাঁদের সাথে নিয়ে আসা অর্ককে বসিয়ে দিয়ে বর্তমান অর্ককে নিয়ে ঘরের কোণায় চলে এলেন তাঁরা। তাঁর তৈরি ফোর ডি ক্রিয়েটার নামক গ্যাজেটটি চালু করার সঙ্গে সঙ্গে কায়াকে সিগন্যাল পাঠালেন। তাকে বলাই আছে সংকেত পেলেই সাউন্ড ভাইব্রেটরটি বন্ধ করে দিতে কারণ তিনি কোনও মতেই রুবির মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে চান না, তাছাড়া কায়া ধরা পড়ে গেলে ওকে মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দেওয়ার মত ক্ষমতা রুবির আছে।

রুবি বসার ঘর পর্যন্ত আসতেই চারিদিক পূর্ববৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অবাক হয়ে ব্যাপারটা কী ঘটল অনুধাবন করার চেষ্টা করতে লাগলো সে। অন্যদিকে কায়ার হৃদস্পন্দন ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। আপাদমস্তক কালো পোশাক পরিহিতা কায়া বাগানের একটা ঝাঁকড়া গাছের পেছনে লুকিয়ে আছে হাতে সাউন্ড ভাইব্রেটরের রিমোট। যন্ত্রটা রাখা আছে বাইরের ঘরের জানালার নীচে। কয়েক মিনিট পর রুবির সম্বিৎ ফিরল। সাধনার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে তাছাড়া অর্কও একলা আছে ওখানে। তাড়াতাড়ি সে ফিরতি পথ ধরল।

অর্ক একই রকম ঝিমুনি ভাব নিয়ে বসে আছে দেখে নিশ্চিন্ত মনে আবার কাজ শুরু করল সে। ততক্ষণে ফোর ডি ক্রিয়েটারের সাহায্যে ঘরের মধ্যেই একটা হাইপার কিউব তৈরি করে সঙ্গীদের নিয়ে তার মধ্যে আত্মগোপন করেছেন প্রফেসর। এছাড়া উপায় ছিল না প্রায় সংজ্ঞাহীন অর্ককে বের করে নিয়ে যেতে গেলে রুবির চোখে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। রুবি একমনে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছে সে বুঝতেও পারেনি এই ঘরের মধ্যেই চতুর্থ মাত্রায় তিনজন অনাহুত ব্যক্তি আর আরেকজন অর্কর অস্তিত্ব আছে। প্রফেসরের তৈরি ফোর ডি স্পেক্টাগ্লাসের সাহায্যে রুবির ক্রিয়াকলাপ তাঁরা দেখতে পেলেও রুবি তাঁদের দেখতে পাচ্ছে না। অন্তিম মুহূর্তে পৌঁছে গেছে রুবি ওরফে রজনীর সাধনা। সে একটু একটু করে অর্কর প্রাণশক্তি হরণ করার জন্য প্রস্তুত হলো। আর কয়েক মুহূর্ত পরেই সে অমরত্বের দিকে আরো এক কদম এগিয়ে যাবে আর অর্কর দেহটা হয়ে যাবে এক মুঠো ছাই। কিন্তু একীহচ্ছে অর্কর প্রাণশক্তি শোষণ করা শুরু করতেই তার শরীরের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে কেন! জরা ক্রমশ থাবা বসাচ্ছে তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গে আর অর্কর মধ্যে কোনও পরিবর্তনই ঘটছে না। কী করে সম্ভব এটা! অর্ক তো সর্ব সুলক্ষণযুক্ত পুরুষ আর রাত বারোটা বাজতেই সে আঠারো বছরে প্রবেশ করেছে তাহলে? রুবি জানতেও পারল না সে যে অর্কর প্রাণশক্তি হরণ করার চেষ্টা করেছে তার বয়স আঠারোর সীমা অতিক্রম করেনি। এই অমরত্ব সাধনায় সামান্য ত্রুটিও ক্ষমাযোগ্য নয়। রুবির জরাগ্রস্থ শরীরটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে নেতিয়ে পড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অবশেষে চারশ বছরের জরার ভার থেকে রুবির শরীর মুক্তি পেল। তার আত্মা বিলীন হয়ে গেল মহাকালের গর্ভে।

প্রফেসরের মুখে হাসির রেখার আঁকিবুকি। তাঁর পরিকল্পনা সফল হয়েছে। একটা ছয়শ বছরের পুরনো পুঁথি পড়ে তাঁর যা ধারণা হয়েছিল সেটাই প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। একমাস আগের অর্ককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে জেনেছে হঠাৎ সে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় মহামায়া মন্দিরে আর যাওয়া হয়নি। বর্তমানের অর্ক এখন রবির ঘরে বসে আছে। ইনজেকশন দিয়ে তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনা হয়েছে। আড়াল থেকে ওদের কথাবার্তা শুনছেন প্রফেসর।

“রবি বল না কী হয়েছে? আমি তোর বাড়িতে এলাম কী করে?” উদ্বিগ্ন গলা অর্কর।

“রুবি বৌদির বাড়িতে আগুন লেগেছে অর্ক। আমি তো জানতাম তুই ওখানে আছিস তাই ছুটে গিয়ে লোকজনের তোর ওপর লক্ষ্য পড়ার আগেই তোকে যাহোক করে বের করে আনি।”

“রুবি? রুবি কোথায়?” চেঁচিয়ে ওঠে অর্ক। প্রফেসরের শেখান কথাগুলো আউড়ে যায় রবি, “তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি রে। এতবড় বাড়িতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। নেহাত ওই ঘরটা পেছনে বলে তোকে বের করতে পেরেছি। ওখানে তো ছিল না। মনে হয় রুবি বৌদি আর….।”

“নাহ, হতে পারে না।” ডুকরে কেঁদে উঠলো অর্ক।

অর্ককে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়িতে রেখে এল রবি। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার আগে প্রফেসর আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। উনি চাননি এই সাধনার বিষয়ে কেউ বিন্দুমাত্র আভাসও পাক।

এবার বিদায়ের পালা। কায়া রবির হাত দুটো ধরে বলল, “যদিও সময়ের হিসেবে আমি তোমার চেয়ে অনেক ছোটো কিন্তু তাও তোমাকে আমার ভাইয়ের মত মনে হয়েছে। তোমাকে সারাজীবন মনে থাকবে।” কায়া আর রাজ বিদায় নেবার পর প্রফেসর বললেন, “আপাতত টা টা। তোমার আমার তো আবার দেখা হবে। তবে প্লীজ বেশি জ্বালিও না আমাকে।”

১৬ই জুন, ২১১৮

প্রফেসরের লিভিংরুমে বসে এনার্জি ড্রিঙ্কে চুমুক দিচ্ছিল কায়া। টাইম ট্রাভেল করার পর বর্তমানে ফিরে এসে ভীষণ দুর্বল লাগছে ওদের। টেবিলের ওপর কায়ার ফোনটা বেজে উঠলো। রাজ এক আকাশ হাসি মুখে নিয়ে ফোনটা কায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। ভিডিও কলারের মুখটা দেখেই কায়া চমকে উঠল।

“হেই দি হোয়াটস আপ? তুই আর জিজ কোথায়?”

রিকির কথাগুলো কানে ঢুকছে না কায়ার। প্রাণভরে ভাইকে দেখছে সে। দু চোখের কোল ছাপিয়ে আনন্দাশ্রু ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার গালে। প্রফেসর মিউজিক বক্সে তাঁর পুরোনো গানের সংগ্রহ থেকে 1969 সালের একটা

গান চালিয়ে দিলেন “মনে পড়ে রুবি রায় কবিতায় তোমাকে…”

সমীকরণ - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

“আদু এই আদু কী পাগলামি করছিস তুই!”

“আমি আজ যা খুশি করব। আয়াম ম্যাড।” চিৎকার করে বলল অদ্বিতীয়া। ওর কথাগুলো সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে কেটে কেটে ভেসে এল রাহুলের কানে। আপনমনে হেসে উঠলো সে। সত্যিই মেয়েটা পাগলী। একদম বাচ্চাদের মত এখনও। এই যে হঠাৎ করে মন্দারমনি আসার প্ল্যানটা এটাও তো ওরই। জলের মধ্যে ক্রমাগত লাফিয়ে চলেছে অদ্বিতীয়া। আছড়ে পড়া ঢেউগুলো যেন ওর খেলার সাথী। রাহুলের হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ থেকে ছয় বছর আগের একটা বর্ষণ মুখর দিন। ওর তখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ার আর অদ্বিতীয়ার ফাস্ট ইয়ার তবে অন্য কলেজ। পারিবারিক পরিচিতির কারণে একে অপরকে ভালো ভাবেই চিনত, জানত। সেদিন ওর কলেজের গেটের সামনে অদ্বিতীয়াকে দেখে অবাক হয়েছিল সে। ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে একটা গোলাপী ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা। অবাধ্য বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ছাতার বাধা সরিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল ওকে। ভিজে ঝুপ্পুস মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে কোনও রকম ভনিতা না করে বলেছিল, “রাহুল, আই লাইক ইউ। আই লাভ ইউ। তোকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল তাই ভাবলাম আজকেই তোকে কথাগুলো বলে দিই। তোর কোনও চাপ নেই। ভালো করে ভেবে আনসার দিস কারণ আমি ওই টাইম পাস রিলেসনশীপে নেই বস। আমি তোকে ভালোবাসি এটা জানিয়ে দিলাম। এবার তুই ভাব এখন আমার সাথে চুটিয়ে প্রেম করতে, ইন ফিউচার বিয়ে করতে, আমার বাচ্চার বাবা হতে আর আজ থেকে পঁচিশ বছর পর যখন আমার ওয়েট সত্তর কেজি হয়ে যাবে তখন ভালোবেসে আমার মুখ ঝামটা খেতে পারবি কিনা?” রাহুল হাঁ করে ওর কথাগুলো শুনছিল। এভাবেও প্রেম নিবেদন করে কেউ! যাই হোক অদ্বিতীয়ার কথাগুলো ওর কাছে মেঘমল্লার হয়ে বাজছিল কারণ অদ্বিতীয়াকে ওরও ভালো লাগতো শুধু সাহস করে বলা হয়ে ওঠেনি কখনও। মেয়েটার মধ্যে অদ্ভুত একটা সারল্য আছে। “আমি তাহলে এখন আসি। তুই ভাবিস তাহলে আমার প্রপোজালটা।” ছাতাটা পেছনে হেলিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছিল অদ্বিতীয়া যেন এক কাপ কফি খাওয়ার জন্য বলতে এসেছিল। রাহুল ওর হাতটা টেনে ধরে মুখে ছদ্ম গাম্ভীর্য এনে বলেছিল, “আমার ভাবা হয়ে গিয়েছে। আমি চাই না কোনও ছেলের জীবন নষ্ট হোক কারণ তোর মত ছিটেল মেয়েকে আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও ছেলে সামলাতে পারবে বলে মনে হয় না আমার।” ওর কথা শুনে অদ্বিতীয়া হেসে ফেলেছিল। হাসলে ওর গজ দাঁতগুলো বেরিয়ে ভারী মিষ্টি লাগে ওকে।

তারপর মাঝের বছরগুলোয় মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগে আরও দৃঢ় হয়েছে ওদের সম্পর্ক। ক্রমশ আরও কাছাকাছি এসেছে ওরা। মন্দারমনিতে এসে তো ওদের মধ্যে যেটুকু দূরত্ব, যেটুকু আড়াল ছিল তাও আবেগের স্রোতে ভেসে গেছে। পরিপূর্ণ রূপে ওরা একে অন্যের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।

“এই বসে বসে কী ভাবছিস রে? এখানে আয় না।”

অদ্বিতীয়ার ডাকে ওর কাছে ছুটে গেল রাহুল।

“এখানে এসে কি কবি হয়ে গেলি নাকি? বসে বসে শুধুই কী যেন ভেবে যাচ্ছিস।”

“প্রেমে পড়লে সবাই একটু আধটু কবি হয়ে যায়।”

“তাই নাকি! জানা ছিল না। লিখে ফেল তাহলে দু'চারটে কবিতা। বাবাকে বলে বই ছাপিয়ে দেব তোর।” হাসতে হাসতে বলল অদ্বিতীয়া। ওর বাবা বিজন মিত্র বর্তমান কালের একজন বিখ্যাত লেখক।

“আমি যদি লিখতে আরম্ভ করি তোর বাবাকে ছাড়িয়ে যাব বুঝলি।”

“এই এই একদম ফালতু বকবি না। কোথায় আমার বাবা আর কোথায় তুই! ফুহ!”

ওদের খুনসুটির মাঝেই একটা বিশাল ঢেউ এসে অদ্বিতীয়াকে বেসামাল করে দিল। ঢেউয়ের ধাক্কায় পড়ন্ত অদ্বিতীয়াকে রাহুল শক্ত হাতে ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। আকাশে অস্তগামী সূর্য, পায়ের তলায় অকূল পারাবারকে সাক্ষী রেখে দুটি প্রেমমগ্ন আঁখি পরস্পরের প্রতি নিবদ্ধ হয়ে রইল। সদা চঞ্চল ছটফটে অদ্বিতীয়ার মুখে হঠাৎই নববধূর লাজ। আবেগঘন কণ্ঠে বলল, “কথা দে এমনি করেই চিরকাল আমাকে সামলে নিবি। এমনি করেই প্রতি মুহুর্তে আমার পাশে থাকবি।”

তার হওয়ায় ওড়া অবাধ্য চুলগুলোকে সরিয়ে কপালে ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে রাহুল বলল, “কথা দিলাম।”

 

“এই রাহুল ওঠ না। বেড়াতে এসে কেউ ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোয়!”

“ঘুমোয় না তবে এইটা করে।” রাহুল অদ্বিতীয়াকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে আরম্ভ করলো।

“তবে রে দুস্টু। ওঠ বলছি।” অদ্বিতীয়ার সুড়সুড়ির চোটে রাহুল উঠতে বাধ্য হলো। জামাকাপড় বদলে রিসোর্টের পেছন গেটের দিকে রওনা হলো ওরা। অদ্বিতীয়ার ইচ্ছে ওই দিকে বেরিয়ে ঝাউবনের ধার দিয়ে কিছুক্ষণ রাহুলের হাত ধরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরবে। সবে মধ্যাহ্নের সূর্য অপরাহ্নের দিকে পা বাড়িয়েছে কিন্তু তার মধ্যেই আকাশে ইতিউতি জলভরা মেঘ উঁকি দিচ্ছে। ওরা গেটের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে এমন সময় হঠাৎ মেঘগুলো কান্নাকাটি আরম্ভ করলো। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ওরা ছুটে একটা শেডের তলায় চলে এল। পুরো রিসর্ট জুড়েই সুন্দর ডিজাইনের ছোট্ট ছোট্ট সিমেন্টের শেড বানিয়ে বসার জায়গা করা আছে। তারই একটা তে আশ্রয় নিল ওরা। ওদের কটেজটা এখান থেকে বেশখানিকটা দূরে। শেডটার পাশেই পাশাপাশি দুটো নাম না জানা লাল ফুলের গাছ। প্রায় একমানুষ উঁচু ঝাঁকড়া দুটি গাছ। তারপরেই একটা কটেজ। সব কটা কটেজেরই সামনে-পেছনে এক চিলতে ছোট্ট বারান্দা আছে। রোদের মধ্যে এই বৃষ্টির দৃশ্য ভারী মন মুগ্ধকর। এমন পরিবেশে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, নিস্তব্ধতাই শ্রেয়। ওরা চুপচাপ এই হঠাৎ বৃষ্টি উপভোগ করছিলো।

“বারান্দার মধ্যে কী দুস্টুমি শুরু করেছ ভেতরে চল । যত বয়স বাড়ছে তত অসভ্য হয়ে যাচ্ছ তুমি। ” কোনও এক মধ্যবয়সিনীর ন্যাকা ন্যাকা আদুরে গলা।

“ইটস ইওর ক্রেডিট বেবি।”

“তাই নাকি!”

“হুম তুমি এখনও এত গর্যাস, এত সেক্সি। কাছে এলেই পাগল হয়ে যাই আমি।” কামাতুর পুরুষ কণ্ঠ।

“হুহ। বৌকেও নিশ্চই একই কথা বল।”

“অ্যাবসলিউটলি নট।”

“তোমার বউ তো দারুণ সুন্দরী। তাও বলো না?”

“আমার বউ নো ডাউট সুন্দরী বাট ইউ আর ফায়ার। তোমার আগুনে পুড়ে যে কী সুখ তা তুমি বুঝবে না। এই এখন আমার বউ, তোমার বরের কথা ছাড়। এখন শুধু তুমি আর আমি। নেক্সট মান্থ গোয়া ট্রিপটা কিন্তু ফাইনাল। অনেকদিন তোমাকে নিয়ে দূরে কোথাও যাইনি। বরের জন্য বাহানা রেডি রেখো।”

“ডোন্ট ওরি। আমার ওই শান্তশিষ্ট, ভালোমানুষ বরকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। যাহোক বললেই হলো। চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে আমাকে।”

মধ্যবয়স্ক দুই নারী পুরুষের অন্তরঙ্গ কণ্ঠস্বর রাহুল আর অদ্বিতীয়ার মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলো। অদ্বিতীয়া পায়ে পায়ে গাছ দুটোর আড়ালে এসে দাঁড়ালো। গাছের ফাঁক দিয়ে কটেজের বারান্দাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রাহুলও এসে ওর পেছনে দাঁড়িয়েছে। শরীরী খেলায় মত্ত দুই নারী-পুরুষ খেয়ালই করল না চার জোড়া বিস্ময়াবিষ্ট চোখ তাদের লক্ষ করছে।

 

বেসিনের মধ্যে হড়হড় করে বমি করে ফেলল অদ্বিতীয়া।

“আদু কন্ট্রোল ইওর সেল্ফ।” অদ্বিতীয়াকে ধরে নিয়ে বলল রাহুল। অদ্বিতীয়া কাঁপতে কাঁপতে রাহুলকে জড়িয়ে ধরল। রাহুলেরও গা টা ক্রমশ গুলিয়ে উঠছে। কটেজের সেই মধ্যবয়স্ক প্রেমিক যুগল তখন বিছানার মধ্যে গভীর শরীরী আশ্লেষে মগ্ন। কামনার আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার জন্যই তো শহর থেকে দূরে নির্জনে পাড়ি জমিয়েছে তারা।

 

হাতের বইটা আঙুলের ফাঁকে ভাঁজ করে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন বিজন। আকাশ আজ কাজলা মেঘে সেজেছে। বইটা টেবিলে নামিয়ে রেখে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমে আসছে এই তপ্ত পৃথিবীর বুকে। হাতটা বাড়িয়ে দিলেন বিজন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তাঁর হাতে চুম্বন এঁকে যাচ্ছে। রুচিরা বাড়িতে থাকলে বিরক্ত হতো নিশ্চিত। বলত, "তোমাদের কবিদের এই রোমান্টিসিজমটা না ম্যানিয়ার মত।” আর বিজনের হারিয়ে ফেলা অতীতের মত ছিল “রোমান্টিসিজম না থাকলে কবি হওয়া যায় না।” বিজনের অতীত আর বর্তমানের মধ্যে অনেকটা বৈপরীত্য তবে বিজন কোনও দিন তুলনা করার চেষ্টাও করেননি কারণ অতীতকে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় কিন্তু বর্তমানের হাত ধরে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। অতীতকে বিজন তাঁর হৃদয়ের এক গোপন কুঠুরিতে বন্ধ করে রেখেছেন। তাকে কোনও দিন প্রকাশ করেন না শুধু কোনও দিন কোনও কবিতার ফাঁকে কিংবা মেঘলা বিকেলের মন খারাপের মাঝে সে জলছবি হয়ে বিজনের মানস পটে ভেসে ওঠে। রুচিরার সাথে বিজনের মানসিকতা, জীবনযাত্রায় অনেক ফারাক হলেও তাঁরা একপ্রকার সুখী দম্পতি হিসেবেই এতগুলো বছর একসাথে পার করে দিলেন কারণ তাঁরা একে অপরের প্রতি যথেষ্ট সহনশীল। রুচিরা একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চ পদে আসীন। তাঁর ব্যস্ততা নিশ্ছিদ্র যেখানে সংসার, স্বামী, সন্তানের জন্য সময় বড়ই অল্প। বিজনও ব্যস্ত থাকেন তাঁর কলেজ, সেমিনার, লেখালেখি নিয়ে কিন্তু তার মধ্যেও কোনও দিন কবিতার খাতাখানি খোলা রেখে বাগানে মেয়েকে নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন সাতরঙা প্রজাপতির পেছনে। কোনও দিন হঠাৎ করে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন লং ড্রাইভে। রুচিরার সময় বাড়ন্ত হলে পিতা-পুত্রী মিলেই হারিয়ে গেছেন অজানা, অচেনা কোনও গ্রামের ধানক্ষেতের আড়ালে কিংবা পা ডুবিয়ে বসে থেকেছেন ক্ষিণতনু কোনও স্রোতস্বিনীতে। রুচিরা কে কোনও দিন দোষ দেন না বিজন কারণ ওই রকম একটা দায়িত্বশীল পদে থেকে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মত ঘরকন্যা করা সম্ভব নয়। বিজন জানেন রুচিরা তাঁর সাধ্যমত চেষ্টা করেন কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে দূরত্বটা ঘোচাতে পারেন না। মানসিকতায় তফাৎ থাকলেও বিজন রুচিরার বড় গর্বের জায়গা। বিজন লক্ষ করেছেন কেউ বিজনের কোনও কবিতা বা উপন্যাসের প্রশংসা করলে রুচিরার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যখন বয়স কম ছিল তখন তো কেউ রুচিরার সামনে বিজনের প্রশংসা করলেই তারপর বিজনের প্রাপ্তিযোগটা বড় মধুর হত।

“দাদা চা।” মালার ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলেন বিজন।

“আদু এখনও ফেরেনি না?’

“আদু তো অনেকক্ষণ ফিরেছে। নিজের ঘরে আছে।”

অবাক হলেন বিজন। তিনি বাড়িতে আছেন অথচ আদু তাঁর কাছে না এসে নিজের ঘরে চলে গেছে এটা বোধহয় এই প্রথমবার ঘটল। ছোটবেলা থেকেই মায়ের সঙ্গ খুব একটা বেশি না পাওয়ার অভাবটা বাবাকে দিয়ে পুষিয়ে নেয় মেয়েটা। বাবাই ওর ফ্রেন্ড, ফিলজফার এন্ড গাইড। সবাইকে বলেও বাবা ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। রুচিরা মাঝে মাঝে ছদ্ম অভিমান করে বলে, “মেয়ে তো শুধু তোমার। আমাকে তো ওর দরকার নেই।” মেয়ে তখন মাকে জড়িয়ে ধরে, আদর করে একাকার করে। যখন আদু আর রুচিরা বিজনের সাথে থাকে বুকের গহনে একটা চিনচিনে বেদনা সত্ত্বেও বিজনের নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয় কিন্তু ইদানিং আকস্মিক আদুর আচার-আচরণের পরিবর্তন বিজনকে ভাবিত করছে। প্রাণচঞ্চল মেয়েটা হঠাৎ করেই একদম ধীর-স্থির শান্ত হয়ে গেছে। কথাবার্তাও বিশেষ বলে না প্রয়োজন ছাড়া। রুচিরাকে জানিয়েছেন বিজন কিন্তু সে তো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে। মেয়ে বড় হয়েছে মুড সুইং করতেই

পারে এই বলে পাত্তা দেয় নি।

 

অদ্বিতীয়া দরজা খুলে দেখল সামনে বাবা দাঁড়িয়ে। যে জলস্রোতকে ট্যাপের জলে নিশ্চিহ্ন করে এসেছে কয়েক মুহূর্ত আগে সেই স্রোতটা আবার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কোনও রকমে মৃদু স্বরে জিগ্যেস করল, “বাবা তুমি?”

“আমি কি একটু ভেতরে আসতে পারি?” বাবার গলার স্বরে চমকে উঠল আদু। বাবা তার সঙ্গে এরকম গম্ভীর গলায় এভাবে কখনও কথা বলেন না। অসহায় ভাবে বলল, “এরকম করে কেন বলছ?”

“বলছি কারণ তুমি বড় হয়ে গেছ। তোমার জীবনেও এমন কথা জন্ম নিচ্ছে যা আমার সাথে শেয়ার করা যায় না। আমি তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড থেকে এখন বোধহয় শুধু বাবা হয়ে গেছি।” আস্তে আস্তে কেটে কেটে বলা বিজনের কথাগুলো অদ্বিতীয়ার বুকে সৃষ্টি হওয়া ক্ষতস্থান থেকে নতুন করে রক্তপাত ঘটালো। চিরকাল বাবার স্নেহের শীতল ছায়ায় বেড়ে ওঠা মেয়েটার মনে হলো বাবার সাথে কয়েক যোজন দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বড় নিঃসঙ্গ সে। মাথার ওপর হাজার হাজার ফারেনহাইটের সূর্য যার উত্তাপে সে দগ্ধ হতে হতে এই ক্লেদাক্ত পৃথিবীর পাঁকে ডুবে যাবে।

“বাবা।” বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে। এই মানুষটা যে তার রাগ, অভিমান, ভরসা, বিশ্বাস সব কিছুর আশ্রয়। “ভেতরে গিয়ে বোস। আমি আসছি এক্ষুনি।” মেয়েকে ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন বিজন।

 

“এই নে এটা খেতে খেতে বল কী হয়েছে।” মেয়ের পাশে বসে সহজ গলায় বললেন বিজন। অদ্বিতীয়া অবাক হয়ে দেখল তার প্রিয় চকলেট আইসক্রিমের কাপটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরেছেন বাবা। ছোটবেলায় তার কান্না থামানোর সহজ উপায় হিসেবে বাবা এটা আবিষ্কার করেছিলেন।

“সব কিছু কেন ছোট বেলার মত হয় না বাবা?” কান্না ভেজা গলায় জিগ্যেস করে অদ্বিতীয়া। বিজন স্মিত হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “ ছোট বেলাটা হলো অনেকটা রূপকথার গল্পের মত। যেখানে সব কিছু স্বপ্ন মাখা কিন্তু মা বড় হয়ে মানুষকে যেসব কঠিন বাস্তবের মুখমুখি হতে হয় সেগুলো আছে বলেই ওই স্বপ্নের দিনগুলোর দাম আছে। তোর কী হয়েছে আমাকে বল দেখবি অনেক ভালো লাগছে। তুই তো ছোটবেলায় বলতিস আমি ম্যাজিশিয়ান যে তোর সব সমস্যার সমাধান করে দেয়।”

“কিন্তু আমার কথাগুলো শুনে তুমি যদি কষ্ট পাও, সহ্য করতে না পারো?”

হেসে উঠলেন বিজন।

“পাগলী তোর এই বাবা জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছে রে। অনেক কিছু হারিয়েছে। একটা সময় সর্বহারা হয়ে গেছে তাও নিজেকে সামলে নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে কিন্তু তোর চোখের জল, তোর কষ্ট আমি একদম সহ্য করতে পারি না রে। তুই বল।”

একটু সময় নেয় অদ্বিতীয়া। কাঁচের মহল ভেঙ্গে ফেলার আগে নিজেকে একটু প্রস্তুত করে। নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিজের কাছেই লুকোবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে।

“বাবা আমি কনসিভ করেছি।”

চমকে ওঠেন বিজন কিন্তু কোনও ব্যাপারেই চট করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন না তিনি। মাথা ঠান্ডা রেখে মেয়েকে জিগ্যেস করেন, “হু ইজ দ ফাদার?”

“রাহুল। রাহুল সেন।”

“রাহুল সেন মানে রজত সেনের ছেলে?”

“হুম।”

বিজন মিত্রের অন্তরে একটা ঘুমন্ত ঝড় জেগে উঠে উথাল পাতাল করছে কিন্তু নিজের মনভাব দমন করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন।

“ওর সাথে তোর কি কোনও সম্পর্ক তৈরি হয়েছে মানে তোরা কি পরস্পরকে ভালোবাসিস না হঠাৎ করে শুধু শারীরিক চাহিদার কারণে …” খুব শান্ত ভাবে প্রশ্ন করে চলেছেন বিজন কারণ বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং ততোধিক স্পর্শ কাতর তাঁর কন্যাটি।

“না না বাবা আমরা একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসি।” বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে অদ্বিতীয়া।

“তাহলে এখন তোদের প্ল্যান কী ?”

অদ্বিতীয়ার দু'চোখের কোল বেয়ে বৃষ্টি নামল।

“উই উইল গো ফর এবরশন।”

“বুঝলাম কিন্তু তোমাদের এরকম ডিসিশনের কারণ? তোমার মা একদিন বলছিল যে রাহুল একটা এম.এন.সি তে চাকরি পেয়েছে যদিও ওর ইচ্ছে কোনও প্রেস্টিজিয়াস গভর্নমেন্ট জব করার সে যাই হোক সে একটা চাকরি করে, তুমিও একটা পাবলিকেশন হাউসের সঙ্গে এটাচ হয়েছ তাহলে তোমরা বিয়ের কথা ভাবছ না কেন? রাহুল তার বাবা-মার একমাত্র সন্তান আর তুমিও আমাদের। ফিনান্সিয়াল কোনও প্রবলেম তোমাদের হওয়ার কথা নয় তাহলে নিজেদের সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর কথা ভাবছ না কেন? মিস্টার সেন আর তোমার মা বহুদিনের কলিগ এ বিয়েতে কারুর আপত্তি থাকার কথা নয়। তাহলে?” উত্তরের প্রত্যাশায় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন বিজন কিন্তু তাঁর আদরের আদু আজ মুখ নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।

“আদু একটা সত্যি কথা বল। তোরা কি তোদের সম্পর্কটা নিয়ে সিরিয়াস নোস মানে আজকাল তো অনেক ছেলেমেয়ে বিয়ে-বাচ্চা এসব দায়িত্ব নিতে চায় না। ঝামেলা মনে করে অথচ একে অন্যের সঙ্গে থাকতে চায়। তোরাও কি সেরকম… আর তাহলে সাবধান হওনি কেন?”

প্রবল বর্ষণে যেমন পাহাড়ের বুকে ধস নামে তেমনি অদ্বিতীয়ার ভেতরেও ধস নামছে। সব কিছু ধ্বংস করে খাদের দিকে নেমে যাচ্ছে। শূন্য দৃষ্টিতে তার সবচেয়ে ভরসার মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

“কী রে কিছু বল?” মেয়ের পিঠে আলতো হাত রাখেন বিজন।

“বাবা আমরা ওকে মারতে চাই না। আমাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি ওর অস্তিত্ব অনুভব করি বাবা।” চিৎকার করে কেঁদে উঠে বাবার বুকে আশ্রয় খোঁজে অদ্বিতীয়া।

“তাহলে তোরা বিয়ে করে নে না। আমি সবার সাথে কথা বলব। সমস্যাটা কী হচ্ছে তোদের আমি তো বুঝতে পারছি না।”

“আমি বলতে পারবো না বাবা। তুমি ভীষণ কষ্ট পাবে।” হাহাকার করে ওঠে পিতা অন্ত প্রাণ অদ্বিতীয়া।

ছোটবেলায় বাবাকে সুপার ম্যান মনে হত অদ্বিতীয়ার কিন্তু আজ জানে সুপার ম্যানদেরও সীমাবদ্ধতা থাকে। তার সুপার ম্যান কি পারবে আসন্ন আঘাত সামলাতে? পারবে কি অদ্বিতীয়া তার বাবাকে এক নিষ্ঠুর সত্যের মুখমুখি দাঁড় করাতে? নীড় হারা পাখির মতো কাঁপতে থাকে সে।

 

সুরেলা রিংটোনের ডাকে দীপাবলি বারান্দা থেকে ঘরে এলেন। স্ক্রিনের ওপর অচেনা নাম্বার।

“হ্যালো।”

“হ্যালো, আমি বলছি।” অপর প্রান্তের গলাটা শুনে থমকে গেলেন দীপাবলি।

“হ্যালো, মিসেস সেন শুনতে পাচ্ছেন?”

“হুম।” দীপাবলি অবাক হলেন অপর প্রান্তের মানুষটির আত্মবিশ্বাস দেখে। নিজের পরিচয় টুকু দিলেন না ধরেই নিলেন কণ্ঠস্বর শুনেই দীপাবলি তাঁকে চিনে নেবেন। সত্যিই কি দীপাবলির পক্ষে চেনা সম্ভব ছিল কিন্তু তাও তো তিনি চিনে নিলেন। কথা তো ছিল ভুলে যাওয়ার কিন্তু ভুলতে তো পারেন নি। যে স্বর কর্ণকুহরে নয় হৃদয়ের অন্তঃস্থলে গুঞ্জরিত হয় তাকে বোধহয় বিস্মৃত হওয়া যায় না।

“আজ বিকেলে একবার দেখা করতে পারবেন? ভীষণ দরকার। প্লিজ।” আকুতি ঝরে পড়ে মানুষটির গলায়। একটা সময় ছিল যখন এই মানুষটার একটা ডাকের অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। তারপর এক দীপাবলির রোশনাই নেভা সন্ধ্যায় মানুষটার সব আহ্বান উপেক্ষা করে অন্ধকার গলিপথ বেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন পিতৃগৃহে। প্রেমিকা হেরে গিয়েছিল কন্যার কাছে।

 

কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন বিজন। খুব চেনা, খুব কাছের মানুষের উপস্থিতি মানুষ চোখ বন্ধ করেও অনুভব করতে পারে। বিজ্ঞান এর কী ব্যাখ্যা দেয় জানা নেই কিন্তু এটা ঘটে থাকে। বিজনও সহসা চোখ খুললেন। রেস্টুরেন্টের প্রবেশদ্বার দিয়ে দীপাবলি ঢুকছেন। মাঝের আঠাশটা বছর দীপাবলির চুলে এক-আধটা রুপোলি রেখা আঁকা ছাড়া আর কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি। দীপাবলি এখনও ভোরের শিউলির মতই স্নিগ্ধ, শান্ত। দীপাবলির চোখ দুটো ইতিউতি বিজনকে খুঁজছে। বিজন ইচ্ছে করেই ডাকলেন না। আজ বড্ড ইচ্ছে করছে ওকে আগের মত ‘দীপ’ বলে ডাকতে কিন্তু আজ আর প্রকাশ্যে সেটা করা শোভনীয় নয়। রুচিরার অফিস পার্টিতে বিজন কখনও যান না বললেই চলে কিন্তু সেবার যখন বিজনের জাতীয়স্তরের একটা পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে রুচিরা পার্টি দিলেন তখন বিজনকে বাধ্যগত যেতেই হয়েছিল। সেখানেই অনেক বছর পর দীপাবলিকে দেখেন স্বামী-সন্তান সহ। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির সি ই ও রজত সেনকে ভালো করে দেখছিলেন বিজন। এই সেই যোগ্যব্যক্তি যার অর্থ, যশ, প্রতিপত্তির কাছে তৎকালীন হাইস্কুলের বাংলার শিক্ষক তথা উদীয়মান কবি বিজন মিত্র পরাজিত হয়েছিলেন। যাঁর হাতে নিজের কন্যাকে তুলে দিতে না পারলে আত্মহত্যা পর্যন্ত করার হুমকি দিতে পারেন একজন পিতা! দীপাবলি বিজনকে খুঁজে নিয়ে এগিয়ে এলেন। দীপাবলিকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন বিজন কিন্তু পরমূহুর্তেই সম্বিৎ ফেরে তাঁর শক্ত হয়ে ওঠে বিজনের মন। নিজের অতীতের আবেগের জালে জড়িয়ে পড়লে চলবে না সামনে এক ভীষণ লড়াই তাঁর।

“বসো।” দীপাবলি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বিজনের দিকে। মনের মধ্যে ঘূর্ণির মত পাক খাচ্ছে অনেকগুলো প্রশ্ন। এতবছর পর বিজন এভাবে তাঁর সাথে গোপনে একলা দেখা করতে চাইলেন কেন? বিজনের ফোনে বলা কথা গুলো কানে বাজছিল দীপাবলির, “ ইটস ভেরি আর্জেন্ট আর আজও আমি বিশ্বাস করি আমি আপনাকে অকারণে বা কোনও অসাধু উদ্যেশ্যে যে ডাকছি না সেইটুকু ভরসা আপনি আমাকে করেন তাই আমি অপেক্ষায় থাকব।”

“দীপ।” বিজনের ডাকে কেঁপে উঠলেন দীপাবলি। কতদিন পরে এই ডাকটা শুনলেন। চোখের সামনে বাষ্প জমা হচ্ছে কিন্তু আঠাশ বছর আগে যেমন নিজেকে সামলে নিয়ে ছিলেন তেমনি আজও বুকের মধ্যে ওঠা ঝড়টাকে পাঁজরের খাঁচায় বন্দী করে অস্ফুটে বললেন, “ বলুন।”

“দীপ, আমার মেয়ে অদ্বিতীয়াকে তো তুমি চেন?”

“হুম।” মুখ তুলে অবাক হয়ে বললেন দীপাবলি।

“সি ইজ প্রেগন্যান্ট এন্ড ইওর সান রাহুল ইজ রেস্পন্সিবল ফর দিস।”

দীপাবলি এতটা অবাক বোধহয় কোনও দিন হননি।

“বাবু!”

“হুম। তবে এক্ষেত্রে আমার বোধহয় রেস্পন্সিবল কথাটা ব্যবহার করা ঠিক হলো না কারণ আদু আর রাহুল দুজনেই এর জন্য দায়ী। আমাদের অজান্তে ওদের মধ্যে একটা সুন্দর সমীকরণ গড়ে উঠেছে। ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে, বিয়ে করতে চায়। তুমি রাহুলকে জিগ্যেস করে দেখতে পারো।”

দীপাবলি একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “ঠিক আছে আমি বাবু আর রজতের সাথে কথা বলব।”

ম্লান হাসলেন বিজন, “ব্যাপারটা এত সহজ হলে তোমাকে এভাবে ডাকার দরকার হত না দীপ। হয়ত রাহুল নিজেই তোমাকে বলত। আমি আদুকে নিষেধ করে দিয়েছি রাহুলকে জানাতে যে আমি সব জানি।”

“মানে? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”

বিজন দীপাবলির চোখে চোখ রেখে বললেন, “তুমি কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারবে দীপ?”

“আমার সহ্য শক্তি কতটা তার প্রমাণ আপনি বহু বছর আগেই পেয়েছেন।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন দীপাবলি। একটু সময় নিয়ে বিজন বললেন, “দীপ, রুচিরা আর রজতের মধ্যে একটা এক্সট্রা ম্যারিট্যাল এফেয়ার আছে। আদু আর রাহুল মন্দারমনিতে ওদের একসাথে একটা কটেজে আবিষ্কার করে। পরিষ্কার করে না বললেও ওর কথা থেকে আমি বুঝেছি ওরা খুবই ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিল।”

“প্লিজ চুপ কর তুমি।” দু হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন দীপাবলি। বিজন চুপ করে যান। প্রেমিকের সঙ্গে বিচ্ছেদ আর স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে খুব চড়া দাগের একটা পার্থক্য আছে। বাবার আদেশ মান্য করে বিজনের সাথে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে রজতের হাত ধরে একটা নতুন জীবন শুরু করেছিলেন দীপাবলি। বিজনের স্মৃতির স্রোতকে মনের এক কোণে নুড়ি-পাথর চাপা দিয়ে রজতকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসে ছিলেন। তার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। তাকে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার মত যোগ্য করে তুলেছেন তার এই প্রতিদান দিল রজত! আচ্ছা, রাহুল আর অদ্বিতীয়ার কিছু ভুল হচ্ছে না তো?

“ওদের কোনও ভুল হচ্ছে না তো?” অনেক আশা নিয়ে প্রশ্ন করেন দীপাবলি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিজন বলেন, “আমারও প্রথমে মানতে কষ্ট হয়েছিল। নিজের সাজানো মহলটা যে আসলে তাসের ঘর ছিল এটা সহজে মেনে নিতে পারিনি। আজ তোমায় একটা সত্যি কথা বলি হয়ত তোমার খারাপ লাগতে পারে তাও বলছি তুমি আমার প্রথম প্রেম এটা যেমন সত্যি তেমনি এটাও সত্যি আমার স্ত্রী হিসেবে রুচিরাকেও আমি কম ভালোবাসিনি। মুদ্রার এক পিঠে যদি আছে তোমার সাথে কাটানো প্রথম যৌবনের ভালোলাগার মুহুর্তগুলো , প্রথম হাতে হাত রেখে বৃষ্টি ভেজা পথে হাঁটার স্মৃতি তেমনি মুদ্রার উল্টো পিঠে আছে রুচিরার সাথে নতুন সংসার পাতার দিনগুলো, আদুর জন্ম, প্রথম বাবা ডাক শোনার অনুভূতি। আমি খোঁজ খবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি আদুদের ধারণা একবর্ণও মিথ্যে নয়।” দীপাবলি নিশ্চুপ হয়ে শুধু শুনছেন। একটু থেমে বিজন আবার শুরু করলেন, “একদিন ভাগ্যের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিলাম। তোমাকে নিজের কাছে ধরে রাখতে পারিনি কিন্তু আজ আমার মেয়েকে সেই ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা আমি পেতে দেব না। আদুর চোখের জল আমি সহ্য করতে পারি না। তাছাড়া এক নোংরা সম্পর্কের জন্য ওদের পবিত্র সম্পর্কটা পরিণতি পাবে না কেন বলতে পারো? একটা নিষ্পাপ প্রাণকে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই অন্ধকারে তলিয়ে যেতে হবে কেন? আমি এসব হতে দেব না। রুচিরা আর রজত আদু আর রাহুলের সম্পর্কটা মানতে চাইবে না এটা খুব স্বাভাবিক কারণ তাতে ওদের অসুবিধা হবে তাই ওরা যেমন আমাদের আড়ালে নিজেদের সম্পর্কটা তৈরি করেছে তেমনি ওদের আড়ালে আমি আদু আর রাহুলের চারহাত এক করব কিন্তু তার জন্য আমার তোমার হেল্প চাই।”

“কীরকম হেল্প?” ঝাপসা চোখে প্রশ্ন করেন দীপাবলি।

 

 

 

 

 

“বাবু।” মায়ের ডাকে বালিশ থেকে মুখ তুলে তাকালো রাহুল। দীপাবলি দেখলেন ছেলের চোখ দুটো ফোলা।

“এই সময় শুয়ে আছিস?” স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করলেন।

“এমনি শুয়েছিলাম।” নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে রাহুল। ছেলের মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিলেন দীপাবলি।

“খুব কষ্ট হচ্ছে না রে?”

“কষ্ট? কীসের কষ্ট?” চমকে ওঠে রাহুল।

“অদ্বিতীয়ার জন্য আর পুচকুটার জন্য?”

“মা!”

“খুব মনে হচ্ছে না রে যে পুচকুটা মেয়ে না ছেলে। জন্মালে কেমন দেখতে হতো?”

“মা তুমি এসব….।” রাহুলের চোখের কোল বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।

“আমার কষ্ট হবে ভেবে নিজের ভালোবাসা, নিজের সন্তান সব বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছিলি!”

“তোমাকে এসব….। আমি আদুকে তো বারণ করেছিলাম।”

“কেন বারণ করেছিলি? কেন এত বড় ভুল করতে যাচ্ছিলি বাবু?”

“মা।” ছোটবেলার মত মাকে জড়িয়ে ধরে রাহুল।

“বাবু, একটা কথা দিবি আমায়?”

“কী কথা?”

“এখন থেকে আমি যা বলব তাই করবি তুই। তোর বাবার বিশ্বাসঘাতকতার কাছে আমরা হারব না, কিছুতেই না প্রমিস কর আমাকে।” মায়ের চোখে এমন আগুন রাহুল আগে কখনো দেখনি।

 

 

স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসলেন রজত। মালিনী খাবার প্লেটটা তাঁর সামনে এনে রাখতে ভারী আশ্চর্য হলেন রজত। পনের দিন পর বাড়ি ফিরছেন, সাত দিন অফিস টুর আর তারপর সাত দিন রুচিরার সাথে গোয়ায় প্রমোদ ভ্রমণ। দীপাবলিকে চিরকাল তাঁর অফিস পার্টি বা অফিসের বন্ধু বান্ধব থেকে পারত পক্ষে দূরে সরিয়ে রাখায় রজতের এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে কোনও অসুবিধা হয়নি। রুচিরার অনাবৃত শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে দীপাবলির ফোনের উত্তরে জানিয়েছেন মিটিং য়ে ভারী ব্যস্ত তিনি। ফ্রি হলে ফোন করবেন। ফোন করতে ভুলে গেলে জানিয়েছেন কাজের চাপে নাভিশ্বাস উঠছে তাঁর। দীপাবলি সরল মনে বিশ্বাস করে গেছেন তাঁকে তাই তাঁর ফেরার দিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে সে। প্রেমিকার নগ্ন শরীরের উত্তাপ নেবার পর শান্ত নদীর মত স্ত্রীর প্রেমের সাগরে অবগাহনটা ভালোই লাগে রজতের কিন্তু আজ এখনো দীপাবলির দেখা নেই কেন! আজ কোথাও যাওয়ার মানুষ তো সে নয়। অস্থির হয়ে ওঠেন রজত, “মানুদি দীপা কোথায়?”

“দীপার খোঁজ নেওয়ার খুব কি প্রয়োজন আছে তোর?” ঠান্ডা গলায় বলে মালিনী। সম্পর্কে সে রজতের জ্ঞাতি সম্পর্কিত খুড়তুতো দিদি। শারীরিক কিছু ত্রুটির জন্য তার বিয়ে সম্ভব ছিল না। পারিবারিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না তাদের তাই রাহুল জন্মাবার পর রজতের মা দীপাবলির দেখাশোনার জন্য মালিনীকে গ্রাম থেকে পাঠিয়ে ছিলেন সেই থেকে এবাড়ির একজন হয়ে সে রয়ে গেছে। রক্তের সম্পর্ক থাকায় এ বাড়ির মানুষগুলো প্রতি তার ভালোবাসা, অধিকার বোধ, আনুগত্য সবই গড়পরতা কাজের লোকের চেয়ে অনেক বেশি। এহেন মালিনীর আচমকা এই প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে গেলেন রজত, “মানে? কী বলতে চাইছ তুমি? দীপা কোথায় আর তুমিও মনে হচ্ছে বাইরে যাবার জন্য তৈরী হয়েছ?”

“হুম, আমি শুধু বাড়ির চাবিটা তোকে দেওয়ার জন্য এখনও আছি আর তার সঙ্গে দীপার দিয়ে যাওয়া এই কাগজটা।” একটা খাম বাড়িয়ে ধরল মালিনী।

“কী এটা?”

“পড়ে দেখে নে।” সংক্ষিপ্ত জবাব মালিনীর।

তাড়াতাড়ি খামের ভেতর থেকে কাগজটা বের করেন রজত।

“এটা কী ? এসবের মানে কী ?” চিৎকার করে উঠলেন রজত।

“তুই কি ভেবেছিলি দিনের পর দিন মেয়েটাকে তুই ঠকিয়ে যাবি আর ও জানতেও পারবে না!” গর্জে উঠল মালিনী।

“কী বলছ কি তুমি!” স্খলিত স্বরে বলেন রজত।

“কী বলছি তুই ভালো করেই জানিস। সবচেয়ে লজ্জার কথা কী জানিস তোর আর তোর ওই রুচিরার কথা সবচেয়ে প্রথমে জেনেছে বাবু। দীপা ডিভোর্স পেপারে সই করে চলে গেছে। তোকে বাকি কাজ করে নিতে বলেছে।”

“বাবু!”

“হ্যাঁ বাবু। যদিও তোকে বলতে ইচ্ছে করছে না তবুও বলছি বাবু ফরেন সার্ভিসের চাকরিটা পেয়ে নিজের বউ আর মাকে নিয়ে কাল এদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে।”

“বউ!”

“হ্যাঁ, বাবুর বউ কে সেটাও তুই জেনে যাবি। আমি এখন আসছি।”

“তুমিও চলে যাবে? কোথায় যাবে?” অসহায় গলায় প্রশ্ন করেন রজত।

“আপাতত একটা আশ্রমে যাচ্ছি। বাবু বলেছে যদি ব্যবস্থা করতে পারে আমাকেও নিয়ে যাবে ওর কাছে আর একটা কথা ওরা বলে গেছে ওদের সাথে কোনও রকম যোগাযোগ করার চেষ্টা না করতে। লাভ হবে না।” মালিনী নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ডিভোর্স পেপারে দীপাবলির সই টার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রজত। একদিন তাঁর খালি ঘরে আলো জ্বালিয়ে ছিল দীপা আজ তাঁর শূন্য ঘরে শুধুই অমাবস্যার অন্ধকার। রুচিরার সাথে দিনের পর দিন সম্পর্ক রাখার সময় একবারও মনেও আসেনি এমন দিনও আসতে পারে যেদিন বাড়ি ফিরে দরজার পেছনে দীপাবলির হাসিমুখটা দেখতে পাবেন না। আর বাবু, সে এখন তার বাবাকে ঠিক কতটা ঘেন্না করে?

 

“তুমি কোথাও যাচ্ছ?” বেডরুমে ঢুকে প্রশ্ন করেন রুচিরা। বিজনের প্রস্তুতি দেখেই বোঝা যায় তিনি বাইরে কোথাও যাচ্ছেন।

“হুম, একটা ফরেন ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করছি আমি।” নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দেন বিজন।

“মানে?”

“ওরা বহুদিন থেকেই ডাকছিল। আমি ভাবলাম এটাই যাওয়ার উপযুক্ত সময়।”

“কী যা তা বলছ তুমি। আমাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করনি? আদু জানে?” রেগে উঠলেন রুচিরা।

“তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আগে দিই, আদু জানে। আর প্রথম প্রশ্নের উত্তরে জানাই আমি আর আদু দুজনেই ভাবলাম তোমার এনজয়মেন্টে বাধা দেওয়া উচিত নয়। অনেক দিন পর রজত সেনের সাথে লম্বা ট্রিপে গেছ।” বিজনের কেটে কেটে উচ্চারণ করা কথাগুলো রুচিরার ভেতর পর্যন্ত তিরের ফলার মত বিদ্ধ করল।

“কী বলতে চাইছ তুমি?” নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন রুচিরা।

“দেখ বেশি কিছু বলার ইচ্ছে বা সময় কোনওটাই আমার নেই। তোমার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগও আমার নেই। হয়ত তোমার সব চাহিদা পূরণ করতে আমি ব্যর্থ তাই তোমাকে অন্য পুরুষের কাছে সুখ খুঁজতে হয়েছে। আজ থেকে আমি তোমাকে তোমার পথে চলার পূর্ণ স্বাধীনতা দিলাম। ডিভোর্স পেপার, ফিনান্সিয়াল কিছু পেপার্স সব এই ব্যাগটায় আছে। দেখে নিও।”

রুচিরার চোখে মুখে হতাশা আর বিস্ময় কাটাকুটি খেলছে। একটু থেমে বিজন আবার বললেন, “আদু বলেছিল ওর ব্যাপারে তোমাকে কিছু না জানাতে কিন্তু আমার মনে হয় মা হিসেবে তোমার এটুকু জানার অধিকার আছে যে তোমার মেয়ে এখন কোথায় কী করছে। তাই জানিয়ে যাচ্ছি আদু, রাহুল মানে মিস্টার রজত সেনের ছেলেকে বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। আমি আদুর কাছেই প্রথম তোমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে পারি। মন্দারমনিতে অবৈধ প্রেমের নেশায় মগ্ন তোমরা খেয়ালই করনি যে আদু আর রাহুলের কাছে ধরা পড়ে গেছ তোমরা। ওরা তোমাদের কথা জানতে পেরে নিজেদের জীবনটা শেষ করার পথে চলেছিল কিন্তু আমি তা হতে দিইনি। আদু মা হতে চলেছে। ওরা যাতে তোমাদের দুজনের পরিধির বাইরে নিজেদের জীবনটা সাজাতে পারে তার সব ব্যবস্থা আমি করেছি। বাই দ ওয়ে আদু বলে দিয়েছে ওকে কোনও রকম ডিস্টার্ব না করতে।”

বিজন বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন। রুচিরার মনে হচ্ছে তাঁর পায়ের তলায় মাটি আর মাথার ওপর ছাদ কিছুই নেই। একটা নিঃসীম ধু ধু প্রান্তরে একলা দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ দুটোও বুঝি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে।

“বিজন একবার কি...”

“সরি, রুচিরা আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে। আসছি।”

স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন রুচিরা। রজতের সাথে পরকীয়া প্রেমের নেশায় ভাসলেও বিজনকে ছাড়া নিজের জীবনটা তো কোনওদিন কল্পনাও করেননি। বহুদিন পরে বিজন তাঁকে ‘রুচি’ না বলে ‘রুচিরা’ বলে ডাকলেন। স্বামী-সন্তানকে সময় না দিয়ে অফিসের বাহানায় অবসর সময়গুলো রজতের সাথে কাটিয়েছেন ভেবেছেন বিজন আর আদুর অস্তিত্ব তাঁর জীবনে চিরস্থায়ী আর আজ আদু, বিজন দুজনেই তাঁকে স্রেফ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তাদের জীবন থেকে।

 

 

অদ্বিতীয়া ঘুমচ্ছে। রাহুল অফিসে। পাহাড় ঘেরা থিম্পুতে এই অলস দুপুরে বসে দীপাবলির বড্ড মনে পড়ছে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের সমীকরণ গুলো কীভাবে বদলে গেল। একদিন তিনি আর বিজন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ পরস্পরের হাত ধরে হাঁটতে চেয়েছিল কিন্তু সুতো কাটা ঘুড়ি যেমন নীল আকাশের বুকে হারিয়ে যায় তেমনি তাঁদের সম্পর্কটাও পরিবারের চাপে সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেল। দুজনেই নতুন সঙ্গীর সাথে নীড় বেঁধে জীবনের পথে এগিয়ে গেলেন। সেখানেও তাঁদের অগোচরে তৈরি হল দুটো নতুন সমীকরণ। রজত আর রুচিরা এবং রাহুল আর অদ্বিতীয়ার মধ্যে। প্রথম সম্পর্কটা ঝড়ের মত তছনছ করে দিয়েছে সব কিছু আর দ্বিতীয় সম্পর্কটা নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। দীপাবলি যখন রজতের সাথে আর থাকবেন কি-না এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দোলাচলে দোদুল্যমান ঠিক তখনই বিজন এসে দাঁড়ান তাঁর সামনে। তাঁর চোখে চোখ রেখে বলেন, “একদিন আমার ডাকে সাড়া দাওনি কিন্তু আজ আমার কথা তোমাকে রাখতেই হবে। আমার আদুর দায়িত্ব তোমার। ও মাকে কোনও দিন ভালো ভাবে পায়নি সেই অভাব পূরণ করতে হবে তোমাকে। এই অবস্থায় ওর তোমাকে প্রয়োজন। আমার একদা সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির হাতে আমার সবচেয়ে আদরের মানুষটির ভার আমি তুলে দিলাম। তোমাকে ওদের সাথে যেতেই হবে। আজ আমি না শুনব না।” দীপাবলিও বিজনকে ফেরাতে পারেননি আর। রাহুল আর অদ্বিতীয়া তো ভীষণ খুশি দীপাবলি ওদের সাথে চলে আসায়। রজত একলা কী করছে কে জানে? আর আরেকটা মানুষ যে একলা চলে গেছে এই পৃথিবীর অন্য একটা মহাদেশে।

দুটো পাখি ডানা মেলে উড়ে চলছে নীল আকাশের বুকে। সেদিকে তাকিয়ে দীপাবলির হঠাৎ মনে হলো ওরা তো সীমানা মানে না। নিজেদের ইচ্ছে মত উড়ে যায় দেশ-দেশান্তরে। যাবে কি ওরা কলকাতায় ওঁর ফেলে আসা বাড়িটার একফালি ছাদের ওপর দিয়ে?

অলৌকিক সেই খেলা


অলংকরণ - সুমিত রায়

আকাশে মেঘের ঘনঘটা বেড়েই চলেছে। যেকোনও মুহুর্তে বৃষ্টি নামবে। ঋষির কপালে চিন্তার ভাঁজ। অন্ধকার নামার আগে চাঁদিপুর পৌঁছতে পারবে তো?

“এই জন্য আমি বলেছিলাম ট্রেনে চলো। কে শোনে আমার কথা।” পাশ থেকে রাগতস্বরে বলল মেধা। ওর রাগের দোষ নেই। ঋষিকে ও অনেকবার গাড়ি নিয়ে আসতে নিষেধ করেছিল কিন্তু ঋষি ওর কথায় কর্ণপাত করে নি। আসলে ড্রাইভিং ঋষির প্যাশন। হাতে স্টিয়ারিং পেয়ে গেলে ও সব ভুলে যায়। ধনী পরিবারের সন্তান হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন রকম গাড়ি কেনা ও চালানোর শখটা ও সহজেই পূরণ করতে পারে। এবারে এই নতুন গাড়িটা কেনার পর মেধাকে ও বলেছিল, “চলো কাছেপিঠে কোথাও ঘুরে আসি। আমাদের কোম্পানির নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ করার আগে একটু রিফ্রেশমেন্ট হয়ে যাবে।” গাড়ি নিয়ে আসতে মেধার যথেষ্ট আপত্তি ছিল কিন্তু ঋষি নাছোড়। ড্রাইভারও সঙ্গে আনেনি। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে গেল। সেই সঙ্গে মুহুর্মুহু বজ্রপাত হচ্ছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছটা বাজে। চারিদিকে সর্বগ্রাসী অন্ধকার নেমেছে । গাড়ির হেডলাইটের আলোয় আর কিচ্ছু কাজ হচ্ছে না। এবার ঋষিরও মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা ভুল হয়ে গেছে। ওরা যে রিসর্ট বুক করে এসেছে সেটা এখনও প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কিন্তু গাড়ি নিয়ে আর এগোনো যাচ্ছে না

“এই দ্যাখ সামনে একটা হোটেল মনে হচ্ছে। আজ রাতটা যদি এখানে থেকে যাই।”

“বুকিং ছাড়া কি রুম পাবো?” ঋষি বলে।

“আরে বাবা চাঁদিপুরে পুরী-দীঘার মত অত ভীড় হয়না তাছাড়া রুম না থাকলেও মানবিকতার খাতিরে ভেতরে একটু বসতে অন্তত দেবে। এই বৃষ্টি-বাজের মধ্যে তোমার গাড়িতে থাকাটা কি খুব নিরাপদ মনে হচ্ছে?”

 

গাড়ি থেকে নেমে রিসেপশন পর্যন্ত আসতেই ওরা ভিজে গেল। রিসেপশনের ছেলেটি জানাল একটাও ঘর ফাঁকা নেই। শুনে ওদের মুখ শুকিয়ে গেল। ঋষি কয়েক মুহূর্ত ভেবে ম্যানেজারকে ডেকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাল। ম্যানেজার ছেলেটি একেবারেই কমবয়সী। মেধা তাকে নিজেদের অবস্থাটা বুঝিয়ে বলল, “ভাই বড় বিপদে পড়েছি। কোনও ব্যবস্থা কি হতে পারে না?”

“একটা রাতের তো ব্যাপার। সকালেই আমরা আমাদের বুক করা রিসর্টে চলে যাব। একটু দেখুন না যদি কিছু ব্যবস্থা করা যায়। টাকা-পয়সা নাহয় ডাবল দেব।” ঋষি বলল।

“দেখুন টাকা-পয়সার ব্যাপার নয়। রুম তো খালি নেই। তবে একটা ব্যবস্থা করতে পারি নিজের রিস্কে।” ম্যানেজার ছেলেটি বলে।

“বুঝলাম না।”

“আসলে এটা হোটেল কাম রিসর্ট । এই বাউন্ডারির মধ্যে সমুদ্রের দিকে ছটা কটেজও আছে কিন্তু ওগুলো এখন বন্ধ ।”

“বন্ধ কেন?”

“সেটা জানিনা। আসলে এই হোটেলটা প্রায় মাস আটেক বন্ধ ছিল রেনভেশনের জন্য। মাস দুয়েক আগে আবার খুলেছে। সব স্টাফও নতুন। আমিও নতুন এসেছি। আমার মনে হয় মালিকপক্ষের কিছু স্পেশাল প্ল্যান আছে কটেজগুলো নিয়ে। যাই হোক আমি নিজের দায়িত্বে একটা কটেজ খুলে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করছি। এই ঝড় জলের রাতে এসেছেন তারওপর ম্যাডাম ভাই বলে ডাকলেন কি করে আপনাদের ফেরাই বলুন।” খুব আন্তরিক ভাবে বলল ছেলেটি। মেধা আর ঋষি অনেকবার ধন্যবাদ জানাল। ম্যানেজার ছেলেটি খুব করিতকর্মা। অল্প সময়ের মধ্যেই একটা কটেজের চাবি খুঁজে, পরিস্কার করিয়ে ঋষিদের পাঠিয়ে দিল সেখানে। কটেজটা ঋষিদের খুব পছন্দ হলো। বৃষ্টির আওয়াজ সেই সাথে সমুদ্রের গর্জন মিলেমিশে বাইরে যেন মহাদেবের প্রলয় নৃত্য হচ্ছে।

 

মেধার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল রাত বারোটা। বাইরে থেকে এখনও অল্প বৃষ্টির আওয়াজ আসছে। পাশে ঋষি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমন্ত ঋষির কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল সে । বিছানা ছেড়ে মেধা বাথরুমের দিকে এগোল। কাজ সেরে জলের কলটা বন্ধ করে পেছন ফিরেই মেধা চমকে উঠল। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ঋষি। তার হাতে একটা লম্বা ছুরি যার ফলাটা বাথরুমের স্বল্প আলোতেও চকচক করছে।

“ঋষি এটা কি?” আতঙ্কিত স্বরে প্রশ্ন করল মেধা।

“ছুরি জানু যেটা এক্ষুনি তোমার পেটে চুমু খাবে।” হিসহিসিয়ে বলল ঋষি। এ কোন ঋষিকে দেখছে মেধা! একে তো সে চেনে না। চোখে যেন শয়তান ভর করেছে ঋষির।

“এ এসব কি বলছ তুমি?” কাঁপা কাঁপা গলায় বলে মেধা। কোনও উত্তর দেয় না ঋষি শুধু মেধার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মেধা পালাবার চেষ্টা করে কিন্তু কোমোডে ধাক্কা লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। ঋষি এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে যেন তার কোনও তাড়া নেই। নিজের লক্ষ্যে সফল হবার ব্যাপারে সে বোধহয় নিশ্চিত। দরজার দিকে যাওয়া সম্ভব নয়, ঋষি দাঁড়িয়ে আছে।মেধা পাগলের মতো পালাবার পথ খোঁজে। ঋষি এক পা এক পা করে প্রায় তার কাছে চলে এসেছে। মেধা ডানদিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে হঠাৎ তার শরীরের আঘাতে দেওয়ালের কিছু অংশ ভেঙে পড়ে একজন মানুষ গলে যাওয়ার মত ফোকর সৃষ্টি হয়। সেদিকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য ভাবে মেধা ছুটতে থাকে। হঠাৎ করে কিছুতে পা লেগে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সে। বৃষ্টি থেমে গেছে । মেঘ সরে গিয়ে আকাশে একফালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। চাঁদের সেই স্বল্প আলোয় মেধা নিজেকে একটা ঝাউ জঙ্গলের মধ্যে আবিস্কার করল। তার হৃদপিণ্ডটা যেন মিনিটে হাজারবার তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। মাটির ওপর বসে থাকে মেধা। পা গুলো ভীষন ব্যথা করছে আর বোধহয় সে উঠে দাঁড়াতে পারবে না এখন। হায় রে অদৃষ্ট! বিধাতা বোধহয় আজ রাতে পঁচিশ বছরের তরতাজা মেয়েটার সমস্ত জীবনীশক্তি শেষ করার আয়োজন করেছে। শুকনো পাতার খচমচ আওয়াজ শুনে মেধার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো। তার আশঙ্কা সত্যি করে ঋষি মৃত্যুদূতের মত এগিয়ে আসছে। কোনও মতে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে আরম্ভ করল মেধা। মাঝে মাঝেই গাছে ধাক্কা লাগছে। পরনের রাত পোশাকটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। তবুও মেধা ছুটে চলেছে বাঁচার আশায়। জোৎস্নার আবছা আলোয় মেধা দেখল এক জায়গায় অনেকগুলো কাঠের গুঁড়ি পড়ে আছে। সেগুলোর পেছনে সে আশ্রয় নিল। শরীরের প্রতিটা অঙ্গ যেন জবাব দিয়ে দিচ্ছে। শ্যাওলা ধরা গুঁড়িগুলোতে ঠেস দিয়ে মেধা হাঁপাতে লাগলো। চারিদিকে একটা বুনো গন্ধ খেলা করছে। নিজের হৃদস্পন্দন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে। প্রকৃতি তার কান্না বন্ধ করে দিলেও মেধার দু চোখের কোল উপচে শ্রাবণের ধারা নামলো। নোনতা জল এসে তার ঠোঁট ছুঁয়ে দিচ্ছে। রাতের খোলা কালো আকাশের তলায় শ্যাওলা বিছানো ভিজে মাটির ওপর বসে মেধার মনে একটাই প্রশ্ন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে কেন? কেন ঋষি এমন করল? তবে কি মেধাকে শেষ করার জন্যই ও কোনও বারণ না শুনে এখানে এল? কিন্তু হঠাৎ করে কি হলো যে ঋষি এত ভয়ংকর একটা সিদ্ধান্ত নিলো? কিচ্ছু মাথায় আসছে না । খানিক পরে মেধার মনে আস্তে আস্তে একটা সম্ভাবনা উঁকি দিতে লাগলো। ‘ রুহি’ ঋষির প্রাক্তন প্রেমিকা। ঋষির বাবা-মায়ের রুহিকে খুব একটা পছন্দ ছিল না। ওঁদের মনে হয়েছিল রুহির পক্ষে ভালো স্ত্রী বা বৌমা কোনওটাই হওয়া সম্ভব নয়। তাও ছেলের মুখ চেয়ে তাঁরা জোর করে রুহিকে মেনে নিতে রাজি ছিলেন কিন্তু উল্টো দিকে রুহি ওঁদের সাথে থাকতে রাজি তো ছিলই না তারওপর ঋষিকে শর্ত দিয়েছিল যে ওকে বিয়ে করতে হলে বাড়ির সাথে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে ওর বাবার বিজনেস জয়েন করতে হবে। ঋষি রাজি না হওয়ায় ওদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। রুহি একজন এন আর আই কে বিয়ে করে এখন বোস্টনের বাসিন্দা। ঋষি এ সমস্ত কিছুই বিয়ের আগে মেধাকে বলেছিল। ওদের দেখেশুনে বিয়ে। ঋষির মায়ের একটা বিয়েবাড়িতে মেধার সাথে আলাপ হয়েছিল। ঋষি বলেছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনও কিছু গোপন থাকা উচিত নয় সেই হিসেব মেনে মেধাও বিমানের কথা বলেছিল। তার ওভার পজেসিভনেস, মেধার প্রতিটি পদক্ষেপ কন্ট্রোল করার চেষ্টা এইসব কারণে সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার কথা সবকিছু খুলে বলেছিল। বিয়ের আগেই ঋষি আর মেধার মধ্যে খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর এই তিন বছরে মেধার মনে অন্তত কোনও ক্ষোভ, দুঃখ, অভিমান কিছু তৈরি হয়নি। ঋষির দিক থেকে কোনও কিছুর খামতি ছিল না। সেই কারণে মাসখানেক আগে যখন রুহি ফোন করে ঋষিকে জানায় যে সে দেশে এসেছে, একবার ঋষির সাথে দেখা করতে চায় মেধা ঋষিকে বাধা দেয় নি বরং বলেছিল তার ইচ্ছে হলে সে রুহির সাথে একবার দেখা করতে পারে। ঋষির প্রতি, তাদের বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতি গভীর বিশ্বাস ছিল মেধার কিন্তু ঋষি নিজেই দেখা করতে চায়নি সটান না বলে দিয়েছিল। মেধাকে প্রবল আবেগে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আজ তুমি বলছ কিন্তু কাল যদি তোমার মনে সামান্যতমও সন্দেহ দেখা দেয় আমি সহ্য করতে পারব না। আমি কোনও অবস্থাতেই তোমাকে হারাতে পারব না। রুহির সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল পাহাড়ী নদীর মত যেখানে উচ্ছলতা ছিল কিন্তু গভীরতা ছিল না আর তোমার আমার সম্পর্ক মাঝ সমুদ্রের মত। শান্ত,ধীর কিন্তু যার গভীরতা অতলান্ত।” মেধাও পরম নিশ্চিন্তে ঋষির বুকে মাথা গুঁজে দিয়েছিল। সেদিনের সেই বিশ্বাস আজ ক্রমশ অবিশ্বাসের কালো চাদর এসে ঢেকে দিচ্ছে। নিশ্চয় গোপনে রুহির সাথে ঋষির আবার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। হয়ত রুহি ওর বিবাহিত জীবনে খুশি নয় তাই ঋষিকে ডাকছিল আর প্রথমে না বললেও শেষ পর্যন্ত ওর সেই আহ্বান ঋষি উপেক্ষা করতে পারে নি। এছাড়া আর কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছে না মেধা। ফুঁপিয়ে উঠে নিজের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল মেধা। ঋষি ওকে একবার মুখ ফুটে বলতে পারত । যত কষ্টই হোক সে সরে যেত ঋষির জীবন থেকে নাকি বাবা-মা পুরো ব্যাপারটা মেনে নেবেন না বলে ঋষি এই পথ নিয়েছে?

“হ্যালো ডার্লিং, কোথায় লুকিয়েছ সোনা? আমি তোমাকে খুঁজেই পাচ্ছি না। আজ রাতের এই লুকোচুরি খেলাটা তুমি জমিয়ে দিয়েছ। মজা আসছে খেলে। পালাও পালাও ,আমার হাত থেকে পালাবার চেষ্টা কর। ভোর পর্যন্ত সময় দেখা যাক কে জিততে পারে। তুমি না আমি। হা হা হা।”

ঋষির ভয়ংকর অট্টহাসিতে মেধার অন্তরাত্মা শুধু নয় জঙ্গলের প্রতিটি পাতাও কম্পিত হচ্ছে। মেধা বুঝতে পারছে পালাবার পথ নেই তবুও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষ বাঁচতে চায়। ঋষির পদধ্বনি ক্রমশ এগিয়ে আসছে। মেধা আবার তার শ্রান্ত, ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে জীবনের সন্ধানে ছুটল। খানিকক্ষণ ছোটার পর মেধা জঙ্গলের বাইরে চলে এল। সমুদ্রের গর্জন শুনে তাকিয়ে বুঝতে পারল এটা বেলাভূমি। এত গভীর রাতে সে কোনও দিন সমুদ্র দেখেনি। আকাশের চাঁদোয়ার নিচে অনন্ত সমুদ্র তার বিশালতা নিয়ে শায়িত। ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাসের তাল-বেতালে নৃত্য। কয়েক মুহূর্তের মুগ্ধতার রেশ কাটতেই মেধা শিহরিত হলো। এতক্ষন জঙ্গলের আলো আঁধারী ছায়াময় পরিবেশ তাকে রক্ষা করেছে কিন্তু এবার সামনে সীমাহীন সাগর আর পায়ের নিচে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রতট। কোথায় লুকোবে সে? পেছনে কাল রূপে তার নিজের স্বামী ধাওয়া করে আসছে। অসহায় ভাবে চারিদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎ মেধা দেখতে পেল তার বামদিকে কিছুদুরে একেবারে সমুদ্র ছুঁয়ে একটা দোতলা বাড়ি সম্ভবত পরিত্যক্ত। জোৎস্নার আলো তার ভাঙাচোরা শরীরটা ধুইয়ে দিচ্ছে। পায়ে পায়ে শ্রান্ত মেধা সেদিকে এগিয়ে গেল। তার দু চোখে বৃষ্টি, মনে কালবৈশাখী। ভাঙা দরজার সামনে গিয়ে দুদন্ড ভাবলো সে তারপর পা বাড়াল ভেতরে। কেমন একটা রহস্যময় প্রাচীন গন্ধ ঘরের বাতাসে। অন্ধকারেরও নিজস্ব একটা আলো থাকে। সেই আলোয় মেধা দেখল ঘরময় পুরু ধুলোর আস্তরণ। তার চোখে মুখে মাকড়সার জাল জড়িয়ে যাচ্ছে। মেধার বুকে ক্রমাগত কে যেন হাতুড়ি পিটছে। দ্বিতীয় ঘরটায় প্রবেশ করার সাথে সাথে একঝাঁক চামচিকে মেধার ওপর আক্রমণ করল। এতদিন পরে তারা জীবন্ত মানুষের দর্শন পেয়েছে। মেধা গলা চিরে একটা মর্মভেদী আর্তনাদ করে উঠলো। তার অন্তরের সমস্ত ভয়, আশঙ্কা সব যেন ছিটকে বেরিয়ে এল। দুহাতে করে চামচিকের আক্রমণ ঠেকাতে ঠেকাতে সে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে দৌড়ল। একটা সিঁড়ির মুখে এসে পৌঁছল সে। চিন্তা করার অবকাশ নেই তার কাছে। পলেস্তারা খসে পড়া সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির ছাদে উঠে এল মেধা। সারা ছাদ জুড়ে ভাঙা ইঁটের টুকরো আর লোহার রড ছড়ানো আছে তার মধ্যেই হাঁটু মুড়ে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে মিশে তার কান্নার আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশে-বাতাসে।

“এত তাড়াতাড়ি কুইট করলে চলে ডার্লিং। গেট আপ গেট আপ। ফাইট মেধা ফা আ আ ইট।” টেনে টেনে অদ্ভুত বিকৃত স্বরে বলল ঋষি।

মেধা চমকে উঠে দেখল কখন নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ঋষি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে। ঋষি এই বাড়িতে ঢুকেছে সে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারে নি। কোনও মানুষ এত নিঃশব্দে পদচারণা করতে পারে!

“কি অবাক হচ্ছ আমাকে এখানে দেখে? ভাবতেই পারছনা আমি তোমার ঠিক পেছন পেছন এখানে এসে পড়েছি। কি করব বল আজকের খেলার এটাই রুল আমার তাড়া খেয়ে তুমি বাঁচার চেষ্টা করবে আর আমি চেষ্টা করব তোমাকে শেষ করার।” চিবিয়ে চিবিয়ে বলল ঋষি।

“কেন? কেন ঋষি তুমি এমন করছ? আমাদের বিয়ে, আমাদের ভালোবাসা সব কি মিথ্যে ছিল? বলনা ঋষি?” হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল মেধা।

“ওহ স্টপ দিস ননসেন্স টক। বিয়ে, ভালোবাসা অল আর ভ্যালুলেস ওয়ার্ডস। নাও আর ফালতু বকবক না করে মরার জন্য তৈরি হও। দ গেম ইজ ওভার। সবচেয়ে মজার কথাটা জানো এই গেমের দুজন পার্টিসিপেন্ট তুমি আর আমি। তফাতটা হল আমি স্বেচ্ছায় খেলছি আর তুমি বাধ্য হয়ে । তুমি তো হেরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত জানলেই না জিততে হলে কি করতে হত। ” সাপের মত হিসিসিয়ে বলল ঋষি।

“নাহ, আমি তোমার কাছে হারব না।” চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো মেধা। চোখে মুখে প্রত্যয়। ঋষি আড়চোখে লোহার রড গুলোর দিকে তাকালো।

“কি ভাবছো আমি ওগুলো দিয়ে তোমাকে আটকাবার চেষ্টা করব? না মিস্টার ঋষি মুখার্জী আমি সেটা পারবো না কারণ আমি তোমাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসে ছিলাম। তোমার শরীর থেকে একফোঁটা রক্ত ঝরাতেও আমি পারবো না। তুমি বলেছিলে না তোমার খেলায় আমি হেরে গেছি কিন্তু আমার খেলায় তো আমি জিতবই। আজ হয়ত তুমি অন্য কারুর কিন্তু একদিন তুমি শুধুমাত্র আমার ছিলে। আমার ঋষি তো মারা গেছে তার স্মৃতি বুকে নিয়ে আমি তোমাকে মুক্তি দেব। ভালোবাসার খেলায় আমি জিতবই। “কয়েক মুহূর্ত থেমে ঋষিকে দেখল মেধা। ঋষি ওর কথার মর্ম উদ্ধার করার চেষ্টা করছে। অভিমান ভরা শান্ত স্বরে মেধা বলল, “ভালো থেকো। সুখে থেকো রুহিকে নিয়ে।” কথা বলতে বলতে ন্যাড়া ছাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে মেধা। নিচে পাথরের ওপর উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। নিজের হাত দুটো দুপাশে মিলে দিয়ে ঋষিকে শেষবারের মতো দেখল সে।

“এই কি করছ তুমি? আমাকে তুমি হারাতে পার না।” চিৎকার করে উঠল ঋষি। এতক্ষনে সে মেধার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে। ছুরিটা নিয়ে তীর বেগে ছুটে আসছে মেধার দিকে। তাকে কোনও সুযোগ দিল না মেধা । নিজের শরীরটাকে পেছন দিকে হেলিয়ে দিল। অভিকর্ষের টানে বাতাস কেটে তার শরীরটা নামতে লাগলো। চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল মেধা।

 

গভীর ঘুমের মধ্যেই ঋষি কানের কাছে কারুর গরম নিশ্বাস অনুভব করল। পরমুহূর্তেই ঠোঁটের ওপর আলতো ঠোঁটের ছোঁয়া। তার সারা শরীরে কোমল একটা হাত খেলা করে বেড়াচ্ছে। ঋষির শরীরে ক্রমশ উত্তেজনা ছড়িয়ে যাচ্ছে। নরম একটা ঠোঁট তার শরীরের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলোয় পাগলের মতো চুমু খেতে লাগলো। ঋষির পুরুষাঙ্গ জানান দিচ্ছে সেই বিশেষ মুহূর্ত আগত। ঋষির তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কেটে গিয়ে সে জড়িয়ে ধরল সেই নারী শরীরকে। ভীষন নরম শরীরটা ঋষির শরীরে মিশে যেতে চাইল। ঋষি তাকে বিছানায় নামিয়ে উপগত হওয়ার উপক্রম করল কিন্তু পরমূহুর্তেই বিছানা ছেড়ে ছিটকে নীচে নেমে দাঁড়ালো।

“কে আপনি? আমাদের বিছানায় কি করছেন?” ঋষির চোখে যেটুকু ঘুমের রেশ ছিল কেটে গেছে। আবছা নীলচে আলোয় সে আবিষ্কার করল তার সাথে যে শরীরী খেলায় মেতে ছিল সে তার স্ত্রী মেধা নয় অন্য কেউ। অপূর্ব সুন্দরী এক নারী। ফিনফিনে সাদা রাত পোশাকে তাকে এত মোহময়ী লাগছে যেন রূপকথার দেশ থেকে উঠে আসা জলপরী। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এত স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান যে সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা বোধহয় স্বয়ং ঈশ্বরেরও অসাধ্য কিন্তু ঋষির সেসব দেখার সময় বা ইচ্ছে কোনওটাই নেই সে বিস্ফারিত চোখে পুরো রুমটায় নজর বুলিয়ে ভয় পেয়ে গেল। কোথাও মেধার অস্তিত্ব নেই। ছুটে গিয়ে একধাক্কায় বাথরুমের দরজা খুলে দেখল সেখানেও মেধার চিন্হ মাত্র নেই।

“মেধা আ আ…। কোথায় তুমি?” চিৎকার করে উঠলো ঋষি।

“সে তো গেছে তার প্রেমিকের সঙ্গে অভিসারে।” লাস্যময়ী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল সেই মেয়ে।

“মিথ্যে কথা। কি যা তা বলছেন! কে আপনি?” রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে ঋষি।

“আমি নীলাঞ্জনা। ইউ ক্যান কল মি অনলি নীল। আমিও এই হোটেলের বোর্ডার। এত সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও আমার মত দুঃখী কেউ নেই। বাবা-মা এক বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়েছে। হি কান্ট স্যাটিসফাই মি। বিশ্বাস কর তোমাকে হোটেলের রিসেপশনে দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছি আমি। আমার বরটার তো কিছু মুরোদ নেই ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম একা। যখন দেখলাম তোমার বউ তার প্রেমিকের হাত ধরে সমুদ্রের দিকে চলে গেল তখন আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। প্লিজ শুধু আজ রাতের কিছু সুন্দর মুহূর্ত আমাকে দাও। একটু সুখ পেতে দাও আমাকে।” কাতর ভাবে বলে মেয়েটি।

“স্টপ দিস ননসেন্স টক। হাসব্যান্ডের সাথে প্রবলেম তো ডিভোর্স দিয়ে দিন আবার বিয়ে করুন যা খুশি করুন তা বলে এভাবে একজন অচেনা পুরুষের সঙ্গে…..।” ঋষি ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

“কেন ঋষি? যে তোমার সাথে বিট্রে করছে তার প্রতি লয়াল থাকার কি দরকার তোমার? প্লীজ ঋষি আমাকে তোমার করে নাও। আয়াম ম্যাড ফর ইউ। তোমাকে না পেলে মরে যাবো আমি।” কথা বলতে বলতে ঋষির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটি। বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, “তোমার শরীরে আজ আমি আগুন জ্বালিয়ে দেব।”

ঋষি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে মেয়েটির বাহুমুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছে মেধা কোথায়? অজানা অচেনা জায়গায় এত রাতে একলা একলা ঘোরার মেয়ে মেধা নয়। এই মেয়েটা ওকে কিছু করেনি তো? এক ঝটকায় মেয়েটিকে বিছানায় ফেলে দিয়ে ঋষি ফুঁসে ওঠে, “সত্যি করে বলুন মেধাকে আপনি কি করেছেন?”

“বললাম তো তোমার বউ কোথায় গিয়েছে।”

“চুপ একদম চুপ। আপনার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না। আমার মেধা আপনার মত নোংরা মেয়ে নয়। ওর নামে একটাও বাজে কথা আমি শুনতে চাই না।”

ঋষি বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ করে। সে বুঝে গেছে রুমের মধ্যে এই মেয়েটার সাথে শুধু শুধু কথা বলে লাভ নেই। ম্যানেজার ছেলেটা ভালো। ওর কাছে সাহায্য পেতে পারে।

“স্টপ ঋষি স্টপ। তুমি এভাবে আমাকে হারিয়ে দিতে পারো না।” আহত বাঘিনীর মত গর্জে উঠল মেয়েটি। ঋষি একবার ওর দিকে ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। ওর নীল চোখদুটো দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঋষির দিকে। সে চোখের আশ্চর্য সম্মোহনী ক্ষমতা। ঋষি আচ্ছন্নের মত এগিয়ে যেতে লাগলো ওর দিকে।

 

খুব আস্তে আস্তে চোখের পাতা খুলল মেধা। বালির ওপর একটা পাথরে ঠেস দিয়ে বসে আছে সে। কিছুটা সময় লাগলো তার মাথাটা পরিষ্কার হতে। কিছু দূরে সেই বাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছে।

তার তো বেঁচে থাকার কথা নয় তাহলে? ঋষিই বা কোথায়?

“খুব অবাক লাগছে তাই না মেধা?” চমকে উঠে মেধা দেখল তার সামনে প্রায় ঋষির বয়সীই একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।

“আপনি কে?” ক্লান্তি জড়ানো গলায় মেধা প্রশ্ন করে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে তার মনে ভয়, আশঙ্কা আর কিছুই কাজ করছে না।

“ধরে নাও তোমার বন্ধু যে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর জানে।”

“আপনি জানেন আমার সাথে কি হচ্ছে কেন হচ্ছে?” মেধার অসহায় প্রশ্ন।

“হুম, জানি। তার আগে তোমাকে কংগ্রাচুলেট করতে চাই। ইউ হ্যাভ ওন দ গেম।”

“মানে?”

“সব জানতে হলে বুঝতে হলে তোমাকে ধৈর্য্য ধরে একটা গল্প শুনতে হবে।”

“বলুন।” সংক্ষিপ্ত উত্তর মেধার।

“তবে শোন। তোমরা যে হোটেলে উঠেছ ওই হোটেলের মালিকের বড়ছেলে ছিল সুমিত। সুমিত বাবা মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বিয়ে করে নীলাঞ্জনা নামে একটি মেয়েকে। ভালোবাসার চরম সীমা যদি কিছু হয়ে থাকে সেই পর্যন্ত সুমিত ভালোবাসতো নীলাঞ্জনাকে। সুমিতের খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল রাজেন। সুমিতের অগোচরেই রাজেন, নীলাঞ্জনা আর সুমিতের মধ্যে একটা অদৃশ্য ত্রিভুজ তৈরি হয়ে যায়। বস্তুত রাজেন ছিল ক্যাসানোভা টাইপের ছেলে আর নীলাঞ্জনা সেই সব মেয়েদের দলে পড়ত যারা টাকা আর শরীরের জন্য সব কিছু করতে পারে। বিশ্বস্ততা শব্দটাই এদের দুজনের ডিকশনারিতে ছিল না। ভালোবাসা, বিশ্বাস এসব মূল্যহীন ছিল এদের কাছে। রাজেন সুমিতদের হোটেল চেনেই কাজ করত। সুমিতকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নীলাঞ্জনা এই হোটেলের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন কথা সুমিতের কানে এলেও সে গুরুত্ব দিত না কারণ সে তার নীলকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতো, বিশ্বাস করত। কারুর সাবধান বাণীতে কর্ণপাত করেনি সে কিন্তু একদিন সুমিতের ভাই অনেক কষ্টে সুমিতকে বোঝায় নীলাঞ্জনা আর রাজেনের ওপর নজর রাখার জন্য। সত্যি কথা বলতে কি সুমিত ভাইকে বিশ্বাস করে নয় তাকে ভুল প্রমাণিত করার জন্যই কলকাতা থেকে এখানে ছুটে আসে। তারপরে কি হলো সংক্ষেপে বলছি তোমাকে কারণ খেলা শেষ হতে আর বেশি সময় নেই। তোমরা যে কটেজটায় আছো ওই কটেজের জানালা দিয়ে সুমিত ভেতরের যে দৃশ্যাবলী দেখে তাতে তার পায়ের তলার বালি সরে অকূল সাগরে পড়ে যায় সে। তার ভালোবাসার মানুষটি আর তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু উদ্দাম শরীরী খেলায় মেতে উঠেছে। জানো মেধা দুটো মানুষ যখন পরস্পরকে সত্যিকারের ভালোবেসে মিলিত হয় তখন তাদের সেই মিলন হয় পবিত্র, দৃষ্টিনন্দন কিন্তু যদি তাদের সম্পর্কের মধ্যে নোংরামি থাকে তাহলে তাদের সেই সম্ভোগ দৃশ্য কতটা অশ্লীল, কতটা কদর্য হতে পারে সে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। সুমিত আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না দরজায় ধাক্কা দেয়। সুমিতকে দেখে ওরা বুঝতে পারে ধরা পড়ে গিয়েছে। সুমিত রাগের মাথায় নিজের লাইসেন্সেড রিভলবার বের করে ওদের শাসাতে থাকে , ওটা সব সময় তার সঙ্গে থাকত কিন্তু ও বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি রাজেনের কাছেও রিভলবার আছে। শুরু হয় অন্তিম যুদ্ধ। ধস্তাধস্তি করতে করতে রাজেনের গুলি দিকভ্রষ্ট হয়ে সোজা লাগে নীলাঞ্জনার বুকে। জানো মেধা সেই অবস্থাতেও সুমিতের বুকটা তার নীলের জন্য দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যায়। সে তার নীলের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে রাজেনের বুকে পরপর তিনটে গুলি চালিয়ে দেয় তারপর রিভলবারে আর একটা গুলি ছিল সেটা নিজের জীবন শেষ করতে সে ব্যবহার করে। শেষ হলো একটা অধ্যায়। এটা এক বছর আগের ঘটনা।”

এতদূর বলে রহস্যময় মানুষটি থামলেন। মেধা মন্ত্রমুগ্ধের মত বলল, “তারপর?”

“তারপর এই কাহিনীতে ঢুকলে তোমরা। সুমিত, নীলাঞ্জনা, রাজেন কারুর আত্মাই মুক্তি পায়নি। তারা প্রেতযোনি লাভ করেছে। গত এক বছরে তাদের আত্মা কিছু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে । আজ সেই অভিশপ্ত দিন। এই দিনে তারা আবার পরস্পরের মুখোমুখি হয়। তুমি এসব ঠিক বুঝবে না আর হাতেও বেশি সময় নেই। যে কোনও মুহূর্তে খেলা শেষ হয়ে যেতে পারে। সুমিত, নীলাঞ্জনা আর রাজেন তিনজনেই ভিডিও গেম খেলতে খুব ভালোবাসতো। আজ তোমাদের ওই কটেজে দেখে ওদের মধ্যে একটা গেম খেলার সিদ্ধান্ত হয়। এই গেমের ভিত্তি নির্ধারিত হয় বিশ্বাস আর ভালোবাসা। দুটো পার্ট এই গেমের। একদিকের প্লেয়ার মেধা মুখার্জী আর তাকে তাড়া করবে যে ভিলেন সে হলো রাজেন আগারওয়াল। অন্য দিকের প্লেয়ার ঋষি মুখার্জী তাকে বাঁচতে হবে নীলাঞ্জনার হাত থেকে। খুব অবাক লাগছে তাই না?”

“আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না। আমাকে তো ঋষি তাড়া করেছিল।”

“মেধা, রাজেন এখন প্রেতাত্মা। বললাম না প্রেত যোনি লাভ করার পর প্রত্যেকেই কিছু ক্ষমতার অধিকারী হয়। তুমি প্রথম থেকে ভেবে দেখ হঠাৎ করে বাথরুমের দেওয়াল ভেঙ্গে গেল কি করে। রাজেন তোমার কাছে ঋষির রূপে এসেছিল। এই গেমের রুল অনুযায়ী তুমি ফাস্ট লেভেলেই জিতে যেতে যদি বাথরুম থেকে ভয়ে না পালাতে। যদি বিশ্বাস করতে ঋষি তোমাকে কোনও অবস্থাতেই মারতে পারে না। সেকন্ড লেভেলেও জিততে পারতে যদি মন থেকে সমস্ত অবিশ্বাস দূর করতে পারতে কিন্তু তোমার মনে ঋষির প্রাক্তন প্রেমিকার কথা উদয় হলো। লাস্ট লেভেলে গিয়েও তোমার মন থেকে ঋষির প্রতি অবিশ্বাস দূর হয়নি কিন্তু তুমি জিতে গেলে ভালোবাসার লড়াইতে। তোমার কাছে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তুমি ঋষি রূপী রাজেনকে আঘাত না করে নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলে। তুমি যদি একবারও রাজেনকে আঘাত করে ফেলতে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যেতে। তুমি তা না করায় রাজেনের কি পরিণতি হয়েছে দেখ।”

মেধার সামনে বিশাল একটা পর্দা ফুটে উঠল। তার মধ্যে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী চলমান। মেধার শরীরটা ক্রমশ নিচের দিকে পড়ছে আর ছাদের ওপর ঋষির চেহারাটা আসতে আসতে অন্য একটা মানুষের চেহারা নিচ্ছে। যার চোখে ধুর্ততা, চেহারায় হিংস্রতা। মেধা দেখল সেই মানুষটা “না আ আ” বলে চিৎকার করে উঠলো আর সঙ্গে সঙ্গে তার সারা শরীরে আগুন ধরে গেল।

“এই খেলার সেকেন্ড পার্ট এখনও বাকি মেধা। তুমি তো জিতে গেলে তাই তোমার জীবনও বেঁচে গেল। এখন ঋষির ওপর নির্ভর করছে ওর নিজের জীবন আর সুমিতের মুক্তি।”

“মানে? কি বলতে চাইছেন আপনি?”

“এই গেমের রুল অনুযায়ী যদি তুমি আর ঋষি দুজনেই জিততে পারো তবেই সুমিতের আত্মা মুক্তি পাবে কারণ তোমরা জিতে যাওয়ার অর্থ বিশ্বাস আর ভালোবাসার জয়। যেগুলো ভীষন মূল্যবান সুমিতের কাছে। “

“এই খেলার শেষে রাজেন আর নীলাঞ্জনার কি হবে?” মেধা প্রশ্ন করে।

“রাজেন তোমার কাছে হেরে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে মানে প্রেতলোকে চিরকালের জন্য বন্দী সে। ওর আত্মা কোনও দিন মুক্তিও পাবে না আবার মনুষ্য লোকে এসে কারুর ক্ষতি সাধনও করবে না। ঋষি জিততে পারলে নীলেরও একই দশা হবে। যদি ঋষি হেরে যায় তাহলে ওর জীবনীশক্তি নিয়ে নীলের প্রেতাত্মা আরও শক্তি শালী হয়ে যাবে। সুমিতের আত্মাও তার দুঃখ বুকে নিয়ে এই সাগর পাড়ে ঘুরে বেড়াবে।”

“আচ্ছা ওরা তো খুব খারাপ মানুষ ছিল তাহলে খেলার রুল তো নাও মানতে পারে মানে ওদের ধ্বংস হয়ে যাবার ব্যাপারটা…..।”

“মেধা, মনুষ্য লোকের মত প্রেত লোকেরাও কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন আছে তাছাড়া রাজেন আর নীলের মত সুমিতও কিছু ক্ষমতার লাভ করেছে তাই খেলার পরিণতি তার নিয়ম অনুযায়ী হতে বাধ্য।”

“খুব ভালোবাসতেন নীলাঞ্জনাকে তাই না?”

মেধার প্রশ্নে রহস্যময় মানুষটি ওর দিকে ফিরে তাকায়। মেধা স্মিত হেসে বলে, “আজও আপনি নীলাঞ্জনাকে পরম যত্নে নীল বলে ডাকেন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমিত বলে, “এখন তোমার ভালোবাসার পরিণতি কি হয় দেখা যাক।”

পর্দায় ফুটে উঠলো কটেজের সেই রুম। ঋষিকে দেখতে দেখতে মেধার চোখের পাতা ভিজে এলো। ঋষি তাকে এত বিশ্বাস করে অথচ সে ঋষিকে এত খারাপ ভাবছিল! নিজের ওপরই ঘেন্না হচ্ছে মেধার। একটু পরে “ওহ শিট! নীল তুমি এটা করতে পারো না। ইট মাস্ট বি এ ফেয়ার গেম।” নিজের বাম হাতের তালুতে ঘুঁসি মেরে বলল সুমিত। মেধা অবাক হয়ে তাকাতে সুমিত উত্তেজিত ভাবে বলল, “নীল সম্মোহনী শক্তি প্রয়োগ করছে ঋষির ওপর। ঋষি একবার ওর বশে চলে এলে ঋষিও শেষ আর আমিও।”

মেধা কাঁদো কাঁদো হয়ে প্রশ্ন করে, “ওকে আটকানোর উপায় নেই?”

“নাহ, তিনজনে যখন খেলাটা তৈরি করি আমি এইদিকটা ভেবে দেখিনি। গেমের রুলসে উল্লেখ নেই বলে আমি ওকে আটকাতেও পারব না। বেঁচে থাকতে ওদের বিশ্বাস করার যে ভুলটা করেছিলাম আবার সেই একই ভুল করে ঋষিকে বিপদের মুখে ফেলে দিলাম। নীল এখনও একই রকম রয়ে গেছে। নীতিহীন, ছলনাময়ী।” হতাশ স্বরে বলল সুমিত।

“নাহ এটা হতে পারে না। আমার ঋষির কিছু হবে না।” কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মেধা। ঋষি এগিয়ে যাচ্ছে বিছানার দিকে যেখানে ফুটন্ত লাভার মত উত্তপ্ত যৌবন নিয়ে বসে আছে নীলাঞ্জনা। তার মনুষ্য শরীরটা চিতার আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেলে কি হবে আজ সে প্রেত শক্তি বলে যৌনতার মাদকতায় পূর্ন এই শরীর ধারণ করেছে। মেধা পর্দার দিকে তাকিয়ে ঋষির নাম ধরে চিৎকার করে ওঠে তারপর উন্মাদের মত সেদিকে ছুটে যায়।

 

নীলাঞ্জনার ঠোঁটে ক্রূর হাসি খেলা করছে। সুমিতকে সে মুক্তি পেতে দেবে না। বেচারা সুমিত প্রেতযোনি থেকে আর ওর মুক্তি ঘটবে না। রাজেনটা বোকার মতো হেরে গেল। চিরকালই ওর মাথাটা মোটা। সেদিন যদি বোকার মতো সুমিতের সাথে লড়াই করতে না যেত আজ তাহলে ওরা বেঁচে থাকতো। কেঁদেকেটে ক্ষমা চেয়ে সুমিতকে সে ঠিক আবার হাতের মুঠোয় নিয়ে নিত আর সুযোগ বুঝে শেষ করতো। তার বদলে আজ প্রেতিনি হয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। ঋষি তার খুব কাছে চলে এসেছে। হেরে গেলে সুমিত তুমি হেরে গেলে। কি বলেছিলে তুমি ভালোবাসা নাকি চিরন্তন! আমার আর রাজেনের মত কিছু মানুষ তাকে কলুষিত করেছে। ভালোবাসা নাকি কখনও হারে না! যত বোগাস কথাবার্তা! কিন্তু ঋষি এরকম করছে কেন? দুহাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে ঝাঁকাচ্ছে!

 

মোহগ্রস্থের মত ঋষি বিছানায় বসে থাকা মেয়েটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু তার মনের মধ্যে এরকম উথাল পাতাল হচ্ছে কেন? কার মুখটা বারবার জলছবির মত চোখের সামনে ভেসে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে? কে ও? মনে হচ্ছে খুব কাছের খুব নিজের কেউ। কি নাম ওর? এত চেনা লাগছে কেন? ঋষির কানে হঠাৎ একটা রিনরিনে আওয়াজ ভেসে এল। কেউ ওকে ডাকছে। পাগলের মতো ওর নাম ধরে চিৎকার করছে। এদিকে সামনের মেয়েটি ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তার উন্মুক্ত যৌবন ভোগ করার জন্য। এই মেয়েটিই বা কে? ঋষি কেন ওর কাছে যাবে? আস্তে আস্তে ঋষির ঘোর কেটে আসছে। মেধা, মেধা,মেধা…. এই একটা নাম মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ঋষি আচমকা চিৎকার করে উঠলো, “মেধা আ আ …...তুমি কোথায়?”

“নাহ, আমি এভাবে হারতে পারি না। না আ আ…..।” মরণ চিৎকার বেরিয়ে এল নীলাঞ্জনার গলা থেকে।

“তুমি হেরে গেছ নীল।”

সুমিত অবাক হয়ে রুমের মধ্যে আরও দুজন মানুষের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে। তারই বয়সী একজন পুরুষ আর অন্যজন তার স্ত্রী মেধা যার ছেঁড়া পোশাক, কেটে ছিঁড়ে যাওয়া হাত, মুখ আর বিধ্বস্ত চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে কোনও ঝড় বয়ে গেছে।

“মেধা তুমি কোথায় ছিলে? এমন অবস্থা কেন তোমার?” ঋষির উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।

প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে মেধা দৌড়ে এসে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুহাতে তাকে শক্ত করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি ঠিক আছো তো? ও তোমার কোনও ক্ষতি করে নি তো?”

নীলাঞ্জনার দু চোখে জিঘাংসার আগুন কিন্তু তার কিচ্ছু করার নেই খেলা শেষ। শর্ত অনুযায়ী তাকে এবার চির বন্দিনী হয়ে থাকতে হবে প্রেতলোকে।

“গুড বাই নীল। ঋষির ভালোবাসা আর বিশ্বাস ওকে তোমায় সম্মোহন থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।” সুমিত শেষ বিদায় জানায় তার ভালোবাসার মানুষকে। নীলাঞ্জনার শরীরটা আস্তে আস্তে আগুনের গ্রাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।

বিস্মিত ঋষির বলে, “আ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব। আমরা জিতে গেছি ঋষি। ভালোবাসার খেলায় আমরা জিতে গেছি।” খুশির ছোঁয়া মেধার কন্ঠে।

 

মাথার ওপর অন্তহীন আকাশ, সামনে অকূল পাথার। মেধা আর ঋষি দাঁড়িয়ে আছে পরস্পরের হাত ধরে সামনে সুমিত।

“এমনি করেই দুজনে দুজনকে ভালোবেসো, পরস্পরের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখো। ভালো থেকো তোমরা আর ভালো থাকুক ভালোবাসা।”

সুমিতের অবয়বটা ধীরে ধীরে আবছা হয়ে মিলিয়ে গেল নীল আকাশের বুকে। দিগন্তে তখন কনে বউয়ের মত সিঁদুরে রাঙা লাজুক সূর্য উঁকি দিচ্ছে।